সুতরাং যদিও ‘টিট ফর ট্যাট’ হতে পারে একমাত্র সন্দেহজন ‘ইএসএস’, এর একধরণের একটি উচ্চতর পর্যায়ের স্থিতিশীলতা আছে। এর কি মানে হতে পারে? নিশ্চয়ই যা স্থিতিশীল তার তো স্থিতিশীল হবার কথা। বেশ, এখানে আমরা একটি দীর্ঘতর দৃষ্টির সাহায্য নিচ্ছি। সবসময় বিশ্বাসঘাতক’ দীর্ঘসময় ধরে কোনো আগ্রাসনকে প্রতিহত করতে পারে। কিন্তু যদি আমরা যথেষ্ট পরিমান দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করি, হয়তো বহু হাজার বছর, “টিট ফর ট্যাট’ ধীরে ধীরে সেই সংখ্যাধিক্য অর্জন করে যা ছুরির প্রান্তসীমা অতিক্রম করতে পারে। এবং পুরো জনগোষ্ঠী বদলে যায়। কিন্তু এর উল্টোটা কখনো হবে না। সবসময় বিশ্বাসঘাতকতা’, যেমনটি আমরা দেখেছি, একসাথে জমায়েত বাধা থেকে কোনো সুবিধা আদায় করতে পারেনা এবং সে কারণে উচ্চতর পর্যায়ের স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনা।
টিট ফর ট্যাট, যেমনটি আমরা দেখেছি, একটি ভালো বা নাইস’ স্ট্রাটেজী, যার অর্থ প্রথমে কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা না করা এবং ক্ষমাশীল কারণ অতীতের অপকর্ম বেশী দিন মনে রাখার মত তার দীর্ঘ মেয়াদী স্মৃতি নেই। আমি এখন অ্যাক্সেলরডের আরেকটি ইঙ্গিতবহ কারিগরী শব্দের সাথে পরিচিত হই। টিট ফর ট্যাট একই সাথে খুব বেশী ঈর্ষাকাতর নয়। ঈর্ষাকাতর হতে হলে, আক্সেলরডের ভাষায়, অন্যান্য খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশী অর্থ উপার্জনের জন্য সংগ্রাম করতে হবে, ব্যাঙ্কারের টাকার পুরোপুরিভাবে বিশাল অংশ পাবার চেয়েও। ঈর্ষাকাতর না হওয়া মানে বেশী খুশী হওয়া যে অন্য খেলোয়াড়ও আপনার মতই সমপরিমান অর্থ জয় করে, যতক্ষণ না পর্যন্ত ব্যাঙ্কারের কাছ থেকে আপনারা দুজনেই আরো বেশী অর্থ উপার্জন করেন। টিট ফর ট্যাট কখনো আসলেই কোন খেলায় জয়লাভ করেনা। বিষয়টি নিয়ে ভাবুন এবং আপনি দেখতে পাবেন এটি এর প্রতিপক্ষ থেকে কখনোই বেশী বেশী পরিমান লাভ অর্জন করতে পারেনা কোনো একটি নির্দিষ্ট খেলায় কারণ এটি কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা করেনা শুধুমাত্র বদলা নেয়ার সময় ছাড়া। বড় জোর এটি যা করতে পারে তা হলো এর প্রতিপক্ষের সাথে ড্র করে। কিন্তু এটি প্রতিবারই ড্র অর্জন করে,যখন দুজনেই লাভই এককরমভাবে অনেক বেশী হয়। যখন আমরা টিট ফর ট্যাট বা অন্যান্য নাইস স্ট্রাটেজী নিয়ে কথা বলি, ‘প্রতিপক্ষ’ শব্দটিই অপ্রযোজ্য এখানে। দুঃখজনকভাবে যদিও যখন মনোবিজ্ঞানীরা ‘পুনরাবৃত্তি হওয়া প্রিজনার’স ডাইলেমা গেমটি সাজান সত্যিকারের মানুষদের মধ্যে, প্রায় প্রতিটি খেলোয়াড়ই ঈর্ষার শিকার হন এবং সেকারণে অর্থ উপার্জনের বিবেচনায় তারা অপেক্ষাকৃতভাবে খারাপ ফলাফল করেন। মনে হতে পারে যে বহু মানুষ, হয়তো এমনকি কোনো কিছু চিন্তা না করে, অন্য খেলোয়াড়ের সাথে সহযোগিতা করে ব্যাঙ্কারের ক্ষতি করার বদলে বরং অন্য খেলোয়াড়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। অ্যাক্সেলরডের কাজ প্রদর্শন করে কি বড় ধরনের ভুল ছিল এটি।
