বিস্ট্রল আর কভেন্ট্রির মধ্যে প্রায় পুরোটা খেলা, সেই সময়ের একটি খবরের কাগজকে উদ্ধৃতি দিলে, দ্রুত এবং প্রায়শই হিংস্র, একটি উত্তেজনাময় ( যদি আপনি এই ধরনের খেলা পছন্দ করে থাকেন। ডিং-ডং যুদ্ধ। দুই পক্ষের কিছু দারুণ গোল খেলার আশিতম মিনিটে ফলাফল প্রায় নিশ্চিৎ করেছিল: ২-২, অর্থাৎ ড্র। তারপর খেলার শেষ দুমিনিট আগে অন্য মাঠ থেকে খবর এলো সান্দারল্যান্ড হেরে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে কভেন্ট্রির টীম ম্যানেজমেন্ট মাঠের এক প্রান্তে থাকা সুবিশাল ইলেকট্রনিক বোর্ডে খবরটি প্রচার করে। স্পষ্টতই ২২ জন খেলোয়াড়ই পড়তে সক্ষম এবং তারা অনুভব করেছিলেন তাদের আর এত পরিশ্রম করে খেলার কোনো প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয় ডিভিশনে নেমে যাবার হাত থেকে বাঁচার জন্য শুধুমাত্র একটি ড্র করাই প্রয়োজন তাদের। আসলেই, এখন গোল করার জন্য কোনো বাড়তি প্রচেষ্টাই অবশ্যই খারাপ নীতি কারণ, প্রতিরক্ষা বা ডিফেন্স থেকে খেলোয়াড় সরিয়ে নেবার ঝুঁকি আছে, যা সত্যিকারভাবে হারাতে পারে –এবং দ্বিতীয় ডিভিশনে জায়গা হতে পারে। উভয় পক্ষই বিশেষভাবে আগ্রহী ছিল ড্র করার জন্য। একই খবরটি যদি উদ্ধৃত করি: ‘ সমর্থকরা যারা ব্রিস্টলের পক্ষে ডন গিলিসের ৮০ তম মিনিটে সমতাসূচক গোলটি করার আগে একে অপরের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, তারা হঠাৎ করেই যৌথভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে শুরু করেছিলেন। রেফারী রন শালিস অসহায়ভাবে খেলোয়াড়দের অলসভাবে বল নিয়ে এদিক ওদিক পাস দেয়া দেখতে থাকেন, যেখানে কোনো খেলোয়াড়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। যা এর আগে একটি জিরো সাম গেম ছিল সেটি হঠাৎ করে বাইরে থেকে আসা একটা টুকরো খবর পাবার সাথে সাথে একটি নন-জিরো সাম গেমে রূপান্তরিত হয়। আমাদের এর আগের আলোচনার ভাষায়, যেন একজন বাইরের ব্যাঙ্কার যাদুবলে সেখানে আবির্ভুত হলেন, যা ব্রিস্টল এবং কভেন্ট্রি উভয় টিমকেই একই পরিণতি– ড্র থেকে সুফল আদায় করার সুযোগ প্রদান করে।
দর্শকদের খেলা যেমন ফুটবল সাধারণত খুব সঙ্গত কারণে জিরো সাম গেম। আরো বেশী উত্তেজনাময় দর্শকদের জন্য যখন তারা দেখে খেলোয়াড়রা একে অপরের সাথে তীব্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, তারা একে পরের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে কোনো ষড়যন্ত্র করছে এমন দৃশ্য তাদের কাম্য নয়। কিন্তু বাস্তব জীবন, মানুষের জীবন কিংবা উদ্ভিদ বা প্রাণী, এমনভাবে সাজানো নয় যে এর দর্শককে সে কোনো সুবিধা দেয়না। বাস্তব জীবনে বহু পরিস্থিতি, সত্যিকারভাবে, নন-জিরো সাম গেমের সমতুল্য। প্রকৃতি প্রায়শই ব্যাঙ্কারের ভূমিকা পালন করে এবং সেকারণে একক কোনো সদস্য