মাছদের প্রসঙ্গ ছেড়ে, আমি এবার স্ত্রী সদস্যদের অন্য প্রধান কৌশলটি নিয়ে আলোচনা করবো –‘হি-ম্যান স্ট্রাটেজী’। যে সমস্ত প্রজাতিতে স্ত্রী সদস্যরা এই কৌশলগত নীতিমালা ব্যবহার করে– সেখানে কার্যত তারা, তাদের সন্তানদের পিতার কাছ থেকে কোনো সাহায্য চাওয়া থেকে নিজেদের নিবৃত রাখে, এবং এর পরিবর্তে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয় কিভাবে ভালো জিন তারা পেতে পারে। আরো একবার তারা তাদের অস্ত্র ব্যবহার করে মিলনে অস্বীকৃতি জানিয়ে। তারা যেকোনো পুরুষের সাথে মিলনে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু কোনো পুরুষকে তাদের সাথে মিলনের অনুমতি দেবার আগে তারা খুব বেশীমাত্রায় সতর্কতার সাথে বাছ বিচার করে। কিছু পুরুষ নিঃসন্দেহে বহু সংখ্যক ভালো জিন ধারণ করে অন্য পুরুষদের চেয়ে। পুত্র কিংবা কন্যা উভয় সন্তানের ক্ষেত্রেই যে জিনগুলো বাঁচা ও প্রজনন সফল হবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। যদি কোনো একজন স্ত্রী সদস্য কোনো ভাবে পুরুষদের মধ্যে ভালো জিন শনাক্ত করতে পারে, বাহ্যিক কোনো দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য বা ইঙ্গিত দেখে, সে তার নিজের জিনেরই উপকার করবে, ভবিষ্যৎ সন্তানের পিতার ভালো জিনের সাথে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে। নৌকা বাইচের দল নিয়ে আমাদের আগের সেই উদাহরণটা যদি ব্যবহার করি, একটি স্ত্রী সদস্য পারে তার নিজের জিনকে খারাপ জিনদের সাথে সম্পর্ক করার সম্ভাবনাকে যতটুকু সম্ভব হ্রাস করা সম্ভব তা করতে। সে চেষ্টা করতে পারে তার নিজের জিনের জন্য ভালো নৌকাবাইচের সঙ্গী বাছাই করে নিতে।
ভালো সম্ভাবনা আছে যে, কে সবচেয়ে সেরা পুরুষ সেটি নির্ধারণ করার মানদণ্ড নিয়ে অধিকাংশ স্ত্রী সদস্যদের মধ্যে একটি পারস্পরিক ঐক্যমত থাকে, কারণ নির্বাচনের কাজটি শুরু করার সময় তাদের সবার কাছে একই তথ্য থাকে। সুতরাং এই সব অল্প কিছু পুরুষরা বেশীর ভাগ প্রজননের কাজটি করে। এবং কাজটি করার জন্য তারা যথেষ্ট যোগ্য, কারণ তাদের শুধু যা করতে হবে তাহলে প্রতিটি স্ত্রী সদস্যদের কিছু সস্তা শুক্রাণু দান করা। এবং ধারণা করা হয় এটাই ঘটে এলিফ্যান্ট সীল আর বার্ড অব প্যারাডাইজদের ক্ষেত্রে। এই স্ত্রী সদস্যরা শুধুমাত্র অল্প কিছু পুরুষকে তাদের পরিত্যাগ করার সুযোগ দেয় আদর্শ স্বার্থপরতার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কৌশল ব্যবহার করে, যা সব পুরুষই করার জন্য আশা করে থাকে, কিন্তু স্ত্রী সদস্যরা একটা বিষয় নিশ্চিৎ করে যে শুধুমাত্র সেরা পুরুষরা যেন এই বিলাসিতা করার অনুমতি পায়।
কোনো স্ত্রী সদস্যের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, যে শুধু চেষ্টা করছে সবচেয়ে ভালো জিনগুলো বাছাই করার জন্য যার সাথে সে তার নিজের জিনগুলোর সম্মিলন ঘটায়, সে আসলে কোন জিনিসটি সন্ধান করে? একটি জিনিস হচ্ছে সে টিকে থাকার যোগ্যতার প্রমাণ চায়। অবশ্য যে কোনো সম্ভাব্য সঙ্গী যে তার সাথে মিলিত হবার জন্য প্রাক প্রজনন আচরণ করছে সে তার টিকে থাকার যোগ্যতা দিয়েছে অন্তত তার এই প্রাপ্তবয়স্ক বয়স অবধি বাঁচার মাধ্যমে, কিন্তু সে অবশ্যম্ভাবিভাবে কোনো প্রমাণ দিচ্ছে না যে সে আরো অনেকদিন। টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে। সুতরাং একটি ভালো নীতি হতে পারে কোনো স্ত্রী সদস্যের জন্য, তা হলো বয়স্ক পুরুষদের