গডফাদার

১.১ তিন নম্বর ফৌজদারি আদালত

গডফাদার (ভলিউম-১) – মারিয়ো পুজো
রূপান্তর: শেখ আবদুল হাকিম

প্রথম পর্ব

০১.

নিউইয়র্ক। তিন নম্বর ফৌজদারি আদালত। বসে আছে আমেরিগো বনাসেরা। মনে আশা, সুবিচার পাবে সে। তার মেয়ের ওপর যারা অমানুষিক নির্যাতন করেছে, যারা বেচারীর ইজ্জত লুঠ করার অপচেষ্টা চালিয়েছে, আইনের মাধ্যমে তাদের উপর প্রতিশোধ নেয়া যাবে।

থমথম করছে বিচারকের মুখ। কালো পোশাকের আস্তিন গোটালেন তিনি, যুবক দুজনকে নিজের হাতেই যেন কষে ধোলাই দেবেন। ঘৃণাভরে তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি।

তবু কেমন যেন একটা সন্দেহ জাগছে নাসেরার মনে। সঠিক কিছুই বুঝতে পারছে না, কিন্তু খুঁতখুঁত করছে মনটা: এসবের মধ্যে কোথায় যেন একটা ছলচাতুরি আছে।

তোমরা নরাধম! জঘন্য অপরাধ করেছ। রাগে কেঁপে উঠলেন বিচারক।

চকচক করছে ছোট করে ছাঁটা দুই যুবকের চুল! লাবণ্যের প্রলেপ মাখা পরিচ্ছা মুখ। অনুতাপে মিয়মান। মাথা হেঁট।

বুনো জন্তুর মত আচরণ করেছ তোমরা, কর্কশ গলায় রায় ঘোষণা করছেন বিচারক। সে বেচারীর সতীত্ব নষ্ট করতে পারোনি, এ তোমাদের সৌভাগ্যতা যদি করতে, তোমাদের প্রত্যেককে বিশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হত। থামলেন তিনি। তাঁর অদ্ভুত ঘন ভুক্ত জোড়া দেখে শ্রদ্ধা জাগে মনে। ভুরুর নিচে চকচক করছে দুটো চোখ। চোখের পাতা কুঁচকে তাকালেন তিনি। চকিতে বনাসেরার রক্তশূন্য মুখটা দেখে নিলেন একবার। টেবিলের উপর ফিরে এলো দৃষ্টি। কাগজপত্রের স্তূপ দেখলেন। মৃদু কুঞ্চিত হলো ভুরু জোড়া, কাঁধ ঝাঁকালেন। ভাবটা যেন, আর কোন উপায় নেই, তাই নিজের স্বাভাবিক ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে তাকে।

তোমাদেরকে আমি তিন বছরের কারাদণ্ড দিলাম, আবার শুরু করলেন বিচারক। কিন্তু তোমাদের বয়স কম। এ ধরনের অপরাধ আগে কখনও করোনি। অভিজাত পরিবারের ছেলে তোমরা। এবং আইনের অপার মহিমা তাই কখনও সে প্রতিশোধ গ্রহণ করে না। এই সব বিবেচনা করে তোমাদের এই দণ্ড মওকুফ করা হলো।

হতাশা আর ঘৃণায় স্তম্ভিত হয়ে গেল বনাসেরা। মেয়েটি এখনও হাসপাতালে, তার দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে-ভাঙা চোয়াল। কুকুর দুটো বেকসুর খালাস পেয়ে গেল। ভাবছে সে, বেঈমানী করা হলো তার সাথে। ঠকানো হলো। এর নাম বিচার নয়, প্রহসন।

ছেলে দুটোর মা-বাবার দিকে তাকালসে! পরম আদরে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ছেলেদের। কত খুশি সবাই! হাসি আর আনন্দের প্লাবন বয়ে যাচ্ছে।

গলা দিয়ে টক টক একটা ভাব উঠে এলো আমেরিগোর। বমি পাচ্ছে তার। সাদা একটা রুমালে চেপে ধরুল মুখ।

দুপাশে বসাব বেঞ্চ, মাঝখানে অপ্রশস্ত পথ। লম্বা পা ফেলে চলে যাচ্ছে ছেলে দুটো। অনড় দাঁড়িয়ে থাকল নাসেরা। নড়ার শক্তি নেই। ছেলে দুটোর মুখে আনন্দের হাসি। দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তার দিকে ভুলেও একবার তাকাল না।

ইতিমধ্যে ওদের মা-বাবারাও কাছে এসে পড়েছে। দুজন মহিলা, দুজন পুরুষ। সবাই ওর কাছাকাছি বয়সের পোশাক-আশাক, ওর চেয়ে একটু বেশি মার্কিনী। ওর দিকেই তাকিয়ে আছে চারজন। একটু যেন ইতস্তত ভাব রয়েছে সবর মধ্যে, কিন্তু চোখেমুখে বিজয়ের অদ্ভুত একটা বেপরোয়া ভাবও রয়েছে, দৃষ্টি এড়াল না বনাসেরার।

এতক্ষণ বহু কষ্টে নিজেকে সামলে রেখেছিল সে। হঠাৎ সংযমের বাঁধ ধসে পড়ল। সামনের দিকে ঝুঁকে বিকৃত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল সে, আমার মত তোমাদেরকেও কাঁদতে হবে। সে ব্যবস্থা আমি করব। চোখের উপর রুমাল চেপে ধরুল বনাসেরা। পানি মুছছে।

ঠিক পিছনেই রয়েছে বিপক্ষের উকিলরা, মক্কেলদের একধারে সরিয়ে নিয়ে একটা দল পাকিয়ে ফেলল তারা। মা-বাবাদের নিরাপজ নিশ্চিত করার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ছেলে দুটো, দলের সঙ্গে যোগ দিল তারাও। তাড়াতাড়ি ছুটে এলো একজন বেলিফ। নাসেরার বেরিয়ে আসার পথ বন্ধ করে দিল সে। তবে এসবের কোন প্রয়োজন ছিল না।

আমেরিকার আইন শৃঙ্খলার উপর কখনও আস্থা হারায়নি বসেরা সেজন্যেই বৈষয়িক উন্নতি করেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে ঘৃণায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে তার সারা শরীরে। ছেলে দুটোকে কুকুরের মত গুলি করে খুন করার ইচ্ছে হচ্ছে। নিজেকে সামলে নিয়ে স্ত্রীর দিকে ডাকাল সে। স্ত্রী বেচারী কিছুই বোঝেনি তখনও। বোকা বানিয়েছে ওরা আমাদের, বলল সে। তার মাথার ভিতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল সে। যা থাকে কপালে, ডন কর্লিয়নির কাছেই যাব আমি। কেঁদে পড়ব তার কাছে। ন্যায্য বিচার চাই আমি।

.

লস এঞ্জেলস। প্রকাণ্ড এক হোটেলের সুইট। লাল একটা কাউচে শুয়ে রয়েছে জনি ফন্টেন। হাতে স্কচ হুইস্কির বোতল। বার বার বোতল কাত করে মুখে মদ ঢালছে সে। ঢোঁক গিলছে। পাশেই একটা কাঁচের পাত্র, তাতে পানি আর বরফের কুচি রয়েছে। ঢোঁক গিলেই ঠাণ্ডা পানি মুখে নিয়ে মদের তেতো স্বাদটা ধুয়ে ফেলছে সে।

ভোর রাত। চারটে বাজে। মাতাল জনি মতলব আঁটছে, কলঙ্কিনী স্ত্রী আজ বাড়ি ফিরলে হয়, খুন করে ফেলবে তাকে। কিন্তু বাড়ি যদি ফেরে, তবেই। প্রথমা স্ত্রীকে ফোনে ডেকে মেয়ে দুটোর খবর নেবে নাকি? নাহ, সময় নেই এখন, অনেক দেরি হয়ে গেছে। বন্ধুদের কাউকে ডাকলে কেমন হয়? উঁহু, মন সায় দিচ্ছে না। কে কি ভাববে কে জানে! সুখ্যাতি আর সাফল্যের সেই চূড়ায় এখন আর নেই সে। ধাপে ধাপে নামতে নামতে অনেক নিচে নেমে গেছে। এমন একদিন ছিল, ভোর চারটে কেন, যখন ইচ্ছা ডাকলেই পোষা কুকুরের মত লেজ নাড়তে নাড়তে ছুটে আসত সবাই। সেদিন আর নেই। এখন ওরা তার ডাক পেলে বিরক্তি বোধ করে। আপন মনে হাসল জনি ফন্টেন। মনে পড়ে যাচ্ছে, যখন নাম ডাক ছিল, হলিউডের সেরা তারকারাও ওর ব্যক্তিগত সুবিধে অসুবিধের কথা শোনার জন্যে ব্যর্থ হয়ে থাকত।

বোতল কাত করে হুইস্কি ঢেলেছে মুখে, এমন সময় শব্দ হলো। দরজার তালায় চাবি ঢোকাবার শব্দ। কলঙ্কিনী স্ত্রী আসছে, বুঝতে পেরেও উঠছে না জনি। গলায় মদ ঢালছে।

কামরায় ঢুকল মেয়েটা। জনির সামনে এসে দাঁড়াল।

জনির চোখে কি অপূর্ব সুন্দর এই মেয়ে। চোখ দুটো বেগুনি, সাগরের গভীরতা সেখানে। দেবীর মত অম্লান মুখ। নিখুঁত, একহারা, কোমল শরীর। সিনেমার পর্দায় ওর রূপ আরও কয়েকশো গুণ বেড়ে যায়। দুনিয়ার দশ কোটি পুরুষ মার্গট অ্যাশটনের প্রেমে অন্ধ। গাঁটের পয়সা খরচ করে ওকে দেখতে যায় তারা।

কোন চুলোয় যাওয়া হয়েছিল? জানতে চাইল জনি।

কোথায় আবার, একটু ঢলাঢলি করতে বেরিয়েছিলাম।

মাতাল জনি তার উপর কতটা রেগে আছে, বুঝতে পারেনি মার্গট। লাফ দিয়ে ককটেল টেবিলটা টপকাল জনি, মার্গটের গলা টিপে ধরল। কিন্তু বেগুনি চোখের এত কাছে এসে কেমন যেন হয়ে গেল জনি। মূহুর্তে পানি হয়ে গেল তার রাগ। এই সময় একটু ভুল করে বসল মার্গট। ঠোঁট বাঁকা করে ব্যঙ্গের হাসি হাসল সে। এক পলকে আবার মাথায় রক্ত চড়ে গেল জনির। মারবে বলে ঘুষি তুলল সে।

না-না, জনি, চেঁচিয়ে উঠল মার্গট। মুখে মেরো না। আমি এখন ছবি করছি যে! হাসছে সে।

পেটে এক ঘুষি মেরে তাকে মাটিতে ফেলে দিল জনি। পরমুহর্তে ডাইভ দিয়ে পড়ল তার শরীরের উপর। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মার্গটের। হাঁসফাস করছে। তার কনুইয়ে ঘুষি মারছে জনি। চাপড় মেরে পাঁচ অঙুলের দাগ বসিয়ে দিচ্ছে রোদে পোড়া উরুতে।

কিশোর বয়সে হেলস কিচেন, নিউ ইয়র্কের গুণ্ডাপাড়ায় ছোট ছোট ছেলেদের ধরে উত্তম-মধ্যম দিত জনি, ঠিক সেই রকম করে মারছে তার স্ত্রীকে। ব্যথা কোথাও কম লাগছে না, তবে একটা দাঁত নড়ে বা নাক ভেঙে রূপের স্থায়ী কোন ক্ষতি হচ্ছে না।

খুব যে জোরে মারছে জনি, তা নয়। আসলে হাতে জোর পাচ্ছে না সে। মার খাচ্ছে, কিন্তু ফিক ফিক করে হাসছে মার্গট। হাই-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে মেঝেতে, উপর দিকে উঠে গেছে গাউন, কিন্তু সি থামছে না তার। আর সেই সাথে কথার হুল ফোটাচ্ছে, এসো, জনি, এসো। কাজ সারো..আসলে তাই তো চাইছ।

উঠে পড়ল জনি।

গড়িয়ে সরে গেল মার্গট, নৃত্য-পটিয়সীর মত লাফ দিয়ে উঠে জনির মুখোমুখি দাঁড়াল। ছোট্ট মেয়ের মত নাচছে, নাচতে নাচতে সুর করে বলছে, মারেনি, মারেনি! জনি আমাকে মারেনি! হঠাৎ ম্লান হয়ে গেল তার চেহারা, নাচ থামাল মর্গট। গাম্ভীর্য ফুটে উঠল চোখেমুখে, তাও নয়ন ভরে দেখার মত সুন্দর! বলল, বোকা, জনি, তুমি চিরকেলে বোকা। আহাম্মক, হাতে-পায়ে খিল ধরিয়ে দিলে আমার। কিভাবে প্রেম করতে হয় তাও তুমি জানো না। আনাড়ী খোকা। এখনও তুমি ভাবো ন্যাকামি ঢংয়ে যেভাবে গান গাইতে, মেয়েদের সাথে সেভাবে প্রেম করতে হয়! মাথা নাড়ছে মার্গট। বেচারা! তোমাকে আমি করুণা:করি, জনি। গুড বাই, জনি। শোবার ঘরে চলে গেল সে। শব্দ শুনে জনি বুঝল ভিতর থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়া হলো।

মেঝেতে বসল জনি। মুখ ঢাকল দুহাতে। অদ্ভুত একটা গ্লানি অনুভব করছে সে। অপমানে, নৈরাশ্যে অস্থির হয়ে উঠছে মন। নিঃসম্বল হাতে ছেলেদেরও প্রাণশক্তির কিছুটা জোর থাকে, সেই জোর খাঁটিয়ে ফোন তুলল জনি। একটা ট্যাক্সি ডাকল। এয়ারপোর্ট যাবে। ফিরে যাবে নিউইয়র্কে। ক্ষমতা দরকার এর দরকার বিচক্ষণ পরামর্শ। ভালবাসা দরকার, দরকার আত্মবিশ্বাস। এসব তাকে মাত্র একজনই দিতে পারেন। পৃথিবীতে একমাত্র তার কাছেই এসব চাইতে পারে জনি। তার কাছেই যাচ্ছে সে। তিনি ওর ধর্মপিতা। গড ফাদার

ডন কর্লিয়নি।

.

রুটিওয়ালা নাজোরিনি। প্রকাণ্ড একটা ইটালিয়ান রুটির মতই চেহারাটা। ফাপা ফোলা। একবার স্ত্রীর দিকে তাকাচ্ছে, একবার যুবতী মেয়ের দিকে, তারপর চট করে দেখে নিচ্ছে সহকারী এমজোকে। তার ভুরু, জোড়া কোঁচকানো। সারা গায়ে ময়দা মেখে সাদা ভূত হয়ে আছে।

পোশাক পাল্টে, গায়ে যুদ্ধবন্দীর উর্দি চড়িয়েছে এনজো। জামার আস্তিনে। একটা ব্যাণ্ড, তাতে সবুজ সংখ্যা লেখা। গভর্নর্স আইল্যাণ্ডে হাজিরা দিতে দেরি হয়ে গেলে বারোটা বাজবে তার, এই ভয়ে আধমরা হয়ে আছে। হাজার হাজার ইটালিয়ান যুদ্ধবন্দীকে প্রতিদিন পেরোলে মুক্তি দেয়া হয়, আমেরিকার অর্থনীতিকে মোটা তাজা করার কাজে যাতে সাহায্য করতে পারে, তারা। এনজোর ভয়, সুযোগটা যদি কেড়ে নেয়া হয়। তাই আজকের এই ব্যাপারটা তার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঝাঁঝের সাথে জানতে চাইল নাজোরিনি, মেয়ের ইজ্জৎ নিয়ে প্রশ্ন। আমি জানতে চাই, তুমি কি ওর ধর্ম নষ্ট করেছ? স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ছোট কোনো পোটলা ওকে উপহার দিয়েছ? যুদ্ধ থেমে গেছে, আমেরিকা এখন তোমাকে.পোদে লাথি মেরে তাড়াবে। সিসিলির সেই অজ গায়ে ফেরত পাঠানো হবে তোমাকে।

খুব চওড়া শরীর এনজোর। ভাঁজ করে হাত দুটো বুকে রাখল সে। চেহারা কাদো কাদো। দেখুন, যীশু-মাতার কিরে, আপনার মেয়ে.•ওকে আমি ভালবাসি। ওকে আমি বিয়ে করতে চাই। কিন্তু একবার যদি ওরা আমাকে ইটালিতে ফেরত পাঠায়, জীবনে কখনও আর এখানে ফেরা হবে না আমার। আর ফিরতে না পারলে ক্যাথারিনকে হারাতে হবে, চিরতরে।

ঢং কোরো না! ধমকের সুরে বলল ফিলোমিনা, তারপর ফিরল স্বামীর দিকে। এখন কি করতে হবে তা তোমার অজানা নয়। থেকে যাবে এনজো। লং আইল্যাণ্ডে আমাদের আত্মীয়-স্বজন রয়েছে, তাদের কাছে ওকে লুকিয়ে রাখো।

কাঁদছে ক্যাথারিন। এরই মধ্যে গায়ে মেদ জমতে শুরু করেছে তার। মুখটা সাদামাঠা, মিহি গোঁফের রেখা ঠোঁটের ওপর। তার চোখে সুদর্শন পুরুষ এনজো, তার মনে হয়, শ্রদ্ধা মেশানো প্রেমের সাথে তার শরীরের গোপন জায়গাগুলোয় যেভাবে হাত দেয় সেভাবে আর কোন পুরুষ হাত দেবে না। শালিক পাখির মত চেঁচামেচি জুড়ে দিল সে।

ঠিক আছে, ইটালিতে গিয়েই থাকব আমি, বলল ক্যাথারিন। তোমরা এনজোকে এখানে রাখার কোন ব্যবস্থা যদি না করো, আমাকেও পালিয়ে যেতে হবে।

আড়চোখে তার দিকে তাস্কাল নাজারিনি। বহুত ঘোড়েল তার এই মেয়েটা। নজর এড়ায়নি তার, তন্দুর থেকে গরম রুটি বের করে খদ্দেরদের টেবিলের দিকে এগোলেই ক্যাথারিন তার সুগঠিত নিতম্ব এনজোর গায়ে ঘষে দেয়। একটা ব্যাপারে এখন নাজোরিনির মনে কোন সন্দেহ নেই: সময় থাকতে একটা সমাধান বের করতে না পারলে ছোকরার গরম রুটি মেয়েটার তন্দুরে উঠবে।

আমেরিকায় স্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে এনজোকে। মাত্র একজন ভদ্রলোক আছেন, যিনি এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন। তিনি গড় ফাদার। ওর ধর্মপিতা। ডন কর্লিয়নি।

.

উনিশ শো পঁয়তাল্লিশ সাল। আগস্ট মাসের শেষ শনিবার। আরও অনেকের সাথে এই কজনও মিস কনস্ট্যানসিয়া কর্লিয়নির বিয়ে উপলক্ষে এনগ্রেভ করা নিমন্ত্রণপত্র পেল।

কনের বাপ ডন ভিটো কর্লিয়নি আজকাল লং আইল্যাণ্ডের প্রকাণ্ড একটা বাড়িতে থাকেন, কিন্তু পুরানো বন্ধু-বান্ধব কিংবা প্রতিবেশীদের কথা কখনও তিনি, ভুলে যান না। যাদেরকে তিনি চেনেন, যারা তার বন্ধু ছিল এককালে, যারা তার প্রতিবেশী হবার গৌরবের অধিকারী তাদের সবাইকে তিনি মনে রেখেছেন, নিমন্ত্রণ করতেও ভোলেননি।

বিয়ের আয়োজন লং আইল্যান্ডের এই বাড়িটিতেই করা হয়েছে। সারাদিন ধরে এখানে চলবে তুমুল আমোদ-আলাদ। জাপানীদের সাথে যুদ্ধ থেমেছে মাত্র, কারও ছেলে যুদ্ধ করছে না, সুতরাং আনন্দফুর্তি উপভোগ করতে অসুবিধে নেই কারও। উদ্দাম আনন্দ প্রকাশ করার জন্যে বিয়েবাড়ির উৎসবের মত পরিবেশ আর আছে নাকি।

শনিবারের সকাল।

নিউ ইয়র্ক শহর থেকে বিশাল জনমোত বেরিয়ে আসছে। গন্তব্যস্থান লং আইল্যাণ্ড। এরা সবাই ডন কর্লিয়নির বন্ধু-বান্ধব। গড ফাদারের দাওয়াত পেয়ে প্রত্যেকে গর্বিত, কৃতজ্ঞ এবং ধন্য। ধর্মপিতার প্রাপ্য সম্মান দিতে দলে দলে চলেছে তারা। চেক নয়, ঘিয়ে-রঙা এনভেলাপে ভরে নগদ টাকা নিয়ে এসেছে সবাই, বর কনেকে উপহার দেবার জন্যে। সবার এনভেলাপে একটা করে কার্ড আছে, সেই কার্ডে দাতার পরিচয় এবং গড ফাদারের প্রতি তার ভক্তি ও শ্রদ্ধার মাত্রাও উল্লেখ করা হয়েছে। সত্যি কথা বলতে কি, তাদের এই সীমাহীন ভক্তি-শ্রদ্ধা পাবার যোগ্যতা গড ফাদার ডন ভিটো কর্লিয়নির আছে।

সাহায্যের জন্যে এসে ডন কর্লিয়নির কাছ থেকে কখনও খালি হাতে ফিরে যায় কেউ। কাউকে তিনি বিমুখ করতে জানেন না। প্রতিশ্রুতি দিলে তা রক্ষা করেন তিনি, কাউকে কখনও মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেন না। তার চেয়েও শক্তিশালী কোন পক্ষের কাছে তার হাত পা বাধা, এ ধরনের কাপুরুষোচিত অজুহাত কখনও দেখান না তিনি। তাঁর সাথে যে-কেউ বন্ধুত্ব করতে পারে, সবার বন্ধু হবার জন্যে তিনি সব সময় প্রস্তুত হয়ে আছেন। সাহায্য পেতে হলে তার সাথে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে হবে, এমন কোন শর্তও নেই। ঋণ শোধ করার সঙ্গতি নেই যার তাকেও তিনি সাহায্য করেন, বিনিময়ে তার কাছ থেকে কিছুই চান না। মাঝখানে কথা আছে মাত্র একটা; সাহায্য যে পেতে চায় তাকে যেচে পড়ে তার কাছে আসতে হবে, বন্ধুত্ব পাতাতে হবে। ব্যস, শুধু এইটুকু।

সাহায্য প্রার্থী সর্বহারা হোক, দুর্বল হোক, কিছু এসে যায় না তার সমস্ত সমস্যা; বিপদ, দুশ্চিন্তা নিজের কাঁধে তুলে নেবেন ডন কর্লিয়নি। তার বিপদকে নিজের বিপদ হিসেবে গ্রহণ করবেন। তাকে বিপদ মুক্ত করার জন্যে, তার দুঃখ দূর করার জন্যে দরকার হলে সাধ্যের বাইরে চেষ্টা করবেন তিনি, শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে লড়বেন। সামনে যত বাধাই আসুক, মানবেন না। কিন্তু বিনিময়ে? এর বিনিময়ে কিছুই কি চান না তিনি?

চান। বন্ধুত্ব চান। চান মর্যাদার প্রতীক ডন হিসেবে স্বীকৃতি। কখনও বা আরও মধুর সশ্রদ্ধ সম্বোধন-গড় ফাদার। এবং এর সাথে হয়তো নগদ প্রাপ্তি হিসেবে নয়, শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ ঘরে তৈরি এক গ্যালন মদ, কিংবা যত্ন করে বেক করা এক ঝুড়ি ঝাল নিমকি পেলে খুশি হন। তাছাড়া, ব্যাপারটা যদিও সামান্য লৌকিকতা ছাড়া কিছু নয়, তবে সকলেরই জানা আছে যে সামনে দাঁড়িয়ে তোমাকে বলতে হবে, তাঁর কাছে তুমি কৃতজ্ঞ এবং ঋণী, প্রয়োজনে নগণ্য কোন কাজ করে দিয়ে সে ঋণের প্রতিদান চাওয়ার অধিকার তাঁর থাকল।

বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন ডন ভিটো কর্লিয়নি। অতিথিরা সবাই তার পরিচিত, সবাইকে তিনি বিশ্বাস করেন। এদের মধ্যে এমন লোকের সংখ্যা প্রচুর যারা তাদের সমস্ত জীবনের সাফল্যের জন্যে তার কাছে চিরঋণী হয়ে আছে। আজকের এই শুভ অনুষ্ঠান উপলক্ষে তাকে তারা প্রকাশ্যে গড। ফাদার বলে ডাকতেও সাহস পাচ্ছে। বাড়িতে কাজকর্ম করছে যারা তারাও সবাই তাঁর বন্ধু বান্ধব। টেবিলে মদের পাত্র সাজাবার দায়িত্ব নিয়েছে যে, সে-ও তার একজন পুরানো বন্ধু, বন্ধুত্বের প্রতিদান হিসেবে যত মদ লাগছে, সবই যোগান দিচ্ছে সে। তার ছেলেদের বন্ধুরা দায়িত্ব নিয়েছে পরিবেশনের। বাগানে ফেলা হয়েছে পিকনিক টেবিলগুলো। ডনের স্ত্রী আর তার বান্ধবীদের রান্না করা উপাদেয় খাবারগুলো সেখানে সাজানো হয়েছে। কনের তরুণী বান্ধবীরা রঙ বেরঙের মালা দিয়ে সাজিয়েছে বাগানের এক একর জায়গা।

ধনী হোক বা গরীব, ক্ষমতাশালী হোক বা দুর্বল, আচরণে কারও প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব প্রকাশ পাচ্ছে না, সমান আন্তরিক প্রীতির সাথে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছেন ডন কর্লিয়নি। কাউকে তিনি অনাদর করছেন না। তাঁর স্বভাবই এই। মেহমানরাও বিগলিত বিনয়ে বারবার স্বীকার করছে, কালো সান্ধ্য পোশাকে তাকে ভারি সুন্দর মানিয়েছে–অজ্ঞ যে কোন লোক তাকে দেখে ভাববে তিনিই বুঝি ভাগ্যবান বর।

তিন ছেলের মধ্যে দুজন বাপের সাথে সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বড় ছেলে সানতিনা, বাবা ছাড়া আর সবাই তাকে সনি বলে ডাকে।

সনির দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে বয়স্ক ইটালিয়ান ভদ্রলোকেরা। তাকিয়ে আছে যুবকরাও, তাদের চোখে শ্রদ্ধামাখা দৃষ্টি। এক পুরুষ ধরে ইটালিতে বসবাসরত মা বাপের ছেলেরা সনির মত এতটা লম্বা হয় না। প্রায় ছফুট। এলোমেলো কোঁকড়া চুল মাথায়, ফলে তাকে আরও বেশি লম্বা মনে হয়। মুখটা দেখতে খানিকটা স্থল, কিউপিডের মত। নিখুঁত নাক চোখ! ঠোঁট দুটো পুরু এবং ধনুকের মত বাকা, যা দেখে তাকে ইন্দ্রিয়াসক্ত বলে চেনা যায় সহজেই। ঠোঁটের নিচেই টোল খাওয়া থুতনিতে অদ্ভুত একটা, অশ্লীলতার লক্ষণ রয়েছে।

শক্তিশালী ষাঁড়ের মত শরীর সনির। সবাই বলে প্রকৃতি নাকি ওকে এমন উদার হস্তে দান করেছে যে অতীতে অবিশ্বাসীরা ব্ল্যাক নামের যন্ত্রটাকে যে রকম ভয় করত, ওর নির্যাতিতা স্ত্রী বেচারীও ওর যন্ত্রটাকে সে-রকম ভয় পায়। গুজবে প্রকাশ, মাত্র কৈশোর আর যৌবনের সন্ধিক্ষণে পৌঁছেটে তখন সনি, বারবনিতা পল্লীর সবচেয়ে ডাকসাইটে দুর্ধর্ষ মেয়েগুলোও নাকি ওর বিশাল যন্ত্রটা দেখা মাত্র প্রচলিত দরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দরহেঁকে বসত।

আজকের এই বিয়ে বাড়িতে চওড়া নিতম্ব নিয়ে কমবয়েসী কজন গিন্নী এসেছে, মুখে গাভীর্য অটুট রেখে চোখা দৃষ্টিতে তারা মাপ নিচ্ছে সনি কর্লিয়নির। তবে আজ ওদের বরাত খারাপ, কৌনো আশা নেই। কারণ, অনুষ্ঠানে স্ত্রী এবং বাচ্চা-কাচ্চারা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও লুসি ম্যানচিনিকে নিয়ে অন্য মতল রয়েছে সনির। বোনের বান্ধবী লুসি, উৎসবের গোলাপী পোশাক পরে এসেছে। মাথায় কালো, চকচকে চুলের উপর শোভা পাচ্ছে ফুলের মুকুট। বাগিচায় একটা টেবিলের কাছে বসে আছে; সনির মতলব সম্পর্কে পূর্ণ সচেতনসে।

গত এক হপ্তা ধরে চলেছে বিয়ের আয়োজন, লুসি ম্যানচিনি দীর্ঘ সাতদিন সময় পেয়েছে সনির সাথে ভাব জমাবার। আজ সকালেও এক কাণ্ড করেছে সে, বিয়ের একটা খণ্ড অনুষ্ঠানে সুযোগ পেয়েই হাত চেপে ধরেছিল সনির। কুমারী সে, এর চাইতে বেশি আর কতদূর এগোতে পারে?

সনি কর্লিয়নি তার বাপডন কর্লিয়নির মত একজন মহাপুরুষ হয়ে উঠবে না, কিন্তু সে ব্যাপারে কোন মাথাব্যথা নেই লুসি ম্যানচিনির। গায়ে জোর আর বুকে বল আছে; সনির। হৃদয়ে উদারতার কোন অভাব নেই তার। তবে বাপ যেমন বিনয়ী, ছেলে তার ধারে কাছেও যেতে পারে না। চট করে রেগে ওঠে সনি, আর রেগে গেলেই বিচার বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। একথা ঠিক যে ব্যবসায় তার বাপকে সর্ব রকম সাহায্য করে সে, কিন্তু তবু এই সনিই তার উত্তরাধিকারী হবে কিনা সে বিষয়ে জোর করে কিছুই বলা যায় না।

ফ্রেড বা ফ্রিডো বলে ডাকে সবাই মেজ ছেলেকে, নাম ফ্রেডারিকো। এমন একটা ছেলের জন্যেই প্রার্থনা করে থাকে সব ইটালিয়ান মা বাপেরা। ফ্রেড যেমন কর্তব্যপরায়ণ, তেমনি বিশ্বাসী। বাপের হুকুম পাবার জন্যে সদা সর্বদা একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে বললেও অত্যুক্তি হয় না। ত্রিশ বছর বয়সেও মা বাপের সাথে বসবাস করছে সে। একটু বেঁটে, গড়নটাও বেশ ভারি, ঠিক সুপুরুষ বলা যায় না তাকে। কর্লিয়নি পরিবারের চেহারাগত বৈশিষ্ট্যগুলো ওর মধ্যে উপস্থিত: গোল মুখ, কিউপিডের মাথার উপর কোঁকড়া চুলের মুকুট, ঠোঁট ধনুকের মত বাঁকা। ঠোঁট বাকা হলেও সনির সাথে তফাৎ এই যে ফ্রেঙের ঠোঁটে কামুকতার চিহ্ন নেই, গ্র্যানাইট পাথরে খোদাই করা বলে মনে হয়।

চেহারা এবং আচার-ব্যবহারে শক্ত নীরস একটা ভাব আছে ফ্রেডের। তবু সেই তো বাপের একমাত্র অবলম্বন, কখনও মুখের উপর তর্ক করে না বা মেয়ে ঘটিত ব্যাপারে ঝামেলায় পড়ে তার অপমান করে না। এই ধরনের যথেষ্ট গুণ থাকলেও ফ্রেডের চরিত্রে সেই প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব নেই যা মানুষকে আকর্ষণ করে, নেই সেই বুনো জন্তুর মত প্রবল প্রাণশক্তি-জননেতা হতে চাইলে যা না থাকলেই নয়। বাপের উত্তরাধিকারী হবার সম্ভবনা তারও নেই বললেই চলে।

ছোট ছেলে মাইকেল।

বাবা আর ভাইদের সাথে সদর দরজায় না দাঁড়িয়ে বাগানের নির্জনএক কোণে একটা টেবিলের কিনারায় বসে আছে মাইকেল কর্লিয়নি। সযত্নে দূরে সরে থাকার চেষ্টা করলেও আত্মীয় স্বজনের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি সে।

ডনের ছোট ছেলে মাইকেল, প্রবল প্রতাপশালী জন্মদাতার শাসন একমাত্র সেই মেনে চলতে রাজি নয়। ভাইদের সাথে কোথাও তেমন কোন মিল নেই মাইকেলের। কিউপিডের মত ভারি নয় তার মুখ, চুলগুলো কুচকুচে কালো, কিন্তু কোঁকড়া নয়। গায়ের চামড়া চকচকে সোনা রঙ মেশানো বাদামী, সাধারণত রূপসী মেয়েদের গায়ের রঙও এমন সুন্দর হতে দেখা যায় না। কোমল একটা রূপ আছে মাইকেলের। একটা সময় গেছে যখন ছেলের পুরুষত্ব সম্পর্কে চিন্তিত ছিলেন জুন। সতেরো বছরে পৌঁছে বাগের মিথ্যে দুর্ভাবনা অবশ্য দূর করে দিয়েছিল মাইকেল।

ভিড় থেকে মাইকেলের দূরে সরে বসার কারণ হলো, বাপ এবং আর সকলের কাছ থেকে নিজেকে যে সে স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন করেছে সেটাকে প্রকট ভাবে প্রকাশ করা। পাশে বসে আছে যে মেয়েটি সে ইটালিয়ান নয়, আমেরিকান। সবাই শুনেছে এর কথা, কিন্তু চোখে এই প্রথম দেখছে। মাইকেল অবশ্য ভদ্রতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে সবার সাথে আলাপ করিয়ে দিয়েছে মেয়েটার, তাদের মধ্যে পরিবারের কেউ বাদ পড়েনি।

কেউই মেয়েটাকে দেখে খুব একটা মুগ্ধ হয়নি। একটু বেশি রোগা, বেশি ফর্সা, চেহারাটা মেয়েমানুষের পক্ষে একটু বেশি তীক্ষ্ণ, চোখমুখে সপ্রতিভ ভাবও একটু বেশি, বিশেষ করে কুমারী মেয়ের চেহারায় এতটা চালাক চতুর ভাব না থাকলেই যেন তারা খুশি হত। কে অ্যাডামস-ওর নামটাও একটু বেশি অপরিচিত আর কেমন যেন অদ্ভুত শোনাল ওদের কানে। গত দুশো বছর ধরে ওরা বসবাস করছে আমেরিকায় এবং ওর পদবীটা অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয়, মেয়েটা যদি একথা বলে তাহলেও ব্যাপারটাকে তারা সহজ ভাবে গ্রহণ করতে পারবে না, কাঁধ ঝাঁকিয়ে তাচ্ছিল্য প্রকাশের সুযোগটাকে সাথে সাথে কাজে লাগাবে। এ নাম ওদের পছন্দ নয়।

