কিছুদিন মানসিক হাসপাতালে থাকার পর তিনি আবার অন্য শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। ইতিমধ্যে তাঁর আটটি সন্তানের জন্ম হয়েছে। সংসারে আর্থিক অনটন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার গবেষণার কাজে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটেনি। একদিকে যেমন চিকিৎসাশাস্ত্র ছাড়াও বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশুনা করতেন, তেমনি পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজনে নিজেই বিভিন্ন ঔষুধ খেতেন। এতে বহুবার তিনি অসুস্থ পড়েন, তা সত্ত্বেও কখনো গবেষণার কাজ থেকে বিরত থাকেননি।
দীর্ঘ ছয় বছরের অক্লান্ত গবেষণার পর তিনি সিদ্ধান্তে এলেন যথার্থই সাদৃশ্যকে সদৃশ আরোগ্য করে। (similia similiabus curantur অর্থাৎ like cures likes)–এই ধারণা কোন অনুমান বা কল্পনার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। এ সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক সত্য।
তাঁর এই আবিষ্কার ১৭৯৬ সালে সে যুগের একটি বিখ্যাত পত্রিকায় (Hufeland’s Journal) প্রকাশিত হল। প্রবন্ধটির নাম দেওয়া হল “An essay on a new Principle for Ascertaining the curative Powers of Drugs and some Examination of the previous principal.”
এই প্রবন্ধের মধ্যে দিয়ে তিনি সিদ্ধান্তে এলেন Every Powerful medicinal sub stance produces in the human body a peculiar kind of discase the more Powerful the medicine, the more peculiar, marked and violent the disease.
We should imitate nature which sometimes cures a chronic disease by super adding another and employ in the (especially shronic) disease we wish ne which is able to Produce another very similar artificial disease and the former will be cured. Similia-Similibus.
এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আধুনিক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ভিত্তি পত্তর করলেন হ্যানিম্যান–সেই কারণে ১৭৯৬ সালকে বলা হয় হোমিওপ্যাথিক জন্মবর্ষ। হোমিওপ্যাথিক শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে গ্রীক শব্দ হোমস (Homoeos) এবং প্যাথস, (Pathos) থেকে। সদৃশ এবং এর অর্থ রোগ লক্ষণের সম লক্ষণ বিশিষ্ট ঔষধ দ্বারা চিকিৎসা।
হ্যানিম্যানের এই যুগান্তকারী প্রবন্ধ প্রকাশের সাথে সাথে চিকিৎসা জগতে আলোড়ন সৃষ্টি হল।
চিকিৎসা জগতের প্রায় সকলেই এই মতের ঘোরতর বিরোধী হয়ে উঠলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তীব্র সমালোচনামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে আরম্ভ করল। তাকে বলা হল অশিক্ষিত হাতুড়ে চিকিৎসক। নিজের আবিষ্কৃত সত্যের প্রতি তাঁর এতখানি অবিচল আস্থা ছিল, কোন সমালোচনাতেই তিনি সামান্যতম বিচলিত হলেন না।
হ্যানিম্যান নিজেই শুরু করলেন বিভিন্ন ঔষধের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তার মনে হয়েছিল সুস্থ মানবদেহের উপর ঔষধ পরীক্ষা করেই তার ফল উপলব্ধি করা সম্ভব। ঔষধের মধ্যে যে আরোগ্যকারী শক্তি আছে সেই বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করার অন্য কোন উপায় নেই। সাধারণ পরীক্ষায় বা গবেষণাগারে পরীক্ষা করে কোন ঔষধের সাধারণ বৈচিত্র্য বৈশিষ্ট্য বোঝা যায় কিন্তু মানুষের উপর কিভাবে তা প্রতিক্রিয়া করে তা জানবার জন্যে মানুষের উপরেই পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
পরীক্ষার প্রয়োজনের নিজেই সমস্ত ঔষধ খেতেন। তারপর পরিবারের লোকেদের উপর তা পরীক্ষা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন চিকিত্সক হিসাবে রোগীর কোন ক্ষতি করবার তার অধিকার নেই। এইভাবে একের পর এক ঔষধ পরীক্ষা করে যে জ্ঞান অর্জন করলেন তার ভিত্তিতে ১৮০৫ সালে লাটিন ভাষায় প্রকাশ করলেন Fragment-de viribus নামে ২৭টি ঔষধের বিবরণ সংক্রান্ত বই। এই বইটি প্রথম হোমিওপ্যাথিক মেটিরিয়া মেডিকা বা ভেষজ লক্ষণ সংগ্রহ। চিকিৎসা জগতে মেটিরিয়া মেডিকার গুরুত্ব অপরিসীম।
এর পর থেকেই তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা আরম্ভ করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন তাঁর পরিক্ষিত সত্যকে যতক্ষণ না রোগীর রোগ চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তা জনগণের কাজে ব্যবহার করছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তা জনগণের মনে বিশ্বাস উৎপাদন করতে সক্ষম হবে না। এই সময় তাকে রোগীর দেখাশুনা করা, চিঠিপত্র লেখা, গবেষণার কাজ, এছাড়া বই লেখার জন্যে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হত।
প্রতিদিন ভোর ৬ টায় ঘুম থেকে উঠতেন। সকালের জলখাবার ছিল দু কাপ দুধ। তারপর কিছুক্ষণ বাগানে পায়চারি করে চেম্বারে চলে যেতেন। দুপুরবেলায় বাড়ি ফিরে দুপুরের খাওয়া সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেন। তাঁর এই বিশ্রামের সময়টুকু কড়া পাহারায় রাখতেন মেয়েরা। সামান্য সময় পেলেই চিঠিপত্র লেখার কাজ শুরু করে দিতেন। অল্প কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার রুগী দেখার কাজ। সন্ধ্যে অবধি চলত তার রুগী দেখা।
তারপর এককাপ গরম দুধ আর রাতের খাওয়া খেয়ে চলে যেতেন পড়ার ঘরে। মধ্যরাত, কোন কোন সময় শেষরাত অবধি চলত তাঁর রোগের বিবরণ লেখা, চিঠিপত্র লেখা, বই লেখা।
অবশেষে ১৮১০ সালে প্রকাশিত হল অর্গানন অব মেডিসিন (Organon of Medicine)। এই অর্গাননকে বলা হয় হোমিওপ্যাথির বাইবেল। এতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতির নীতি ও বিধান সমূহের বিস্তৃত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ আর অকাট্য যুক্তির উপর দাঁড় করিয়েছেন তার প্রতিটি অভিমত। এতে হোমিওপ্যাথিক মূল নীতির আলোচনা ছাড়াও অন্যান্য চিকিৎসা প্রণালীর সাথে আলোচনা করে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। এছাড়াও সে যুগে চিকিৎসার নামে যে ধরনের অমানুষিক কার্যকলাপ প্রচলিত ছিল তার বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করলেন।
