আমি সুস্পষ্টভাবে শুধুমাত্র মানুষের কথা বলিনি, কিন্তু অবশ্যম্ভাবীভাবে যখন আমরা এই অধ্যায়ে উল্লেখিত বিবর্তনীয় যুক্তিগুলো নিয়ে ভাবি, আমরা আমাদের নিজেদের প্রজাতি এবং আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা না ভেবে পারি না। নারীদের সঙ্গমে বিরত থাকা যতক্ষণ না কোন পুরুষ দীর্ঘ মেয়াদী বিশ্বস্ততার কোনো প্রমাণ দিচ্ছে এই ধারণাটি আমাদের কাছে পরিচিত মনে হয়। এটি হয়তো প্রস্তাব করে যে মানব নারী ‘ড্ডামেস্টিক ব্লিস’ কৌশল অবলম্বন করে ‘হি-ম্যান’ কৌশলের চেয়ে। বহু মানব সমাজ বাস্তবিকভাবে একগামী। আমাদের নিজেদের সমাজে, পিতামাতার যৌথ বিনিয়োগ অনেক বিশাল এবং আবশ্যিকভাবে ভারসাম্যহীন নয়। মায়েরা নিশ্চিৎভাবে তাদের সন্তানের জন্য অনেক বেশী সরাসরি কাজ করে তাদের বাবাদের তুলনায়, কিন্তু বাবা প্রায়শই কাজ করে পরোক্ষভাবে আবশ্যিক বস্তুগত সম্পদের যোগান নিশ্চিৎ করার জন্য যা সন্তানদের প্রতিপালনে ব্যয় হয়। অন্যদিকে কিছু মানব সমাজ বহুগামী, এবং অনেকগুলোই হারেম নির্ভর। এই বিস্ময়কর বিচিত্রতার উপস্থিতি প্রস্তাব করে যে, মানুষের জীবনাচারণ প্রধানত নির্ধারিত হয় জিন নয় বরং সংস্কৃতির দ্বারা। তা সত্ত্বেও এটি এখনও সম্ভব যে মানব পুরুষের বহুগামী হবার একটি সাধারণ প্রবণতা আছে এবং স্ত্রী সদস্যদের একগামী হবার প্রবণতা আছে, যেমনট আমরা বিবর্তনীয় ব্যাখ্যার মূল তত্ত্বের জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি। এবং এই দুটি প্রবণতার নির্দিষ্ট কোনটি প্রাধান্য বিস্তার করবে তা নির্ভর করছে সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির মধ্যে, ঠিক যেমনটি ঘটে বিভিন্ন প্রজাতিতে, যখন এটি নির্ভর করে পরিবেশগত পরিস্থিতির উপর।
আমাদের নিজেদের সমাজের একটি বৈশিষ্ট্য যা মনে হয় সুস্পষ্টভাবে অসঙ্গতিপুর্ণ, সেটি হচ্ছে যৌন বিজ্ঞাপনের বিষয়টি। যেমনটি আমরা দেখেছি, বিবর্তনীয় ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করেই খুব দৃঢ়ভাবেই প্রত্যাশিত যে, যেখানেই দুটি লিঙ্গের মধ্যে পার্থক্য দৃশ্যমান, সেখানে পুরুষদেরই বিজ্ঞাপন করা উচিৎ এবং স্ত্রী সদস্যদের যেখানে বর্ণহীন নিষ্প্রভ হবার কথা। আধুনিক পশ্চিমা মানুষরা কোনো সন্দেহ নেই এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। অবশ্যই সত্যি কিছু পুরুষ জমকালোভাবে জামাকাপড় এবং কিছু নারী খুব নিষ্প্রভভাবে কাপড় পরেন, কিন্তু গড়পড়তা কোনো সন্দেহ নেই আমাদের সমাজে ময়ুরের লেজের সমতুল্য কোনো কিছু প্রকাশ করে নারীরাই, পুরুষরা নয়। নারীরা তাদের মুখে রঙ লাগায়, মিথ্যা চোখের পাপড়ি আঠা দিয়ে লাগায়। বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া, যেমন অভিনেতারা, পুরুষরা নয় বরং নারীদের আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় তারা তাদের ব্যাক্তিগত উপস্থিতি এবং চেহারা প্রতি বেশী আগ্রহী এবং তাদের সেটি করতে উৎসাহ যোগায় তাদের প্রতি নির্দেশিত নানা পত্রিকাগুলো। পুরুষদের পত্রিকাগুলো পুরুষদের যৌন আকর্ষণীয়তা নিয়ে সাধারণত বেশী ব্যস্ত থাকে না এবং কোনো পুরুষ যে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী মাত্রায় আগ্রহী তার নিজের কাপড় আর চেহারা নিয়ে, সে প্রায়শই পুরুষ এবং নারী উভয়েরই সন্দেহের উদ্রেক করে। যখন কোনো নারীকে কথোপকথনে বর্ণিত করা হয়, খুবই সম্ভাবনা আছে তার যৌন আকর্ষণীয়তা বা যৌন আকর্ষণীয়তার অভাব, খুব স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করা হবে। এটি সত্যি, সেই বক্তা নারী কিংবা পুরুষ যেই হোক না কেন। কোনো পুরুষকে বর্ণনা করা হয়, যে বিশেষণগুলো ব্যবহৃত হয় তাদের বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই যৌনতার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।
