সরলতার কারণে, আমি এমনভাবে কথা বলছি যেন পুরুষরা হয় বিশুদ্ধভাবে সৎ নয়তো পুরোপুরিভাবে প্রতারক। বাস্তবে আরো সম্ভাব্য যে সব পুরুষরা, আসলে সব একক সদস্যরা, সামান্য খানিকটা ছলনাকারী, অর্থাৎ তারা এমনভাবে প্রোগ্রাম করা যে তারা তাদের সঙ্গীদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার সুযোগ নেবে। প্রাকৃতিক নির্বাচন, প্রত্যেকটি সঙ্গীর মধ্যে অন্য সঙ্গীর অসততা শনাক্ত করার ক্ষমতা শানিয়ে তোলার মাধ্যমে, বড় মাপের প্রতারণাকে নিয়ন্ত্রণ করে, ফলাফলে প্রতারণার ঘটনা মোটামুটি নিম্ন একটি পর্যায়ে থাকে। পুরুষদের অসৎ হবার লাভ স্ত্রী সদস্যদের অসৎ হবার লাভ থেকে অনেক বেশী এবং আমাদের অবশ্যই প্রত্যাশা করতে হবে যে এমন কি সেই সব প্রজাতির ক্ষেত্রেও যেখানে পুরুষরা যথেষ্ট পরিমান পিতামাতার পরার্থবাদীতা প্রদর্শন করে থাকে, সাধারণত স্ত্রী সদস্যদের চেয়ে তাদের কিছুটা কম কাজ করার প্রবণতা থাকে এবং পরিত্যাগ করার খানিকটা বেশী সম্ভাবনা থাকে। পাখি ও স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে এটি অবশ্যই সাধারণত সত্য।
তবে এমন প্রজাতি আছে, যেখানে পুরুষরা আসলেই তাদের সন্তানদের প্রতিপালন করার জন্য অনেক বেশী কাজ করে কোনো স্ত্রী সদস্যের তুলনায়। পাখি ও স্তন্যপায়ীদের মধ্যে পিতামাতাদের এধরনের নিবেদিত প্রাণ আচরণের উদাহরণগুলো ব্যতিক্রমভাবে খুবই দূর্লভ, কিন্তু মাছদের মধ্যে এটি বেশ পরিমানে দেখা যায়। কেন? (৪) স্বার্থপর জিন তত্ত্বের এই চ্যালেঞ্জটি আমাকে বহু দিন ধরে ভাবিয়েছে। সম্প্রতি আমার একটি টিউটোরিয়াল ক্লাসে একটি উদ্ভাবনী সমাধান প্রস্তাব করেছিলেন মিস টি. আর. কার্লাইল। তিনি সেটি ব্যাখ্যা করার জন্য ট্রিভার্সের ‘জুয়েল বাইন্ড’ (cruel bind) ধারণাটি ব্যবহার করেছিলেন, ১৯৩ পৃষ্ঠায় যে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবে:
বহু মাছই যৌন সঙ্গম করে না বরং এর পরিবর্তে তাদের জনন কোষগুলো তারা শুধুমাত্র খোলা পানিতে উগরে দেয় বমি করা মত। নিষিক্তকরণ পক্রিয়াটি ঘটে খোলা পানিতে, তাদের কোনো সঙ্গীর শরীরের অভ্যন্তরে না, এভাবে সম্ভবত যৌন প্রজনন প্রথম শুরু হয়েছিল। পাখিদের, স্তন্যপায়ী আর সরীসৃপদের মত স্থলবাসী প্রাণীদের জন্য এরকম শরীরের বাইরে নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়াটি পোষায় না, কারণ তাদের জনন কোষগুলোর শুকিয়ে যাবার ঝুঁকি অনেক বেশী। একটি লিঙ্গের জনন কোষগুলোকে– পুরুষের শুক্রাণু, যেহেতু শুক্রাণু সচল, অন্য লিঙ্গের কোনো সদস্যের আর্দ্র অভ্যন্তরে প্রবেশ করানো হয় –স্ত্রী সদস্য। আপাতত এতটুকু হচ্ছে শুধু বাস্তব সত্য। এবার আমরা কিছু ধারণা নিয়ে কথা বলি। যৌন মিলনের পরে, সত্যিকার ভ্রণের দ্বায়িত্ব স্থলবাসী স্ত্রী প্রাণীর কাছেই থাকে। তার শরীরের অভ্যন্তরে এটি অবস্থান করে। এমনকি যদি সে নিষিক্ত ডিম প্রসব করেও থাকে তাৎক্ষণিকভাবে, পুরুষটির হাতে সময় থাকে সেখান থাকে পালিয়ে যাবার, এবং সেভাবেই সে স্ত্রী প্রাণীকে বাধ্য করে ট্রিভার্সের ‘ক্রুয়েল বাইন্ড’ পরিস্থিতিতে আবদ্ধ হতে। অবশ্যম্ভাবীভাবে পুরুষের পূর্বপ্রদত্ত সেই সুযোগটি থাকে, তার সঙ্গীনিকে পরিত্যাগ করতে পারে এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সে আগেই নিতে পারে, যা স্ত্রী সদস্যটি জন্য কোনো বিকল্প পথ খোলা রাখে না এবং সে স্ত্রী সদস্যকে বাধ্য করে সিদ্ধান্ত নিতে, সে কি তার সন্তানকে নিশ্চিৎ মৃত্যু মুখে ফেলে পরিত্যগ করবে নাকি সেই সন্তানের সাথেই থাকবে ও সেটিকে প্রতিপালন করবে। সে-কারণেই স্থলবাসী প্রাণীদের মধ্যে মা কতৃক সন্তান প্রতিপালনের বিষয়টি আমরা পিতা কতৃক সন্তান প্রতিপালনের উদাহরণের চেয়ে অনেক বেশী দেখতে পাই।
