(৫) আমি অবশ্যই চাইনা এই বাক্যগুলোর অর্থ যেন এমন করা হয় যে আমি বলছি, ‘আকর্ষণীয়তা’ কোনো একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা গ্রহনযোগ্য হবার একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে। আর যাই হোক, কিছু বৈজ্ঞানিক ধারণা আসলেই সঠিক এবং কিছু অবশ্যই ভুল! তাদের গুরুত্বহীনতা কিংবা ভ্রান্তি পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব। তাদের যুক্তিকে ব্যবচ্ছেদ করা যেতে পারে। তারা আসলে কোনো পপ গানের সুর, কিংবা ধর্ম বা পাঙ্কদের চুলের ফ্যাশনের মত না। তবে যাই হোক না কেন বিজ্ঞানে যেমন সমাজবিজ্ঞান আছে তেমনি যুক্তিও আছে। কিছু। বাজে বৈজ্ঞানিক ধারণা অনেক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে, অন্ততপক্ষে খানিকটা সময় ধরে। এবং কিছু ভালো ধারণা স্বীকৃতি এবং গ্রহনযোগ্যতা ও বৈজ্ঞানিক কল্পনাকে অধিগ্রহন করতে পারার আগেই বহু বছর ধরে সুপ্ত থাকতে পারে।
আমরা এই ধরনের সুপ্তাবস্থা ও পরে ব্যাপকহারে গ্রহনযোগ্যতার বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ খুঁজে পেতে পারি এই বইয়ের একটি প্রধান ধারণায়, হ্যামিলটনের ‘কিন সিলেকশন’ তত্ত্ব। আমি ভেবেছিলাম বৈজ্ঞানিক জার্নালে রেফারেন্স খোঁজার ক্ষেত্রে এটি খুবই উপযুক্ত একটি কেস হতে পারে মিমদের ছড়িয়ে পড়া পরিমাপ করার ধারণাটিকে পরীক্ষা করে দেখার জন্য। প্রথম সংস্করণে আমি উল্লেখ করেছি (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ১১৬), ‘এই বিষয়ে আজ অবধি যত প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, ১৯৬৪ সালে সোস্যাল ইথথালজী বিষয়ে তার দুটি প্রবন্ধ ছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এবং আমি কখনোই বুঝতে পারিনি কেন তার এই প্রবন্ধগুলোকে অবহেলা করেছে ইথোলজিস্টরা (তার নাম এমনকি উল্লেখ করা হয়নি ইথোলজীর উপর লেখা দুটি প্রধান পাঠ্যপুস্তকের ইনডেক্সেও, যেগুলো প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭০ এ)। সৌভাগ্যক্রমে তার ধারণার প্রতি কৌতূহল বৃদ্ধি পাবার একটি সাম্প্রতিক চিহ্ন দৃশ্যমান। আমি এটি লিখেছিলাম ১৯৭৬ সালে, আসুন আমরা সেই মিমের যাত্রাটি লক্ষ করি এর পরবর্তী দশকগুলোয়।
‘সায়েন্স সাইটেশন ইনডেক্স’ সূচকটি একটি অদ্ভুত প্রকাশনা, যেখানে যেকোনো প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র কেউ চাইলে খুঁজে দেখতে পারেন এবং একই সাথে টেবিল আকারে বছর প্রতি এর পরবর্তী প্রকাশনাগুলোর একটি তালিকাও দেখতে পারেন, যা এই প্রবন্ধটিকে তাদের তথ্যসূত্রে উল্লেখ করেছে। কোনো একটি বিষয়ে প্রকাশিত গবেষণা প্রবেন্ধ খোঁজার জন্য এটি নির্মিত হয়েছে। ইউনিভার্সিটির অ্যাপয়েন্টমেন্ট কমিটিগুলোও স্কুল (বেশী স্কুল ও খুব সহজে পাওয়া যায়) এবং দ্রুত ব্যবহারযোগ্য একটি মানদণ্ড হিসাবে এটি ব্যবহার করার অভ্যাস গুড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে তারা একই পদের জন্য আবেদনকৃত প্রার্থীদের তুলনা করে দেখতে পারেন। হ্যামিলটনের গবষণাপত্রটির সাইটেশনের সংখ্যা গণনা করার মাধ্যমে, ১৯৬৪ থেকে প্রতিটি বছর, আমরা মোটামুটি একটা ধারণা পেতে পারি জীববিজ্ঞানীদের সচেতনতার স্তরে তার প্রবন্ধগুলো কিভাবে ছড়িয়ে পড়ছে সেই বিষয়টি অনুসরণ করার জন্য (ছবি ১)।
