পারস্পরিক উপকার করার এই সম্পর্ক, যা ঘটে ভিন্ন প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে সেটি পরিচিত মিউচালিজম অথবা সিমবায়োসিস বা মিথোজীবিতা হিসাবে। বিভিন্ন প্রজাতির সদস্যরা প্রায়শই অনেক কিছু পরস্পরকে নিবেদন করে, তারা এই অংশীদারিত্বের সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন দক্ষতার যোগান দেয়। এই ধরনের মৌলিক অপ্রতিসাম্যতা পারস্পরিক সহযোগিতার বিবর্তনীয় ভাবে স্থিতিশীল একটি কৌশল সৃষ্টির পথ সুগম করে। উদ্ভিদের রস খাওয়ার জন্য এফিডদের সঠিক মুখোপাঙ্গ থাকে, কিন্তু এই ধরনের শুষে খাবার উপযোগী মুখোপাঙ্গ আত্মরক্ষার জন্য উপযোগী নয়। উদ্ভিদের রস শুষে খাবার জন্য পিপড়ারা খুব একটা দক্ষ না, কিন্তু তারা খুব ভালো যুদ্ধ করতে পারে। এফিডদের প্রতিপালন ও তাদের রক্ষা করার পিপড়ার জিনটির সংখ্যা পিপড়ার জিনপুলে বিশেষ সুবিধা পারেন। পিপড়াদের সাথে সহযোগিতা করার এফিডদের জিন বিশেষভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত হয় এফিডদের জিনপুলে।
পারস্পরিক আদান প্রদানের এই মিথোজীবি সম্পর্কগুলো প্রাণী এবং উদ্ভিদের জগতে প্রায়শই দেখা যায়। একটি লাইকেন আপাতদৃষ্টিতে যেকোনো একটি বৃক্ষের উপরের পৃষ্ঠে বসবাস করে, কিন্তু তারা আসলে একটি ছত্রাক ও সবুজ শৈবালের খুবই ঘনিষ্ঠ মিথোজীবি একটি সম্পর্ক। এই অংশীদারিত্বের কোনো অংশই এককভাবে। টিকতে পারেনা, তাদের পারস্পরিক সহায়তার প্রয়োজন হয়। যদি তাদের এই সম্মিলন আরো খানিকটা অন্তরঙ্গ হয় আমরা তাহলে হয়তো আর বলতে পারবো না যে একটি লাইকেন হচ্ছে দুটি জীবের একটি মিশ্রণ। হয়তো এরকম আরো দুটি বা বহু জীবের সংমিশ্রণ অছে যাদের আমরা এখনও সেভাবে শনাক্ত করতে পারিনি। হয়তো এমনকি আমরাও?
আমাদের প্রত্যেকের শরীরে প্রতিটি কোষের মধ্যে অসংখ্য ক্ষুদ্র অঙ্গাণু থাকে, যাদের ‘মাইটোকন্ড্রিয়া’ বলা হয়। মাইটোকন্ড্রিয়ারা হচ্ছে রাসায়নিক কারখানা, আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তির বেশীর ভাগ অংশের যোগান দেবার দ্বায়িত্ব তারা পালন করে থাকে। কোনোভাবে যদি আমরা আমাদের মাইটোকন্ড্রিয়াদের হারাই তাহলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমরা মারা যাবো। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তিগ্রাহ্যভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, মাইটোকন্ড্রিয়া হচ্ছে, এর উৎসে, মূলত মিথোজীবি ব্যাকটেরিয়া, যারা আমাদের কোষের সাথে জোড় বেধেছিল বিবর্তনের প্রায় শুরুর দিকে। একই ধরনের প্রস্তাব করা হয়েছে আমাদের কোষের ভিতরের থাকা অন্যান্য অঙ্গাণুদের ক্ষেত্রেও। এবং এটি সেই সব বৈপ্লবিক ধারণার একটি যার প্রতি অভ্যস্ত হবার জন্য সময়ের প্রয়োজন, কিন্তু এটি হচ্ছে এমন একটি ধারণা যার প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পাবার সময় হয়েছে। আমি ধারণা করছি যে, আমরা আরো অনেক বেশী বৈপ্লবিক ধারণা, যেমন, আমাদের প্রত্যেকটি জিন আসলে স্বতন্ত্র মিথোজীবি ইউনিট– একসময় গ্রহন করতে পারবো। আমরা হচ্ছি মিথোজীবি জিনদের একটি দানবাকৃতির একটি কলোনী। আমরা আসলেই এই ধারণার সপক্ষে কোনো প্রমাণের কথা বলতে