সুতরাং অনেক কিছুই নির্ভর করে সংখ্যাগরিষ্ঠ স্ত্রী সদস্যরা কিভাবে আচরণ করবে। আমাদের যদি অনুমতি দেয়া হয় স্ত্রী সদস্যদের ষড়যন্ত্রের ভাষায় বিষয়টি ভাবতে তাহলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু স্ত্রী সদস্যদের একটি ষড়যন্ত্র বিবর্তিত হতে পারে না, যেমন কিনা ডোভদের ষড়যন্ত্র বিবর্তিত হতে পারেনা, যা আমরা আলোচনা করেছিলাম অধ্যায় ৫ এ। বরং, আমাদের বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল কোনো কৌশল এখানে খুঁজে বের করতে হবে। আসুন আমরা মেনার্ড স্মিথের আগ্রাসী দ্বন্দ্বগুলো বিশ্লেষণের পদ্ধতি গ্রহন করি এবং এটি যৌন প্রজনন ও লিঙ্গ দ্বন্দ্ব ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে সেটি প্রয়োগ করি। (২)।এটি অবশ্যই আরেকটু বেশী জটিল হবে ‘হক’ আর ‘ডোভদের’ উদাহরণ থেকে, কারণ, আমাদের হাতে আছে স্ত্রী সদস্যদের দুটি স্ট্রাটেজী এবং পুরুষ সদস্যদের দুটি স্ট্রাটেজী।
মেনার্ড স্মিথের গবেষণার মতই, “স্ট্রাটেজী’ বা কৌশল শব্দটি বোঝাচ্ছে অন্ধ, অবচেতন একটি আচরণগত একটি প্রোগ্রাম। আমাদের স্ত্রী সদস্যদের দুটি স্ট্রাটেজী বা কৌশলকে বলা হবে, কয় (লাজুক) এবং ‘ফাস্ট (বেপরোয়া)’, আর পুরুষ সদস্যদের দুটি কৌশলকে বলবো ‘ফেইথফুল (বিশ্বাসী)” এবং “ফিলানডেরার (ছলনাকারী)। এই চারটি প্রকারের আচরণের নীতিমালা হচ্ছে এরকম: ‘কয়’ বা লাজুক নারী কোনো পুরুষ সদস্যের সাথে সঙ্গম করবে না যতক্ষণ না পর্যন্ত সে একটি দীর্ঘমেয়াদী, ব্যয়বহুল প্রাক মিলন কোর্টশিপ বা প্রেম কিংবা বাগদান পর্ব সম্পন্ন না করে, যা কয়েক সপ্তাহ ব্যাপী দীর্ঘ হতে পারে। ফাষ্ট’ বা বেপরোয়া স্ত্রী সদস্যরা প্রজনন করে সাথে সাথেই যে কারো সাথেই। ফেইথফুল’ বা বিশ্বাসী পুরুষরা দীর্ঘমেয়াদী একটি সময় প্রাকমিলন কোর্টশীপ আচরণ অব্যাহত রাখে ধৈর্য সহকারে এবং সঙ্গমের পর তারা সন্তান প্রতিপালনে সহায়তা করতে স্ত্রী সদস্যের সাথে থাকে। ‘ফিলানডেরার’ বা হালকাভাবে প্রেমের ভান করা ছলনাকারী কোনো পুরুষ সদস্য দ্রুত তাদের ধৈর্য হারায় যদি স্ত্রী সদস্যরা সাথে সাথেই সঙ্গম না করে, এবং অন্য কোন সম্ভাব্য প্রজনন সঙ্গীর জন্য তারা অন্য জায়গায় তাদের সন্ধান অব্যাহত রাখে, এবং সঙ্গমের পরেও ভালো পিতাদের মত তারা তাদের সন্তানদের মায়ের সাথে বেশী দিন থাকে না বরং অন্য নতুন প্রজনন সঙ্গীর সন্ধানে দ্রুত তাদের পরিত্যাগ করে। হক’ ও ‘ডোভ’ উদাহরণের ক্ষেত্রে যেমন হয় আমরা দেখেছিলাম, শুধুমাত্র এগুলোই সম্ভাব্য কৌশল নাও হতে পারে, কিন্তু তাসত্ত্বেও কৌশলগুলোর পরিণতিগুলো নিয়ে গবেষণা বহু বিষয়ের উপর আলোকপাত করতে পারে।
মেনার্ড স্মিথের মতই, আমরা কিছু কাল্পনিক হাইপোথেটিকাল মূল্যমান ব্যবহার করবো নানা ধরনের মূল্য এবং এর সংশ্লিষ্ট সুবিধাগুলো বোঝাতে। আরো সাধারণভাবে বোঝানোর জন্য এটি করা যেতে পারে বীজগণিতের চিহ্ন ব্যবহার করে। কিন্তু সংখ্যা বোঝা অপেক্ষাকৃত সহজতর। ধরুন, যখন কোনো একটি শিশুকে সফলভাবে প্রতিপালন করা হয়, তখন পিতামাতা পৃথক পৃথকভাবে জিনগত যে লাভ অর্জন করে, সেটি মূল্যমান হচ্ছে: +১৫ ইউনিট। কোন একটি শিশুকে প্রতিপালন করার মূল্য, তাকে খাওয়ানো সব খাদ্যের মূল্য এবং সেই সময় যা তার জন্য ব্যয় করা হয় এবং তাকে রক্ষা করার জন্য যে পরিমান ‘ঝুঁকি নিতে হয়, সেটি মূল্যমান হচ্ছে– ২০ ইউনিট। এই মূল্যমানটি প্রকাশ করা হয়েছে ‘ঋণাত্মক চিহ্ন ব্যবহার করে কারণ এই মূল্য পিতামাতা পরিশোধ করছে। আরো ঋণাত্মক মূল্যমান হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী প্রাক-প্রজনন কোর্টশীপ আচরনের অপচয়কৃত সময়, ধরা যাক তার মূল্যমান হচ্ছে:–৩ ইউনিট।