প্রাথমিক সুপ্তাবস্থার পর্বটি এখানে খুব স্পষ্ট। এরপর দেখা যায় যেন ১৯৭০ এর দশকে ‘কিন সিলেকশন’ নিয়ে আগ্রহ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়কে চিহ্নিত করতে হয় এই উর্ধমূখী প্রবণতার বৃদ্ধির জন্য, এটি মনে হয় ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৪ এর মধ্যে। এই উর্ধমুখী আগ্রহের শীর্ষ বিন্দুটি স্পর্শ করতে আমরা দেখি ১৯৮১ তে, এরপর থেকে এর বাৎসরিক সাইটেশনের হার স্থিতিশীল একটি পর্যায়ে থাকে, কম বেশী ওঠা নামার মধ্যে।
একটি মিমগত পুরাণ প্রচার পেয়েছিল যে, ‘কিন সিলেকশন’ নিয়ে কৌতূহলের উর্ধমূখী বৃদ্ধির চালিকা শক্তি ছিল ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৬ এর মধ্যে প্রকাশিত বইগুলো। গ্রাফটি, যার উর্ধমুখী পরিবর্তন শুরু হয়েছিল ১৯৭৪ এ, আপাতদৃষ্টিতে এই ধারণাটিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছিল। বরং এর বিপরীত, প্রমাণগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে ভিন্ন একটি হাইপোথিসিসকে সমর্থন করার জন্য, বিশেষ করে আমরা যখন এমন কোনো ধারণা নিয়ে কথা বলছি যা কিনা ‘বাতাসে ভাসছিল’ বা ‘যার সময় অবশেষে এসেছে। মধ্য সত্তরের দশকে প্রকাশিত বইগুলো হয়তো, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রধান কারণ হবার পরিবর্তে বরং “ব্যান্ড-ওয়াগন’ ইফেক্ট এর উপসর্গই হবে (অর্থাৎ কোনো একটি ধারণার গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়, যখন এটি অন্যদের কাছে ইতিমধ্যেই গ্রহনযোগ্য হয়)।
ছবি ১, হ্যামিলটনের ১৯৬৪ সালে প্রবন্ধটি বছর প্রতি সাইটেশন, সায়েন্স সাইটেশন ইনডেক্স মোতাবেক।
হয়তো, আসলেই আমরা এমন কোন কিছু নিয়ে কথা বলছি যা কিনা দীর্ঘ মেয়াদী, ধীরে শুরু হওয়া, ক্রমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়া ব্যান্ড-ওয়াগন যা হয়তো শুরু হয়েছিল আরো আগের কোনো এক সময়ে। আমরা চাইলে এই সাধারণ মানুপাতিক হাইপোথিসিসটি পরীক্ষা করে দেখতে পারি, পুঞ্জীভূত উপাত্তগুলো ‘লগারিদমের স্কেলে’ পরিমাপ করে। যে কোনো বৃদ্ধি প্রক্রিয়া, যেখানে বৃদ্ধি পাবার হার ইতিমধ্যে সে আকারটি তা অর্জন করেছে তার সমানুপাতিক হয়, এটাকে বলে সমানুপাতিক বা ক্রমানুপাতে বৃদ্ধি। একটি বৈশিষ্ট্যসূচক ক্রমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাবার প্রক্রিয়ার উদাহরণ হতে পারে যেমন কোনো এপিডেমিক বা মহামারী: প্রতিটি ব্যক্তি প্রশ্বাসের সাথে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির উপর ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিচ্ছে, যাদের প্রত্যেকেই আবার সেই একই কাজটি করছে আরো একই সংখ্যক মানুষের উপর। সুতরাং আক্রান্তদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারেই বাড়তে থাকবে। কোনো একটি ক্রমানুপাতিক কার্ভের এটি শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য যে এটি যদি কোনো লগারিদমের স্কেলে গ্রাফে প্লট করা হয়, এটি সরল রেখার রুপ নেবে। এটি আবশ্যিক নয়, কিন্তু পুঞ্জীভূত উপাত্ত নিয়ে এধরনের কোন লগারিদমের গ্রাফ তৈরী করা সুবিধাজনক এবং সাধারণত করা হয়ে থাকে। যদি হ্যামিলটনের মিম আসলেই ক্রমশ বাড়তে থাকা কোনো মহামারীর রুপ নিয়ে থাকে, তাহলে পুঞ্জীভুত লগারিদমের গ্রাফ একটি একক সরল রেখায় পড়া উচিৎ, সেটা কি ঘটছে?
