সাংস্কৃতিক এবং জিনগত বিবর্তনের তুলনামূলক উদাহরণ প্রায়শই উল্লেখ করা হয়েছে, কখনো সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় রহস্যময়তার আবরণে। বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে জিনগত বিবর্তন বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করেছেন স্যার কার্ল পপার। আমি সেই দিক বরাবর আরো অগ্রসর হতে চাই, যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন, যেমন, জিনতাত্ত্বিক এল, এল, কাভালি এসফোরজা, নৃতাত্ত্বিক এফ. টি. ক্লোক এবং প্রাণি-আচরণ বিশেষজ্ঞ জে. এম, কালেন।
একজন উৎসাহী ডারউইনবিদ হিসাবে, আমার অন্যান্য সহযোগী উৎসাহী ডারউইনবিদদের ব্যাখ্যাগুলোয় আমি সন্তুষ্ট না, মানুষের আচরণের ব্যাখ্যা হিসাবে যা কিছু তারা প্রস্তাব করেছিলেন। তারা মানব সভ্যতার বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর ‘জৈববৈজ্ঞানিক সুবিধাগুলো অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করেছিলেন। যেমন, গোত্রগত ধর্মকে গ্রুপ ‘সংহতি’ ও ‘পরিচয়’ দৃঢ় করার একটি মাধ্যম হিসাবে দেখা হয়। দল বেধে শিকার করা, প্রাণীদের মধ্যে যা বিশেষভাবে গুরুতুপূর্ণ, যখন সদস্যরা আরো বড় এবং দ্রুত প্রাণী শিকার করতে পরস্পর সহযোগিতা করে। প্রায়শই বিবর্তনীয় প্রাকধারণা, যার উপর এই তত্ত্বগুলো তাদের ভিত্তি রচনা করে, সেগুলো পরোক্ষভাবে গ্রুপ সিলেকশনবাদী, কিন্তু অর্থোডক্স বা মূলধারার ‘জিন সিলেকশন’ তত্ত্ব দ্বারা এই তত্ত্বগুলোকে নতুন করে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। মানুষ খুব সম্ভবত গত কয়েক মিলিয়ন বছর সময়কালের বড় একটি অংশ ‘কিন’ বা আত্মীয়দের ক্ষুদ্র গোষ্ঠী হিসাবে বসবাস করে এসেছে। কিন সিলেকশন এবং পারস্পরিক পরার্থবাদীতার জন্য নির্বাচন হয়তো আমাদের অনেকগুলো মৌলিক মনোজাগতিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রবণতা সৃষ্টি করতে মানব জিনের উপর কাজ করেছে। এই ধারণাগুলো যেভাবে প্রস্তাবিত হয়েছে, সেখানে সম্ভাব্য এবং ব্যাখ্যাযোগ্য আপাতগ্রাহ্যতা আছে, যত দূর সম্ভব এটি ভাবা যেতে পারে। কিন্তু আমার মনে করি, সেগুলো সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক বিবর্তন এবং পৃথিবী মানব সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে বিদ্যমান বিশাল পার্থক্যগুলো ব্যাখ্যা করার সমীহ জাগানো চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করতে পারেনা, যেমন: উগান্ডার ‘ইক’দের চূড়ান্ত স্বার্থপরতা থেকে– যা ব্যাখ্যা করেছিলেন কলিন টার্নবুল– মার্গারেড মীডের বর্ণিত ‘আরাপেশ’দের বিনম্র পরার্থবাদীতা। আমি মনে করি আমাদের আবার শুরু করতে হবে এবং প্রথম মূলনীতি থেকেই আবার শুরু করতে হবে। এবং আমি যে যুক্তি প্রস্তাব করবো, বিস্ময়কর মনে হতে পারে, যখন কিনা এটি এমন কেউ প্রস্তাব করছে যিনি এই বইয়ের