মেহমানদের সকলের দৃষ্টি জুনের দিকে। ডন কি করছেন না করছেন সেদিকে সবার গভীর মনোযোগ। জন যে তার ছোট ছেলের দিকে বিশেষ খেয়াল দিচ্ছেন না। এটা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না কারও।

যুদ্ধের আগে পর্যন্ত মাইকেলই ছিল ডনের সবচাইতে প্রিয় সন্তান, তখনই না গিয়েছিল যে উপযুক্ত সময়ে তারকাঁধেই পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনার সম্মানজনক দায়িত্ব তুলে দেয়া হবে। মহাপুরুষ বাপের মৌন শক্তি আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির সবটুকু পেয়েছে ও, তারই সাথে যোগ হয়েছে এমনভাবে চলবার একটা জন্মগত ক্ষমতা, যার ফলে কোন মানুষেরই ওকে বন্ধ না করে উপায় নেই।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হতেই একটা পারিবারিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করুন মাইকেল। মেরিন কোরে নাম লিখিয়ে যুদ্ধে যোগ দিল সে। ডন কর্লিয়নি ছেলেকে বিশেষভাবে নিষেধ করলেন। কিন্তু মাইকেল কর্লিয়নি বাপের আদেশের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার প্রয়োজনবোধ করল না।

ডন কর্লিয়নি আমেরিকাকে একটা বিদেশী শক্তি হিসেবে ধরতেন, সেই শক্তির সেবা করতে গিয়ে তাঁর ছোটো ছেলে খুন হবে, এ তিনি চাননি। ঘুষ হিসেবে টাকা পয়সা যা লাগে ডাক্তারকে সেসব দেয়া হয়ে গিয়েছিল, গোপন আর সব ব্যবস্থাও মেরে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়াল মাইকেলের বয়স। একুশ পেরিয়ে গেছে তখন ও। তার ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুই করা গেল না। মেরিন কোরে নাম লিখিয়ে যুদ্ধ করতে চলে গেল সে প্রশান্ত মহাসাগরে।

পদক পেল মাইকেল, ক্যাপটেন হলো। ১৯৪৪ সালে ওর কৃতিত্বের সচিত্র বিবরণী ছাপা হলো লাইফ ম্যাগাজিনে, ওর ছবিও ছাপা হলো। বাড়ির লোকজনদের কারও সাহস হয়নি পত্রিকাটা নিয়ে এসে দেখায় ডনকে। তবে ডনের একজন বন্ধু পত্রিকাটা একদিন দেখাল ডনকে। সবটুকু পড়ে দেখে ডন তাচ্ছিল্যের সাথে একটা শব্দ করলেন, বললেন, এ ধরনের অলৌকিক ঘটনা ঘটাচ্ছে ও বিদেশীদের জন্যে।

১৯৪৫ সালের প্রথম দিকে সামরিক বিভাগ থেকে মুক্তি দেয়া হলো মাইকেল কর্লিয়নিকে। আহত ও অক্ষম অবস্থা থেকে যাতে ও সুস্থ হয়ে উঠতে পারে সেজন্যে ডন কর্লিয়নিই ছেলের এই মুক্তির ব্যবস্থা করলেন, কিন্তু মাইকেল এ সম্পর্কে কিছুই জানত না। চুপচাপ কয়েক হপ্তা বাড়িতে বসে থাকল ও। তারপর কাউকে কিছু না জানিয়ে ভর্তি হয়ে গেল হ্যাঁনোভারের ডার্টমান্য কলেজে। অর্থাৎ অবার সে বাপের বাড়ি ছেড়ে সরে গেল দূরে।

বোনের বিয়ে উপলক্ষে এতদিন পর আবার বাড়ি ফিরেছে মাইকেল। ফেরার আরেকটা উদ্দেশ্য হলো: ভাবী স্ত্রীকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া।

মেহমানদের মধ্যে যাদের চাকচিক্য একটু বেশি তাদের সম্পর্কে দুএকটা মজার মজার গল্প বলে ভাবী স্ত্রী কে অ্যাডমসকে হাসাতে চেষ্টা করছে মাইকেল। কে হাসির মত কিছু খুঁজে পাচ্ছে না, বরং মাইকেল যাদের কথা বলছে সেই সব লোককে আশ্চর্য রোমাঞ্চকর বলে মনে হচ্ছে তার। বেশ মজা লাগছে মাইকেলেরও। যা কিছু নতুন, যা কিছু ওর অভিজ্ঞতার বাইরে তাতেই যত কৌতূহল কে-র, এটা লক্ষ করে সত্যিই মুগ্ধ হচ্ছে ও।

ঘরে তৈরি মদে ভরা একটা পিপের চারদিকে ছোটখাটো ভিড় জমেছে একটা। একসময় সেদিকে চোখ পড়ল কে অ্যাডামসের। এরা হলো আমেরিগো বনাসেরা, রুটিওয়ালা নাজোরিনি, এ্যান্টনি কপোলা এবং লুকাব্রাসি। লোক চারজনকে অখুশি দেখাচ্ছে, সচেতন দৃষ্টি এবং ওর স্বাভাবিক বৃদ্ধির সাহায্যে তা ধরে ফেলল কে।

মৃদু হাসল মাইকেল। তুমি ঠিকই ধরেছ। ওরা অপেক্ষা করছে বাবার সাথে দেখা করবে বলে। প্রত্যেকের কিছু না কিছু চাওয়ার আছে। কথাটা ঠিক। ডন যেদিকেই যাচ্ছেন, চারজোড়া চোখ তাকে সারাক্ষণ অনুসরণ করছে।

অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন ডন কর্লিয়নি। এমন সময় শানবাঁধানো উঠানের উল্টো দিকে এসে থামল একটা কালো শেভ্রলে গাড়ি। সামনের সীটে দুজন লোক। কোটের পকেট থেকে নোট বই বের করে উঠানের চারদিকে দাঁড়ানো গাড়িগুলোর নম্বর টুকছে।

ব্যাটারা নির্ঘাৎ পুলিশ, বাপের দিকে তাকাল সনি।

কাঁধ ঝাঁকালেন ডন কর্লিয়নি। রাস্তাটার মালিক তো আর আমি নই। যা খুশি তাই করতে পারে ওরা।

রাগে লাল হয়ে উঠেছে সনির মুখ শালা কুত্তার বাচ্চারা! একটা শুভ কাজের ওপরও কি ওদের শ্রদ্ধা থাকতে নেই? বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নেমে যাচ্ছে সনি। উঠান পেরিয়ে গাড়িটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। নিচু হয়ে ড্রাইভারের দিকে তাকাতেই লোকটা নির্বিকার চিত্তে ওয়ালেট খুলে সবুজ রঙের পরিচয় পত্রটা দেখিয়ে দিল। কথা বলল না সনি, শুধু পিছু হঠে এসে থোঃ করে একগাল থুথু ছুঁড়ল। সেটা পড়ল গিয়ে গাড়ির পিছনের দরজার উপর।

ফিরে আসছে সনি। আশা করছে, ড্রাইভার নিচে নেমে ওকে তাড়া করে উঠানে উঠে আসবে। কিন্তু না। বাপের কাছে ফিরে এসে সনি বলল, এফ-বি আই, কুকুরগুলো সব গাড়ির নম্বর টুকছে।

দেখেই ওদের পরিচয় অনুমান করতে পেরেছেন ডন কর্লিয়নি। ওরা আসবে, এও তিনি জানতেন। সেজন্যে তার ঘনিষ্ঠ সব বন্ধুদের সাবধান করে দেয়া হয়েছে, বিয়ে বাড়িতে কেউ যেন নিজের গাড়ি নিয়ে না আসে। সনির এই নির্বোধের মত রেগে ওঠার পিছনে তার কোন সমর্থন না থাকলেও, তিনি বুঝলেন এতে একটু ভাল ফল দেবে। অবাঞ্ছিত আগন্তুকরা এখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে তাদের আগমনটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত, এর জন্যে কোন প্রস্তুতি নেয়া হয়নি।

রাগের কোন প্রকাশ জনের নিজের মধ্যে একেবারেই দেখা গেল না। তার কারণ অনেক দিনের অভিজ্ঞতায় তিনি একটি মূল্যবান শিক্ষা অর্জন করেছেন, তা হলো: সমাজ কোন মানুষকে যত ভয়ঙ্কর ভাবেই অপমান করুক না কেন, তা মুখটি বুজে সহ্য করতে হয় এই আশায় বুক বেঁধে যে এ দুনিয়ায় চোখ কান খোলা রাখলে এমন দিনও আসে যখন তুমি যত দূর্বলই হও না কেন, অতিক্ষমতাবানের উপরও প্রতিশোধ নিতে পারবে। এই জ্ঞানটি আছে বলেই তিনি কখনও তার সবিনয় ভাবটি বিসর্জন দেন না।

মেহমানরা সবাই পৌঁছে গেছে। বাড়ির পিছন দিকের বাগানে এই সময় চার বাজনাদারের ব্যাণ্ড শোনা গেল। অবাঞ্ছিতদের চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে বিয়ের ভোজে শরিক হতে যাচ্ছেন ডন কর্লিয়নি। সাথে দুই ছেলে।

প্রকাণ্ড বাগান। ইতিমধ্যে কয়েকশো মেহমান জড়ো হয়েছে সেখানে। ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে কাঠের মঞ্চ, তাতে চড়ে কেউ কেউ নাচতে আরম্ভ করেছে। টেবিলগুলো লম্বা, সুস্বাদু মশলা দিয়ে রান্না করা উপাদেয় খাবার-দাবারের পাহাড় জমে উঠেছে সেগুলোয়। ঘরে তৈরি করা কালো মদ সরবরাহ করা হয়েছে। এক একটা জগে এক গ্যালন করে মদ ধরে। টেবিলগুলোর সামনে বসে আছে। মেহমানরা। সবচেয়ে উঁচু টেবিলে বসে আছে জমকালো পোশাক পরা বিয়ের কনে, কনি কর্লিয়নি। পাশে তার বর। ওদেরকে সঙ্গ দিচ্ছেন কনে ও বরের বন্ধু-বান্ধবীরা। সেকেলে ইতালীয় পাড়াগেঁয়ে রীতিতে বিবাহ উৎসবের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ব্যাপারটা পছন্দ হয়নি কনি কর্লিয়নির, শুধু বাবাকে খুশি করার জন্যেই এমন সুল আয়োজনে রাজি হয়েছে সে। এ ধরনের ছোটখাটো ব্যাপারে জেদ ধরে বাবার অসন্তোষ বাড়াতে চায়নি, এমনিতেই স্বামী বাছাই করার ব্যাপারে যথেষ্ট অসন্তুষ্ট করেছে তাকে।

বর কার্লো রিটসি। দো-আঁশলা। মা ইটালির উত্তর দিকের মেয়ে, বাবা সিসিলির। মায়ের কাছ থেকে কালো সোনালী চুল আর নীল চোখ পেয়েছে। নেভাড়ায় থাকে ওরা, আইন কানুনের সাথে তেমন বনিবনা না হওয়ায় সে-রাজ্য ছেড়ে চলে এসেছে কার্লো। সনি কর্লিয়নির সাথে নিউইয়র্কেই পরিচয়, সেই সূত্রে পরিচয় কনি কর্লিয়নির সাথে। নেভাড়ায় বিশ্বস্ত বন্ধু পাঠিয়ে ডন কর্লিয়নি অবশ্য খবর নিয়ে জেনেছেন পুলিশের সাথে ঝামেলাটা যে একটা বন্দুক নিয়ে, অর্থাৎ ব্যাপারটার কোন গুরুত্ব নেই। পাত্রকে নিখুঁত করার স্বার্থে খাত থেকে সহজেই ব্যাপারটা মুছে ফেলা যায়। বন্ধুরা ফিরে এসে সেই সুথে তাকে আরও জানিয়েছিল যে আইনের অনুমতি নিয়ে ধূমসে জুয়া খেলা চাল রয়েছে নেভাডায়। কৌতূহল বোধ করেছিলেন ডন কর্লিয়নি, এবং ব্যাপারটা নিয়ে এখনও ভাবনাচিন্তা করছেন। তাঁর বড় হওয়ার আরেকটা কারণ হলো, সবকিছু থেকেই তিনি লাভবান হতে পছন্দ করেন।

খুব একটা সুন্দরী কনি কর্লিয়নিকে বলা চলে না। বেশ রোগা। নার্ভাস টাইপের মেয়ে। একটু বয়স হলেই এরা খিটখিটে মেজাজের হয়ে ওঠে। কিন্তু আজকের কথা আলাদা। নারীর সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ কুমারীত্ব দান করার ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে কনির চেহারায়, মনে মনে নিজেকে নিয়ে আজ ও ব্যক্তিগত উৎসবে মেতে উঠেছে। বিয়ের সাদা পোশাকে মানিয়েছে খুব, চোখে মুখে এমন এক উজ্জ্বলতা, যে এক রকম সুন্দরীই দেখাচ্ছে তাকে। একটা হাত টেবিলের নিচে দিয়ে স্বামীর পৈশীবহুল উরুর উপর রেখেছে। ধনুকের মত আঁকা ঠোঁট দিয়ে স্বামীকে চুমোয় চুমোয় ব্যতিব্যস্ত করে তোলার জন্যে অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছে।

কনির চোখে কার্লো আশ্চর্য এক সুদর্শন পুরুষ। বয়স যখন কম ছিল মরুভূমির খোলা বাতাসে কঠিন পরিশ্রমের কাজ করেছে কালো। বিশাল শক্তিশালী ষাড়ের মত কাঁধ তার, পেশীর চাপে সৌখিন কোটের দুটো দিক উঁচু হয়ে আছে। শ্রদ্ধা, প্রশংসা আর ভালবাসার দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে কনি। গর্বে আরও ফুলে উঠছে কার্লোর বুক। স্ত্রীর গেলাসে মদ ঢেলে দিচ্ছে। কিন্তু কনির ডান কাঁধে ঝোলানো রেশমী ব্যাগটার দিক থেকে বেশিক্ষণ চোখ সরিয়ে রাখতে পারছে না সে। ব্যাগে রয়েছে অসংখ্য খাম, খামগুলো ভলারে ঠাসা। অনুমান করার চেষ্টা করছে কালো, কত ডলার ধরতে পারে ওই ব্যাগে? পঞ্চাশ হাজার? এক লাখ? তৃপ্তির মুচকি হাসি ফুটছে, তার ঠোর্টে। এই তো সবে শুরু, এখন শুধু আসতেই থাকবে টাকা, আসতেই থাকবে। বলতে গেলে মন্তু এক রাজার জামাই হয়েছে সে। এখন ওকে খাতির করতেওরা বাধ্য।

মেহমানদের মধ্যে রয়েছে ভেল চকচকে মাথাওয়ালা চালিয়াত ছোকরা পলি গাটো।মেন বদ মতলবে নয়, যে অভ্যাসের বশে ভাবছে টাকায় ফুলে ওঠা ওই ব্যাগটা কিভাবে হাইজ্যাক করা যায়। ভেবে খুব মজা পাচ্ছে পলি। জানে, খেলনা বন্দুক দিয়ে বাচ্চারা ট্যাঙ্ক উড়িয়ে দেবার যে স্বপ্ন দেখে, তার কল্পনাটাও সেই রকম অলস দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়।

ওর ওপরওয়ালাকে লক্ষ্য করছে পলি। ভারি মোটা, আধাবয়েসী পিটার ক্লেমেনজো। কাঠের মঞ্চের উপর উঠে ছুকরী বয়েসী টসটসে মেয়েদের সাথে ধুমধাড়াক্কা-সর্বস্ব ট্যারান্টেলা নাচছে। যেমন অস্বাভাবিক লম্বা তেমনি চওড়া তার শরীর, অথচ আশ্চর্য বেপরোয়া দক্ষতার সাথে নাচছে সে। মেয়েগুলো বেঁটে বলেই হোক বা ক্লেমেনজোর শক্ত ভুড়িটা প্রতিটা লাফের সাথে সাথে উঁচুতে উঠে যাচ্ছে বলেই হোক, মেয়েগুলোর ফুলে থাকা বুকের সাথে অশ্লীলভাবে ধাক্কা খাচ্ছে। তাই দেখে মেহমানদের কি উল্লাস! এরপর ওর পার্টনার হবার জন্যে একটু বয়স্ক মেয়েরা এগিয়ে এসে ছেকে ধরল ওকে, ওর হাত ধরে টানাহেঁচড়া শুরু করে দিল। ম্যাণ্ডোলিনের উদ্দাম তালের সাথে মিল রেখে হাততালি দিচ্ছে ছোকরাগুলো। এক সময় হাঁপ ধরে গেল ক্লেমেনজোর। যে চেয়ারটায় বসল, সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে গেল সেটা। তাড়াহুড়ো করে এক গ্লাস মদ এনে দিল.ওকে পলি গাটো। রেশমী রুমাল দিয়ে. ওর বিশাল কপালের ঘাম মুছে দিল। তিমি মাছের মত হাঁসফাঁস করছে ক্লেমেনজো, গলায় মদ ঢালছে। ধন্যবাদ দেয়া তো দূরের কথা, চাছাছোলা গলায় বলল, শোনো, নাচের সমঝদার হবার দরকার নেই। কাজ করোগে। সব ঠিক ঠাক আছে কিনা দেখে এসো ঘুরে।

সুড়ুৎ করে ভিড়ের ভিতর ঢুকে গেল পলি।

টিফিনের জন্যে একটু থামল ব্যাণ্ড রাদকরা। পড়ে থাকা একটা ম্যাণ্ডোলিন তুলে নিল এক ছোকরা। নিমো ভ্যালেন্টি। চেয়ারের উপর বাঁ পা তুলে দিয়ে খানিকটা অশ্লীল ধাচের একটা সিসিলীয় প্রেমের গান গাইতে শুরু করল। সুদর্শন চেহারা, কিন্তু মদ খেয়ে ফুলে গেছে মুখটা। আজও এরই মধ্যে নেশা করেছে সে। অশ্লীল পদগুলো জিভ দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে গাইছে নিনো, মেয়েদের দিকে কামাতুর, ঢুলু ঢুলু চোখে তাকাচ্ছে। আর মেয়েগুলো আমোদে আপ্লুত হয়ে চেঁচাচ্ছে। প্রত্যেক চরণের শেষ শব্দটা নিনোর সাথে গলা ফাটিয়ে আওড়াচ্ছে ছেলেরা।

এসব ব্যাপারে গোড়া বলে যথেষ্ট অখ্যাতি আছে ডন কর্লিয়নির। দেখলেন সবার সাথে মেতে উঠে তার মেদবহুল মোটা গিন্নীটিও উল্লাসে চেঁচাচ্ছে। বুদ্ধি করে তিনি বাড়ির ভিতর পালিয়ে গেলেন।

ব্যাপারটা লক্ষ্য করে কনের টেবিলের দিকে এগোল সনি কর্লিয়নি বসল লুনি ম্যানচিনির পাশে। এখন কোন বাধা নেই। পরিবেশনের আগে বিয়ের কেকট্রাতে শেষ সাজ দেবার জন্যে ওর স্ত্রীও গেছে হেঁসেলে।

তরুণী লুসির কানে কানে কিছু বলল সনি। লুসি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল সাথে সাথে। কিন্তু টেবিল ছেড়ে নড়ার কোন লক্ষণ সনির মধ্যে দেখা গেল না। কয়েকটা মুহূর্তকে বয়ে যেতে দিল সে। তারপর উঠল। অনুসরণ করল লুসিকে। ভিড়ের ভিতর দিয়ে যাবার সময় এখানে সেখানে থেমে এর তার সাথে দুটো কথাও বলল, যেন ওর কোন তাড়া নেই বা নির্দিষ্ট কোন কাজ নেই হাতে।

কিন্তু আসল ব্যাপারটা কারও দৃষ্টি এড়াল না। ওদের দুজনের উদ্দেশ্য সবাই জানে। সবাই বুঝল নির্জন কোথাও যাচ্ছে ওরা। কেন যাচ্ছে, তাও জানতে বাকি নেই কারও।

তিন বছর কলেজে পড়ে পুরো আমেরিকান বনে গেছে লুসি ম্যানচিনি। পাকা টসটসে ফলের মত দেখতে মেয়েটা, সবার আলোচনার পাত্রী। বিয়ের তোড়জোর চলার সময় খুব জমিয়ে ছিল সনি কর্লিয়নির সাথে। প্রচুর ঠাট্টা তামাশা করে, খানিকটা মিঠেকড়া ব্যঙ্গের মিশেল দিয়ে চটিয়ে পুরোপুরি খেপিয়ে তুলেছিল সনিকে। ওর ধারণা যেহেতু ও নীত-কনে আর সনি নীত-বর তাই এসবের মধ্যে দোষের কিছু নেই।

পরনের পোলাপী গাউনটা মাটি থেকে একটু তুলে ধরেছে লুসি, মুখে লক্ষ্মী মেয়ের কৃত্রিম হাসি। চঞ্চল পায়ে বাড়ির ভিতর ঢুকল সে। সিঁড়ি বেয়ে সোজা উঠে গেল দোতলায়। এদিক-ওদিক তাকাল। উত্তেজিত দেখাচ্ছে। আপনাআপনি লাল হয়ে উঠেছে চেহারা। হাঁপাচ্ছে। খানিক পরই ব্যাপারটা ঘটবে। আসছে সনি। ওকে আজ নেবে সে। আশ্চর্য এক উষ্ণতা অনুভব করছে লুসি তার শরীরে। শিহরিত বুকে বাথরুমে গিয়ে ঢুকল। কয়েক মিনিট পর বেরিয়েই দেখতে পেল সনিকে। উপরের ল্যাণ্ডিঙে দাঁড়িয়ে ওর জন্যেই অপেক্ষা করছে। ইশারায় ওকে ডাকলসনি। ঢোক গিলল লুসি। সারা শরীরে অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ।

ডন কর্লিয়নির অফিস রূমটা এক কোণায়, সেটা তৈরি করা হয়েছে একটু উঁচু করে। জানালাগুলো বন্ধ, তারই একটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে টমাস হেগেন। বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে সুসজ্জিত বাগান আর উৎসবমুখর মেহমানদের দেখছে সে। তার পিছনের দেয়ালটা ঢাকা পড়ে আছে বুক শেলফে সেগুলোয় মোটা মোটা সব আইনের বই ঠাসা। টমাস হেগেন একাধারে ডন কর্লিয়নির উকিল এবং কার্যকরী কনসিলিয়রি অর্থাৎ মন্ত্রণাদাতা। কর্লিয়নি পরিবারের ব্যাপারে যারা খাটছে, যারা অধঃস্তন কর্মচারী, তাদের কাছে এই পদের গুরুত্ব অপরিসীম।

ডনের সাথে এই অফিসরুমে বসেই জটিল সব সমস্যা আলোচনা করে হেগেন। ডন উৎসবমুখর বাগান ছেড়ে বাড়িতে ঢুকছেন দেখেই সে বুঝল, আজও তিনি কাজে বসবেন। এরপরই তার নজরে ধরা পড়ল সনি। লুসির কানে কানে কি যেন বলছে সে। গোটা প্রহসনটাই মনোযোগ দিয়ে দেখল হেগেন। গম্ভীর হয়ে একটু ভাবল ডনের কানে কথাটা তুলরে কিনা।

না। সিদ্ধান্ত নিয়ে ডেস্কের কাছে এসে দাঁড়াল হেগেন। ডনের সাথে আজ যারা গোপনে সাক্ষাৎ করার অনুমতি পেয়েছে তাদের তালিকাটা তুলে নিল ডেস্ক থেকে। এমন সময় অফিসে ঢুকলেন ডন। সাথে সাথে হেগেন তার হাতে তুলে দিল নামের তালিকাটা।

নামগুলোর উপর একবার চোখ বুলালেন ডন। সম্মতি জানাবার ভঙ্গিতে মাথা কাত করলেন। বললেন, আমেরিগো বনানেরাকে সবার শেষে ডেকো।

লম্বা দরজা খুলে বেরিয়ে গেল হেগেন। সোজা বাগানে। মদের পিপের চারপাশে সাক্ষাৎপ্রার্থীরা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। সবাই ওর দিকে তাকাল। রুটিওয়ালা নাজোরিনির দিকে তর্জনী তুলল হেগেন।

বুকে জড়িয়ে ধরে রুটিওয়ালাকে অভ্যর্থনা জানালেন ডন কর্লিয়নি। অনেক দিন, আগেরকত কথা মনে পড়ে যাচ্ছে তার: বন্ধু ছিলেন তারা, একসাথে খেলাধুলো করেছেন, একসাথে বড় হয়েছেন। ইটালির সেইসব দিনের কথা কি ভোলা যায়। প্রতি বছর ঈস্টারের সময় সদ্য বেক করা পাই পৌঁছে যেত ডন কর্লিয়নির বাড়িতে। সে-পাইয়ের আকার প্রকাণ্ড ট্রাকের চাকার মত, তাজা হনা আর সুজি দিয়ে তৈরি, মুরগীর ডিমের হলুদ কুসুম দিয়ে সোনালী রঙ করা বড় দিন, বাড়ির কারও জন্মদিন, অথবা অন্য কোন উত্সবের দিন হলে আর কথা ছিল না, ক্ষীর দিয়ে ভরাট করা উপাদেয় মিষ্টির ঝুড়ি উপহার হিসেবে, নাজোরিনিদের শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে পৌঁছে যেত। বয়স হতে ডন একটা বেকারি সমিতি গঠন করেছিলেন, সেই সমিতির চাঁদা সুদিন দুর্দিনে বছরের পর বছর খুশি মনে নিয়মিত দিয়ে এসেছে নাজোরিনি। যুদ্ধের সময় কিছু কালোবাজারি চিনির কুপন ছাড়া আর কোন ব্যাপারে কখনও সে ডনের কাছে সাহায্যের জন্যে হাত পাতেনি। বিশ্বাসী বন্ধু সে, এখন বিপদে পড়ে সাহায্য চাইতে এসেছে। আনন্দের সঙ্গে তার উপকার করবেন ডন কর্লিয়নি। তার উপকার করার সুযোগের অপেক্ষাতেই তিনি আছেন।

এক গ্লাস স্টেগা মদ খেতে দিলেন বন্ধুকে ডন কর্লিয়নি। তারপর একটা ডি নোবিলি চুরুট দিলেন। উৎসাহ যোগানোর জন্যে একটা হাত রাখলেন তার কাঁধে। বহু তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ডন কর্লিয়নি জানেন মানুষ হয়ে আরেকজন মানুষের কাছে অনুগ্রহ চাওয়া কত কঠিন, কতটা সাহসের দরকার হয়।

তাঁকে নিজের মেয়ে এবং এনজার কথা বলল রুটিওয়ালা। ইতালির খা এক ছেলে, বাড়ি নিসিলীতে। যুদ্ধবন্দী হিসেবে পাঠানো হয়েছে আমেরিকাতে। বর্তমানে প্যারোলে মুক্ত। ওর মেয়ে ক্যাথারিন এই যুদ্ধবন্দীর প্রেমে পাগলিনী হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ এখন থেমে যাওয়ায় এনজোকে আর সব যুদ্ধবন্দীর সাথে ফেরত পাঠানো হবে ইটালিতে। এখানেই হয়েছে মুশকিল। এনজো চলে গেলে ওর মেয়ের মন ভেঙে যাবে, সে বাঁচবে না। বলাই বাহুল্য, ওদের দুজনের মধ্যে এই প্রেমটা যেমন কড়া তেমনি পবিত্র। এখন, একমাত্র গড ফাদারই পারেন এই অভাগা অভাগিনীকে সাহায্য করতে। তার হাতেই নির্ভর করছে ওদের জীবন মৃত্যু।

বন্ধুকে সাথে নিয়ে পায়চারি করছেন ডন কর্লিয়নি। একটা হাত তুলে দিয়েছেন তার কাঁধে। সহানুভূতির সাথে মাথা ঝাঁকাচ্ছেন, বন্ধু যাতে উৎসাহ হারিয়ে না ফেলে। সব শুনে মৃদু হাসলেন তিনি। বললেন, আমি থাকতে তোমার কোন চিন্তা নেই।

কি কি করতে হবে সব তিনি অত্যন্ত সাবধানে বুঝিয়ে দিলেন। ওই এলাকার কংগ্রেস সদস্যের কাছে আবেদন করলে তিনি একটা বিশেষ বিলের প্রস্তাব তুলবেন, প্রস্তাবটা পাসও হয়ে যাবে, এবং পাস হয়ে গেলেই মার্কিন মুল্লুকের নাগরিক হবার অনুমতি মিলবে এনজোর। না-না, কংগ্রেসে বিলটা পাস হবে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ করার কিছুই নেই। পরস্পরের জন্যে এটুকু উপকার সবাই করে থাকে।

কৃতজ্ঞতায় অভিভূত হলো নাজোরিনি। তার চোখে পানি এসে গেছে। দরজা পর্যন্ত তাকে পৌঁছে দিলেন ডন কর্লিয়নি। বিদায় নেবার আগে রুটিওয়ালা মহান বন্ধুকে আলিঙ্গন করল।

ডনের দিকে তাকিয়ে হাসল হেগেন। নাজোরিনির জন্যে চমৎকার একটা বিনিয়োগ এটা। মাত্র দুহাজার ডলার খরচ করতে হবে তাকে, বিনিময়ে একটা কৃতজ্ঞ জামাই অর্থাৎ রুটির দোকানের নামমাত্র বেতনে সারাজীবন কাজ করার জন্যে একজন লোক পেয়ে গেল। একটু বিরতি নিয়ে জানতে চাইল সে, কাজটা কাকে দেব?

ভুরু কুঁচকে একটু ভাবলেন ডন কর্লিয়নি। আমাদের দলের কাউকে না। পাশের পাড়ার ইহুদিটাকে দিতে পারো! ঠিকানা ইত্যাদি সব বদলে দিতে হবে। যুদ্ধ থেমে গেছে, এ ধরনের সমস্যা আরও দেখা দেবে। আমাদের আরও কিছু লোক ওয়াশিংটনে থাকা দরকার, যারা বাড়তি কাজগুলো করবে, কিন্তু বাড়তি দর হাকবে না। নোট বুকে টুকছে হেগেন। কংগ্রেস সদস্য লুটেকার কাজ নয় এটা। ফিশারকে ধরো।

এরপর অ্যান্টনি কপোলাকে নিয়ে এল হেগেন। যৌবনে রেল ইয়ার্ডে কাজ করেছেন ডন কর্লিয়নি, তখনকার একজন সহকর্মীর ছেলে। একটা পাইয়ের দোকান দিতে চায় কপোলা, সেজন্যে পাঁচশো ডলার লাগবে তার। পকেট হাতড়ে এক গোছা টাকা বের করে গুনলেন ডন কর্লিয়নি। পাঁচশো ডলার হচ্ছে না দেখে হেগেনকে বললেন, একশো ডলার ধার দিতে পারো? সোমবারে ব্যাঙ্ক থেকে এনে। ফেরত দেব।

চারশো দিলেই কাজ চলবে, আর লাগবে না, সলজ্জভাবে বলছে কপোলা। কুণ্ঠিতভাবে হাসলেন ডন কর্লিয়নি। কপোলার কাঁধ চাপড়ে দিয়ে বললেন, তাই কি হয়। আমার পকেট খালি সেতো এই শখের বিয়ের জন্যেই, হেগেনের বাড়িয়ে ধরা হাত থেকে টাকাটা নিয়ে নিজেরগুলোর সাথে কপোলার হাতে গুঁজে দিলেন।

সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হেগেন। সে জানে, ডনের শিক্ষা হলো, কিছু দিতে হলে সেটাকে ব্যক্তিগত দান হিসেবেই দিতে হয়। ডনের মত একজন। মহাপুরুষ টাকা ধার করে তাকে দান করলেন, এতে অ্যান্টনি কপোলার মর্যাদা এক পলকে কতটা বেড়ে গেল। ডন একজন কোটিপতি, কপোলা তা জানে। কিন্তু গরীব বন্ধুর ছেলেকে সাহায্য করার জন্যে কজন কোটিপতি এ-ধরনের ঝামেলাকে হাসিমুখে নেয়?

মাথা তুলে তাকালেন ডন। দৃষ্টিতে প্রশ্ন।

হেগেন বলল, তালিকায় নাম নেই লুকা, ব্রাসির। কিন্তু তবু একবার দেখা করতে চাইছে সে। প্রকাশ্যে ব্যাপারটা হতে পারে না, এ কথা সে বুঝতেই পারছে না, ব্যক্তিগত ভাবে আপনার সাথে দেখা করে অভিনন্দন জানাবে।

এই প্রথম অপ্রসন্ন দেখাল ডনকে। তবে সরাসরি তিনি আপত্তি প্রকাশ করলেন না। বললেন, কোন দরকার আছে কি?

আপনি তাকে আমার চেয়ে ভাল চেনেন, কাঁধ ঝাঁকাল হেগেন। বিয়েতে দাওয়াত করা হয়েছে, সেজন্যে আশ্চর্য এবং কৃতজ্ঞ বোধ করছে। এতটা আশা করেনি। বোধ হয়…

ইঙ্গিত পেয়ে থেমে গেল হেগেন। লুকা ব্রাসিকে নিয়ে আসতে বলছেন ডন।

বাগানে বসে লুকা ব্রাসির মুখে বুনো একটা হিংস্রতার ছাপ লক্ষ্য করে কে অ্যাডামস তার বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ করছে। কে-কে বিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসার পিছনে মাইকেলের একটা উদ্দেশ্য আছে। ও চাইছে কে একটু একটু করে এবং মোটেও খুব বেশি স্তম্ভিত না হয়ে,ওর বাবার বিষয়ে সব প্রকৃত সত্য যেন জেনে নেয়। কিন্তু, দেখেশুনে ওর মনে হচ্ছে, সামান্য দুর্নীতিপরায়ণ একজন ব্যবসায়ী ছাড়া কে ডন কর্লিয়নিকে আর কিছু ভাবছে না এখনও। মাইকেল ঠিক করল, পরোক্ষ ভাবে ও চেষ্টা করবে আসল ব্যাপারগুলো জানিয়ে দিতে। তাই বুঝিয়ে বলল যে পূবদিকে যত লোক গোপনে আইন লঙ্ঘন করে তাদের মধ্যে লুকা ব্রাসির মত ভয়ঙ্কর, নির্মম পিশাচতুল্য চরিত্র আর একটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ওর সবচেয়ে বড় প্রতিভা হলো, কারও সাহায্য না নিয়ে, একাকী, এমন নিখুঁত ভাবে খুন-টুন করতে পারে যে ধরা পড়ার কোন সম্ভাবনা প্রায় থাকেই না। মাইকেল মুখ বিকৃত করল, বলল, এর মধ্যে সত্য মিথ্যা কতটা জানি না। তবে ওর সাথে আমার সম্পর্কটা বন্ধুত্বেরই, বলতে পারো।

এই প্রথম চোখ খুলে গেল কে-র। তার কণ্ঠে অবিশ্বাস, এমন ভয়ঙ্কর লোক ও? তুমি নিশ্চয়ই বলতে চাই না যে এরকম একজন লোককে তোমার বাবা চাকরিতে রেখেছেন?

