পারস্পরিক সুবিধার সম্পর্কের বিবর্তন তাত্ত্বিকভাবে কল্পনা করা সহজ যদি কোনো বিশেষ সুবিধার আদান প্রদান যুগপৎভাবে ঘটে থাকে, যেমনটি ঘটে সেই সব অংশীদারদের মধ্যে যারা একটি লাইকেন তৈরী করে। কিন্তু সমস্যা উদ্ভূত হয় যদি কোনো উপকার প্রদানের পর এর প্রতিদান পেতে দেরী হয়। এর কারণ প্রথম উপকার গ্রহীতা হয়তো প্রলুদ্ধ হতে পারে প্রতিদান না দিয়ে প্রতারণা করতে যখন তার প্রতিদান দেবার সময় আসে। এই সমস্যার সমাধান বেশ কৌতূহলদ্দীপক এবং ব্যাপকভাবে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা আছে। আমি সেই কাজটি ভালোভাবে করতে পারবো যদি একটি হাইপোথেটিকাল উদাহরণ ব্যবহার করি।
মনে করুন একটি প্রজাতির পাখিদের পরজীবি হিসাবে আক্রান্ত করে খুব খারাপ ধরনের একটি টিক, যারা একটি ভয়ঙ্কর রোগ বহন করে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে এই সব টিকগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরিয়ে ফেলা উচিৎ। সাধারণত কোনো একটি একক পাখি নিজেই তার টিককে সরিয়ে ফেলে নিজের পালক পরিষ্কার রাখার সময়। কিন্তু একটি জায়গা– মাথার ঠিক উপরের অংশ– সে নিজের ঠোঁট দিয়ে পরিষ্কারের কাজটি করতে পারেনা। এই সমস্যার একটি সমাধান কি হতে পারে সেটি যে কোনো মানুষ সাথে সাথেই চিন্তা করতে পারবে। কোনো একজন হয়তো তার নিজের মাথা ছুতে পারেন না, এবং কোনো একজন বন্ধুর সাহায্য নিয়ে কাজটি করার মত সহজতর আর কোনো সমাধান নেই। পরবর্তীতে, যখন সেই বন্ধুটির নিজেই টিক দ্বারা আক্রান্ত হবে, তার সেই ভালো কাজটির প্রতিদান দেয়া যেতে পারে। পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে পারস্পরিক ‘গ্রুমিং’ বা পারস্পরিক পরিষ্কার আর পরিচর্যা করে রাখার আচরণটি বাস্তবিকভাবে খুবই দৃশ্যমান একটি আচরণ।
বিষয়টি খুব দ্রুত সজ্ঞালদ্ধ জ্ঞানেই বোধগম্য মনে হয়। যে কেউই যার সচেতন ভবিষ্যৎ দৃষ্টি আছে সে দেখতে পারে যে একটি পারস্পরিক ‘পিঠ চুলকে দেবার’ বা সহায়তার একটি সম্পর্কে প্রবেশ করা বুদ্ধিমানের মত কাজ হবে। কিন্তু আমরা শিখেছি সতর্ক হতে, আপাতদৃষ্টিতে সহজাতভাবে যা অর্থময় মনে হতে পারে। কারণ জিনের কোনো দুরদৃষ্টি নেই। তাহলে কি স্বার্থপর জিনের তত্ত্বটি পারবে এই পারস্পরিক ‘পিঠ চুলকে’ দেবার সম্পর্কটির বা যাকে বলা যেতে পারে ‘পরস্পরমুখী পরার্থবাদীতার’ (রেসিপ্রোকাল অ্যালট্রইজম) ব্যাখ্যা দিতে, যেখানে কোনো উপকার আর সেটির প্রতিদান পাবার ক্ষেত্রে বিলম্ব হয়? উইলিয়ামস তার ১৯৬৬ সালে বইটিতে এই বিষয়টি সংক্ষিপ্তভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, যার কথা আমি ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি। তার উপসংহার ছিল, যেমন ছিল ডারউইনেরও, বিলম্বে ঘটা পরস্পরমুখী পরার্থবাদিতা কোনো একটি প্রজাতির মধ্যে বিবর্তিত হতে পারে, যে প্রজাতির সদস্যরা একে অপরকে পৃথক সদস্য হিসাবে চিনতে এবং মনে রাখতে পারে। ট্রিভার্স, ১৯৭১ সালে বিষয়টির আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন, যখন তিনি লিখেছিলেন, তার কাছে তখনও মেনার্ড স্মিথের বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল কৌশল বা ‘ইএসএস’ এর ধারণাটি ছিল না। যদি সেটি তার জানা থাকতো, আমার ধারণা তিনি তার সদ্ব্যবহার করতেন। কারণ এটি তাকে তার ধারণাগুলো প্রকাশ করার জন্য একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক উপায় নিশ্চিৎ করতো। তার প্রিজনার’স ডাইলেমা’র প্রতি তথ্যনির্দেশ- গেম তত্ত্বের একটি প্রিয় ধাঁধা– প্রদর্শন করছে তিনি ইতিমধ্যে সেভাবেই ভাবতে শুরু করেছিলেন।
ধরুন, ‘খ’ এর মাথার উপর একটি পরজীবি আছে, ‘ক’ সেটি তার মাথা থেকে খুটে তুলে ফেলে। পরে যখন সময় আসবে, ‘ক’ এর নিজের মাথার উপরেই একটি পরজীবি থাকে, খুব স্বাভাবিকভাবে সে ‘খ’ কে খুঁজে বের করে যেন ‘খ’, তার মাথার উপর থেকে পরজীবিটি খুটে ফেলে দিয়ে তার পূর্বে করা সেই উপকারটির প্রতিদান দেয়। দেখা গেল, ‘খ’ তার এই আহবানে কোনো কর্ণপাত না করে নাক ঘুরিয়ে অন্য দিকে চলে গেল। ‘খ’ এখানে একজন প্রতারক, একজন সদস্য যে অন্য একজন সদস্যদের উপকারের সুযোগ ঠিকই গ্রহন করে কিন্তু সে এর প্রতিদান দেয়না বা সে এর প্রতিদান যতটুকু দেয়া উচিৎ ছিল, তা দেয়না। প্রতারকরা স্বভাবতই নির্বিচারে অন্যের উপকার করে যাওয়া পরার্থবাদীদের তুলনায় ভালো করে কারণ তারা কোনো মূল্য পরিশোধ ছাড়াই সুবিধা ভোগ করে। নিশ্চিৎ হবার জন্য, অন্য একজন সদস্যর মাথা পরিষ্কার করার মূল্য মনে হতে পারে খুব সামান্য, যদি ক্ষতিকর পরজীবিকে সরিয়ে দেবার ফলে প্রাপ্ত সুবিধার কথা বিবেচনা করা হয়, কিন্তু এটি একেবারে উপেক্ষা করার মত সামান্য নয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ও সময় এর পিছনে ব্যয় করতে হয়।
ধরা যাক সেই জনগোষ্ঠী এমন সদস্যদের দিয়ে তৈরী যারা দুটি কৌশলের যেকোনো একটিকে বেছে নেয়। মেনার্ড স্মিথের বিশ্লেষণের মত, আমরা কোনো “সচেতন’ কৌশলের কথা ভাবছি না, কিন্তু ভাবছি অবচেতন মনে প্রোগ্রাম করা আচরণের কথা, যার মূল রচয়িতা হচ্ছে ‘জিন’। এই দুটো কৌশলের নাম দেয়া যাক, ‘সাকার’ এবং ‘চিট’। সাকাররা’ যে-কারো মাথা থেকে পরজীবি বেছে দেয় যাদের সেটি প্রয়োজন আছে, নির্বিচারে। “চিটরা’ উপকার গ্রহন করে ‘সাকারদের কাছ থেকে, কিন্তু তারা কখনো অন্য