ওয়েইন-এডয়ার্ডসের লেখায় বা আর্সে যখন ওয়েইন-এডওয়ার্ডস ধারণাটি জনপ্রিয়করণ করেছিলেন, যে বিষয়টির উপর গুরুত্বারোপ করা হয়নি, সেই বিষয়টি হচ্ছে, বিশাল পরিমান ঐক্যমত ভিত্তিক বাস্তব সত্য আছে, যা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। সুস্পষ্টভাবে বন্য প্রাণীদের জনসংখ্যা অস্বাভাবিক উচ্চহারে বৃদ্ধি পায় না, তাত্ত্বিকভাবে যে হারে বংশ বৃদ্ধি করার জন্য তারা সক্ষম। মাঝে মাঝে বন্য প্রাণী জনসংখ্যার আকার কম বেশী স্থিতিশীল থাকে, যেখানে জন্ম আর মৃত্যুর হার পরস্পরের কাছাকাছি অবস্থান করে। অনেক ক্ষেত্রেই লেমিংসরা বিখ্যাত একটি উদাহরণ হতে পারে, জনসংখ্যার হার যখন ব্যাপক এলোমেলো হারে ওঠা নামা করে, যেখানে মাঝে মাঝে বিস্ফোরণের মত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমান্তরালে অত্যন্ত নিম্ন অভিমূখে এই হারের পতন এবং প্রায় বিলুপ্তি থাকে। কখনো ফলাফল হচ্ছে সুস্পষ্টভবে বিলুপ্তি, অন্ততপক্ষে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানীয় এলাকায়। কখনন, যেমন কানাডিয় লিঙ্কসদের কথা ধরা যাক –যেখানে তাদের চামড়া বা পেন্ট সংখ্যার পরিসংখ্যান আমরা পাই হাডসন বে কোম্পানীর ধারাবাহিক বছরওয়ারী হিসাব থেকে –জনসংখ্যা সেখানে একটি নির্দিষ্ট ছন্দে ওঠা নামা করেছে। একটি জিনিস যা কোন প্রাণী জনগোষ্ঠী করে না, তাহলে অনির্দিষ্টভাবে তারা তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যহত রাখেনা।
বন্য প্রাণীরা প্রায় কখনোই বৃদ্ধ হয়ে মারা যায় নাঃ পুরোপুরি বার্ধক্যে জরাগ্রস্থ হয়ে মারা যাবার আগেই খাদ্যাভাব, অসুখ বা শিকারী প্রাণীরা তাদের মৃত্যুর কারণ হয়। খুব সাম্প্রতিককাল অবধি এটি মানুষের জন্যেও সত্যি ছিল। বেশীর ভাগ প্রাণী তাদের শৈশবে মারা যায়, অনেকেই ডিম্বাণু পর্যায় কখনো পার হতে পারে না। খাদ্যাভাব আর অন্যান্য মৃত্যুর কারণ হচ্ছে মূল সেই কারণগুলো, যা ব্যাখ্যা করে কেন জনসংখ্যা অনির্দিষ্টভাবে বাড়তে পারেনা। কিন্তু যেমনটি আমরা আমাদের নিজেদের প্রজাতির ক্ষেত্রে দেখেছি, সেই একই পরিণতি আমাদেরও নিয়তি হবে এমন কোনো আবশ্যিকতা নেই। শুধুমাত্র যদি প্রাণীরা তাদের জন্মের হার’ নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো, খাদ্যাভাব বা দূর্ভিক্ষ হবার কোনো প্রয়োজন ছিল না, তারা ঠিক এই কাজটি করে– এটাই ওয়েইন-এডওয়ার্ডসের মূল ধারণা ছিল। কিন্তু এখন সেখানে কম মতানৈক্য আছে, এমনকি তার বইটি পড়ে আপনি যতটা ভাবছেন তারও কম। স্বার্থপর জিন ধারণার সমর্থকরা খুব সহজেই একমত হবেন যে, প্রাণীরা তাদের জন্মহার নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো একটি প্রজাতি বরং একটি সুনির্দিষ্ট আকারে ক্লাচ সাইজ বা লিটার-সাইজ থাকে; কোনো প্রাণীরই অসীম সংখ্যক সন্তান উৎপাদন করার ক্ষমতা নেই। তারা জন্মহার নিয়ন্ত্রণ করে কি করে না, মতানৈক্য কিন্তু সেই বিষয়ে নয়। মতের অমিলটা হচ্ছে ‘কেন তারা সেটি নিয়ন্ত্রণ করে: প্রাকৃতিক নির্বাচনের কোন প্রক্রিয়াটিতে পরিবার পরিকল্পনা বিবর্তিত হয়েছে? সংক্ষেপে মতের অমিলটির মূল উৎস হচ্ছে প্রাণীদের এই জন্মসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াটি কি পরার্থবাদী, যা তারা অনুশীলন করে সার্বিকভাবে গ্রুপের মঙ্গলের জন্য, নাকি স্বার্থপর, যা তারা অনুশীলন করে যে সদস্যটি প্রজনন করছে তার নিজের কল্যাণে। ধারাবাহিক অনুক্রমে এই দুটি তত্ত্ব নিয়ে আমি আলোচনা করবো।
