এই পর্যন্ত এই অধ্যায়টিতে যা আলোচনা করেছি তার একটি সংক্ষেপ রুপ দেবার চেষ্টা করি। বিভিন্ন ধরনের প্রজনন পদ্ধতি যা আমার বিভিন্ন প্রাণীদের মধ্যে লক্ষ্য করি– একগামী, বহুগামিতা, হারেম পদ্ধতি এবং ইত্যাদি আরো অনেক কিছু– সেগুলো বোঝা সম্ভব হবে স্ত্রী ও পুরুষ সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সাংঘর্ষিক স্বার্থের দ্বন্দ্বের ভাষায়। তাদের জীবদ্দশায় দুই লিঙ্গের সদস্যরাই ‘চায়’ মোট প্রজনন সাফল্যতা যতটা সম্ভব ততটা সফল করার চেষ্টা করতে। শুক্রাণু আর ডিম্বাণুর আকারে ও সংখ্যায় মৌলিকভাবে বৈষম্য থাকার কারণে, পুরুষদের সাধারণভাবে প্রবণতা থাকে বহুগামী হবার এবং প্রতিপালনের ক্ষেত্রে পিতা হিসাবে সন্তান প্রতিপালনে অংশগ্রহন না করার। এর বিরুদ্ধে স্ত্রী সদস্যদের দুটি পাল্টা কৌশল আছে, যাদের আমি উল্লেখ করেছি– ‘হি-ম্যান’ এবং ‘ডোমেস্টিক ব্লিস’ কৌশল হিসাবে। কোনো একটি প্রজাতির পরিবেশগত পরিস্থিতি নির্ধারণ করে এই দুটি পাল্টা কৌশলের মধ্যে কোনটিকে স্ত্রী সদস্যরা বেছে নিবে, বা কোনটি বেছে নেবার প্রতি তাদের প্রবণতা থাকবে এবং একইভাবে এটি নির্ধারণ করবে পুরুষরা কিভাবে এর প্রত্যুত্তর দেবে। বাস্তব ক্ষেত্রে হি-ম্যান এবং ডোমেস্টিক ব্লিস স্ট্রাটেজীর মাঝামাঝি সব অবস্থাই খুঁজে পাওয়া যায়, যেমন আমরা দেখেছি, এমনও অনেক ক্ষেত্র যেখানে পিতারা মায়েদের চেয়ে অনেক বেশী সন্তানের যত্ন নেয়। এই বইটি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো প্রাণী প্রজাতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার সাথে সংশ্লিষ্ট না বিধায় আমি আলোচনা করবো না, কোন বিষয়টি একটি প্রজাতিকে কোনো একটির বদলে বরং অন্য একটি বিশেষ প্রজনন কৌশলের দিকে প্ররোচিত করার ক্ষেত্রে ভুমিকা পালন করে। এর পরিবর্তে আমি বরং আলোচনা করবো সেই পার্থক্যগুলো যা আমরা সাধারণভাবে দেখি স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে এবং দেখাতে চাই কিভাবে সেই পার্থক্যগুলো ব্যাখ্যা দেয়া যায়। সেকারণে আমি সেই প্রজাতির উপর বেশী গুরুত্বারোপ করবো না যে প্রজাতিতে দুই লিঙ্গর মধ্যে পার্থক্য সামান্য, এবং সাধারণভাবে এই প্রজাতিগুলো হচ্ছে সেগুলো যাদের স্ত্রী সদস্যরা ‘ডোমেস্টিক ব্লিস’ স্ট্রাটেজী প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করে।
প্রথমত, সাধারণত পুরুষদের দেখা যায় যৌন আকর্ষণীয় রুপে, উজ্জ্বল চটকদার রঙের, এবং স্ত্রী সদস্যদের সাদামাটা অনুজ্জ্বল রঙের হবার প্রবণতা আছে। দুই লিঙ্গের সদস্যরাই চেষ্টা করে কোনো শিকারী প্রাণীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে, এবং কিছুটা বিবর্তনীয় চাপ থাকে দই লিঙ্গর উপরেই তার রঙ যেন অনজ্জ্বল হয়। উজ্জ্বল রঙ সহজেই শিকারী প্রাণীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, যা কোন অংশেই কম নয়, যেমন করে সেই