আগের অধ্যায়গুলো লিখেছেন। সেটি হচ্ছে, আধুনিক মানুষের বিবর্তন সম্বন্ধে একটি বোধগম্যতা অর্জন করতে আমাদের অবশ্যই শুরু করতে হবে বিবর্তন সংক্রান্ত সকল ধারণার একমাত্র ভিত্তি হিসাবে জিনের ধারণাটিকে বাদ দিয়ে। আমি একজন তীব্র উৎসাহী ডারউইনবাদী, এবং আমি মনে করি জিনের সংকীর্ণ ধারণায় সীমাবদ্ধ হয়ে থাকার জন্য ডারউইনবাদ আসলেই অনেক বড় একটি তত্ত্ব। জিন আমার এই মূল প্রস্তাবনায় অবশ্যই থাকবে, তবে শুধুমাত্র তুলনামূলক উদাহরণ হিসাবে, তার বেশী কিছু নয়।
সর্বোপরি, জিনদের সেই বিশেষ বিশেষত্বটি কি? এর উত্তর হচ্ছে। তারা হচ্ছে রেপ্লিকেটর বা অনুলিপনকারী। আমাদের অভিগম্য এই মহাবিশ্বে সর্বত্র পদার্থবিদ্যার সূত্র একই রকম হবার কথা। জীববিজ্ঞানেরও কি এমন কোনো মূলনীতি আছে, যেগুলোরও ঠিক একই রকম বিশ্বজনীন সত্যতা আছে? নভোচারীরা যখন দূরের কোনো গ্রহে অভিযানে যান এবং জীবনের অনুসন্ধান করেন, এমন জীবের অনুসন্ধান তারা পেতে পারেন বলে প্রত্যাশা করতে পারেন, যা অবশ্যই আমাদের কল্পনার চেয়েও বেশী অদ্ভুত আর অপার্থিব হবে। কিন্তু এমন কি কিছু আছে যা সব জীবনের জন্য একইভাবে সত্য হবে, যেখানেই তাদের পাওয়া যাক না কেন এবং তাদের ভিত্তিতে যে রসায়নের উপস্থিতি থাকুক না কেন? যদি জীবনের এমন কোনো রুপ থাকে, যার ভিত্তি কার্বন নয় সিলিকন অথবা পানি নয় বরং অ্যামোনিয়া, যদি এমন কোন জীব পাওয়া যায়, যারা– ১০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডেই সিদ্ধ হয়ে মারা যায়, যদি এমন কোনো জীবনের রুপ, যারা কোনো ধরনের রসায়নভিত্তিক নয় বরং কম্পমান ইলেক্ট্রনিক সার্কিটের সমষ্টি, তাহলে এমন কি কোনো সাধারণ মূলনীতি থাকবে, যা জীবনের যেকোনো রুপের জন্য সত্য হবে? অবশ্যই আমি জানি না, কিন্তু, যদি আমাকে বাজী রাখতে হয়, আমি আমার বাজী ধরবো একটি মৌলিক মূলনীতির উপর। সেটি হচ্ছে সেই সূত্র, অনুলিপনকারী সত্তাগুলোর টিকে থাকার ক্ষমতার পার্থক্যর উপর ভিত্তি করে সকল জীবন ‘বিবর্তিত হয় (১)। জিন, ডিএনএ অণু, ঘটনাচক্রে সেই অনুলিপনকারী সত্তা যা আমাদের এই গ্রহে আধিপাত্য স্থাপন করেছে। অন্য আরো এ-ধরনের সত্তা থাকতে পারে; যদি তারা থেকে থাকে, এবং যদি অন্যান্য শর্তাবলী পূর্ণ হতো, তারা প্রায় অবশ্যম্ভাবীভাবে বিবর্তন প্রক্রিয়ার ভিত্তি হতে পারতো।
কিন্তু অন্য ধরনের অনুলিপনকারী এবং এর পরিণতিতে উদ্ভূত ভিন্ন বিবর্তন প্রক্রিয়াসমূহ খুঁজতে কি আমাদের ভিন্ন কোনো গ্রহে যেতে। হবে? আমি মনে করি একটি নতুন ধরনের অনুলিপনকারী খুব সম্প্রতি আবির্ভূত হয়েছে এই গ্রহেই, আর ঠিক আমাদের চোখের সামনেই, এখনও এটি তার শৈশবে, এখনও অদক্ষভাবে এটি ভেসে বেড়াচ্ছে আদিম জৈব মিশ্রণ বা সুপে, কিন্তু ইতিমধ্যে এটি অর্জন করেছে এমন একটি গতির বিবর্তনীয় পরিবর্তন, যা পুরোনো জিন বিবর্তনকে হাঁপানোরত অবস্থায় বহু পেছনে ফেলে রেখে অনেক দূর সামনে দৌড়ে এগিয়ে গেছে।
