ডিউক ফার্দিনান্দও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন হ্যানিম্যানের প্রতিভা। তিনি তাঁকে ওষুধ প্রস্তুত করবার অনুমতি দিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁকে রাজসভার চিকিৎসক হিসাবে মনোনীত করলেন।
১৮২২ সালে হ্যানিম্যান প্রকাশ করলেন প্রথম হোমিওপ্যাথিক পত্রিকা। এর কয়েক বছর পর হ্যানিম্যান প্রকাশ করলেন তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা Chronic disease: Their nature and Homoeopathic treatment অর্থাৎ পুরাতন রোগের চিকিৎসা সম্বন্ধীয় পুস্তক। চিকিৎসা জগতে এ এক যুগান্তকারী সংযোজন। পুরনো রোগের চিকিৎসা সম্বন্ধে এমন বই ইতিপূর্বে কোথাও রচিত হয়নি। তিনি বললেন, সোরা (Psory), সিফিলিশ (Syphislis) ও সাইকোসিস (Sycosis) মানবদেহের সর্ব রোগের কারণ। এদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা ক্ষতিকারক শক্তি হল সোরা।
তাঁর অভিমতের বিরুদ্ধে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হল। এমনকি হ্যানিম্যানের কিছু ছাত্র অনুগামীও তাঁর মতের বিরুদ্ধচারণ করে তাঁর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্কে ছিন্ন করল। তা সত্ত্বেও বহু চিকিত্সক অনুভব করতে পারলেন হ্যানিম্যানের রচনার গুরুত্ব। কয়েকজন বিখ্যাত এলোপ্যাথিক চিকিৎসক হোমিওপ্যাথিক শিক্ষার জন্য হ্যানিম্যানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। আমেরিকা থেকে এলেন ডাঃ কন্সটেন্টাইন হেরিং, ইংলন্ড থেকে এলেন ডাক্তার কুইন। এঁরা সকলেই নিজের দেশে হোমিওপ্যাথির প্রচার-প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন।
১৮৩০ সাল হ্যানিম্যানের স্ত্রী হেনরিয়েটা ৬৭ বছর বয়েসে মারা গেলেন। তিনি ১১টি সন্তানের জননী। সমস্ত জীবন হ্যানিম্যানের পাশে ছিলেন তার যোগ্য সহধর্মিণী। বাইবেল প্রতিকূলতার মাঝে হ্যানিম্যান যখন ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছিলেন সংসার জীবনে তখন অফুরন্ত শক্তি সাহস ভালবাসায় পূর্ণ করে দিয়েছিলেন হেনরিয়েটা। হ্যানিম্যানের জীবনের অন্ধকারময় দিনগুলোতে হেনরিয়েটা ছিলেন তাঁর চলার সঙ্গী। হ্যানিম্যানের জীবনে যখন অন্ধকার দূর হয়ে আলোর আভা ফুটে উঠছিল, হেনরিয়েটা তখন চির অন্ধকারের জগতে হারিয়ে গেলেন।
স্ত্রী অভাব, কন্যাদের ভালবাসা আর যত্নে ভুলে গেলেন হ্যানিম্যান। হ্যানিম্যানের খ্যাতি প্রতিপত্তি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। রোগী দেখে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন। এই সময় হ্যানিম্যানের জীবনে এল নতুন বসন্ত। তিনি তখন ৮০ বছরের বৃদ্ধ।
১৮৩৪ সালের ৮ অক্টোবর এক সুন্দরী যুবতী মাদাম মেলানি চর্মরোগের চিকিৎসার জন্য হ্যানিম্যানের কাছে এলেন। মেলালি ছিলেন ফ্রান্সের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও তৎকালীন আইনমন্ত্রীর পালিতা কন্যা। হ্যানিম্যানের সাথে সাক্ষাতের সময় তার বয়স ৩৫ বছর। মেলালি ছিলেন শিল্পী কবি। বয়েসের বিরাট ব্যবধান থাকা হয়ে গেল। মেলানি হ্যানিম্যানকে ফ্যান্সে নিয়ে গেলেন। সরকারিভাবে তাঁকে ডাক্তারি করবার অনুমতি দেওয়া হল।
জীবনের অন্তিমপর্বে এসে হ্যানিম্যান পেলেন জীবনব্যাপী সংগ্রামের পুরস্কার, খ্যাতি, সম্মান, যশ, সুনাম, আরাম, অর্থ, সাংসারিক সুখ।
ক্রমশই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। হ্যানিম্যানের জীবনকালেই ছয়টি হোমিওপ্যাথিক কলেজ গড়ে উঠেছিল। তার কয়েকজন ছাত্র প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক হিসাবে সুনাম অর্জন করলেন।