দুত্তোরি ছাই! ভাবল মাইকেল। সরাসরি বলল, শোনো তাহলে। পনেরো বছর আগের কথা। কয়েকজন লোক বাবার জলপাই তেলের ব্যবসাটা হাত করে। নেবার মতলব এটেছিল। ওদের উদ্দেশ্য ছিল বারাকে খুন করা। খুন প্রায় করে ফেলেছিল। কিন্তু সময় থাকতেই ওদের পিছনে লাগানো হলো ওকে, ওই লুকা ব্রাসিকে। সত্য মিথ্যা জানি না, গুজব হলো, হপ্তা দুয়ের মধ্যে এক এক করে ছয়জনকেই শেষ করেছিল লুকা। বিখ্যাত জলপাই তেল যুদ্ধের সমাপ্তি ওখানেই। হাসল মাইকেল, কথাগুলো যেন কতই না মজার।

শিউরে উঠল মেয়েটা। তোমার বাবাকে খুন করার চেষ্টা করেছিল?

অনেক আগের কথা। পনেরো বছর আগেই সব ঠাণ্ডা মেরে গেছে। ভয় হচ্ছে মাইকেলের, খুব বেশি বলে ফেলেনি তো!

হঠাৎ হাসল কে। মাইকেলের পাজরে মৃদু একটা কনুইয়ের তো মেরে বলল, ভারি চালাক! আসলে আমাকে ভয় দেখাচ্ছ! চাও না যে তোমাকে আমি বিয়ে করি?

আমি চাই তুমি গোটা ব্যাপারটা ভালভাবে ভেবেচিন্তে দেখো, বলল মাইকেল।

ভুরু কুঁচকে কে জানতে চাইল, ছয় জনকে মেরে ফেলেছে, সত্যি?

প্রমাণ হয়নি কিছু। কিন্তু কাগজে তাই লিখেছিল। ওর সম্বন্ধে আরেকটা নাকি গল্প আছে, কিন্তু সেই গল্পের কথা কেউ কাউকে বলে না। সে নাকি সাংঘাতিক একটা ব্যাপার, বাবাও কখনও মুখে আনেন না। মাত্র কয়েকজন জানে গল্পটা, তার মধ্যে টম হেগেন একজন। কিন্তু কিছুতেই বলবে না। একবার শোনার জন্যে জেদ ধরায় সে আমাকে কি বলেছিল, জানো?।

বলেছিল, তোমার বয়স একশো বছর হলে গল্পটা শোনার উপযুক্ত হবে তুমি। নিশ্চয়ই গল্পের মত গল্প! না শুনেই কেমন যেন গা ছমছম করে আমার, শুনলে না জানি কেমন হবে?

লুকা ব্রাসি। নরকের সম্রাট স্বয়ং শয়নও বুঝি এই নাম শুনে আঁতকে ওঠে। বেঁটে, গাঁট্টাগোট্টা, মাথার খুলিটা প্রকাণ্ড, কাছে এলেই বিপদের হিম-শীতল ঢেউ জাগে শরীরে। মুখ নয়, নির্মম হিংস্রতার পুরু মুখোশ যেন। মুখোশের কোথাও প্রাণের সজীবতা থাকে না, ওর মুখেও তা নেই। গায়ের রঙটা কেমন উৎকট বাদামী।

হিংসাত্মক কাজে লুকা ৰাসির সমকক্ষ কেউ নেই, তেমনি ডন কর্লিয়নির প্রতি তার আন্তরিক, অন্ধ ভক্তির ব্যাপারটাও কিংবদন্তীর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ডন কর্লিয়নির বিশাল শক্তিশালী দুর্গের ভিত্তিমূলে গাঁথা প্রকাণ্ড একটা স্তম্ভ এই লুকা ব্রাসি। সারা দুনিয়া খুঁজেও এরকম আরেকটা মানুষ পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

পুলিশকে ভয় নেই সূকা ব্রাসির, ভয় নেই সমাজকে। সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করে না। সে, ভয় করে না নরকযন্ত্রণার সম্ভাবনাকে। মানুষকে? না, মানুষকে সে ভয় করে না, তাকে সে ভালও বাসে না। শুধু একজনকে ছাড়া। স্বেচ্ছায়, যেচে পড়ে, ভালবাসে সে ডন কর্লিয়নিকে, ভয় করে। এইমাত্র নিয়ে আসা হয়েছে ওকে ডন কর্লিয়নির সামনে। ভয়ঙ্কর, হিংস্র মানুষটাকে এখন চেনার কোন উপায়ই নেই। ভক্তি আর শ্রদ্ধায় কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। কথা বলবে, কিন্তু ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। মুখ খুলল বটে, কিন্তু তোতলাচ্ছে। এর আগেও এরকম হয়েছে। ডনের সামনে কথা বলতে গেলেই তোতলাতে উরু করে। কোনরকমে তার মনের কথা জানাল সে: প্রথমেই গড ফাদার যেন নাতির মুখ দেখেন।

সাথে করে নব-দম্পতির জন্যে উপহার নিয়ে এসেছে লুকা ব্রাসি। টাকা ভর্তি একটা খাম। কাঁপা হাতে সেটা সে ডন কর্লিয়নির দিকে বাড়িয়ে ধরল।

ডন কর্লিয়নির মধ্যে একটা পরিবর্তন চোখ এড়াল না হেগেনের। রাজাকে খুশি করার জন্যে কোন প্রজা যখন কোন মহৎ কাজ করে, রাজা তখন সেই প্রজাকে যেভাবে অভ্যর্থনা করেন, খুব ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গতার সাথে নয়, বরং গাম্ভীর্যপূর্ণ রাজোচিত সম্মানের সাথে, ঠিক সেইভাবে ডন কর্লিয়নি অভ্যর্থনা করছেন লুকা ব্রাসিকে। তার প্রতিটি ভঙ্গির সাহায্যে, প্রতিটি বাক্যের সাহায্যে ডন কর্লিয়নি বুঝিয়ে দিলেন তাঁর কাছে লুকা ব্রাসি একটা অমূল্য সম্পদ। তিনি তাকে আর সবার চেয়ে বেশি মূল্য দেন। নিজের হাতে উপহারটি তাঁকে দেবার জন্যে তিনি মোটেও বিস্ময় প্রকাশ করলেন না। সবই তিনি বুঝলেন। তিনিও শব্দের মণি মুক্তো দিয়ে তৈরি করা ভাষায় ৪ন্যবাদ জানিয়ে সামান্য এই আনাড়িপনাটুকু মাফ করে দিলেন।

হেগেন লক্ষ করছে, মুহূর্তে হিংস্র মুখোশটা খসে পড়ল লুকা ব্রাসির চেহারা থেকে, গর্ব আর আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল মুখ। এগিয়ে গেল হেগেন, দরজা খুলে দিয়ে অপেক্ষা করছে সে। লুকা ব্রাসি গড ফাদারের হাতে চুমো খাচ্ছে।

লুকা ব্রাসি যখন বেরিয়ে যাচ্ছে, বুদ্ধি করে হেগেন তার দিকে ফিরে ভেট হিসেবে বন্ধুত্বের হাসি উপহার দিল একটা। কিন্তু ব্রাসিকে সে হাসতে দেখল না। নীরস রবারের মত ঠোঁট দুটো একটু লম্বা হলো শুধু। হেগেনের জন্যে এইটুকুই যথেষ্ট।

লুকা ব্রাসি বিদায় হতেই আপনা-আপনি বুকের ভিতর থেকে স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল ডন কর্লিয়নির। পৃথিবীর কোন লোককে সামান্যতম ভয়ও যদি তিনি করেন, তো সে এই লুকা ব্রাসি। এ লোক প্রচণ্ড একটা প্রাকৃতিক শক্তি, একে সংযত রাখা আসলেই সম্ভব নয়। লোকটাকে ডিনামাইট মনে করে খুব সাবধানে ঘাটেন তিনি। আপন মনে মৃদু কাঁধ ঝাঁকালেন ডন। ভাবলেন, প্রয়োজনে নিরাপদ বিস্ফোরণ তত ডিনামাইটেরও ঘটানো যায়। তারপর দৃষ্টিতে প্রশ্ন নিয়ে হেগেনের দিকে তাকালেন।

গড ফাদারের দৃষ্টির অর্থ বুঝতে পেরে হেগেন বলল, জ্বী, আর শুধু আমেরিগো বনাসেরা বাকি আছে।

ভুরু কুঁচকে কিছু ভাবলেন ডন কর্লিয়নি। তারপর বললেন, তার আগে সান্তিনোকে ডাকো। এসব কিছু কিছু তারও শেখা দরকার।

বাগানে বেরিয়ে এসেছে হেগেন। ব্যস্তভাবে এখানে সেখানে খুঁজে বেড়াচ্ছে সনিকে। বনাসেরার সাথে দেখা হয়ে গেল। তাকে একটু ধৈর্য ধরার উপদেশ খয়রাত করে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল মাইকেল কর্লিয়নি আর তার বান্ধবীর দিকে।

সনিকে দেখেছ নাকি, মাইকেল?

মাথা নাড়ল মাইকেল।

শঙ্কিত হয়ে উঠল হেগেন। সনি কি তাহলে এখন সেই মেয়েটার সাথে রঙ তামাশায় মেতে আছে? একটা গোল না বাধিয়ে ছাড়বে না দেখছি! কেমন আক্কেল বাপু তোমার বৌ রয়েছে, ছুঁডীটার বাড়ির লোকজন রয়েছে, সব জানাজানি হয়ে গেলে সর্বনাশ হতে কিছু বাকি থাকবে? ভাবতে ভাবতে সদর দরজার দিকে হন হন করেএগোচ্ছে হেগেন। প্রায় আধঘন্টা আগে সনিকে ওদিকে যেতে দেখা গেছে।

হেগেন বাড়ির ভিতর ঢুকছে, তাই দেখে কে অ্যাডামস জানতে চাইল, আসলে কে ও? ভাই বলে পরিচয় তো করিয়ে দিলে, কিন্তু নামে মিল নেই, চেহারা দেখেও তো ঠিক ইতালীয় বলে মনে হচ্ছে না।

মাইকেল জানাল, ওর সেই বারো বছর বয়স থেকে এখানে আছে। মা-বাপ মরে গেল কিনা, কি আর করে, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। তাই দেখে সনি এক রাতে ওকে ধরে বাড়িতে নিয়ে আসে। সেই থেকে আছে। কোন আশ্রয় ছিল না, বিয়ের আগে পর্যন্ত আমাদের বাড়িতেই থাকত।

ঘটনাটা রোমাঞ্চকর লাগছে কে অ্যাডামসের। ঠিক যেন গল্প শুনছি। তোমার বাবার এত দয়া? নিজেরই এতগুলো ছেলেপিলে, তার ওপর আরেকজনকে পুষ্যি নিলেন?

চার সন্তানের পরিবারকে বহিরাগত ইতালীয়রা বড় পরিবার বলে মনে করে না, কিন্তু তা কেকে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন বোধ করল না মাইক। বলল, বাবা ওকে পুষ্যি নিয়েছেন, এ কথা আমি বলেছি? আমাদের সাথে এমনি থাকত।

ও, আচ্ছা, বলল কে। কিন্তু কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে সাথে সাথে আবার প্রশ্ন করল সে, কিন্তু পুষ্যিই বা নিলেম না কেন?

একটু হাসল মাইকেল। পুষ্যি নিলে তো নাম বদলাতে হয়, সেটা বাবা চাননি। তাতে ওর বাবা-মার প্রতি অসম্মান দেখানো হয়ে যায়।

হেগেন আর সনিকে দেখতে পাচ্ছে এখন ওরা। লম্বা কাঁচের দরজা দিয়ে ঠেলে ডনের অফিসে সনিকে ভিতরে ঢুকিয়ে আঙুল বাকিয়ে ডাকছে হেগেন আমেরিগো বনাসেরাকে।

আচ্ছা, জানতে চাইছে কে, এমন দিনে ওরা তোমার বাবাকে কাজের মধ্যে টেনে না আনলেই তো পারত!

আবার একটু হাসল মাইকেল। মজার একটা কারণ আছে এর মধ্যে।

কি? কৌতূহল উপচে পড়ছে কে-র দুচোখে।

ওরা জানে মেয়ের বিয়ের দিনটা এমন এক দিন, এই দিনে প্রার্থীকে ফিরিয়ে দেয়া হয় না। এটা হলো একটা সিসিলীয় রীতি। কিছু চাওয়ার এমন সুযোগ সিসিলীর লোকেরা ছাড়ে কিভাবে, বলো?

.

গোলাপী গাউনটা মাটি থেকে একটু তুলে নিয়ে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে লুসি ম্যানচিনি। একটু আগে দেখা সনি কর্লিয়নির কিউপিডের মত ভারি মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। মদ খেয়ে বিচ্ছিরী লাল করে ফেলেছে মুখটাকে, তার উপর উগ্র লালসার সীল মোহর পড়েছে। শিউরে উঠল লুসি,.ভয়ই করছে তার। কিন্তু, একথাও ভাবছে, এখন আর ভয় পেলে চলবে কেন গো মেয়ে! এই মজার আশাতেই না তুমি সারাটা হপ্তা ষাঁড়টাকে জ্বালাতন করে খেপিয়ে তুলেছ। এখন তার শিং দেখে ডরাও ক্যান?

এর আগে কলেজে দুটো প্রেমের স্বাদ পাওয়ার সুযোগ ঘটেছিল লুসির। কোনটা থেকেই মিষ্টি কিছু পায়নি। এক হপ্তার বেশি টেকেনি-কোনটা। দ্বিতীয় প্রেমিকটা ঝগড়ার মধ্যে নিচু গলায় বলতে চেয়েছিল বা বলেই ফেলেছিল যে ওর ওইটা নাকি সাংঘাতিক প্রশস্ত। অর্থটা ঠিকই ধরতে পেরেছিল লুসি, এবং তারপর থেকে ওভাবে আর কারও সাথে মিশতে রাজি হয়নি সে।

বান্ধবী কনি কর্লিয়নির বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল, এই উপলক্ষ্যে লুসি কদিনের জন্যে থেকেই গিয়েছিল এবাড়িতে। এই সময়ই সনি কর্নিয়নি সম্পর্কে নানারকম অবিশ্বাস্য, রোমাঞ্চকর কানাঘুষো কানে গেছে তার। এক রোববার দুপুরে সনির বউ সাণ্ডা দিল খুলে গল্প করছিল। বউটা হয়তো একটু স্থূল, কিন্তুমনটা সাদা জন্মেছে ইটালিতে, তবে অল্প বয়সেই নিয়ে আসা হয়েছে আমেরিকায়। দশাসই শরীর, বুক দুটোর ওজন কম করেও সের পাঁচেক, পাঁচ বছরে তিন ছেলেমেয়ে বিইয়ে বসে আছে। সে, এবং আর সব বিবাহিতা মেয়েরা, ফুলশয্যা রাতে কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটবে তা নিয়ে কনিকে ঠাট্টাচ্ছলে ভয় দেখাবার চেষ্টা করছে।

ফিক ফিক করে হাসছে সাণ্ডা। বলছে, আই বাপ! সনির ওই মুগুর দেখে আমার তো… কথা শেষ করতে পারে না সে, হেসেই গড়িয়ে পড়ে। …যখন বুঝলাম ওই মুগুর আমাকে নিতেই হবে, অমনি এমন তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলাম-হি হি হি-হি-হি… হাসি থামতে আবার বলল, বছর খানেকের মধ্যে আমার ওখানের কি অবস্থা হলো–যেন এক ঘণ্টা ধরে ম্যাকারনি সেদ্ধ করা হচ্ছে, গলে ছাতুর মত থেলথসে। তারপর যেই শুনলাম অন্য মেয়েদের দিকে ওর নেক নজর পড়েছে, অমনি গির্জায় ছুটে গেলাম। মোমবাতি জ্বেলে ধন্যবাদ দিয়ে এলাম যীশুর মাকে।

সাণ্ডার কথা শুনে মুখে হাত চাপা দিয়ে সে কি চাপা হাসি সবার। কিন্তু লুসি হাসেনি। কথাগুলো শোনেনি সে, গোগ্রাসে গিলেছিল। দুই পায়ের মাঝখানে শরীর শিরশির করে উঠেছিল তার।– রোমাঞ্চকর ভীতিবোধটাকে উপভোগ করছে লুসি। সিঁড়ি বেয়ে সনির কাছে ছুটে যাবার সময় শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে দাউ দাউ কামনার আগুন। সিঁড়ির মাথায় পৌঁছতেই ওর হাত চেপে ধরে হলঘরের পাশের একটা শোবার ঘরে টেনে নিয়ে গেল ওকে সনি। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেছে বুঝতে পেরেই পায়ের সবটুকু জোর হারিয়ে ফেলল লুসি। নিজের ঠোঁটে সনির ঠোঁট অনুভব করছে। সনির মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা বাতাসে তামাকের কটু গন্ধ। লুসি মুখ খুলল। গাডনের নিচে সনির হাত, অনুভব করছে। খানিকটা ছিঁড়ে গেল রেশমী কাপড়। দুই হাত তুলে সনির গলা জড়িয়ে ধরল লুসি। ব্যস্ত হয়ে পোশাক খুলছে সনি।

তারপর লুসির নিতম্বের নিচে দুটো হাত রেখে উপর দিকে তাকে তুলে ধরল সনি। শূন্যে লাফ দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরে থাকল লুসি। সনির জিভ লুসির মুখের ভিতর, ললিপপের মত চুষছে লুসি। সনি তাকে সামনের দিকে ঠেলে দিতেই দরজায় ঠুকে গেল লুসির মাথা। গনগনে আগুনের ছোঁয়া অনুভব করছে লুসি। মিলনের সীমাহীন আনন্দে দম. আটকে যাচ্ছে তার। জীবনে এই প্রথমবারের মত পূর্ণ তৃপ্তি লাভ করল সে। হাঁপিয়ে গেছে দুজনেই, পরস্পরের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

শব্দটা বুঝি কিছুক্ষণ ধরেই হচ্ছে, খেয়াল করেনি ওরা। হঠাৎ শুনল কে যেন ধীরে ধীরে টোকা দিচ্ছে দরজায়। দ্রুত দরজার গায়ে শরীর ঠেকিয়ে কাপড় চোপড় পরে নিল সনি। ঝটপট তৈরি হয়ে গেছে লুসিও, ব্যস্ত, হাতে ঠিকঠাক করে নিচ্ছে গোলাপী গাউনটা।

বাইরে থেকে নিচু গলা ভেসে এলো টম হেগেনের, আছ নাকি, সনি?

স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে লুসির দিকে তাকান সনি, চোখ মটকাল। কি ব্যাপার, টম?

গলা আরও খাদে নামিয়ে হেগেন জানাল, ডনের অফিসে। এক্ষুণি! হেগেনের পায়ের আওয়াজ দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে।

দেরি করল না সনি, দরজা খুলে অনুসরণ করল হেগেনকে।

চুলে চিরুনি চালাচ্ছে লুসি। কাপড়-চোপড় ঠিক আছে কিনা দেখে নিল আরেকবার, সোজা করল মোজার গার্টার, তারপর দরজা খুলে ধীর স্থির পায়ে সিঁড়ি, ভেঙে সোজা বাগানে নেমে এল। কনির পাশে, কনের টেবিলে বসল সে। মৃদু বিরক্তির সুরে কনে তাকে বলল, কোথায় যাওয়া হয়েছিল রে? নেশা করেছিস মনে হচ্ছে? খবরদার, আমাকে ছেড়ে নড়বি না কোথাও।

লুসির জন্যে গ্লাসে মদ ঢালছে বর। এক মাথা সোনালী চুল নেড়ে সবজান্তার ভঙ্গিতে হাসল সে। এসবে কিছুই এসে গেল না লুসির। গ্লাসে চুমুক দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছে সে। শরীরের কাপুনিটা এখনও একটু একটু আছে। ঠোঁটে গ্লাস তুলে ইতিউতি তাকাচ্ছে, দৃষ্টি খুঁজে বেড়াচ্ছে সনি কর্লিয়নিকে। আর কেউ ওকে আকর্ষণ করতে পারছে না। কনির কানের কাছে মুখ নিয়ে চালাকি করে বলল সে, আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো, নিজেই টের পাবে ব্যাপারটা।

নিঃশব্দে হেসে ফেলল কনি।

.

টম হেগেনের পিছু পিছু কোণার ঘরে ঢুকে আমেরিগো বনাসেরা দেখতে পাচ্ছে বিরাট এক ডেস্কের পিছনে বসে আছেন ডন কর্লিয়নি। ঘরে সনি কর্লিয়নিও রয়েছে, জানালার সামনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে বাগানের দিকে।

আজ এই প্রথম কেমন যেন উদাসীন আচরণ করলেন ডন কর্লিয়নি। প্রার্থীকে আলিঙ্গন, তো করলেনই না, তার সাথে করমর্দনও করলেন না। প্রার্থী আমেরিগো বনাসেরাকে রক্তশূন্য, ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। সে একজন আণ্ডারটেকার; তার ব্যবসা হলো মৃতদেহ সমাধিস্থ করার আয়োজন এবং শবাধার তৈরি করা। ডনের স্ত্রীর সাথে তার স্ত্রীর অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব, সেকারণেই নিমন্ত্রণ পাবার উপযুক্ত বিবেচিত হয়েছে সে। এমনিতে ডন কর্লিয়নি এই লোকের উপর অত্যন্ত চটে আছেন।

চাতুর্যের সাথে তার অনুরোধ পেশ করতে শুরু করেছে বনাসেরা। আপনার স্ত্রীর ধর্ম-কন্যা, আমার মেয়ে এখানে এসে আজ আপনাদের পরিবারকে শ্রদ্ধা জানাতে পারল না, সেজন্যে তাকে আপনি ক্ষমা করবেন। হাসপাতালের বিছানায় এখন শুয়ে আছে সে। সনি কর্লিয়নি এবং টম হেগেনের দিকে তাকাল বনাসেরা। আশা করছে সে যে এদের সামনে কথাটা পাড়তে চাইছে না তা ডন কর্লিয়নি বুঝবেন। ডন সবই বুঝলেন। কিন্তু তাঁর দয়া হলো না।

তিনি বলেন, মেয়েটার দুর্ভাগ্যের কথা আমরা জানি। তার কোন সাহায্য আমার পক্ষে করা সম্ভব বলে মনে করলে, বলল। আর যাই হোক, আমার স্ত্রী তার ধর্ম-মা, সুতরাং আমার কাছে তার সম্মান কম নয়, এবং এই সম্মানের কথা আমি কখনও ভুলি না। ডনের এই কথাগুলোর মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে লুকিয়ে আছে বনাসেরার প্রতি তীব্র তিরস্কার। ডন কর্লিয়নিকে বনাসেরা আজ পর্যন্ত কখনও ধর্ম-পিতা বলে, সম্বোধন করেনি। অর্থাৎ প্রথম থেকেই একটা অবশ্য পালনীয় রীতি লঙ্ঘন করে আসছে বনাসেরা।

ডনের কথা শুনে কাগজের মত সাদা হয়ে গেল নাসেরার মুখ। দমে গিয়ে বলল, আপনার সাথে নির্জনে কথা বলার সৌভাগ্য হবে কি?

মাথা নাড়লেন ডন কর্লিয়নি। এদেরকে আমি নিজের মতই বিশ্বাস করি। এরা দুজন আমার দুটো হাত। এখান থেকে ওদেরকে যেতে বলা মানে ওদেরকে অপমান করা। তা আমি পারব না।

চোখ বুজে কি এক ধাক্কা সামলাল যেন বনাসেরা। তারপর চোখ খুলে, যেন মৃত ব্যক্তির আত্মীয়কে সান্তনা দিচ্ছে, রপ্ত করা নরম আর শান্ত গলায় কথা বলা শুরু করল।

মেয়েকে আমি আমেরিকান স্টাইলে মানুষ করেছি। তার কারণ, আমেরিকার ওপর আমার আস্থা আছে। এর মধ্যে যতটুকু সাফল্য অর্জন করেছি আমি, তা আমেরিকারই দান। মেয়েকে স্বাধীনতা দিয়েছি সত্যি, তার সাথে এ-শিক্ষাও দিয়েছি যে কখনও যেন নিজেদের পরিবারকে কলঙ্কের মধ্যে না জড়ায়। একজন বয়-ফ্রেণ্ড, ইতালীয় নয়, তার সাথে সিনেমা টিনেমায় যেত ও। কিন্তু ছেলেটি কখনও আমার বা আমার স্ত্রীর সাথে পরিচিত হবার জন্যে বাড়িতে আসেনি। কোন প্রতিবাদ না করে এ সবই আমি মেনে নিয়েছিলাম। এখানেই ভুল হয় আমার। যাই হোক, মাস দুই আগে ছেলেটা ওকে গাড়িতে করে বেড়াতে বেরিয়েছিল। সাথে ছিল আরেক ছোকরা। এরা দুজন মিলে জোরজার করে ওকে হুইস্কি খাইয়ে ওর চরিত্র নষ্ট করার চেষ্টা করে। ও রাজি হয়নি, বাধা দিয়েছিল। এবং নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিল। তখনই ওকে মার খেতে হয়। খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম, মেয়েকে নিতে পারি না। দুচোখে কালসিটে। নাক ভেঙে গেছে। টুকরো টুকরো হয়ে গেছে চোয়ালের হাড়। জোড়া লাগাবার জন্যে তার দিয়ে বাঁধতে হয়েছে। কথার মধ্যে কোন আবেগ না থাকলেও কথা শেষ হতেই ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল বনাসেরা।

অভদ্রতা দেখানো হয়ে যায় তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুহূর্তের জন্যে চেহারায় ক্ষীণ একটু সমবেদনার ভাব ফোঁটালেন ডন কর্লিয়নি।

বেদনায় নীল হয়ে গেছে বনাসেরার চেহারা। ও আমার একমাত্র মেয়ে, আমার চোখের আলো। ভারি সুন্দর দেখতে ছিল। সেই রূপ আর কখনও ফিরে পাবে না। বড় বেশি বিশ্বাস করত মানুষকে, আর কখনও করবে না। থরথর করে কাঁপছে শরীরটা।

ভাল মানুষ একজন আমেরিকান যা করে, আমিও তাই করলাম। পুলিশের কাছে গেলাম। পুলিশ ছেলে দুটোকে গ্রেফতার করল। কোর্ট তাদের বিচার করল। এত সাক্ষ্য, অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়। অপরাধ স্বীকার করল ওরা। জজ ওদের সাজা দিলেন। তিন বছরের জেল। সাথে সাথে সাজা মাফও করে দিলেন। তখুনি ওরা ছাড়া পেয়ে গেল। বোকার মত দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি। দুই হারামজাদা, তাদের মা বাবারা আমার দিকে ফিরে হাসতে লাগল। তখন আমার স্ত্রীকে জানালাম, সুবিচার পেতে হলে ডম কর্লিয়নির কাছে যেতে হবে।

লোকটার দুঃখের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার জন্যে মাথাটা একটু নত করলেন ডন কর্লিয়নি। কিন্তু তার আত্মমর্যাদা যে আহত হয়েছে তা বোঝা গেল ঠাণ্ডা হিম কণ্ঠস্বর থেকে! কেন? পুলিশের কাছে যাওয়া হয়েছিল কেন? শুরুতেই আমার কাছে আসোনি কি মনে করে?

বিড় বিড় করে কি যেন বলল বনাসেরা, কেউই তা ভাল করে শুনতে পেল না। গলায় জোর এনে তারপর বলল, আপনি যা চান তাই দেব। আপনার ইচ্ছাটা শুধু আমাকে জানতে সুযোগ দিন। কিন্তু আমার আরজিটা গ্রহণ করুন-দয়া করে। কথাগুলো প্রায় ঔদ্ধত্যের মত শোনাল।

গম্ভীর হলেন ডন কর্লিয়নি। আরজিটা কি?

হেগেন আর সনির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল নাসেরা। ডেস্কের উপর হাতের ভর রেখে প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে পড়লেন ডন। একটু ইতস্তত করল বনাসেরা, তারপর নিচু হয়ে ডনের নোমশ কানের এত কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে গেল যে প্রায় ছোঁয়া লেগে যায় আর কি। এই মুহূর্তে গির্জার পাদ্রীর মত লাগছে ডনকে, গভীর মনোযোগে কোন পাপীর স্বীকারোক্তি গুনছেন যেন। তাকিয়ে আছেন যেন বহুদূরে, চোখে উদাস দৃষ্টি। দীর্ঘ এক মিনিট পর কথা শেষ করে সোজা হয়ে দাঁড়াল বনাসেরা। ডন ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। গভীর। মুখটা লাল হয়ে উঠল বটে, কিন্তু ভয় পেল না বনাসেরা। সেও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ডনের চোখের দিকে।

না, শেষ পর্যন্ত মুখ খুললেন ডন। এমন কাজ আমি করতে চাই না। তু আবেগে অন্ধ হয়ে গেছ।

গলায় জোর এনে, স্পষ্ট স্বরে বনাসেরা বলল, যত টাকা লাগে দেব।

কথাটা শুনেই হেগেনের শরীর শক্ত কাঠ হয়ে গেল। কপালের কাছে দপ দপ করছে একটা শিরা। বুকের উপর দুটো হাত ভাঁজ করে রেখে দাঁড়িয়ে আছে সাল, মুখে মৃদু ব্যঙ্গের হাসি। ঘরের ভিতর এতকিছু ঘটে যাচ্ছে, পাত্তাই দেয়নি সে এতোক্ষণ। এখন মনোযোগ না দিয়ে পারছে না।

চেয়ার ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন ডন কর্লিয়নি। মুখ দেখে মনের ভাব বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। তুমি আর আমি, পরস্পরকে অনেক দিন থেকে চিনি আমরা। কিন্তু এতদিন হয়ে গেল, পরামর্শ বা সাহায্যের জন্যে কখনও তুমি আমার কাছে আসার প্রয়োজন বোধ করোনি। কই, মনে তো পড়ছে না শেষ কবে তুমি আমাকে তোমার বাড়িতে কফি খেতে ডেকেছ। অথচ, আমার স্ত্রী তোমার মেয়ের ধর্ম-মা। শোনো, স্পষ্ট করেই বলি। পাছে আমার কাছে ঋণী হও, এই তোমার ভয়। তাই আমার বাড়িয়ে দেয়া বন্ধুত্বের হাত ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছ তুমি।

অস্পষ্ট গলায় বলল বনাসেরা, কোন গোলমালে নিজেকে জড়াতে চাইনি আমি…

কথা বলতে নিষেধ করার ভঙ্গিতে একটা হাত তুললেন ডন। চুপ! তুমি মনে করেছ আমেরিকা একটা স্বর্গ। চুটিয়ে ব্যবসা করছ, দুহাতে লুটছ টাকা, ভাবছ দুনিয়াটা কি মজার, কি নিরাপদ জায়গা–এখানে যা মন চায় তাই করা যায়। খাঁটি একজন বন্ধুর সাহায্য দরকার আছে বলে মনে করোনি, তাকে দিয়ে নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করোনি। ভেবেছ, এসব গোলমেলে ব্যাপার, নিজেকে খামোকা জড়িয়ে ফায়দা নেই। ভেবেছ, তোমাকে পাহারা দেবার জন্যে পুলিশ আছে, ন্যায় বিচারের জন্যে আদালত আছে। ভেবেছ, ডন কর্লিয়নির সাহায্য তোমার দরকার নেই। বেশ। মনে দুঃখ পেয়েছিলাম আমি, কিন্তু আমার বন্ধুত্বের মূল্যই যে দেয়, যে আমাকে অতি সামান্য বলে মনে করে, জোর জবরদস্তি করে তার ঘাড়ে আমার বন্ধুত্ব চাপাব আমি কি সেই বান্দা? কক্ষনো নই!

ভদ্রভাবে কাষ্ঠ হাসলেন, তারপর বললেন, অথচ লেজে পা পড়ায় এখন আবার আমার কাছে ছুটে এসেছ, বলছ, ডন, কর্লিয়নি, আমি সুবিচার চাই। তাও পরিবেশের পবিত্রতার মুখ চেয়ে কিছু শ্রদ্ধার সাথে বলছ না। এটা আমার বাড়ি, আজ আমার মেয়ের বিয়ে আর তুমি আমার কাছে এসে আমাকে বলছ খুন করতে, বনাসেরার কণ্ঠস্বর নকল করে ঘৃণার সাথে ডন কর্লিয়নি বললেন, বলছ, যত টাকা চান দেব, না-না, আমি রাগ করিনি। কিন্তু বলো তো, কি অপরাধ করেছি তোমার কাছে আমি, যার প্রতিশোধ নিচ্ছ, এত অসম্মান করছ আমাকে?

আতঙ্কের একটা যন্ত্রণা আছে, বনাসেরা সেই যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাচ্ছে। দিশেহারার মত বলতে লাগল, আমেরিকা আমার কত উপকার করেছে। ভাল নাগরিক হতে চেয়েছিলাম আমি। চেয়েছিলাম আমার মেয়ে হবে আমেরিকান মেয়ে…

হাত তালি দিয়ে দৃঢ় সমর্থন জানালেন ডন কর্লিয়নি। চমৎকার, খাসা বলেছ। তাহলে তো আর নালিশ করার কিছু থাকলই না। রায় দিয়েছেন জজ সাহেব। রায়। দিয়েছেন আমেরিকা সাহেব। ফুল আর এক বাক্স মিষ্টি নিয়ে যেয়ো হাসপাতালে, তাতেই তোমার মেয়ে সান্তনা পাবে। তেমন কোন গুরুতরব্যাপার তো আর নয়, ওদের বয়স কম, উত্তেজনার পরিমাণ একটু বেশি, আবার শুনছি একজন নাকি প্রভাবশালী রাজনীতিকের ছেলে। না, ভাই আমেরিগো, তুমি অসৎ এ অপবাদ কখনও আমি দিতে পারব না। সতোর প্রতি তোমার শ্রদ্ধা, হ্যাঁ, স্বীকার করতেই হবে। আমার বন্ধুত্ব উপেক্ষা করেছ, সেটা তেমন কিছু নয়, তবু অন্য কোন মানুষের চাইতে তোমার কথায় আমার আস্থা আছে। তাই কথা দাও, এসব পাগলামি ছাড়বে তুমি। আবেগের বশে যা চাইছ, কাজটা ঠিক আমেরিকান নয়। ওদেরকে মাফ করে দাও। ভুলে যাও। মেনে নাও, এমন কি আমেরিকাতেও দুর্ঘটনা ঘটে।

নির্মম অবহেলা, ব্যঙ্গ আর তাচ্ছিল্যের সাথে কথাগুলো বলে গেলেন ডন কর্লিয়নি। বনাসেরা কাঁপছে। তবু সাহস সঞ্চয় করে পুনরাবৃত্তি করল সে, সুবিচার আমি আপনার কাছে চাই।

সুবিচার আদালত দেয়নি তোমাকে?

একগুয়ে ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল নাসেরা। না। সুবিচার ওরা পেয়েছে। আমি পাইনি।

উপর নিচে মাথা নেড়ে এই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ অনুমোদন করলেন ডন কর্লিয়নি। কি চাও তুমি?

