প্রিজনার বা বন্দীদের এই উভয় সংকটের সরল খেলায়, এই পারস্পরিক বিশ্বাসকে নিশ্চিৎ করার কোনো উপায় নেই। যদি না কোনো একজন খেলোয়াড় সত্যিকারভাবে সাধুসদৃশ্য ‘সাকার’, যারা এই পৃথিবীর জন্য অতিরিক্ত ভালো, পুরো খেলাটা শেষ হবার সম্ভাবনা আছে পারস্পরিক বিশ্বাসঘাতকার মাধ্যমে, যা ফলাফল কাঙ্খিত ফলাফলের বিপরীত, দুজনের জন্য যা খারাপ পরিণতির কারণ হবে। কিন্তু এই খেলাটার আরো একটি সংস্করণ আছে। এটিকে বলে ‘পুনরাবৃত্তি হওয়া বন্দীদের উভয়সংকট বা আইটিরেটেড অথবা রিপিটেড প্রিজনার’স ডাইলেমা। পুনরাবৃত্তি হওয়া খেলাটি আরো বেশী জটিল এবং এই জটিলতার মধ্যেই আছে আশা।
এই ‘পুনরাবৃত্তি হওয়া খেলাটি খুবই সাধারণ সেই একই খেলার মত, শুধুমাত্র যেটি একই খেলোয়াড়দের নিয়ে অনির্দিষ্টবারের জন্য পুনরাবৃত্তি হয়। আরো একবার আমি এবং আপনি মুখোমুখি হই, আমাদের মাঝে বসে থাকেন মিমাংসাকারী ব্যাঙ্কার। আবারো আমাদের হাতে দুটো করে কার্ড থাকে, একটি সহযোগিতা, আর আরেকটি অসহযোগিতা/বিশ্বাসঘাতকতা বা কোঅপারেট এবং ডিফেক্ট। আবারো খেলার দানে আমাদের দুজন এই দুটি কার্ডের যেকোনো একটি খেলবো, এবং উপরে বর্ণিত সেই খেলার নিয়মানুযায়ী ব্যাঙ্কার হয় টাকা দেবে, নয়তো জরিমানার শাস্তি প্রদান করবে। কিন্তু এখন, সেই খেলাটি একবার শেষ হবার বদলে, আমরা আবারও কার্ড হাতে তুলে নিয়ে নতুন খেলার দান শুরু করি। এভাবে একের পর এক খেলার চক্র আমাদের সুযোগ দেয় বিশ্বাস অথবা অবিশ্বাস সৃষ্টি করার জন্য, একে অপরের কাজের প্রতিদান অথবা তোষণ বা ক্ষমা বা প্রতিশোধ নেয়ার। একটি অনির্দিষ্ট সময়ব্যাপী চলমান দীর্ঘ খেলায়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপারটি হচ্ছে, আমরা দুজনেই জিততে পারি ব্যাঙ্কারকে বোকা বানিয়ে, নিজেদের কোনো ক্ষতি না করে।
এভাবে এই খেলার দশ রাউন্ড পর, তাত্ত্বিকভাবে আমি প্রায় ৫০০০ ডলার জয় করতে পারি, কিন্তু শুধুমাত্র যদি আপনি খুব বড় মাপের বোকা হয়ে থাকেন (বা মহাপুরুষ সাধুসুলভ হন) এবং সবসময়ই সহযোগিতার কার্ডটি খেলে থাকেন, এমনকি যখন আমি সবসময়ই অসহযোগিতার কার্ডটি খেলে যাচ্ছি। আরো বাস্তবসম্মতভাবে, আমাদের দুজনের জন্যই খুব সহজ হবে ব্যাঙ্কারের ৩০০০ ডলার হাতিয়ে নেয়া এই খেলার দশটির রাউন্ডের প্রতিটিতে দুজনেই সহযোগিতার কার্ডটি খেলে। এর জন্য আমাদের বিশেষভাবে সাধুসুলভ হতে হবে না, কারণ আমরা দুজনেই দেখতে পাচ্ছি, একে অপরের অতীতের দান থেকে, পরস্পরকে আমরা বিশ্বাস করতে পারবো। আমরা কার্যত একে অপরের আচরণের উপর নজরদারী করতে পারবো। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, এমনও সম্ভাবনা আছে। আমাদের কেউ একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারবো না। আমরা দুজনেই ডিফেক্ট অসহযোগিতার কার্ডটি খেলছি পুরো দশ রাউন্ড জুড়ে এবং ব্যাঙ্কার আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০০ ডলার জরিমানা আদায় করে নেবেন। খুব সম্ভবত যেটা হবে আমরা একে অপরকে আংশিকভাবে বিশ্বাস করবো, এবং আমরা দুজনেই সহযোগিতা আর অসহযোগিতার একটি মিশ্র’ কৌশল ধারাবাহিকভাবে খেলে যাবো, মোটামুটি মাঝারী পরিমান টাকা আদায় করা সম্ভব হবে।
