প্রশ্নটির উত্তর হচ্ছে, তার সন্তানদের মধ্যে মায়ের কোনো নির্দিষ্ট পছন্দ থাকার জিনগত কোনো কারণ নেই। সব সন্তানের সাথে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক একই, ১/২। তার জন্য সবচেয়ে অনুকূল কৌশলটি হচ্ছে সমানভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক সন্তানদের জন্য বিনিয়োগ করা যেন সে তার সব সন্তানদের সেই বয়স অবধি প্রতিপালন করতে পারে, যখন তারা নিজেরাই সন্তানের পিতামাতা হতে পারে। কিন্তু যেমন আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি, কিছু সদস্য অন্য সদস্যের তুলনায় জীবন বীমার ঝুঁকির নিশ্চয়তা হিসাবে বেশী উত্তম। একটি আকারে ছোট আর দুর্বল রান্ট (কোনো প্রাণীর একগুচ্ছ সন্তানের মধ্যে যে সবচেয়ে দূর্বল) তার অন্যান্য সবল লিটার সঙ্গীদের মতোই তার মায়ের সব জিনই বহন করে। কিন্তু তার প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল সংক্ষিপ্ত। অন্য আরেকটি উপায়ে বিষয়টি বলা যেতে পারে যে, পিতামাতার বিনিয়োগে তার যে ভাগ পাওয়ার কথা, তার প্রয়োজন’ আরো বেশী, শুধুমাত্র তার ভাইবোনদের সমান হয়ে উঠবার জন্য। এই পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে, তার সন্তানদের মধ্যে দূর্বলতমকে খাদ্য দিতে অস্বীকার এবং তার ভাগে বরাদ্দকৃত পিতামাতার বিনিয়োগটিকে বাকী ভাইবোনের জন্য বরাদ্দ করলে মায়ের জন্য হয়তো বেশী লাভজনক হতে পারে। সত্যি, হয়তো তার জন্য লাভজনক হবে যদি তার ভাইবোনকে তার এই দুর্বল সন্তানটিকে খাদ্য হিসাবে সরবরাহ করে। বা সে নিজেই যদি তাকে খেয়ে ফেলে এবং তাকে ব্যবহার করে আরো দুধ বানাতে। মা শূকর মাঝে মাঝে তার নিজের শিশুকে খাদ্য হিসাবে গ্রহন করে, তবে আমার জানা নেই তারা কি বিশেষভাবেই খাদ্য হিসাবে তাদের দুর্বল শিশুটিকে বেছে নেয় কিনা।
রান্ট বা দুর্বল শিশুরা একটি বিশেষ উদাহরণ গঠন করে। আমরা কিছু সাধারণ ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি যে, কিভাবে একটি মায়ের কোনো একটি শিশুর প্রতি বিনিয়োগ প্রভাবিত হতে পারে তার বয়সের কারণে। যদি তার একটি সরাসরি বাছাই করার বিষয় থাকে, বিশেষ একটি শিশুকে বা অন্য কোনো একটি শিশুর জীবন বাঁচানোর জন্য, বিশেষ করে যখন সে যাকে বাঁচাবে না, তার মৃত্যু অবধারিত, তার জন্য উচিৎ হবে, বয়সে বড় শিশুটিকে বাঁচানো। এর কারণ যদি তার ছোট ভাইয়ের বদলে বয়সে বড় শিশুটি মারা যায় সেখানে তার দীর্ঘ দিনের জীবনে পিতামাতার বিনিয়োগের অপেক্ষাকৃত বড় একটি অংশ নষ্ট হবে। হয়তো বিষয়টি আরো ভালো করা বলা যাবে এভাবে, যদি সে তার ছোট ভাইটিকে বাঁচায়, সেক্ষেত্রে তাকে আরো কিছু মূল্যবান সম্পদ তাকে তার বড় ভাইয়ের বয়স অবধি নিয়ে আসার জন্য বিনিয়োগ করতে হবে।
অন্যদিকে, যদি পছন্দ করার বিষয়টি জীবন আর মৃত্যুর মধ্যের কোনো একটিকে বাছাই করার মত এত স্পষ্ট কিছু না হয়, তাহলে তার সেরা বাজীর দানটি হবে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী সন্তানটিকে বাছাই করা। যেমন, ধরুন তার দ্বন্দ্ব, একটি নির্দিষ্ট টুকরো খাবার সে কি বয়সে যে বড় সেই সন্তানটিকে দেবে, নাকি তার ছোট সন্তানটিকে। সম্ভবত তার বড় সন্তানটি যথেষ্ট বড় সুতরাং কোনো সাহায্য ছাড়াই নিজের খাদ্য নিজেই খুঁজে নেবার ক্ষমতা