চোখের বদলে চোখ, অস্ফুটে বলল বনাসেরা। চোখ দুটো জ্বলে উঠল তার।

আরও বেশি চাইছিলে, ডন বললেন। তোমার মেয়ে তো মরেনি।

নিরাশ হলো বনাসেরা। দাবির পরিমাণ কমিয়ে বলল, তাহলে ওরাও যেন ওর মত কষ্ট পায়। বানাসেরা আরও কিছু বলবে, এই আশায় অপেক্ষা করে আছেন ডন কর্লিয়নি। সবটুকু সাহস দিয়ে বুক বেঁধে বসে বলল, কত টাকা দেব আপনাকে? হতাশ আর্তনাদের মত শোনাল কথাটা।

ঘুরে দাঁড়ালেন ডন কর্লিয়নি। এর অর্থ দূর হও তুমি! কিন্তু বাসেরা নড়ল না।

মনটা বড় তাল ডন কলিয়নির, দিকভ্রষ্ট বন্ধর উপর কতক্ষণই বা তিনি রাগ করে থাকতে পারেন? অবশেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি, তারপর আবার ফিরলেন। ইতিমধ্যে বেঁচে থেকেও মরার মত ফ্যাকাসে হয়ে গেছে বনাসেরার চেহারা।

ধৈর্যের সাথে, কোমল গলায় বললেন ডন কর্লিয়নি, প্রথম থেকেই লক্ষ করেছি, আমাকে বিশ্বাস করতে ভয় পাও তুমি। আইনের কাছে সুবিচারের আশায় মাসের পর মাস অপেক্ষা করো তুমি। উকিলের পিছনে বস্তা বস্তা টাকা ঢালো। অথচ, সবাই জানে তোমাকে কেমন ঠকানো হবে। সুবিচারের জন্যে এমন জজের ওপর বিশ্বাস রাখো তুমি যে রাস্তায় রাস্তায় খদ্দের খুঁজে বেড়ানো বেশ্যার মত নিজেকে বেচে দেয়। একবার তুমি সর্বনেশে সুদের বিনিময়ে টাকা ধার করতে গিয়েছিলে ব্যাঙ্কে, দীন-হীন ফকিরের মত ওখানে গিয়ে বসে থাকতে হত তোমাকে দিনের পর দিন, ওরা তোমার পিছনটা কে গন্ধ নিয়ে বুঝতে চাইত টাকা শোধ করার ক্ষমতা তুমি রাখো কিনা!

কেন, আমার কাছে আসতে পারোনি? যদি আসতে টাকায় ঠাসা আমার থলি তোমার হয়ে যেত। যদি সুবিচার চাইতে, তোমার মেয়ের এই দুর্ভোগের জন্যে যারা দায়ী তাদের চোখ দিয়ে নোনা পানি ঝরত। তোমার সাথে কেউ যদি শত্রুতা করত, তাদেরকে আমার শত্রু বলে মনে করে উচিত সাজা দিতাম। বনাসেরার দিকে তনী খাড়া করলেন ডন কর্লিয়নি, তাহলে, বিশ্বাস করো, আমাকে যেমন ভয় করে, তোমাকেও তেমনি ভয় পেত সবাই।

চোখ নামিয়ে নিল বনাসেরা। চিবুক প্রায় বুক ছোঁয় ছোঁয়। রুদ্ধ গলায় বলল, সব মেনে নিলাম। আমি আপনার বন্ধুত্ব চাই।

দুর্ভাগা লোকটার কাঁধে একটা হাত রাখলেন ডন কর্লিয়নি। ঠিক আছে। পাবে, তুমি সুবিচার। হয়তো সেদিন কখনোই আসবে না, তবুবলে রাখছি, একদিন হয়তো তোমার কাছে যাব আমি বলব এর বদলে আমার একটা কাজ করে দাও। তার আগে পর্যন্ত ভেব এই সুবিচার তোমার মেয়ের ধর্ম-মায়ের তরফ থেকে ছোট্ট একটা দান।

কৃতজ্ঞতায় অভিভূত বনাসেরার মুখ দিয়ে কথা সরল না। আনন্দে বিহ্বল লোকটা চলে গেলে দরজা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল হেগেন। ডন কর্লিয়নি বললেন, কাজটা ক্লেমেঞ্জাকে দাও। রক্তের গন্ধ পেয়ে খেপে উঠবে না এমন লোককে দিয়ে সারতে বলবে। মড়াপোতা ব্যাটার মাথায় যত পাগলামিই গিজ গিজ করুক, আমরা তো আর খুনে নই। বিরক্তির সাথে লক্ষ করলেন তাঁর শক্তিশালী পুরুষসিংহ জ্যেষ্ঠ পুত্রধন জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বাগানের উৎসব উপভোগ করছে। নাহ, ওর হবে না, ভাবলেন তিনি। শেখারই যদি আগ্রহ না থাকে, পারিবারিক ব্যবসাটা চালানো ওর কম্ম নয়। ডন ও কোনোদিনই হতে পারবে না। আর কাউকে বেছে নিতে হবে। এবং তাড়াতাড়ি। তিনি নিজে তো আর অমর হয়ে জন্মাননি।

হঠাৎ করে বাগান থেকে একটা আনন্দ কোলাহল ভেসে আসতে তিনজনই চমকে উঠল। একমুখ হাসি নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল সনি, ছুটল দরজার দিকে। জনি, জনি–বিয়েতে জনি এসেছে। কি, বলিনি আমি?

জানালার কাছে গেল হেগেন। বলল, হ্যাঁ, আপনার ধর্ম-পুত্র এসে পৌঁছেছে। নিয়ে আসব এখানে?

না, বললেন ডন। ওর ইচ্ছে হলে আমার কাছে আসবে। হাসলেন তিনি। ছেলেটা আমার কেমন ভাল, দেখলে তো!

একটু ঈর্ষা হলো হেগেনের। গলাটা একটু পড়ে গেল তার, কম দিন তো হলো না, দুবছর! আবার হয়তো কোন ঝামেলা বাধিয়ে বসেছে, সাহায্য চায়।

তাই যদি হয়, প্রশ্ন করলেন ডন কর্লিয়নি, সাহায্যের জন্যে ওর ধর্ম-বাপ ছাড়া আর কার কাছে যাবে শুনি?

.

বিয়ের কনের যে একটা আলাদা মর্যাদা আছে, জনিকে দেখে তা আর মনেই থাকল না কনির। জনি-ই-ই! চেঁচিয়ে উঠে পাখনা মেলা পাখির মত উড়ে গিয়ে ওর বাড়িয়ে দেয়া দুই বাহুর মধ্যে সেঁধিয়ে গেল।

কনির মুখে চুমো খেলে জনি। সাদর অভ্যর্থনা জানাবার জন্যে সবাই যখন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে ওকে, কনিকে তখনও জাপটে ধরে রেখেছে ও। সবাই এরা পুরানো বন্ধু-বান্ধব ওর, এদের সাথেই ওয়েস্ট সাইডে বড় হয়েছে জনি।

কনি ওকে টেনে নিয়ে গেল ওর সদ্য বিবাহিত স্বামীর কাছে। আজকের প্রধান ভূমিকা থেকে পদচ্যুত হয়ে ছোকরার মুখ ভার। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে খুব মজা লাগছে জনির। তাই তার সাথে হ্যাণ্ডশেক করে তাকে মোহিত করতে লেগে গেল ও। গ্লাস ভর্তি মদ খেয়ে শুভেচ্ছা জানাল।

ব্যাণ্ড বাদকদের উঁচু মঞ্চ থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, এবার একটা গান ধরতে পারলে হত না, জনি?

ঝট করে তাকাল জনি। দেখল ওর দিকে চেয়ে আছে নিনো। নিনো ভ্যালেন্টি। হাসছে। এক সময় গলায় গলায় ভাব ছিল দুজনের, একসাথে গাইত, মেয়েদের নিয়ে একসাথে হুল্লোড় করত। তখন রেডিওতে গাইতে শুরু করেনি জনি, নাম কিনতে শুরু করেনি। ছবি করতে জনি যখন হলিউডে চলে গেল, প্রথমদিকে বার দুয়েক ফোন করেছিল নিনোকে, তখন কথা দিয়েছিল ক্লাবে ও নিনোকে গাইবার ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু সে-কথা আর রাখা হয়নি। এখন নিনোর খুশির, ব্যঙ্গ মেশানো মদ খাওয়া হাসি দেখে অন্তরে চাপা পড়ে থাকা ভালবাসাটা ধড়মড় করে জেগে উঠল।

ম্যাণ্ডোলিনে নিনো একটু টুংটাং করতে না করতে জনি ফন্টেন তার কাঁধে হাত রেখে বলল, এ গান শুধু বিয়ের কনের জন্যে! বলেই পা ঠুকে পুরানো একটা সিসিলীয় অশ্লীল প্রেমের গান ধরল। আর যায় কোথা, নিনোও গানের সুরের সাথে তাল রেখে অঙ্গভঙ্গি করতে শুরু করে দিল।

কুনের মুখ রাঙা হয়ে উঠছে গর্বে। মেহমানরা চিৎকার করে জয়ধ্বনি ছুঁড়ছে। গান শেষ হবার আগে উঠে পড়ল সবাই, প্রতি চরণের শেষের চতুর দ্ব্যর্থ ব্যঞ্জক পদটি সমস্বরে গর্জন করে গাইতে শুরু করে দিল পা ঠুকে। গান তো এক সময় থামল, কিন্তু কার সাধ্যি করতালি থামায়। আরেকটা গান ধরল জনি।

ওকে নিয়ে কত গর্ব ওদের। ওদেরই একজন আপনজন ছিল ও, এখন না হয় বিখ্যাত হয়েছে, চিত্রজগতের মস্ত তারকা হয়েছে, দুনিয়ার সেরা সব লোভনীয় মেয়ে মানুষদের সাথে শোয়। কিন্তু, হ্যাঁ, ধর্ম-বাপকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে ভুল করেনি, বিয়ের দাওয়াত পেয়ে তিন হাজার মাইল দূর থেকে উড়ে চলে এসেছে এখনও ও নিনো ভ্যালেন্টির মত পুরানো বন্ধুকে ভালবাসে। ওদের ছেলেবেলায় ওরা দুজন একসাথে গান করত, তা কে না দেখেছে। ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেনি কেউ জনি একদিন তার হাতের মুঠোয় পাঁচ কোটি মারীর হৃদয় ধরে রাখবে।

হাত বাড়িয়ে কনেকেও মঞ্চে তুলে নিল জনি। জনি আর নিনোর মাঝখানে দাঁড়াল কনি। ম্যাণ্ডোলিনের তার থেকে কয়েকটা কর্কশ পদ বের করল নিনো। এটা পুরানো একটা রুটিন ওদের-নকল যুদ্ধ, এবং প্রেম বিনিময়। তরোয়ালের মত তীক্ষ্ণ ধার কণ্ঠস্বরে, একেকজন পালা করে গান ধরছে। সূক্ষ্ম সৌজন্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নিনোর কণ্ঠকে নিজের গলার উপরে ছাপিয়ে উঠতে দিল জনি, কনেকে হরণ করে নিতে দিল ওর হাত থেকে বিজয়ীর শেষ চরণটি গাইতে দিল নিনোকেই, আস্তে আস্তে বহুদূরে মিলিয়ে গেল জনির গলা। গান শেষে বিয়ে বাড়িতে উদ্দাম আনন্দের ঢেউ আর উচ্ছ্বসিত জয়ধ্বনি শুরু হলো। শেষদিকে ওরা তিনজন আলিঙ্গন করছে পরস্পরকে। ওদিকে আরেকটা গানের দাবিতে মেহমানদের চিৎকার শুরু হয়েছে।

শুধু ডন কর্লিয়নি, কোণার ঘরটার দরজার কাছে একা দাঁড়িয়ে সন্দেহ করছিলেন, কোথায় যেন গোলমাল আছে একটা। প্রফুল্ল মুখে অমায়িক হেসে, মেহমানদের কারও মনে দুঃখ না দিয়ে, সবাইকে ডেকে তিনি বললেন, আমার ধর্ম পুত্র, আমাদেরকে সম্মান দেখানোর জন্যে এতদূর থেকে এসেছে, গলা ভেজাবার জন্যে ওকে কিছু দেবার কথা কারও মনে পড়ল না? কথাটা শেষ হতে যা দেরি, সাথে সাথে দশ বারোটা মদ ভর্তি গ্লাস জনির দিকে এগিয়ে দেয়া হলো। সব গ্লাসে একটা করে চুমুক দিল জনি, তারপর ছুটল ধর্ম-বাপকে আলিঙ্গন করতে।

ধর্ম-বাপকে বুকে চেপে ধরে এক কে তার কানে কানে কিছু বলল জনি। তিনি আর তাকে হাতছাড়া করলেন না, সাথে করে বাড়ির ভিতর নিয়ে চলে গেলেন।

জনি ফন্টেনকে ঘরে ঢুকতে দেখেই করমর্দনের জন্যে হাত বাড়িয়ে দিল টম হেগেন। কেমন আছ? করমর্দন করল বটে জনি, কিন্তু সবাই জনির যে উষ্ণ, গভীর অন্তরঙ্গতার প্রশংসা করে তার কোন প্রকাশ ঘটল না। ডন কর্লিয়নির যাবতীয় অপ্রিয় কাজ যাকে করতে হয়, এইটুকু শাস্তি তাকে তো নিতেই হবে মাথা পেতে।

নিমন্ত্রণ পেয়েই ভাবলাম, যাক, ধর্ম-বাপের রাগ হলে পানি হয়ে গেছে, ডনকে বলছে জনি। বউকে ডিভোর্স করার পর ফোন করেছিলাম আপনাকে পাঁচবার, টমের গলায় শুনেছি হয় আপনি বেরিয়ে গেছেন, নয় এই মুহূর্তে সাংঘাতিক ব্যস্ত। বুঝতে অসুবিধে হয়নি রেগে কাঁই হয়ে আছেন আমার ওপর।

হলুদ বোতল থেকে মদ ঢেলে গ্লাস ভরে দিলেন ডন। আচ্ছা, থাক, হয়েছে। এখন ওসব মনে নেই। এখনও কিছু করতে পারি নাকি তোমার জন্যে? এত বড়লোক হয়ে যাওনি, এত নাম কিনে ফেলোনি তো যে তোমার জন্যে আমার আর কিছুই করার নেই?

তরল অনলের মত মদটুকু গিলে নিয়ে আবার গ্লাসটা বাড়িয়ে দিল জনি। গলার স্বরে বানোয়াট একটা স্ফূর্তির ভাব আনতে চেষ্টা করে বলল, এখন তো আর আমি বড়লোক নই, গড ফাদার! পতন শুরু হয়ে গেছে আমার। আপনার কথাই ফললো। কি কুক্ষণে চরিত্রহীনা মেয়েটাকে বিয়ে করলাম, তার জন্যে, স্ত্রী আর মেয়েদেরকে পর করে দিয়ে ভাল করিনি আমি। এখন বুঝি, আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে আপনি অন্যায় কিছু করেননি।

শ্রাগ করলেন ডন। আর যাই হোক, তুমি আমার ধর্ম-পুত্র তো, তোমার জন্যে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল-এই আর কি।

অস্থির হয়ে উঠে ঘরের মেঝেতে পায়চারি শুরু করে দিল জনি। পাজী, শয়তান মেয়েমানুষটার জন্যে বদ্ধ পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। হলিউডের আকাশে সবচেয়ে দামী তারকা, পরীর মত দেখতে। জানেন, শুটিং শেষ হলে কি করে? মেকআপম্যানের কাজ যদি মনের মত হয়, দেহ দেয় তাকে। ক্যামেরাম্যান যদি যত্ন করে ছবি তোলে, নিজের ড্রেসিংরুমে ডেকে এনে তাকে দিয়ে কাপড় খোলায়। কাউকে খুশি করার জন্যে আমি যেমন পকেট থেকে খুচরো পয়সা দিই বকশিশ হিসেবে, তেমনি ও দেয় নিজের শরীরটাকে। বেশ্যা।

ছোট্ট করে জানতে চাইলেন ডন, তোমার স্ত্রী আর মেয়েরা কেমন আছে?

একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল জনি। আদালত যা দিতে বলেছে তার চেয়ে বেশিই দিচ্ছি। প্রত্যেক হপ্তায় দেখা করতে যাই। ওদের কথা মনে পড়লে শান্তি পাই না। মাঝে মাঝে ভাবি, বুঝি পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি। আবার একবার গ্লাসে মদ ভরে নিল সে। আমার দ্বিতীয়পক্ষ আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে আজকাল। আমি নাকি সেকেলে, আমি নাকি আনাড়ি, আমার গান নিয়ে ব্যঙ্গ করে। কষে মারধোর করে এসেছি। ছবি করছে, তাই মুখে মারলাম না। সিগারেট ধরাল সে। এত কথা বলে আপনাকে আসলে বোঝাতে চাইছি, ধর্ম-বাপ, বেঁচে থাকার যে সুখ তা এখন আর আমার নেই। আমি অসুখী।

ডনের কণ্ঠে সরলতা প্রকাশ পেল, এসব ব্যাপারে তোমাকে যে সাহায্য করব তার কোন উপায়ই নেই। থামলেন তিনি, তারপর জানতে চাইলেন, গলায় কি হয়েছে?

সবটুকু আত্মবিশ্বাস, মাধুর্য নিমেষে চেহারা থেকে উবে গেল জনির। কণ্ঠস্বরে একটা হাহাকার ফুটে উঠল তার, গড ফাদার, গড ফাদার, আমার গলায় কিছু হয়েছে, ডাক্তাররা ধরতে পারছে না! গড ফাদার, আমি আর গাইতে পারি না।

জনিকে এভাবে হঠাৎ ভেঙে পড়তে দেখে ডনের সাথে সাথে হেগেনও চমকে উঠল।

দুটো ছবি করে অনেক টাকা কামিয়েছিলাম, বলে চলেছে জনি। বিরাট স্টার বনে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন ওরা আমাকে তাড়াতে চাইছে। স্টুডিওর মালিক ব্যাটা প্রথম থেকেই আমাকে দুচোখে দেখতে পারে না, সুযোগ বুঝে বদলা নিচ্ছে।

ধর্ম-পুত্রের সামনে দাঁড়ালেন ডন কর্লিয়নি। তার ভারি কণ্ঠস্বর গম গম করে উঠল, কেন সে তোমাকে দুচোখে দেখতে পারে না?

ওই যে, প্রগতি সংস্থার হয়ে গান করতাম, যা আপনিও ভাল চোখে দেখতেন না, সেটাই আমার ওপর তার যত আক্রোশের কারণ, বুঝলেন? আপনার মত জ্যাক ওলট-ও এসব পছন্দ করে না। তার ধারণা, আমি নাকি কমিউনিস্ট, কিন্তু প্রমাণ করতে পারেনি কিছুই। আরও কারণ আছে। নিজের জন্যে ব্যাটা এক মেয়ে শিকার করেছিল, শিকারীর মুখ থেকে সেটাকে ছিনিয়ে নিলাম আমি। না-না, তেমন সিরিয়াস কিছু না, মাত্র এক রাতের ব্যাপার-তাও, আমি নই, মেয়েটাই ধাওয়া করছিল আমাকে। কি করতে পারি আমি? তারপর বেশ্যা দ্বিতীয় বউটা আঁটা মেরে খেদিয়ে দিন আমাকে। আমি এখন কি করি? গড ফাদার, এখন আমার কি গতি হবে? মেয়েরা জায়গা দেবে না আমাকে, এক যদি না হামাগুড়ি দিয়ে, নাকে খত্ দিয়ে ওদের কাছে গিয়ে মাফ চাই। এদিকে, গাইতেও পারছি না আর। গড ফাদার, আপনার কাছে এসেছি, বলে দিন এখন আমি কি করব।

জমাট বরফ হয়ে গেছে ডন কর্লিয়নির মুখ। সেখানে সহানুভূতির লেশমাত্র নেই। তার কণ্ঠস্বরে প্রকট হয়ে উঠল তাচ্ছিল্য, মেয়েমানুষ, তুমি একটা মেয়েমানুষ! রাগে বিকৃত হয়ে উঠল তার চেহারা। প্রথমে পুরুষমানুষের মত আচরণ করতে পারো! জনিকে একেবারেই কিছু বুঝতে না দিয়ে ডেস্কের উপর ঝুঁকে পড়ে খপ করে তার চুল ধরে ফেললেন মুঠো করে। ফর গডস সেক, এও কি বিশ্বাস করতে হবে আমাকে যে এতকাল আমার কাছে কাটিয়েও এর বেশি কিছু হতে পারোনি তুমি? চিত্র-জগতের একটা নষ্টা মেয়ে তুমি, হাপুস নয়নে কাঁদছ আর দয়া ভিক্ষা করছ-এখন আমি কি করব! এখন আমি কি করব!

জনির স্বর ভঙ্গিটা হুবহু, নিখুঁত নকল করলেন ডন, এবং তা এমনই অপ্রত্যাশিতভাবে যে চমকে উঠে হেসে ফেলল হেগেন আর জনি। খুশি হলেন তিনি। মুহূর্তে মনে পড়ে গেল কত গভীরভাবে ভালবাসেন ধর্ম-পুত্রকে। এভাবে যাচ্ছে তাই বলে শাসন করলে কি প্রতিক্রিয়া হত তাঁর নিজের সন্তানদের? মুখ হাঁড়ি করে থাকত সান্তিনো, দিনের পর দিন কথা বলত না ভাল করে। কেঁচো বনে যেত ফ্রিডো। বরফের মত ঠাণ্ডা এক চিলতে হেসে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত মাইকেল, কয়েক মাস তার আর কোন সন্ধানই পাওয়া যেত না। অখুচ জনি! বাহ, কেমন লক্ষ্মী ছেলে, হাসতে পারছে এরই মধ্যে! তা হাসবে না, ধর্মবাপের মতলবটা যে ঠিক ধরে ফেলেছে।

মালিকের মেয়েমানুষ ভাগিয়ে আনলে, তার ক্ষমতা তোমার চেয়ে বেশি জেনেও, তারপর আবার অভিযোগ করছ কেন সে তোমাকে সাহায্য করছে না। সংসার, স্ত্রী, মেয়েদেরকে শ্রাগ করলে কেন? না, একটা বেশ্যাকে বিয়ে করার জন্যে। তারপর এই ভেবে কাঁদছ কেন ওরা তোমাকে দুবাই বাড়িয়ে আদর করে ডেকে নিচ্ছে না! বেশ্যাটা ছবি করছে কিনা, তাই তার মুখে মারোনি-অথচ ব্যঙ্গ করেছে বলে বিস্ময় প্রকাশ করছ। তুমি কি থেকে কি হয়েছ, জানো? এই নির্বোধ, জানোতা? নির্বোধের জায়গা নরকেও নেই, বুঝলে?

ঝাল মিটিয়ে নিয়েছেন ডন কর্লিয়নি। এবার তিনি শান্ত হলেন। একেবারে ভিন্ন সুরে, কোমল সহায়তার সাথে জানতে চাইলেন, এবার থেকে আমার কথা মত চলবে তো?

কাঁধ ঝাঁকাল জনি। জিনিকে আবার বিয়ে করব তা সম্ভব নয়। ওর মনের মত স্বামী কোনদিনই হতে পারব না আমি। জুয়া, মদ, আচ্ছা–এইসব নিয়ে চলছিল আমার, তরতাজা মেয়েমানুষরা আমার পিছু নিত, লোভ আমি কক্ষনো সামলাতে পারিনি। এই সব করে ফিরে যেতাম জিনির কাছে, তখন মনের গ্লানিতে মরে যেতে ইচ্ছে করত আমার। না, গড ফাদার, সেই অবস্থায় আবার আমি ফিরে যেতে পারব না।

ডন কর্লিয়নি কালেভদ্রে অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করেন, এমন কি হেগেনও আজ অনেকদিন পর তাঁকে অসহিষ্ণু হতে দেখল। আবার জিনিকে বিয়ে করো একথা তোমাকে বলেছি আমি? যা মন চাইছে করতে তাই করো। বাপ হয়ে সন্তানদের ভাল করতে চাইছ, খুব ভাল কথা। সন্তানদের যত্ন নেয় না যে সে তো পূরুষ মানুষই নয়। তবে, তা করতে চাইলে ওদের মায়ের কাছেও কিন্তু তোমাকে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। রোজ ওদের কাছে যেতে পারবে না, কে বলেছে তোমাকে? কে নিষেধ। করেছে ওদের সাথে এক বাড়িতে বাস করতে পারবে না? কে আপত্তি করেছে যেভাবে তুমি চাও সেভাবে জীবন কাটাতে পারবে না?

হাসল জনি ফন্টেন। গড ফাদার, সেকেলে ইতালীয় স্ত্রীদের মত নয় জিনি। ও সব সহ্য করবে না সে।

ডন কর্লিয়নি এবার বিদ্রূপ করে বললেন, তার কারণ তোমার নাটুকে আচরণ। আদালত যা দিতে বলল, তার চেয়ে বেশি দিলে তুমি, ওইখানেই প্রকাশ পেল তোমার বিচ্ছিরী নাটুকেপনা। দ্বিতীয় স্ত্রীকে মারতে পারোমি, কি করেই বা মারতে পারো, ছবি করছে যে! ভেড়া! তাও আবার মেয়েমানুষের! আরে, এখনও শিখলে না, ওরা গুড ফর নাথিং! দুনিয়ার কাজ চালাবে সে ক্ষমতা ওদের একেবারেই নেই। তবে হ্যাঁ, স্বর্গে গিয়ে নির্ঘাৎ ওরাই সেন্ট বনে যাবে, আমরা যত পুরুষ মানুষ নরকে

হঠাৎ কি যেন মনে পড়ে যেতে গম্ভীর হলেন ডন কর্লিয়নি। ধর্মপুত্র, তোমাকে নিয়ে আমার গর্ব হয়, তুমি অত্যন্ত সৎ ছেলে আমার, আমার ওপর শ্রদ্ধার অভাব কখনোই তোমার মধ্যে দেখিনি। কিন্তু তোমার বন্ধুদের জন্যে কি করেছ? সেই, ইতালীয় ছেলেটার কথাই ধরা, হাসির ছবি করত, যেই তাকে দুর্ভাগ্য একটু টেনে নামাল অমনি তুমি চুপটি করে কেটে পড়লে তার পাশ থেকে। কারণ তখন প্রচুর নামডাক তোমার। আরও পুরানো বন্ধুর কথা ধরো, স্কুলে পড়েছ যার সাথে, গলায় গলায় দোস্তি ছিল যার সাথে? নিনো? জানো, হতাশ হয়ে মদ ধরেছে. ছেলেটা? তোমার বিরুদ্ধে তবু একটা কথা বলে না। জানো, কি কাজ করে সে? আমাদের কাকরের ট্রাক চালাচ্ছে-গাধার মত খাটে। শনি-রবিবারে কিছু উপরি আয় করে গান গেয়ে। নিনোই না তোমার গানের পার্টনার ছিল? ভুলে গেছ? পারো না ওকে একটু সাহায্য করতে? কেন পারো না? গান তো ভালই গায়, অস্বীকার করতে পারবে?

ক্লান্ত বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে জনিকে। তবু ধৈর্যের সাথে বলল, গড ফাদার, আসল কথা হলো যথেষ্ট প্রতিভা নেই যে ওর। ভাল, অস্বীকার করি না, কিন্তু তেমন সাফল্য ও কোনদিনই অর্জন করতে পারবে না।

পাতা দুটো নেমে এসে চোখ প্রায় বুজে এলো ডন কর্লিয়নির। বলেন, আর এখন তোমার, ধর্ম-পুত্র? যথেষ্ট প্রতিভা তোমারও তো নেই। তাহলে নিনোর সঙ্গেই কাকরের ট্রাকে তোমাকেও একটা কাজ যোগাড় করে দিই, কি বলো?

জনি কথা বলছে না দেখে ডন বলে চললেন, ধর্মপুত্র, বন্ধুত্বই সব। প্রতিভাও বন্ধুত্বের কাছে কিছু না। সরকারের চেয়েও বড় বন্ধুত্ব। প্রায় পরিবারের সমান, এই বন্ধুত্ব। আমার এই কথাটা কখনও ভুলো না। বন্ধুত্বের একটা প্রাচীর যদি গড়ে তুলতে পারতে, আজ তাহলে তোমাকে আমার কাছে সাহায্যের জন্যে হাত পাততে হত না। এবার বলো দিকি, গাইতে না পারার কারণ কি? বাগানে বেশ গাইলে, শুনলাম তো। প্রায় নিনোর মতই ভাল।

ডনের এই সূক্ষ্ম খোঁচা উপভোগ করে জনি এবং হেগেন দুজনেই হাসল।

গলার জোর হারিয়ে ফেলেছি, বলল জনি। দুএকটা গান করার পর বুজে আসে গলা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাইতে পারি না আর। মাঝে মধ্যে এমনও হয় দিনের পর দিন গাইতে পারি না। রিহার্সল থাকে, কয়েক বার করে রেকর্ড করতে হয়, কিন্তু পারি না। সাংঘাতিক কোন রোগ হয়েছে আমার গলায়।

মেয়েমানুষ নিয়ে সমস্যা। গলায় লোগ। হুঁ। এবার বলো, হলিউডের সেই কর্তা, তার সাথে ঝগড়াটা কিসের? হেগেন বুঝল, এতক্ষণে হাতে কলমে কাজে নামছেন ডন।

আপনার যে-কোন কাপ্তানের চেয়ে তার ক্ষমতা অনেক বেশি, বলল জনি। সে-ই স্টুডিওটার মালিক। সিনেমার মাধ্যমে যুদ্ধের যত প্রপাগাণ্ডা হয়েছে, তার মূলে ছিল এই লোক। এ বিষয়ে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ছিল সে-ই। মাসখানেক আগে চলতি বছরের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের চিত্রত্ব খরিদ করেছে সে। বইটা বেস্ট সেলার। বইয়ের নায়ক হুবহু আমার চরিত্র, অবিকল আমার মত। অভিনয় করার দরকারই পড়বে না আমার, স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করলেই খাপে খাপে মিলে যাবে। একটা গান পর্যন্ত গাইতে হবে না। সবাই স্বীকার করছে চরিত্রটা শুধু আমাকেই মানাবে, আবার সুনাম হবে আমার। এবার অভিনয় করে। কিন্তু ওই শালা হারামজাদা জ্যাক ওলটস কিছুতেই চরিত্রটাতে অভিনয় করতে নেবে না আমাকে। পণ করে বসে আছে সে, নেবেই না। ঘোষণা করে দিয়েছে, স্টুডিওর কমিনারিতে গিয়ে সবার সামনে যদি ওর পাছায় চুমু খাই, ব্যাপারটা ভেবে দেখতে রাজি হবে।

হাত নেড়ে ডন কর্লিয়নি এমন একটা ইঙ্গিত করলেন যার অর্থ দাঁড়ায়, আরে থামো, অমন কত দেখা আছেধর্মপুত্রের কাঁধ চাপড়ে আশ্বাস দিলেন তিনি। তুমি দেখছি একেবারেই ভেঙে পড়েছ। ভেবেছ কারও কোনরকম সাহায্য করার নেই তোমাকে? রোগাও হয়ে গেছ দেখছি। মদ খাচ্ছ বুঝি খুব? ঘুমের জন্যে বোধহয় ট্যাবলেট খাও? এসবে যে তার সমর্থন নেই মাথা নেড়ে তা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন তিনি।

বললেন, এখন থেকে তুমি আমার হুকুম মেনে চলল, এই আমি চাই। এক মাস থাকো আমার কাছে। খাও দাও ঘুমাও। তোমার সঙ্গ আমার ভালই লাগবে। আর তোমার ধর্ম-বাপের কাছ থেকে তুমিও হয়তো দুনিয়াদারি সম্পর্কে এমন কিছু শিখতে পারো যেটা তোমাদের ওই বোকার স্বর্গ হলিউডেও কাজে লেগে যেতে পারে। কিন্তু গান গাইতে পারবে না, মদ খেতে পারবে না, মেয়েমানুষের ছায়া পর্যন্ত। মাড়াতে পারবে না। আজ থেকে ঠিক এক মাস পর হলিউডে ফিরে যাবে তুমি, গিয়ে দেখবে তোমার সেই .৯০ ক্যালিবারের কাপ্তান সাহেব তার ছবিতে তোমাকে নেবার জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। রাজি?

ডন কর্লিয়নির এত ক্ষমতা আছে, ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না জনি ফন্টেনের। কিন্তু যে কাজ তার দ্বারা হবে না,সে কাজ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি তিনি কখনও কাউকে দেন না, গড ফাদার সম্পর্কে এই কথাটাও জানা আছে তার। ব্যাটাচ্ছেলে কিন্তু যা তা লোক নয়। জে এডগার হভারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সামনে দাঁড়িয়ে সাহস করে কথাই বলা যায় না।

মুচকি একটু হাসলেন ডন কর্লিয়নি। ধর্মপুত্রের সংশয় টের পেয়েছেন তিনি। বললেন, সেতো একজন ব্যবসায়ী। তার লাভ হবে এমন প্রস্তাবই তাকে দেব।

এখন আর সময় নেই, বলল জনি। সবাইকে দিয়ে কন্ট্রাক্ট সই করানো হয়ে গেছে। আগামী হপ্তায় শুটিং। তোমার কিছুই করার নেই এ ব্যাপারে, গড ফাদার।

সব দায়িত্ব আমি নিলাম, এরপর আবার কথা কিসের? জনিকে ঠেলে বের করে দিলেন তিনি ঘর থেকে তোমার জন্যে ওরা সবাই অপেক্ষা করছে, যাও, হৈ হন্না করোগে।

ডেস্কের পিছনে বসে সব নোট করে নিয়েছে হেগেন। আর কিছু আছে নাকি? তাকে প্রশ্ন করলেন ডন।

ক্যালেণ্ডারের দিকে তাকিয়ে হেগেন বলল, ভার্সিল সোযোকে তো আর এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। এই হপ্তার ভেতরই আপনার সাথে দেখা করতে চাইছে সে।

শ্রাগ করলেন ডন। বিয়েটা চুকে গেল, এখন যেদিন বলো তুমি।

উত্তরটা শুনে দুটো জিনিস বুঝল হেগেন। এক, এবং এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,-ভার্সিল সলোযোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হবে। দুই, বিয়ের আগে আলোচনায় না বসার অর্থ ডন কর্লিয়নি ভাবছেন এর ফলে কিছু গোলমাল হতে পারে।

সাবধানের মার নেই, এই কথা ভেবে সে বলল, ক্লেমেঞ্জা কে এ-বাড়িতে কিছু লোক এনে রাখতে বলব?

কেন? ডনকে অসহিষ্ণু দেখাল। বিয়ের মত একটা বিশেষ দিনে দূরের আকাশেও এতটুকু মেঘ দেখা যাক তা আমি চাইনি, তাই কথা বলিনি ওর সাথে। তাছাড়া কি বিষয়ে কথা বলতে চায় ও, সেটাও জানা বাকি ছিল আমার। এখন জানি বড় জঘন্য একটা প্রস্তাব করবে।

সত্যি তাহলে ওকে প্রত্যাখ্যান করবেন?

উপর-নিচে মাথা দোলালেন ডন।

পরিবারের সবাই একসাথে বসে ভাল করে আলোচনা করে তারপর উত্তর দিলে হত।

সেই রকম ইচ্ছা বুঝি তোমার? মৃদু হাসলেন ডন কর্লিয়নি। বেশ, কাল তুমি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ফিরে এলে আলোচনাই করা যাবে। প্লেনে করে গিয়ে আগে মিটিয়ে দিয়ে এসো জনির ব্যাপারটা। চিত্র জগতের ফেরেশতাটিকে রাজি করাও। আর কিছু?

