কিন্তু আপনি যদি বিশ্ব সংস্কৃতিতে অবদান রাখেন, আপনার যদি ভালো কোনো ধারণা থাকে, বা কোনো সুর সৃষ্টি করেন, স্পর্কিং প্লাগ আবিষ্কার করে থাকেন, কবিতা লিখে থাকেন, সাধারণ জিনপুলে আপনার জিনগুলো হারিয়ে যাবার পরে সেটি হয়তো অপরিবর্তিত টিকে থাকবে। সক্রেটিসের একটি বা দুটি জিন হয়তো এখনও এই পৃথিবীতে জীবিত থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে, যেমনটি জি, সি, উইলিয়ামস মন্তব্য করেছিলেন, কিন্তু আসলেই কার কি এসে যায় তাতে? সক্রেটিস, লিওনার্দো, কোপার্নিকাস এবং মার্কোনীর মিম-কমপ্লেক্স এখনও শক্তিশালী।
এবং মিমতত্ত্বটি যত বেশী ধারণাভিত্তিক হোক না কেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা আমি আরো একবার বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। এটাই হচ্ছে সেটা, যখন আমরা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্টগুলোর বিবর্তন এবং তাদের টিকে থাকার যোগ্যতা বা সারভাইভাল ভ্যালু লক্ষ করি, আমাদের সুস্পষ্ট হতে হবে, আমরা আসলে ‘কার’ টিকে থাকার কথা বলছি। জীববিজ্ঞানীরা, যেমনটি আমরা দেখেছি, জিন পর্যায়ে সুবিধাগুলো খোঁজার ক্ষেত্রে অভ্যস্ত (অথবা কোনো একক সদস্য, গ্রুপ, অথবা প্রজাতি যার যেমন রুচি); যা আমরা এর আগে বিবেচনা করিনি সেটি হচ্ছে কোনো একটি সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বিবর্তিত হতে পারে এমন একটি উপায়ে,কারণ খুব সরলভাবেই এটি এর নিজের জন্যই সুবিধাজনক।
ধর্ম, সঙ্গীত, আচার অনুষ্ঠানের নৃত্য ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রচলিত প্রথাগত জৈববৈজ্ঞানিক টিকে থাকার যোগ্যতা আমাদেও অনুসন্ধান করার কোনো প্রয়োজন নেই, যদিও তাদের সেটি থাকতেও পারে। যখনই জিনরা তাদের সারভাইভাল মেশিনগুলোকে মস্তিষ্ক প্রদান করেছে যা দ্রুত অনুকরণ করতে সক্ষম, তখন মিমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এর উপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। অনুকরণের কোনো ধরনের জিনগত সুবিধার ব্যাপারে আমাদেও কোনো প্রস্তাব করার বাধ্যবাধকতা নেই, যদি তারা অবশ্যই সহায়ক এই ক্ষেত্রে। যেটা আবশ্যিক সেটি হচ্ছে মস্তিষ্কের সেই ‘ক্ষমতা থাকতে হবে অনুকরণ করার জন্য। মিমরা এরপর বিবর্তিত হবে এই ক্ষমতাকে পুরোপুরি নিজেদের স্বার্থে সদ্ব্যবহার করার জন্য।
আমি এখন নতুন রেপ্লিকটর বা অনুলিপনকারীদের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা স্থগিত রাখবো, এবং এই অধ্যায়টি শেষ করবো একটি তথ্যপুষ্ট যোগ্য আশা দিয়ে। মানুষের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা মিম প্রক্রিয়ায় বিবর্তিত হতেও পারে আবার নাও হতে পারে, সেটি হচ্ছে সচেতন ভবিষ্যৎদর্শিতা। স্বার্থপর জিনগুলোর ( এবং যদি আপনি এই অধ্যায়ের ধারণাগুলোকে সম্মতি দেন, সেক্ষেত্রেও মিমগুলোর) কোনো ভবিষ্যৎদর্শিতা নেই। তারা সচেতনতাহীন, অন্ধ অনুলিপনকারী। বাস্তব সত্যটি হচ্ছে যে তারা নিজেদের অনুলিপি সৃষ্টি করে, আরো সুনির্দিষ্ট কিছু বাড়তি শর্তাবলীসহ, এর অর্থ কোনো পরিকল্পনা