আবার বিবেচনা করুন সেই প্রজনন যুগলদের, যাদের দিয়ে এই অধ্যায়টি শুরু করেছিলাম। উভয় সঙ্গী বা সঙ্গীনি, স্বার্থপর একটি মেশিন হিসাবে সমান সংখ্যক পুত্র ও কন্যার জন্ম দিতে চায়। এই পর্যন্ত তারা একমত। তাদের যেখানে মতের মিল হয়না সেটি হচ্ছে এই প্রত্যেকটি সন্তান প্রতিপালন করার দ্বায়িতেও সিংহভাগ কে বহন করবে। প্রতিটি সদস্য চায় যত বেশী সম্ভব তত সংখ্যক জীবিত সন্তান। যত কম কোনো সন্তানের জন্য বিনিয়োগ করতে তাকে বাধ্য হতে হবে তত বেশী সন্তানের জন্ম সে দিতে পারবে। এই কাঙ্খিত পরিস্থিতি অর্জন করার একটি সুস্পষ্ট উপায় হচ্ছে আপনার যৌন সঙ্গীকে প্ররোচিত করা, সে যেন তার সম্পদের নায্য যে ভাগ বিনিয়োগ করার কথা তারচেয়ে বেশী পরিমান সম্পদ প্রতিটি শিশুর প্রতিপালনের জন্য বিনিয়োগ করে, যা অন্য কোনো সঙ্গী/সঙ্গীনির সাথে আরো সন্তান উৎপাদন করতে আপনাকে মুক্ত করে। যেকোনো লিঙ্গের সদস্যের জন্য এটাই কাঙ্খিত কোনো কৌশল হবার কথা। কিন্তু নারীদের জন্য এটি অর্জন করা খুব কঠিন, কারণ সে শুরুই করে পুরুষদের চেয়ে বেশী পরিমানে বিনিয়োগ করে। তার বড়, পুষ্টি সমৃদ্ধ ডিম রুপে কোনো একটি মা সেই ভ্রুণটিকে নিষিক্ত হবার মূহুর্ত থেকে প্রতিটি সন্তানের প্রতি গভীরভাবে দায়বদ্ধ তার পিতার তুলনায়। যদি শিশুটি মারা যায় তার পিতার চেয়ে তার মায়ের ক্ষতির পরিমান অনেক বেশী হবে। আরো মূল কথাটি হচ্ছে ‘ভবিষ্যতে তাকে কোনো পিতার চেয়ে আরো বেশী বিনিয়োগ করতে হবে বিকল্প আরেকটি শিশুকে সেই অবধি বড় করে তুলতে। যদি মা পিতার কাছে শিশুকে রেখে চলে যাবার সেই কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করে, যখন মা কোনো পুরুষ সঙ্গীর সাথে চলে যায়, শিশুর পিতা হয়তো, অপেক্ষাকৃতভাবে তার জন্যে অনেক কম ক্ষতি স্বীকার করে নিয়ে সে নিজেও শিশুটিকে পরিত্যাগ করে এর বদলা নিতে পারে। সেকারণে অন্তত শিশুর বেড়ে ওঠার প্রাথমিক স্তরে, যদি পরিত্যাগ করার মত কোনো ঘটনা ঘটে, পিতারই সন্তানসহ মাকে পরিত্যাগ করার সম্ভাবনা অনেক বেশী এর বিপরীত কোনো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনার তুলনায়। একইভাবে স্ত্রী সদস্যদের কাছে প্রত্যাশা করা যেতে পারে পুরুষের চেয়ে তারাই শিশুর জন্য বেশী পরিমান বিনিয়োগ করে, শুধু শুরুর মুহূর্তেই না, তাদের বেড়ে ওঠার পুরোটা সময় ধরে। সুতরাং স্তন্যপায়ীদের জন্য যেমন, স্ত্রী সদস্যরাই তাদের নিজেদের শরীরে ভ্রূণকে ধারণ ও লালন পালন করে। স্ত্রী সদস্যরা দুধ তৈরী করে তাদের স্তনগ্রন্থিতে, যেন জন্ম হবার পর থেকে শিশুটি তা চুষে পান করার সুযোগ পায়, এবং স্ত্রী সদস্যরাই সন্তানদের প্রতিপালন আর সুরক্ষা করার মূল ভারটি বহন করে। স্ত্রী লিঙ্গের সদস্যরা স্বার্থপর উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় এবং এমন কিছু হবার মৌলিক বিবর্তনীয় ভিত্তি হচ্ছে সেই বাস্তব সত্যটি, সেটি হচ্ছে ডিম্বাণুগ শুক্রাণু থেকে আকারে বড়।
