শ্রমিকদের কামিকাজি বা আত্মঘাতী আচরণ এবং অন্যান্য ধরনের পরার্থবাদীতা ও সহযোগিতা আদৌ বিস্ময়কর না, যদি আমরা একবার স্বীকার করে নেই যে তারা নীর্বিজ বা প্রজনন অক্ষম। জিনের টিকে থাকার বিষয়টি নিশ্চিৎ করতে কোনো একটি সাধারণ প্রাণীর শরীর উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিচালিত হতে পারে দুটি উপায়ে, সেটা হতে পারে সন্তানের জন্ম দিয়ে কিংবা অন্য একজন সদস্যদের দেখাশোনা করা মাধ্যমে, যারা কিনা একই জিন বহন করে। অন্য সদস্যদের দেখাশোনা করার স্বার্থে আত্মহত্যা করা কারো নিজের সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আত্মঘাতী আত্মবিসর্জন সেকারণে কদাচিৎ বিবর্তিত হয়। কিন্তু কোনো একটি শ্রমিক মৌমাছি তার নিজের কোনো সন্তান উৎপাদন করেনা, তার সব প্রচেষ্টা নিজের সন্তান নয় বরং অন্যান্য আত্মীয়দের দেখাশোনা করার মাধ্যমে তার জিনের সূরক্ষা করার জন্য নির্দেশিত। প্রজনন অক্ষম একটি মৌমাছির মৃত্যু এর জিনের জন্য হেমন্তের সময় পাতার ঝরে গেলে গাছের জিনের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ নয়।
সামাজিক কীটপতঙ্গদের আচরণের উপর আধ্যাত্মিক দুর্বোধ্যতার প্রলেপ লাগাবার একটি প্রলোভন আছে, কিন্তু আসলেই তার কোনো প্রয়োজন নেই। একটু বিস্তারিতভাবে দেখার প্রয়োজন আছে কিভাবে স্বার্থপর জিন তত্ত্ব এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করে, এবং বিশেষ করে, কিভাবে এটি কর্মীদের প্রজনন অক্ষমতার অসাধারণ প্রপঞ্চটির বিবর্তনীয় উৎসটি ব্যাখ্যা করে, যেখান থেকে আরো অনেক কিছুই আপাতদৃষ্টিতে আমরা অনুসরিত হতে দেখি।
সামাজিক পতঙ্গদের কোনো কলোনী হচ্ছে একটি বিশাল পরিবার, সাধারণত সবাই একই মায়ের সন্তান। কর্মীরা, যারা কদাচিৎ বা কখনোই নিজেরা প্রজনন করে না, তারা শ্রেণীবিন্যস্ত কিছু সংখ্যক সুস্পষ্ট শেণীতে, যেমন, ক্ষুদ্র কর্মী, বৃহদাকার কর্মী, সৈন্য এবং অতিমাত্রায় বিশেষায়িত শ্রেণী যেমন, হানি-পট সসদ্য। প্রজননক্ষম স্ত্রী সদস্যদের বলা হয় “কুইন’ বা রানি। প্রজনন-সক্ষম পুরুষদের কখনো কখনো বলা হয় ‘ড্রোন’ অথবা ‘কিং”। এবং আরো অগ্রসর। সমাজে, প্রজননক্ষমরা প্রজনন ছাড়া কখনোই আর কলোনির জন্য অন্য কোনো কাজ করেনা, তবে এই একটি কাজে তারা অত্যন্ত দক্ষ। তারা কলোনীর কর্মীদের উপর নির্ভর করে তাদের খাদ্য আর সুরক্ষার জন্য এবং কর্মীদের দ্বায়িত্ব হচ্ছে গ্রুপের সব সন্তানদের দেখাশুনা করা। কিছু পিপড়া আর উইপোকার প্রজাতির মধ্যে রানিরা স্ফীতকায় বিশালাকার ডিমের কারখানার মত একটি রুপ নেয়, খুবই কঠিন তখন একে পতঙ্গ হিসাবে শনাক্ত করা, শতগুণ বেশী আকারের বড় যেকোনো কর্মীর চেয়ে, রানি তার আকারের জন্য নড়াচড়া করতে প্রায় অক্ষম। রানীকে সারাক্ষণই দেখাশোনা করছে। কর্মীরা, তাকে খাওয়াচ্ছে, তার নিরন্তরভাবে প্রসব করা ডিমগুলো তারা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের যৌথ সামাজিক নার্সারীতে। যদি এমন একটি দানবাকৃতির রাণীকে কখনো তার রাজকীয় কক্ষ থেকে স্থানান্তরিত করতে হয়, তাকে সেই সেই বিশাল কর্মী বাহিনীরা ঘাড়ে করে তার জায়গা পরিবর্তন করতে সাহায্য করে।