ফোন এসেছিল হাসপাতাল থেকে, নীরস গলায় গভীরভাবে বলল হেগেন। কনসিলিয়রি আবানদাণ্ডের রাত কাটবে না। শেষবার দেখার জন্যে ওর বাড়ির লোকদের যেতে বলা হয়েছে।

ডন কর্লিয়ন্ত্রি মন্ত্রণাদাতা অর্থাৎ কনসিলিয়রি গেনকো আবানদাণ্ডোর ক্যান্সার হয়েছে, তাই গত এক বছর থেকে এই পদে টম হেগেনকেই অস্থায়ীভাবে বহাল করা হয়েছে। হেগেন অপেক্ষা করছে ডন কবে তাকে বলবেন পদটা তোমার স্থায়ী হলো। ডনের এ কথা না বলারই সম্ভাবনা বেশি। যাদের মা-বাপ দুজনেই ইতালীয় কেবল তাদেরকেই এতোবড় পদটা দেয়া হয়। তাই, এমন কি অস্থায়ীভাবে কাজ চালাবার জন্য হেগেনকে বেছে নেয়ায় কিছু প্রতিবাদও হয়েছে। তার বয়সও এক্ষেত্রে একটা বাধা। মাত্র পঁয়ত্রিশ। কনসিলিয়রির কাজ সুষ্ঠুভাবে চালিয়ে সাফল্য অর্জন করার জন্যে যে অভিজ্ঞতা আর চার্য প্রয়োজন এত অল্প বয়সে কারও মধ্যে তা থাকে না, এই রকম ধারণা সবার।

হেগেনকে ডন কর্লিয়নি কিন্তু কোন উৎসাহই দিলেন না। প্রসঙ্গ বদলে জানতে চাইলেন। আমার মেয়ে-জামাইয়ের রওনা হবার সময় ঠিক হয়েছে?

রিস্টওয়াচ দেখল হেগেন। এই তো কেক কাটরে, তারপর আর আধঘন্টা। এই কথার সূত্র ধরে তার আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল। জামাই বাবাজীকে কি পারিবারিক ব্যবসায় বড় কোন পদ দেয়া…।

কক্ষনো না। ডনের অস্বাভাবিক দৃঢ় কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠল হেগেন। টেবিলে চাপড় মেরে ডন আবার বললেন, প্রশ্নই ওঠে না। খাওয়া পরা চলে, হ্যাঁ, সে-ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু কখনও যেন আমাদের পারিবারিক ব্যবসার কথা না, জানে। সনি, ফ্রিডো, ক্লেমেঞ্জা-সবাইকে বলে দিয়ে কথাটা।

একটু হাসলেন ডন, তারপর বললেন, ছেলেগুলোকে বলো; তিনজনকেই, আমার সাথে হাসপাতালে যেতে হবে ওদেরকে। আমি চাই গেনকো বেচারিকে ওরা শেষ শ্রদ্ধা জানাবে। বড় গাড়িটা চালাতে বলবে ফ্রিডোকে, আর. জনি যাবে কিনা জেনে নাও। বলবে, ও গেলে আমি খুশি হব।

চোখে প্রশ্ন নিয়ে ডনের দিকে তাকিয়ে আছে টম হেগেন।

আজ রাতেই ক্যালিফোর্নিয়ায় যাচ্ছ তুমি, তাহলে আর গেনকোর সাথে কখন দেখা করবে? কিন্তু হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে কিছু কথা যদি বলতে চাই, এখানে যেন পাই তোমাকে।

আচ্ছা। ফ্রেড গাড়ি নিয়ে কখন আসবে?

মেহমানরা আগে বিদায় হোক। চিন্তা কোরো না, আমার জন্যে অপেক্ষা করবে গেনকো, হেগেন ডন কর্লিয়নির কথাটার অর্থ করল, তিনি বলতে চাইছেন, গেনকে! আবানদাণ্ডো তার সাথে দেখা না করে মরবে না।

সিনেটর নিজে আসতে পারেননি বলে ফোন করে ক্ষমা চেয়েছেন, বলল হেগেন। বললেন, কথাটা আপনি বুঝবেন। এফ. বি. আই-এর লোক দুজনের কথা ইঙ্গিত করলেন বলে মনে হলো। লোক মারফত প্রেজেন্টেশন পাঠাতে অবশ্য ভুল করেননি।

উপহারটা কেমন, ভাল? সিনেটরকে তিনি বারণ করেছিলেন আসতে, একথা আর বললেন না ডন।

খাঁটি ইতালীয় ভঙ্গিতে সমর্থন সূচক মুখভঙ্গি করল হেগেন, তবে তার আধা আইরিশ আধা-জার্মান চেহারায় সেটা তেমন মানাল না,। রূপোর প্রাচীন জিনিস, মেলা দাম দিয়ে কিনেছেন সিনেটর। হাজার ডলারের কম নয়। প্রচুর সময় খরচ হয়েছে সিনেটরের উপযুক্ত জিনিসটা খুঁজে বের করতে।

খুশি হলেন ডন কর্লিয়নি। লুকা ব্রাসির মত তার ক্ষমতার প্রাসাদের আরেক শুভ এই সিনেটর ভদ্রলোক। এই উপহার পাঠিয়ে তিনিও ডন কর্লিয়নির বশ্যতা স্বীকার করলেন নতুন করে।

.

সাংঘাতিক আশ্চর্য হয়ে গেল কে অ্যাডমস। এ তোমার অন্যায়, মাইক! জনি ফন্টেনকে তোমরা চেনো একথা আগে বলোনি কেন? এখন আর কোন দ্বিধা নেই, বিয়ে আমি তোমাকেই করব।

ওর সাথে কথা বলবে?

এখন? না। জানো, ক্যাপিটালে যখনই গাহত ও, নিউইয়র্কে এসে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গলা ফাটিয়ে ফেলতাম আমি। কি যে ভাল লাগে ওকে, তিন বছর ওকে ছাড়া আর কোন পুরুষকে তো ভাবতেই পারতাম না।

গান শেষ হলো জনির।ডন কর্লিয়নির সাথে তাকে বাড়ির ভিতর যেতে দেখল কে অ্যাডামস। মাইকেলের আপাদমস্তক দেখে নিয়ে সে বলল, কি ব্যাপার? তোমার বাবার সাথে গেল যে জনি ফন্টেন? ওকেও তোমার বাবার অনুগ্রহ চাইতে হয়, নিশ্চয়ই একথা বলবে না তুমি? কে ভাবছে, খুব ব্যঙ্গ করতে পেরেছে মাইকেলকে।

জনি বাবার ধর্মপুত্র, বলল মাইকেল। ওর এত বড় ফিল্ম স্টার হবার পেছনে বাবারই বেশি দান রয়েছে।

সত্যি? আনন্দে হেসে উঠল কে। তোমার একথার মধ্যেও কেমন যেন একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি আমি।

এদিক ওদিক মাথা নাড়ছে মাইকেল। তোমার না শোনাই ভাল।

আমাকে বিশ্বাস করো না?

অগত্যা বলল মাইকেল। গল্পটা হাস্যকর শোনাল না। গর্বের সাথেও বলল না। মাইকেল। ব্যাখ্যা দেবার ঝামেলায় না গিয়ে জানাল, বছর সাত-আট আগে এখনকার তুলনায় আরও খেয়াল খুশি মাফিক চলতেন ওর বাবা, এবং ঘটনার সাথে তার ধর্মপুত্র জড়িত থাকায় নিজের আত্মসম্মানের ব্যাপার বলে ধরে নিয়েছিলেন সেটাকে। সংক্ষেপে বলে গেল মাইকেল:

সাত আট বছর আগের কথা। জনি ফন্টেন গায়ক হিসেবে নাম করে জনপ্রিয় ড্যান্স ব্যাণ্ডের সাথে গান গায়। কিছু দিনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ হয়ে ওঠে সে রেডিওর। কিন্তু ব্যাপার্টির কর্তা লেস হ্যাঁলি পাঁচ বছরের একটা চুক্তি সই করিয়ে নিয়েছিল জনিকে দিয়ে। এই চুক্তি অনুযায়ী এখানে, সেখানে জনিকে গাধার খাটুনি খাঁটিয়ে মুনাফার বিস্তর টাকা নিজের পকেটে ভরার অধিকার ছিল লেস হ্যাঁলির। এই নিয়েই লাগল গণ্ডগোল। একটা আপোস রফার চেষ্টা করলেন ডন কর্লিয়নি। চুক্তিটা যদি লেস হ্যাঁলি বাতিল করে, তাকে তিনি এককালীন বিশ হাজার ডলার দেবেন। কিন্তু রাজি হলো না, লেস হ্যাঁলি। সে দাবি করছিল জনির মোট আয়ের শতকরা পঞ্চাশ ভাগ। হেসেছিলেন ডন। প্রস্তাবটা বদলালেন। নতুন প্রস্তাবে বললেন, বিশ নয়, দশ হাজার ডলার দেবেন তিনি লেস হ্যাঁলিকে। সে লোকটা দুনিয়ার কোন খবর রাখত না। সুতরাং টাকার অঙ্ক কমে যাবার কি অর্থ তা তার মাথায় ঢুকলই না। বলাই বাহুল্য, এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল সে।

ডন কর্লিয়নি নিজে দেখা করলেন লোকটার সাথে। সাথে গেল তার সবচাইতে অন্তরঙ্গ দুজন বন্ধু। একজন তার মন্ত্রণাদাতা, গেনকো আবানদাণ্ডো, অপরজন লুকা ব্রাসি। সেখানে আর কেউ ছিল না। ডন কর্লিয়নি একটা দলিলে সই নিলেন লেস হ্যাঁলির। দশ হাজার ডলার পেল সে, আগের চুক্তিটা বাতিল হয়ে গেল।

কিভাবে! এই তো বললে লেস হ্যাঁলি রাজি হয়নি?

বাবা তার কপালে পিস্তল ধরে বলেছিলেন, এক মিনিটের মধ্যে হয় সই করো, না হয় দলিলে তোমার মাথার ঘিলু পড়বে!

ঘাবড়ে গেছে কে। ভুরু কুঁচকে চিন্তিতভাবে বলল, তোমার বাবা দেখছি আধুনিক রবিন হুড। ভোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে অন্যের জন্যে কিছু না কিছু সবসময় তিনি করছেন। ঠোঁট বাঁকা করে ব্যঙ্গের হাসি হাসল সে। ওঁর পদ্ধতিগুলো আইনসম্মত নয়, এই যা।

যাই শোনাক না কেন, একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল মাইকেল, আসল ব্যাপারটা হলো: মেরু অভিযাত্রীদের কথা তো শুনেছ তুমি? যারা যাবার পথে এখানে ওখানে লুকিয়ে রেখে যায় খাবার, বিপদের পুঁজি, ফেরার পথে যদি দরকার হয়, মনে করে? বাবার উপকার আর অনুগ্রহগুলো ঠিক সেই খাবারের পুঁজির মত, প্রয়োজনের সময় সবার বাড়িতে গিয়ে ফেরত চাইবেন, তখন না দিলেই বিপদ।

মেহমানদের বিদায় নিতে নিতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। রাস্তায় এখন একটাই মাত্র গাড়ি দেখা যাচ্ছে। কালো লম্বা ক্যাডিলাক। ড্রাইভিং সীটে বসে আছে ফ্রিডো। তার পাশে বসলেন ডন কর্লিয়নি। পিছনের সীটে সনি, মাইকেল আর জনি ফন্টেন।

তোমার বান্ধবীর কথা বলছি, ডন কর্লিয়নি তার কনিষ্ঠ পুত্রকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, একা শহরে ফিরতে পারবে সে?

টম ব্যবস্থা করবে বলেছে।

মনে মনে মন্ত্রণাদাতার যোগ্যতায় খুশি হলেন ডন। সন্তুষ্ট চিত্তে মাথা নাড়লেন তিনি।

পেট্রলের রেশন থাকায় ম্যানহাটনের দিকে যাবার সময় বেল্ট পার্কওয়েতে যানবাহন একেবারে নেই বললেই চলে। ফ্রেঞ্চ হাসপাতালে পৌঁছতে পুরো এক ঘন্টাও লাগল না। পথে দুএকটা কথা হলো। ডন কর্লিয়নি তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রকেই দ্বিতীয় প্রশ্নটি করলেন, পড়াশোনা ঠিকমত চলছে তো?

মাথা ঝাঁকাল শুধু মাইকেল।

সনি বলল, জনির ব্যাপারটা তুমি মিটিয়ে দিচ্ছ শুনলাম? চাও আমি গিয়ে সাহায্য করি?

সামান্য ব্যাপার, সংক্ষেপে বললেন ডন।

ঠিক উল্টো ধারণা জনির, হাসল সনি। সেজন্যেই মনে করলাম তুমি হয়তো আমাকে পাঠাবে।

মাথা ঘুরিয়ে পিছনে বসা জনির দিকে তাকালেন ডন। আমাকে বিশ্বাস করতে পারো না কেন তুমি? করব বলেছি অথচ করিনি এমন কোন উদাহরণ দেখাতে পারো? শুনেছ কোনদিনকেই আমাকে এড়িয়ে যেতে পেরেছে?

কেঁচো হয়ে গেল জনি ফন্টেন। ভয়ে ভয়ে বলল, গড ফাদার, ও ব্যাটা একটা ৯০ ক্যালিবারের শয়তান। কিছুতেই ওর কথার নড়চড় হয় না। সবচেয়ে ভয় পাচ্ছি; লোকটা ঘৃণা করে আমাকে। আমার মাথায় ঢুকছে না কি করে আপনি এর ফয়সালা করবেন…

সস্নেহে কৌতুক করলেন ডন। বললেন, কথা যখন দিয়েছি, ফয়সালা তো যেভাবে হোক করে দিতেই হবে। দেখি! কনিষ্ঠ পুত্র মাইকেলের পাজরে খোঁচা মারলেন তিনি। আর যাই হোক, তুমি আমার ধর্মপুত্র, তোমাকে তো আ, দুর্দশায় ফেলতে পারি না, কি বলো, মাইকেল?

জীবনে কখনও এক সেকেণ্ডের জন্যেও বাবাকে অবিশ্বাস করেনি মাইকেল। সায় দেবার ভঙ্গিতে নিঃশব্দে মাথা নাড়ল সে।

হাসপাতালের ফটক দিয়ে ঢোকার সময় মাইকেলের কনুইয়ের উপরটা ধরলেন ডন কর্লিয়নি। কাজেই ওদেরকে ওখানে রেখে এগিয়ে গেল বাকি সবাই। লেখাপড়ার পাট চুকলে, ছোট ছেলেকে বললেন তিনি, আমার কাছে এসো একবার কথা আছে। তোমার ভাল লাগবে এমন কিছু পরিকল্পনা করেছি আমি।

মাইকেল চুপ করে থাকল। তাই দেখে বেজার হয়ে ভারি গলায় ডন বললেন, তোমাকে আমি চিনি। এমন কিছু করতে বলব না যা তোমার পছন্দ হবে না। জেনে রেখো, সাধারণ কোন ব্যাপার নয়-বড় তত হয়েছ, যা ভাল বোঝো করো। কিন্তু বইগুলো গেলা শেষ করে, আর সব ছেলে যেমন করে, আমার কাছে তুমিও একবার এসো।

চওড়া বারান্দার সাদা টালি বসানো মেঝেতে এক ঝাক মোটাতাজা কালো কাক বসে আছে, যেন। ওরা সবাই গেনকো আবানদাণ্ডের পরিবারের লোকজন। গেনকোর তিন মেয়ে আর তার স্ত্রী, শোকের প্রতীক কালো পোশাক পরে এসেছে সবাই।

এলিভেটর থেকে নামলেন ডন কর্লিয়নি। তাকে দেখেই ডানা ঝাপটে সবাই ছুটে এল পরম আশ্রয়ের জন্যে। দশাসই চেহারা মায়ের, মেয়েগুলো সাধারণ, মোটাসোটা। ডনের গলা ছুঁয়ে বিলাপ জুড়ে দিল গেনকোর স্ত্রী, দেবতার চেয়ে কম কিসে তুমি, ছুটে এসেছ নিজের মেয়ের বিয়ে ফেলে।

এসব প্রশংসা গায়ে না মেখে ডন কর্লিয়নি বললেন, গেনকো আমার শরীরের একটা অংশের মত, আজ বিশ বছর ধরে। তাকে শ্রদ্ধা জানাতে আমি আসব না তো কে আসবে?গেনকোর স্ত্রীর কল্পনাতেও নেই যে আজ রাতে তার স্বামী মারা যাবে, একথা বুঝতে দেরি হয়নি ডন কর্লিয়নির।

ক্যান্সারের শিকার গেনকো আবানদাণ্ডো আজ প্রায় এক বছর ধরে এই হাসপাতালে শুয়ে আছে। সে যে দ্রুত মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে একথা ভাল করে বোঝেনি তার স্ত্রী। স্বামীর অসুখটাকে স্বাভাবিক জীবন যাত্রার একটা অংশ বলে ধরে নিয়েছে সে। ভেবেছে, আরেকটা সঙ্কটকাল হাজির হয়েছে আজ রাতে, তার বেশি কিছু না। একনাগাড়ে কথা বলে চলেছে সে, ভিতরে গিয়ে দেখে এসো ওকে। ডাকছিল তোমাকে। জানো, খুব ইচ্ছে ছিল বেচারির তোমার মেয়ের বিয়েতে গিয়ে আশীর্বাদ করার, কিন্তু ডাক্তার একেবারেই ছাড়তে চাইল না। ও-ই আবার বলল, দেখো, উনি আজকের দিনে আমাকে দেখতে আসবেন। সত্যি বলছি, আমি তো ভাবতেই পারিনি। বন্ধুত্বের মেয়েরা কি বোঝে, বলো? সুতরাং আমার দোষ দিতে পারো না। বন্ধুত্বের মূল্য তোমরা, পুরুষরা দিতে জানো। যাও, খুব খুশি হবে তোমাকে দেখে।

নার্স আর ডাক্তার বেরিয়ে এল বারান্দায়। ডাক্তারটি অল্প বয়েসী, গভীর। হাব, ভাব দেখে মনে হয় হুকুম চালাবার জন্যেই দয়া করে এই দুনিয়ার মাটিতে পা রেখেছে, চাল-চলনে বড়লোকি ভাবটা প্রকট। গেনকোর মেয়েদের একজন খুব সাবধানে দয়া ভিক্ষার সুরে জানতে চাইল, এখন বাবাকে দেখতে যাব, ডা. কেনেডি?

রাজ্যের বিরক্তি ফুটে উঠল ডা. কেনেডির চেহারায়। কেবিনের রুগী মরতে যাচ্ছে তা কি এরা সত্যি বুঝতে পারছে না? লোকটাকে শান্তিতে মরতে দিলেই কি ভাল করত না? ওর বাড়ির লোকজন ছাড়া একজনও কেবিনে ঢুকবেন না, বলল সে।

কিন্তু পরমুহূর্তে সে দেখল ভারিক্কী চেহারার খাটো এক লোকের দিকে সবাই ফিরে দাঁড়াল, যেন তাঁর ইচ্ছাতেই সব হবে। লোকটাকে তেমন কিছু মনে হলো না ডাক্তার কেনেডির! একেবারে আনাড়ি লোক, কিভাবে সান্ধ্য পোশাক পরতে হয় তাই জানা নেই। তার দিকে তাকিয়ে লোকটা একটা প্রশ্ন করল, উনি কি আজই মারা যাবেন, ডাক্তার সাহেব? কণ্ঠস্বরে ক্ষীণ ইতালীয় টান।

হ্যাঁ, গভীরভাবে জবাব দিল ডাক্তার।

আপনারা তাহলে কাঁধ থেকে দায়িত্ব নামান, বললেন ডন কর্লিয়নি। এখন থেকে আমরা ভার নেব। ওঁকে সান্তনা দেয়া, ওঁর চোখ বন্ধ করা-সব আমরা, করব। ওঁকে মাটিতে শোয়ার সময় আমরাই ফেলব চোখের পানি। তারপর, ওর স্ত্রী-কন্যাদের ভরণ পোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সেটাও নেব আমরা।

ডন কর্লিয়নিকে এমন স্পষ্টভাবে কথা বলতে শুনে সব বুঝে ফেলল গেনকোর স্ত্রী। কাঁদতে শুরু করল সে।

কাঁধ ঝাঁকাল ডাক্তার কেনেডি। গেঁয়ো ভুতদের সাথে কথা বলতে যাওয়াই ঝকমারি! তবে লোকটার কথার মধ্যে যে যুক্তি আছে তাও স্বীকার করতে হলো তাকে। সাদা কোট উড়িয়ে লম্বা বারান্দা ধরে হন হন করে চলে গেল সে।

আবার কেবিনে ফিরে গেল নার্স। একটু পর আবার বেরিয়ে এসে নিচু গলায় বলল, উনি প্রলাপ বকছেন। খুব জ্বর, খুব ব্যথা। বেশি কথা বলবেন না। ওঁর স্ত্রী ছাড়া আর কারও দুএক মিনিটের বেশি ওখানে থাকা চলবে না। চলে যাবার আগের মুহূর্তে নার্স হঠাৎ জনি ফন্টেনকে দেখে চিনতে পারল। বিস্ময়ে, অবিশ্বাসে চোখ দুটো বিস্ফারিত হলো তার। জনি ফন্টেন তাকে স্বীকৃতি দিয়ে হাসছে দেখে পুলকিত হয়ে উঠল মেয়েটা। যখন খুশি এলেই আমাকে পেতে পারো, চোখের দৃষ্টির মাধ্যমে এই দাওয়াত দিয়ে রাখতে ভুল করল না সে।

ভবিষ্যতে প্রয়োজন লাগতে পারে ভেবে মেয়েটার কথা মনে গেঁথে রাখল জনি, তারপর সবার শেষে কেবিনে ঢুকল।

দৌড় প্রতিযোগিতায় মৃত্যুর সাথে হেরে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে খাটে শুয়ে আছে গেনকো আবানদাণ্ডো। মাংসহীন কঙ্কাল একটা। মাথা ভর্তি কালো চুলের নাম নিশানাও খুঁজে পাওয়া যাবে না, পাকানো নোংরা দড়ির মত হয়ে গেছে সেগুলো।

গলার স্বরে খুশির ভাব এনে ডন কর্লিয়নি বললেন, এই দেখো, গেনকো ভাই, আমার সাথে কারা এসেছে। ওরা তোমাকে ওদের শ্রদ্ধা জানাতে চায়। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আর একজন কে এসেছে দেখো। জনিরও ইচ্ছা তোমাকে সে তার শুভেচ্ছা আর শ্রদ্ধা জানাবে।

মুমূর্ষ গেনকো চোখ মেলে সকৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকাল ডন কর্লিয়নির দিকে। ছেলেরা সবাই তার পাটখড়ির মত সরু হাতটাকে ধরল। খাটের পাশে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ওর স্ত্রী আর মেয়েরা। তারা সবাই গেনকোর গালে চুমো খেলো। তারপর তার অপর হাতটা ধরুল।

বিশ্বস্ত পুরানো বন্ধুর হাত ডন কর্লিয়নিও ধরলেন। খুব আন্তরিকতার সাথে তিনি বললেন, এবার তুমি সেরে উঠলেই, বুঝলে ভায়া, আর কেউ না, শুধু তুমি-আমি গিয়ে ইতালির আমাদের সেই গ্রামে একবার বেড়িয়ে আসব। বক্কিখেলার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে তোমার? মদের দোকানের সামনে বাবারা সেই যে খেলতেন? ঠিক করেছি, ছেলেমানুষের মত স্ফূর্তি অনুভব করছেন ডন কর্লিয়নি। গ্রামে গিয়ে ওই মদের দোকানের সামনে আমরা দুজন আবার,বক্কি খেলব।

মেনকো একটা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অতি কষ্টে সেটা তুলে ইশারা করল। সবাই বুঝল ঈশারাটা। ডনের ছেলেরা, গেনকোর স্ত্রী এবং মেয়েরা নিঃশব্দে সরে গেল। সরু হাতটা দিয়ে ডন কর্লিয়নিকে আঁকড়ে ধরে কথা বলতে চেষ্টা করছে গেনকো। খাটের পাশে একটা চেয়ারে বসলেন ডন। ওদের ছেলেবেলার কথা যা মনে আসছে, বক বক করে যাচ্ছে গেনকো আবানদাণ্ডো। তার কালো নিষ্প্রভ চোখ দুটোয় চাতুর্য চিকচিক করে উল। অস্ফুটে কি বলল, শোনা গেল না, আরেকটু নিচু হলেন ডন। একটু দূরে কেবিনে আর যারা রয়েছে তারা এই করুণ দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত। মাথা নাড়ছেন ডন কর্লিয়নি। তাঁর গাল বেয়ে গড়িয়ে নামছে চোখের পানি।

কাঁপা গলায় আরও জোর পেল গেনকো। সবাই শুনতে পাচ্ছে এখন তার কথা। প্রাণপণ চেষ্টা করে, হাঁপাতে হাঁপাতে বালিশ থেকে মাথাটাকে তুলে ফেলল সে। রোগা হাতের একটা কাঠির মত আঙুল ডনের দিকে খাড়া করল, বলল, গড ফাদার, তোমার দুটো পায়ে পড়ি, তুমি আমাকে মরে যেতে দিয়ো না। গড় ফাদার, হাড়ে আমার দাউ দাউ আগুন জ্বলছে, পোকায় মগজ খাচ্ছে–এর যে কি কষ্ট সব আমি টের পাচ্ছি। গড ফাদার, ও গড ফাদার, তোমার কতটুকু ক্ষমতা সে আমি জানি। তুমি পারো! গড ফাদার, তুমি আমাকে ইচ্ছে করলেই ভাল করে দিতে পারো! মনে, নেই, ছোটবেলায় কর্লিয়নিতে আমরা একসাথে খেলেছি, একসাথে বড় হয়েছি? আমাদের অচ্ছেদ্য সম্পর্ক, এ সম্পর্ক কোন কালে নষ্ট হবার নয়তবু তুমি আমাকে মরে যেতে দেবে? না, গড ফাদার, তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যেতে পারব না। পাপ করেছি, কিন্তু তোমার সাথে যতক্ষণ আছি কাউকে ডরাই না। নরক আমার কাছে ভীষণ ভীতিকর। তুমি যেভাবে হোক আমাকে বাঁচিয়ে দাও, গড় ফাদার, আমি মরতে চাই না।

শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায়, স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতে শুরু করলেন ডন কর্লিয়নি। অবিশ্বাসীর ভুল ভেঙে দেবার জন্যে তিনি চাইছেন তার প্রক্রিট শব্দ যেন গেনকো এবানদাণ্ডের কান হয়ে মগজে পৌঁছায়। ভাই গেনকো, সে ক্ষমতা যদি আমার থাকত, বিশ্বাস করো, সৃষ্টিকর্তার চেয়েও বেশি দয়া দেখাতাম তোমাকে। না, ভাই, নরকের কথা ভেবে তুমি নিজেকে কষ্ট দিয়ো না। কথা দিচ্ছি, প্রতিদিন দুবেলা উপাসনার আয়োজন করব আমি, যাতে তোমার আত্মা, শান্তি পায়। তোমার পরিবারের সবাই তোমার আত্মার কল্যাণের জন্যে প্রার্থনা করবে। আমরা সবাই এতগুলো মানুষ সৃষ্টিকর্তার কাছে ধরনা দেব, তারপরও তিনি তোমাকে সাজা দেবেন এ হতে পারে না।

কঙ্কালের মুখে বিশ্রী একটা ধূর্ত ভাব ফুটে উঠল। সব ব্যবস্থা করা হয়ে গেছে তাহলে?

কঠিন সান্ত্বনাহীন শোনাল ডনের উত্তরটা, অবিশ্বাসীর মত প্রলাপ বোকো না। মেনে নাও, আত্মসমর্পণ করো।

ঝপ করে পড়ে গেল বালিশের উপর মাথাটা। দপ্ করে নিভে গেল চোখ থেকে উন্মত্ত আশার আলোটা। কেবিনে ব্যস্তভাবে ঢুকল নার্স, সবাইকে জোরজার করে কেবিন থেকে বের করে দিচ্ছে সে? ডনও উঠে দাঁড়ালেন।

তার দিকে হাত বাড়িয়ে অসহায় গেনকো আবানদাণ্ডো করুণ আবেদনের সুরে বলল, গড ফাদার, আমাকে ফেলে চলে যেয়ো না। কাছে থেকে তুমি আমাকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে অন্তত সাহায্য করো। তোমাকে দেখে হয়তো ভয় পেয়ে যাবে সে, আমার শান্তি ভঙ্গ করতে সাহস পাবে না। বুঝিয়ে শুনিয়ে ভয় দেখিয়ে যেভাবে হোক একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারো হয়তো, কি বলো? বিবর্ণ ঠোটু বাকা করে কথা বলছে গেনকো আবানদাণ্ডো, উনকে এখন যেন সে বিদ্রূপ করছে। হাজার হোক তোমাদের রক্তের সম্পর্ক, সেটা তো আর তুমি অৰীকার করতে পারো না? ডন রাগ করবেন ভেবে এবার ভয় হলো তার, তাড়াতাড়ি তার হাতটা ধরে ফেলল। আমি তোমার হাতটা ধরে আছি, তুমি আমার কাছে থাকো। দুজন একসাথে অমন কত লোককে আমরা নতি স্বীকার করিয়েছি, আর এ ব্যাটাকে জব্দ করতে পারব না? থাকো, গড ফাদার, ভয় লাগছে, দয়া করে আমার কাছে থাকো।

ইশারা করে সবাইকে কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন ডন কর্লিয়নি। শুকিয়ে ছোট হয়ে যাওয়া গেনকো আবানদাণ্ডোর হাতটা নিজের দুই মস্ত হাতে তুলে নিলেন। মৃত্যু আসবে, তারই অপেক্ষায় বসে আছেন তিনি অন্তরঙ্গ বন্ধুর পাশে। কোমল স্বরে কত রকমের আশ্বাস দিচ্ছেন বন্ধুকে ডন।

.

.

আজকের দিনটা কনি কর্লিয়নির ভাল ভাবেই কাটল। স্বামী হিসেবে বিয়ের প্রথম রাতের কর্তব্য অত্যন্ত দক্ষতা এবং বলিষ্ঠতার সাথে পালন করল কার্লো রিটসি। উপহার হিসেবে পাওয়া টাকার কথা সারাক্ষণ মনে থাকায় কর্তব্য পালনে সাংঘাতিক উৎসাহ দেখিয়েছে সে। কুড়ি হাজার ডলার, কম নয়। কনি অবশ্য যে ব্যগ্রতার সাথে। তার কুমারীত্ব বর্জন করল, টাকাগুলো হাতছাড়া করার সময় সেরকম ব্যগ্র তাকে হতে দেখা গেল না। কালো কিন্তু ভারি চালাক, সারারাত স্ত্রীকে জাগিয়ে রেখে তার এমন যত্ন নিল যে কনির চোখে কালসিটে পড়ে গেল।

ওদিকে সনি কর্লিয়নি কখন টেলিফোন করবে এই আশায় বাড়িতে বসে ছটফট করছে লুসি ম্যানচিনি। তার বিশ্বাস সনি আবার যোগাযোগ না করেই পারে না। শেষ পর্যন্ত অধৈর্য হয়ে সে-ই ফোন করল অপর প্রান্তে এক মহিলার গলা শুনে সাথে সাথে রিসিভাব ক্রাডলে নামিয়ে রাখল সে। তার জানার কথা নয় যে তাকে নিয়ে সনি আধঘণ্টার জন্যে আড়ালে গিয়ে কি করেছে তা নিয়ে কানাকানি হয়েছে বিয়ে বাড়ির চারদিকে, সবাই বলাবলি করেছে:আরেকটা শিকার বালিয়েছে সান কর্লিয়নি।

ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখেছে আমেরিগো বনাসেরা। দেখেছে ডন কর্লিয়নিকে। কার্নিস ভোলা টুপি, ওভার অল আর দস্তানা পরে আছেন তিনি। তার দোকানের সামনেই কয়েকটা লাশ নামাচ্ছেন তিনি, সব কটা বুলেটে ঝাঁঝরা। চোখ পাকিয়ে বলছেন, খবরদার, টু-শব্দটি নয়। তাড়াতাড়ি মাটিতে পুঁতে দাও লাশগুলো।

ঘুমের মধ্যে ভয় পেয়ে গোঙাচ্ছে বনাসেরা। কেমন মানুষ গো তুমি, একপেট বিয়ে খেয়ে এসে দুঃস্বপ্ন দেখো। তার স্ত্রী ধাক্কা দিয়ে বনাসেরার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে বলল।

নিউ ইয়র্ক সিটির হোটেলে কে অ্যাডামসকে পৌঁছে দিতে যাচ্ছে ক্লেমেঞ্জা আর পলি গাটো। প্রকাণ্ড গাড়িটা চালাচ্ছে গাটো। সম্মান দেখিয়ে সামনের বাকি.সীটটায় কে অ্যাডামসকে বসতে দিয়ে পিছনে বসেছে ক্লেমেঞ্জা। কে অ্যাডামসের দৃষ্টিতে এরা দুজনেই সাংঘাতিক রোমাঞ্চকর চরিত্র। ব্রুকলিনের কথা খইয়ের মত ফুটছে ওদের মুখে। ওকে অতিরিক্ত সমীহ দেখাচ্ছে। দুএক কথায় গল্প জমে উঠল। মাইকেলের প্রতি ওদের দ্বিধাহীন স্নেহ আর অপার শ্রদ্ধা প্রকাশ পেতে দেখে বিস্মিত হলো কে। বিস্ময়ের কারণ, মাইকেলের কাছ থেকে শুনে অনেকদিন থেকেই তার ধারণা বাপের বাড়িতে সে একজন বহিরাগতের মত। কিন্তু ক্লেমেঞ্জা ঠিক তার উল্টো কথা বলছে। ডন কর্লিয়নি নাকি মনে করেন তার ছেলেদের মধ্যে সবার সেরা মাইকেল। পারিবারিক ব্যবসার হাল নাকি তাকেই ধরতে হবে ভবিষ্যতে।

সেটা কিসের ব্যবসা? জানতে চাইল কে।

স্টিয়ারিং হুইল ঘোরাচ্ছে পলি গাটো, চট করে কে-র দিকে তাকাল, একবার সে।

মাইক জানায়নি? ব্যাক সীট থেকে আশ্চর্য হয়ে বলল ক্লেমেঞ্জা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ইটালিয়ান জলপাই তেলের আমদানীকারক উনি, ডন কর্লিয়নি। যুদ্ধ থেমেছে, ওদের ব্যবসা এখন-ফেঁপে উঠবে। ব্যবসাতে এখন মাইকের মত মেধাবী ছেলেরই দরকার।

হোটেলে পৌঁছে দরকার নেই বলা সত্ত্বেও জোর করে ভেস্ক পর্যন্ত এল কেমো। কে-র আপত্তির উত্তরে সে জানাল, কর্তার নির্দেশ আপনি নিরাপদে পৌঁছলেন কিনা দেখে যেতে হবে। সুতরাং দেখে যেতেই হবে।

কে-কে এলিভেটর পর্যন্ত পৌঁছে দিল ক্লেমেঞ্জা। প্রসন্ন হেসে বিদায় দিল তাকে। তারপর ফিরে এসে হাতের সবুজ কাগজের লিটা ডেস্কের উপর দিয়ে ক্লার্কের দিকে গড়িয়ে দিয়ে জানতে চাইল, কার নামে রুম ভাড়া নিয়েছেন উনি?

গোল পাকানো টাকাটা তাড়াতাড়ি কুড়িয়ে পকেটে চালান করে দিল ক্লার্ক। বলল, মি. এবং মিসেস মাইকেল কর্লিয়নি।

গাড়িতে ফিরে এল ক্লেমেঞ্জা। পলি গাটো বলল, বেশ ভাল মেয়ে।

মাইক ওর সাথে শোয়, হেড়ে গলায় বলল কুমো। এসব ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবার দরকার নেই। হেগেন একটা কাজ দিচ্ছে, তাড়াতাড়ি সারতে হবে সেটা। খুব সকালে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ো আমার।

.

