বেশ কিছু বিচিত্র কারণে, মেদাওয়ারের বৃদ্ধ হবার তত্ত্বটির সাথে যা হয়তো সংশ্লিষ্ট (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ৫১), নারীরা তাদের প্রাকৃতিক অবস্থায় বয়স বাড়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে সন্তান প্রতিপালনে অপেক্ষাকৃত অদক্ষ হয়ে ওঠে। সেকারণে কোনো একটি বয়স্ক মায়ের শিশুর প্রত্যাশিত জীবনের আয়ুষ্কাল একটি তরুণী মায়ের জন্ম দেয়া সন্তানের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কালের চেয়ে বেশ কম হবে। এর অর্থ হচ্ছে যদি কোনো নারী একটি শিশুর জন্ম দেয় এবং একই দিনে তার একটি নাতির জন্ম হয়, তার নাতি তার সন্তানের চেয়ে বেশী দিন বাঁচবে এমন প্রত্যাশা করা যায়। যখন কোনো নারী এমন একটি বয়সে পৌঁছায় যখন তার প্রতিটি জন্ম দেয়া সন্তানের প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে পৌঁছাবার গড় সম্ভাবনা সেই একই বয়সের তার নাতি নাতনীর পূর্ণবয়স্ক হবার সম্ভাবনার অর্ধেকেরও চেয়েও কম হয়, সন্তান অপেক্ষা নাতিনাতনীর জন্য বিনিয়োগ করতে প্ররোচিত করে এমন কোনো জিন, সেই জিনপুলে ভালো করার জন্য প্রাকৃতিক নির্বাচনের আনুকূল্য পাবে। এই ধরনের কোনো জিন বহন করবে তার প্রতি চারটি নাতি-নাতনীর মধ্যে মাত্র একজন, অপরদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী জিন যা বহন করবে তার প্রতি দুই সন্তানের মধ্যে একজন, কিন্তু নাতি-নাতনীদের জীবনের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বেশী হবার কারণে এই বৈষম্যটির ভারসাম্য পায় বিপরীত দিকে এবং ‘নাতি নাতনী পরার্থবাদী’ জিন জিনপুলে প্রভাব বিস্তার করে। কোনো নারী তার নাতি-নাতনীর জন্য পুরোপুরি বিনিয়োগ করতে পারে না, যদি সে তার নিজের সন্তান উৎপাদন অব্যহত রাখে। সুতরাং জনসংখ্যায় মধ্য বয়সে প্রজননগতভাবে অনুর্বর হবার কোনো জিন সংখ্যায় বাড়তে থাকে। যেহেতু সেই জিনটি বহন করে নাতি-নাতনীদের শরীর, পিতামহী/মাতামহী পরার্থবাদীতা যাদের টিকে থাকায় সহায়তা করে।
নারীদের রজোনিবৃত্তি বিবর্তনের এটি একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। আর কেন পুরুষদের প্রজনন উর্বরতা আকস্মিকভাবে বন্ধ না হয়ে ধীরে ধীরে হ্রাস পায়, এর কারণ, যেকোনো ক্ষেত্রেই সম্ভবত পুরুষরা কোনো একটি শিশুর প্রতি নারীদের মত বিনিয়োগ করে না। তরুণী নারীদের দ্বারা সে সন্তান উৎপাদন করতে পারে এই শর্তে একজন খুব বৃদ্ধ পুরুষের পক্ষে নাতি-নাতনীর চেয়ে তার সন্তানের জন্য বিনিয়োগ করা লাভজনক।
