নোটস (অধ্যায় ১১)।
(১) আমার সেই বাজিটি, সব ধরনের জীবন, মহাবিশ্বের যে কোনো জায়গায়, দেখা যাবে ডারউইনীয় প্রক্রিয়ায় বিবর্তিত হয়েছে, এখন বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং এর সপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছি ইউনিভার্সাল ডারউইনিজম’ শিরোনামে আমার একটি। প্রবন্ধে এবং আমার ‘দ্য ব্লাইন্ড ওয়াচমেকার’ বইটির শেষ অধ্যায়ে। আমি দেখিয়েছি যে, ডারউইনবাদের সব বিকল্পগুলো এযাবৎ যা প্রস্তাব করা হয়েছে, নীতিগতভাবে সেই প্রস্তাবনাগুলো জীবনের সুসংগঠিত জটিলতা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম নয়। এই যুক্তিটি খুব সাধারণ একটি যুক্তি, আমাদের পরিচিত ‘জীবনের কোনো বিশেষ বাস্তব সত্যের উপর এটি নির্ভরশীল নয়। আর এভাবেই এটির সমালোচনা করেছেন সেই বিজ্ঞানীরা, যারা যথেষ্ট পরিমান কল্পনাশক্তিহীন এমন কিছু ভাবার জন্য যে, গরম টেস্ট-টিউব (অথবা কর্দমাক্ত ঠাণ্ডা বুট) নিয়ে পরিশ্রম করাই হচ্ছে বিজ্ঞানে কোনো কিছু আবিষ্কার করার একমাত্র উপায়। একজন সমালোচক অভিযোগ করেছিলেন, আমার যুক্তিগুলোর প্রকৃতি ‘দার্শনিক’, যেন সেটি যথেষ্ট পরিমানে একটি অপবাদ। দার্শনিক হোক বা না হোক, বাস্তব সত্যটি হচ্ছে তিনি এবং অন্য কেউই আমি যা বলেছি সেখানে কোনো ভুল খুঁজে পাননি। এবং নীতিগতভাবে এইসব যুক্তিগুলো যেমন, আমার, বাস্তব পৃথিবীতে আদৌ অপ্রাসঙ্গিক তো নয়ই এবং আরো বেশী শক্তিশালী হতে পারে সত্যিকারের কোনো নির্দিষ্ট বাস্তব গবেষণা নির্ভর যুক্তি থেকে। আমার যুক্তিগুলো, যদি এটি সঠিক হয়, এই মহাবিশ্বে যেকোনো স্থানে জীবন সম্বন্ধে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধারণা দেয়। ল্যাবরেটরী এবং মাঠপর্যায়ের গবেষণা আমাদের শুধুমাত্র তথ্য দেয় এখানে জীবনের যে নমুনা আমরা সংগ্রহ করি, তার সম্বন্ধে।
(২) মিম শব্দটি আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে একটি ভালো মিমে পরিণত হয়েছে। এখন এটি বেশ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয় এবং ১৯৮৮ সালে এটি অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারীর ভবিষ্যৎ সংস্করণে যুক্ত হবার জন্য বিবেচিত শব্দতালিকায় এটি যুক্ত হয়েছিল। এবং আমাকে আরো বেশী এটি চিন্তিত করে তোলে পুনরাবৃত্তি করতে যে, মানব সংস্কৃতির উপর আমার পরিকল্পনাগুলো খুব সামান্য প্রায় শূন্যে মিলিয়ে যাবার মতই ছিল। আমার সত্যিকারের আকাঙ্খা– এবং স্বীকার করতেই হবে সেগুলো আসলেই বিশাল– সম্পূর্ণ ভিন্ন দিক বরাবর নির্দেশিত হয়েছে। মহাবিশ্বের যেকোনো জায়গায় একবার যখন তাদের উদ্ভব হয়, সেই খানিকটা কম সঠিক স্ব-অনুলিপনকারী সত্তাদের প্রায় অসীম ক্ষমতার কথা আমি দাবী করতে চেয়েছিলাম। এর কারণ তারাই ডারউইনীয় নির্বাচনের ভিত্তিতে পরিণত হয়, যা যথেষ্ট পরিমান প্রজন্মে পুঞ্জীভূত হয়ে খুব জটিলতার একটি সিস্টেম তৈরী করতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক পরিস্থিতির উপস্থিতিতে অনুলিপিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরস্পরের সাথে জোট বদ্ধ হবে একটি সিস্টেম বা যন্ত্র সৃষ্টি করতে, যা তাদের বহন করে বেড়াবে এবং তাদের অনুলিপিগুলোর অব্যাহত হস্তান্তর নিশ্চিৎ করার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করবে। ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইটির প্রথম দশটি অধ্যায়ে আমি কেবল এক ধরনের অনুলিপনকারীদের ব্যাপারে আলোচনা সীমাবদ্ধ রেখেছি, সেটি হচ্ছে জিন। শেষ অধ্যায়ে মিম আলোচনা করার মাধ্যমে আমি সব ধরনের অনুলিপনকারীদের বিষয়ে একটি সাধারণ প্রস্তাব করার চেষ্ঠা করলাম এবং দেখাতে চেয়েছি জিনরাই এই গুরুত্বপূর্ণ অনুলিপনকারী শ্রেণীর একমাত্র সদস্য নয়। মানব সংস্কৃতির পরিবেশ আসলেই সেটি আছে কিনা, এ ধরণের ডারউইনবাদকে পরিচালিত করার জন্য যার প্রয়োজন আছে, আমি নিশ্চিৎ নই, কিন্তু যেকোনো ক্ষেত্রেই এই প্রশ্নটি আমার মূল চিন্তার সামান্য একটি অংশ। অধ্যায় ১১ সফল হবে যদি পাঠক এই বইটি বন্ধ করেন এমন একটি অনুভূতি নিয়ে যে ডিএনএ অণুরাই শুধুমাত্র একমাত্র সত্তা নয় যা ডারউইনীয় বিবর্তনের ভিত্তি রচনা করেছে। আমার উদ্দেশ্য মানব সংস্কৃতির একটি সুবিশাল কোনো তত্ত্ব গড়ার বদলে বরং জিনকে তার সঠিক জায়গায় স্থাপন করা।
(৩) ডিএনএ হচ্ছে স্ব-অনুলিপনকারী এক টুকরো হার্ডওয়্যার। প্রতিটি অংশের আছে একটি সুনির্দিষ্ট গঠন, যা প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক টুকরো ডিএনএর তুলনায় ভিন্ন। যদি মস্তিষ্কে মিমরা জিনদের অনুরুপ হয় তাদের অবশ্যই স্ব-অনুলিপনকারী মস্তিষ্কের গঠন হতে হবে, সত্যিকারের নিউরনের প্যাটার্ন হতে হবে যা পরস্পরের সাথে সংযুক্ত, যারা নিজেদের পুনর্গঠন করে একটি মস্তিষ্কের পর আরেকটি মস্তিষ্কে। আমি সবসময়ই ইতস্তত বোধ করেছি বিষয়টি এত স্পষ্ট করে বলার জন্য, কারণ আমরা জিন সম্বন্ধে যতটুকু জানি, মস্তিষ্ক সম্বন্ধে তার চেয়ে অনেক কম জানি এবং সেকারণে আবশ্যিকভাবে খানিকটা অস্পষ্ট এধরনের মস্তিষ্কের গঠন আসলে কেমন হতে পারে সেই বিষয়ে। সেকারণে আমি খুবই স্বস্তিবোধ করেছি সম্প্রতি একটি প্রবন্ধ পড়ে, এই কৌতূহলোদ্দীপক গবেষণা পত্রটি লিখেছেন। জার্মানীর ইউনিভার্সিটি অফ কনস্টানজ এর হুয়ান ডেলিয়াস। আমার ব্যতিক্রম, ডেলিয়াস আদৌ কোনো ইতস্ততাবোধ করেননি এবং ক্ষমাপ্রার্থীও হননি, কারণ তিনি এখন বিখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী, যখন আমি আদৌ স্নায়ুবিজ্ঞানী নই। আমি খুব আনন্দিত হয়েছি, সেকারণে, যে তিনি যথেষ্ট সাহসের সাথে বিষয়টি ব্যাখ্যা দিয়েছেন আসলেই একটি চিত্র প্রকাশের মাধ্যমে, যেন কোনো একটি মিমের স্নায়বিক হার্ডওয়্যার কেমন দেখতে হতে পারে তার একটি রুপ আমরা দেখতে পাই। আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় তিনি করেছিলেন, তিনি অনুসন্ধান করেছিলেন আরো বেশী অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে, আমি যতটা করেছিলাম তার চেয়ে বেশী, মিমের সাথে পরজীবিদের তুলনামূলক একটি উদাহরণ টেনে, আরো বেশী সুনির্দিষ্টভাবে, সেই স্পেকট্রাম বা বিস্তারটি ব্যবহার করে যেখানে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকারক পরজীবি এক চূড়ান্ত প্রান্তে, নীরিহ মিথোজীবি অন্য চূড়ান্ত প্রান্তে। আমি বিশেষভাবে এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি বেশী উৎসাহী কারণ আমার নিজের আগ্রহ ‘এক্সটেন্ডেড ফিনোটাইপিক বা সম্প্রসারিত বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য সংক্রান্ত প্রভাব নিয়ে যা পরজীবির মত জিনের পোষকের আচরণের উপর ফেলতে পারে (এই বইয়ে অধ্যায় ১৩ এবং ‘দি এক্সটেন্ডেড ফিনোটাইপ’ বইটির অধ্যায় ১২ দেখুন), ডেলিয়াস, প্রসঙ্গক্রমে মিম এবং তাদের বাহ্যিক বা ফিনোটাইপিক প্রভাবের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজনের উপর জোর দিয়েছেন, এবং তিনি সহ-অভিযোজিত হওয়া মিম-কমপ্লেক্সগুলো গুরুত্ব পুনরাবৃত্তি করেছেন, যেখানে মিমরা নির্বাচিত হয় তাদের পারস্পরিক সামঞ্জস্যতার উপর।
