ধর্মীয় মিম কমপ্লেক্সের আরো একটি সদস্য হচ্ছে ‘ফেইথ’ বা ধর্মবিশ্বাস। এর অর্থ আসলে অন্ধ বিশ্বাস, কোনো ধরনের প্রমাণের অনুপস্থিতিতে বিদ্যমান অন্ধ বিশ্বাস, এমনকি প্রয়োজনে সব প্রমাণের সরাসরি বিরোধীতা করে। সন্দেহবাদী থমাসের সেই গল্প বলা হয়ে থাকে, এমন নয় যে আমরা থমাসকে প্রশংসা করতে পারবো, বরং আমরা যেন অন্যান্য শিষ্য বা অ্যাপস্টোলদের প্রশংসা করতে পারি তার সাথে তুলনা করে। থমাস প্রমাণ দাবী করেছিলেন, এবং কিছু বিশেষ ধরনের মিমের জন্য প্রমাণ অনুসন্ধান করার চেয়ে আর কোনো কিছুই এত বেশী ভয়ঙ্কর নয়। অন্য শিষ্যরা, যাদের ধর্মবিশ্বাস এত বেশী শক্তিশালী যে তাদের কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই, তাদেরকে অনুকরণের উপযুক্ত ও আদর্শ হিসাবে আমাদের কাছে উপস্থাপন করা হয়। অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের মিম তার নিজের চিরন্তন স্থায়ীত্ব নিশ্চিৎ করে শুধুমাত্র অবচেতনে সুবিধাজনক কৌশল ব্যবহার করে, যে কৌশল সকল যৌক্তিক অনুসন্ধানকে অনুৎসাহিত করে।
অন্ধ বিশ্বাস যেকোনো কিছুকে যুক্তিযুক্ত করতে পারে (৭)। যদি কোনো মানুষ ভিন্ন একটি ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেন বা এমনকি যদি তিনি ভিন্ন ধর্মীয় আচার ব্যবহার করেন সেই একই ঈশ্বরকে উপাসনার জন্য, অন্ধ বিশ্বাস ডিক্রি জারী করতে পারে তার মরে যাওয়া উচিৎ– ক্রুশবিদ্ধ হয়ে, আগুনে দগ্ধ হয়ে, ক্রসেডারদের তলোয়ারে আঘাতে এফোড় ওফোড় হয়ে, বৈরুতের রাস্তায় গুলি খেয়ে,অথবা বেলফাস্টের কোনো পানশালায় বোমা বিস্ফোরণে বহু টুকরো হয়ে। অন্ধ বিশ্বাসের জন্য মিমগুলোদের নিজস্ব নিষ্ঠুর উপায় আছে নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য। এবং ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের মতই এটি দেশপ্রেম এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও সত্য।
মিম ও জিনরা প্রায়শই হয়তো প্রায়ই পরস্পরকে শক্তিশালী করে থাকে, কিন্তু কখনো তারা আবার পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থানেও এসে দাঁড়ায়। যেমন, চিরকৌমার্যের অভ্যাসটি খুব সম্ভবত জিনের মাধ্যমে প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরিত হয় না। চিরকুমার থাকা কোনো জিন, জিন পুলে ব্যর্থ হতে বাধ্য, শুধুমাত্র বিশেষ কিছু পরিস্থিতি ছাড়া, যেমন আমরা সামাজিক কীটপতঙ্গদের মধ্যে দেখি। কিন্তু তারপরও, চিরকুমার থাকার একটি মিম, মিমপুলে সফল হতে পারে। যেমন, ধরুন কোনো মিমের সফলতা নির্ভর করে খুবই গুরুত্বপূর্ণভাবে ঠিক কতটা সময় মানুষ ব্যয় করেছে সক্রিয়ভাবে এই মিমটি মানুষের মধ্যে সঞ্চারণ করার জন্য। যেকোনো পরিমান সময় যা কিনা ব্যয় করা হয়েছে এই মিমটিকে প্রচার করা ছাড়া, মিমের দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই পরিমান সময়কে গণ্য করা যেতে পারে সময়ের অপচয় হিসাবে। চিরকুমার থাকার মিম প্রচারিত হয় যাজকদের দ্বারা অল্পবয়সী বালকদের মধ্যে, এখনও যারা