স্পষ্টতই বেশ কিছু বিষয় এখানে ভুল। দুটো যুক্তিই অতি সরলীকরণ করে এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমার এই উল্টো করে সাজানো উদ্ধৃতি আলেকজান্ডারের বিপরীত কোনো বিষয়কে প্রমাণ করছে না বরং শুধুমাত্র দেখাচ্ছে যে আপনি তর্ক করতে পারবেন না ঐ ধরনের কৃত্রিম কোনো অপ্রতিসম উপায়ে। আলেকজান্ডারের যুক্তি এবং আর আমার এটি উল্টো করে সাজানো দুটোই ভুল করেছে কোন একটি একক সদস্যের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পুরো ব্যাপার দেখে– আলেকজান্ডারের ক্ষেত্রে, পিতামাতা, আমার ক্ষেত্রে তাদের সন্তান। আমি বিশ্বাস করি এই ধরনের ভুল খুব সহজেই করা সম্ভব যখন আমরা এখানে ‘ফিটনেসের মত কোনো কারিগরী বিশেষ অর্থবাচক শব্দ ব্যবহার করি। একারণে আমি এই বইতে শব্দটি ব্যবহার করা থেকে বিরত থেকেছি। বিবর্তনের ক্ষেত্রে আসলেই শুধুমাত্র এটি সত্তা থাকে যার দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ আর সেই সত্তাটি হচ্ছে স্বার্থপর জিন। কোনো তরুণ প্রাণীদের শরীরে জিনরা নির্বাচিত হতে তাদের পিতামাতার শরীরকে বোকা বানানোর দক্ষতার উপর ভিত্তি করে; পিতামাতার শরীরে জিনরা নির্বাচিত হবে তাদের তরুণ সন্তানদের বোকা বানানোর মাধ্যমে। সেই বাস্তব সত্যটিতে কোনো স্ববিরোধী ধাঁধা নেই যে সেই একই জিন ধারাবাহিকভাবে একটি তরুণ শরীরে এবং এরপর একটি পিতামাতার শরীরে বাস করে। জিনরা নির্বাচিত হয় তাদের হাতে থাকা ক্ষমতা সঠিক সদ্ব্যবহার করার যোগ্যতার উপর ভিত্তি করে তারা তাদের বাস্তব সুযোগগুলো তাদের স্বার্থে ব্যবহার করে। যখন কোনো জিন একটি অপ্রাপ্তবয়স্কের শরীরে বাস করে তার ব্যবহারিক সুযোগ ভিন্ন হবে যখন এটি কোনো পিতামাতার শরীরে বাস করে। সেকারণে এর সবচেয়ে উপযুক্ত নীতিমালাও ভিন্ন হবে জীবনের ইতিহাসের দুটি পর্বে। কোন কারণ নেই মনে করা যেমন আলেকজান্ডার করেছেন, এবং পরের উপযুক্ত নীতিমালার আবশ্যিকভাবে এর আগের নিয়মকে বাতিল করে দেয় নতুন নিয়ম আরোপ করে।
আলেক্সান্ডারের যুক্তির বিরুদ্ধে প্রস্তাব দাঁড় করানোর আরেকটি উপায় আছে। তিনি অনুক্তভাবে মেনে নিয়েছেন যে একটি মিথ্যা অসাম্যতা থাকে যেমন একদিকে পিতামাতা/সন্তানের সম্পর্কে, এবং অন্যদিকে ভাই/বোনের সম্পর্কের মধ্যে। আপনি মনে করতে পারবেন যে, ট্রিভার্সের মতে, একটি স্বার্থপর শিশুর তার নায্যভাবে প্রাপ্য ভাগের বেশী কিছু কেড়ে নেবার বিনিময় মূল্য কি হতে পারে। এবং সে একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত শুধু কেড়ে নেবার এই চেষ্টা করে তার কারণ হচ্ছে, এরপরে সেটি তার ভাইবোনদের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়, যারা প্রত্যেকেই তার অর্ধেক জিন বহন করে। কিন্তু ভাইবোনরা হচ্ছে শুধুমাত্র একটি বিশেষ ধরনের আত্মীয় যাদের ৫০ শতাংশ আত্মীয়তা থাকে। কোনো স্বার্থপর সন্তানের নিজের ভবিষ্যৎ সন্তান কম বা বেশী ‘মূল্যবান’ নয় তার নিজের ভাই এবং বোনদের তুলনায়। সুতরাং আপনার নিজের নায্য ভাগের চেয়ে বেশী দখল করে নেবার মোট মূল্য পরিমাপ করার উচিৎ শুধুমাত্র হারানো ভাইবোনদেরই দিয়ে না বরং আপনার ভবিষ্যত সন্তানদের পরিমাপেও, ভাইবোনদের মধ্যে স্বার্থপর দ্বন্দ্বে যাদের হারিয়েছেন। আপনার নিজের সন্তানদের মধ্যে শৈশবের স্বার্থপরতা বিস্তার লাভ করার অসুবিধা নিয়ে আলেক্সান্ডারের যুক্তি, যার মাধ্যমে আপনার নিজের দীর্ঘমেয়াদী প্রজনন সাফল্যের ঘাটতি