এমন কোনো একটি সাধারণ বিনিময় মূল্যের কথা ভাবা খুব কঠিন, যা দিয়ে সেই সম্পদগুলো পরিমাপ করা সম্ভব যা কোনো পিতামাতা তার সন্তানের প্রতিপালনের জন্য বিনিয়োগ করতে পারে। ঠিক যেমন মানব সমাজগুলো টাকা ব্যবহার করে সর্বজনীনভাবে বিনিময়যোগ্য একটি বিনিময় মূল্য হিসাবে, যা কিনা অনুদিত হতে পারে খাদ্য, বাসস্থান আর শ্রমের সময়ের মূল্যমান হিসাবে, সুতরাং আমাদেরও একটি বিনিময় মূল্য প্রয়োজন, যা দিয়ে আমরা এই সব সম্পদগুলো পরিমাপ করতে পারি, যা কিনা একক সারভাইভাল মেশিন হয়তো অন্য আরেক জনের জীবনে বিনিয়োগ করতে পারে– বিশেষ করে কোনো একটি শিশুর জীবনে। যেমন, শক্তি পরিমাপে ‘ক্যালোরি ব্যবহার করার জন্য আমরা প্রলোভিত হতে পারি এবং কিছু পরিবেশবিদ আসলেই প্রকৃতির এই শক্তি খরচের হিসাব নিকাশ করার জন্য নিজেদের নিবেদিত করেছেন। যদিও আমাদের প্রয়োজনের জন্য এটি অপ্রতুল, কারণ এটি শুধুমাত্র হালকাভাবে রুপান্তরযোগ্য সেই বিনিময় মূল্যটির যা আসলেই মূল্যবান, বিবর্তনের ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’, আর সেটি হচ্ছে জিন সারভাইভাল বা জিনদের টিকে থাকা। আর. এল. ট্রিভার্স ১৯৭২ সালে এই সমস্যাটি তার Parental Investment বা ‘পিতামাতার বিনিয়োগ’-এর ধারণাটি দিয়ে পরিষ্কারভাবে সমাধান করেছিলেন (যদিও খুব আটোসাটো বাক্যগুলোগুলো কি বোঝাতে চাইছে সেটা অনুধাবন করতে পারলে যেকোনো পাঠকেরই একটি বিষয় অনুভব করার কথা যে, স্যার রোনাল্ড ফিশার, বিংশ শতাব্দী অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাত্ত্বিক জীববিজ্ঞানী তার parental expenditure ধারণাটি দিয়ে ১৯৩০ সালে একই কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন)(১)।
পিতামাতার বিনিয়োগকে (‘parental Investment‘ বা P.I. বা পিআই) সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে এমনভাবে: ‘তাদের অন্য সন্তানের জন্য যতটুকু বিনিয়োগ করতে তারা সক্ষম ছিলেন তার বিনিময়ে, কোনো একটি সন্তানের জন্য পিতামাতার যেকোনো ধরনের বিনিয়োগ, যা কিনা সেই সন্তানটির টিকে থাকার সম্ভাবনা (এবং সেকারণে প্রজনন সফল হবার সম্ভাবনাও) বাড়াবে’, ট্রিভার্সের পিতামাতার বিনিয়োগ সংক্রান্ত ধারণাটির সৌন্দর্য হচ্ছে এটি মাপা হয়েছে সেই ‘এককগুলো ব্যবহার করে যেগুলো সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ এককগুলোর খুব নিকটবর্তী। যখন কোনো শিশু তার মায়ের বুকের দুধের কিছু অংশ ব্যবহার করে খাদ্য হিসাবে, যে পরিমান দুধ খাওয়া হলো সেটি পাইন্ট দিয়ে পরিমাপ করা হয় না, ক্যালোরি দিয়েও না বরং একই মায়ের অন্য সন্তানদের প্রতি ক্ষতির একক হিসাবে সেটি পরিমিত হয়। যেমন, যদি কোনো একটি মায়ের দুটি সন্তান থাকে, ‘ক’ ও ‘খ’, এবং ‘ক’ এক পাইন্ট দুধ খায়, পিতামাতার বিনিয়োগের একটি সিংহভাগ যা এই পাইন্টটি প্রতিনিধিত্ব করে তা পরিমাপ করা হয়, সম্ভাবনা বৃদ্ধির একক হিসাবে যে ‘খ’ মারা যাবে, কারণ সেই এক পাইন্ট দুধ সে খেতে পারেনি। পিতামাতার বিনিয়োগ’ বা ‘পিআই’ অন্য শিশুদের, যারা জীবিত আছে বা এখনও জন্ম নেয়নি, তাদের সবার প্রত্যাশিত আয়ুষ্কালের কত এককের হ্রাস পায় সেই হিসাবে পরিমাপ করা হয়।