অধ্যায় ৭ এ আমি সন্তান ধারণ আর প্রতিপালনের মধ্যে পার্থক্যের বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলাম। আমি বলেছিলাম যে, মিশ্র কৌশলগুলো, প্রতিপালন এবং সন্তান ধারণে মিশ্রণ, খুব সাধারণভাবেই বিবর্তিত হবে। অধ্যায় ৫ এ আমরা দেখেছি মিশ্র বিবর্তনীভাবে স্থিতিশীল কৌশল দুটি সাধারণ ধরনের হতে পারে। কোনো জনগোষ্ঠীতে হয় প্রতিটি সদস্য একটি মিশ্র উপায়ে আচরণ করবে: এভাবে সদস্যরা সাধারণত সন্তান ধারণ ও প্রতিপালনের একটি বিচক্ষণ মিশ্রণ অর্জন করে; অথবা, জনগোষ্ঠী হয়তো দুটি ভিন্ন ধরনের সদস্যে বিভাজিত হতে পারে। এবং এভাবেই আমরা প্রথম সেই দৃশ্য দেখেছিলাম হক এবং ডাভদের মধ্যে একটি ভারসাম্যময় পরিস্থিতিতে। তবে এটি তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব সন্তান ধারণ এবং প্রতিপালনের মধ্যে বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল একটি ভারসাম্য অর্জন করা যেতে পারে পরবর্তী ধরনের উপায়ে: জনগোষ্ঠীকে সন্তান ‘ধারক’ এবং প্রতিপালকে ভাগ করা যেতে পারে। কিন্তু এটি বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল হবে শুধুমাত্র যদি প্রতিপালকরা সেই সব সদস্যদের নিকটাত্মীয় হয় যাদের তারা প্রতিপালন করে, অন্ততপক্ষে এই আত্মীয়তা সেই পরিমান নিকটবর্তী হয়, যেমন তাদের যদি কোনো সন্তান থাকে, তাদের সাথে যে পরিমান নিকটবর্তী সম্পর্ক হতো। যদিও এটি তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব বিবর্তনের জন্য এই পথে অগ্রসর হওয়া, কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে শুধুমাত্র সামাজিক কীটপতঙ্গের ক্ষেত্রেই এটি আসলেই ঘটে (১)।
সামাজিক পতঙ্গদের গ্রুপে সদস্যরা দুটি প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত, সন্তান উৎপাদনকারী এবং প্রতিপালনকারী। উৎপাদনকারীরা হচ্ছে। প্রজননক্ষম পুরুষ এবং স্ত্রী সদস্যরা। প্রতিপালকরা হচ্ছে কর্মীরা– অনুর্বর পুরুষ এবং স্ত্রী সদস্যরা যেমন, উইপোকাদের ক্ষেত্রে, অনুর্বর স্ত্রী সদস্যরা অন্য সব সামাজিক কীটপতঙ্গের ক্ষেত্রে। উভয় ধরনের সদস্যরা তাদের কাজ অনেক বেশী দক্ষতার সাথে করে কারণ তাদের পরস্পরের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয় না। কিন্তু কার দৃষ্টিভঙ্গিতে এই প্রক্রিয়াটি দক্ষ? যে প্রশ্নটি ডারউইনীয় তত্ত্বের দিকে ছুঁড়ে দেয়া হয়, সেই খুব পরিচিত একটি চিৎকার: এখানে কর্মীদের কি লাভ থাকতে পারে?
