কিছু মানুষ এর উত্তর দিয়েছে, কোনো কিছু না। তারা অনুভব করেন যে, রানি তাদের নিজের ইচ্ছামতই সব কিছু পাচ্ছে, সে তার কর্মী বাহিনীকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ব্যবহার করছে রাসায়নিক অণুর সাহায্য নিয়ে, তারা কর্মীদের বাধ্য করে তার অসংখ্য সন্তানের প্রতিপালন করতে। এটাই আলেকজান্ডারের প্যারেন্টাল ম্যানিপুলেশন’ এর একটি সংস্করণ, যে তত্ত্বটির সাথে আমরা পরিচিত হয়েছি অধ্যায় ৮ এ। বিপরীত ধারণাটি হচ্ছে যে কর্মীরা আসলে প্রজননকারীদের চাষ করে, কর্মীরা তাদেরকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করে তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্যে, কর্মীদের জিনের অনুলিপি প্রজন্মান্তরে হস্তান্তর করার জন্য। নিশ্চিৎ বিষয়টি হচ্ছে সারভাইভাল মেশিনগুলো, যা রানিরা জন্ম দেয় তারা কর্মীদের সন্তান নয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা নিকটাত্মীয়। হ্যামিলটনই প্রথম অসাধারণ দক্ষতায় অনুধাবন করেছিলেন যে, অন্তত পিপড়া, মৌমাছি আর বোলতাদের ক্ষেত্রে, কর্মীরা হয়তো আসলেই সম্পর্কে রানির নিজের চেয়েও রানির সন্তানদের অনেক বেশী নিকটাত্মীয়। এবং এই বিষয়টি তাকে এবং পরে ট্রিভার্স এবং হেয়ার, স্বার্থপর জিন তত্ত্বের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজয়ের ধারণায় উপনীত হতে সাহায্য করেছিল। এবং তাদের যুক্তি প্রক্রিয়াটি ছিল এরকম।
হাইমেনোপটেরা (Hymenoptera) গ্রুপের কীটপতঙ্গ, যেমন, পিপড়া, মৌমাছি এবং বোলতাসহ অন্যদের লিঙ্গ নির্ধারণ করারএকটি অদ্ভুত পদ্ধতি আছে। টারমাইটরা এই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত না এবং তাদের এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যটিও নেই। একটি হাইমেনোপটেরাদের কলোনীতে সাধারণত একটি প্রাপ্তবয়স্ক রানি থাকে। রানি প্রজননের জন্য একবার মাত্র ওড়ে (মেটিং ফ্লাইট) যখন সে বয়সে তরুণ এবং তার বাকী দীর্ঘ জীবন ধরে সে শুক্রাণুগুলো তার শরীরে জমা করে রাখে– দশ বছর কিংবা আরো দীর্ঘ সময়। ধীরে ধীরে সে তার ডিম্বাণুগুলোর জন্য এই শুক্রাণুগুলো ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে, যা এই ডিম্বাণুগুলোকে নিষিক্ত হবার সুযোগ দেয় যখন সেগুলো তার প্রজনন নালীর মধ্য দিয়ে বাইরে বের হয়ে আসে। কিন্তু সব ডিম্বাণুগুলো নিষিক্ত হতে পারেনা। যেগুলো অনিষিক্ত সেগুলো পুরুষ হিসাবে জন্ম নেয়। পুরুষদের সেকারণে কোন বাবা নেই এবং তাদের শরীরে শুধুমাত্র এক সেট ক্রোমোজোম থাকে (পুরোটাই আসে তার মায়ের কাছ থেকে) দুই সেট এর বদলে ( যা আসে একটি বাবা থেকে ও আরেকটি মায়ের নিকট থেকে, যেমন, আমাদের মধ্যে থাকে। অধ্যায় ৩ এ সমরুপ উদাহরণটি ব্যবহার করলে, একটি পুরুষ হাইমেনোপটেরা সদস্যের প্রতিটি ‘খণ্ডের একটি করে অনুলিপি তার সব কোষের মধ্যে অবস্থান করে, সাধারণত দুটো থাকার বদলে।