টম হেগেনের নানান কাজের ঝামেলা চুকতে অনেক দেরি হয়ে গেল। স্ত্রীকে চুমো খেয়ে বিদায় নিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে ছুটল সে, তখন অনেক রাত। পেন্টাগনের একজন স্টাফ জেনারেল অফিসার তার কৃতজ্ঞতার নমুনা হিসেবে যে টপ প্রায়োরিটি ইমার্জেন্সী ছাড়পত্রটি দিয়েছিল তাকে সেটি সাথে থাকায় লস এঞ্জেলেসের বিমানে সীট পেতে মোটেও বেগ পেতে হলো না।

দিনটা ক্লান্তিকর, কিন্তু ফলপ্রসূ বটে, ভাবছে হেগেন। গেনকো আবানদাণ্ডো মারা গেছে, ভোর তিনটেয়। হাসপাতাল থেকে ফিরেই ডন কর্লিয়নি তাকে জানিয়েছেন যে আজ থেকে পরিবারের অফিশিয়াল কনসিলিয়রি সে-ই। অফিশিয়াল অর্থাৎ স্থায়ী মন্ত্রণাদাতা পদটি পাওয়ার তাৎপর্য হলো হেগেন নিঃসন্দেহে এবার অগাধ ধন সম্পদের মালিক বনে যাবে, তার ক্ষমতার পরিধিও সেই সাথে অনেক বড় হবে।

এক্ষেত্রে একটা অতি পুরাতন এবং প্রতিষ্ঠিত প্রচলিত রীতি লঙ্ঘন করলেন ডন কর্লিয়নি। খাট একজন সিসিলীয় ছাড়া আজ পর্যন্ত কনসিলিয়রির মত এত বড় পদ আর কাউকে দেয়া হয়নি। ডন কর্লিয়নির পরিবারে টম হৈগেনও একজন হয়ে উঠেছে, কিন্তু সেটাই সব নয়। প্রশ্নটা রক্ত নিয়ে। প্রচলিত বিশ্বাস হলো যন্ত্রণাদাতার মত সাংঘাতিক গুরুপূর্ণ পদের জন্যে শুধুমাত্র একজন সিসিলীয়কেই বিশ্বাস করা যেতে পারে, তার কারণ, ওমোর, অর্থাৎ মুখ বন্ধ রাখার নিয়ম শুধু তারই জানা থাকে।

বাড়ির কর্তা ডন কর্লিয়নি দ্বার উপরে আছেন, সমস্ত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ আসে তাঁর কাছ থেকেই। অনেক নিচের স্তরে একদল লোক রয়েছে তারা ডনের আদেশ বাস্তবায়িত করার জন্যে হাতে কলমে কাজ করে। এই দুই প্রান্তের মাঝখানে রয়েছে তিনটে স্তর, এই স্তরগুলোয় কর্মীরা সব সময় মিডিয়া হিসেবে থাকে। এর সুবিধের দিকটা হলো, কোন কাজের সূত্র ধরে উপরের প্রান্ত পর্যন্ত কখনোই পৌঁছানো সম্ভব নয়। সম্ভব, যদি কনসিলিয়রি বেঈমানী করে।

বনাসেরার মেয়েকে যারা মেরেছে তাদেরকে কি সাজা দেয়া হবে তার বিস্তারিত বিধান দিয়েছেন ডন, কিন্তু আদেশটি তিনি কারও সামনে দেননি। হেগেনও তৃতীয় কারও অনুপস্থিতিতে আদেশটা জানিয়েছিল ক্লেমেঞ্জাকে। ক্লেমেঞ্জ কাজটা সারতে বলল পলি গাটোকে।

পলি গাটো এবার লোক সংগ্রহ করবে। এ কাজ কেন করতে বলা হলো, গোড়ায় কে আদেশটা দিয়েছে, এসব সে বা তার লোকেরা জানবে না। কোন কাজের জন্যে ডন কর্লিয়নিকে যদি জড়াতে হয়, প্রত্যেক স্তরের কর্মীকে অর্থাৎ শিকলের প্রতিটি গিটকে, বেঈমানী করতে হবে। মাফিয়া পরিবারগুলোর দীর্ঘ ইতিহাসে এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি, কিন্তু তার মানে এই নয় যে এ-ধরনের কিছু ঘটতে পারে না। ঘটার সম্ভাবনা সব সময়ই আছে। সেই মহামারীর সঠিক ওষুধটিও সবার জানা, শিকলের মাত্র একটা গিটকে কেটে বাদ দিলেই বিপদ শেষ।

কনসিলিয়রি হলো ভনের দ্বিতীয় মগজ। সে ডনের ডান হাত হিসেবে কাজ করে, ডনকে বুদ্ধি পরামর্শ যোগান দেয়। ডনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী, অন্তরঙ্গ সুহৃদ বলতে কনসিলিয়রিকেই বোঝায়। গুরুত্বপূর্ণ যাত্রায় সে ডনের গাড়ি চালায়। জরুরী বৈঠক চলাকালে সেই খাবার, পানীয়, নতুন চুরুট হাতের কাছে এগিয়ে দেয়।

কোন বিষয়ে ডন যতটা জানেন, কনসিলিয়রি ততটা না জানলেও, তাঁর কাছাকাছি জানে। কোন শক্তির উৎস কোথায়, রহস্য কি সব সে বোঝে। ডনের ক্ষতি করার সাধ্য দুনিয়ায় যদি কারও থাকে, তো সে এই কনসিলিয়রির। অবশ্য আজ পর্যন্ত কোন কনসিলিয়রি তার ডনের সাথে বেঈমানী করেছে বলে শোনা যায়নি। বিশ্বাসঘাতকতা করার কথা কনসিলিয়রিদের মনে কখনও স্থান না পাবার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। বিশ্বাস রক্ষা করলে কনসিলিয়রি পার্থিব জগতের সমস্ত লোভনীয় উপকরণই হাতের মুঠোয় পেয়ে থাকে। অঢেল টাকা, অগাধ ক্ষমতা, দুষ্প্রাপ্য মর্যাদা-সবই সে পাবে।

ঝুঁকি যেমন আছে, তেমনি আছে নিরাপত্তার নিশ্চিত আয়োজন। তেমন দুর্ঘটনা যদি কখনও ঘটে, সে বেঁচে থাকতে তার স্ত্রী তথা পরিবার যে আরাম আয়েশ এবং সচ্ছলতার মধ্যে দিন কাটায়, সে মরে গেলেও তেমনি ভাবে বাকি জীবন কাটাতে পারবে। তার অনুপস্থিতিতে তাদের আশ্রয় এবং যত্নের মধ্যে কোন হেরফের হবে না। শর্ত একটাই: তাকে মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস রক্ষা করে চলতে হবে।

ক্ষেত্র বিশেষে প্রকাশ্যে এবং সরাসরি ডনের প্রভাব প্রয়োগ করার জন্যে, প্রতিনিধিত্ব করতে হয় কনসিলিয়রিকে, কিন্তু তাকে কোন অবস্থাতেই ব্যাপারটার সাথে জড়ানো চলে না। সেই রকম একটা উদ্দেশ্য নিয়েই প্লেনে চড়ে আজ ক্যালিফোর্নিয়া যাচ্ছে হেগেন। কনসিলিয়রি হিসেবে তার ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা নির্ভর করছে হাতের এই কাজটার সাফল্যের উপর এটুকু পরিষ্কার বুঝেছে সে। ডনের পারিবারিক ব্যবসার লাভ-লোকসানের দিক থেকে বিচার করলে ছায়াছবিটিতে জনি ফন্টেন তার শখের অভিনয় করার সুযোগ পেল কি পেল মা তাতে কিছু এসে যায় না। ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এ ব্যাপারটা নিতান্তই তুচ্ছ, কোন গুরুত্ব বহন করে না। গুরুত্বপূর্ণ হলো আগামী শুক্রবারে ভার্সিল সলোযোর সাথে আলোচনাটা। কিন্তু দুটো ব্যাপারের মধ্যে আকাশপাতাল ব্যবধান থাকলেও, ডনের কাছে একটার চেয়ে আরেকটার গুরুত্ব কোন অংশে কম নয়। এটুকু পরিষ্কার বোঝে বলেই শ্রেষ্ঠ কনসিলিয়রিদের মধ্যে একজন হবার উপযুক্ততা রয়েছে হেগেনের।

টম হেগেনের উদ্বেগ প্লেনের ঝাঁকুনিতে আরও যেন বেড়ে গেল। এয়ার, হোস্টেসকে ডেকে একটা মার্টিনি চাইল সে। প্রযোজক জ্যাক ওলটসের কথা ভাবতে চেষ্টা করছে। লোকটা কি রকম শয়তান তা বোঝাতে চেষ্টার কোন ত্রুটি করেনি জনি ফন্টেন। উনও তাকে কিছু জ্ঞান দান করেছেন। জনির মুখ থেকে সব শোনার পর তার বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে, ওলটসকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করানো তার কর্ম নয়। কিন্তু সেই সাথে এ-ও জানে যে জনিকে কথা দিয়েছেন যখন, সে কথা ডন যে কোনভাবেই হোক রক্ষা করবেন। সুতরাং, তার ঘাড়ে মধ্যস্থতা এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব চেপেছে।

ওলটসের ডোশিয়ার তৈরি হতে খুব বেশি দেরি হয়নি। ফাইলটা সাথে করে নিয়েও এসেছে হেগেন। সীটে হেলান দিয়ে সেটার উপর চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে সে এখন। প্রথম শ্রেণীর মাত্র তিনজন, প্রযোজকের মধ্যে একজন ওলটস। নিজেরই একটা স্টুডিও আছে তার। কন্ট্রাক্ট সই করিয়ে শয়ে শয়ে তারকাকে সে নিজের পকেটে ভরে রাখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সামরিক তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টাদের মধ্যে সে একজন। লোকটা প্রায়ই ডিনার খেতে যায় হোয়াইট হাউজে। হলিউডে ওর বাড়িতে অতিথি হিসেবে যারা যান তাদের মধ্যে জে এডগার হুভারের মত স্বনামধন্য ব্যক্তি রয়েছেন। শুনতে এব যতটা ডারিকী আর গুরুতপূর্ণ লাগে, আসলে ব্যাপারটা সেরকম কিছু নয়। বড় বড় লোকদের সাথে তার উঠাবসা আছে ঠিকই, কিন্তু সবই সরকারী সম্পর্ক। সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়াশীল লোক, সেজন্যেই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার প্রভাব বলতে গেলে কিছুই নেই। খুব অহঙ্কারী। উন্মাদের মত নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করতে অভ্যস্ত। ব্যাঙের ছাতার মত। অগুনতি শত্রু গজিয়ে আছে তার চারদিকে, কিন্তু সে-ব্যাপারে লোকটার কোন খেয়ালই নেই।

মনটা দমে গেল হেগেনের। পরিষ্কার বুঝতে পারছে, যুক্তিতে কান দেবার লোক ওলটস নয়। ফাইলটা রেখে দিয়ে ব্রীফকেস থেকে ব্যবসা সংক্রান্ত কাগজপত্র বের করে লেখাপড়ার কাজে মন দিল সে। কিন্তু শরীরটা বেঁকে বসতে চাইছে। খুব ধকল গেছে আজ। আরেকটা মার্টিনি চেয়ে নিল সে। সীটে হেলান দিয়ে চোখ বুজল। নিজের কথা ভাবছে।

কোন খেদ, কোন অপূর্ণতা নেই ওর জীবনে। ভাগ্যটা আশাতীত ভাল। দশ বছর আগে বেছে নেয়া এই কর্ম জীবনটা ওর উপযুক্তই হয়েছে, ওকে বিমুখ করেনি। হিসাব ধরলে সাফল্যের অনেক সিঁড়ির ধাপই সেটপকে আসতে পেরেছে। পরিণত একজন পুরুষের পক্ষে যতটা সুখী হওয়া সম্ভব, তার চেয়ে কম সুখী নয় সে। তার উপর, বর্তমান জীবনটা ওর কাছে সাংঘাতিক রোমাঞ্চকর, বড় চিত্তাকর্ষক।

দীর্ঘদেহী, আমেরিকান স্টাইলে ছোট করে ছাঁটা চুল মাথায়, ছিপের মত একহারা, টম গেহেনের বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশ। চেহারায় তেমন কোন বৈশিষ্ট্য নেই। উকিল হিসেবে তিন বছর প্র্যাকটিস করলেও, এখন আর ডনের পারিবারিক ব্যবসার আইনগত দিকটা হাতে-কলমে করতে হয় না তাকে।

সনি কর্লিয়নি আর টম হেগেন সমবয়েসী, এগারো বছর বয়সে পরস্পরের খেলার সাথী ছিল ওরা। অন্ধ হয়ে গিয়ে হেগেনের মা ছেলের দৃশ বছর পূর্ণ হতেই মারা গেল, বাপও তারপর থেকে একেবারে বেহেড মাতাল হয়ে গেল। কাঠ মিস্ত্রী নোকটা খুব খাটতে পারত। কিন্তু মদ খেয়ে লিভার পচিয়ে শেষ পর্যন্ত সে-ও মরে গেল।

এতিম টম রাস্তায় রাস্তায় নেড়ি কুকুরের মত ঘুরে বেড়ায়, রাতে লোকের বাড়ির সামনে ঘুমায়। মায়ের মত তারও চোখের ব্যারাম, সবাই রোগটাকে ছোঁয়াচে মনে করে ভয় পায়, নিজেদের ছেলেগুলোকে ওর ধারেকাছে ঘেঁষতে নিষেধ করে দেয়, কাছে পিঠে ওকে দেখলে দূর হ দূর হ করে ঝাড়ু, হাতে ছুটে আসে।

সনি কর্লিয়নি সেই এগারো বছর বয়সেই দারুণ একগুঁয়ে, বন্ধুর দুর্দশা দেখে মনে তার অদ্ভুত করুণার উদ্রেক হলো। একদিন তাকে সাথে করে বাড়িতে নিয়ে এসে আবদার জুড়ে দিল সে, এ-বাড়িতেই ওর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এক পেয়ালা টমেটো সসের গরম স্প্যাগেটি আনা হলো টমের সামনে। সেই স্প্যাগেটির স্বাদ চিরকাল জিভে লেগে থাকবে তার।

ছেলের আবদার সম্পর্কে হা-না কিছুই বলেননি ডন কর্লিয়নি। টমকেও কিছু বলেননি। তাঁর মৌনতা লক্ষ করে সবাই বুঝে নিল, টম হেগেনকে আশ্রয় দিতে তার কোন আপত্তি নেই। তারপর তিনি নিজেই তাকে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গিয়ে চোখের অসুখটা সারালেন, ভর্তি করে দিলেন স্কুলে। টম তার ছেলেদের সাথেই বড় হতে লাগল। একদিন সে কলেজে ভর্তি হয়ে আইন,পড়তে শুরু করল।

ডন কর্লিয়নির আচরণে কোনদিনই টমের প্রতি স্নেহের কোন প্রকাশ ছিল না। টমের বাবার স্থান দখল না করে তিনি অভিভাবকের ভূমিকা নিয়েছিলেন। স্নেহ ভালবাসার প্রকাশ ছিল না, কিন্তু তিনি তাঁর ছেলেদের চেয়ে তাকেই বেশি সৌজন্য দেখাতেন, এবং কোন সময়ই শাসন করতেন না। টমের কোন সিদ্ধান্ত কখনও তিনি বাতিল করেননি। আইন পড়ার সিদ্ধান্তটা টমের নিজেরই। তবে, ডন একবার কাকে যেন বলেছিলেন অস্ত্রধারী একদল ডাকাতের চেয়ে ব্রীফকেসধারী একজন মাত্র উকিল অনেক বেশি টাকা লুট করতে পারে। কথাটা ভোলেনি টম হেগেন।

ওদিকে সনি আর ফ্রেডির পড়াশোনা বেশিদূর এগোল না। হাই স্কুল থেকে বেরিয়েই পারিবারিক ব্যবসায় ঢুকে পড়ল দুজন। কিন্তু মাইক কলেজে পড়তে গেল। এরপরই ঘটল পার্ল হারবারের দুর্ঘটনা, অমনি কলেজ ছেড়ে মেরিনসে নাম লেখাল সে।

আইন পড়া শেষ করে বিয়ে করল হেগেন। ইতালিরই মেয়ে, নিউ জার্সিতে থাকে, সে-ও গ্র্যাজুয়েট,-বেশ হাসিখুশি টাইপের মেয়ে। বিয়েটা ডন কর্লিয়নির বাড়িতেই হলো। ডন বললেন, এখন টম যেখানে ইচ্ছা নিজের ব্যবসা দাঁড় করাবার চেষ্টা করতে পারে, উনি তাকে সাহায্য করবেন, মক্কেল যোগাড় করে দেবেন, অফিস গোছগাছ করে দেবেন।

আমি আপনার কোন কাজে লাগতে চাই, অবনত মস্তকে মৃদু কণ্ঠে নিজের আন্তরিক ইচ্ছা জানিয়েছিল হেগেন।

অবাক হলেন ডন। খুশিও কম হৃলেন না। কিন্তু প্রশ্ন করলেন, তুমি জানো, আমি কি?

মাখাটা একদিকে কাত করে হেগেন বোঝাতে চেষ্টা করল, সে জানে।

আসলে ডন কর্লিয়নির ক্ষমতার পরিধি সম্পর্কে তখনও কিছু জানা ছিল না হেগেনের। তারপর আরও দশ বছর কাটল, এই দীর্ঘ সময়েও সবটুকু জানা সম্ভব হয়নি। গেনকো আবানদণ্ডা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে অস্থায়ীভাবে কনসিলিয়রির পদে নির্বাচিত করা হলো, এরপরই সে গোটা পরিধিটা আঁচ করতে পারল।

অতি ক্ষুদ্র, অতি নগণ্য অবস্থা থেকে মহাপুরুষের মহিমা অর্জন করার মূলে যে ক্ষমতার দরকার, মানুষের মন বোঝার সেই অদ্ভুত ক্ষমতা আছে ডন কর্লিয়নির। সেই ক্ষমতার সাহায্যে টম হেগেনের মন জেনে নিতে পেরেছিলেন তিনি। এবং সেই প্রথম হেগেনকে তিনি বাপের মত অকুণ্ঠচিত্তে স্নেহ করলেন, তাকে দুহাত দিয়ে টেনে নিজের বুকের মধ্যে আনলেন। এরপর থেকেই তিনি ওর সাথে এমন ব্যবহার করতে শুরু করলেন, বাইরে থেকে দেখে বোঝাই যেত না যে হেগেন তাঁর সন্তান নন।

কিন্তু প্রায়ই তিনি টমকে মনে করিয়ে দিয়ে বলতেন, দেখো টম, বাপ-মায়ের চেয়ে কেউ বড় নয়। ওদের কথা কখনও ভুলে যেয়ো না। আসলে শুধু টমকে নয়, কথাটা তিনি নিজেকেও মনে করিয়ে দিতেন।

ডনের নির্দেশে পারিবারিক ব্যবসা সংক্রান্ত কাজ কর্ম দেখাশোনা করার মধ্যেই তিনটে বছর আইন-ব্যবসা চালাল হেগেন। আইন-ব্যবসার এই অভিজ্ঞতা পরে খুব কাজে দেয়। এলাকার সবচেয়ে বিখ্যাত ফৌজদারী উকিলদের প্রতিষ্ঠানে ডনের কিছু প্রভাব থাকায় এরপর সেখানে দুবছর প্রশিক্ষণ নিতেও কোন অসুবিধে হয়নি টমের।

কিছুদিনের মধ্যেই জানা গেল, আইনের বিশেষ এই দিকে হেগেন একটা প্রতিভা। কর্লিয়নিদের পারিবারিক ব্যবসার একজন ফুল-টাইম কর্মচারী হবার পর থেকে ছয় বছরের মধ্যে আইনগত ব্যাপারে তার উপর অসন্তুষ্ট বা বিরক্ত হবার কোন কারণ দেখতে পাননি ডন কর্লিয়নি।

হেগেনকে অস্থায়ীভাবে কনসিলিয়রির পদে নিযুক্ত করায় প্রভাবশালী সিসিলীয় পরিবারগুলো কর্লিয়নিদের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রকাশ করতে কসুর করেনি। আইরিশ দঙ্গল এই নাম রেখেছে সবাই কর্লিয়নিদেয়। কথাটা মনে পড়লেই হাসি পায় হেগেনের। কিন্তু সেই সাথে এটাও হৃদয়ঙ্গম করে যে ডন কর্লিয়নির অবর্তমানে এই পরিবারের ব্যবসার উপর কর্তৃত্ব করার আশা তার না রাখাই ভাল।

কিন্তু তবু টম হেগেন অসন্তুষ্ট নয়। ডন কর্লিয়নিকে ভালবাসে সে, ভালবাসে ডনের স্ত্রীকে, ভালবাসে ডনের ছেলে-মেয়েদের-গোটা পরিবারের সাথেই ওর ভালবাসার সম্পর্ক। এই পরিবারের ঋণ রক্ত দিয়ে, প্রাণ দিয়ে কোন ভাবেই শোধ করার নয়। সেজন্যে নিজেকে কখনও লাগাম ছাড়া উচ্চাশার শিকার হতে দেয় না সে, দেবে না কখমও। সে ধরনের উচ্চাশা পোষণ করার একটাই অর্থ হয়: পরম উপকারীর অসম্মান করা। জীবন থাকতে তা করতে পারবে না টম হেগেন।

.

লস অ্যাঞ্জেলসে যখন পৌঁছল হেগেন, ভোর হয়নি তখনও। হোটেলে শাওয়ার সারুল সে, শেভ করল। জানালার সামনে একটা চেয়ারে বসে গুটি গুটি পায়ে কিভাবে তোর আসে তাই দেখছে। খানিক পর ব্রেকফাস্ট আর সংবাদপত্রের অর্ডার দিয়ে বিছানায় শুলো একটু আরাম করার জন্যে।

আগের দিনই ডনের নির্দেশে ফোন করেছিল সে বিলি গফ নামে এক লোককে। চলচ্চিত্র শ্রমিক সংঘে খুবই প্রভাব আছে বিলি গফের। জ্যাক ওলটসের সাথে হেগেনের দেখা করার ব্যবস্থা এই লোকই করেছে। ওলটসকে বিলি গফ আভাস ইঙ্গিতে জানিয়ে দিতে ভুল করেনি যে হেগেনকে অসন্তুষ্ট করলে স্টুডিওর শ্রমিকরা বিনা নোটিশে ধর্মঘটের ডাক দিয়ে বসতে পারে।

এক ঘণ্টা পর ফোন পেয়েছিল হেগেন। বিলি গফ তাকে জানিয়েছে আজ বেলা দশটার সময় তার সাথে দেখা করতে রাজি হয়েছে ওলটস। কিন্তু বিলি গফ হেগেনকে একথাও বলেছে, ধর্মঘটের হুমকিটাকে বিশেষ পাত্তা দেয়নি ওলটস। স্টুডিওতে শেষ পর্যন্ত যদি গোলমাল পাকাতেই হয়, তার আগে দুটো কথা বলে নেব আমি ডনের সাথে।

কোনরকম প্রতিশ্রুতি দেয়া এড়িয়ে যাওয়ার জন্যে হেগেন তাকে বলেছে, সেক্ষেত্রে ডনও কথা বলতে চাইবেন।

কর্লিয়নিদের ক্ষমতা নিউ ইয়র্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও শ্রমিক নেতাদের সাথে নিজস্ব পদ্ধতিতে যোগাযোগ করে নিউ ইয়র্কের বাইরেও ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছেন ডন কর্লিয়নি। এটুকু জানা আছে বলেই ডনের ইচ্ছাটাকে গফু এত বেশি মর্যাদা দিচ্ছে দেখে আশ্চর্য হয়নি হেগেন। অন্যান্য শ্রমিক নেতাদের মত বিলি গফও ডনের কাছে কোন না কোনভাবে ঋণী, এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

কিন্তু বেলা দশটায় সাক্ষাৎ! লক্ষণটা ভাল লাগছে না হেগেনের। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, সবার আগে তার সাথে দেখা করবে ওলটস অর্থাৎ তাকে লাঞ্চ খাওয়াবার কোন ইচ্ছা ওর নেই। তার মানে গফ যথেষ্ট ভয় দেখায়নি, তাই তাকে যথেষ্ট মূল্য দিচ্ছে না ওলটস। বলা যায় না; গফ হয়তো ওর কাছ থেকে ঘুষ খায়।

একটু ক্ষোভ দেখা দিল হেগেনের মনে। ডনের এই একটা অভ্যাস, সব সময় নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে সরিয়ে রাখা। এতে পারিবারিক ব্যবসার ক্ষতি হয়। বাইরের লোক তাকে চেনে না, তার ক্ষমতা সম্পর্কে জানার সুযোগ পায় না। ফলে ডনের কোন গুরুত্বই দেয় না অজ্ঞরা। ( ঠিক সময়ে পৌঁছল হেগেন। সীটিং রূমটা বিলাসবহুল আসবাব পত্রে সাজানো। মখমলের গদি দিয়ে মোড়া চেয়ার। আরাম করে বসে আছে হেগেন। ওর বিশ্লেষণটাই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। প্রায় আধঘণ্টা হয়ে গেছে, অথচ এখনও ওলটসের খাস কামরা থেকে ডাক আসেনি।

সামনের একটা সোফায় স্বল্পবয়েসী একটা মেয়ে বসে আছে। বড়জোর বারো, তার বেশি বয়স হবে না। মেয়েটা পরমাসুন্দরী। অতটুকুন মেয়ে, কিন্তু মূল্যবান সাজসজ্জায় বয়স্কা মহিলার মত দেখাচ্ছে তাকে। সোনালী আঁশের মত চকচক করছে মাথার চুল, টানা দুটো চোখে আশ্চর্য এক মায়াবী গভীরতা, তাজা রাস্পবেরীর মত ঠোঁট। সাথের হাফ-বুড়িটা মেয়েটাকে আগলে রেখেছে। নিশ্চয়ই মা হবে, ভাবল হেগেন। মহিলা বারবার কটমট করে তাকাচ্ছে হেগেনের দিকে। হেগেনের অপরাধ, মাঝে মাঝেই মেয়েটার দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।

দামী পোশাক পরা এক মোটা মহিলা এসে উদ্ধার করল হেগেনকে। অনেকগুলো অফিস কামরার ভিতর দিয়ে পথ দেখিয়ে তাকে নিয়ে যাচ্ছে সে। কামরাগুলোয় আশ্চর্য সুন্দরী সব মেয়েরা কাজ করছে দেখে আপন মনে একটু হাসল হেগেন। এরা সবাই বুদ্ধিমতী মেয়ে, চলচ্চিত্র অফিসে কেরানীর চাকরি করাটা এদের কারুরই উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য অভিনয় করার সুযোগ বের করে নেয়া। চাকচিক্যের এই জগতটায় ঢোকার কৌশল হিসাবে চাকরি নিয়েছে এরা। দুঃখ বোধ করল হেগেন। কেননা, ওরা জানে না ওদের বেশির ভাগেরই বাকি জীবনটা এই কেরানীর চাকরি করেই কেটে যাবে, অভিনয় করার সুযোগ আসবে না।

জ্যাক ওলটস দীর্ঘদেহী, শক্তসমর্থ, ভুড়িটা বিরাট হলেও সুটটা এমন নিখুঁতভাবে তৈরি করা যে সেটাকে প্রায় ঢেকেই রেখেছে। ওলটসের অতীত ইতিহাস কিছুই অজানা নেই হেগেনের। খুব ছোটবেলা থেকে রোজগার করছে সে। দশ বছর বয়সে ঠেলাগাড়ি আর খালি মদের পিপে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গড়িয়ে নিয়ে যেত বাপের একটা পোশাক তৈরির দোকান ছিল, বিশ বছর বয়সে সেই দোকানের কর্মচারীদের উপর অত্যাচার আর শোষণ চালাত। ফাইভ সেন্ট থিয়েটারে টাকা খাটাতে শুরু করে ত্রিশ বছর বয়সে। তার বয়স যখন আটচল্লিশ, হলিউডের রথী মহারথীদের মধ্যে অন্যতম একজন হয়ে উঠেছে সে। বড় হয়েছে, কিন্তু স্বভাব আগের মতই আছে। এখনও সে কামাতুর, কর্কশভাষী, হিংস্র নেকড়ের মত হবু তারকাদের ওপর অত্যাচার চালায়

নিজেকে গড়ে পিটে নিতে অবশ্য ভুল করেনি লোকটা। মার্জিত ভাষায় কথা বলতেও শিখেছে, সাজ-পোশাক কিভাবে করতে হয় তাও একজন ইংরেজ ভ্যালের কাছ থেকে শিখে নিয়েছে, আরেকজন ইংরেজ বাটলারের কাছ থেকে জেনে নিয়েছে সামাজিক আচরণের নিয়ম-কানুন। প্রথমা স্ত্রী গত হবার পর পৃথিবী বিখ্যাত সুন্দরী আরেক মেয়েকে বিয়ে করেছে সে। ওলটস এখন ষাট বছরের বুড়ো। এখন তার শখ একালের বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা ছবি সংগ্রহ করা। বর্তমানে সে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য। চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নতির জন্যে একটা স্থায়ী তহবিল গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে নিজেই সে কয়েক কোটি ডলার চাঁদ দিয়ে বিস্তর সুনাম এবং প্রচুর হাততালি কুড়িয়েছে। ওর মেয়েকে বিয়ে করেছে এক ইংরেজ লর্ড। আর ছেলেটা বিয়ে করেছে এক ইটালিয়ান রাজকুমারীকে।

মার্কিন মুলুকের সমস্ত সিনে-ম্যাগাজিনগুলোর রিপোর্টারদের মতে ওলটসের সবচেয়ে শখের বস্তু হলো তার ঘোড়ার আস্তাবল। তার ঘোড়াগুলো দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হয়। গত বছর এই ঘোড়ার পিছনেই সে নাকি খরচ করেছে দশ লক্ষ ডলার। এই তো কিছুদিন আগে ছয় লক্ষ ডলার দিয়ে নামকরা ইংলিশ রেসিং ঘোড়া খার্তুম-কে কিনল। কিনেই সে ঘোষণা করল, খার্তুম আর দৌড়াবে না, আস্তাবলের শোভা বর্ধন করবে। তাজ্জব বনে গিয়েছিল সবাই, দৈনিক সব সংবাদপত্রে বড় বড় হেডিংয়ে বেরিয়েছিল খবরটা।

হেগেনকে অভ্যর্থনা জানাবার সময় ভদ্রতার কার্পণ্য দেখাল না সে। চাঁছাছোলা, ক্লীন-শেভ মুখ, হঠাৎ সেটা বিকৃত হয়ে উঠল-হেগেনকে বুঝে নিতে হলো, এই ভেংচিটাই ওলটসের হাসি। সাংঘাতিক আরামে আছে, ওর শরীর এবং চেহারার যত্ন নেয়বিশেষজ্ঞেরা, তাতেও বয়স লুকিয়ে রাখতে পারেনি। সেলাই করে একসঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে মুখের পেশীগুলো, মনে হলো হেগেনের। তবে, নড়াচড়ার মধ্যে অদ্ভুত এক প্রাণশক্তির প্রাচুর্য টের পাওয়া যাচ্ছে। প্রভুত্ব করার সহজাত গুণ রয়েছে লোকটার মধ্যে, পরিবেশটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে সেই।

ভূমিকা না করে কাজের কথা পাড়ল হেগেন। জানাল, জনি ফন্টেনের তরফ থেকে নয়, তার এক বিশিষ্ট বন্ধুর প্রতিনিধিত্ব করছে সে। প্রসঙ্গক্রমে জানাল, জনি ফন্টেনের এই বন্ধুটি প্রচণ্ড প্রভাব এবং ক্ষমতাশালী মানুষ, এবং মি, ওলটস যদি তার ছোট্ট একটা উপকার করেন, তিনি কৃতজ্ঞ বোধ করবেন এবং কৃতজ্ঞতার নিদর্শন, স্বরূপ চিরস্থায়ী বন্ধ হবার প্রতিশ্রুতি দেকেন। উপকারটি কি? নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিল হেগেন, মি. ওলটসের স্টুডিওতে একটা যুদ্ধের ছবি শুরু হবে আগামী হপ্তায়, তাতে একটা বিশেষ ভূমিকা দিতে হবে জনি ফন্টেনকে।

কোন ভাবান্তর নেই ওলটসের চেহারায়। হাসি হাসি, ভদ্র ভাব মুখে। তার কথার মধ্যে কৌতুকের সুর, সেই সাথে একটু প্রশ্রয় দেয়ার ভাব ফুটে উঠল। তার প্রচণ্ড ক্ষমতা এবং প্রভাব আমার কি উপকারে আসবে?.

এই ধরুন, সবিনয়ে জানাল হেগেন, আপনার স্টুডিওতে শ্রমিকরা গোলমাল বাধালে আমার বন্ধু কথা দিচ্ছেন, সেটা তিনি মিটিয়ে দেবেন। তারপর, খুব নামকরা আপনাদের একজন নায়ক, ইদানীং মারিজুয়ানা ছেড়ে হেরোইন ধরেছে আমার বন্ধু কথা দিচ্ছেন, কোনভাবেই সে আর হেরোইন যোগাড় করতে পারবে না। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতেও যে কোন ছোটখাটো সমস্যা দেখা দিলে আপনি যদি শুধু একটা ফোন করে জানান, সাথে সাথে সব মিটে যাবে।

ছোট ছেলের বড়াই করা শুনছে, এই রকম একটা হাসি হাসি ভাব নিয়ে হেগেনের কথা শুনল ওলটস। কিন্তু কণ্ঠস্বর রূঢ় শোনাল, আমাকে ভয় দেখাচ্ছ নাকি?

