এতক্ষণ পর্যন্ত বিশেষ করে মানুষের ব্যাপারে আমি বেশী কিছু বলিনি, আলোচনা থেকে যদিও মানুষকে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদও দেইনি। ‘সারভাইভাল মেশিন’ বা টিকে থাকার যন্ত্র শব্দটি ব্যবহার করার আংশিক কারণ হচ্ছে, ‘প্রাণী’ শব্দটি ব্যবহার করলে সেটি উদ্ভিদদের এই আলোচনার বাইরে রাখতো, এবং কিছু মানুষের মনে, মানুষদেরকেও। যে যুক্তিগুলো আমি প্রস্তাব করেছি এখানে সেগুলো, প্রথম দৃষ্টিতে, যে-কোনো বিবর্তিত জীবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া উচিৎ। যদি কোনো প্রজাতিকে তালিকা থেকে বাদ হতে হয়, সেটিকে অবশ্যই সুনির্দিষ্টভাবে উপযুক্ত কিছু কারণে হতে হবে। আমাদের নিজেদের প্রজাতি স্বতন্ত্রভাবে অনন্য– এমন কিছু মনে করার কি ভালো কোনো কারণ আছে? আমি বিশ্বাস করি এর উত্তর, হ্যাঁ।
মানুষের ক্ষেত্রে যা কিছু ব্যতিক্রম সেগুলো সব একটি মাত্র শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যেতে পারে: ‘সংস্কৃতি। আর আমি এই শব্দটি ব্যবহার করছি সংস্কৃতিহীনতার প্রতি একটি অবজ্ঞা অর্থে না, বরং একজন বিজ্ঞানী যে অর্থে শব্দটি ব্যবহার করেন সেই অর্থে। সাংস্কৃতিক কোনো কিছুর বিস্তার বা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার সাথে জিনগত বিস্তার বা হস্তান্তরণ সদৃশ এই অর্থে যে, যদিও মৌলিকভাবে রক্ষণশীল একটি অর্থে, এটিও একধরনের বিবর্তনের সূচনা করতে পারে। জিওফ্রে চসার তার সমসাময়িক ইংরেজী ভাষা ব্যবহার করে আধুনিক কোনো ইংরেজীভাষীর সাথে কথোপথন চালিয়ে যেতে পারবেন না, যদিও তাদের মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধন রচনা করে আছে অবিচ্ছিন্ন প্রায় বিশটি প্রজন্মের ইংরেজরা, যাদের প্রত্যেকেই সেই ধারাবাহিক বংশধারার শৃঙ্খলের পার্শবর্তী প্রতিবেশীর সাথে কথা বলতে পারবেন, যেমন করে কোনো পুত্র তার পিতার সাথে কথা বলে থাকে। প্রতীয়মান হয় যে ভাষা বিবর্তিত হয় জিনগত নয় এমন কোনো উপায়ে এবং এমন একটি হারে, যা জিনগত বিবর্তনের চেয়ে বেশ কয়েকগুণ দ্রুত।
সাংস্কৃতিক এই বিস্তার বা হস্তান্তরণ শুধু মানুষেরই অনন্য কোনো বৈশিষ্ট্য নয়। মানুষ নয় এমন কোনো প্রাণীদের ক্ষেত্রে আমার জানা এর সবচেয়ে সেরা উদাহরণটি সাম্প্রতিক সময়ে যা বর্ণনা করেছেন পি. এফ. জেনকিন্স ‘স্যাডলব্যাক’ পাখিদের গানে, যারা বাস করে নিউ জিল্যান্ডের কাছাকাছি একটি দ্বীপে। বিশেষ যে দ্বীপে তিনি গবেষণা করেছিলেন, সেখানে স্যাডলব্যাক পাখিদের সংগ্রহে মোট নয়টি সুস্পষ্টভাবে পৃথক গান ছিল। কোনো পুরুষ পাখি সেই গানগুলো থেকে শুধু একটি বা অল্প কয়েকটি কেবল গাইতে পারে। পুরুষদের এইভাবে ভিন্ন ভিন্ন ডায়ালেক্ট গ্রুপে শ্রেণী বিন্যস্ত করা যেতে পারে। যেমন, আটটি পুরুষ পাখির একটি গ্রুপ তাদের পাশের এলাকা থেকে ভিন্ন কারণ তার একটি বিশেষ গান গায়, যার নাম ‘সিসি সং। অন্য ডায়ালেক্ট বা উপভাষাগত গ্রুপরা ভিন্ন ভিন্ন গান গায়। কখনো কোনো একটি ডায়ালেক্ট গ্রুপের সদস্যরা একাধিক সুনির্দিষ্ট গান ব্যবহার করে। বাবা এবং ছেলের গানের তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ করে জেনকিন দেখিয়েছিলেন গানের প্যাটার্নটি জিনগতভাবে হস্তান্তরিত হচ্ছে না। প্রতিটি তরুণ পুরুষ পাখি তার এলাকার