আমরা ইতিমধ্যেই সারভাইভাল বা টিকে থাকার যন্ত্রগুলোর পিতামাতা সংক্রান্ত, যৌন ও লিঙ্গ নির্ভর এবং আগ্রাসী ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি– যারা একই প্রজাতির সদস্য। কিন্তু আরো কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয় আছে বিভিন্ন জীব সদস্যদের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে, যে বিষয়গুলো খুব সুস্পষ্টভাবে আগের কোনো অধ্যায়েই আলোচনা করা হয়নি। এর একটি হচ্ছে বহু জীবের একত্রে কোনো গ্রুপ হিসাবে বসবাস করার প্রবণতা। পাখিরা ঝাক বেধে ওড়ে, কীটপতঙ্গরাও একত্রে ঝাক বাধে, মাছ কিংবা তিমিরা দলবদ্ধ হয়ে বাস করে, সমতলে স্তন্যপায়ীরা একসাথে দল বেধে চরে বেড়ায় কিংবা একসাথে দল বেধে শিকার করে। এই একসাথে জড়ো হবার ব্যাপারটি মূলত ঘটে শুধুমাত্র একই প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে, জেব্রা অনেকসময় চরে বেড়ায় ‘নু’দের সাথে এবং মিশ্র প্রজাতির পাখির ঝাকও মাঝে মাঝে দেখা যায়।
প্রস্তাবিত যে উপকারিতাগুলো স্বার্থপর কোনো সদস্য গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে অন্য সদস্যদের বসবাস করার মাধ্যমে আদায় করে নেয় তার তালিকাটি বরং একটি বিবিধ মিশ্র তালিকা। সেই পুরো তালিকার বিবরণ আমি এখানে ব্যাখ্যা করবো না, কিন্তু শুধুমাত্র অল্প কিছু প্রস্তাবনা এখানে উপস্থাপন করবো। এবং এটি করার প্রক্রিয়ায় আমি ফিরে আসবো অবশিষ্ট আপাতদৃষ্টিতে কিছু পরার্থবাদী আচরণের আলোচনায়, যা আমি প্রথম অধ্যায়ে উল্লেখ করেছিলাম এবং যা আলোচনা করার জন্য আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এই আলোচনা সামাজিক কীটপতঙ্গগুলোর বিষয় বিবেচনা করতে আমাদের নির্দেশ করবে, যে বিষয়টি ছাড়া জীবজগতে পরার্থবাদীতা সংক্রান্ত কোনো বিবরণই সম্পূর্ণ হবে না। অবশেষে বরং এই বিবিধ বিষয় নিয়ে আলোচনার এই অধ্যায়ে, আমি উল্লেখ করবো রেসিপ্রোকাল অ্যালটুইজম বা পারস্পরিক পরার্থবাদীতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, সেটি হচ্ছে ‘তুমি আমার পিঠ চুলকে দাও, আমিও তোমার পিঠ চুলকে দেবো মূলনীতিটি (অর্থাৎ তুমি আমাকে সাহায্য করো, আমি তোমাকে সাহায্য করবো)।
যদি প্রাণীরা একসাথে দলবদ্ধ হয়ে বাস করে, তাহলে সেই সহযোগিতাপূর্ণ সংশ্লিষ্টতায় তাদের জিনগুলোকে অবশ্যই বেশী সুবিধা পেতে হবে, তারা যা বিনিয়োগ করছে তার চেয়ে বেশী। হায়েনাদের একটি দল, কোনো একটি একক হায়েনার চেয়ে তাদের শিকার হিসাবে অনেক বেশী বড় আকারের কোনো প্রাণীকে পরাস্ত করতে পারে, সে কারণেই প্রতিটি স্বার্থপর হায়েনা সদস্যদের জন্য একসাথে দল বেধে শিকার করা লাভজনক, এমনকি যখন তাদের শিকারের খাদ্য পরস্পরের সাথে ভাগ করে নিতে হচ্ছে। এবং সম্ভবত একই ধরনের কিছু কারণে মাকড়শারা বিশাল কমুনাল বা সামাজিক মাকড়শার জাল তৈরী করার জন্য পরস্পরের সাথে সহযোগিতা করে। শরীরের তাপ সংরক্ষণ করতে এম্পেরর পেঙ্গুইনরা একসাথে গায়ে গা লাগিয়ে একত্রে জড়ো হয়ে থাকে, প্রত্যেকেই লাভবান হয় পুরোপুরি শরীরকে উন্মুক্ত না করে বরং সবাই শরীরের অল্প খানিকটা এলাকা ঠান্ডায় উন্মুক্ত করে রাখার মাধ্যমে, একা থাকলে যেটি সম্ভব নয়। কোনো একটি মাছ যে আরো একটি মাছের পেছনের খানিকটা বাকা হয়ে সাঁতার কাটলে সে একটি হাইড্রোডায়নামিক সুবিধা পায় সামনের মাছের সৃষ্টি করা টারবুলেন্স এর কারণে। আংশিকভাবে এটাই কারণ কেন মাছরা একটা সাথে দল বা স্কুল তৈরী করে। একটি সম্পর্কযুক্ত কৌশল যার সাথে বাতাসের টারবুলেন্স জড়িত, সেটি ব্যবহার করতে শোনা যায় রেসিং সাইকেল চালকদের, এবং এটাই