সবিনয়ে বলল হেগেন, ছি-ছি, এ আপনি কি বলছেন। আমার বন্ধু আপনার কাছ থেকে অনুগ্রহ ভিক্ষা চান। আমার মাধ্যমে তিনি আপনাকে জানাচ্ছেন, ভিক্ষাটা দিলে আপনার কোন ক্ষতি হবে না, উপকার হবে।

রাগে মুখটা কালচে হয়ে উঠল ওলটসের। ভুরুজৈাড়া কুঁচকে নেমে এল নিচে, জ্বলজ্বলে চোখের উপর ঘন, কালো, পুরু একটা রেখার মত দেখাচ্ছে সেটাকে। ডেস্কের উপর, হেগেনের দিকে ঝুঁকে পড়ল সে, একটা গাল দিয়ে বলল, বেকুব। তোমার বন্ধু বা মনিব, যেই হোক সে, তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দাওগে, আমি বেঁচে থাকতে অভিনয় করা তো দুরের কথা, ছবিটায় জনি ফন্টেন ছায়া পর্যন্ত ফেলার সুযোগ পাবে না। অসভ্য, জংলী মাফিয়া গুণ্ডাদেরকে আমি ডরাই না। চেয়ারের একদিকের হাতলে কনুই রেখে শরীরের ভর চাপাল সে, ঠোঁট বাঁকা করে হাসল, বলল, একেবারে খালি হাতে ফিরে যাও তা চাই না, সাথে করে একটু জ্ঞানও নিয়ে যাও–এডগার ভার, ব্যঙ্গের হাসিটা আরও বিত্তত হলো মুখে, আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন। তার কানে যদি যায় যে তোমরা আমাকে বিরক্ত করছ, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা করে ছাড়বে সে তোমাদের।

বাইরে শান্ত দেখালেও মনে মনে রীতিমত বিস্ময়বোধ করছে হেগেন। এ কেমন বোকা লোক, যে নিজের বিপদ টের পায় না? এই হাঁদা কোটি কোটি টাকার একটা ব্যবসার মালিক হলো কিভাবে? ভাবনার খোরাক রয়েছে এর মধ্যে। নতুন ব্যবসা খুঁজছেন ডন, চলচ্চিত্রে টাকা খাটালেই তো হয়। এই সব গাধারা যদি ওখান থেকে আয় করতে পারে, ডনের যা বুদ্ধি, তিনি তো চোখ বুজে লুটপাট করবেন। ওলটসের গালি-গালাজ গায়ে মাখল না হেগেন। কাজ-কারবারে সব কিছু গায়ে না মেখে মাথা ঠাণ্ডা রাখাটাই সাফল্যের মূল কথা, এ মন্ত্র স্বয়ং ডন তাকে শিখিয়েছেন। ডন বলেন, না, রাগ দেখাবে না। ভয় তো দেখাবেই না। শুধু যুক্তি দিয়ে বোঝাবে। অপমান বা ভীতি-প্রদর্শন গ্রাহ্য করতে নিষেধ করেন ডন। মহান যীশুর পথ অবলম্বন করার পরামর্শ দেন তিনি। একবারের একটা ঘটনার কথা কখনও ভুলবে না হেগেন। কুখ্যাত, আত্মম্ভরি মরণ বাড় বেড়ে ওঠা এক গুণ্ডার সাথে আলোচনায় বসেছেন ডন। লোকটা নানাভাবে অপমান করছিল ডনকে। তিনি হাসি মুখে সব সহ্য করছিলেন। লোকটা যাতে তার স্বভাব বদলায় তার জন্যে শান্তভাবে যুক্তি দিয়ে বোঝাচ্ছিলেন তাকে। এক দুঘণ্টা নয়, ঝাড়া আট ঘণ্টা ধরে এই চলল। শেষ পর্যন্ত হতাশার ভাব ফুটে উঠল ডনের চেহারায়। আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হাত দুটো শূন্যে তুলে আর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, বোঝা গেল, এ লোকের সাথে যুক্তি চলে না। কথা শেষ করে দ্রুত কামরা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সাথে সাথে দূত পাঠিয়ে তখুনি ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল ডনকে। সমস্যার সমাধানও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দুমাস পর লোকটাকে তার পাওনা ঠিকই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ডন। নাপিতের দোকানে ঢুকে কে যেন গুলি করে মেরে ফেলেছিল লোকটাকে।

ডনের শিক্ষার কথা মনে রেখে হেগেন তাই আবার নতুন করে শুরু করল, আমার কার্ড তো আপনি দেখেছেন, আমি একজন উকিল, তাই না? নিজেকে বিপন্ন করার মত কাজ আমি কিভাবে করি, বলুন? আচ্ছা, আপনাকে ভয় দেখাবার মত একটা কথাও কি বলেছি আমি? আমরা আপনার সব শর্ত মেনে নেব, আপনার সব, কথায় আমরা রাজি, এতসবের বিনিময়ে ছোট একটা অনুরোধ যদি রাখেন, আমরা ধন্য হয়ে যাব। বিশ্বাস করুন, তাতে আপনারও মস্ত লাভ। সামান্য একটা দানের বিনিময়ে আপনার যাতে প্রচুর লাভ হয় সেজন্যে ইতিমধ্যেই অনেকগুলো লোভনীয় প্রস্তাব দেয়া হয়েছে আপনাকে। একটু বিরতি নিয়ে সবিনয়ে হাসল হেগেন, তারপর আবার বলল, জনিকে আপনি নিজেই বলেছেন ওই ভূমিকায় তাকেই সবচেয়ে ভাল মানায়। আপনি যদি মনে করতেন, জনিকে মানাবে না, তাহলে অনুরোধটা করাই ইত না আপনাকে পুঁজির অভাব থাকলে, তাও আমার মক্কেল যোগান দিতে রাজি আছেন। ওলটস কিছু বলতে যাচ্ছে দেখে হাত তুলে তাকে থামাল, বলল, সব কথা আমাকে খুলে বলতে দিন, প্লীজ। ধরে নিচ্ছি, একবার যখন না বলেছেন, এরপর প্রতিবারই না বলবেন আপনি, এটাই আপনার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। এ কথা তো ঠিক, আপনার ওপর জোর খাটাবার অধিকার কারও নেই, সে চেষ্টা কেউ করছেও না মি. হতার যে আপনার ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধু, তাও আমরা জানি। এবং বিশ্বাস করুন, এই সম্পর্কটার জন্যে আমার মনিব শ্রদ্ধাও করেন আপনাকে। বরাবর তিনি এ ধরনের সম্পর্কের মূল্য দিয়ে থাকেন।

লাল পালকের ঝুঁটিওয়ালা কলম দিয়ে কাগজে হিজিবিজি কাটছে ওলটস। টাকার কথা শুনে চোখের কোণে ঝিলিক দিয়ে উঠল কৌতূহল। থেমে গেছে হাতটা। বলল, ছবিটা করতে কত টাকা লাগবে জানো? পঞ্চাশ লক্ষ ডলার।

আঁতকে ওঠার কৃত্রিম ভান করল হেগেন। তারপর খুব নরম সুরে বলল, আমার মনিবের অনেক জাদরেল বন্ধু আছে, তারা ওঁর কথায় মরে ওর কথায় বাঁচে।

এই প্রথম গোটা ব্যাপারটা গুরুত্বের সাথে নিল ওলটস। হেগেনের কার্ডটা আরেকবার ভাল করে দেখল সে। না, এর আগে তোমার নামই শুনিনি আমি। নিউ ইয়র্কে যারা নাম করা উকিল তাদের সবাইকে চিনি আমি। তুমি কোন চুলো থেকে এসেছ শুনি?

নিউ ইয়র্কের অভিজাত আইন-উপদেষ্টা সংস্থাগুলোর একটা আমার, মৃদু গলায় বলল হেগেন। উঠি তাহলে।

করমর্দন সেরে দরজার দিকে রওনা দিল হেগেন, দুপা এগিয়ে ঘুরে দাঁড়াল আবার, বলল, এমন সব লোকের সাথে চলাফেরা করেন আপনি যারা নিজেদেরকে অনেক বড় করে জাহির করে। আমার বেলা কিন্তু তার উল্টোটি ঘটছে। ইচ্ছা করলেই খোঁজ নিয়ে এ ব্যাপারে আপনি সব জানতে পারবেন। মত-যদি বদলায়, হোটেলে ফোন করতে ভুলবেন না। একটু থেমে আবার বলল, শুনে হয়তো আপনার মনে হবে পবিত্র একটা ব্যাপার নিয়ে ঠাট্টা করছি, কিন্তু কথাটার মধ্যে এতটুকু অতিরঞ্জন নেই–আমি যার প্রতিনিধিত্ব করছি তিনি এমন অনেক কাজও করে দিতে পারেন যা খোদ মি. হুভারেরও সাধ্যের অতীত।

ওলটসের চোখ দুটো ছোট হয়ে আসছে দেখে হেগেন ভাবল, এতক্ষণে বোধহয় টনক নড়ছে। যথাসম্ভব তোষামোদের সুরে বলল, আরে, বলতে ভুলেই গেছি…আমার মনিব বলে পাঠিয়েছেন, আপনার তৈরি ছবিগুলো সব সত্যি অপূর্ব, প্রশংসা না করে পারা যায় না। এসব ভাল কাজ, আশা করি চালিয়ে যেতে পারবেন। দেশে এসবের দরকার আছে।

সেদিনই সন্ধ্যায় ওলটসের সেক্রেটারি ফোন করল হেগেনকে জানাল, এক ঘণ্টা পর একটা গাড়ি তুলে নেবে হেগেনকে, শহরের বাইরে ওলটসের বাড়িতে তার জন্যে ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে। মাত্র ঘণ্টা তিনেকের পথ, পানীয় বা নাস্তার জন্যে বার আছে গাড়িতেই, সুতরাং কোন অসুবিধে হবে না।

কিন্তু হেগেন ভাবছে অন্য কথা। নিজের প্লেনে আসা যাওয়া করে ওলটস, আজ প্লেন বাদ দিয়ে গাড়ি কেন?

হেগেনের চিন্তায় বাধা দিয়ে সেক্রেটারি আবার বলল, টুকটাক দরকারী জিনিস, সাথে নিতে পারেন, রাতটা ইচ্ছে করলে ওখানে কাটাতে পারবেন অনায়াসে, কাল সকালে মি. ওলটস আপনাকে এয়ারপোের্ট পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করবেন।

ঠিক আছে, বলল বটে হেগেন, কিন্তু সেক্রেটারির শেষ কথাটায় ভাবনার আরেকটা খোরাক পেয়ে গেল সে। কাল সকালের প্লেনে নিউ ইয়র্কে ফিরবে সে, এ কথা জানল কিভাবে ওলটস? এর একমাত্র সম্ভাব্য ব্যাখ্য হলো, ওর পিছনে টিকটিকি লাগিয়েছে ওলটসে। তাই যদি হয়ে থাকে, সে যে ডনের প্রতিনিধি এ কথাও নিশ্চয় জানা হয়ে গেছে ওলটসের। এবার যদি কাজ হয়, ভাবল হেগেন, তবে ডনকে যদি ওলটস প্রাপ্য গুরুত্ব দিতে ভুল না করে, তবেই।

প্রাসাদোপম বাড়ি ওলটসের। বাড়ির চারদিকে প্রশস্ত মাঠ, তাতে ঘোড়া দৌড়ায়, তাই কালো মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। বিশাল একটা ঘাস-জমি লালন করা হচ্ছে ঘোড়া চরাবার জন্যে। চিত্রতারকারা যত্ন করে যেভাবে তাদের নখ পরিষ্কার রাখে ওলটসের কর্মচারীরা, সেভাবে পরিষ্কার করে রেখেছে বাড়ি, বাগান, লতা ঝোঁপ, মাঠ এবং রাস্তাটা।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটা কাঁচ মোড়া বারান্দায় হেগেনকে অভ্যর্থনা জানাল ওলটস। বুক ভোলা নীল রঙের রেশমী শার্ট, হলুদাভ সবুজ রঙের স্ন্যাকস এবং কোমল চামড়ার স্যান্ডেল পরে রয়েছে সে। দামী এবং রঙচঙে পোশাক তার কর্কশ চেহারার সাথে বেমানান লাগছে। হেগেনকে এক গ্লাস মার্টিনি দিয়ে নিজেও ট্রে থেকে একটা তুলে নিল সে। চেহারা এবং আচরণে আগের চেয়ে অনেক বেশি সহনশীলতার ছাপ লক্ষ করার মত। হেগেনের কাঁধে একটা হাত তুলে দিয়ে বলল সে, ডিনারে বসার আগে চলো আমার ঘোড়াগুলো দেখে আসি।

আস্তাবলের দিকে রওনা হলো ওরা। তোমার সম্পর্কে খবর নিয়েছি, বুঝলে? তুমি ডন কর্লিয়নির প্রতিনিধিত্ব করছ একথা আমাকে আগে বলা উচিত ছিল। আমাকে ধাপ্পা দেবার জন্যে থার্ড ক্লাস একজন গুণ্ডাকে পাঠিয়েছে জনি, এই ভেবে নিয়েছিলাম আমি। কি জানো, ধাপ্পাবাজিতে বিশ্বাস নেই আমার। তা সে যাই হোক, ডিনারের পর কাজের কথা হবে।

মেহমানকে আনন্দ দানের মনোবৃত্তি এবং আয়োজন, কোনটারই অভাব নেই ওলটসের। গোটা আমেরিকায় তার আস্তাবলটা যাতে সবচেয়ে নামকরা এবং অত্যাধুনিক হয়ে ওঠে সেজন্যে কি সব নতুন পদ্ধতি এবং ব্যবস্থাপনা কাজে লাগিয়েছে তার একটা ফিরিস্তি দিল সে। প্রতিটি আস্তাবল ফায়ার-ফ, পয়ঃপ্রণালী, পানি নিষ্কাশন এবং স্বাস্থ্য রক্ষা ব্যবস্থা ত্রুটিহীন। একটা ইনভেষ্টিগেশন কার্ম ঘোড়া এবং আস্তাবলগুলোকে পাহারা দেয়। সবশেষে হেগেনকে ওলটস একটা স্টলে নিয়ে গেল, সেটার দেয়ালে প্রকাণ্ড একটা তামার ফলক ঝুলছে, তাতে ওলটসের প্রিয় ঘোড়ার নাম লেখা, খাম।

ঘোড়া সম্পর্কে কিছু না জানলেও খামকে দেখে মুগ্ধ হলো হেগেন। গায়ের রঙটা চকচকে কালো। কপালে সাদা একটা রুহিতন আঁকা। সোনার তৈরি আপেলের মত চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। রেসের সবচেয়ে দামী ঘোড়া, গর্বের সাথে বলল ওলটস। রাশিয়ার জাররাও ঘোড়ার পিছনে এত টাকা কখনও খরচ করেনি, ছয় লাখ ডলার দিয়ে কিনেছি ওকে আমি। কিন্তু ওকে রেসের মাঠে নিয়ে যাব না। বাচ্চা পয়দার কাজে লাগাব। আস্তাবলটাকে আমি এমন ভাবে গড়ে তুলব, দেশের লোকের যেন তাক লেগে যায়। হেগেনের দিকে ফিরে বলল, পঞ্চাশ পেরোবার পর প্রথম ষোড়ায় চড়তে শিখি আমি, কিন্তু সবাই আমাকে একজন ওস্তাদ ঘোড়সওয়ার বলে জানে। চোখ মটকে হাসল সে, বলা যায় না, কোন কসাক হয়তো আমার দাদী বা নানীকে ধর্ষণ করেছিল রাশিয়ায়, সেই শালার রক্ত রয়েছে আমার গায়ে। প্রিয় ঘোড়র পেটে সুড়সুড়ি দিচ্ছে সে। ব্যাটার যন্ত্রটা দেখেছ? আমারটা যদি ওর মত হত!

একজন বাটলার এবং তিনজন ওয়েইটার পরিবেশন করল ডিনার। প্লেট, কাঁটা চামচ সব রূপোর। খাওয়া শেষ করে দুটো চুরুট ধরাল ওরা। কাজটা তাহলে পাচ্ছে না জনি? প্রশ্ন করল হেগেন।

সম্ভব হলো না। কন্ট্রাক্ট সই হয়ে গেছে সব, আজ বাদে কাল থেকে শুটিং শুরু হবে। এখন আর কোনমতে, সভব নয়।

আপনার ইচ্ছার ওপর জোর নেই, বলল হেগেন। চুরুটে ঘন ঘন টান দিয়ে ধোয়া ছাড়ল সে। আমার মনিবকে বলব এ কথা। নাকি অন্য কিছু ভাবছেন আপনি?

শ্রমিকরা একটু গোলমাল করবে, বুঝতে পারছি। প্রতি বছর এক লাখ ডলার ঘুষ খায়, অথচ এ-বিষয়ে আভাস দিতে সাহস পেল গফ ব্যাটা। কি জানো, ছবি তৈরির টাকার জন্যে কারও কাছে হাত পাততে হচ্ছে না আমাকে, যথেষ্ট আছে আমার। তোমার বসকে বলল, তার অন্য যেকোন অনুরোধ রাখতে চেষ্টা করব। জনি ফন্টেনকে দুচোখে দেখতে পারি না আমি।

হেগেন ভাবছে, নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে হারামজাদার, তা নাহলে এতদূর টেনে নিয়ে আসত না তাকে। ঠাণ্ডা গলায় বলল সে, মনে হচ্ছে অবস্থাটা বোঝেননি আপনি। মি. কর্লিয়নির সাথে জনির সম্পর্কের মধ্যে আশ্চর্য একটা পবিত্রতা রয়েছে, তিনি ওর ধর্মপিতা। ধর্মের প্রসঙ্গ উঠতে শ্রদ্ধায় মাথা নিচু করল ওলটস। আপনাকে জানানো কর্তব্য বলে মনে করছি, আমার মালিকের মনটা খুবই স্পর্শকাতর, দ্বিতীয়বার কোন অনুরোধ করার আগে তিনি স্মরণ করেন তাঁর প্রথম অনুরোধটা রক্ষা করা হয়েছিল কিনা।

কাঁধ ঝাঁকাল ওলটস। সত্যি, খুবই দুঃখিত। উপায় নেই, তাই কিছু করতে পারলাম না। কিন্তু তুমি যখন সামনে রয়েছ, এসো না, সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষের ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলি। কত টাকা? ক্যাশ দেব। এখুনি।

ডনকে তোয়াক্কা করছে না ওলটস, জনিকে সুযোগ না দেবার ব্যাপারে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে সে বুঝতে পেরেও মাথা ঠাণ্ডা রাখল হেগেন। ভাবছে, বিস্তর টাকার মালিক লোকটা, এফ, বি, আই-এর কর্তার সাথে বন্ধুত্ব, অনেক রাজনৈতিক নেতা তার পৃষ্ঠপোষকতায় চলে, ছায়াছবির জগতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এই রকম একজন নোক কোন দুঃখে ভয় পাবে ডন কর্লিয়নিকে? নিজের প্রতিষ্ঠা পরিমাপ করে যে-কোন বুদ্ধিমান লোককে স্বীকার করতেই হবে, সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে ওলটস। তবে, এই বিশ্লেষণে একটা কিন্তু রয়েছে। ডন কর্লিয়নি জনিকে কথা দিয়েছেন ভূমিকাটা তাকে পাইয়ে দেবেন। হেগেন জানে, কথা রাখার জন্যে সম্ভাব্য সব কিছু করে থাকেন তিনি।

শান্তভাবে বলল হেগেন, আপনি আমাকে ইচ্ছা করে ভুল বুঝছেন। আমার মালিক কথা দিচ্ছেন, বন্ধুত্বের বিনিময়ে সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষ ঠেকাবেন তিনি, বিনিময়ে আপনি তার ধর্মপুত্রকে কাজটা দেবেন। সে যাই হোক, বোঝাই যাচ্ছে, আপনি মন স্থির করে ফেলেছেন। তবে আমি বলব, মস্ত ভুল করতে যাচ্ছেন আপনি।

রেগে ওঠার এই সুযোগটা হাতছাড়া করল না ওলটস মাফিয়াদের পুরানো কায়দায় ভয় দেখাচ্ছ আমাকে, এই তো? এতে কাজ হবে না, যাও। চরিত্রটা জনির জন্যে সবচেয়ে মানানসই, আমি জানি, কিন্তু ধড়ে প্রাণ থাকতে ওই ভূমিকায় অভিনয় করতে দেব না ওকে আমি। তার কারণটাও জেনে রাখো। আমার পোষ মানানো একটা মেয়ের সর্বনাশ করেছে ও। পাঁচ বছর ধরে লাখ লাখ ডলার খরচ করে তাকে আমি নাচ গান অভিনয় শিখিয়েছিলাম, অমন সুন্দরী মেয়ে, অমন নিতম্বিনী কোটিতে গুটিকয়েক দেখা যায়। পুরুষমানুষকে শুষে নিয়ে ছিবড়ে বানিয়ে ফেলার আশ্চর্য একটা ক্ষমতা ছিল তার। এই রকম মেয়েকে কিনা আমার কাছ থেকে ভাগিয়ে নিয়ে গেল শালা, রীতিমত বোকা বনে গেলাম আমি। আমার যা পজিশন, তাতে কারও চোখে বোকা প্রতিপন্ন হওয়া চলে না, মি. হেগেন। জনিকে আমি শিক্ষা দিতে চাই।

স্তম্ভিত হয়ে গেল হেগেন। সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত একজন লোক মেয়েমানুষের মত তুচ্ছ একটা ব্যাপারে কিভাবে নিজের স্বার্থবুদ্ধিকে জলাঞ্জলি দিতে পারে তা সে ভেবেই পেল না। হেগেন তথা কর্লিয়নিদের জগতে মেয়েমানুষ মানেই তা ব্যক্তিগত ব্যাপার, বৈষয়িক বিষয়ের সাথে তার সম্পর্ক নেই। তবে বিয়ে, অথবা পারিবারিক সম্মানের কথা আলাদা।

শেষ একটা চেষ্টা করে দেখছে হেগেন। বলল, আমি শুধু বলতে চাই, অতীতে কি ঘটেছে না ঘটেছে সে কথা মনে রেখে ঝুঁকি নেয়া কি ঠিক হচ্ছে আপনার? আমার মালিক ছোট্ট একটা অনুরোধ করেছেন আপনার কাছে, তার কাছে এটার অনেক মূল্য, এই আসল কথাটাই আপনি বুঝতে পারছেন না।

সোফা ছেড়ে ঝট করে উঠে দাঁড়াল ওলটস। কাকে ভয় দেখাচ্ছ তোমরা! এক্ষুণি যদি ফোন করি আজ রাতটা হাজতে কাটাতে হবে তোমাকে, তা জানো? খুনে গুণ্ডাদের আমি ভয় পাই না, তারাই আমাকে ভয় করে চলে। শোনো, দরকার হলে হোয়াইট হাউসে যাব আমি, এবং এমন ব্যবস্থা করব যে তোমার ওই রংবাজ গুণ্ডা সর্দার টেরও পাবে না কোত্থেকে কে তাকে ঘায়েল করে গৈল।

এমন নির্বোধ নোক তো দেখিনি, ভাবছে হেগেন। এত বড় একটা আহাম্মক। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় স্টুডিওর মালিক, প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা হলো কিভাবে? কোন সন্দেহ নেই এই ব্যবসাতে নেমে পড়া উচিত ডনের।

সময়টা বড় আনন্দে কাটল, সেজন্যে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, বলল হেগেন। রাতটা আর এখানে কাটাব না। ঠাণ্ডা ভাবে একটু হাসল সে। মি. কর্লিয়নি আবার অবিলম্বে দুঃসংবাদ শুনতে ভালবাসেন।

বাইরে বেরিয়ে এসে হেগেন দেখল, সেই বারো বছরের অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটি আর তার মা লম্বা একটা লিমুসিন গাড়িতে চড়ছে। এদেরকেই ওলটসের অফিসে আজ সকালে দেখেছিল সে। চেহারা এরই মধ্যে আশ্চর্য-বিকৃত হয়ে গেছে মেয়েটার, গোলাপী মাংসের একটা পিণ্ডের মত দেখাচ্ছে মুখটাকে। লম্বা পা দুটো ঠিকমত ফেলতে পারছে না সে, একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছে। মা কানে কানে কি যেন বলল, সাথে সাথে ঘাড় ফিরিয়ে হেগেনের দিকে তাকাল মেয়েটা। তার চোখে উকট একটা উল্লাস লক্ষ করল হেগেন। মাকে অনুসরণ করে মেয়েটা এবার উঠে পড়ল গাড়িতে।

এতক্ষণে বুঝতে পারলহেগেন, প্লেনে করে কেন তাকে নিয়ে আসা হয়নি। এই মা আর মেয়েকে সাথে করে নিয়ে এসেছিল ওলটস। ডিনার খাবার আগে এই কচি মেয়েটার সাথে ফুর্তি করার দরকার ছিল তার। হায় কপাল, ভাবল হেগেন, অথচ এই নরকেই বাস করতে চাইছে জনি!

.

কাজে তাড়াহুড়ো পছন্দ করে না পলি গাটো। আজকের এই কাজটা একটা সহজ কাজ হলেও, কেউ যদি কোথাও একটু ভুল করে ফেলে, তার পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। তাই আজ সে আরও সতর্ক হয়ে আছে। বারে বসে বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে, আর ফাঁক বুঝে আড়চোখে দেখে নিচ্ছে পাজি দুই ছোকরাকে। মেয়েমানুষ দুটোকে নিয়ে তারা একেবারে মেতে উঠেছে।

ছেলে দুটো সম্পর্কে সব জানা আছে পলির। দুজনেরই বছর কুড়ি বয়স, নাম জেরি ওয়াগনার আর কেভিন মুনান। দুজনই স্বাস্থ্যবান, লম্বা, মাথায় বাদামী রঙের চুল। ছুটির মধ্যে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে এসেছে, কদিন পর চলে যাবে আবার। হারামীর হাড় শালারা, ভাবছে পলি, গভীর রাত পর্যন্ত বারে বসে মদ গেলা আর বেশ্যাগুলোর পিছু লাগা, এই ওদের কাজ।

খিলখিল করে হেসে উঠল একটা মেয়ে। পলি শুনতে পাচ্ছে তার কথা। রক্ষে করো, জেরি! তোমার সাথে এক গাড়িতে যাব আমি? তারপর তুমি আমাকে ওই বেচারীর মত হাসপাতালে পাঠিয়ে দাও!

আমেরিগো বনাসেরার কথা ভেবে দুঃখ হলো পলির। মেয়ের সর্বনাশ দেখতে হয় যাকে, তার মত অভাগা আর কে! গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে পড়ল সে, বার থেকে বেরিয়ে এল অন্ধকার রাস্তায়।

দোকান পাট সব বন্ধ হয়ে গেছে, এলাকার আর একটা মাত্র বারে আলো জ্বলতে দেখছে পলি। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছে ক্লেমেঞ্জা। রেডিওর ডাক না পেলে এদিকে ভুলেও আসবে না পুলিশ। শ্ৰেভলে সিডান গাড়িটার দরজায় হেলান দিল পলি। পিছনের সীটে প্রকাণ্ডদেহী দুজন লোক বসে আছে, কিন্তু অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না তাদেরকে। নিচু গলায় তাদেরকে বলল পলি, বেরুলেই শুরু করে দেবে।

খানিক পর বার থেকে বেরিয়ে এল ওরা। মেয়ে দুটো যাচ্ছে তাই বলে বিদ্রূপ করেছে ওদেরকে, তাই মেজাজ খুব খারাপ।

গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে ইতিমধ্যে বিশালদেহীরা।

গাড়ির ফোরে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পলি, ছোকরাদেরকে উদ্দেশ্য করে বাঁকা হাসল সে, বলল, কি হে, মেয়েরা বুঝি পাত্তা দিল না?

ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ওরা। বেঁটে, বেজিমুখো পলির চালিয়াতি ভঙ্গি দেখে মাথায় রক্ত চড়ে গেল ওদের। নিমেষে পলির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ওরা। কিন্তু সেই মুহূর্তে ওদের গায়ের উপর এসে পড়ল বিশালদেহীরা। দুজনের হাত ধরে ফেলল তারা, টেনে সরিয়ে আনল ছোকরাদেরকে পলির কাছ থেকে।

এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল পলি। দ্রুত লোহার কাটা বসানো নাকুল ডাস্টার হাতে পরে নিল সে, চরকির মত আধপাক ঘুরেই ওয়াগনার ছোকরার নাকে প্রচণ্ড একটা আঘাত করল সে। প্রকাণ্ডদেহীদের একজন ওয়াগনারকে এবার দুহাত দিয়ে ধরে তুলে ফেলল শূন্যে! নাগালের মধ্যে তার কুঁচকিটা পেয়ে হাত ঘুরিয়ে একটা আপার কাট চালান এবার পলি। নিঃশব্দে দড়ির মত ঝুলে পড়ল ওয়াগনার। ব্যাপারটা শুরু হয়েছে মাত্র ছয় সেকেণ্ড আগে।

লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে বসে স্টার্ট দিল পলি। ওদিকে তার লোকেরা ধুমসে পেটাচ্ছে কেভিন মুনানকে। কোন তাড়াহুড়ো নেই ওদের মধ্যে, হাতে যেন অঢেল সময় রয়ে গেছে। এলোপাতাড়ি মারছে না ওরা, শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে ধীরেসুস্থে একের পর এক ঘুসি চালাচ্ছে। ওদের ওপর নির্দেশ আছে, মাথায় বা পিছনে শিরাড়ার উপর মারা চলবে না। তার মানে ছোকরাদের মৃত্যু চাওয়া হয়নি। তবে সেই সাথে সাবধানের সুরে একথাও জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে ছোকরা দুজন যদি হাসপাতাল থেকে মাসখানেকের আগে ছাড়া পায়, ওদেরকে আবার সেই ট্রাক চালাবার কাজে ফেরত পাঠানো হবে। দুজনেই এককালে মুষ্টিযোদ্ধা ছিল ওরা। টাকা কর্জ দেয়ার এমন ব্যবসা এদেরকে শিখিয়ে দিয়েছে সনি কর্লিয়নি যে রীতিমত আরাম আয়েশের সাথে জীবন কাটাতে পারছে। তাই ছোটখাটো এই কাজটা অত্যন্ত উৎসাহ আর আগ্রহের সাথে করে দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার এই মন্ত সুযোগ ওরা ছাড়েনি।

যেখানেই আঘাত লাগছে সেখানেই চামড়া ফেটে যাচ্ছে কেভিন মুনানের। চেহারাটা চেনা যাচ্ছে না এখন তার। তাকে ছেড়ে দিয়ে প্রাক্তন মুষ্টিযোদ্ধারা আবার ফিরল ওয়াগনারের দিকে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে, সেই সাথে হেলপ, হেলপ করে চেঁচামেচি করছে।

একজন কাঁধে ঘুসি মেরে বসিয়ে দিল তাকে, অপরজন তার হাতটা মুচড়ে ধরে পিঠে প্রচণ্ড এক লাথি মারল। মট করে শব্দ হলো, পাজরের একটা হাড় বোধহয় ভেঙে গেল।

বার থেকে একজন লোক বেরিয়ে আসছে দেখে কাজের গতি দ্রুত করুল ওরা। ওয়াগনার চেঁচাচ্ছে, শব্দের আকৃষ্ট হয়ে ঝটপট খুলে যাচ্ছে বাড়িগুলোর জানালা। আরও লোকজন বেরিয়ে আসছে বার থেকে। কিন্তু কেউ ওদের কাছাকাছি আসছে না বা কিছু বলছে না।

ওয়াগনারের মাথাটা স্থির রাখার জন্যে দুহাত দিয়ে সেটা চেপে ধরুল একজন, দ্বিতীয় লোকটা লক্ষ্য স্থির করে ধই করে ঘুসি মারুল মুখের উপর। যথেষ্ট হয়েছে, চেঁচিয়ে বলল পলি গাটো। চলে এসো এবার।

দৌড়ে এসে গাড়িতে উঠে পড়ল প্রকাণ্ডদেহীরা, সাথে সাথে গাড়ি ছেড়ে দিল পলি। অনেকেই দেখেছে গাড়িটা, নাম্বারও টুকে রাখতে ভুল করেনি, মুচকি হেসে ভাবছে সে, কিছু এসে যায় না তাতে–চুরি করা ক্যালিফোর্নিয়ার নাম্বার প্লেট এটা। তাছাড়া, এক লাখের উপর শেভ্রলে সিডান আছে নিউ ইয়র্ক শহরে।

১.২ নিজের আইন অফিসে টম হেগেন

০২.

বৃহস্পতিবার সকাল। শহরে নিজের আইন অফিসে এসে পৌঁছল টম হেগেন। আগামীকাল ভার্সিল সলোমোর সাথে সাক্ষাৎকারের দিন ঠিক হয়েছে, তাই কাগজ কলমের বাকি কাজ সেরে, গুছিয়ে তুলে রাখতে চায় সে। ডন অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন সাক্ষাৎকারটিকে, নিজেদেরকে প্রস্তুত করার জন্যে গোটা একটা সন্ধ্যা ব্যয় করবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি হেগেনকে। সন্ধ্যার মীটিংয়ে হালকা মনে উপস্থিত থাকার জন্যে হাতের কাজ সেরে ফেলতে চাইছে সে।

মঙ্গলবার গভীর রাতে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ফিরে এসেই ওলটসের ব্যাপারটা রিপোর্ট করেছিল হেগেন। সব শুনে মোটেও অবাক হননি ডন। হেগেন যখন সেই ছোট সুন্দর মেয়েটার কথা বলল, অসন্তোষে তার মুখের চেহারা বদলে গেল। কী জঘন্য!মৃদু কণ্ঠে মন্তব্য করলেন তিনি। চরম ঘৃণা এবং আপত্তি প্রকাশ করার সময় এই দুটো শব্দ ব্যবহার করেন ডন কর্লিয়নি।

সব শুনে একটি মাত্র প্রশ্ন করলেন তিনি। লোকটার সত্যিকার পৌরুষ আছে কি?

ডনের এই প্রশ্নের অন্তর্নিহিত অর্ধ কি হতে পারে তাই নিয়ে অনেক মাথা ঘামাতে হয়েছে হেগেনকে। দীর্ঘ দিন সান্নিধ্য লাভের ফলে সে জানে সাধারণ মানুষ আর ডনের মূল্যবোধের মধ্যে এত বেশি পার্থক্য রয়েছে যে তার একটা কথার অর্থ সাধারণভাবে যা হওয়া উচিত অনেক সময় তা না হয়ে অনেক বেশি গভীর অর্থ বহন করে।

ঠিক কি জানতে চাইছেন ডন? ওলটসের ব্যক্তিত্ব আছে কিনা? তার মছিবীজোর আছে কি? অবশ্যই আছে। কিন্তু হেগেন বুঝল, ডন এসব জানতে চাননি। কিতে, ধাপ্পায় বিচলিত হয় না, সেই মুরোদ আছে কি নোকটার? সিনেমা তৈরিতে বাধা পড়লে প্রচুর আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করতে হবে তাকে, তার সবচেয়ে বড় অভিনেতা হেরোইনে আসক্ত এই গুজব ছড়িয়ে পড়লে নিন্দার ঝড় উঠবে–এসব ঝুঁকি নেবার মত ক্ষমতা আছে কি তার? অবশ্যই আছে। কিন্তু ডন এসবও জানতে চাননি।

প্রশ্নটার সঠিক অর্থ নিজেই বিশ্লেষণ করে আবিষ্কার করতে পেরেছে হেগেন। ডন জানতে চাইছেন, আত্মসম্মান রক্ষার জন্যে, প্রতিশোধ নেবার জন্যে স্ব হারাবার ঝুঁকি নিতেও পিছপা হবে না, এতটা পৌরুষ কি আছে ওলটসের?

