হতভাগ্য দম্পতিটিকে টেনে হিঁচড়ে ‘জিরো সাম’ খেলায় জড়িয়ে ফেলা হবে, তবে আইনজীবিদের জন্য, স্মিথ বনাম স্মিথ কেসটি খুব ভালো লাভজনক একটি নন-জিরো সাম’ গেম, যেখানে স্মিথরা টাকা দেবে, এবং দুই পেশাজীবি এই দুই মক্কেলের যৌথ একাউন্ট শুষে নেবে তাদের বিস্তারিতভাবে পরিকল্পিত সাংকেতিক সহযোগিতার মাধ্যমে। একটি উপায় হচ্ছে যেখানে দুই আইনজীবি পারস্পরিক সহযোগিতা করে, সেটি হচ্ছে উভয় পক্ষ এমন কোনো প্রস্তাব উপস্থাপন করে, তারা দুজনেই জানেন যে প্রস্তাব অপর পক্ষ কখনোই মেনে নেবে না। এটি আবার একটি পাল্টা প্রস্তাবের জন্ম দেবে, এবং আবারো তারা দুজনেই জানেন কেউই তা মেনে নেবেন না। এবং এভাবেই এটি চলতে থাকে। প্রতিটি চিঠি, প্রতিটি টেলিফোন কল সহযোগিতাপূর্ণ প্রতিপক্ষের মধ্যে আদান প্রদান হয়, যা বিলের অংক আরো খানিকটা ভারী করে। ভাগ্য প্রসন্ন হলে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকতে পারে বহু মাস অথবা এমনকি কয়েক বছর, যার সাথে সমান্তরালে বাড়তে থাকে খরচ। আইনজীবিরা একসাথে হয়ে এর কোনো মিমাংসা করেনা। বরং এর বিপরীত, সহযোগিতার জন্য সযত্নে নিজেদের এই দুরত্ব বজায় রাখাটা তাদের প্রধান অস্ত্র, যার মূল্য পরিশোধ করতে হয় তাদের মক্কেলদের। উকিলরা হয়তো নিজেরাই জানেন না তারা কি করছেন। ভ্যাম্পায়ার বাদুরদের মত– যাদের নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা কথা বলবো, তারা একটি বহু চর্চিত আচারের নিয়ম অনুসরণ করছেন। এই সিস্টেমটি কাজ করে কোনো সচেতন তদারকী বা পরিকল্পনা ছাড়া। আমাদের জিরো সাম গেম খেলতে বাধ্য করার জন্য এগুলো সবই সজ্জিত। মক্কেলদের জন্য জিরো সাম, কিন্তু আইনজীবিদের জন্য খুব ভালোভাবেই নন-জিরো সাম।
কি করা যেতে পারে? শেকসপিয়ারের প্রস্তাবটি খুব সহজ কাজ না, বহু ঝামেলার, তবে অনেক কম ঝামেলা হবে যদি আমরা আইনটি বদলাতে পারি। কিন্তু বেশীর ভাগ সংসদ সদস্যই আবার আইন পেশা থেকে এসেছেন, এবং তারা জিরো সাম মানসিকতাপুষ্ট। ব্রিটিশ হাউস অব কমনস এর চেয়ে শত্রুভাবাপন্ন জায়গা কল্পনা করা খুবই কঠিন (আইনের আদালত নিদেনপক্ষে বিতর্ক করার শ্লীলতা সংরক্ষণ করে, এবং তারা হয়তো আমার বিজ্ঞ বন্ধু এবং আমি খুব ভালোভাবে সহযোগিতা করছে ব্যাঙ্ক অবধি যাওয়ার পুরোটা পথেই।) হয়তো শুভাকাঙ্খী সংসদ সদস্যরা এবং আসলেই অনুশোচনারত আইনজীবিদের সামান্য কিছু গেম থিওরী শেখা উচিৎ। নিরপেক্ষভাবে আমাদের যোগ করা উচিৎ যে কিছু আইনজীবি এর ঠিক বিপরীত দ্বায়িত্বটি পালন করেন, তারা মক্কেলদের প্ররোচিত করেন, যারা একটি জিরো সাম গেম খেলার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে, অথচ আদালতের বাইরে একটি নন-জিরো সাম সমঝোতা করলে তারা দুজনেই লাভবান হবে।