সিদ্ধান্ত নেয়নি তাদের জীবন নিয়ে তারা কি করবে। এই প্রচারের মাধ্যম হচ্ছে নানা ধরনের মানবিক প্রভাব আরোপন, কথ্য এবং লিখিত শব্দমালা, ব্যক্তিগত উদাহরণ ইত্যাদি। ধরুন, তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেই, ঘটনাচক্রে দেখা গেল, বিবাহ, কোনো যাজক তার অনুসারীদের উপর যে প্রভাব প্রদর্শন করে থাকেন, সেটি দুর্বল করে দেয়, কারণ এটি তার সময়ের ও মনোযোগের বিশাল একটি অংশ দখল করে রাখে। এটাই আসলে, যাজকদের মধ্যে চিরকুমার থাকার বিষয়টির সপক্ষে আনুষ্ঠানিক কারণ হিসাবে প্রস্তাব করা হয়। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে আমরা বলতে পারি চিরকুমার থাকার মিমটি বেশী পরিমান টিকে থাকার ক্ষমতা আছে বিবাহের মিমটির অপেক্ষায়। অবশ্যই, ঠিক এর উল্টোটাই সত্যি হবে চিরকুমার থাকার জিনটির ক্ষেত্রে। যদি কোনো যাজক মিমদের জন্য টিকে থাকার যন্ত্র হয়, তাহলে চিরকুমার থাকার বৈশিষ্ট্যটা একটি উপযোগী বৈশিষ্ট্য যদি সেটি তার ভিতরে থাকে। চিরকুমার থাকার ব্যপারটি পারস্পরিক সহযোগিতা করা মিমদের বড় কোনো কমপ্লেক্সে কেবল মাত্র একটি গৌন অংশীদার।
আমি ধারণা করছি যে, সহ-অভিযোজিত মিম-কমপ্লেক্সগুলো বিবর্তিত হয়েছে সহ-অভিযোজিত জিন-কমপ্লেক্সগুলোর মতই। নির্বাচন সেই সব মিমদের সহায়তা করে যারা তাদের সাংস্কৃতিক পরিবেশকে তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। এই সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরী করে অন্য মিমরাও, যারা এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়। মিম পুল, সেকারণে বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল সেট হিসাবে বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, যেখানে নতুন মিমদের পক্ষে আগ্রাসন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আমি মিমদের ব্যপারে কিছুটা নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছি ঠিকই, কিন্তু আনন্দময় দিকও তাদের আছে। আমরা যখন মারা যাই, দুটো জিনিস আমরা ছেড়ে যাই, জিন এবং মিম। আমরা এমনভাবে নির্মিত যেন জিন মেশিন, যাদের সৃষ্টি করা হয়েছে জিনদের হস্তান্তর করার জন্য। কিন্তু আমাদের সেই দিকটি তিন প্রজন্ম পরেই বিস্মরিত হবে। আপনার শিশু, এবং দৌহিত্র, হয়তো আপনার মত কিছুটা দেখতে, হয়তো মুখের গড়নে, সঙ্গীতের প্রতিভায়, চুলের রঙে। কিন্তু একটি করে প্রজন্ম অতিক্রান্ত হলে, আপনার জিনের অংশগ্রহন সেখানে অর্ধেকে নেমে আসে। সুতরাং বেশী সময় লাগেনা প্রায় নগন্য পরিমান অংশগ্রহনের মত একটি পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে। আমাদের জিন হতে পারে অমর, কিন্তু আমাদের যে-কোনো কারোর শরীরেরই জিনদের সমষ্টি অবশ্যই ভেঙ্গে যেতে বাধ্য। দ্বিতীয় এলিজাবেথ উইলিয়াম দ্য কঙ্কেররের সরাসরি উত্তরসূরী। তাসত্ত্বেও খুবই সম্ভাবনা আছে যে, তিনি সেই প্রাচীন রাজার একটি জিনও বহন করছেন না। প্রজননের মাধ্যমে অমরত্বের অনুসন্ধান করা আমাদের উচিৎ নয়।
