সম্ভাবনা আছে, সুনির্দিষ্ট কণার মত নয় আপাত এই রুপটি বিভ্রম হতে পারে, এবং জিনদের সাথে এর তুলনামূলক উদাহরণটিও ভেঙ্গে পড়ে না। মোট কথা, যদি আমরা বহু জিনগত বৈশিষ্ট্যের চরিত্র লক্ষ করি, যেমন মানুষের উচ্চতা অথবা চামড়ার রং, আমাদের মনে হয় না এসব কোনো অবিভাজ্য আর অমিশ্রণযোগ্য জিনের কাজ। যদি একজন কৃষ্ণাঙ্গ এবং শেতাঙ্গ মানুষ প্রজনন করে, তাদের সন্তান শুধু সাদা বা কালো হয়নাঃ তারা মধ্যবর্তী একটি রুপ পায়, এর অর্থ কিন্তু এই না যে এর জন্য দায়ী জিনগুলো সুনির্দিষ্টভাবে পৃথক কোনো কণার মত রুপ নয়। এর কারণ হচ্ছে চামড়ার রঙ কি হবে তার জন্য বহু সংখ্যক জিন মূলত দায়ী। প্রত্যেকটিরই এমনই অল্প প্রভাব আছে, যে তাদের দেখতে মনে হয় তারা একে অপরের সাথে মিশে গেছে। এ পর্যন্ত আমি মিমদের বিষয়ে কথা বলেছি যেন এটা খুবই স্পষ্ট একটি একক ইউনিটের মিম কি দিয়ে তৈরী, কিন্তু অবশ্যই বিষয়টি এখনও সুস্পষ্টতা থেকে বহু দূরে, আমি বলেছি যে, একটি সুর একটি মিম, কিন্তু তাহলে একটি সিম্ফনী কি: কত সংখ্যক মিম সেখানে আছে? প্রতিটি মুভমেন্ট কি একটি মিম, নাকি মেলোডির সুনির্দিষ্ট অংশগুলো একেকটি মিম, প্রতিটি বার, প্রতি কর্ড অথবা অন্য কোনো কিছু?
অধ্যায় ৩–এ আমি যে শব্দের কৌশল ব্যবহার করেছিলাম, আমি তার প্রতি আবারো আবেদন করছি। সেখানে আমি ‘জিন কমপ্লেক্সকে ভাগ করেছিলাম বড় এবং ছোট জিনগত একক হিসাবে এবং ইউনিটের মধ্যে ইউনিট হিসাবে। ‘জিন’ সংজ্ঞায়িত করেছিলাম, “সব-অথবা-কোনটাই নয় এমন কোনো কঠোর নিয়ম ছাড়াই। কিন্তু সুবিধাজনক একক হিসাবে, ক্রোমোজোমের একটি দৈর্ঘ্য, যার যথেষ্ট পরিমান অনুলিপি করার বিশ্বস্ততা আছে যে, সেটি প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি কার্যকরী একক হিসাবে কাজ করতে পারে। যদি বিটহোভেনের সিম্ফোনীর একটি একক ফ্রেজ বা সঙ্গীতাংশকে যথেষ্ট পরিমান স্বতন্ত্র এবং মনে রাখার মত মনে হয়, যাকে পুরো সিম্ফোনী কাঠামো থেকে পৃথক করা সম্ভব এবং সেটি ব্যবহৃত হয় চূড়ান্তমাত্রায় আগ্রাসীরুপে ইউরোপীয় কোনো ব্রডকাস্টিং স্টেশনের সূচনা সঙ্গীত হিসাবে, তাহলে সেই পর্যায় অবধি এটি একটি মীম হিসাবে চিহ্নিত হবার দাবী রাখে। ঘটনাচক্রে বাস্তবিকভাবে এটি আমার মূল সিম্ফোনীটি উপভোগ করার ক্ষমতা হ্রাস করেছে।
একইভাবে, যখন আমরা বলি যে, আজকাল সব জীববিজ্ঞানীরাই ডারউইনের তত্ত্ব বিশ্বাস করেন, আমরা কিন্তু বোঝাচ্ছি না প্রতিটি জীববিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কে স্বয়ং চার্লস ডারউইনের শব্দগুলোর অনুলিপি হুবহু খোদাই করা রয়েছে; প্রতিটি ব্যক্তি স্বতন্ত্রভাবেই ডারউইনের তত্ত্বটিকে ব্যাখ্যা করেন, তিনি হয়তো সেটি জেনেছেন ডারউইনের নিজের লেখা থেকে না, বরং সাম্প্রতিক কোনো একজন লেখকের লেখা থেকে। ডারউইন যা বলে গিয়েছিলেন, তার অনেক কিছুই, বিস্তারিতভাবে পড়লে, মনে হবে ভুল। ডারউইন নিজে যদি এই বই পড়তেন, তিনি নিজেই এখানে তার মূল তত্ত্বটি খুঁজে বের করতে বেশ সমস্যায় পড়তেন, যদিও আমি আশা করছি আমি যেভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছি সেটি তিনি পছন্দ করতেন। কিন্তু তাসত্ত্বেও, এমন কিছু আছে, ডারউইনবাদের কিছু মূল বিষয়, যা প্রতিটি ব্যাক্তির মাথায় আছে যারা এই তত্ত্বটি বুঝেছেন। যদি এরকম না হত বিষয়টি, তাহলে দুজন মানুষের একমত হবার বিষয় সংক্রান্ত যে কোনো বক্তব্য অর্থহীন হতো। একটি ধারণা-মিম’ হয়তো এমন একটি সত্ত্বা হিসাবে ব্যাখ্যা করা যাবে, যা একটি মস্তিষ্ক থেকে অন্য একটি মস্তিষ্কে সঞ্চারিত হতে সক্ষম। ডারউইনের তত্ত্বের মিম সুতরাং ধারণাটি মূল ভিত্তি যা সব মস্তিষ্কই সাধারণ হিসাবে গ্রহন করে যারা এই তত্ত্বটি বুঝেছে। ভিন্ন ভিন্ন মানুষরা তার সেই তত্ত্বটি কিভাবে উপস্থাপন করেন, সেটি তাহলে, সংজ্ঞানুযায়ী, মিমের কোনো অংশ নয়। যদি ডারউইনের তত্ত্বটিকে বেশ কিছু উপাদানে ভাগ করা যায়, যেমন কিছু মানুষ উপাদান ‘ক’ বিশ্বাস করেন কিন্তু উপাদান ‘খ’ নয়, অপরদিকে অন্যরা হয়তো ‘খ’ অংশ বিশ্বাস করেন, কিন্তু ‘ক’ অংশটি নয়, তাহলে ‘ক’ এবং ‘খ’ অংশটিকে পৃথক মিম হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। যদি প্রায় সবাই যারা ‘ক’ বিশ্বাস করেন, তারা ‘খ’ অংশও বিশ্বাস করেন– যদি মিমগুলো ঘনিষ্ঠ হয়, যদি আমরা জিনগত ভাষায় বিষয়টি ভাবি–তাহলে দুটি অংশকে একসাথে একক মিম হিসাবে চিহ্নিত করাই সুবিধাজনক।
আসুন, এবার মিম ও জিনের মধ্যকার এই সদৃশ্যতা নিয়ে আলোচনাটিকে আরো খানিকটা অগ্রসর করা যাক। পুরো এই বইটা জুড়ে, আমি বার বার গুরুত্বারোপ করেছি, অবশ্যই জিনদের কোনো সচেতন, উদ্দেশ্য ধারণ করতে সক্ষম সত্তা হিসাবে আমাদের বিবেচনা করা সঠিক না। অন্ধ প্রাকৃতিক নির্বাচন, যদিও, তাদের এমনভাবে আচরণ করায় যেন তারা উদ্দেশপূর্ণ এবং সরলভাবে ব্যাখ্যা করার লক্ষ্যে উদ্দেশ্যময় ভাষা জিনদের নিয়ে আলোচনা উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে বিষয়টি সুবিধাজনক হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। যেমন, যখন আমরা বলি, “জিনরা চেষ্টা করছে ভবিষ্যত জিন পুলে তাদের সংখ্যা বাড়াতে’, আমরা এটি বলতে আসলে যা বোঝাচ্ছি সেটি হচ্ছে, সেই জিনগুলো এমনভাবে আচরণ করে যেন ভবিষ্যত জিন পুলে তাদের সংখ্যা বাড়ে, সাধারণত তারাই সেই সব জিন হয় যাদের প্রভাবগুলো আমরা পৃথিবীতে দেখি। ঠিক যেভাবে আমরা জিনদের সক্রিয় কোনো এজেন্ট হিসাবে ভাবতে সুবিধা বোধ করি, যারা তাদের নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাজ করে, হয়তো, মিমদের নিয়ে সেভাবে ভাবাও আমাদের জন্য সুবিধাজনক হবে। কোনো ক্ষেত্রেই এই বিষয়টিকে বাড়তি কোনো রহস্যময়তা দেবার প্রয়োজনীয়তা নেই। উভয় ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্যময়তার ধারণা শুধুমাত্র একটি রুপক, কিন্তু আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি জিনদের ক্ষেত্রে এটি বেশ ফলপ্রসূ একটি রুপক। আমরা এমনকি জিনদের ক্ষেত্রে এমন শব্দও ব্যবহার করেছি, ‘স্বার্থপর’ এবং ‘নিষ্ঠুর’ জিন, যখন আমরা খুব ভালোভাবে জানি এটি শুধুমাত্র একটি কথার কথা। আমরা কি ঠিক একই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে স্বার্থপর আর নিষ্ঠুর মিমদের অনুসন্ধান করতে পারবো?