কিন্তু মাছ এবং অন্যান্য পানিতে বসবাসকারী প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি খুবই ভিন্ন। যদি পুরুষরা শারীরিকভাবে তাদের শুক্রাণু স্ত্রী সদস্যের শরীরে প্রবেশ না করায়, স্ত্রী সদস্যদের সেখানে এমন কোনো আবশ্যিকতা নেই যে তাদের বাচ্চাদের তাদের সাথে ধরে রাখতে হবে। যেকোনো সঙ্গীই দ্রুত পালিয়ে যাবার প্রচেষ্টা করতে পারে অন্য ন উপর সদ্য নিষিক্ত হওয়া ডিম্বাণুগুলোর দ্বায়িত্ব দিয়ে। এমনকি এখানে একটি সম্ভাব্য কারণও আছে কেন প্রায়শই সঙ্গীদের মধ্যে পুরুষদেরই পরিত্যক্ত হবার ঝুঁকি থাকে বেশী। হতে পারে এখানে বিবর্তনীয় যুদ্ধ গড়ে ওঠে কে প্রথমে জনন কোষ শরীরের বাইরে ছড়িয়ে দেয় সেই প্রশ্নে। সঙ্গীদের ( স্ত্রী কিংবা পুরুষ) মধ্যে যে এই কাজটি করে তার অন্য সঙ্গীর উপর নতুন ভ্রূণের দ্বায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যাবার সুযোগ আছে। আবার অন্য দিকে, যে সঙ্গী প্রথম শরীরের বাইরে তার জনন কোষ ছড়িয়ে দেয়, তার আবার কিন্তু সেই ঝুঁকি থাকে যে তার সম্ভাব্য সঙ্গীটি হয়তো পরে তার জনন কোষ সময়মত নিঃসরণ করে নিষিক্ত করতে করতে ব্যর্থ হতে পারে। এখন এখানে পুরুষ থাকে ঝুঁকির মধ্যে, শুধুমাত্র এর কারণ যদি হয় শুক্রাণুরা হালকা এবং ডিমের চেয়ে সেগুলোর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে বেশী। আর যদি কোনো স্ত্রী প্রাণী আগে বেশী ডিম পারে, যেমন, যদি পুরুষ প্রাণীটি প্রস্তুত হবার আগেই, খুব একটা বেশী কোনো হেরফের হবে না কারণ ডিম, আকারে বড় ও ভারী হবার সুবাদে এবং কিছু সময়ের জন্য সেগুলোর একসাথে পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে গুচ্ছাকারে ভেসে থাকার সম্ভাবনা থাকে। সে-কারণে কোনো স্ত্রী মাছের পক্ষে আগে ডিম পাড়ার ‘ঝুঁকি নেয়া সম্ভব হয়। পুরুষরা সাহস করে এই ঝুঁকি নিতে পারেনা কারণ যদি সে বেশী আগে তার জনন কোষ পানিতে ছাড়ে তার শুক্রাণুগুলো আগেই পানিতে ভেসে দুরে সরে যাবে স্ত্রী প্রাণী ডিম পাড়ার জন্য প্রস্তুত হবার অনেক আগে, এবং সে হয়তো এরপর আর নিজেই ডিম পাড়বে না কারণ তার জন্য এমন কোনো অপচয়ের ঝুঁকি নেয়া যুক্তিযুক্ত হবে না। এই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বার সমস্যার কারণে পুরুষ অবশ্যই অপেক্ষা করতে হবে যতক্ষণ না স্ত্রী প্রাণীরা ডিম পাড়ে এবং তারপর তাকে অবশ্যই ডিম্বাণুর উপরে তার শুক্রাণু ছড়িয়ে দিতে হবে। সুতরাং স্ত্রী সদস্যটির হাতে মূল্যবান কিছু সেকেন্ড আছে, পুরুষটির উপর তার প্রাণগুলোর দ্বায়িত চাপিয়ে যে সময় সে পালিয়ে যেতে পারে এবং ট্রিভার্সের উভয় সংকটটি সরাসরি মোকাবেলা করার জন্য তাকে বাধ্য করতে পারে। সুতরাং এই তত্ত্ব খুব ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে কেন পিতা কতৃক প্রতিপালনের বিষয়টি জলজ প্রাণীদের মধ্যে খুব বেশী দেখা গেলেও কিন্তু স্থলে এটি অপেক্ষাকৃতভাবে দূর্লভ।
