(২) এখন মনে হয় এটি ভ্রান্ত একটি ধারণার উদ্রেক করে, যখন আমরা লিঙ্গ ভূমিকার ভিত্তি ব্যাখ্যা করার জন্যশুক্রাণু আর ডিম্বাণুর আকার, আকৃতি আর সংখ্যার বৈষম্যের উপর গুরুত্বারোপ করি। এমনকি যদিও একটি শুক্রাণু আকারে ছোট এবং সস্তা, কিন্তু মিলিয়ন সংখ্যক শুক্রাণু বানানো এবং সেটি সফলভাবে কোনো স্ত্রী সদস্যের শরীরে সকল ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবেলা করে প্রবেশ করানো অবশ্যই শক্তি এবং সময়ের ব্যয়ের মাত্রায় আদৌ সস্তা কোনো ব্যাপার নয়। এখন আমি বরং নিচে বর্ণিত উপায়টি বেছে নেবো নারী পুরুষের মৌলিক অপ্রতিসাম্যটাকে ব্যাখ্যা করার জন্য:
ধরুন, আমরা দুটি লিঙ্গ নিয়ে শুরু করলাম, যাদের কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নেই, যা দিয়ে তাদের স্ত্রী কিংবা পুরুষ হিসাবে শনাক্ত করা যায়। একটি নিরপেক্ষ নাম দিয়ে তাদের আমরা উল্লেখ করি, ধরুন ‘ক’ এবং ‘খ’। আমাদের যে বিষয়টি শুধু নিশ্চিৎ করতে হবে সেটি হচ্ছে প্রতিটি প্রজনন যেন একটি ‘ক’ এবং একটি ‘খ’ এর মধ্যে ঘটে। এখন যেকোনো প্রাণী, সে ‘ক’ কিংবা ‘খ’ হোক না কেন, তাকে একটি ট্রেড অফ বা হিসাব নিকাশের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে দ্বন্দ্ব করার জন্য ব্যবহৃত সময় ও শক্তি বিদ্যমান সন্তানদের প্রতিপালনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারেনা। এবং একইভাবে সন্তান প্রতিপালনের জন্য ব্যবহৃত শক্তি সে ব্যবহার করতে পারে না কোনো দ্বন্দ্বের জন্য। প্রতিটি জীবের জন্যে এটাই প্রত্যাশিত যে তারা এই দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী চাহিদার টানাপোড়েনের মধ্যে সে তার প্রচেষ্টার একটি ভারসাম্য তৈরী করবে। যে বিষয়টি আমি বর্ণনা করতে চাইছি, সেটি হচ্ছে যে ‘ক’ রা হয়তো ‘খ’ এর ভিন্ন কোনো ভারসাম্য অর্জনের পথ বেছে নেয় এবং সেটা একবার যখন তারা বেছে নেয়, তাদের মধ্যে ক্রমশ ভিন্নতা বাড়তে থাকে।
এটা দেখার জন্য, মনে করুন যে দুটি লিঙ্গ, ‘ক’ এবং ‘খ’ রা, একে অপরের থেকে ভিন্ন, একেবারে শুরু থেকে, ভিন্নতার বিষয়টি হচ্ছে কিভাবে সন্তানের পিছনে বিনিয়োগ অথবা প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে যুদ্ধ করে তারা তাদের সফলতাকে প্রভাবিত করতে পারে (আমি ‘যুদ্ধ’ কথাটা ব্যবহার করবো একই লিঙ্গের মধ্যে সবধরনের সরাসরি দ্বন্দ্বকে বোঝাতে); শুরুতে দুটি লিঙ্গর মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্য, কারণ আমি যা বলতে চাইছি সেটি হচ্ছে এর একটি অন্তর্গত প্রবণতা আছে ক্রমশ বৃদ্ধি পাবার। ধরুন ‘ক’রা শুরু করেছিলো সেই অবস্থা দিয়ে, যেখানে তাদের প্রজনন সাফল্যে সন্তান প্রতিপালনের আচরণের তুলনায় প্রধান অবদান রেখেছিল ‘যুদ্ধ’ ‘খ’ রা,অন্যদিকে, শুরু করে এমন পরিস্থিতিতে, যেখানে সরাসরি যুদ্ধ অপেক্ষাতাদের প্রজনন সাফল্যের জন্য সন্তান প্রতিপালনের আচরণ খানিকটা বেশী ভূমিকা রেখেছিল। এর অর্থ হচ্ছে, যেমন, যদিও একজন ‘ক’ অবশ্যই লাভবান হয় প্রতিপালন আচরণের জন্য, কিন্তু ‘ক’দের মধ্যে একজন সফল প্রতিপালনকারী এবং একজন অসফল