সন্তানদের প্রতিপালন করার ক্ষেত্রে অবশ্যই অনেক প্রজাতিতে পিতারাও বিশ্বস্ততার সাথে কঠোর পরিশ্রম করে। কিন্তু এমনকি তারপরও, আমাদের অবশ্যই প্রত্যাশা করতে হবে প্রতিটি শিশুর পেছনে খানিকটা কম বিনিয়োগ এবং ভিন্ন ভিন্ন স্ত্রী সদস্যদের দ্বারা আরো বেশী সন্তান উৎপাদন করার প্রচেষ্টা করা জন্যে সাধারণভাবেই পুরুষ সদস্যদের উপর একটি বিবর্তনীয় চাপ থাকবে। এটা দিয়ে আমি শুধু বোঝাতে চেয়েছি জিন পুলে সফল হবার জন্য সেই জিনদের একটি প্রবণতা থাকে বলার যে, ‘শরীর যদি তুমি পুরুষ হও, তাহলে তোমার সঙ্গীদের ছেড়ে একটু আগে চলে যাও, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যালিল তোমাকে যা করতে বলতো তার আগে এবং অন্য সঙ্গীনি খোঁজার ব্যবস্থা করো। ঠিক কি পর্যায় অবধি এই বিবর্তনীয় চাপ আসলেই কাজ করে, ব্যবহারিক অর্থে প্রজাতি ভেদে সেটি ভিন্ন হয়; অনেক প্রাণী, যেমন, বার্ডস অব প্যারাডাইস পাখিদের স্ত্রী সদস্যরা পুরুষ সদস্যদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পায় না এবং সন্তানদের তারা নিজেরাই এককভাবে প্রতিপালন করে। অন্য প্রজাতি যেমন, কিটিহকরা যারা একগামী জুটি বাধে দৃষ্টান্তমূলক বিশ্বস্ততার সাথে এবং উভয় সঙ্গী তাদের সন্তান প্রতিপালনে পরস্পরকে সহায়তা করে। এখানে আমাদের অবশ্যই কোনো বিবর্তনীয় বিপরীতমুখী চাপের কথা ভাবতে হবে যাঃ অবশ্যই স্বার্থপরতার মাধ্যমে সঙ্গীকে নিজের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কৌশলের সংশ্লিষ্ট যেমন শাস্তি, তেমনি সুবিধা, এবং কিটিহকদের এই ক্ষেত্রে এই শাস্তি তাদের লাভের চেয়ে বেশী। তবে যেকোনো ক্ষেত্রেই তার স্ত্রী আর শিশুকে পরিত্যাগ করলে কোনো একটি পিতার জন্য শুধুমাত্র লাভ হয়, যদি স্ত্রী সদস্যটির ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গতভাবে ভাবা যেতে পারে সে একাই সন্তানের প্রতিপালন করতে পারবে।
সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো ট্রিভার্স বিবেচনা করেছিলেন যা কিনা কোনো একটি মা নিতে পারে, যাকে তার সঙ্গী পরিত্যাগ করেছে; তার জন্য সবচেয়ে উত্তম হবে অন্য আরেকজন পুরুষকে প্রতারণা করার চেষ্টা করা, যেন সে তার সন্তানকে নিজের সন্তান ভেবে গ্রহন করে (পোষক হিসাবে)। যখন ভ্রূণটি গর্ভে থাকে, এখনও যার জন্ম হয়নি, তখন খুব একটি কঠিন কাজ হয় না এটি। অবশ্যই, যদিও শিশুটি তার অর্ধেক জিন বহন করে, কিন্তু সে সহজেই বিশ্বাসপ্রবণ’ সৎ-বাবার কোনো জিন বহন করে না। প্রাকৃতিক নির্বাচন কঠোরভাবে পুরুষদের এ ধরনের ‘বিশ্বাসপ্রবণতার শাস্তি দেয় এবং আসলেই সেই সব পুরুষদের সহায়তা করে যারা যেকোনো সৎ সন্তানদের হত্যা করতে সক্রিয় পদক্ষেপ নেয় যখনই সে তার নতুন স্ত্রী সঙ্গীনির সাথে প্রজনন শুরু করে। খুব সম্ভবত এটাই উপযুক্ত ব্যাখ্যা হতে পারে তথাকথিত সেই ‘ব্রুস’ ইফেক্ট প্রভাবের (Bruce Effect): পুরুষ ইঁদুররা একটি রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে যখন সেটির গন্ধ শুঁকলে কোনো গর্ভবতী স্ত্রী ইঁদুরের গর্ভপাতের কারণ হতে পারে। এবং শুধুমাত্র তার গর্ভপাত ঘটে যদি গন্ধটি তার প্রাক্তন সঙ্গীর গন্ধ থেকে ভিন্ন হয়। এভাবে কোনো পুরুষ ইঁদুর তার সম্ভাব্য সব সৎ সন্তানদের বিনষ্ট করে এবং তারা নতুন স্ত্রী সদস্যদের তার নিজের যৌন প্রজননে অংশগ্রহন করার উপযোগী করে প্রস্তুত করে। আর্জ্যে, ঘটনাচক্রে, ব্রুস ইফেক্টটিকে দেখেছিলেন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার একটি পদ্ধতি হিসাবে! একই ধরনের আরো একটি উদাহরণ হচ্ছে পুরুষ সিংহরা, যারা যখন কোনো একটি প্রাইডে (সিংহদের একটি গ্রুপ, ফ্যামিলি ইউনিট) নতুন প্রবেশ করে, তারা মাঝে মাঝে। সেখানে জীবিত সব সিংহ-শাবকদের হত্যা করে এবং সম্ভবত এর কারণ তারা তাদের নিজেদের সন্তান নয়।
