প্রতিযোগিতার ধরণ নিয়ে এখানে একটি সমস্যা আছে। যখন যৌন প্রজনন ঘটে, প্রতিটি জিন ক্রোমোজোমে তাদের জন্য সেই নির্দিষ্ট স্লট বা জায়গাটির জন্য সুনির্দিষ্টভাবে তার অন্য প্রতিরুপ বা অ্যালিলগুলোর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। মিমদের ক্ষেত্রে ক্রোমোজোম সমরুপ কোনো কিছু নেই এবং তাদের অ্যালিল সমতুল্যও কিছু নেই। আমি মনে করি, খুব গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন একটি অর্থে বহু ধারণার ক্ষেত্রে বলা যাবে যে তাদের বিপরীত কিছু আছে। কিন্তু সাধারণভাবে মিমরা খুব আদি অনুলিপনকারী অণুদের সদৃশ্য, যারা বিশৃঙ্খল ও স্বাধীনভাবে ভেসে বেড়ায় আদিম জৈব সুপে, আধুনিক জিনরা যেমন সুন্দরভাবে জোড়ায় জোড়ায় সজ্জিত থাকে ক্রোমোজোমে তেমনি কোনো সজ্জায় নয়। কোন অর্থে তাহলে মিমরা পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতা করে? আমাদের কি তাদের ‘স্বার্থপর’ অথবা ‘নিষ্ঠুর হিসাবে প্রত্যাশা করা উচিৎ, যদি তাদের কোনো অ্যালিল বা বিকল্প রুপ না থাকে? এর উত্তর হচ্ছে হয়তো আমরা পারি সেটি করতে, কারণ একটি অর্থ আছে, যেখানে অবশ্যই পরস্পরের সাথে একধরনের প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ে।
ডিজিটাল কম্পিউটারের যে-কোনো ব্যবহারকারী জানেন, কম্পিউরের সময় আর মেমোরি সংরক্ষণ করার জায়গার পরিমান কত মূল্যবান। অনেক বিশাল কম্পিউটার সেন্টারে, আক্ষরিকার্থে এর। মূল্য পরিশোধ করতে অর্থের বিনিময়ে। অথবা প্রতিটা ব্যবহারকারীকে হয়তো নির্দিষ্ট পরিমান সময় রেশন করে বরাদ্দ করা দেয়া হয়, যা সেকেন্ডে আমরা পরিমাপ করি, এবং সুনির্দিষ্ট পরিমান স্পেস বা জায়গা বরাদ্দ করতে পারি, যা পরিমাপ করা হয় “শব্দে। যে কম্পিউটারে মিমরা বাস করে সেটি হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্ক (৬)। ‘সময় হয়তো সংরক্ষণ করার জায়গা বা স্টোরেজ স্পেসের’ তুলনায় আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকারী একটি বিষয়। এবং এটি তীব্র প্রতিযোগিতারও একটি বিষয়। মানুষের মস্তিষ্ক, এবং যে শরীরকে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করে, একই সাথে একটি বা অল্প কিছু কাজ ছাড়া করতে পারেনা। যদি একটি মিমকে মানব মস্তিষ্কের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রাধান্য বিস্তার করতে হয়, এটি অবশ্যই প্রতিদ্বন্দ্বী মিমদের সাথে প্রতিযোগিতা করেই করতে হয়। অন্যান্য সামগ্রীগুলো যার জন্য মিমরা প্রতিযোগিতা করে, সেগুলো যেমন হতে পারে, রেডিও এবং টেলিভিশন সম্প্রচার সময়, বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডের জায়গা, সংবাদপত্রের মতামত কলামের জায়গা এবং লাইব্রেরীর তাকের জায়গা ইত্যাদি।