পিতামাতার বিনিয়োগ সম্পূর্ণভাবে একটি আদর্শ কোনো পরিমাপ না, কারণ, অন্যান্য জিনগত সম্পর্কগুলোর বিপরীতে এটি পিতৃত্ব/মাতৃত্ব অর্থাৎ বংশপরিচয়ের গুরুত্বের উপর অত্যাধিক জোর দেয়। আদর্শ পরিস্থিতিতে আমাদের সাধারণীকৃত পরার্থবাদী বিনিয়োগ (altruism investment) পরিমাপটি ব্যবহার করা উচিৎ হবে। যেমন, সদস্য ‘ক’ সম্পর্কে হয়তো বলা যেতে পারে, সে ‘খ’ এর উপর বিনিয়োগ করেছে, যখন ‘ক’, ‘খ’ এর টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়, সে নিজে সহ অন্যদের প্রতি একই ভাবে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে ‘ক’ এর যতটুকু ক্ষমতা ছিল সেই মূল্যের বিনিময়ে, সব মূল্য পরিশোধ যখন সঠিক আত্মীয়তার পরিমাপে ওজন করা হয়। এভাবে কোনো পিতামাতার তাদের কোনো একটি শিশুর প্রতি বিনিয়োগ আদর্শগতভাবে পরিমাপ করতে হবে শুধুমাত্র তাদের অন্য সন্তানদের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কালের ক্ষতি করার অর্থেই, বরং সেই হিসাবে আছে, ভাইপো, ভাইঝি, সে নিজেও ইত্যাদি। অনেক ক্ষেত্রেই, যদিও, এটি মূল বিষয়টি এড়িয়ে চলা কথার মারপ্যাঁচ, এবং ট্রিভার্সের পরিমাপ ব্যবহারিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করার অনেক সুফল আছে।
এখন যেকোনো নির্দিষ্ট একজন প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের তার সম্পূর্ণ জীবনে নির্দিষ্ট একটি মোট পরিমান পিতামাতার বিনিয়োগ থাকে, যা সে তার সন্তানদের জন্য বিনিয়োগ করতে পারে (এবং অন্যান্য আত্মীয় এবং তার নিজে জন্যেও, তবে খুব সরল ব্যাখ্যার খাতিরে আমরা শুধুমাত্র সন্তানদের কথাই এখানে বিবেচনা করবো)। এটি প্রতিনিধিত্ব করে সর্বমোট পরিমান খাদ্য, যা সে জড়ো করতে পারে বা এমন কিছু যা সে তৈরী করতে পারে তার সারাজীবনের শ্রমের বিনিময়ে, সেই সব ঝুঁকিগুলো, যা সে নেবার জন্য প্রস্তুত এবং সব শক্তি আর পরিশ্রম যা সে ব্যবহার করতে পারে তার শিশুদের কল্যাণে। কিভাবে একটি তরুণ স্ত্রী প্রাণীর, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রারম্ভে তার জীবনের সম্পদগুলো বিনিয়োগ করা উচিৎ হবে? তার জন্য কোনটি বিচক্ষণ একটি বিনিয়োগ নীতিমালা হতে পারে যা তার অনুসরণ করা উচিৎ? আমরা ইতিমধ্যে ‘ল্যাকের তত্ত্ব’ থেকে জেনেছি যে, তার সম্পদ খুব বেশী সংখ্যক শিশুর মধ্যে ভাগ করে দেয়া উচিৎ হবে না। কারণ সেরকম কিছু করলে সে অনেক বেশী পরিমান জিন হারাবে: তার যথেষ্ট পরিমান নাতি-নাতনী থাকবে না। আবার অন্যদিকে, অবশ্যই সে যেন তার সব সম্পদ খুব অল্প সংখ্যক সন্তানের মধ্যে বিনিয়োগ না করে– বেশী মাত্রায় সযত্নে বড় করা বখে যাওয়া শিশুদের জন্য। সে হয়তো আসলেই তার নিজের জন্য কিছু নাতি-নাতনী নিশ্চিৎ করতে পারবে, কিন্তু তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী যে তার জন্য সবচেয়ে অনুকূল সংখ্যক সন্তানের জন্য বিনিয়োগ করে, তার বেশী সংখ্যক নাতি-নাতনী হবার সম্ভাবনা থাকবে। সুতরাং ন্যায়সঙ্গত বিনিয়োগ নীতিমালা নিয়ে আলোচনা এখানেই শেষ হলো। আমাদের বর্তমান আলোচনার বিষয় হচ্ছে যদি কোনো মা তার সন্তানদের মধ্যে বৈষম্যমূলকভাবে তার সম্পদ বিনিয়োগ করেন, যেমন, তার কি বিশেষ পছন্দের কোনো সন্তান থাকতে পারে কিনা, আর এতে মা কি লাভবান হতে পারে?