এটি শুধুমাত্র কিছু বিশেষ ধরনের খেলার জন্য ভুল। গেম তাত্ত্বিকরা খেলাগুলো বিভক্ত করেন দুটি প্রকারে– ‘জিরো সাম’ এবং ননজিরো সাম’। কোনো একটি ‘জিরো সাম’ গেম হচ্ছে সেই গেম যেখানে কোনো একক খেলোয়াড়ের জন্য বিজয় মানে অন্য জনের জন্য পরাজয়। দাবা হচ্ছে ‘জিরো সাম’, কারণ প্রতিটি খেলোয়াড়ের লক্ষ্য হচ্ছে জয় লাভ করা, এর মানে হলো অন্য খেলোয়াড়কে পরাজিত করা। প্রিজনার’স ডাইলেমা, তবে, একটি নন-জিরো সাম’ গেম। একজন ব্যাঙ্কার আছে যিনি টাকা দেন, এবং এটি সম্ভব দুজন খেলোয়াড় জোট বেধে হাসতে হাসতে ব্যাঙ্কে যেতে পারেন। এই হাসতে হাসতে ব্যাঙ্কে যাওয়ার কথাটি আমাকে শেকসপিয়ার এর একটি চমৎকার উক্তির কথা মনে করিয়ে দিলো:
‘প্রথম যে জিনিসটি আমরা করবো, আসুন সব উকিলদের হত্যা করি। হেনরী (চতুর্থ)
যাকে আমরা সাধারণ সামাজিক ‘দ্বন্দ্ব’ বলি, সেখানে প্রায়শই বাস্তবিকভাবে সহযোগিতার একটি বিশাল সুযোগ থাকে। যাকে দেখলে মনে হয় একটি জিরো সাম দ্বন্দ্ব, সেটি একটু সদিচ্ছা থাকলেই রূপান্তরিত হতে পারে পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ নন জিরো সাম গেমে। বিবাহ বিচ্ছেদের কথা ভাবুন, একটি ভালো বিয়ে অবশ্যই নন-জিরো সাম গেম, যা পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ। এবং এমনকি যখন এটি ভেঙ্গে পরে, সেখানে বহু ধরনের কারণ থাকে কেন সেই দম্পতির প্রত্যেকেই লাভবান হতে পারে সহযোগিতা অব্যাহত রেখে এবং তাদের বিবাহ বিচ্ছেদকেও একটি নন-জিরো সাম গেম হিসাবে বিবেচনা করে। সন্তানদের কল্যাণ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসাবে তো আছেই, আইনজীবিদের পারিশ্রমিকও পারিবারিক খরচের উপর খারাপ প্রভাব ফেলবে, সুতরাং স্পষ্টতই কোনো কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন দম্পতি একটি আইনজীবির কাছে যৌথভাবে যাবার মাধ্যমে শুরু করে। তাই না?
বেশ, আসলেই তা নয়। অন্তত ইংল্যান্ডে সাম্প্রতিক সময়ের আগে, যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চাশটি রাজ্যে, আইন বা আরো সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে এবং আরো বেশী গুরুত্বপর্ণভাবে– আইনজীবিদের পেশাগত বিধি অনুযায়ী, তাদের একই সাথে একই দম্পতির দুজনের আইনজীবি হতে অনুমতি দেয়না। কোনো দম্পতির যেকোনো একজনকে মাত্র তারা তাদের মক্কেল বানাতে পারেন। অন্যজনকে দরজা থেকেই ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং হয় তার কোনো আইনগত উপদেশ নেই একদম অথবা তারা অন্য একজন আইনজীবির শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন। এবং তখনই কেবল আসল মজা শুরু হয়। আলাদা আলাদা কক্ষে কিন্তু একটি কণ্ঠস্বরে, দুই আইনজীবি তাৎক্ষণিকভাবে ‘আমরা” এবং “ওরা” হিসাবে নিজেদের চিহ্নিত করতে শুরু করে। আমরা–আপনি বুঝতে পারছেন– এর মানে কিন্তু আমি এবং আমার স্ত্রী নয়: এর অর্থ হচ্ছে ‘আমি এবং আমার আইনজীবি’ বনাম ‘সে এবং তার আইনজীবি। যখন কোর্টের সামনে কেসটি আসে, এটি সাধারণত তালিকাভুক্ত করা হয় নাম দিয়ে, যেমন ‘স্মিথ বনাম স্মিথ’! তারা প্রতিপক্ষ হবে এমন পূর্বধারণা করে নেয়া হয়। দম্পতি একে অপরে প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হবেন কি হবেন না, বা তারা বিশেষভাবে রাজী হয়েছিল কিনা যে যুক্তিসঙ্গত কারণে তারা বন্ধুভাবাপন্ন থাকবেন কি থাকবেন না। এবং কে আসলে লাভবান হবে ‘আমি জিতেছি আর তুমি হেরেছো এমন দড়ি টানাটানি হিসাবে এটিকে ভাবলে? সম্ভাবনা হচ্ছে শুধুমাত্র লাভবান হবেন দুই আইনজীবি।