অন্যের সফলতা থেকে সুবিধার আদায় করতে পারে। তারা নিজেদের সুবিধাপ্রাপ্তি নিশ্চিৎ করতে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হবার কোনো দরকার নেই। স্বার্থপর জিনের মৌলিক সূত্র থেকে বিচ্যুত না হয়েও আমরা দেখতে পারি কিভাবে সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সহায়তা বিকশিত হতে পারে এমনকি মৌলিকভাবে কোনো স্বার্থপর পৃথিবীতে। আমরা দেখতে পারি অ্যাক্সেলরড যেভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, ভালোরাই হয়তো শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়– বিষয়টি বুঝতে পারি।
কিন্তু এসব কিছুই হবে না যদি না খেলাটির পুনরাবৃত্তি হয়। খেলোয়াড়রা অবশ্যই জানেন (অথবা ‘জানে’) বর্তমান যে খেলাটি চলছে এটাই তাদের মধ্যে শেষ খেলা নয়। অ্যাক্সেলরডের সেই হৃদয়স্পর্শী বাক্য, ‘ভবিষ্যতের ছায়া অবশ্যই অনেক দীর্ঘ। কিন্তু এটিকে অবশ্যই কত দীর্ঘ হতে হবে? অবশ্যই এটি অসীমভাবে দীর্ঘ নয়। তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি কোনো সমস্যা নয় যে খেলাটি কত দীর্ঘ; গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে কোনো খেলোয়াড়ই আসলে জানেন না খেলাটি কখন শেষ হবে। ধরুন আমি এবং আপনি একে অপরের বিরুদ্ধে খেলছি, এবং ধরুন আমরা দুজনেই জানি এই খেলায় রাউন্ড সংখ্যা ঠিক ১০০; এখন আমরা উভয়েই বুঝতে পারি যে ১০০ তম রাউন্ডটি এই গেমের শেষ, সুতরাং কোনো সাধারণ প্রিজনার’স ডাইলেমা গেমের একটি দানের এটি সমতুল্য। সুতরাং ১০০ তম রাউন্ডে আমাদের দুজনের জন্যই একমাত্র যৌক্তিক কৌশল হচ্ছে বিশ্বাসঘাতকতা করা। এবং আমরা প্রত্যেকেই ধরে নিতে পারি অন্য খেলোয়াড়ও এটি সহজেই বুঝবেন এবং সেও শেষ রাউন্ডে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য স্থিরকল্প থাকবে। সুতরাং শেষ রাউন্ড কি হবে সেটি আমরা আগে থেকেই বলে দিতে পারি পূর্বপ্রত্যাশিত উপায়ে। কিন্তু এখন ৯৯ তম রাউন্ড হবে একদানের খেলার মতই, এবং একমাত্র যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হবে উভয় খেলোয়াড়ের জন্য এই একটি বাদে শেষ রাউন্ডে– বিশ্বাসঘাতকতা করা। এর পর ৯৮ তম রাউন্ডটি একই পরিস্থিতির স্বীকার হবে এবং এভাবে বাকী সবগুলো। দুজনই খুবই কঠোরভাবে যুক্তিবাদী খেলোয়াড়, যাদের প্রত্যেকেই ধরে নেন যে অপরজন যুক্তিবাদী, তারা বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনা যদি তারা জানতে পারেন সেই খেলাটির নিয়তিতে কয় রাউন্ড খেলা চলবে। আর এই কারণে যখন গেম তাত্ত্বিকরা পুনরাবৃত্তি হতে থাকা প্রিজনার’স ডাইলেমা গেম এর কথা বলেন, তারা সবসময় মনে করেন এই খেলার শেষটি কখন হবে সেটি আগে থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব না অথবা এটি কখন শেষ হবে সেটি জানে শুধু ব্যাঙ্কার।