তার হয়তো আছে। সুতরাং যদি সে তাকে খাওয়ানো বন্ধ করে দেয়, সে অবধারিতভাবে মারা যাবেই, এমন কিছু বলা যাবে না। কিন্তু অপরদিকে, তার ছোট সন্তানটি যে নিজের খাদ্য নিজে সন্ধান করার জন্য এখনও বয়সে অনেক ছোট, তার মারা যাবার সম্ভাবনা থাকে বেশী, যদি তার মা তাকে বাদ দিয়ে তার বড় ভাইকে খাবার দেয়। এখন, যদিও মা হয়তো চাইবে বড় ভাইয়ের বদলে ছোট ভাই মারা যাক, তারপরও সে কিন্তু ছোট সন্তানকেই খাবার দেবে, কারণ তার বড় সন্তানটির মরে যাবার সম্ভাবনা এমনিতেও কম। এ কারণে স্তন্যপায়ী মায়েরা তাদের সন্তানদের জীবনে অনির্দিষ্টকাল সময় ধরে বুকের দুধ খাওয়ানো বদলে, ধীরে ধীরে তার বুকের দুধ খাওয়ানো পরিমান কমাতে থাকে, যেন সে অন্য খাবারে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে, যাকে বলা হয় “উইনিং’ বা মাই ছাড়ানো। একটি শিশুর জীবনে এমন একটি সময় আসে, তার সেই সন্তানটির প্রতি বিনিয়োগটিকে তার ভবিষ্যত সন্তানের প্রতি পরিচালিত করাই যখন তার মায়ের জন্য লাভজনক একটি পদক্ষেপ হয়। যখন এই মুহূর্তটি আসে, তখন সে তাকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দেবার প্রক্রিয়াটি শুরু করে। একটি মা, তার যদি কোন উপায়ে জানা থাকে যে, শেষ যে সন্তানটি সে জন্ম দিয়েছিল সে হয়তো প্রত্যাশা করতে পারে তার মা বাকী পুরোটা জীবন ধরে তার সম্পদের বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে তার জন্য, হয়তো তাকে বুকের দুধ খাইয়ে প্রাপ্তবয়স্ক করে তুলবে। তবে যাই হোক না কেন, তার উচিৎ হবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা, তার নাতি-নাতনী অথবা ভাইপো-ভাইঝিদের জন্য বিনিয়োগ করা তার জন্য বেশী লাভজনক হবে কিনা, যদিও আত্মীয়তার সম্পর্কের পরিমানে তারা তার নিজের সন্তানরা যতটা জিনগতভাবে আত্মীয়, সেই পরিমানের অর্ধেক, তার বিনিয়োগের কারণে তাদের লাভ করার ক্ষমতা হতে পারো তার নিজের কোনো একটি সন্তানের দ্বিগুণ।
এই মুহূর্তটি মনে হয় আরো একটি বিস্ময়কর প্রপঞ্চ, যা পরিচিত ‘মেনোপজ বা রজোনিবৃত্তি হিসাবে, নিয়ে আলোচনা করার উত্তম সময়। রজোনিবৃত্তি হচ্ছে মধ্য বয়সে মানব নারীর প্রজনন উর্বরতার আকস্মিক পরিসমাপ্তি। আমাদের বন্য উত্তরসূরিদের মধ্যে ঘটনাটি হয়তো খুব সচরাচর ঘটেনি, কারণ এমনিতেই সেই সময় সময় অবধি খুব বেশী সংখ্যক স্ত্রী সদস্যরা বেঁচেও থাকতেন না। কিন্তু তারপরও, হঠাৎ করে কোনো নারীর জীবনের এই পরিবর্তন আর পুরুষের উর্বরতার হ্রাসের ক্ষেত্রে ক্রমশ ধীর পরিবর্তন ইঙ্গিত করে রজোনিবৃত্তি প্রক্রিয়াটিতে কোনো কিছু আছে যাকে আমরা বলতে পারবো ‘জিনগতভাবে পুর্বপরিকল্পিত বা বলা যায় একটি ‘অভিযোজন’। বিষয়টি বরং ব্যাখ্যা করা বেশ কঠিন। প্রথম দৃষ্টিতে আমরা আশা করি যে কোনো নারী তার মুত্যুর আগ অবধি সন্তান জন্ম দেয়া অব্যাহত রাখবে, এমনকি যদিও বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার জন্ম দেয়া কোনো সন্তানের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও ক্রমশ হ্রাস পাবে। নিশ্চয়ই মনে হতে পারে এমন কাজ করার প্রচেষ্টা অবশ্যই তার জন্য লাভজনক, তাই না? কিন্তু আমরা অবশ্যই মনে রাখবো সে তার নাতি-নাতনীদেরও আত্মীয়, যদিও তার সন্তানদের সাথে যতটা তার অর্ধেক মাত্রায়।
