যদি পিতামাতা আর তাদের সন্তানদের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত থাকে, যারা একে অপরের ৫০ শতাংশ জিন বহন করে, তাহলে সহজেই বোধগম্য আরো কত বেশী মাত্রায় স্বার্থের সংঘাত থাকতে পারে প্রজনন সঙ্গীদের মধ্যে, যারা জিনগতভাবে পরস্পরের অনাত্মীয় (১)? তাদের মধ্যে যে একটি মাত্র সাধারণ বিষয় আছে সেটি হচ্ছে তারা তাদের একই সন্তানদের শরীরে ৫০ শতাংশ জিনগত অংশীদারিত্ব দাবী করে। যেহেতু বাবা ও মা দুজনেই একই সন্তানদের ভিন্ন অর্ধাংশগুলোর কল্যাণের ব্যপারে আগ্রহী, সে কারণে সেই সন্তানদের প্রতিপালন করার জন্য একে অপরের সহযোগিতা করলে অবশ্যই দুজনের কিছু উপকৃত হবার সম্ভাবনা থাকে। পিতামাতার দুজনের মধ্যে একজন যদি প্রতিটি সন্তান প্রতিপালনে তাদের মূল্যবান সম্পদের নায্য অংশ বিনিয়োগ না করেই পার পেয়ে যায়, সেটা তার জন্য সুবিধাজনক হবে, কারণ সে তাহলে তার অন্য যৌনসঙ্গীর মাধ্যমে জন্ম দেওয়া অন্য সন্তানদের জন্য আরো খানিকটা সম্পদ ব্যয় করতে পারবে, সুতরাং সে তার জিনগুলো আরো বেশী বিস্তার করতে পারবে। প্রতিটি সঙ্গীকে সেকারণেই ভাবা যেতে পারে পরস্পরকে তাদের নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে, অন্যজনকে তার ভাগের বেশী পরিমান সম্পদ বিনিয়োগ করার জন্য বাধ্য করতে চেষ্টা করছে। আদর্শ কোনো পরিস্থিতিতে, কোনো একক সদস্য হয়তো পছন্দ করবে (আমি শারীরিকভাবে উপভোগ করার কথা বলছি না, যদিও সেটি সে করতেই পারে) তার বিপরীত লিঙ্গের যতটা সম্ভব পারা যায় এমন সংখ্যক সদস্যদের সাথে প্রজনন করতে, এবং প্রতিবারই সেই সঙ্গীদের পরিত্যাগ করতে, যেন সেই সন্তানের প্রতিপালনের দায়ভার তার সেই পরিত্যক্ত সঙ্গী/সঙ্গীনির উপর বর্তায়। আমরা নানা উদাহরণের সহায়তায় দেখবো বহু প্রজাতিতে পুরুষ সদস্যরা এই পরিস্থিতিটি অর্জন করেছে, কিন্তু অন্য অনেক প্রজাতিতে পুরুষরা বাধ্যভাবে সন্তান। প্রতিপালনের সমপরিমান দ্বায়িত্ব পালন করে। যৌন-অংশদারীত্বের এই দৃষ্টিভঙ্গি, পারস্পরিক অবিশ্বাস আর পারস্পরিক নিজ স্বার্থে ব্যবহার করার সম্পর্ককে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন ট্রিভার্স। পাণি-আচরণবিদদের জন্য এটি তুলনামূলকভাবে একটি নতুন ধারণা। যৌন আচরণ, সঙ্গম এবং সঙ্গী নির্বাচন পুর্ববর্তী নানা আচরণ বা কোর্টিং সম্বন্ধে আমরা সাধারণত যা ভেবে এসেছি সেটি হচ্ছে আবশ্যিকভাবে এগুলো একধরনের সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ, যা গ্রহন করা হয় পারস্পরিক সুবিধার্থে অথবা এমনকি প্রজাতির কল্যাণের জন্য!