কারো মাথা থেকে পরজীবি বেছে দেয়না। এমনকি সেই সদস্যকেও সে প্রতিদানে কোনো উপকার করেনা, যে এর আগেই তাদের মাথা থেকে পরজীবি বেছে দিয়েছিল। “হক’ এবং “ডাভদের ক্ষেত্রে যেমন ঘটেছিল, আমরা মনগড়া একটি উপায়ে তাদের জন্য উপকারের বিনিময় মূল্য পয়েন্টের মাধ্যমে চিহ্নিত করি। তাদের সঠিক মূল্যমান কি, কোনো কিছু যায় আসে না, যতক্ষণ নিজের মাথা থেকে কারো পোকা বেছে পরিষ্কার করে দেবার কাজটির উপকারিতা, অন্য কারো মাথা থেকে পরজীবি পরিষ্কার করার কাজ থেকে প্রাপ্ত সুবিধার চেয়ে বেশী হবে। যদি পরজীবিদের প্রকোপ অনেক বেশী থাকে, কোনো ‘সাকার’ সাকারদের জনগোষ্ঠীতে মনে করতে পারে সে যতবার অন্য কারো মাথা থেকে পরজীবি সরাবে, সে নিজেও এই ধরনের সুযোগ পাবে অন্য সাকারদের কাছ থেকে। সে কারণে গড়পড়তাভাবে কোনো একটি সাকার জনগোষ্ঠীতে উপকারের বিনিময় মূল্য ধনাত্মক। সেখানে তারা সবাই বেশ ভালোই করে বাস্তবিকভাবে এবং “সাকার’ শব্দটিও প্রযোজ্য নয় বলেই মনে হয়। কিন্তু এখন মনে করুন একটি ‘চিট’ বা প্রতারকের জন্ম হলো সেই জনগোষ্ঠীতে। এবং একা ‘চিট’ হবার সুবাদে সে আশা করতে পারে সবাই তার মাথা থেকে পরজীবি সরিয়ে দেবে, কিন্তু বিনিময়ে সে কাউকে সেই উপকারটির প্রতিদান দেয় না। তার গড়পড়তা লাভ কোনো একজন ‘সাকারের’ গড়পড়তা লাভের চেয়ে বেশী। ‘চিটদের’ জিন একারণে জনগোষ্ঠীতে বিস্তার লাভ করবে। ‘সাকারদের’ জিন খুব দ্রুত বিলুপ্তির পথে হারিয়ে যাবে। এর কারণ জনগোষ্ঠীতে যে অনুপাতই থাকুক না কেন, “চিটরা সবসময়ই সাকারদের চেয়ে ভালো করবে। যেমন, এমন এক পরিস্থিতির কথা ভাবুন যখন জনগোষ্ঠীতে মোট ৫০ শতাংশ ‘সাকার’ আর ৫০ শতাংশ ‘চিট’ থাকে। গড় লাভ, সাকার এবং চিট উভয়েরই কম হবে, যে-কোনো সদস্যের জন্যে, যারা ১০০ শতাংশ ‘সাকার’ সম্বলিত জনগোষ্ঠীর সদস্য। কিন্তু তারপরও চিটরা বেশী ভালো করবে সাকারদের তুলনায় কারণ তারা সব সুবিধাই পাচ্ছে– যেমন আসলে তারা– এবং কোনো প্রতিদান না দিয়ে। যখন ‘চিটদের’ অংশ জনগোষ্ঠীর মোট ৯০ শতাংশ হবে, তখন সব সদস্যের গড়পড়তা লাভ খুব কম হবে: এই দুটি প্রকারের বহু সদস্যই এখন মারা যাবে টিকদের (একটি পরজীবি) বহন করে আনা সংক্রামক ব্যাধির আক্রমণে। কিন্তু তখনও ‘সাকারদের চেয়ে ‘চিটা’ ভালো করে। এমনকি যদি পুরো জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যদি কমে যেতে থাকে বিলুপ্তির দিকে, তাহলেও এমন কোনো সময় আসবে না, যেখানে ‘সাকাররা’ ‘চিটদের চেয়ে ভালো করবে। সুতরাং, আমরা যতক্ষণ এই দুটি কৌশলকে শুধুমাত্র বিবেচনা করি, কোনো কিছুই সাকারদের বিলুপ্তিকে থামাতে পারেনা এবং খুব সম্ভবত, পুরো জনগোষ্ঠীর বিলুপ্তিও।
