প্রসঙ্গক্রমে, মাথার পরজীবি পরিষ্কার না করার বিপদ সংক্রান্ত আমার এই হাইপোথেটিকাল উদাহরণ খুবই সম্ভাব্য। বিচ্ছিন্ন করে রাখা ইঁদুররা তাদের মাথার সেই সব অংশে অস্বস্তিকর ক্ষতে আক্রান্ত হয়, যে অংশগুলো তারা নিজেরা পরিষ্কার করতে পারেনা। একটি গবেষণায়, গ্রুপে রাখা ইঁদুরদের এই সমস্যায় আক্রান্ত হতে হয়না, কারণ তারা একে অপরে মাথা উপরের অংশ চেটে পরিষ্কার করে দেয়। বেশ কৌতূহলোদ্দীপক একটি ব্যপার হবে এই ‘পরস্পরমুখী পরার্থবাদীতার তত্ত্বটি পরীক্ষমূলকভাবে নীরিক্ষা করে দেখা যায় এবং আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে ইঁদুররা এই ধরনের গবেষণার জন্য উপযুক্ত।
ক্লিনার ফিশদের বিস্ময়কর মিথোজীবিতা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন ট্রিভার্স। প্রায় ৫০ টি প্রজাতি, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছোট মাছ এবং শ্রিম্পরা, অন্য প্রজাতির বড় মাছদের শরীরের উপর থেকে পরজীবিদের খুটে খুটে তুলে পরিষ্কার করার জন্য তারা সুপরিচিত। বড় মাছরা অবশ্যই এইভাবে পরিস্কার হবার মাধ্যমে লাভবান হয়, এবং এর বিনিময়ে ক্লিনাররা ভালো পরিমান খাদ্য সংগ্রহ করে নেয়। এই সম্পর্ক মিথোজীবিতা নির্ভর। অনেক ক্ষেত্রে বড় মাছগুলো তাদের মুখ হা করে ক্লিনার ফিশদের তাদের মুখের ভিতরে ঢুকে তাদের দাঁত পরিষ্কার করার জন্য সুযোগ করে দেয়, এবং তাদের ফুলকার মধ্য দিয়ে সাঁতার করে বের হয়ে যাবার জন্য, যে ফুলকাগুলোও তারা পরিষ্কার করে দেয়। কেউ হয়তো ভাবতে পারেন চালাকী করে কোনো বড় মাছ হয়তো পুরোপুরি পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা নাও করতে পারে, এরপর ক্লিনার মাছদের নিজেরাই খাদ্য হিসাবে গিলে ফেলতে পারে। কিন্তু এর পরিবর্তে সে সাধারণত ক্লিনার মাছগুলোকে কোনো ধরনের আক্রমণ ছাড়াই চলে যেতে দেয় তাদের কাজ শেষ করার পর। এবং অবশ্যই এটি উল্লেখযোগ্য পরিমানের একটি আপাতদৃষ্টিতে পরার্থবাদীতা, কারণ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই বড় মাছের স্বাভাবিক শিকারের মত ক্লিনার মাছগুলো একই আকারের।
ক্লিনার মাছের একটি বিশেষ ধরনের দাগ কাটা নক্সা থাকে এবং বিশেষ একটি নাচের প্রদর্শনী যা তাদের চিহ্নিত করে ক্লিনার ফিশ হিসাবে। বড় মাছগুলো সাধারণত এইসব ছোট মাছদের খাওয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখে যাদের শরীরে সঠিকভাবে এই ধরনের দাগাঙ্কিত আছে, যারা তাদের সামনে সঠিক ধরনের নাচ প্রদর্শন করে এগিয়ে আসে। এর বদলে বড় মাছগুলো এক ধরনের গভীর ঘোর লাগা কোনো অবস্থায় প্রবেশ করে, এবং ক্লিনার মাছকে তারা অনুমতি দেয় তাদের বাইরে ও ভিতরে অবাধ বিচরণের জন্য। অবাক হবার কোনো কারণ নেই যে স্বার্থপর জিন তাদের বৈশিষ্ট্যগত কারণেই নিষ্ঠুর, স্বার্থপর চিটরা এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে নেয়। ছোট মাছের বেশ কিছু প্রজাতি আছে তারা দেখতে ঠিক ক্লিনার মাছের মত এবং তারা ঠিক একইভাবে নাচতে জানে, যেন বড় মাছগুলোর আশে পাশে থেকে যেন নিরাপদে সরে যেতে পারে। যখনই বড় মাছ তাদের প্রত্যাশিত সেই ঘোরের মধ্যে থাকে যেন ক্লিনার মাছরা তাদের পরিষ্কার করছে, এই চিটরা পরজীবি