সাথে মিলিত হওয়া। তাদের যে সমস্যাগুলোই থাকুক না কেন, তারা অন্তত প্রমাণ করেছে যে তারা টিকে থাকতে পারে এবং স্ত্রী সদস্যটিরও দীর্ঘায়ু জিনের সাথে তার নিজের একটি মিত্রতা গড়ে তোলার সম্ভাবনা আছে। তবে, কোনো অর্থই হয়না তার সন্তানদের জন্য দীর্ঘ জীবনের নিশ্চয়তা করা, যদি না তারা তাকে সেই সাথে অনেক নাতি-নাতনী উপহার না দেয়। দীর্ঘায়ু পৌরুষদীপ্ততার প্রমাণ নয়। আসলেই একজন দীর্ঘায়ু পুরুষ টিকে থাকে কারণ প্রজনন করার জন্য হয়তো সুনির্দিষ্টভাবে সে কোনো ঝুঁকি নেয়নি। কোনো স্ত্রী সদস্য যে একজন বৃদ্ধ পুরুষকে বাছাই করে সে আবশ্যিকভাবে তার প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো স্ত্রী সদস্য অপেক্ষা বেশী সংখ্যক উত্তরসূরির নিশ্চয়তা পায়না, যে কিনা তরুণ কোনো পুরুষকে বাছাই করে, যে ভালো জিন বহন করার অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য হয়তো প্রদর্শন করে।
অন্য আর কি প্রমাণ আছে? বহু সম্ভাবনা আছে। হয়তো শক্তিশালী মাংসপেশী খাদ্য সংগ্রহ করার জন্য দক্ষতার চিহ্ন বহন করে, হয়তো লম্বা পা, যা প্রমাণ করে শিকারী প্রাণীর আক্রমণ থেকে তার দৌড়ে পালাবার যোগ্যতা। কোনো স্ত্রী সদস্য হয়তো এই সব বৈশিষ্ট্যসহ জিনের সাথে মিত্রতা গড়তে পারে, যেহেতু সেগুলো তার ছেলে কিংবা মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে উপযোগী গুণাবলী হতে পারে। তাহলে, শুরুতেই আমাদের স্ত্রী সদস্যদের কল্পনা করতে হবে তারা পুরুষ সদস্যদের বাছাই করে শুধুমাত্র সুচারুভাবে সত্যিকারের লেবেল বা শনাক্তকারী চিহ্ন দেখে, যা সেই পুরুষদের শরীরে ভালো জিনের উপস্থিতি প্রমাণ করে। কিন্তু এখানে একটি খুব কৌতূহলোদ্দেীপক বিষয় অনুধাবন করতে পেরেছিলেন ডারউইন এবং যার সুস্পষ্ট আর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছিলেন ফিশার। কোনো একটি সমাজে যেখানে পুরুষরা পরস্পরের সাথে প্রতিদ্বন্দিতা করে ‘হি-ম্যান’ হিসাবে স্ত্রী সদস্যদের দ্বারা বাছাই হবার জন্য– সবচেয়ে ভালো যে কাজটি কোনো মা তার জিনের জন্য করতে পারে তাহলো একটি ছেলের জন্ম দেয়া যে তার সময় হলে একজন আকর্ষণীয় ‘হি-ম্যান’এ রূপান্তরিত হবে। যদি সে নিশ্চিৎ করতে পারে তার ছেলে সেই অল্প কিছু ভাগ্যবান পুরুষদের একজন হবে, যারা বেশীর ভাগ প্রজননের সুযোগ অর্জন করে সেই সমাজে, যে সমাজে সে প্রতিপালিত হয়েছে– সে বহুসংখ্যক নাতিনাতনী উত্তরসূরী হিসাবে পাবে। এর ফলাফল হচ্ছে স্ত্রী সদস্যদের চোখে কোনো একটি পুরুষের জন্য সবচেয়ে কাঙ্খিত গুণাবালী হবে, খুব সাধারণভাবেই, যৌন আকর্ষণীয়তা বৈশিষ্ট্যটি নিজেই। কোনো একটি স্ত্রী সদস্য যে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ‘হি-ম্যানের সাথে প্রজনন করে তার সম্ভাবনা থাকে সেই সব পুত্রের জন্ম দেয়া যারা পরবর্তী প্রজন্মের স্ত্রী সদস্যদের কাছেও আকর্ষণীয় হয় এবং যারা তার জন্য প্রচুর সংখ্যক নাতিনাতনীর জন্ম দেবে। মূলত, তাহলে, স্ত্রী সদস্যদের সম্বন্ধে ভাবা যেতে পারে, যারা পুরুষদের নির্বাচন করে সুস্পষ্টভাবে উপযোগী গুণাবলীর উপর ভিত্তি করে, যেমন, শক্তিশালী মাংসপেশী। কিন্তু একবার এইসব গুণাবলী যখন প্রজাতির স্ত্রী সদস্যদের মধ্যে ব্যাপকভাবে গৃহীত হবে আকর্ষণীয় হিসাবে, প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই সব বৈশিষ্ট্যগুলোকে টিকে থাকতে সহায়তা করতে শুরু করবে শুধুমাত্র তারা আকর্ষণীয় এই কারণে।
