এই তত্ত্বটির অসাধারণ কাঠামোর আরো অদ্ভুত একটি বিষয় হচ্ছে সেই বাস্তব সত্যটি যে, কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে তরুণ রানিরা তাদের প্রজননের জন্য ওড়ার সময় একজনের পরিবর্তে বেশ কয়েকজন পুরুষের সাথে মিলিত হয়। এর মানে হচ্ছে যে তার কন্যাদের মধ্যে গড় আত্মীয়তার পরিমান ৩/৪ এর কম এবং চরম কোনো পরিস্থিতিতে এটি এমনকি ১/৪ এর কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে। সেকারণে লোভনীয় যে, যদিও সম্ভবত খুব বেশী যৌক্তিক নয়, এটিকে কর্মীদের উপর রানিদের ধূর্ত কোনো আক্রমণ হিসাবে গণ্য করা! ঘটনাচক্রে, এটি হয়তো এমন কোনো প্রস্তাব করছে বলে মনে হতে পারে কর্মীদের কোনো রানীকে তার প্রজননের জন্য ওড়ার সময় চোখে চোখে রাখার দরকার আছে, যেন তাকে একাধিকবার প্রজনন করা থেকে বিরত রাখা যায়। কিন্তু সেটি কর্মীদের নিজের জিনের জন্য কোনো উপকারে আসবে না– শুধুমাত্র আগামী প্রজন্মের কর্মীদের জিন ছাড়া। শ্ৰেণী হিসাবে কর্মীদের মধ্যে কোনো ট্রেড ইউনিয়ন স্পিরিট’ নেই। তাদের প্রত্যেকেই তাদের নিজেদের জিনের কথা ছাড়া আর কিছু ‘ভাবে না। কোনো একটি কর্মী হয়তো পছন্দ করতো তার নিজেদের মাকে চোখে চোখে রাখতে, কিন্তু তার সেই সুযোগ থাকে না, কারণ তার সেই সময় জন্ম না হবার কারণে। তার ‘মেটিং ফ্লাইটে একটি তরুণ রানি হচ্ছে বর্তমান প্রজন্মের কর্মীদের বোন, তাদের মা নয়। সুতরাং পরবর্তী প্রজন্মের কর্মীদের চেয়ে বরং তারা তার পক্ষেই থাকে, যারা শুধুমাত্র তাদের ভাইঝি হবে। আমার মাথা এখন ঘুরছে, এই প্রসঙ্গটির ইতি টানার উপযুক্ত সময় এটি।
হাইমেনোপটেরান কর্মীরা তাদের ‘মা’দের সাথে করে থাকে সেটিকে আমি একটি খামারের সাথে তুলনা করেছিলাম। যে খামারটি হচ্ছে জিনের খামার। নিজেরা যতটুকু করতে পারতো তারচেয়ে আরো বেশী দক্ষতার সাথে তারা তাদের মাকে তাদের। নিজেদের জিনের অনুলিপি উৎপাদন করার জন্য ব্যবহার করে। জিনগুলো প্রজননক্ষম সদস্য হিসাবে প্রোডাকশন লাইন থেকে বের। হয়ে আসে। এই খামারের তুলনামূলক উদাহরণের সাথে কোনো সংশয় থাকার উচিৎ না যে সামাজিক কীটপতঙ্গদের প্রসঙ্গে যা ‘চাষ’ বলা হচ্ছে সেটির অর্থটি খুব ভিন্ন। সামাজিক কীটপতঙ্গরা আবিষ্কার করেছিল, যা মানুষ করেছিল বহুদিন পর, কোন একটি জায়গায় স্থিতিশীল হয়ে খাদ্য ‘চাষ’ করা, ‘শিকার কিংবা খাদ্য-সংগ্রহ করার চেয়ে অনেক বেশী দক্ষ একটি উপায় হতে পারে।
