এই নতুন সুপটি হচ্ছে মানব সংস্কৃতির সুপ। এই নতুন অনুলিপনকারীকে চিহ্নিত করার জন্য আমাদের একটি নামের প্রয়োজন। কোনো একটি বিশেষ্য পদ যা সাংস্কৃতিক ধারণাগুলোর বিস্তার বা ছড়িয়ে পড়ার এককের ধারণাটি প্রকাশ করতে পারবে, কিংবা ‘অনুকরণ করার কোনো একক। মাইমিম’ (Mimeme) এসেছে একটি উপযুক্ত গ্রিক মূল শব্দ থেকে, কিন্তু আমি চাই এটি একটি একক স্বরধ্বণির কোনো শব্দ হোক, যা ‘জিন’ শব্দটির মতই শুনাবে, আমি আশা করছি গ্রিক বিশেষজ্ঞ বন্ধুরা আমাকে ক্ষমা করবেন, যদি আমি “মাইমিম’ শব্দটিকে সংক্ষেপিত করি, মিম (meme) শব্দে (২)। যদি কোনো সান্ত্বনার বিষয় হয়, সেকারণে আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, বিকল্পভাবে এটিকে ভাবা যেতে পারে মেমোরী বা স্মৃতি শব্দটির সাথে সংশ্লিষ্ট, অথবা ফরাসী মিম (méme) শব্দটির সাথে সম্পর্কিত। এটিকে উচ্চারণ করা উচিৎ হবে যেন এটি ‘ক্রিম’ (cream) শব্দটির সাথে ছন্দময় হয়।
‘মিমে’র উদাহরণ হতে পারে যেমন, কোনো সুর, ধারণা, বা কোনো বহুল ব্যবহৃত শব্দ-সমষ্টী বা ‘ক্যাচ-ফ্রেজ’, কাপড়ের ফ্যাশন, কোনো পাত্র বানানোর উপায় বা আর্চ বা খিলান তৈরী করার কৌশল। ঠিক যেভাবে জিনরা জিন পুলে শুক্রাণু বা ডিম্বাণু দ্বারা এক শরীর থেকে অন্য শরীরে প্রবেশ করার মাধ্যমে তাদের বংশ বিস্তার করে, সেভাবে একটি মস্তিষ্ক থেকে অন্য একটি মস্তিষ্কে প্রবেশ করার মাধ্যমে মিমরাও মিম পুলে বিস্তার করে এমন একটি প্রক্রিয়ায়, যেটিকে ‘বৃহত্তর’ অর্থে ‘অনুকরণের মাধ্যমে বলা যেতে পারে। যদি একজন বিজ্ঞানী কোনো একটি ভালো ধারণা সম্পর্কিত কিছু শোনেন। বা পড়েন, তিনি তার সহকর্মী ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সেটি প্রচার করেন। তিনি সেটি উল্লেখ করেন তার প্রবন্ধে এবং ভাষণে। যদি সেই ধারণাটি জনপ্রিয়তা পায়, বলা যেতে পারে, একটি মস্তিষ্ক থেকে অন্য একটি মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে এটি নিজেকে বিস্তার করতে পেরেছে। আমার সহকর্মী এন.কেহামফ্রে যেমন চমৎকারভাবে এর একটি সংক্ষিপ্ত রুপ দিয়েছিলেন এই অধ্যায়ের আগের একটি খসড়া পর্যালোচনা করার সময়, .. মিমগুলোকে জীবন্ত কোনো কাঠামো হিসাবে বিবেচনা করা উচিৎ, শুধু রুপকার্থেই না বরং কারিগরী অর্থে। (৩) যখনই আপনি কোনো উর্বর মিম আমার মনের মধ্যে স্থাপন করবেন, আক্ষরিকার্থে আপনি আমার মস্তিষ্ককে পরজীবির মত অধিগ্রহন করবেন, এটিকে যা রূপান্তরিত করে সেই মিম সম্প্রচারের একটি বাহক হিসাবে, ঠিক যেমন, কোনো ভাইরাস পোষক কোষের জিনগত প্রক্রিয়াকে দখল করে নেয়। এবং এটি শুধুমাত্র বলার জন্য কোনো কিছু বলা নয় –যেমন, সেই মিমটি, ‘মৃত্যু পরবর্তী জীবনের উপরে বিশ্বাস’ আসলেই সারা পৃথিবী জুড়ে বহু মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে ভৌত একটি কাঠামো হিসাবে বহু লক্ষবার বাস্তবায়িত হয়েছে।