মানুষের জীবনে অন্য গেমগুলো তাহলে কেমন? কোনটা জিরো সাম আর কোনটা নন-জিরো সাম? এবং যেহেতু এটি একই জিনিস নয়– জীবনের কোন অংশটি আপনি অনুভব করেন জিরো অথবা নন জিরো সাম গেম? মানব জীবনের কোন অংশটি ‘ঈর্ষা বা পরশ্রীকাতরতা লালন করে এবং কোন অংশটি ব্যাঙ্কারের বিরুদ্ধে যৌথ সহযোগিতা? যেমন, ভাবুন, বেতন নিয়ে দরকষাকষি এবং ‘পার্থক্য। আমরা যখন আমাদের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে দরকষাকষি করি, আমরা কি ঈর্ষার কারণে প্ররোচিত হই অথবা আমরা সহযোগিতা করি আমাদের সত্যিকার আয় বাড়ানো সর্বোচ্চ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে? আমরা কি ধরে নেই, বাস্তব জীবনে এবং একই সাথে মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায়, যে আমরা একটি জিরো সাম গেম খেলছি, যখন আমরা সেটি করছি না? আমি শুধুমাত্র এই সব কঠিন প্রশ্নগুলো উত্থাপন করতে চাই। তবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া এই বইয়ের আওতার বাইরে।
ফুটবল হচ্ছে একটি জিরো সাম গেম। অন্তত সাধারণত এটি তাই, কখনো কখনো এটি নন-জিরো সাম গেম হতে পারে। এটি ঘটেছিল ১৯৭৭ সালে ইংলিশ ফুটবল লীগে ( অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল বা ‘সকার’, অন্য যে খেলাগুলো পরিচিত ফুটবল হিসাবে- রাগবী ফুটবল, অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল, আমেরিকান ফুটবল, আইরিশ ফুটবল ইত্যাদি, সব জিরো সাম গেম)। ফুটবল লীগে দলগুলোকে চারটি বিভাগে ভাগ করা হয়। একটি ক্লাৰ অন্য একটি ক্লাবের বিরুদ্ধে খেলে তাদের নিজেদের বিভাগের মধ্যে, প্রতিটি জয়ের বা ড্রয়ের জন্য পয়েন্ট সঞ্চিত করে পুরো মৌসুম জুড়ে। প্রথম ডিভিশনে থাকা সন্মানজনক এবং আরো একটি লোভনীয় এবং ব্যবসার জন্য ভালো কারণ এটি অনেক বেশী দর্শক সমাগম নিশ্চিৎ করে। প্রতিটি মৌসুমের শেষে, তালিকায় সর্বনিম্ন থাকা প্রথম ডিভিশনের তিনটি ক্লাব পরের মৌসুমে দ্বিতীয় ডিভিশনে নামিয়ে দেয়া হয়। এই পদাবনতিকে মনে করা হয় ভয়ঙ্কর একটি পরিণতি হিসাবে, যে পরিণতিকে এড়ানোর জন্য সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা করা যুক্তিযুক্ত।
১৯৭৭ সালে ১৮মে ছিল সেই বছরের ফুটবল মৌসুমের শেষ দিন। প্রথম ডিভিশন থেকে তিনটি টিমের দুটি যারা দ্বিতীয় বিভাগে পদাবনতি পেয়েছে তারা ইতিমধ্যেই নির্দিষ্ট হয়ে গেছে, তৃতীয় কোন টীমটি তাদের নিয়তি বরণ করবে সেটি তখনও নিশ্চিৎ হয়নি। তবে সেটি সান্ডারল্যান্ড, ব্রিস্টল অথবা কভেন্ট্রি, নিশ্চিৎভাবে এই তিনটি দলের কোনো একটির হবার কথা। এই তিনটি দল, তখন, বাধ্য তাদের সব কিছু দিয়ে পরের রবিবারের খেলাটি খেলার জন্য। সান্ডারল্যান্ড খেলছিল চতুর্থ একটি টীমের সাথে ( যাদের প্রথম ডিভিশন থেকে জায়গা হারাবার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই); ব্রিস্টল এবং কভেন্ট্রি ঘটনাচক্রে এক অপরের সাথে খেলছিল। আগেই জানা ছিল যে, যদি সান্দারল্যান্ড তাদের খেলায় হেরে যায়, তাহলে কভেন্ট্রি আর ব্রিস্টলের একে অপরের সাথে শুধু ড্র করতে হবে প্রথম ডিভিশনে টিকে থাকার জন্য। কিন্তু যদি সান্দারল্যান্ড জিতে যায়, তাহলে ব্রিস্টল বা কভেন্ট্রির কোনো একটি দলকে দ্বিতীয় বিভাগে নামতে হবে, যা নির্ভর করবে তাদের মধ্যকার খেলার ফলাফলের উপর। দুটি গুরুত্বপূর্ণ খেলা তাত্ত্বিকভাবে যুগপৎ ঘটছে। বাস্তব সত্য হচ্ছে যদিও ব্রিস্টল-কভেন্ট্রি ম্যাচটি পাঁচ মিনিট দেরীতে শুরু হয়েছিল। এই কারণে সান্দারল্যান্ডের খেলার খবর ব্রিস্টল-কভেন্ট্রি খেলা শেষ হবার আগেই জানা যাবে, এবং এর উপর নির্ভর করেছিল এই পুরো জটিল কাহিনীটি।