প্রতিপালনকারীর মধ্যে পার্থক্য, তাদের মধ্যে কোনো সফল যোদ্ধা এবং একজন অসফল যোদ্ধার মধ্যে পার্থক্যের তুলনায় অপেক্ষাকৃত। ক্ষুদ্র। ‘খ’দের মধ্যে ঠিক এর বিপরীতটাই সত্য, সুতরাং কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিমান পরিশ্রমে, কোনো একজন ‘ক’ তার নিজের জন্য উপকার করবে যুদ্ধ করার মধ্যে, তবে ‘খ’ কি তার নিজের জন্য ভালো কিছু করবে, যদি সে তার প্রচেষ্টা যুদ্ধ থেকে সরিয়ে নেয় প্রতিপালন আচরণে।
পরবর্তী প্রজন্মগুলোয়, সেকারণে, ‘ক’রা তাদের পিতামাতা অপেক্ষা খানিকটা বেশী যুদ্ধ করবে, এবং ‘খ’রা কম যুদ্ধ করবে, এবং তাদের পিতামাতাদের চেয়ে একটু বেশী প্রতিপালনে বিনিয়োগ করবে। এখন সেরা ‘ক’ এবং সবচেয়ে খারাপ ‘ক’ এর মধ্যে পার্থক্য এই দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে আরো অনেক কম হবে। সুতরাং কোনো একটি ‘ক’ এমনকি আরো বেশী লাভ করবে তার প্রচেষ্টা যুদ্ধে বিনিয়োগ করার মাধ্যমে, এবং এমনকি আরো কম সে লাভবান হবে প্রতিপালনের জন্য তার বিনিয়োগ প্রচেষ্টায়। এর ঠিক উল্টোটা হবে ‘খ’দের ক্ষেত্রে তাদের প্রজন্মান্তরে। মূল ধারণাটি হচ্ছে একটি সামান্য প্রারম্ভিক পার্থক্য, যা ভিন্ন ভিন্ন লিঙ্গদের মধ্যে থাকে সেটি স্বপ্রণোদিতভাবে বৃদ্ধি পায় : নির্বাচন শুরু করতে পারে একটি প্রারম্ভিক, সামান্য পার্থক্য দিয়ে এবং এটিকে সে ক্রমশ আরো বেশী বিশালকার পার্থক্যে রুপান্তর করে, যতক্ষণ না ‘ক’রা রূপান্তরিত হয় যাদের আমরা এখন বলি পুরুষ, এবং ‘খ’রা রূপান্তরিত হয় যাদের আমরা বলি স্ত্রী। শুরুর পার্থক্যটা হতে পারে খুব সামান্যই যা ঠিক অনির্দিষ্টভাবেই শুরু হয়েছিল। সর্বোপরি, দুই লিঙ্গের মধ্যে শুরুর পরিস্থিতি হুবহু একরকম হবার সম্ভাবনাও কম।
আপনি হয়তো লক্ষ করতে পারবেন, এটি বরং কোনো তত্ত্বের মত, পার্কার,বেকার এবং স্মিথের গবেষণায় শুরু হয়েছিল এবং ১৮৫ (মূল বইয়ে) পৃষ্ঠায় আলোচনা করা হয়েছে, যে তত্ত্বটি আদিম গ্যামেটের শুক্রাণু আর ডিম্বাণুতের বিচ্ছিন্ন হবার সূচনা পর্বটি ব্যাখ্যা করে। যে যুক্তিটি এই মাত্র উপস্থাপন করা হলো, সেটি একটি সাধারণ রুপ। লিঙ্গ নির্দিষ্ট ভুমিকাগুলোর আরো মৌলিক বিভেদে ডিম্বাণু আর শুক্রাণুর মধ্যে পার্থক্য হওয়া শুধুমাত্র একটি ক্ষেত্র। শুক্রাণু-ডিম্বাণুর পার্থক্য প্রাথমিক হিসাবে গণ্য না করে, স্ত্রী ও পুরুষের সব বৈশিষ্ট্যসূচক গুণাবলীগুলো উৎস হিসাবে এই বিষয়টি চিহ্নিত করলে, আমরা এখন একটি যুক্তি পাবো যা ব্যাখ্যা করতে পারে। শুক্রাণু-ডিম্বাণুর পৃথকীকরণ প্রক্রিয়া এবং একই ভাবে অন্যান্য বিষয়গুলোও। আমরা ধারণা করে নিয়েছিলাম যে, দুটি লিঙ্গ একে অপরের সাথে প্রজনন করবে; আমাদের ঐ সব লিঙ্গ নিয়ে আর কিছু জানার প্রয়োজন নেই। শুরুর খুব সামান্য ধারণা থেকে শুরু করে, আমরা ইতিবাচকভাবে প্রত্যাশা করি যে শুরুতে এই দুটি লিঙ্গ যতটাই সমান হোক না কেন, তারা বিভাজিত হয় দুটি পৃথক লিঙ্গে যারা বিশেষায়িত হয় বিপরীত এবং সম্পূরক প্রজনন কৌশলে। শুক্রাণু আর ডিম্বাণু পার্থক্য হবার বিষয়টি আরো অনেক বেশী সাধারণ পৃথকীকরণের একটি উপসর্গ, এর কারণ নয়।