প্রতিবেশীকে অনুকরণ করে কোনো গানকে বেছে নিচ্ছে, মানুষ যেমন করে ভাষা গ্রহন করে সেভাবে। বেশীর ভাগ সময় যখন জেনকিন্স সেই দ্বীপে ছিলেন সেখানে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক গান ছিল, একধরনের গানে সম্ভার বা সং পুল, যেখান থেকে তরুণ পুরুষ পাখিরা তাদের নিজেদের সংগ্রহের গান বেছে নেয়। কিন্তু মাঝে মাঝে জেনকিনসের সৌভাগ্য হয়েছিল নতুন গানের আবিষ্কার হতে দেখতে, পুরোনো কোনো একটি গান অনুকরণের সময় সৃষ্ট ভুলের মাধ্যমে যেটি ঘটে। তিনি লেখেন: ‘নতুন গানের রুপগুলোকে দেখা গেছে নানা ভাবে উদ্ভব হতে, কোনো একটি নোটের পিচ পরিবর্তন, বা কোনো একটি নোটের পুনরাবৃত্তি, কোনো নোটে ধ্বনিলোপ, অন্যান্য কোনো গানের নানা অংশের সম্মিলন, ইত্যাদির মাধ্যমে। নতুন রুপের কোনো গানের আবির্ভাব খুবই আকস্মিক একটি ঘটনা এবং বেশ কয়েক বছরের জন্য এই ঘটনার ফলে সৃষ্ট বিষয়টি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকে। এছাড়াও বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই ভিন্ন রুপটি নিখুঁতভাবে ছড়িয়ে পড়ে এর নতুন রুপে তরুণদের মধ্যে, সুতরাং একটি একই ধরনের শিল্পীদের শনাক্তযোগ্য সম্মিলিত গ্রুপ গড়ে ওঠে। জেনকিন এই নতুন গানের সৃষ্টিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। ‘সাংস্কৃতিক একটি মিউটেশন’ হিসাবে।
স্যাডলব্যাক পাখিদের মধ্যে সংগীত সত্যিকারভাবে নন-জেনেটিক বা জিনগত নয় এমন উপায়ে বিবর্তিত হয়। বানর এবং পাখিদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিবর্তনের আরো উদাহরণ আছে, কিন্তু লক্ষণীয়ভাবে এগুলো বেশ ব্যতিক্রম কিছু ঘটনা। সাংস্কৃতিক বিবর্তন কি করতে পারে, সেটি আমাদের নিজেদের প্রজাতিতেই শুধুমাত্র আমরা সত্যিকারভাবে দেখতে পাই। অনেকগুলোর মধ্যে ‘ভাষা’ হচ্ছে শুধুমাত্র একটি উদাহরণ। কাপড় কিংবা খাদ্যাভাসের রীতি, নানা আচার অনুষ্ঠান এবং সামাজিক প্রথা, শিল্পকলা এবং স্থাপত্য, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, সব বিবর্তিত হয়েছিল ঐতিহাসিক সময়ে এমন একটি উপায়ে যা দেখতে অনেক দ্রুতহারে চলমান জিনগত বিবর্তনের মতই মনে হয়, কিন্তু যার আসলেই জিনগত বিবর্তনের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। জিনগত বিবর্তনের মতই যদিও পরিবর্তন হতে পারে ক্রমবর্ধিষ্ণু। অবশ্যই একটি অর্থে, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান প্রাচীন বিজ্ঞান অপেক্ষা আসলেই উত্তম। বহু শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়ে এখন মহাবিশ্ব সম্বন্ধে আমাদের জানার পরিধিই শুধু বদলে যায়নিঃ এটি ক্রমোন্নয়নও ঘটেছে। স্বীকার করতে হবে যে, জ্ঞানার্জনের এই সাম্প্রতিক বিস্ফোরণটির সময়কাল অতীতে বিস্তৃত কেবল রেনেসাঁ অবধি, যা পূর্ববর্তী সময়টি ছিল হতাশাজনকভাবে নিষ্ক্রিয় এবং আবদ্ধতার একটি পর্ব, যখন ইউরোপীয় বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতি ছিল স্থির সেই পর্যায় অবধি, যা গ্রিকরা এর পূর্বে অর্জন করেছিল। কিন্তু যেমন, আমরা অধ্যায় ৫ এ দেখেছি, জিনগত বিবর্তনও এমন সংক্ষিপ্ত হঠাৎ ব্যস্ত সময়ের ধারাক্রম হতে পারে, যাদের অন্তবর্তীকালীন পর্বে স্থিতিশীল পরিস্থিতিগুলো আমরা লক্ষ করি।
