অর্গাননের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৮১০ সালে। এই বই প্রকাশের সাথে সাথে সমালোচনা আর বিতর্কের ঝড় বইতে থাকে। তার উপর শুরু হল নির্যাতন। হ্যানিম্যান জানতেন যারাই নতুন কিছুর আবিষ্কারক তাঁদের সকলকেই এই ধরনের অত্যাচার সইতে হয়। এই ব্যাপারে তিনি প্রথম ব্যক্তি নন, শেষ ব্যক্তিও নন। নিজের উপর তার এতখানি আত্মবিশ্বান ছিল তাই ১৮১৯ সালে যখন অর্গাননের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়, বইয়ের প্রথমে তিনি লিখলেন Aude sapere-এর অর্থ আমি নিজেকে বুদ্ধিমান বলে ঘোষণা করছি। এইভাবে তিনি তৎকালীন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে তীব্র ব্যঙ্গ আর বিদ্রূপ ফেটে পড়লেন। হ্যানিম্যানের জীবনকালে এর পাঁচটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। প্রতিটি সংস্করণেই তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরো উন্নত থেকে উন্নততর রূপে বর্ণনা করেছেন।
১৮১০ সালে অর্গানন প্রকাশের সাথে সাথে হ্যানিম্যানের বিরুদ্ধে একাধিক রচনা প্রকাশিত হল। হ্যানিম্যানের ছয়জন ছাত্রের বিরুদ্ধে বেআইনি ঔষধ তৈরি ও বিতরণের অভিযোগ আনা হল। একজন ছাত্রকে জেলে পোরা হল, তার সমস্ত ঔষধ আগুনে পুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলা হল।
লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক হ্যানিম্যানের চিন্তাধারায় আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে নিয়োগের একাংশ এই কাজে প্রবল বাধা সৃষ্টি করল। কিন্তু তাদের বাধাদান সত্ত্বেও হ্যানিম্যানকে বক্তৃতা দেবার জন্যে অনুমতি দেওয়া হল।
তাঁর এই বক্তৃতা শোনবার জন্য দলে দলে ছাত্ররা এসে ভিড় করল। সকলেই হ্যানিম্যানের নতুন চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্বন্ধে জানতে উৎসাহী, কৌতূহলী। তখন হ্যানিম্যান প্রৌঢ়ত্বের সীমানায় পৌঁছে গিয়েছেন, তবুও তরুণ অধ্যাপকদের মত তেজদীপ্ত বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে হোমিওপ্যাথিক তত্ত্বের বর্ণনা করতেন। কিন্তু ছাত্রদের মধ্যে কেউই তার অভিমতকে গ্রহণ করতে পারল না। কারণ তাদের মধ্যে প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে নতুন কিছুকে গ্রহণ করবার মত মানসিকতা সৃষ্টি হয়নি। তা সত্ত্বেও সামান্য কয়েকজন ছাত্রকে শিষ্য হিসাবে পেলেন যারা উত্তরকালে তার নব চিকিৎসা ব্যবস্থার ধারক-বাহক হয়ে উঠেছিল। এই সময় ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। তাদের মধ্যে বহু সংখ্যক সৈন্য টাইফাস রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। কোন চিকিৎসাতেই তাদের রোগের প্রকোপ,হাস না পাওয়ায় হ্যানিম্যানকে চিকিৎসার জন্যে ডাকা হয়। তিনি বিরাট সংখক সৈন্যকে অল্পদিনের মধ্যেই সুস্থ করে তোলেন। এতে তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