যেমন, নিউ ওয়ার্ল্ডে (উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা) বেশ কিছু প্রজাতির পিপড়া এবং পুরোপুরি স্বতন্ত্রভাবে আফ্রিকার টারমাইটরা। (উইপোকা) “ফাঙ্গাস বা ছত্রাকের বাগান চাষ করার কৌশল বিবর্তিত করেছিল। এই ক্ষেত্রে দক্ষিণ-আমেরিকার ‘প্যারাসল’ পিপড়ারা সবচেয়ে সুপরিচিত। তারা ভীষণভাবে সফল একটি প্রজাতি। তাদের একটি কলোনীতে দুই মিলিয়নেরও বেশী সদস্য খুঁজে পাওয়া গেছে। তাদের নীড়গুলো মাটির নিচে, প্রায় ১০ ফুট কিংবা আরো গভীরে বিস্তৃত জটিল সুড়ঙ্গপথ আর খোলা জায়গার একটি আন্তসংযোগকৃত সুবিশাল একটি জালের মত ছড়িয়ে থাকে। যা তৈরী করতে তাদের প্রায় ৪০ টন পরিমান মাটি খুড়তে হয়েছে। মাটির নীচের কিছু কক্ষে থাকে ছত্রাকের বাগান। পিপড়ারা পরিকল্পিত উপায়ে একটি বিশেষ প্রজাতির ছত্রাক রোপন করে বিশেষায়িত একটি কম্পোষ্ট বিছানো মাটিতে যা তারা নিজেরা তৈরী করে পাতা চিবিয়ে নরম টুকরো টুকরো করে। সরাসরি নিজেদের খাদ্য সন্ধান করে সংগ্রহ করার বদলে, এই প্রজাতির পিপড়ারা কেবল পাতা সংগ্রহ করে কম্পোষ্ট তৈরী করার জন্য। পাতার জন্য প্যারাসল পিপড়াদের পুরো কলোনীর ক্ষুধা দানবসদৃশ। এটাই তাদের চিহ্নিত করেছে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর একটি পতঙ্গ বা পেস্ট হিসাবে। কিন্তু পাতাগুলো তাদের খাদ্য নয় বরং তাদের চাষ করা ছত্রাকের জন্য খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীতে পিপড়ারা এখানে ছত্রাকের চাষ করে এবং ছত্রাক খায় এবং তাদের সন্তানদের খাদ্য হিসাবে খাওয়ায়। পাতার উপাদানগুলো ভাঙ্গার জন্য পিপড়াদের পাকস্থলী থেকে এই ছত্রাকগুলো আরো অনেক বেশী দক্ষ, আর এভাবেই পিপড়ারা সুবিধাপ্রাপ্ত হয় এই বন্দোবস্ত থেকে। সম্ভবনা আছে যে ছত্রাক প্রজাতিটিও লাভবান হয়, যদিও তাদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে: কারণ, তাদের নিজেদের স্পোর বিস্তার করে প্রজননের প্রক্রিয়া যা অর্জন করতে পারতো, এই পিপড়ারা তার চেয়ে আরো দক্ষভাবে তাদের বংশবিস্তারে সহায়তা করে। উপরন্তু, পিপড়ারা তাদের ছত্রাক বাগানের আগাছা পরিষ্কার করে, অন্যান্য ছত্রাক প্রজাতিদের সেখানে বংশবিস্তার করার সুযোগ দেয় হয়না। প্রতিদ্বন্দ্বিতা সরিয়ে দেবার কারণে এটি হয়তো তাদের ‘গৃহপালিত’ ছত্রাকের বংশবৃদ্ধিতে বাড়তি সহায়তা করে। পিপড়া এবং ছত্রাক প্রজাতির মধ্যে বিদ্যমান একধরনের পারস্পরিক পরার্থবাদীতার সম্পর্ক আছে তাই বলা যেতে পারে। বিস্ময়কর একটি ব্যাপার হচ্ছে, প্রায় একই ধরনেরই একটি ছত্রাক চাষাবাদের পদ্ধতি বিবর্তিত হয়েছিল স্বতন্ত্রভাবে, পুরোপুরিভাবে ভিন্ন এক প্রজাতি, টারমাইটদের মধ্যে।
