থমসন গ্যাজেলদের ‘স্টটিং’ বা লাফ দিয়ে প্রদর্শনী করার বিষয়টি বা কি, যা আমি প্রথম অধ্যায়ে উল্লেখ করেছিলাম এবং যাদের আপাতদৃষ্টিতে আত্মঘাতী পরোপকারিতা, আর্সেকে প্রণোদিত করেছিল সরাসরিভাবে উল্লেখ করতে যে, এটিকে কেবলমাত্র ব্যাখ্যা করা সম্ভব ‘গ্রুপ সিলেকশন দিয়ে। এখানে স্বার্থপর জিন তত্ত্ব আরো বেশী কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। পাখিদের ক্ষেত্রে সতর্ক সংকেত কাজ করে কিন্তু সেগুলো কার্যত এমনভাবে পরিকল্পিত যে সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না শব্দের উৎস কোথা থেকে আসছে, এবং যতটা হওয়া সম্ভব ততটুকু সতর্ক। স্টটিং বা এই উচ্চ লাফ ঝাঁপ এর ক্ষেত্রে এটা কিন্তু সেভাবে সম্ভব নয়। তারা যথেষ্ট পরিমান আড়ম্বরময় যাকে বলা যায় সরাসরি উসকানি দেবার মত। গ্যাজেলদের দেখলে মনে হয় যেন তারা সুপরিকল্পিতভাবে শিকারী প্রাণীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, প্রায় যেন তারা শিকারী প্রাণীকে আক্রমণ করার জন্য উসকানি দিচ্ছে। এই আচরণ চমৎকার একটি সাহসী তত্ত্ব প্রস্তাব করার সুযোগ দিয়েছে। এই তত্ত্বটি প্রাকধারণা করেছিলেন এন. স্মাইথ, কিন্তু এটিকে যদি যৌক্তিক কোনো উপসংহারের দিকে নিয়ে যাওয়া যায়, এটি নির্ভুলভাবে এ. জাহাভীর স্বাক্ষর দেখতে পাওয়া যায়।
জাহাভীর তত্ত্বকে আমরা এভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি। গুরুত্বপূর্ণ যে পার্শ চিন্তাটি আমাদের মনে রাখতে হবে যে স্টটিং এর ধারণাটি, অন্যান্য গ্যাজেলদের প্রতি সতর্ক সংকেত হওয়া তো দুরের কথা, সত্যিকারভাবে তাদের এই প্রদর্শনীর লক্ষ্য হচ্ছে শিকারী প্রাণী। অন্য গ্যাজেলরা এটি লক্ষ করে এবং তাদের আচরণকে এটি প্রভাবিত করে, কিন্তু এটি ঘটনাচক্রে ঘটে, এটি মূলত প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয় শিকারী প্রাণীর প্রতি সংকেত হিসাবে। স্কুলভাবে এটি ইংরেজী ভাষায় অনূদিত করলে এর অর্থ হয়, “দেখো আমি কত উর্দুতে লাফাতে পারি, আমি স্পষ্টভাবে অনেক যোগ্য এবং স্বাস্থ্যবান গ্যাজেল, তুমি আমাকে ধরতে পারবে না, তোমার জন্য বুদ্ধিমান হবে আমার পাশে দাঁড়ানো অন্যান্য গ্যাজেলদের ধরা যারা এতটা উঁচুতে লাফাতে পারেনা!’ আরো খানিকটা কম নরাতৃরোপ অর্থে, উঁচু লাফ দেবার জিনগুলো এবং সাড়ম্বরভাবে সেটি প্রদর্শন করার জিনগুলো শিকারী প্রাণীর খাদ্য হবার সম্ভাবনা কম কারণ শিকারী প্রাণীদের প্রবণতা আছে এমন শিকারকে ধরা যাদের সহজে ধরা যায়। বিশেষ করে, অনেক স্তন্যপায়ী শিকারী প্রাণী পুরো দল থেকে বৃদ্ধ আর অসুস্থদের শিকার হিসাবে ধরার জন্য পরিচিত। কোনো একটি সদস্য যে কিনা অনেক উঁচুতে লাফায়, সে কোনো বিজ্ঞাপন করছে না, অতিরিক্ত মাত্রায়, বাস্তব সত্য হচ্ছে সে না বৃদ্ধ না দুর্বল। এই তত্ত্বানুযায়ী, এই প্রদর্শনী পরার্থবাদী অবশ্যই না। যদি কোনো কিছু এর সম্বন্ধে বলতেই হয় তবে এটি স্বার্থপর, কারণ এর উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্য আরেকজনকে ধরার চেষ্টা করার জন্য শিকারী প্রাণীকে প্ররোচিত করা। সুতরাং এক অর্থে চলে কে সবচেয়ে উঁচুতে লাভ দিতে পারে সেটি দেখার জন্য সেখানে একটি প্রতিযোগিতা চলমান এবং এই প্রতিযোগিতায় যারা হারে শিকারী প্রাণী শিকার হিসাবে তাদের মধ্যে থেকে কাউকে বাছাই করে।