এই সব বাস্তব সত্যগুলো মুখোমুখি হয়ে, একজন জীববিজ্ঞানী হয়তো সন্দেহ করতে বাধ্য হবেন, তিনি এমন কোন সমাজের দিকে তাকাচ্ছেন যেখানে নারীরা পুরুষদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, এর বিপরীতটা অর্থাৎ পুরুষরা নারীদের জন্য দ্বন্দ্বরত নয়। বার্ড অব প্যারাডাইজের ক্ষেত্রে, আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, স্ত্রী পাখিরা বর্ণহীন নিষ্প্রভ হয় কারণ তাদের পুরষদের জন্য দ্বন্দ্ব করার কোনো প্রয়োজন নেই। পুরুষরা উজ্জ্বল বর্ণের আর সাড়াম্বর হয় কারণ স্ত্রী পাখিদের চাহিদা অনেক বেশী এবং তারা এই বাছবিচার করার ঝুঁকি নিতে পারে। আর যে কারণে স্ত্রী বার্ড অব প্যারাডাইজদের চাহিদা অনেক বেশী, তা হচ্ছে যে ডিম্বানুরা শুক্রাণু অপেক্ষা অনেক বেশী দুর্লভ একটি সম্পদ। তাহলে আধুনিক পশ্চিমা পুরুষদের সাথে কি হচ্ছে? পুরুষরা কি আসলেই বহু-কাঙ্খিত লিঙ্গে রূপান্তরিত হচ্ছে, যার চাহিদা আছে, সেই লিঙ্গটি, যা বাছবিচার করার জন্য ঝুঁকি নিতে পারে? যদি তাই হয়, তার কারণটাই বা কি?
নোটস (অধ্যায় ৯)
(১) যেমন প্রায়শই ঘটে, এই শুরুর বাক্যটি অনুল্লেখিত ‘অন্য সব বিষয়গুলো যদি একই থাকে এই শর্তে বাক্যাংশটিকে গোপন করে। অবশ্যই সঙ্গীরা সহযোগিতার মাধ্যমে অনেক কিছুই অর্জন করতে পারে। এবং এটাকেই বার বার আমরা এই অধ্যায়ে ফিরে আসতে দেখি। কারণ সর্বোপরি, সঙ্গীদের সম্ভাবনা বেশী একটি ননজিরো সাম গেম’ খেলায় অংশগ্রহন করার, একটি গেম যেখানে উভয়েই সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের অর্জিত লাভের পরিমানকে বাড়াতে পারবে, শুধুমাত্র একজনের লাভ আবশ্যিকভাবে অন্যজনের ক্ষতি হবার বদলে (আমি এই বিষয়টি ব্যাখ্যা দিয়েছি অধ্যায় ১২ এ); বইটিতে এটাই অন্যতম একটি জায়গা যেখানে আমার বক্তব্যের সুর জীবনের নৈরাশ্যবাদী, স্বার্থপরতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বেশী ঝুঁকে পড়েছিল। সেই সময় আমার কাছে এটাই আবশ্যিক মনে হয়েছিল, কারণ প্রাণীদের প্রাক-প্রজনন আচরণ বা কোর্টশিপ সংক্রান্ত প্রচলিত প্রধান ধারণাটি ঝুঁকে ছিল এর বিপরীত দিকে। প্রায় সর্বজনীনভাবে, মানুষ কোনো নিরীক্ষা ছাড়াই ধরে নিয়েছে সঙ্গীরা অকৃপনভাবে পরস্পরের সহায়তা করবে। কোনো ধরনের শোষণ কিংবা অপব্যবহৃত হবার সম্ভাবনা এমনকি বিবেচনাতেও আনা হয়নি। এই ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে আপাতদৃষ্টিতে আমার শুরুর বাক্যটির নৈরাশ্যবাদীতা বোধগম্য কিন্তু আজ হলে আমি আরো খানিকটা নমনীয় অবস্থান গ্রহন করতাম। একই ভাবে এই অধ্যায়ের শেষে মানুষের যৌনতায় তাদের ভুমিকা সংক্রান্ত আমার মন্তব্য আমার কাছে এখন মনে হয় খুব বেশী সরলভাবে এখানে শব্দচয়ন করা হয়েছিল। দুটি বই যারা মানুষের যৌনতার ও লিঙ্গ পার্থক্যগুলোর বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছে, সেগুলো হচ্ছে মার্টিন ডালি এবং মার্গো উইলসনের Sex, Evolution, and Behavior এবং ডোনাল্ড সিমন্সের The Evolution of Human Sexuality;