ছাড়া, যে তারা বিবর্তিত হয় সেই সব বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে যারা, এই বইয়ের বিশেষ অর্থে যাদের বলা যেতে পারে, স্বার্থপর। একটি সরল অনুলিপনকারী, জিন হোক অথবা মিম হোক, তার কাছে এমন কিছু প্রত্যাশা করা যেতে পারেনা যে তার স্বল্পমেয়াদী স্বার্থপর সুবিধা পরিত্যাগ করবে এমনকি যখন এমন কোনো কিছু তাকে দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা প্রদান করবে। আমরা এটা দেখেছি আগ্রাসন নিয়ে লেখা অধ্যায়টিতে। এমনকি যদিও ‘ডোভদের ষড়যন্ত্র প্রতিটি একক’ সদস্যের জন্য বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল বা ‘ইএসএস’ কৌশলের চেয়ে সুবিধাজনক, তারপরও প্রাকৃতিক নির্বাচন ইএসএসকে সুবিধা দিতে বাধ্য।
এটা সম্ভব যে, মানুষের আরো একটি অনন্য বৈশিষ্ট হচ্ছে, নির্ভেজাল, নৈর্ব্যক্তিক, নিস্বার্থ সত্যিকারের পরার্থবাদীতা। আমি তাই আশা করি, আর আমি পক্ষে বিপক্ষে এই কেসটি নিয়ে কোনো তর্ক করবো না, কিংবা এর সম্ভাব্য মিম নির্ভর বিবর্তনের বিষয় নিয়ে কোনো ধারণাও করবো না। আমি যে বিষয়টি বলতে চাইছি সেটি হচ্ছে যদি আমরা অন্ধকার দিকটি দেখি এবং ধরে নেই যে প্রতিটি একক ব্যক্তি মৌলিকভাবে স্বার্থপর, আমাদের সচেতন ভবিষ্যৎদর্শিতা বা দুরদৃষ্টি– কল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতকে একটি কৃত্রিম মডেল হিসাবে সৃষ্টি করার ক্ষমতা– অন্ধ অনুলিপনকারীদের সবচেয়ে খারাপ স্বার্থপর বাড়াবাড়ি থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে। অন্ততপক্ষে আমাদের সেই মানসিক দক্ষতা আছে, শুধুমাত্র আমাদের স্বল্প মেয়াদী স্বার্থপর উদ্দেশ্য পূর্ণ করার চেয়ে বরং দীর্ঘ মেয়াদী স্বার্থপর উদ্দেশ্য প্রতিপালন করা। আমরা দীর্ঘ মেয়াদী সবিধা অর্জনের লক্ষ্যে পারস্পরিক সহযোগিতাকে আমরা ‘ডোভদের ষড়যন্ত্র হিসাবে দেখতে পারি এবং কিভাবে এই ‘ষড়যন্ত্রটিকে আমাদের পক্ষে কাজ করানো যেতে পারে সেই বিষয়ে আলোচনা করতে আমরা একসাথে বসতে পারি। জন্মের সময় থেকে বহন করা স্বার্থপর জিনগুলোর ক্ষমতাকে প্রতিহত করার সেই ক্ষমতা
আমাদের আছে এবং, যদি প্রয়োজন হয়, আমাদের মতদীক্ষিত হওয়া সেই অনুশাসনের স্বার্থপর মিমগুলোর বিরুদ্ধেও আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিশুদ্ধ, নৈর্ব্যক্তিক পরার্থবাদীরা সৃষ্টি ও প্রতিপালন করার নানা উপায় নিয়ে আমরা এমনকি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে পারি। আর এমন কিছু করার অন্য কোনো নজির নেই প্রকৃতিতে, পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে যার কোনদিনও অস্তিত্বই ছিল না। জিন মেশিন হিসাবে আমরা নির্মিত হয়েছি এবং মিম মেশিন হিসাবে সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিপালিত হয়েছি। কিন্তু আমাদের সৃষ্টিকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সেই ক্ষমতা আছে আমাদের। আমরা, এই পৃথিবীতে শুধুমাত্র একা আমরাই, স্বার্থপর অনুলিপনকারীদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারি (৮)।