হবে, খুব ভালোভাবে গৃহীত হয়েছে, কিন্তু শুধুমাত্র সেটি যা বোঝায় তা হলো আমাদের অবশ্যই যোগ করতে হবে সমীকরণের মূল্য পরিশোধ সংক্রান্ত দিকে। কোনো একক সদস্য তারপরও ভালো করবে স্বার্থপর হয়ে, যতক্ষণ না তার জন্য মোট সুবিধা অন্তত তার আপন স্বজনের পরিশোধিত মূল্যের অর্ধেক। কিন্তু নিকটাত্মীয় বলতে শুধুমাত্র ভাইবোন না বরং কারো নিজের ভবিষ্যৎ সন্তানদের কথাও ভাবতে হবে। কোনো একক সদস্যর উচিৎ হবে তার নিজের কল্যাণটি তার ভাইয়ের কল্যাণের চেয়ে দ্বিগুণ মূল্যবান হিসাবে গন্য করা, এবং এটাই মূল প্রাকধারণা যা কিনা ট্রিভার্স করেছিলেন। কিন্তু একই সাথে সে তার নিজেকে দ্বিগুণ মূল্যবান ভাববে তার নিজের ভবিষ্যত সন্তানদের তুলনাতেও। আলেকজান্ডারের উপসংহারটি যে, আসলেই অন্তর্নিহিত কিছু সুবিধা আছে স্বার্থের এই সংঘাতে পিতামাতার পক্ষে, সেটি আসলে ঠিক নয়।
তার মৌলক জিন সংক্রান্ত যুক্তিটি ছাড়াও, আলেকজান্ডার আরো বেশ কিছু ব্যবহারিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি আছে, পিতামাতা/শিশুর অনস্বীকার্যভাবে অপ্রতিসম সম্পর্কের মধ্যে যার সূচনা হয়েছে। পিতামাতা হচ্ছে সক্রিয় অংশীদার, যে আসলেই মূল কাজগুলো করে, যেমন, খাদ্য সংগ্রহ এবং এটি সেকারণে এমন একটি অবস্থানে আছে যা কিনা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যদি পিতামাতা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা সেই কষ্টটি আর করবে না, শিশুটির আসলে তখন সে ব্যাপারে কিছু করার থাকে না, কারণ এটি আকারে ছোট, এবং কোনো প্রত্যুত্তর দেবার মত ক্ষমতা নেই। সুতরাং পিতামাতা হচ্ছে এমন একটি অবস্থানে আসীন যেখানে সে তার নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারে, শিশুটির নিজের চাহিদা যাই থাকুক না কেন। এই যুক্তি অবশ্যই ভুল নয়, কারণ এখানে অসাম্যতা যা এটি প্রস্তাব করছে তা আসলেই সত্যিকারের। পিতামাতারা আসলে আকারে বড়, শক্তিশালী এবং শিশু সন্তানদের তুলনায় ব্যবহারিক অনেক জ্ঞান রাখে। মনে হতে পারে আসলেই তাদের হাতে সব ভালো তাশগুলো আছে। কিন্তু শিশু সন্তানদেরও হাতেও কিছু শক্তিশালী অস্ত্র আছে। যেমন, কোনো পিতামাতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জানা যে তার প্রতিটি সন্তানের কে কতটা ক্ষুধার্ত, সুতরাং সে যেন সর্বোত্তম উপায়ে তাদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করতে পারে। তারা অবশ্যই তাদের সবার জন্য সমানভাবে খাদ্য রেশন করে বিলি করতে পারে, কিন্তু সম্ভাব্য সর্বোত্তম কোনো পরিস্থিতিতে এটি তেমন দক্ষ কোনো পদ্ধতি হবে না সেই পদ্ধতির তুলনায়, যেখানে যারা সত্যিকারভাবে বেশী পেলে সবচেয়ে বেশী উপকৃত হবে তাদের কিছুটা বেশী যদি দেয়া হয়। একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে প্রতিটি শিশু তাদের পিতামাতাকে জানায় যে তারা কতটা ক্ষুধার্ত সে, সেটি আসলে পিতামাতার জন্য সবচেয়ে উপযোগী পদ্ধতি হবে। এবং যেমনটি আমরা দেখেছি,এই ধরনের সিস্টেম বিবর্তিতও হয়েছে। কিন্তু তরুণ শিশুরা মিথ্যা করার বলার জন্য সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকে কারণ তারা জানে আসলেই ঠিক কতটা ক্ষুধার্ত তারা, যখন পিতামাতা শুধুমাত্র অনুমান করতে পারে তারা সত্যি কথা বলছে কি বলছে না। পিতামাতার পক্ষে অসম্ভব ছোট খাটো কোনো মিথ্যা কথা শনাক্ত করা। যদিও তারা বড়সড় মিথ্যা ঠিকই শনাক্ত করতে পারে।