হয়তো পাখিদের ‘ভি’ এর মত একটি ফরমেশন তৈরী করে ওড়ার কারণ। সম্ভবত সেই ঝাঁকে পাখিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে ঝাকের একেবারে মাথার অসুবিধাজনক অবস্থানটি এড়িয়ে চলার। সম্ভবত পাখিরা হয়তো পালাক্রমে এই অনিচ্ছুক নেতা হবার দ্বায়িত্বটা মেনে নেয়– এই অধ্যায়ের শেষে এই ধরনে বিলম্বিত পারস্পরিক পরার্থবাদীতার এই বিশেষ রুপটি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করা অনেকগুলো প্রস্তাবিত উপকারিতা মূলত শিকারী প্রাণীর খাদ্য হওয়া থেকে নিজেদের সুরক্ষা সংক্রান্ত। এই তত্ত্বটির একটি চমৎকার রুপ দিয়েছিলেন ডাবলিউ. ডি. হ্যামিলটন, তার ‘জিওমেট্রি ফর দ্য সেলফিশ হার্ড’ শীর্ষক একটি নিবন্ধে। ভুল ব্যাখ্যা করা হতে পারে এই আশঙ্কায় আমি যে বিষয়টির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার আবশ্যিকতা মনে করছি, সেটি হচ্ছে ‘সেলফিশ হার্ড’ বা ‘স্বার্থপর পশুর পাল’ দ্বারা তিনি বোঝাতে চাইছেন, “স্বার্থপর সদস্যদের দিয়ে তৈরী কোনো পশুর পাল।
আরো একবার আমরা শুরু করবো সরল কোনো ‘মডেল’ দিয়ে, যদিও নৈর্ব্যক্তিক, এটি আমাদের সত্যিকার পৃথিবীটাকে বুঝতে সাহায্য করে। ধরুন একটি জীব প্রজাতি যা কোনো শিকারী প্রাণীর দ্বারা আক্রান্ত হয়, যে শিকারী প্রাণীটি সবসময় সবচেয়ে কাছের শিকার প্রাণীটিকে আক্রমণ করে। শিকারী প্রাণীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটি একটি যৌক্তিক কৌশল, কারণ এটি অযথা শক্তির অপচয় রোধ করে। আর শিকার হওয়া প্রাণীটির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর একটি কৌতূহলোদ্দীপক পরিণতি আছে। এর অর্থ হচ্ছে শিকার হতে পারে এমন প্রতিটি সদস্য নিরন্তরভাবে চেষ্টা করবে শিকারী প্রাণীর সবচেয়ে নিকটবর্তী না হওয়া থেকে। যদি শিকার হওয়া প্রাণী দুরে আক্রমণরত শিকারী প্রাণীকে দেখে, এটি দ্রুত সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু যদি শিকারী প্রাণী খুব দক্ষ হয় হঠাৎ করে কোনো সতর্ক সংকেত ছাড়াই দৃশ্যে উপস্থিত হতে, ধরুন এটি লম্বা ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকে সুযোগের অপেক্ষায়, তাহলে প্রতিটি আক্রম্য সদস্য শিকারের প্রাণীর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়া এড়াতে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। আমরা প্রতিটি শিকার হওয়া প্রাণী সদস্যদের চারপাশে একটি বিপদজ্জনক এলাকা’ দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতেদেখতে পারি। এই এলাকাটিকে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে এমন একটি এলাকা হিসাবে যেখানে কোনো একটি বিন্দু সেই সদস্যদের কাছে সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী অন্য যেকোনো সদস্যদের তুলনায়। যেমন, যদি শিকার হয় এমন সদস্যরা এমনভাবে একসাথে চলাচল করে তারা একটি সাধারণ জ্যামিতিক সংগঠন তৈরী করে, তাদের প্রত্যেকটি সদস্যকে ঘিরে থাকা বিপজ্জনক এলাকাটি (যদি না সেই সদস্য তার প্রান্তে অবস্থান করে) হয়তো হতে পারে স্কুলভাবে ষড়ভুজাকৃতি আকারের একটি এলাকা। যদি কোনো শিকারী প্রাণী কোনো একটি আক্রম্য সদস্য ‘ক’কে ঘিরে থাকা বিপজ্জনক এলাকায় লুকিয়ে থাকে আক্রমণের অপেক্ষায়, তাহলে সদস্য ‘ক’ এর শিকারী প্রাণীর খাদ্য হওয়া সম্ভাবনা থাকে অন্যদের চেয়ে বেশী। গোষ্ঠীবদ্ধ প্রাণীদের পালের প্রান্তে অবস্থিত সদস্যরা বিশেষ ভাবে আক্রম্য হবার সম্ভাবনা থাকে, যেহেতু তাদের বিপদের এলাকা অপেক্ষাকৃতভাবে ছোট ষড়ভুজ না বরং এর মধ্যে একদিকে উন্মুক্ত দিকে বিশাল পরিসর অন্তর্ভুক্ত আছে।