অধ্যায় ১০ এর পাখিরা যারা একে অপরের মাথার উপরের পালক থেকে ছোট কীট বা টিক অপসারণ করতে সাহায্য করে তারাও একধরনের বহুবার পুনরাবৃত্তি হওয়া প্রিজনার’স ডাইলেমা বা উভয়সঙ্কট খেলাটি খেলে। কিভাবে তারা সেটি খেলে? আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে কোনো একটি পাখির পক্ষে তার নিজের পালক থেকে টিক অপসারণ করাটা জরুরী একটি ব্যাপার, কিন্তু সে তার নিজের মাথার উপরের জায়গাটি নিজে ঠোঁট দিয়ে খুটে পরিষ্কার করতে পারেনা, তার তখন অন্য সঙ্গীর দরকার হয়, যে সেই কাজটি তার হয়ে করে দেয়। এখানে স্পষ্টতই মনে হতে পারে খুব স্বাভাবিক ব্যপারটি হবে, সে পরে তার সঙ্গীর করা এই উপকারটির অবশ্যই প্রতিদান দেবে। কিন্তু এই প্রতিদান দিতে হলে পাখি হিসাবে তার সময় ও শক্তির খরচ হবে, যদিও খুব বেশী নয়। যদি কোনো পাখি, প্রতিদান না দিয়ে বা প্রতারণা করে পার পেয়ে যেতে পারে– মানে তার নিজের মাথার টিক পরিষ্কার করার পর, প্রতিদান দিতে অস্বীকার করে– সে মূল্য পরিশোধ না করেই লাভবান আউটকাম বা পরিণতিগুলোকে যদি আপনি পর্যায়ক্রমে সাজান এবং আপনি দেখবেন সত্যিকারের একটি প্রিজনার’স ডাইলেমা গেমই এখানে খেলা হচ্ছে। উভয়পক্ষই যেখানে সহযোগিতা করছে (একে অপরের মাথাকে টিক তুলে দেয়া) সেখানে পরিস্থিতি বেশ ভালো, কিন্তু তারপরও কোনো প্রতিদান ছাড়াই বা কোনো মূল্য পরিশোধ না। করেই উপকার নেবার মাধ্যমে আরো বেশী লাভ করার প্রলোভনও আছে।
দুজনেই অসহযোগিতা করলে (একে অপরের মাথা থেকে টিক পরিষ্কার করতে অস্বীকার করলে) পরিস্থিতি দুজনের জন্যেই বেশ খারাপ হয়। কিন্তু এতটা খারাপ হয় না যেমন হতে পারে যখন কষ্ট করে কারো মাথা থেকে টিক পরিষ্কার করার পরেও নিজের শরীর টিক দ্বারা আক্রান্ত থেকে যায়। লাভ-ক্ষতির হিসাবের ছকটি আমরা দেখতে পারে ছবি ২ তে।
কিন্তু এটি শুধুমাত্র একটি উদাহরণ। আপনি বিষয়টি নিয়ে যত ভাববেন, তত বেশী আপনি অনুধাবন করতে পারবেন জীবন পূর্ণ হয়ে আছে বহুবার পুনরাবৃত্তি হওয়া প্রিজনার’স ডাইলেমা খেলায়, শুধু মানুষের জীবন না বরং প্রাণী এবং উদ্ভিদের জীবনেও। উদ্ভিদের জীবন? হ্যাঁ, কেন নয়? মনে রাখবেন আমরা সচেতনতার স্তরে নেয়া হয়েছে এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা বলছি না (যদিও মাঝে মাঝে আমরা সেটা করতে পারি), এই কৌশলগুলো আসলেই ‘মেনার্ড স্মিথের প্রস্তাবিত অর্থে’, সেই সব কৌশল জিনরা হয়তো যা আগে থেকেই প্রোগ্রাম করতে পারে। পরে আমরা কিছু উদ্ভিদ দেখবো, বেশ কিছু প্রাণী এবং এমনকি ব্যাকটেরিয়া, সবাই এই পুনরাবৃত্তি হতে থাকা প্রিজনার’স ডাইলেমা খেলাটি খেলছে। এখন তাহলে আসুন এই পুনরাবৃত্তি হবার বিষয়টি আসলেই কেন এত বেশী গুরুত্বপূর্ণ সেটি আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করি।