কল্পনা করুন আমাদের কাছে একটি জনগোষ্ঠী আছে, যেখানে সব স্ত্রী সদস্যরা হচ্ছে ‘কয়’, এবং সব পুরুষরা ‘ফেইথফুল’। এটি একটি আদর্শ একগামী সমাজ। প্রতিটি যুগল, পুরুষ ও স্ত্রী সদস্য উভয়েই গড়পড়তা একই লাভ অর্জন করে। তারা +১৫ পায় প্রতিটি শিশুকে প্রতিপালন করার জন্য। তারা দুজনে সেই সন্তানটিকে পালন করার জন্য মূল্যটি (-২০) সমানভাবে ভাগ করে নেয়, অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্য গড়ে:–১০। দীর্ঘ কোর্টশীপ পর্বের জন্য তারা দুজনেই–৩ পয়েন্ট শাস্তি হিসাবে মূল্য পরিশোধ করে। তাহলে গড়পড়তায় তারা মাথাপিছু মোট লাভ করে; +১৫-১০-৩=+২;
এখন মনে করুন একজন ‘ফাস্ট’ কৌশলের স্ত্রী সদস্য সেই জনগোষ্ঠীতে প্রবেশ করে। সে খুবই সফল হয়। প্রাক-প্রজনন বিলম্ব করার জন্য তাকে কোনো নম্বর শাস্তি হিসাবে দিতে হয়না। কারণ সে সময় নষ্ট করে না দীর্ঘমেয়াদী কোনো কোর্টশীপ আচরণে। যেহেতু সব পুরুষ সেই জনগোষ্ঠীতে ‘ফেইথফুল’, সে মোটামুটি ভরসা রাখতে পারে তার সন্তানদের জন্য সে ভালো পিতা পাবে, যার সাথেই সে প্রজনন করুক না কেন। তার গড়পড়তা লাভ সন্তান প্রতি তাহলে হবে: +১৫-১০=+৫; সুতরাং সে তার ‘কয়’ বা লাজুক প্রতিদ্বন্দ্বী স্ত্রী সদস্যদের তুলনায় +৩ ইউনিট বেশী পায়। সুতরাং এই ‘ফাস্ট’ স্ত্রী সদস্যের ‘জিন’ জনগোষ্ঠীর জিন পুলে বিস্তার লাভ করতে শুরু করে।
ফাস্ট স্ত্রী সদস্যদের যদি সাফল্য এতই বেশী পরিমানে হয় যে জনগোষ্ঠীতে তারা প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করে, পুরুষদের ক্ষেত্রেও তাহলে কিছু পরিবর্তন আসতে শুরু করে। আপাতত যেখানে ‘ফেইথফুল’ কৌশলের পুরুষরা প্রাধান্য বিস্তার করতো, কিন্তু এখন ‘ফিলানডেরার’ বা ছলনাকারী পুরুষ কৌশলের আবির্ভাব হয় সেই জনগোষ্ঠীতে, সে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ‘ফেইথফুল’ বা বিশ্বাসী পুরুষ সদস্যদের চেয়ে অনেক বেশী ভালো করতে শুরু করবে। কোনো। একটি জনগোষ্ঠীতে যেখানে ‘ফাস্ট’ স্ত্রী সদস্যদের প্রাধান্য বেশী, সেখানে কোনো ‘ছলনাকারী’ পুরুষদের সঙ্গী জয় করা খুব সহজ একটি কাজ, এবং তারা দ্রুত সফলও হয়। সে মোট +১৫ পয়েন্ট পায় যদি কোনো শিশু সফলভাবে প্রতিপালিত হয় এবং তাকে কোনো ধরনের মূল্য পরিশোধ করতে হয় না। এই মূল্য পরিশোধ না করার আসল অর্থ হচ্ছে তার সঙ্গীকে পরিত্যাগ করার জন্য এবং নতুন স্ত্রী সদস্যদের সাথে প্রজনন করার জন্য সে স্বাধীন। তার সব দুর্ভাগা স্ত্রী সদস্যরা একা একাই তাদের সন্তানদের প্রতিপালন নিয়ে সংগ্রাম করে, তাদের পুরো– ২০ পয়েন্ট মূল্য পরিশোধ করতে হয়। একা একাই। যদিও সেই স্ত্রী সদস্যদের প্রাক-মিলন কোর্টশীপের জন্য কোনো ঋণাত্মক পয়েন্ট মূল্য হিসাবে পরিশোধ করতে হয় না; যখন ‘ফাস্ট’ স্ত্রী সদস্য কোন “ছলনাকারী’ পুরুষের সাথে মিলিত হয় তখন তার মোট লাভের পরিমান, +১৫-২০=-৫; আর লম্পট পুরুষদের জন্য এটি +১৫। কোনো একটি জনগোষ্ঠীতে যেখানে সব স্ত্রী সদস্যরা ‘ফাস্ট’ কৌশল অনুসরণ করেন, সেখানে ‘ছলনাকারী’ পুরুষরা অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে, দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে।