পিপড়াদের নিজস্ব ‘গৃহপালিত প্রাণীও আছে, “গৃহপালিত’ ফসল (ছত্রাক) যেমন থাকে। এফিড– গ্রিনফ্লাই এবং সদৃশ কিছু পোকা—অত্যন্ত বিশেষায়িত কোনো উদ্ভিদের রস শুষে খাওয়ার জন্য। তারা যতটা দক্ষভাবে উদ্ভিদের রসনালী থেকে রস শুষে নিতে পারে তত দক্ষতার সাথে এর পরে সেটি তারা পরিপাক করতে পারে না। ফলাফলে তারা একটি তরল নিঃসরণ করে যার থেকে খুব সামান্যই পুষ্টিগুণ শোষিত হয়েছে। শর্করা সমৃদ্ধ এই ‘হানিডিউ’ ফোঁটা এফিডদের শরীরের পেছন থেকে অত্যন্ত দ্রুত হারে বের হতে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতি ঘন্টায় পতঙ্গটির নিজের শরীরের ওজনের চেয়ে বেশী। হানিডিউ সাধারণত বৃষ্টির মত মাটিতে ঝরে পড়ে– এটি হয়তো সেই স্বর্গীয় খাদ্য হতে পারে, ওল্ড টেস্টামেন্ট এ যাকে বলা হয়েছে ‘মান্না। কিন্তু বেশ কিছু প্রজাতির পিপড়া এই প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে যেই মুহূর্তে সেটি এফিডের পেছন থেকে বের হয়ে আসে। পিপড়ারা এফিডের শরীর থেকে দুধ দোয়ানোর মত করে রস বের করে আনে এফিডদের শরীরের পেছনে ফিলার আর পা দিয়ে টোকা দিয়ে। এফিড তাদের এই আহবানের সাড়া দেয়, কিছু ক্ষেত্রে এমনকি তাদের সেই হানিডিউর ফোঁটা আটকে রাখে যতক্ষণ না পর্যন্ত পিপড়া তাদের পিছনে টোকা না দেয় বা এমনকি সেই ফোঁটাটি আবার সরিয়ে নেয় শরীরের ভেতরে যদি না পিপড়াটি সেটি গ্রহন করার জন্য প্রস্তুত না থাকে। প্রস্তাব করা হয়েছে যে, কিছু এফিড তাদের পেছনের অংশ এমনভাবে বিবর্তিত করেছে যে দেখতে এবং অনুভব করতে পিপড়ার মুখের মত মনে হয়, পিপড়াদের আরো ভালো করে আকর্ষণ করার জন্য। এফিডরা এই সম্পর্ক থেকে যা অর্জন করে সেটি হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে তারা তাদের প্রাকৃতিক শত্রুর হাত থেকে সুরক্ষা পায়। আমাদের গবাদী পশুদের মত তারাও একটি সুরক্ষিত জীবন কাটায়। যে সকল এফিড প্রজাতিদের বিশেষভাবে প্রতিপালন করে পিপড়ারা, এবং তারা তাদের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিপড়া এমনকি এফিডদের ডিমও দেখাশোনা করে মাটির নিচে তাদের ঘরে, বাচ্চা এফিডদের তারা খাওয়ায় এবং অবশেষে যখন তারা পুর্ণবয়ষ্ক হয়, সুরক্ষিত কোনো গাছের কাণ্ডে রস শুষে খাবার জন্য তাদেরকে সাবধানে সেখানে তুলে নিয়ে যায়, অনেকটা চরে বেড়াবার জন্য তার চারণ ভূমিতে।