‘ঈশ্বর’ ধারণাটির কথা ভাবুন। আমাদের জানা নেই মিম সম্ভারে কিভাবে এটি আবির্ভূত হয়েছিল, হয়তো স্বতন্ত্র ‘মিউটেশন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বহুবার এটি সৃষ্টি হয়েছে। যে-কোনো ক্ষেত্রেই, এটি সত্যিই বহু প্রাচীন। কিন্তু কিভাবে এটি নিজের প্রতিলিপি সৃষ্টি করে? উচ্চারিত এবং লিখিত ‘শব্দের মাধ্যমে, অসাধারণ ‘সঙ্গীত’ আর ‘শিল্পকলার সহায়তায়। কিন্তু কেন এটি টিকে থাকার জন্য এত দক্ষ? কেন এর সারভাইভাল ভ্যালু এত বেশী? মনে রাখতে হবে যে ‘সারভাইভাল ভ্যালু’ এখানে জিন পুলের কোনো একটি জিনের গড় সারভাইভাল ভ্যালুকে বোঝাচ্ছে না, বরং মিম পুলে কোনো মিমের সারভাইভাল ভ্যালুকে বোঝাচ্ছে। এই প্রশ্নটির আসলে বোঝাচ্ছে: ঈশ্বর ধারণাটির কি এমন কোনো বৈশিষ্ট্য আছে, যা কোনো একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশে এর উচ্চহারে গ্রহনযোগ্যতা ( পেট্রোন্স: জিনের ভাষায় শব্দটি বোঝায় সেই জিনটির বাহক সদস্যদের মধ্যে কি পর্যায় অবধি সেই জিন বা জিন সেটি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ফিনোটাইপ বা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশিত হয়, বাহকদের মধ্যে কত শতাংশ সেই বৈশিষ্ট্যসূচক ফিনোটাইপটি বহন করছে সেই সংখ্যাটি দ্বারা এটি পরিমাপ করা হয়) এবং স্থিতিশীলতার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে? ঈশ্বর বা গড় মিমটি মিম পুলে সারভাইভাল ভ্যালুর কারণ হচ্ছে এর অসাধারণ একটি মনস্তাত্ত্বিক আবেদন। এটি উপরিভাবে ‘অস্তিত্ব সম্বন্ধে গভীর এবং জটিল দ্বন্দ্বময় প্রশ্নগুলোর সম্ভাব্য একটি উত্তর প্রদান করে। এটি প্রস্তাব করে যে এই জগতের যত অবিচার পরবর্তী জগতে সুবিচার পাবার মাধ্যমে সংশোধিত হবে। চিরস্থায়ী হাত আমাদের নিজেদের সব অক্ষমতার বিপরীততে সুরক্ষার বালিশ এগিয়ে ধরছে, যেমন, কোনো ডাক্তারের দেয়া ঔষধ-বিকল্প বা প্ল্যাসিবো, যা কাল্পনিক হওয়া সত্ত্বেও কোনো অংশেই আসল ঔষধের চেয়ে কম কার্যকরী নয়। এগুলো হচ্ছে কিছু কারণ, যা ব্যাখ্যা করে কেন ঈশ্বরের ধারণাটি অতি সহজে ধারাবাহিকভাবে একক মস্তিষ্কের প্রজন্মদের মাধ্যমে অনুলিপিকৃত হয়েছে। ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে, শুধুমাত্র যদিও, মানব সংস্কৃতির সৃষ্ট পরিবেশে টিকে থাকার উচ্চ ক্ষমতা (সারভাইভাল ভ্যালু) বা সংক্রমণ করার শক্তি বিশিষ্ট একটি মিম রুপে।
আমার কিছু সহকর্মী প্রস্তাব করেছিলেন, ‘গড’ মিমটির সারভাইভাল ভ্যালু সম্বন্ধে এই ব্যাখ্যা অবধারিতভাবে আরো কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়। আগের বিশ্লেষণটিতে তারা সবসময়ই আশা করেন, ‘জৈববৈজ্ঞানিক সুবিধা প্রসঙ্গটিতে ফিরে যেতে। তাদের কাছে এটি যথেষ্ট না শুধুমাত্র বলা যে, ঈশ্বর ধারণাটির একটি সুবিশাল মনস্তাত্ত্বিক আবেদন আছে। তারা জানতে চান, কেন’ এর এই বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক আবেদন আছে। মনস্তাত্ত্বিক আবেদন মানে এটির আবেদন আমাদের মস্তিষ্কে, এবং জিন পুলে জিনদের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে সেই মস্তিষ্ক তার রুপ পেয়েছে। তারা কোনো একটি উপায় খুঁজে পেতে চান, যা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চান যে, এমন কোনো মস্তিষ্ক থাকা জিনের টিকে থাকার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