আসুন আবার আমরা একেবারে সেই প্রথম মূলনীতিতে ফিরে যাই। এবং অনুসন্ধান করি পুরুষ আর স্ত্রী সদস্যদের মৌলিক প্রকৃতিটি আসলে কি রকম। তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা যৌনতা নিয়ে আলোচনা করেছি এর মূল অপ্রতিসাম্যতার উপর গুরুত্বারোপ না করে। আমরা শুধু মেনে নিয়েছি যে, কিছু প্রাণী সদস্যকে আমরা বলছি পুরুষ আর অন্যদের স্ত্রী, এই শব্দগুলো আসলে কি বোঝাচ্ছে সেই পশ্নটির জিজ্ঞাসা না করেই। কিন্তু পুরুষত্বের সেই সারবস্তুটি আসলে কি? আর মূল সেই বিষয়টিই বা কি যা কোনো স্ত্রী সদস্যকে স্ত্রী লিঙ্গের সদস্য হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে? আমরা স্তন্যপায়ী হিসাবে দেখি লিঙ্গগুলোকে সংজ্ঞায়িত করছে একগুচ্ছ বৈশিষ্ট্যের দ্বারা: পুরুষাঙ্গের উপস্থিতি, সন্তান ধারণ, বিশেষ দুধ উৎপাদনের গ্রন্থির মাধ্যমে দুধ পান করানো, কিছু নির্দিষ্ট ক্রোমোজোম সংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি। প্রজাতির সদস্যদের লিঙ্গ বিচার করার এই সব মানদণ্ড স্তন্যপায়ীদের জন্য বেশ ভালোভাবেই কাজ করে, কিন্তু অন্যান্য প্রাণী আর উদ্ভিদের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে সেগুলো ট্রাউজার বা প্যান্ট পরা দেখে মানুষের লিঙ্গ বিচার করার মতই কোনো অংশেই বেশী নির্ভরযোগ্য উপায় নয়। যেমন, ধরুন, ব্যাঙের ক্ষেত্রে, তাদের কোনো লিঙ্গেরই কোনো পুরুষাঙ্গ থাকে না। হয়তো, তাহলে, স্ত্রী, পুরুষ শব্দ দুটির কোনো সাধারণ সর্বজনীন অর্থ নেই। তারা সর্বোপরি হয়তো শুধুমাত্র শব্দ এবং যদি আমরা তাদের উপযোগী শব্দ না ভাবি ব্যাঙদের বর্ণনা করার জন্য, আমরা অবশ্যই স্বাধীন তাদের পরিত্যাগ করার জন্য। আমরা ইচ্ছামত মনগড়া উপায়ে ব্যাঙদের ভাগ করতে পারি লিঙ্গ ১ এবং লিঙ্গ ২ হিসাবে, যদি আমরা চাই। তবে, প্রাণী আর উদ্ভিদ সবার ক্ষেত্রেই দুই লিঙ্গেরই জন্য একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য আছে, যা কিনা পুরুষ সদস্যকে পুরুষ আর স্ত্রী সদস্যকে স্ত্রী হিসাবে চিহ্নিত করতে ব্যবহার করা যেতে পারে। সেটি হচ্ছে, পুরুষদের ‘গ্যামেট বা জনন কোষ আকারে স্ত্রী সদস্যদের জনন কোষের তুলনায় আকারে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র এবং সংখ্যায় অগণিত এবং এটি সত্য আমরা প্রাণী কিংবা উদ্ভিদ, যাদের কথাই আলোচনা করি না কেন। জীব সদস্যদের একটি গ্রুপের জনন কোষ আকারে বড় এবং তাদের ক্ষেত্রে না “স্ত্রী’ শব্দটি ব্যবহার করা সুবিধাজনক। অন্য গ্রুপটিকে সুবিধার খাতিরে আমরা বলতে পারি ‘পুরুষ’, যাদের ক্ষুদ্রাকৃতির জনন কোষ আছে। এই পার্থক্যটি সবচেয়ে বিশেষভাবে সুস্পষ্ট সরীসৃপ আর পাখিদের ক্ষেত্রে, যেখানে একটি একক ডিম্বাণু কোষ হচ্ছে আকারে যথেষ্ট বড় এবং পুষ্টিকর খাদ্যপুর্ণ, যা কোনো বিকাশমান প্রাণকে বেশ কয়েক সপ্তাহ অবধি পুষ্টি জোগাতে পারে। এমনকি মানুষের ক্ষেত্রেও যখন ডিম্বাণু এর আকৃতিতে আণুবীক্ষণীক, তারপরও সেটি শুক্রাণু অপেক্ষা আকারে অনেক বেশী মাত্রায় বড়। পরবর্তী আলোচনায় যেমন আমরা দেখবো আসলেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব যে এই দুটি লিঙ্গের মধ্যে অন্যান্য সব পার্থক্যগুলোর এই একটি মৌলিক পার্থক্য থেকেই উদ্ভব হয়েছে।