জিনদের ক্ষেত্রে, যেমনটি আমরা অধ্যায় ৩ এ দেখেছি সহ অভিযোজিত জিন কমপ্লেক্সও জিন পুলে উদ্ভব হতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রজাপতিদের মিমিক্রি বা বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য অনুকরণ প্রক্রিয়ার জন্য বড় একটি সেট জিনগুচ্ছ, তারা একই ক্রোমোজোমের উপর পরস্পরের সাথে এত ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট থাকে যে তাদেরকে একটি একক জিন হিসাবে মনে করা যেতে পারে। পঞ্চম অধ্যায়ে বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল জিনগুচ্ছ সংক্রান্ত আরো বেশী জটিল একটি ধারণা আমরা পেয়েছিলাম। পরস্পরের সাথে উপযোগী দাঁত, নোখ, অন্ত্র এবং অনুভূতির সাথে সংশ্লিষ্ট অঙ্গগুলো মাংসাশী প্রাণীদের জিন পুলে বিবর্তিত হয়েছে, যখন একটি ভিন্ন গুচ্ছ স্থিতিশীল সেট যারা ভিন্ন বৈশিষ্ট্যাবলীর কারণ তারা নিরামিশাষী প্রাণীদের জিনপূলে আবির্ভূত হয়েছে। মিম পুলে কি সমরুপ কোনো ঘটনা ঘটে? ঈশ্বর মিম কি অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট মিম বা মিমদের সাথে সংশ্লিষ্ট, এই সংশ্লিষ্টতা কি প্রতিটি অংশগ্রহনকারী মিমের টিকে থাকার ব্যাপারে সহায়তা করে? হয়তো আমরা কোনো সুসংগঠিত চার্চের কথা ভাবতে পারি, এর স্থাপত্য,আচার অনুষ্ঠান, আইন, সঙ্গীতশিল্পকলা এবং লিখিত ঐতিহ্য, সহ-অভিযোজিত স্থিতিশীল পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ মিম হিসাবে ভাবতে পারি।
একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ আমরা নিতে পারি, কোনো মতবাদের বিশেষ একটি দিক, ধর্মীয় আনুগত্য নিশ্চিৎ করার জন্য যা খুবই কার্যকরী, সেটি হচ্ছে ‘নরকের আগুনের ভয় দেখানো। বহু শিশু এবং এমন কি কিছু প্রাপ্তবয়স্করা বিশ্বাস করেন যে, মৃত্যুর পরে তারা খুব ভয়াবহ নির্যাতনের স্বীকার হবেন, যদি তারা ধর্মযাজকের নির্দেশিত নিয়ম মেনে না চলেন। কোনো কিছু করানোর জন্য প্ররোচিত করার ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে খুবই নোংরা একটি কৌশল, যা মারাত্মক মানসিক যন্ত্রনার কারণ হয়েছিল মধ্যযুগে এবং এমনকি আজও। কিন্তু এটি খুবই কার্যকর। এটি হয়তো মনে হতে পারে যেন উদ্দেশ্যমূলকভাবেই কোনো একটি মাকিয়াভেলীয় যাজকগোষ্ঠী দ্বারা এটি পরিকল্পিত হয়েছে, যারা গভীরভাবে মানসিক দীক্ষা দেবার কৌশলে প্রশিক্ষিত। তবে আমি আসলেই সন্দেহ করি যে যাজকরা আসলেই এই বিষয়ে এতটা বুদ্ধি রাখতে পারেন। বরং আরো বেশী যে সম্ভাবনা, সেটি হচ্ছে অবচেতন স্তরের এই মিমগুলো তাদের নিজেদের টিকে থাকাটা নিশ্চিৎ করে, সেই একই ছদ্ম-নিষ্ঠুরতার গুণাবলী ব্যবহার করে, যা সফল জিনরাও প্রদর্শন করে। নরকের আগুনের ধারণাটি হচ্ছে খুব সাধারণভাবেই ‘নিজে নিজেই এর অস্তিত্বকে চিরন্তনভাবে টিকিয়ে রাখে’, কারণ এর নিজেরই গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। এটি যুক্ত হয়েছে ঈশ্বর মিমের সাথে, কারণ এরা একে অন্যকে শক্তিশালী করে এবং মিম পুলে পরস্পরের টিকে থাকার ব্যাপারে সহায়তা করে।