পারিনা, কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি। প্রস্তাব করতে এর আগের অধ্যায়গুলোতে, এটি আসলেই সেই প্রক্রিয়াটির অন্তর্গত, যৌন প্রজননের মাধ্যমে প্রজনন করা প্রজাতির সাথে জিন কিভাবে কাজ করে, যেভাবে সেটি আমরা ভাবি। এই মুদ্রার অন্য পিঠ, ভাইরাসরা হতে পারে জিন, যারা এই ধরনের কলোনী, যেমন, আমরা, থেকে নিজেদের মুক্ত করেছে। ভাইরাসরা মূলত তৈরী বিশুদ্ধ ডিএনএ (বা সমগোত্রীয় স্ব-অনুলিপনকারী অণু) যাদের ঘিরে থাকে একটি প্রোটিনের আচ্ছাদন। তারা সবাই মূলত পরজীবি। প্রস্তাবটি হচ্ছে তারা সবাই বিবর্তিত হয়েছে তথাকথিত বিদ্রোহী জিনগুলো থেকে যারা কলোনী থেকে পলায়ন করেছে এবং এখন এক শরীর থেকে অন্য শরীরে যাতায়াত করে সরাসরি বাতাসের মধ্য দিয়ে, বরং সেই প্রথাগত উপায়, শুক্রাণু এবং ডিম্বাণু দ্বারা শরীর থেকে শরীরে হস্তান্তর হবার প্রক্রিয়াটির বদলে। যদি এটি সত্যি হয়, আমরা হয়তো আমাদের গন্য করতে পারি আসলে ভাইরাসদের একটি কলোনী হিসাবে! যাদের কিছু অংশ মিথোজীবি হিসাবে পরস্পরের সহযোগিতা করে, শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর মাধ্যমে এক শরীর থেক অন্য শরীরে তারা যাতায়াত করে। এরাই হচ্ছে প্রথাগত ‘জিন। অন্যরা টিকে থাকে পরজীবি হিসাবে। এবং তারা যাতায়াত করে তাদের পক্ষে সম্ভব যেকোন উপায়ে। যদি পরজীবি ডিএনএ ভ্রমণ করে শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর মাধ্যমে, এটি হয়তো তৈরী করে সেই ‘ধাঁধার মত বাড়তি ডিএনএ, যা আমি এর আগে উল্লেখ করেছিলাম অধ্যায় ৩ এ। আর যদি এটি বাতাসের মাধ্যমে বা অন্য কোনো সরাসরি উপায়ে যাতায়াত করে, এটিকে সাধারণ অর্থে ‘ভাইরাস’ বলা হয়।
কিন্তু এই সব ধারণাগুলো ভবিষ্যতের জন্য। বর্তমানে আমরা অনেক উচ্চ পর্যায়ের সম্পর্কের মিথথাজীবিতা নিয়ে ব্যস্ত, যা ঘটে বহুকোষী প্রাণীদের মধ্যে, তাদের নিজেদের শরীরের অভ্যন্তরে যেটি ঘটে সেটি না। ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ককে বোঝাতে ‘মিথোজীবি’ শব্দটি সাধারণত ব্যবহার করা হয়, কিন্তু, যেহেতু আমরা প্রজাতির জন্য যা কিছু ভালো’ বিবর্তনের এমন দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিহার করতে শিখেছি, আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে বিভিন্ন প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে সহযোগিতাকে একই প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে সহযোগিতা থেকে পৃথক করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। সাধারণভাবে, পারস্পরিক সহযোগিতার এই সম্পর্ক বিবর্তিত হয় যদি প্রতিটি অংশীদার যতটুকু সেই সম্পর্কে বিনিয়োগ করছে তারচেয়ে বেশী উপকার পায়। এবং এটা সত্যি যখন আমরা হায়েনাদের একটি দলের সদস্যদের কথা বলছি বা অনেক বেশী ভিন্ন কোনো জীব প্রজাতির মধ্যে সম্পর্কের কথা বলছি যেমন, পিপড়া এবং এফিডরা বা মৌমাছি আর ফুলরা। কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সত্যিকারের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার সম্পর্ক থেকে একপাক্ষিক স্বার্থপর সুবিধাজনক সম্পর্কের উদাহরণগুলো আলাদা করা বেশ কঠিন হতে পারে।