ওয়েইন-এডওয়ার্ডস মনে করেছিলেন যে, সার্বিকভাবে সেই গ্রুপের কল্যাণে একক সদস্যরা তাদের যা সামর্থ আছে তার চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যক সন্তানের জন্ম দেয়। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে সাধারণ প্রাকৃতিক নির্বাচনের পক্ষে এই ধরনের কোনো পরার্থবাদীতার জন্ম দেয়া সম্ভব নাঃ গড় হারের চেয়ে কম কোনো প্রজনন হারের প্রাকতিক নির্বাচন এর মুল অর্থেরই স্ববিরোধী। সে-কারণে তিনি গ্রুপ সিলেকশন ধারণাটি প্রস্তাব করেন যেমন আমরা অধ্যায় ১ এ দেখেছি। তার মতামত অনুযায়ী, যে গ্রুপগুলোর সদস্যরা তাদের নিজেদের জন্মহার নিয়ন্ত্রণ করে তাদের বিলুপ্ত হবার সম্ভাবনা কম অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপদের চেয়ে, যাদের সদস্যরা দ্রুত বংশ বিস্তার করে এমন হারে যে তারা তাদের খাদ্য সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। সুতরাং পৃথিবীতে সেই সব গ্রুপ প্রাধান্য বিস্তার করে যারা সংযত প্রজননকারী। জন্মদান করার ব্যপারে সংযত কোনো একক সদস্য যা ওয়েইন-এডওয়ার্ডস প্রস্তাব করেছিলেন সেটি আসলে সাধারণ অর্থে জন্ম নিয়ন্ত্রণের সমতূল্য, কিন্তু তিনি তার চেয়ে বেশী সুনির্দিষ্ট ছিলেন এবং সত্যি সত্যি একটি সুবিশাল ধারণার প্রস্তাব করেন যেখানে পুরো সামাজিক জীবনই দেখা হয়েছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রক্রিয়া হিসাবে। যেমন, বহু প্রজাতির সামাজিক জীবনের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাদের টেরিটোরিয়ালিটি বা আঞ্চলিকতা আর ডমিন্যান্স হায়ারার্কি বা প্রাধান্য-পরম্পরা, ইতিমধ্যে যা অধ্যায় ৫ এ বর্ণিত হয়েছে।
বহু প্রাণী প্রচুর পরিমান সময় আর শক্তি বিনিয়োগ করে আপাতদৃষ্টিতে কোনো একটি এলাকাকে রক্ষা করার প্রচেষ্টায়, যাকে প্রকৃতি বিজ্ঞানীরা বলেন, একটি ‘টেরিটোরি’। এই প্রপঞ্চটি প্রাণী জগতে ব্যাপকভাবেই দৃশ্যমান, শুধুমাত্র পাখি, স্তন্যপায়ী এবং মাছই নয়, কীটপতঙ্গ এমনকি সী-অ্যানিমোনরাও এর অন্তর্ভুক্ত। এই টেরিটোরি বা এলাকা কোনো বনভূমির বিশাল কোনো এলাকা হতে পারে, যা কোনো একটি প্রজনন সঙ্গী যুগলের প্রধান খাদ্য সংগ্রহের এলাকা, যেমন, রবিন পাখিরা। বা যেমন হেরিং গালদের ক্ষেত্রে, এটি হতে ছোট একটি এলাকা, যেখানে খাদ্য নেই, বরং এর ঠিক মাঝখানে থাকে তাদের নীড়। ওয়েইন-এডওয়ার্ডসের মতে যে প্রাণীরা কোনো একটি এলাকার জন্য যুদ্ধ করে তারা আসলে একটি “রুপক’ পুরষ্কারের জন্য, কোনো আসল পুরষ্কারের জন্য নয়, যেমন এক টুকরো খাবার। অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রী সদস্যরা এমন কোনো পুরুষ সদস্যদের প্রজনন সঙ্গী হতে অস্বীকৃতি জানায় যাদের কোনো নিজস্ব টেরিটোরি নেই। আসলেই প্রায়শ যা দেখা যায় সেটি হচ্ছে যখনই কোনো স্ত্রী সদস্য, যার পুরুষ সঙ্গী মারা যায়, তার টেরিটোরী দখলকারী পুরুষ সদস্যর সাথে সে নিজেকে দ্রুত সংযুক্ত করে নেয়। এমনকি আপাতদৃষ্টিতে একগামী বিশ্বস্ত যুগল দেখা যায় এমন প্রজাতিতে কোনো স্ত্রী সদস্য আসলেই মূলত ব্যক্তিগতভাবে পুরুষ সদস্যটির চেয়ে তার অধিকৃত টেরিটোরী বা অধিকৃত এলাকার সাথে বেশী যুক্ত থাকে।
