এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আমি যথেষ্ট সহমর্মিতা বোধ করি এবং আমি সন্দেহ করিনা যে, আমাদের যে-ধরনের মস্তিষ্ক আছে সেই ধরনের মস্তিষ্ক আমাদের জিনগত সুবিধা দেয়। কিন্তু তাসত্ত্বেও, আমি মনে করি, এই সব সহকর্মীরা, যদি তারা খুব সতর্কতার সাথে তাদের মূল ধারণাটির মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ করেন, তারা দেখতে পারবেন, সেগুলোও বহু প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে ঠিক যেমন আমার প্রস্তাবটি দিচ্ছে বলে তারা দাবী করেছেন। মৌলিকভাবে, জিন সুবিধার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো জৈববৈজ্ঞানিক প্রপঞ্চকে ব্যাখ্যা করা কেন আমাদের জন্য একটি উত্তম নীতি, তার কারণটি হচ্ছে। জিনরা অনুলিপনকারী। যখনই আদিম সুপ সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল সেখানে অণুরা তাদের প্রতিলিপি সৃষ্টি করতে পারে, তখনই অনুলিপনকারীরা প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করেছিল। প্রায় তিন হাজার মিলিয়ন বছরের বেশী সময় ব্যাপী, ডিএনএ হচ্ছে একমাত্র অনুলিপনকারী, এই পৃথিবীতে যা আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। কিন্তু ডিএনএ আবশ্যিকভাবে সব সময়ের জন্য এই অধিকারের উপর একচ্ছত্রভাবে অধিকার দাবী করতে পারেনা। যখনই পরিস্থিতি অনুকুলে আসে, তখন অন্য আরেক ধরনের অনুলিপনকারীরা সেই জায়গা দখল করে, এবং তাদের নিজেদের মত করেই তারা একটি নতুন ধরনের বিবর্তন শুরু করে। একবার যখন এই নতুন বিবর্তন শুরু হয়, পুরোনো অনুলিপনকারীদের অধীনে থাকার কোনো বাধ্যবাধকতার অর্থ হয়না। পুরোনো জিন-নির্বাচিত বিবর্তন, মস্তিষ্ক সৃষ্টি করার মাধ্যমে সেই সুপের যোগান দেয়, যেখানে প্রথম মিমের উদ্ভব হয়। একবার যখন স্ব-অনুলিপি করতে সক্ষম মিমদের উদ্ভব হয়, তাদের নিজস্ব এবং অনেক দ্রুততর ধরনের বিবর্তনের সূচনা হয়। আমরা জীববিজ্ঞানীরা জিনগত বিবর্তনের ধারণাটিকে এতটাই গভীরভাবে আত্তীকরণ করেছি, আমাদের প্রবণতা আছে ভুলে যাবার যে এটি বহু সম্ভাব্য ধরনের বিবর্তনের শুধুমাত্র একটি।
অনুকরণ, আরো ব্যাপক অর্থে, হচ্ছে একটি উপায় যার মাধ্যমে মিমরা নিজেদের অনুলিপি সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু ঠিক যেমন করে সব জিনই একই রকম সফলতার সাথে নিজেদের অনুলিপি সৃষ্টি করতে পারেনা, ঠিক তেমনভাবে কিছু মিম অন্য মিমদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশী সফল হয় মিম পুলে। এটাই প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি অ্যানালগ বা সমরুপ পরিস্থিতি। আমি সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলোর উদাহরণ উল্লেখ করেছি যা মিমদের মধ্যে অনেক উঁচু সারভাইভাল ভ্যালুর মূল কারণ। কিন্তু সাধারণভাবে তাদের অবশ্যই দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচনা করা অনুলিপনকারীদের মতই একই রকম হতে হবে:দীর্ঘস্থায়ীত্ব, উর্বরতা, এবং বিশ্বস্ততার সাথে নিজেদের অনুলিপি করার দক্ষতা। কোনো এক কপি মিমের দীর্ঘস্থায়ী হবার ব্যাপারটা সম্ভবত আপেক্ষিকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক যেমন করে কোনো এক কপি জিনের ক্ষেত্রে এটি সত্য। যেমন, Auld Lang Syne’ বা অল্ড ল্যাঙ সাইন-এর সুরটির অনুলিপি আমার