অষ্ট্রিয়ার যুবরাজ Schwarzenberg পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এ্যালোপাথি চিকিৎসায় কোন উপকার না পেয়ে হ্যানিম্যানের চিকিৎসা জগতে সুনামের কথা শুনে তাকে চিকিৎসক হিসাবে নিয়োগ করলেন। হ্যানিম্যানের চিকিৎসক হিসাবে নিয়োগ করলেন। হ্যানিম্যানের চিকিৎসায় অল্পদিনের মধ্যেই ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। সামান্য সুস্থ হতেই হ্যানিম্যানের নির্দেশ অমান্য করে মদ্যপান করতে আরম্ভ করলেন। এতে হ্যানিম্যান ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর চিকিৎসা বন্ধ করে দিলেন এবং যুবরাজের চিকিৎসার জন্য আর তার প্রাসাদে গেলেন না। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই যুবরাজ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন।
এই ঘটনায় অস্ট্রিয়ানদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সঞ্চার হল। এ্যালোপাথিক চিকিৎসকরা এই সুযোগে হ্যানিম্যানের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শুরু করল এবং যুবরাজের মৃত্যুর জন্য সরাসরি হ্যানিম্যানকে দায়ী করল। জার্মান সরকার হ্যানিম্যানের ঔষধ তৈরির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল।
১৮২০ সালে ৭ ফেব্রুয়ারি হ্যানিম্যানকে আদালতে উপস্থিত হতে হল। আদালত তাঁর সমস্ত ঔষধ তৈরি এবং বিতরণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল। কারণ হিসাবে বলা হল এই ঔষধ মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর।
হ্যানিম্যান এর জবাবে শুধু বললেন, ভবিষ্যই এর সঠিক বিচার করবে।
সম্মিলিতভাবে চিকিৎসকরা তার বিরোধিতা করতে আরম্ভ করল। তাঁকে লিপজিগ: থেকে বহিষ্কারের জন্য সচেষ্ট হয়ে উঠল। হ্যানিম্যান বুঝতে পারলেন আর তার পক্ষে লিপজিগে থাকা সম্ভব নয়। তিনি নিরুপায় হয়ে ১৮২১ সালের জুন মাসে লিপজিগ ত্যাগ করে কিথেন শহরে এসে বাসা করলেন।
হ্যানিম্যানের জীবনের এই পর্যায়ে ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ পালভাঙা নৌকার মত। সংসারে চরম অভাব। চারদিকে বিদ্বেষ আর ঘৃণা। প্রতি পদক্ষেপে মানুষের অসহযোগিতা আর বিরুদ্ধাচারণ।
এই প্রতিকূলতার মধ্যেও হ্যানিম্যান ছিলেন অটল, নিজের সংকল্পে পর্বতের মত দৃঢ়। অসাধারণ ছিল তাঁর মহত্ত্বতা। যে চিকিৎসকরা নিয়ত তাঁর বিরুদ্ধাচারণ করত তাদের বিরুদ্ধেও কখনো কোন ঘৃণা প্রকাশ করেননি। একটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন “চিকিৎসকরা আমার ভাই, তাদের কারোর বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই।” আরেকটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন “সত্যের বিরুদ্ধে এই নির্লজ্জ প্রচার মানুষের অজ্ঞাতারই প্রকাশ। এর দ্বারা হোমিওপ্যাথিক অগ্রগতি রোধ করা সম্ভব নয়।
হোমিওপ্যাথির এই দুর্দিনে হ্যানিম্যানের পাশে এসে দাঁড়ালেন কিথেন শহরের ডিউক ফার্দিনান্দ। তিনি কিথেন শহরে শুধু বাস করবার অনুমতি নয়, চিকিৎসা করবারও অনুমতি দিলেন। হ্যানিম্যান তাঁর ঔষধ প্রস্তুত ও চিকিৎসা করবার অনুমতির জন্য যখন ডিউকের কাছে আবেদন করলেন, সেই আবেদন পরীক্ষার ভার পড়ল আদম মূলারের উপর। হ্যানিম্যানের সাথে সাক্ষাতের অসাধারণ বিবরণ দিয়েছেন মূলার। “এই লাঞ্ছিত অপমানিত মানুষটিকে দেখে চোখে জল এসে গেল। এই মানুষটির দুঃখে আমার হৃদয় বেদনার্ত হয়ে উঠল। উপলব্ধি করতে পারছিলাম আমার সামনে বসে আছে এই শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিক, ভবিষ্যৎ কালই যার আবিষ্কারের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে পারবে।”