৮৮ বছরে পা দিলেন হ্যানিম্যান। দেহের শক্তি কমে এসেছিল। কিন্তু মনের শক্তি এতটুকু হ্রাস পায়নি। সামান্য অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, অবশেষে ১৮৪৩ সালের ২ জুলাই শেষরাতে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন হোমিওপ্যাথিক জনক মহাত্মা হ্যানিম্যান।
সমস্ত জীবন হ্যানিম্যান নিজেকে মানব কল্যাণে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষকে ব্যাধির অভিশাপ থেকে মুক্ত করাই একজন চিকিৎসকের মহত্তম কর্তব্য। সেই কর্তব্য পথ থেকে কখনো তিনি নিজেকে বিচ্যুত করেননি।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সরল সাদাসিধা। কোন আড়ম্বর বিলাসিতা ছিল না তাঁর। তিনি বলতেন প্রকৃত মানবপ্রেমী কখনো নিজেকে প্রচার করে না। যদি অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয় তোমার পথই শ্রেষ্ঠ তবে তা মানব কল্যাণে নিয়োজিত কর আর সব খ্যাতি অর্পণ কর ঈশ্বরকে।
তিনি বিশ্বাস করতেন সব কল্যাণ সৎ মহত্ত্বতার মধ্যে ঈশ্বরের স্পর্শ আছে। তিনি জীবনের বৃহত্তর অংশ অতিবাহিত করেছেন অন্যের নিন্দা সমালোচনা শুনে, প্রতি পদক্ষেপ তাঁকে সইতে হয়েছে নির্যাতন, অপবাদ, মানুষ তাঁকে বারংবার ঘরছাড়া করেছে। সমস্ত জীবনে তিনি ৩৬ বার বাসা পরিবর্তন করেছেন। এমন বহু দিন গিয়েছে, জল ছাড়া কোন খাবার জোটেনি। সাবানের অভাবে আলু দিয়ে জামা-কাপড় পরিষ্কার করেছেন। কনকনে শীতের রাতে ঘরে আগুন জ্বালাবার মত একটুকরা কাঠ পাননি। একটা পাউরুটি দশ টুকরো করে ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিতরণ করেছেন তবুও তিনি কখনো ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস হারাননি। মৃত্যুশয্যায় স্ত্রীকে বলেছেন, আমি মানুষের জন্য যা কিছু করেছি সব ঈশ্বরের করুণা আর শক্তিতে। তাই সব কিছুর জন্যেই আমি তার কাছে ঋণী।
এই ঈশ্বর বিশ্বাসের সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল তাঁর গভীর আত্মবিশ্বাস। তাই মৃত্যুর পূর্বে নিজের সম্বন্ধে শেষ বাণী উচ্চারণ করেছিলেন, আমার জীবন ব্যর্থ হয়নি।
যথার্থই তাঁর জীবন ছিল পরিপূর্ণ সফলতা আর পূর্ণতার। সেই কারণেই তাঁর শিষ্য ব্রেডফোর্ড গুরুর উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে লিখেছিলেন, তিনি ছিলেন এমন একজন বিদ্বান যাকে বিদগ্ধ জগৎ সমাদৃত করেছে। এমন একজন রসায়বিদ যিনি রসায়ন বিশেষজ্ঞদের শিক্ষা দিতেন। বহু ভাষায় এমন এক পণ্ডিত যাঁর অভিমতকে ভাষাতত্ত্ববিদরা খণ্ডন করতে সাহস পেত না। একজন দার্শনিক যার দৃঢ় মতবাদ থেকে কেউ বিচ্যুত করতে পারেনি।
৪. ইমাম আবু হানিফা (রঃ) (৭০২–৭৭২ খ্রি:)
অধঃপতনের যুগে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা নিয়ে যে সকল মনীষীগণ পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, পার্থিব লোভ লালসা ও ক্ষমতার মোহ যাদেরকে ন্যায় ও সত্যের আদর্শ থেকে বিন্দু মাত্র পদখলন ঘটাতে পারেনি; যারা অন্যায় ও অসত্যের নিকট কোন দিন মাথা নত করেননি, ইসলাম ও মানুষের কল্যাণে সারাটা জীবন যারা পরিশ্রম করে গিয়েছেন, সত্যকে আঁকড়ে থাকার কারণে যারা জালেম সরকার কর্তৃক অত্যাচারিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত; এমনকি কারাগারে নির্মমভাবে হারিত হয়েছেন, ইমাম আবু হানিফা (রঃ) তাঁদের অন্যতম।