মস্তিষ্কে টিকে থাকবে শুধুমাত্র আমার বাকী জীবন অবধি (৪)। সেই একটি সুরের আরেকটি অনুলিপি যা মূদ্রিত আছে আমার সংগ্রহে থাকা ‘দ্য স্কটিশ স্টুডেন্টস সঙ বুকে’ সেটিরও সম্ভাবনা নেই আরো দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকার, তবে আমার প্রত্যাশা, এই একই সুরের বহু অনুলিপি হবে কাগজে এবং মানুষের মস্তিষ্কে আরো বহু শতাব্দী ধরে টিকে থাকবে। যেমন, জিনের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে, এর কোনো একটি নির্দিষ্ট অনুলিপির স্থায়ীত্বের তুলনায় এর উর্বরতা বা নিজেকে আরো বেশী করে অনুলিপি করতে সক্ষম হওয়ার ব্যাপারটি অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। যদি মিম একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা হয়ে থাকে, এর প্রসার নির্ভর করবে কোনো বিজ্ঞানী জনগোষ্ঠীর কাছে এটি কতটুকু গ্রহনযোগ্য তার উপর। এর সারভাইভাল ভ্যালুর একটি স্কুল পরিমাপ। পাওয়া যেতে পারে পর পর বছর প্রতি বৈজ্ঞানিক জার্নালে এটি কত বার উল্লেখিত হয়েছে সেটি গণনা করে (৫)। যদি এটি জনপ্রিয় কোনো সুর হয়, মিম পুলে এর প্রসারের পরিমান আমরা মাপতে পারি, রাস্তায় কত সংখ্যক মানুষ সেটি শীষ দিয়ে গাইছে সেটি পরিমাপ করার মাধ্যমে। যদি এটি কোনো বিশেষ স্টাইলের রমনীদের জুতো হয়, জনসংখ্যা মিমতাত্ত্বিকরা হয়তো জুতোর দোকানে বিক্রির পরিসংখ্যান উপাত্ত ব্যবহার করতে পারেন। কিছু মিম দ্রুত প্রসারের ক্ষেত্রে কিছু জিনের মতই চমৎকার স্বল্প মেয়াদী সফলতা অর্জন করে, কিন্তু মিম পুলে দীর্ঘ মেয়াদী তেমন কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনা। জনপ্রিয় গানগুলো আর সুচালো স্টিলেটো হিল জুতা এর কিছু উদাহরণ। অন্য উদাহরণ, যেমন ইহুদীদের ধর্মীয় আইন, হয়তো তাদের নিজেদের প্রসার করেছে হাজার হাজার বছর ধরে, সাধারণত এর কারণ লিখিত রেকর্ডের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় স্থায়িত্ব।
এই প্রসঙ্গটি সফল অনুলিপনকারীদের তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটির দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে: সেটি হচ্ছে অনুলিপি করার সময় মূল কপিটির বিশ্বস্ততা রক্ষা করা বা ‘কপিইং ফিডেলিটি। এখানে আমি অবশ্যই স্বীকার করছি খানিকটা নড়বড়ে অবস্থানে আমি দাঁড়িয়ে, প্রথম দৃষ্টিতে দেখে মনে হতে পারে মিমরা আদৌ উচ্চ বিশ্বস্তপুর্ণ বা হাই ফিডেলিটি অনুলিপনকারী না। যখনই কোনো বিজ্ঞানী একটি ধারণা শোনেন এবং অন্য একজনকে সেই ধারণাটি হস্তান্তর করেন, সেটি কিছুটা পরিবর্তন করার সম্ভাবনা থাকে, যেমন, আমি গোপন করিনি যে এই বইটির ধারণার জন্য আমি আর, এ. ট্রিভার্স-এর কাছে ঋণী, কিন্তু তারপরও আমি ট্ৰিভার্সের নিজের ভাষায় বিষয়টির পুনরাবৃত্তি করিনি, আমি নিজের বক্তব্যের উদ্দেশ্যে খানিকটা রদবদল করেছি, গুরুত্ব দেবার জায়গাটি পরিবর্তিত হয়েছে, আমার নিজের ও অন্যদের ধারণার সাথে সেটি মিশিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। পরিবর্তিত রুপে মিমগুলো আপনাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এটি সেকারণেই জিনগত বিস্তারের সুনির্দিষ্ট কণাসূলভ প্রকৃতি, ‘পুরোটা-অথবা-কোনটাই না’ বৈশিষ্ট্যের সদৃশ্য নয়। দেখে মনে যেন মিমের বিস্তার ক্রমাগত মিউটেশন এবং মিশ্রণ প্রক্রিয়ার শিকার।