আপাতত এই অধ্যায় ও এর আগেরটিতে, আমরা সবকিছু দেখেছি কোনো পিতামাতার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, বিশেষ করে মায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে। আমরা প্রশ্ন করেছি, আসলেই কি পিতামাতার পছন্দের কোনো সন্তান থাকা আমরা প্রত্যাশা করতে পারি কিনা এবং সাধারণভাবে পিতামাতার জন্য সেরা বিনিয়োগ কৌশল বা নীতিমালা কি হতে পারে। কিন্তু তার পিতামাতা তার ভাই এবং বোনদের বিপরীতে তার জন্য কতটুকু বিনিয়োগ করবে সেটি হয়তো প্রভাবিত করতে পারে প্রতিটি শিশু। এমনকি যদিও পিতামাতা তাদের সন্তানদের মধ্যে এই বিশেষ ‘পক্ষপাতিত্ব’ দেখাতে আগ্রহী নয়, হতে পারে কি, সন্তানরা নিজেরাই তাদের প্রতি তার পিতামাতার বিশেষ ‘সুনজর কেড়ে নেয়? এমন কোনো কাজ করলে তারা কি লাভবান হয়? আরো কঠোর অর্থে, সন্তানদের মধ্যে কেড়ে নেয়ার স্বার্থপর এই আচরণের জন্য জিনটি কি জিনপুলে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো জিন অপেক্ষা সংখ্যায় বাড়বে, যে জিন কিনা সন্তানদের মেনে নিতে শেখায় তার ভাগে যা পাবার কথা, সেটাই সে পেয়েছে? এই বিষয়টির চমৎকার ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন ট্রিভার্স, ১৯৭৪ সালে লেখা তার Parent-Offspring Conflict গবেষণাপত্রে।
একজন মা সমানভাবেই তার সব সন্তানদের সাথে সম্পর্কযুক্ত, যাদের জন্ম হয়েছে আর যারা জন্ম হবার অপেক্ষায় আছে। আমরা যেমন দেখেছি, শুধুমাত্র জিনগত কারণের ভিত্তিতে সন্তানদের মধ্যে তার বিশেষ কোনো পছন্দ থাকা উচিৎ না। কিন্তু যদি সে কোনো সন্তানের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ প্রদর্শন করে, সেটি নির্ভর করে জীবনের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কালের তারতম্যের উপর, এছাড়া অন্য নিয়ামকের মধ্যে আছে বয়স এবং অন্য আরো কিছু বিষয়। অন্য যেকোনো সদস্যের মতই, মায়ের তার নিজের সাথে নিকটাত্মীয়তার পরিমাপ, তার যেকোনো সন্তানের সাথে নিকটাত্মীয়তার পরিমাপের দ্বিগুণ। অন্য সব বিষয় যদি অপরিবর্তিত থাকে, এর অর্থ হচ্ছে তার উচিৎ হবে তার সম্পদের বেশীর ভাগ অংশ স্বার্থপরভাবে তার নিজের জন্য ব্যয় করা, কিন্তু অন্য বিষয়গুলো সমান নয়। সে তার জিনের বেশী উপকার করবে তার সম্পদের একটি নায্য অংশ যদি সে তার নিজের সন্তানের জন্য ব্যয় করে। এর কারণ এই সব সন্তানরা তার তুলনায় বয়সে অনেক কম এবং তার চেয়েও বেশী অসহায় এবং সে কারণে তারা প্রতি ইউনিট বিনিয়োগের জন্য সে নিজে যতটা উপকৃত হত তার চেয়ে বেশী লাভবান হবে। কারো নিজের জন্য বিনিয়োগ করার বদলে অসহায় সদস্যদের জন্য বিনিয়োগ করতে উৎসাহ দেয়া জিন, জিন পুলে সফল হতে পারে এবং এমনকি যখন সেই বিনিয়োগে উপকৃত কেউ হয়তো উপকারকারীর জিনের শুধুমাত্র একটি অংশ বহন করছে। এ কারণে প্রাণীরা পিতামাতা পরার্থবাদ (parental altruism) প্রদর্শন করে এবং আসলে, কিন-সিলেকটেড বা নির্বাচিত আত্মীয়দের প্রতি প্রদর্শিত প্রাণীদের পরার্থবাদীতারও এটাই কারণ।