কিন্তু একটি স্ত্রী হাইমেনোপটেরা সদস্যের ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক, কারণ তার একজন বাবা আছে এবং তার শরীরে প্রতিটি কোষে এক জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। হাইমেনোপটেরান কোনো স্ত্রী সদস্য, কর্মী হিসাবে বড় হবে, নাকি রানি হবে সেটি তার জিনের উপর নির্ভর করেনা বরং নির্ভর করে কিভাবে তাকে প্রতিপালিত করা হয়েছে। এর মানে হচ্ছে বলা যে, প্রতিটি স্ত্রী সদস্যদের রানি হিসাবে গড়ে ওঠার পুরো সেট জিন থাকে এবং কর্মী-তৈরী করার পুরো সেট জিন থাকে (অথবা বরং, জিনের সেট থাকে প্রতিটি বিশেষায়িত শ্রেণীর কর্মী কিংবা সৈন্য ইত্যাদি হিসাবে গড়ে তোলার জন্য); কোন সেট জিনগুলো সক্রিয় হয়ে উঠবে, সেটি নির্ভর করে কিভাবে স্ত্রী সদস্যটিকে প্রতিপালিত হয়েছিল, বিশেষ করে কি ধরনের খাদ্য সে গ্রহন করেছিল।
যদিও অনেক জটিলতা আছে তবে মূল বিষয়টি মূলত এরকমই। আমাদের জানা নেই কেন এই অসাধারণ পদ্ধতির যৌন প্রজনন পদ্ধতি বিবর্তিত হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ ছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের অবশই এটিকে হাইমেনোপটেরাদের বিষয়ে অদ্ভুত একটি বাস্তব সত্য হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। এই ব্যতিক্রমী ব্যপারটির সূচনার মূল কারণ যাই থাকুক না কেন, এটি অধ্যায় ৬ এর আত্মীয়তা পরিমাপ করার সুন্দর সুস্পষ্ট নিয়মটা ওলট পালট করে দেয়। এর মানে হচ্ছে কোনো একটি একক পুরুষ সদস্য থেকে আসা শুক্রাণু, আমাদের শরীরে যেমন তারা ভিন্ন, তা না হয়ে সবগুলো হুবহু একরকম হয়। পুরুষ সদস্যদের শরীরে শুধুমাত্র একটি পুর্ণ সেট থাকে, দুটি সেট নয়। প্রতিটি শুক্রাণু সেকারণে একটি পুরো সেট জিন পায়, পুরো নমুনার ৫০ শতাংশ পাবার বদলে এবং সে কারণে সব শুক্রাণু হুবহু একই রকম। আসুন এবার আমরা চেষ্টা করি মা এবং সন্তানদের মধ্যে সম্পর্ক পরিমাপ করতে। যদি কোনো পুরুষ সদস্য– আগেই থেকে জানা থাকে যে– একটি জিন ধারণ করে, যেমন ‘ক’, কি পরিমান সম্ভাবনা আছে সেই একই জিন তার মার শরীরেও থাকার? এর উত্তর অবশ্যই হবে ১০০ শতাংশ, কারণ পুরুষদের কোনো বাবা নেই এবং তারা সব জিন পেয়েছে তাদের মার কাছ থেকে। কিন্তু ধরুন রানির শরীরে একটি জিন আছে, ‘খ’, তার ছেলের শরীরে সেই জিনটির থাকার সম্ভাবনা মাত্র ৫০ শতাংশ, কারণ সে শুধুমাত্র তার ‘অর্ধেক’ জিন পায়। বিষয়টি শুনতে কেমন যেন পরস্পরবিরোধী মনে হচ্ছে, আসলে কিন্তু সেরকম কিছু নয়। কোনো একটি পুরুষ সদস্য তার সব জিন পায় তার মায়ের কাছ থেকে, কিন্তু মা তার জিনের অর্ধেক কেবল তার ছেলেকে দেয়। আপাতদৃষ্টিতে এই পরস্পরবিরোধীতার সমাধান হচ্ছে সাধারণত যে পরিমান জিন থাকার কথা, পুরুষ সদস্যদের শরীরে এর অর্ধেক পরিমান জিন আছে। সুতরাং কোন কারণই নেই সংশয়গ্রস্থ হওয়া যে সত্যিকারের আত্মীয়তার ইনডেক্স ১/২ নাকি ১; ইনডেক্স বা সূচকটি মানব নির্মিত একটি পরিমাপ, এবং সেকারণেই এটি বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করে, আর সেকারণে আমাদের হয়তো এটি পরিত্যাগ করা উচিৎ এবং প্রথম মূলনীতিতে প্রত্যাবর্তন করা উচিৎ। কোনো একজন রানির শরীরে থাকা একটি ‘ক’ জিনের দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই জিনটি তার ছেলের শরীরে থাকার সম্ভাবনা ১/২, ঠিক একইভাবে তাদের কন্যাদের জন্যে সেটি প্রযোজ্য। রানির দৃষ্টিভঙ্গিতে সুতরাং তার সন্তানরা, যে কোনো লিঙ্গের হোক না কেন, মানব সন্তানরা তাদের মায়েদের যতটা নিকটাত্মীয় ঠিক ততটাই নিকটাত্মীয় হয়।