অন্য উদাহরণটি যা আমি বলেছিলাম, আমি আবার সেই বিষয়ে আলোচনায় ফিরে আসবো– কামিকাজি মৌমাছিদের কেসটি, যা মধু খেতে আসা প্রাণীদের আক্রমণ করে তবে সেটি করতে গিয়ে তারা প্রায় নিশ্চিৎ মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। উচ্চমাত্রার সামাজিক কীটপতঙ্গের অনেক উদাহরণের মধ্যে শুধুমাত্র একটি মৌমাছি। অন্যান্য উদাহরণ যেমন, ওয়াস্প বা বোলতারা, পিপড়া, উইপোকা বা সাদা-পিপড়া। আমি সাধারণভাবে সামাজিক প্রাণী নিয়ে আলোচনা করতে চাই, শুধুমাত্র আত্মঘাতি মৌমাছিদের নিয়ে না। সামাজিক কীটপতঙ্গের নানা ধরনের কর্মকাণ্ড প্রায় কিংবদন্তীর মত, বিশেষ করে তাদের সহযোগিতা বা আপাতদৃষ্টিতে পরার্থবাদী আচরণের বিস্ময়কর সব আচরণগুলো। আত্মঘাতী কামড় দেবার মিশন তাদের আত্মোৎসর্গ করার প্রতিভারই প্রতিনিধিত্ব করে। ‘হানি-পট’ পিপড়াদের মধ্যে একটি শেণীর শ্রমিকরা আছে, তাদের অদ্ভুতভাবে স্ফীত, খাদ্য-ভর্তি পেট থাকে, যাদের জীবনের একটি মাত্র কাজ হচ্ছে তাদের বানানো সুড়ঙ্গের ছাদ থেকে ঝুলে থাকা, স্ফীত কোনো লাইট বাল্বের মত, অন্যান্য শ্রমিক পিপড়ারা যাদের খাদ্য উৎস হিসাবে ব্যবহার করে। মানুষের বোধগম্য ভাষায় তারা আদৌ কোনো একক সদস্য হিসাবে জীবন কাটায় না, তাদের একক অস্তিত্ব তাদের পুরো সমাজের কল্যাণের জন্যবন্দী আর নিয়ন্ত্রিত। পিপড়াদের, মৌমাছিদের বা উইপোকাদের কোনো সমাজ উচ্চতর পর্যায়ে এক ধরনের স্বকীয়তা অর্জন করে। খাদ্য সেখানে যেভাবে ভাগ করে নেয়া হয় সবার সাথে, আমরা হয়তো বলতে পারি যেন কোনো একটি সামাজিক পাকস্থলী। রাসায়নিক সংকেতের দ্বারা এত দক্ষতার সাথে তথ্য আদান-প্রদান করে, কিংবা মৌমাছিদের বিখ্যাত নাচের সাহায্যে যে পুরো গ্রুপটি এমনভাবে আচরণ করে যেন তারা একটি একক সত্তা, যাদের একটি স্নায়ুতন্ত্র আছে এবং একটি অনুভব করার ইন্দ্রিয় আছে– যা তাদের নিজস্ব। বহিঃশত্রুদের শনাক্ত করা হয় এবং তাদের প্রতিরোধ করা হয় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মত খানিকটা সুনির্দিষ্টতার সাথে। কোনো একটি মৌচাকে বিদ্যমান উচ্চ তাপমাত্রা মানুষের শরীরের তাপমাত্রার মতই সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, এমনকি যদিও কোনো একক মৌমাছি কিন্তু “উষ্ণ রক্ত বিশিষ্ট প্রাণী নয়। পরিশেষে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, এই উপমা সম্প্রসারিত করা যেতে পারে প্রজননের ক্ষেত্রেও। কোনো সামাজিক পতঙ্গ কলোনীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা মূলত প্রজনন অক্ষম বা স্টেরাইল কর্মীদের দ্বারা তৈরী। জার্ম লাইন– অমর জিনের ধারাবাহিকতার সেই বংশধারা– সংখ্যালঘু কিছু সদস্যদের শরীরের মাধ্যমে হস্তান্তরিত হয়– যারা প্রজনন করে। এদের আমরা তুলনা করতে পারি আমাদের অণ্ডকোষ আর ডিম্বাশয়ের সাথে। প্রজননে অক্ষম বা নির্বীজ কর্মীদের আমরা তুলনা করতে পারি আমাদের যকৃত,মাংসপেশী এবং স্নায়ুকোষের সাথে।
