যদিও তিনি কখনোই সেই বিশেষ নামটি ব্যবহার করেননি, তবে পরিবার পরিকল্পনায় স্বার্থপর জিন তত্ত্বটির প্রধান স্থপতি হচ্ছেন প্রখ্যাত পরিবেশবিদ ডেভিড ল্যাক। তিনি বন্য পাখিদের ক্লাচের ( কোনো প্রজনন ঋতুতে তাদের ডিমের সংখ্যা) আকার নিয়ে কাজ করেছিলেন কিন্তু তার তত্ত্ব আর উপসংহারগুলোর সাধারণভাবে নানা ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার মত বিশেষ গুণাবলী আছে। প্রতিটি পাখি প্রজাতির একটি বৈশিষ্ট্যসূচক ক্লাচ সাইজ আছে। যেমন, গ্যানেট আর গিলেমটরা একটি করে ডিমে তা দেয় একটি সময়ে, সুইফটা তিনটি, গ্রেট-টিটরা আধা ডজন বা তার কিছুটা বেশী। বেশ কিছু পার্থক্য আছে বা বৈচিত্র্যও আছে: যেমন, কিছু সুইফট মাত্র দুটি করে ডিম পাড়ে একবারে, গ্রেট টিটস কখনো বারোটি ডিমও পাড়তে পারে। এটা মনে করা যুক্তিসঙ্গত হবে যে-কোনো একটি স্ত্রী পাখি কয়টি ডিম পাড়বে এবং বাচ্চা ফুটানোর জন্য সেটি সেগুলো তা দেবে, অন্য যে-কোনো বৈশিষ্ট্যাবলীর মত বিষয়টি অন্তত আংশিকভাবে নির্ভর করবে জিনগত নিয়ন্ত্রণের উপর। এর মানে হচ্ছে এমন কিছু বলা যে, হয়তো একটি জিন আছে দুটো ডিম পাড়ার আর কোনো একটি প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যালিল আছে তিনটি ডিম পাড়ার জন্য, হয়তো অন্য আরেকটি জিন আছে চারটি ডিম পাড়ার ইত্যাদি। যদিও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা সহজ না হবার সম্ভাবনাই বেশী, এখন স্বার্থপর জিন তত্ত্ব আমাদের বাধ্য করে প্রশ্ন করতে এই জিনগুলোর মধ্যে কোনটি জিন পুলে সংখ্যাধিক্য অর্জন করবে। উপরিভাবে মনে হতে পারে যে চারটি ডিম পাড়ার জন্য কোনো জিন এর অবশ্যই দুটি বা তিনটি ডিম পাড়ার জিন এর চেয়ে বাড়তি কিছু সুবিধা ভোগ করবে। যদিও কয়েক মুহূর্ত ভাবলে স্পষ্ট হয় যে, খুব সরল এই ‘বেশী মানে ভালো’ যুক্তিটি সত্যি হতে পারেনা। এটি আমাদের প্রত্যাশা করতে শেখায় যে পাঁচটি ডিম চারটি ডিম থেকে উত্তম, দশটি আরো বেশী ভালো, ১০০ এমনকি আরো অনেক বেশী ভালো এবং অসীম সংখ্যক সবচেয়ে বেশী ভালো। অন্যার্থে যৌক্তিকভাবে এটি অসম্ভাব্যতার দিকে নিয়ে যায়। অবশ্যই বেশী সংখ্যক ডিম পাড়ার যেমন লাভও আছে তেমনি এর জন্য মূল্যও পরিশোধ করতে হয়। বেশী সংখ্যক সন্তান ধারণের মূল্য অবশ্যই। পরিশোধ করতে হবে প্রতিপালন করার ক্ষেত্রে দুর্বলতার মাধ্যমে।
ল্যাকের মূল প্রস্তাবনাটি ছিল যে-কোনো একটি প্রজাতির জন্য, কোনো একটি পরিবেশগত পরিস্থিতিতে, অবশ্যই একটি সবচেয়ে সুবিধাজনক ক্লাচ সাইজ থাকবে। ওয়েইন-এডওয়ার্ডস থেকে তার প্রস্তাবনার পার্থক্যটা আমরা দেখতে পাবো ‘কার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সবচেয়ে সুবিধাজনক’? এই প্রশ্নটির উত্তরে। ওয়েইন-এডওয়ার্ডস বলবেন যে গুরুত্বপূর্ণ সবচেয়ে সুবিধাজনক সংখ্যাটি, যা সব একক সদস্যের অর্জন করার ইচ্ছা পোষণ করা উচিৎ, সার্বিকভাবে গ্রুপের জন্যে যে সংখ্যাটি সবচেয়ে সুবিধাজনক। ল্যাক বলবেন প্রতিটি স্বার্থপর সদস্যই তাদের নিজেদের স্বার্থে ক্লাচ সাইজ বেছে নেয়, তার পক্ষে সম্ভব সর্বোচ্চ সংখ্যা সন্তান প্রতিপালন করার প্রচেষ্টায়। সুইফট পাখিদের ক্ষেত্রে তিন যদি আদর্শ ক্লাচ সংখ্যা হয়, এর অর্থ হচ্ছে, ল্যাকের জন্য, কোনো একটি একক সদস্য যে কিনা চারটি সন্তান প্রতিপালন করার চেষ্টা করবে, পরিশেষে সে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় সম্ভবত কম সংখ্যক সন্তান প্রতিপালন করতে সক্ষম হবে, অপেক্ষাকৃত বেশী হিসাবী ও সতর্ক সদস্যরা চেষ্টা করবে শুধুমাত্র তিনটি সন্তানের প্রতিপালন করার জন্য। এরকম করার সুস্পষ্ট কারণটি হতে পারে চারটি শিশুর জন্য সংগৃহীত খাদ্য মাথাপিছু ভাগে এতটা কম হতে পারে যে তাদের অল্প কয়েকজনই প্রজনন সক্ষম পূর্ণবয়স্ক হওয়া অবধি বাঁচার সম্ভাবনা থাকবে। এটি সত্যি হবে যেমন শুরুতেই চারটি ডিম এর জন্য ইয়োক বা কুসুম ভাগ বাটোয়ারা করার সময়ে, তেমনি ডিম ফুটে বের হবার পর তাদের খাদ্য প্রাপ্তির ভাগাভাগিতেও। ল্যাকের মতে সেকারণে, প্রতিটি সদস্য তাদের ক্লাচ সাইজ নিয়ন্ত্রণ করে পরার্থবাদীতা ছাড়া অন্য কোনো কারণে। গ্রুপের সীমিত সম্পদের অতি-ব্যবহার প্রতিরোধে তারা জন্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন করছে না। তারা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির চর্চা করে যেন তারা তাদের আসলেই জন্ম দেয়া সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক সন্তানদের বেঁচে থাকা নিশ্চিৎ করতে পারে, এই লক্ষ্যটি একেবারেই বিপরীত জন্মনিয়ন্ত্রণের সাথে আমরা যে লক্ষ্যটিকে সাধারণত সংযুক্ত করে থাকি।
শিশু পাখিদের প্রতিপালন করা খুবেই পরিশ্রমসাধ্য একটি ব্যাপার। ডিম উৎপাদন করার জন্য মাকে একটি বিশাল পরিমান খাদ্য, সময় আর শক্তি বিনিয়োগ করতে হয়। সম্ভবত তার সঙ্গীর সাহায্যে স্ত্রী পাখি প্রচুর পরিশ্রম করে তাদের নীড় তৈরী করে, যেন সেখানে সে ডিম পাড়তে ও সেই ডিমগুলোকে রক্ষা করতে পারে। পিতামাতা দুজনকেই সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধৈর্য ধরে ডিমের উপর বসে থাকতে হয়। তারপর, যখন বাচ্চারা ডিম ফুটে বের হয়, পাখি পিতামাতা তাদের সন্তানদের জন্য খাবার যোগাড় করতে আক্ষরিকার্থে পরিশ্রম করে প্রায় নিজেদের মেরে ফেলার উপক্রম করে, কম বেশী অবিরাম, কোন বিশ্রাম ছাড়াই তারা তাদের সন্তানদের রক্ষা করে। যেমন, আমরা এর আগেই দেখেছিলাম গ্রেট টিট বাবামা সুর্যের আলো থাকা অবস্থায় প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একটি করে খাবার তাদের নীড়ে নিয়ে আসে। স্তন্যপায়ীরা যেমন আমরা এই কাজটি করি খানিকটা ভিন্ন ভাবে, কিন্তু প্রজনন করার মূল ধারণাটাই বেশ পরিশ্রম ও ব্যয়সাধ্য একটি ব্যাপার। বিশেষ করে মায়েদের জন্য বিষয়টি কোনো অংশেই কম সত্য নয়। স্পষ্টতই যদি কোনো পিতামাতা চেষ্টা করেন তাদের সীমিত পরিমান খাদ্য আর পরিশ্রম অনেকগুলো সন্তানের মধ্যে বন্টন করার জন্য, পরিশেষে দেখা যাবে আরো সংযত উচ্চাকাঙ্খ নিয়ে শুরু করলে সে যতটা সন্তান প্রতিপালন করতে পারতো, তার চেয়ে। কম সংখ্যক সন্তান প্রতিপালন করা তার পক্ষে সম্ভব হবে। সুতরাং তাকে একটা ভারসাম্য খুঁজে নিতে হবে সন্তান প্রতিপালন আর জন্ম দেবার মধ্যে। খাদ্য ও অন্যান্য সম্পদের মোট পরিমান, যা কোনো একক স্ত্রী সদস্য বা কোনো একজোড়া সঙ্গী যোগাড় করতে পারে সেটি কয়টি সন্তান তারা প্রতিপালন করতে পারে তা নির্ধারণ করার জন্য প্রয়োজনীয় একটি নিয়ামক। প্রাকৃতিক নির্বাচন, ল্যাকের তত্ত্বানুযায়ী, নির্ধারণ করে শুরুর ক্লাচ সাইজ ( বা লিটার সাইজ ইতাদি) কেমন হবে, যেন সেই সিদ্ধান্তটি সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পারে।