পরিষ্কার করার বদলে উল্টো বড় মাছের ফুলকার একটুকরো কামড়ে নিয়ে দ্রুত প্রস্থান করে। কিন্তু সেই চিটগুলো ছাড়া, ক্লিনার মাছ এবং তাদের খদ্দেরদের সম্পর্ক মূলত বন্ধুসুলভ এবং স্থিতিশীল। এই পরিষ্কার করার পেশা প্রবাল প্রাচীরের মাছের সমাজে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রাখে। প্রতিটি ক্লিনার মাছের একটি নিজস্ব এলাকা আছে, এবং বড় মাছরা ঠিক কোন নাপিতের দোকানের সামনে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা খদ্দেরদের মত দাঁড়িয়ে থাকে সেই এলাকার ক্লিনার মাছের জন্য। সম্ভবত এই ‘সাইট-টেনাসিটি’ বা বড় মাছদের বার বার একই জায়গায় ফিরে যাবার প্রবণতাটি একটি বিলম্বিত
পরস্পরমুখী পরার্থবাদিতা সম্ভব করে। কোনো একটি বড় মাছের বার বার একই ‘নাপিতের দোকানে ফিরে আসার সুবিধা অবশ্যই বেশী হতে হবে ক্লিনার মাছদের খাদ্য হিসাবে খাওয়া থেকে বিরত থাকার সুবিধা থেকে। যেহেতু ক্লিনাররা আকারে খুব ছোট, এটি বিশ্বাস করা খুব কঠিন বিষয় না। কিন্তু ক্লিনার মাছ সেজে থাকা ও তাদের অনুকরণ করা প্রতারকরা সম্ভবত পরোক্ষভাবে বিপদে ফেলে প্রতারণা করে এমন প্রকৃত ক্লিনার মাছদের বিপদগ্রস্থ করে, বড় মাছগুলোর উপর দাগসহ নাচতে থাকা ছোট মাছগুলো খেয়ে ফেলার জন্য মৃদু চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বার বার ফিরে আসার কারণে বা সাইট টেনাসিটি আচরণটি কোন বড় মাছ খদ্দেরকে প্রতারকদের এড়িয়ে প্রকৃতি ক্লিনার মাছদের খুঁজে বের করতে সাহায্য করে।
মানুষের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি এবং একক সদস্যদের শনাক্ত করার ক্ষমতা বিশেষভাবে বিকশিত। সেকারণে আমরা হয়তো আশা করতে পারি যে, পরস্পরমুখী পরার্থবাদীতা মানব বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো। ট্রিভার্স এমনকি অনেক দুর আগ বাড়িয়ে প্রস্তাব করেছিলেন যে, আমদের অনেক মনোজাগতিক বৈশিষ্ট্যাবলী, হিংসা, অপরাধবোধ, কৃতজ্ঞতা, সহমর্মিতা ইত্যাদি– তাদের বর্তমান রুপ পেয়েছে প্রতারণা করা, প্রতারক শনাক্ত করা এবং প্রতারক হিসাবে শনাক্ত হবার সম্ভাবনা এড়ানোর আরও উন্নততর দক্ষতার জন্য প্রাকৃতিক নির্বাচনী চাপের ফলে। বিশেষ করে যেটি উল্লেখযোগ্য, সুক্ষ্ম প্রতারকরা, যারা আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় উপকারের প্রতিদান দিচ্ছে, কিন্তু সবসময়ই তারা যে পরিমান উপকার গ্রহন করে তারচেয়ে খানিকটা কম উপকার প্রতিদান হিসাবে দেয়। এটি এমনকি সম্ভব যে মানুষের স্ফীত মস্তিষ্ক এবং গাণিতিকভাবে তার যুক্তি প্রস্তাব করার প্রবণতা, বিবর্তিত হয়েছে আরো বেশী ধূর্তভাবে প্রতারণা করা এবং অন্যদের প্রতারণা শনাক্ত করার প্রক্রিয়া হিসাবে। টাকা হচ্ছে বিলম্বিত পরমুখী পরার্থবাদিতার একটি আনুষ্ঠানিক উপকরণ। কোন শেষ নেই পরস্পমুখী পরার্থবাদীতার এই সব বিস্ময়কর ধারণাগুলোর, যেগুলো সৃষ্টি হয় যখন আমরা ধারণাগুলো আমাদের নিজেদের প্রজাতির উপর প্রয়োগ করি। যদিও প্রলুব্ধ করে বিষয়টি, আমি আর সবার মতই খুব বেশী উত্তম কিছু ধারণা করার জন্য যোগ্য নই এবং এই বিষয়টি বরং পাঠকদের উপর ছেড়ে দেই, তারা তাদের কল্পনাশক্তির অবাধ ব্যবহার করে নিজেদের তৃপ্ত করতে পারবেন।