একই রঙ যৌন সঙ্গীকে আকর্ষণ করে। জিনের ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে অনুজ্জ্বল রঙের জিনগুলোর তুলনায়, উজ্জ্বল রঙের জন্য জিনগুলোর শিকারী প্রাণীদের পেটের মধ্যে শেষ হবার অনেক বেশী সম্ভাবনা থাকবে। আবার অন্যদিকে, অনুজ্জ্বল রঙের জন্য জিনগুলো উজ্জ্বল রঙের জিনগুলোর চেয়ে পরবর্তী প্রজন্মের শরীরে নিজেদের খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষাকৃত কম সম্ভাবনা থাকবে। কারণ, অনুজ্জ্বল রঙের সদস্যদের প্রজনন সঙ্গী আকর্ষণ করতে বেশ কঠিন সমস্যা হবে। সুতরাং এখানে দুটি সাংঘর্ষিক নির্বাচনী চাপের উপস্থিতি আছে: শিকারী প্রাণীরা উজ্জল রঙের জিনগুলো জিনপুল থেকে সরিয়ে দেবে আর প্রজনন সঙ্গীদের অনুজ্জ্বল রঙের জিনগুলো জিনপুল থেকে সরিয়ে দেবার প্রবণতা থাকবে। এবং আরো অন্য অনেক ক্ষেত্রের মতই, সফল দক্ষ সারভাইভাল মেশিনকে গন্য করা যেতে পারে এই দুটি সাংঘর্ষিক নির্বাচনী চাপের একটি সমঝোতা হিসাবে। আমাদের যা আগ্রহী করে তুলছে এই মুহূর্তে সেটি হচ্ছে, কোনো পুরুষের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক সমঝোতাটি কোনো স্ত্রী সদস্যদের জন্য সবচেয়ে অনুকূল সমঝোতা থেকে ভিন্ন হবে। এবং এটি পুরোপুরিভাবে পুরুষ সম্বন্ধে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির– বেশী ঝুঁকি নেওয়া, বেশী লাভের জন্য জুয়া খেলা– সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। কারণ একটি পুরুষ সদস্য, স্ত্রী সদস্যের তৈরী প্রতিটি ডিম্বাণু প্রতি বহু মিলিয়ন শুক্রাণু তৈরী করে, শুক্রাণুর সংখ্য খুব স্পষ্টভাবে ডিম্বাণুর চেয়ে অনেক বেশী। কোনো শুক্রাণুর চেয়ে যেকোনো ডিম্বাণুর সেকারণেই যৌন প্রজনন প্রক্রিয়ায় কোনো শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হবার সম্ভাবনা অনেক বেশী। ডিম্বাণু অপেক্ষাকৃতভাবে মূল্যবান একটি সম্পদ এবং সেকারণে কোনো স্ত্রী সদস্যদের বেশী যৌন আকর্ষণীয় হবার কোনো প্রয়োজন নেই, যতটা না কোনো পুরুষ সদস্যের কোনো স্ত্রী সদস্যের ডিম্বাণু নিষিক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিৎ করার জন্য দরকার। কোনো একটি পুরুষ পুরোপুরিভাবে দক্ষ একটি বড় স্ত্রী সদস্যেদের জনগোষ্ঠীর প্রতিটি সন্তানের জন্মদাতা হবার জন্য, এমনকি যদি কোনো পুরুষের জীবন সংক্ষিপ্তও হয় কারণ যার হয়তো চোখে পড়ার মত উজ্জ্বল লেজ শিকারী পাণীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বা কোনো ঝোঁপের মধ্যে আটকে যায়, তারও মৃত্যুর আগে বহু সংখ্যক সন্তান জন্ম দেয়ার সম্ভাবনা থাকে। একজন অনাকর্ষণীয় অনুজ্জ্বল পুরুষ হয়তো বেঁচে থাকতে পারে কোনো একটি স্ত্রী সদস্যদের মত লম্বা সময়, কিন্তু তার সন্তান সংখ্যা কম হবে, তার জিনগুলো হস্তান্তরিত হবে না। সেই পুরুষটির কি লাভ হবে যদি সে সারা পৃথিবী লাভ করে কিন্তু তার অমর জিনগুলো হারায়?