বড় একটা হাসে না হেগেন, কিন্তু এই ঘটনা উপলক্ষে মৃদু একটু হেসেছে সে, এবং ডনের সাথে কিঞ্চিত রসিকতা করে বলেছে, আপনি আসলে জানতে চাইছেন ওলটস একজন সিসিলীয় কিনা।

প্রশ্নের অর্থ আবিষ্কার করে ফেলায় হেগেনের বলার মধ্যে একটা আত্মপ্রসাদের সুর ফুটে উঠল, সন্তুষ্টচিত্তে মাথা নেড়ে সেটা এবং প্রশ্নের ব্যাখ্যাটাকে মেনে নিলেন। উন।

পরদিনও এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেছিলেন ডন, এবং বিকেলে হেগেনকে তার বাড়িতে ডেকে কিছু আদেশ দিয়েছিলেন। দিনের বাকি অংশটা সেই আদেশ পালন করতেই কেটে গিয়েছিল হেগেনের। ডনের প্রতি শ্রদ্ধায় অভিভূত হয়ে পড়েছিল সে। তিনি যে সমস্যার সমাধান করে ফেলেছেন, এ ব্যাপারে তার মনে কোন সন্দেহই ছিল না।

অফিসে বসে ওলটসের একটা ফোন পাবে বলে আশা করছে হেগেন। যুদ্ধের ছবিটায় জনি ফন্টেনকে প্রধান ভূমিকায় নেয়া হবে, এই খবরটা দেবার জন্যে ফোন তাকে করতেই হবে।

ফোনটা হঠাৎ ঝন ঝন করে বেজে উঠল, কিন্তু হেগেন রিসিভার তুলে কানে ঠেকাতে ওলটসের নয়, আমেরিগো বনাসেরার গলা পেল।

কৃতজ্ঞতায় অভিভূত বনাসেরার কণ্ঠস্বর কাঁপছে। সে যে ডনের কাছে চিরঋণী, হেগেনের মাধ্যমে উনকে এই কথাটা জানাবার জন্যে ফোন করেছে সে। জানাল, গড ফাদার যখনই বলবেন তখনই তার জন্যে নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিতে পারবে সে।

ডেলি নিউজ কাগজটার ভাঁজ খুলে চোখের সামনে মেলে ধরল হেগেন। ভিতরের পৃষ্ঠায় বড় একটা ফটো ছাপা হয়েছে। রাস্তার উপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে কেভিন মুনান আর জেরি ওয়াগনার। মানুষের শরীর বলে চেনা কঠিন, থেঁতলানো মাংসের দুটো পিণ্ড যেন। এরা মরেনি বলে রিপোর্টারও বিস্ময় প্রকাশ করেছে। তার মন্তব্য হলো, মুখ মেরামত করতে হলে প্লাস্টিক সার্জারির সাহায্য নিতে হবে, এবং দুজনকেই মাসের পর মাস থাকতে হবে হাসপাতালে।

পলি গাটো লোকটাকে খুব দক্ষ মনে হচ্ছে, ভাবল হেগেন। ওরধন্যে ভাল কিছু একটা করার কথা বলতে হবে ক্লেমেঞ্জাকে। চিন্তাটা নোট করে রা ফেস।

এরপর গভীর মনোযোগ আর দক্ষতার সাথে হিসাব কষতে শুরু ক হেগেন। ঝাড়া তিন ঘণ্টা কাজ করে ডন কর্লিয়নির জমিজমা থেকে যা আয় হয় র একটা পাকা হিসাব, জলপাই তেল আমদানি আর স্থাপত্য কোম্পানির লাভ লোকসানের হার ইত্যাদি বের করে ফেলল সে, কোন ব্যবসাই বর্তমানে বিশেষ লাভের মুখ দেখছে না, কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, এবার মোটা মুনাফা আশা করা যেতে পারে।

এই সময় ফোন এল ওলটসের।

কুত্তার বাচ্চা, তোমাকে আমি জেলের ঘানি টানাব! ঘৃণায়, ক্ষোভে বিকৃত শোনাচ্ছে ওলটসের কষ্ঠর। শেষ হয়ে যেতে পারি আমি, কিন্তু তবু আমার হাত থেকে তুমি শালার রক্ষা নেই। আর ওই শালা বেজন্মা জনি, ওর আমি পুরুষাঙ্গ যদি কেটে না নিই তো কি বলেছি। সাবধানে থেকো, শালা ইতালীয় গর্ভাব!

শান্ত এবং নরম গলায় বলল হেগেন, একটু ভুল করছেন। আমি ইতালীয় নই–আধা জার্মান, আধা আইরিশ।

কয়েক মুহূর্ত অপর প্রান্ত থেকে কোন সাড়া পেল না হেগেন, তারপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার শব্দ পেল। মুচকি একটু হাসল সে। এত গালমন্দ করল বটে ওলটস, কিন্তু ডন সম্পর্কে একটা কটু কথা তো দূরের কথা, তার নামটা পর্যন্ত উচ্চারণ করেনি।

প্রতিভার কদর আছে, ভাবল হেগেন।

.

দশজন লোকের জায়গা হবে এতবড় একটা খাটে এক ঘুমায় ওলটস। বয়স বেশি হওয়া সত্ত্বেও তার শারীরিক উদ্যমে তেমন ভাটা পড়েনি, তবে কিশোরী মেয়ে ছাড়া আজকাল কেউ তাকে উত্তেজিত করতে পারে না। এবং সন্ধ্যার পর খানিকক্ষণের মধ্যেই সাধ এবং সাধ্য নিঃশেষ হয়ে যায় তার।

আজ বৃহস্পতিবারে কেন যেন খুব ভোরে ঘুম ভাঙল তার। চোখ মেলে পায়ের কাছে পরিচিত একটা আকৃতি দেখে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল সে। হাত বাড়িয়ে জ্বেলে দিল বেড ল্যাম্পটা। যা দেখল তাতে মুহূর্তে অসুস্থ হয়ে পড়ল সে। গলগল করে বেরিয়ে এসে পুরু দামী গালিচার উপর ছিটকে পড়ল দুর্গন্ধময় বমি।

তার প্রিয় ঘোড়া খার্তুমের কাটা মুণ্ড এক দলা জমাট বাঁধা রক্তের উপর বসানো রয়েছে। সাদা দড়ির মত দেখা যাচ্ছে স্নায়ুগুলোকে, চোখ থেকে সোনালী চকচকে ভাব অদৃশ্য হয়েছে, পচন ধরা ক্ষতবিক্ষত আপেলের মত চেহারা হয়েছে সে দুটোর। আতঙ্কে, দুঃখে, ঘৃণায় চেঁচিয়ে উঠল ওল্টস।

বাটলার এবং চাকর বাকররা যে যেখানে ছিল ছুটে এল সবাই। কর্তাকে উন্মাদের মত চেঁচামেচি করতে দেখে ঘাবড়ে গেল বাটলার, দেরি না করে ওলটসের ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং স্টুডিওর প্রধান সহকারীকে ফোন করুল সে। তবে এরা এসে পৌঁছবার আগেই হেগেনকে একচোট গাল দিয়ে নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়েছে ওলটু।

ব্যাপারটা ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে গিয়ে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছে সে। একোন জাতের নোক যে ছোট্ট একটা অনুরোধ রক্ষা করা হয়নি বলে ছয় লাখ ডলারের বিশ্ববিখ্যাত একটা ঘোড়াকে অবলীলায় মেরে ফেলতে পারে? একটু সতর্ক করার প্রয়োজনটুকুও বোধ করল না! হত্যার ধরনের মধ্যেও তাৎপর্য রয়েছে। এই বিভৎস নিষ্ঠুরতা এমন একজন মানুষের পরিচয় প্রকাশ করছে যে নিজেই আইন, নিজেকে ছাড়া আর কাউকে, আর কিছুকে, এমন কি সৃষ্টিকর্তাকেও গ্রাহ্য করে না। ইতিমধ্যে খবর পেয়েছে ওল্টস, ওষুধ খাইয়ে অজ্ঞান করা হয়েছিল খার্তুমকে, তারপর কুড়াল দিয়ে আলাদা করা হয়েছে ওই তিনকোণা মুটাকে। তার মানে, আস্তাবলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বানচাল হয়ে গেছে। ইনভেস্টিগেশন ফার্মের যারা পাহারায় ছিল তারা বলছে রাতে তারা কোন শব্দই পায়নি। এ অসম্ভব। তার মানে টাকা খেয়েছে ওরা।

প্রেসিডেন্টের সাথে খাতির রয়েছে তার। এফ. বি: আই.-এর পরিচালক তার বন্ধু–এসব জেনেও অখ্যাত একজন ইতালীয় তেল আমদানিকারক তাকে খুন করতে যাচ্ছে–নিশ্চয়ই তাই, ব্যাপারটা উপলব্ধি করে শিউরে উঠল ওলটস। অবিশ্বাস্য ব্যাপার, কিন্তু দিবালোকের মত বাস্তব। কী আশ্চর্য, পরিস্থিতি এরকম হয়ে উঠলে পৃথিবীটা দাঁড়াবে কোথায়, খারাপের আর বাকি থাকল কি!

ডাক্তারের দেয়া মৃদু সিডেটিভ খেয়ে শরীরটাকে ঠাণ্ডা করে নিল ওলটস। দেশের মানুষের কাছে হাস্যাস্পদ হওয়া চলবে না তার, ভাবছে সে। কেউ তার ক্ষমতা আর প্রতিপত্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে এটা জানাজানি হয়ে গেলে মুখ দেখাবে কিভাবে সে? যা হবার হয়েছে, এবার সাবধানে পা ফেলতে হবে। সামান্য একটা কারণে জেদ ধরে বসে এই লোভনীয় জীবনটার সমাপ্তি ঘটাবার কোন মানে হয় না। ভাগ্য প্রসন্ন হলে কর্লিয়নিকে নাগালের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে একদিন।

ডাক্তার সহ উপস্থিত সবাইকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে দেয়া হলো যে এ ব্যাপারে আসল সত্যটা কেউ প্রকাশ করবে না। খবরের কাগজে খবর পাঠানো হলো কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ মারা গেছে খার্তুম। ওলটসের নিজের জমিতে অতি গোপনীয়তার সাথে সমাধিস্থ করা হলো ঘোড়াটার দুই অংশ।

এর ছয় ঘণ্টা পর একটা টেলিফোন কল পেল জনি ফন্টেন। ছায়াছবির নির্বাহী প্রযোজক জানাল, জনি যেন শু্যটিংয়ের জন্যে তৈরি হয়ে আগামী সোমবার স্টুডিওতে হাজির হয়।

.

প্রস্তুতি সভায় হাজির থাকার জন্যে সন্ধ্যায় ডনের বাড়িতে এল হেগেন। ডনের নির্দেশে তার বড় ছেলে সনি কর্লিয়নিও বৈঠকে বসেছে। তার কিউপিড আকৃতির মস্ত ভারি মুখে ক্লান্তি আর অবসাদের ছাপ, বারবার একটা গ্লাসে চুমুক দিয়ে স্কচ হুইস্কি খাচ্ছে সে। তাই দেখে হেগেন ভাবল, এখনও নিশ্চয়ই সেই মেয়েটার সাথে ধুমসে প্রেম চালাচ্ছে সনি। আরেকটা দুশ্চিন্তার কারণ বটে।

ডি নোবিলি চুরুট টানতে টানতে আরাম কেদারায় বসলেন ডন। জানতে চাইলেন, দকারী সব জানা হয়ে গেছে আমাদের?

একটা ফাইল খুলল হেগেন। প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য দুর্বোধ্য ভাষায় লেখা আছে এতে। কারও হাতে এটা পড়লে তথ্যগুলোর মর্ম উদ্ধার করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না।

একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিল হৈগেন। বলল, আমাদের সহযোগিতা চাওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আসছেনসলোযো। দশ লক্ষ ডলার পজি চাইবেন উনি এবং আইন যাতে আমাদেরকে কোনভাবে বিরক্ত না করে তার নিখুঁত ব্যবস্থা করবেন। এর বিনিময়ে ব্যবসা থেকে যা লাভ হবে তার একটা অংশ পাব আমরা, কিন্তু সেটার পরিমাণ সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না।

হেগেন লক্ষ করল সনি কর্লিয়নি তার কথা মন দিয়ে শুনছে না, নিজের চিন্তায় বিভোর হয়ে আছে সে। আবার শুরু করল হেগেন, সলোযোর জামিন হচ্ছে টাটাগ্লিয়া পরিবার। লাভের একটা অংশ তারাও হয়তো নেবে। এটা ডাগের ব্যবসা, পপি ফুলের ব্যবসা-তুরস্কে এই ফুলের চাষ হয়। ব্যবসার অন্ধিসন্ধি সব জানা আছে সলোযোর, তুরস্কের সংশ্লিষ্ট মহলের সাথে ভাল যোগাযোগও আছে। পপি ফুল তুরস্ক থেকে পাঠানো হয় সিসিলিতে, সেখানে তার কারখানা আছে, কারখানায় আফিম থেকে তৈরি করা হয় হেরোইন, কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত নিখুঁত, কোন ঝুঁকি নেই। হেরোইন বা মরফিন যাই তৈরি করা হোক, সেগুলো এদেশে নিয়ে এসে বিলি করাটাই হলো সমস্যা। তাছাড়া, পুঁজির ব্যাপারটাও রয়েছে। দশ লাখ ডলার তো আর মুখের কথা নয়।

হেগেন দেখল, ডনের চেহারায় একটু বিরূপ ভাব ফুটল। ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপারে কৌশলে উট দেখানো পছন্দ করেন না তিনি।

তাড়াতাড়ি আবার প্রসঙ্গে ফিরে এল হেগেন, বলল, সলোযোকে ওরা তুর্ক। বলে ডাকে। কারণ তুরস্কে অনেক দিন ছিলেন উনি, তাছাড়া, গুজব আছে, তুর্কী স্ত্রী আর ছেলেমেয়েও নাকি আছে তাঁর। আরেকটা কারণ, ওস্তাদ একজন মারা খেলোয়াড় উনি। পুলিশের খাতায় নাম টোকা আছে তাঁর, একবার ইতালীতে, একবার এ-দেশে জেল খাটতে হয়েছে–ড্রাগ ব্যবসায়ী হিসেবে চেনে ওঁকে কর্তৃপক্ষ। এতে করে আমাদের সুবিধে হতে পারে এইটুকু যে সাক্ষী দেবার জন্যে ওঁকে কখনও ডাকা হবে না। এছাড়া, আমেরিকান স্ত্রী এবং তিনটে ছেলেমেয়ের বাপ তিনি-এদের বেঁচে থাকার জন্যে প্রয়োজনীয় টাকার অভাব হবে না এ নিশ্চয়তা পেলে যে-কোন ঝুঁকি নিতে রাজি তিনি।

চুরুটে টান দিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন ডন। তুমি কি বলো, সনি?

বাপের অধীনে থেকে হাঁফ ধরে গেছে সনির•• স্বাধীনভাবে কিছু একটা করতে চায় সে, জানে হেগেন। উত্তরে কিছু বলবে, জানা আছে তার।

গ্লাসে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে হুইস্কির স্বাদ নিল সনি, মুখ বিকৃত করে বলল, ওই সাদা পাউডারে বড় বেশি লাভ। তাই বিপদও বেশি। পিছনে থেকে উৎসাহ আর পুঁজি যোগান দেয়া যেতে পারে, মন্দ হয় না সেটা কিন্তু নিজেরা আমরা এ কাজে হাত দেব না। মামলা হলে বিশ বছরও ঝুলতে হতে পারে।

চুরুটে আরেকটা টান দিলেন ডন। তোমার মত কি, টম?

যা সত্য বলে মনে করছে তাই বলার জন্যে মনে মনে তৈরি হলো হেগেন। ডন যে সলোযোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবেন, ইতিমধ্যে তা বুঝতে পেরেছে সে। তার ধারণা, যা দৈবাৎ হয় এবার তাই হয়েছে গোটা ব্যাপারটা ভাল করে তলিয়ে দেখেননি ডন। যথেষ্ট দূরদৃষ্টির সাহায্য নিচ্ছেন না তিনি।

হেগেনকে ইতস্তুত করতে দেখে তাকে উৎসাহ দেবার জন্যে ডন বললেন, যা ভাবছ, বলেই ফেলো, টম। মনিবদের সাথে সিসিলীয় কনসিলিয়রিরাও সব সময় একমত হয় না। হেসে উঠলেন ডন, তার সাথে ওরা যোগ দিল,

আমি মনে করি প্রস্তাবটা আপনার গ্রহণ করা উচিত। এই ব্যবসাতে লাভের পরিমাণ খুব বেশি, আমরা এতে না ঢুকলে আর কেউ ঢুকে জায়গাটা দখল করে নেবে। টাটাগ্রিয়ারা এ সুযোগ ছাড়বে বলে আমি মনে করি না। প্রচুর আয় হলে আরও বেশি পুলিশের বন্ধুত্ব আর রাজনৈতিক প্রভাব কিনতে কোন অসুবিধেই হবে না ওদের। ক্ষমতার দিক থেকে আমাদেরকে টপকে যাবে ওরা। তখন হয়তো আমরা যা নিয়ে আছি তার উপর ভাগ বসাবার ফন্দি করবে। ভবিষ্যতের সেরা ব্যবসা হতে যাচ্ছে ড্রাগ ব্যবসা, এখনই এতে যদি আমরা না ঢুকি, এক সময় পিছিয়ে পড়ব! আমাদের যা আছে তাও হাতছাড়া হয়ে যাবার ভয় আছে। আজই হয়তো এসব ঘটবে না, কিন্তু দশ বছর পরের কথা ভাবছি আমি।

হেগেনের মনে হলো উনকে প্রভাবিত করতে পেরেছে সে। সন্দেহ নেই, চুরুটের দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি বললেন, সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। উঠে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলেন, বেঈমানটার সাথে দেখা করার সময় ঠিক হয়েছে?

হেগেন ভাবছে, ডন হয়তো শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে যাবেন। বলল, সকাল দশটায় এখানে আসবেন তিনি।

আমি চাই তার সাথে কথা বলার সময় তোমরা দুজনেই আমার সাথে থাকবে, বললেন ডন। আড়মোড়া ভেঙে ছেলের দিকে ফিরলেন হঠাৎ করে। সনির একটা হাত ধরে বললেন, আজ রাতে একটু ঘুমাবার চেষ্টা করলে কেমন হয়, সান্তিনো? আয়নায় নিজের চেহারা দেখেছ? ভূতের মত লাগে না? একটু নজর দাও শরীরটার দিকে-যৌবন কারও চিরকাল থাকে নাকি?

হেগেন যে প্রশ্ন করতে সাহস পায়নি বাপের কাছ থেকে স্নেহটুকু পেয়ে সেই প্রশ্নটা করে বসল সনি, সলোযোকে কাল তুমি কি বলবে, বাবা?

মৃদু হাসলেন ডন কর্লিয়নি। বললেন, খুঁটিনাটি সব তথ্য না জেনে এখুনি বলি কিভাবে? তাছাড়া,আজ রাতে যা শিখলাম তা নিয়ে একটু ভাবতেও তো সময় দরকার। যাই বলো, আমি তো আর ঝোঁকের বশে, চলি, না। দরজার দিকে এগোলেন তিনি, তারপর হঠাৎ থেমে ঘুরে দাঁড়ালেন, কথার পিঠে কথা বলার ভঙ্গিতে হেগনকে বললেন, আচ্ছা, যুদ্ধের আগে নারী-ব্যবসা করে খরচ চালাত সলোযো, তোমার ফাইলে সে কথাটা লেখা আছে কি? টাটাগ্লিয়ারাও তো আজকাল ওই ব্যবসা ধরেছে। মনে থাকতে থাকতে এ কথাটাও লিখে রাখো।

ডনের কণ্ঠস্বরে প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ লক্ষ্য করে লাল হয়ে উঠল হেগেনের মুখ। তথ্যটা প্রাসঙ্গিক নয় মনে করে উল্লেখ করেনি সে। তবে ডন শুনলে তার সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হতে পারে, এই রকম একটা চিন্তা উদয় হয়েছিল তার মনে। মেয়ে, সেক্স ইত্যাদি বিষয়ে ডন কর্লিয়নি সাংঘাতিক গোড়া এবং রক্ষণশীল, একথা সবাই জানে।

মাঝারি আকারের লোক ভার্সিল সোযো। স্বাস্থ্যটা খুব ভাল। একবার তাকালেই মেনে নিতে হয় গায়ে জোর আছে বটে লোকটার। গায়ের রং তেমন ফর্সা নয় বলে তুরস্কের লোক বলে ভুল করে অনেকে। নাকটা খাড়া। চোখ দুটো কালো এবং দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতার সাথে অদ্ভুত একটা নিষ্ঠুরতার ভাব আছে।

অভ্যর্থনা জানিয়ে তাকে অফিসে নিয়ে এল সনি কর্লিয়নি। হেগেনকে নিয়ে এখানে অপেক্ষা করছেন ডন। সলোযোর দিকে তাকিয়ে হেগেন ভাবছে, লুকা ব্রাসি ছাড়া এমন সাংঘাতিক চেহারার লোক আর কখনও দেখেনি, সে। ডন যদি এখন তাকে জিজ্ঞেস করেন এই তুর্ক লোকটার সত্যিকার পৌরুষ আছে কিনা, এক কথায় জবাব দেবে সে, আছে। শক্তি এবং আত্মবিশ্বাসের এমন স্পষ্ট ছাপ আর কোন মানুষের চেহারায় দেখেনি হেগেন। সলোহোর পাশে বসা ডনকে আজ যেমন বৈশিষ্ট্যহীন, সাদামাঠা বলে মনে হচ্ছে, এর আগে কখনও তা মনে হয়নি। ডনের অভিবাদনের ভঙ্গিটাও সরল গেঁয়ো মনে হলো।

আন্তরিক ভঙ্গিতে করমর্দনের পালা চুকল। তারপর সেই কাজের কথা তুলল সলোযো। প্রথমে নিজের ড্রাগ ব্যবসা সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে চেষ্টা করল সে। কোথাও কোন বিপদের ঝুঁকি নেই। তুরস্কের পপি ফুলের খেত থেকে বছরে এই পরিমাপ আফিম পায় সে। ফ্রান্সের কারখানায় মরফিন তৈরি হয়, সিসিলির কারখানায় হেরোইন। ওই দেশের দুই কারখানায় চোরাকারবারের মাল পৌঁছানো যতটা নিরাপদ হওয়া সম্ভব ততটা নিরাপত্তার ব্যবস্থা আছে। যুক্তরাষ্ট্রে ড্রাগ আমদানি করার জন্যে তুলনামূলক ভাবে সামান্য লোকসান দিতে হবে, তার কারণ সবাই জানে সরাসরি ঘুষ দিয়ে এফ. বি. আই-এর সহযোগিতা আদায় করা এক কথায় অসম্ভব। কিন্তু লাভের পরিমাণ এত বেশি, সে তুলনায় বিপদ নেই বললেই চলে।

সলোযো থামতে ভদ্র বিনয়ের সাথে জানতে চাইলেন ডন, তাহলে আপনি আমার কাছে এসেছেন কেন? কোন দিক থেকে আমি আপনার উদারতার যোগ্য হলাম?

প্রশ্নটাকে কিভাবে সে নিল, সলোহোর মুখ দেখে কিছুই তা বোঝা গেল না। বলল, ক্যাশ বিশ লক্ষ ডলার চাই আমার। এর সমান জরুরী কথা, সাহায্যকারী এমন একজন বন্ধু চাই আমি, সমস্ত বড় বড় জায়গায় যার ক্ষমতাবান মিত্র আছে। এই ক্যবসায় আমার প্রতিনিধিরা মাঝে মধ্যেই ধরা পড়বে, ঠেকানো যাবে না। নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি, ধরা পড়লেও তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ থাকবে না। সুতরাং, এমনিতেও বিচার করে তাদেরকে কঠোর শাস্তি দেয়া যাবে না। আমি এমন একজন বন্ধু চাই যিনি গ্যারান্টি দেবেন যে ধরা পড়লেও আমার প্রতিনিধিদেরকে দুএক বছরের বেশি জেল খাটতে হবে না। শুধু এই ব্যবস্থা করা গেলেই প্রতিনিধিরা। ব্যবসার গোপনীয়তা ফাঁস করে দেবে না। শাস্তির মেয়াদ বেশি হলে, বলা যায় না, তারা হয়তো মুখ খুলবে। তা যদি খোল তাদের ওপরের স্তরের লোকজনের বিপদ হতে পারে। মোটকথা, আইনের হাত থেকে কিছুটা আড়াল চাই আমি, ডন কর্লিয়নি, একটু থেমে গাম্ভীর্যের সাথে বলল সলোযো, শুনেছি, বুট-পালিশ ওয়ালাদের পকেটে যত চাঁদির টাকা আছে আপনার পকেটে তার চেয়ে কম জজসাহেব নেই।

এই প্রশংসার কোন উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ করলেন না ডন। জানতে চাইলেন, শতকরা কত পাব আমরা?

চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল সলোযোর। আধাআধি- ভাগ হবে, একটু বিরতি নিল সে, তারপর মোলায়েম সুরে ফিসফিস করে বলল, ত্রিশ থেকে চল্লিশ লাখ ডলার পাবেন প্রথম বছর। এরপর বাড়তেই থাকবে।

টাটাগ্লিয়ারা কত পাবে?

কেমন যেন অপ্রতিভ দেখাল সলোযোকে। ওদেরকে আমি নিজের ভাগ থেকে কিছু দেব। এ-কাজে ওদের কাছ থেকে একটু সহযোগিতা পেতে হবে আমাকে।

শুধু টাকা জোগাব আর আইনকে ঠেকিয়ে রাখব, কার্যকরী দিকটা নিয়ে আমাকে মাথা ঘামাতে হবে না, বিনিময়ে পাব লাভের আধাআধি বখরা-ঠিক এই কথা বলতে চাইছেন আপনি, তাই না?

দ্রুত মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল সলোযো, বলল, বিশ লক্ষ ডলার দেয়াকে শুধু টাকা জোগানোর মত ছোট করে দেখতে পারছি না আমি। আপনার কাছে ব্যাপারটা যদি তাই হয়, আপনাকে আমি আন্তরিক অভিনন্দন জানাই, ডন কর্লিয়নি।

অটল এবং শান্ত দেখাচ্ছে ডনকে। মৃদু কণ্ঠে কথা বলছেন তিনি। টাটাগ্লিয়াদের ওপর আমার শ্রদ্ধা আছে, তাই আপনার সাথে দেখা করতে রাজি হয়েছিলাম–অবশ্য আমি,শুনেছি যে আপনি নিজেও একজন সম্মানীয় ভদ্রলোক। আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারছি না আমি-কেন, তাও বলছি। আপনার এই ব্যবসায় খুব বেশি লাভ, খুব বেশি ঝুঁকি। এর সাথে নিজেকে জড়ালে আমার অন্য সব ব্যবসা বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে। রাজনীতিক বন্ধুদের সংখ্যা আর্মার কম নয় সত্যি, কিন্তু জুয়ার বদলে যদি ড্রাগের ব্যবসা ধরি, এদের কজন আমার সত্যিকার বন্ধু থাকবে, বলা কঠিন। ড্রাগের কারবার-বড় নোংরা ব্যাপার, সলোযো কিছু বলতে যাচ্ছে দেখে হাত তুলে তাকে বাধা দিলেন তিনি, বললেন, না, না, বাধা দেবেন না। আমি নিজের মতামত দিচ্ছি না, ওদের দৃষ্টি ভঙ্গির কথা বলতে চাইছি। কে কিভাবে রোজগার করে বেঁচে থাকে তা ভেবে সময় নষ্ট করি না আমি। আমার বক্তব্য হলো আপনার ব্যবসায় বড় বেশি ঝুঁকি, লোভে পড়ে আমার পরিবারকে বা পরিবারের জীবিকাকে বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারি না আমি।

চকিতে সনি কর্লিয়নি এবং টম হেগেনের দিকে একবার করে তাকাল সলোযো, এটা ছাড়া তার নৈরাশ্যের কোন লক্ষণ প্রকাশ পেল না। তাকে সমর্থন করে ওরা কেউ কিছু বলুক, এই রকম একটা সূক্ষ্ম আবেদন ফুটে উঠল তার তাকাবার ভঙ্গিতে। তারপর ডনকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি বিশ লাখের নিরাপত্তা সম্পর্কে সন্দেহ করছেন?

নিরুত্তাপ একটু হাসি দেখা দিল ডনের ঠোঁটে। না।

তবু আরেকবার বলল সলোযো, টাটাগ্লিয়ারা আপনার বিশ লাখেরও গ্যারান্টি দেবে।

ঠিক এই সময় অমার্জনীয় ভুল করে বসল সনি। সাগ্রহে জানতে চাইল সে, কোন সুদ না নিয়েই আমাদের পুঁজি ফেরত দেবার জামিন হবে ওরা?

চালে ভুল করে হেগেনকে একেবারে স্তম্ভিত করে দিল সনি। ক্ষোভে, ভয়ে, বিস্ময়ে নিষ্প্রাণ শুকনো কাঠ হয়ে গেল সে। দেখতে পেল, বরফের মত ঠাণ্ডা চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন ডন কর্লিয়নি, দৃষ্টিতে বাঘের চাপা আক্রোশ।

চোখ দুটো আরেকবার অস্বাভাবিক জ্বলজ্বল করে উঠল ভার্সিল সলোযোর, এখন সেখানে সন্তুষ্টির ভাব ঝিলিক দিচ্ছে। ডন কর্লিয়নির দুর্গম দুর্গ প্রান্তদের দেয়ালে ফাটল দেখতে পেয়েছে সে, সেটাই তাকে পুলকিত, উল্লসিত করে তুলেছে।

এরপর যখন মুখ খুললেন ডন, তার গলার সুর থেকে বিদায়ের বার্তা পেল সনোযো। তিনি বললেন, অল্পবয়েসীদের লোভ বেশি, এবং ভদ্রতাবোধ নেই বলে বড়দের কথায় নাক গলায়। ছেলেমেয়েদেরকে আবেগ দিয়ে ভালবাসা উচিত নয়, আমি যেমন ঠিক তাই করে মাথায় তুলে ফেলেছি–নিজের চোখেই তো দেখলেন সব। আমার উত্তরটাই একমাত্র উত্ত, সিনর সলোযো।

সৌজন্য প্রকাশে ত্রুটি করল না সলোযো। রীতি মোতাবেক বো করল সে, করমর্দন সারল, তারপর হেগেনের সাথে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল গাড়িতে ওঠার জন্যে। বিদায় দেবার সময়ও তার চেহারায় ভাবের কোন প্রকাশ দেখল নহেগেন।

হেগেন কামরায় ফিরে আসতেই ডন জানতে চাইলেন, কেমন মনে হলো লোকটাকে তোমার?

একজন সিসিলীয়, তিক্ত সুরে বলল হেগেন।

চিন্তিতভাবে মাথা ঝাঁকালেন ডন। তারপর ছেলের দিকে ফিরে তীক্ষ্ণ চাপা গলায় বললেন, কত বড় ভুল করেছ তা তুমি নিজেও জানে না। মনের কথা পরিবারের বাইরে কাউকে কখনও জানতে দিতে নেই। অল্পবয়েসী মেয়েটার সঙ্গ শ্রাগ করো, ওসব করে বিচার বুদ্ধি হারিয়ে ফেলছ তুমি। এবার একটু কাজ শেখো-এবং এই মুহূর্তে দূর হয়ে যাও আমার সামনে থেকে।

নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল সনি।

হেগেন এক গ্লাস অ্যানিসেট দিল ডনকে। চোখ তুলে তিনি বললেন, লুকা ব্রাসিকে খবর দাও তার সাথে আমি দেখা করতে চেয়েছি।

.

তিনমাস পরের ঘটনা।

অফিসে বসে তাড়াহুড়োর মধ্যে কাজ সারছে হেগেন, ইচ্ছা স্ত্রী আর ছেলে মেয়েদের জন্যে বড়দিনের কেনাকাটা করতে বেরুবে। প্রথম বিঘ্ন সৃষ্টি করল জনি ফন্টেন, টেলিফোনের এ প্রান্ত থেকেও বোঝা গেল আনন্দে একেবারে আটখানা হয়ে আছে সে। জামাল, ছবির শুটিং শেষ। এমন একটা উপহার পাঠাচ্ছে, যা দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যাবে ডনের। জিনিসটা কি? দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে অধৈর্য হয়ে উঠলেও কৌতূহলটা দমন করতে পারল না হেগেন। তা বলা যাবে না! গলা ছেড়ে একচোট হো হো করে হেসে নিল জনি। বড় দিনের মজাটাই তো ওখানে?

একটু পর হেগেনের সেক্রেটারি এসে জানাল কনি কর্লিয়নি টেলিফোন করেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হেগেন ভাবল, বিয়ের পর থেকে বড় জ্বালাতন করছে কনি। স্বামীর নামে নালিশ ছাড়া কথা নেই ওর মুখে। ঝগড়া-ঝাটি করে বাপের বাড়ি চলে আসে, কদিন কাটিয়ে তারপর আবার যায়। আর স্বামী কার্লো রিটসিও অকর্মার ধাড়ী। ভাল একটা ব্যবসায় বসিয়ে দেয়া হয়েছে তাকে, কিন্তু সেটারও সে বারোটা বাজাচ্ছে। বৌকে তো মারধোর করেই, তাছাড়া জুয়া খেলে, বেশ্যাবাড়ি যায়, বেসামাল মদ খায়। এসব কথা বাপের বাড়ির আর কাউকে নয়, শুধু হেগেনকে বলেছে কনি। আজ আবার বোধহয় নতুন কোন দুঃখের কাহিনী শোনাতে চাইছে মেয়েটা, ভাবল হেগেন।

কিন্তু না, কনি শুধু জানতে চাইল, বড়দিনে কি উপহার দিয়ে খুশি করা যেতে পারেবাবাকে। জানতে চাইছে সনি, ফেউ আর মাইকেলকেই বা কি দেয়া যায়? মায়ের উপহারটা আগেই ঠিক করে রেখেছে সে। হেগেনের একটা পরামর্শও পছন্দ হলো না তার, তাই টেলিফোন ছেড়ে দিল তাড়াতাড়ি।

এরপর আবার একটা ফোন এল। চুলোয় যাক সব, কাগজপত্র গুছিয়ে নিতে নিতে ভাল হৈগেন। অফিস থেকে কেটে পড়বে এবার সে। কিন্তু টেলিফোনটা না ধরে এড়িয়ে যাবার কথা একবারও ভাল না। সেক্রেটারি এসে জানাল ফোনে ডাকছে মাইক কর্লিয়নি।মনটা খুশি হয়ে উঠল এবার হেগেনের। মাইককে ওর খুব ভাল লাগে। ১ টম, টেলিফোনে বলল মাইকেল কর্লিয়নি, বড় দিনের আগেই জরুরী একটা কথা বলতে চাই বাবাকে। কে-কে নিয়ে কাল আমি শহরে যাচ্ছি, বাবা বাড়িতে থাকবেন তো?

তা থাকবেন, বলল হেগেন। তোমার জন্যে কিছু করার আছে আমার?

ডনের মতই তার এই ছোট ছেলেটির স্বভাব খুব চাপা। সে বলল, না। ধন্যবাদ, টম। বড় দিনে দেখা হবে, কেমন? লং বীচে সবাই থাকবে তো?

থাকবে, বলল হেগেন। গল্প-গুজবের ধার দিয়ে না গিয়ে মাইক রিসিভার নামিয়ে রাখতে মৃদু একটু হাসল সে।

বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হতে পারে, কিন্তু তার জন্যে যেন খাবার রাখা হয়, এই কথাটা স্ত্রীকে জানাবার দায়িত্ব সেক্রেটারিকে দিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল হেগেন। মেসির দোকানের দিকে হাঁটছে সে, একজন লোক ওর সামনে এসে পথরোধ করে দাঁড়াল। সবিস্ময়ে হেগেন দেখল লোকটা সলোযো।

হেগেনের একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরল সলোযো, বলল, ঘাবড়াবার কিছু নেই, আমি শুধু একটা কথা বলতে চাই তোমাকে। ফুটপাথ ঘেঁষে দাঁড়ানো একটা গাড়ির দরজা ঝট করে খুলে গেল এই সময়। উঠে পড়ো গাড়িতে, ব্যস্তভাবে বলল সে। তোমার সাথে আমার কথা আছে।

হ্যাঁচকা এক টান দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিল হেগেন। ঘাবড়ায়নি সে, ভয়ও পায়নি, শুধু বিরক্ত হয়েছে। এখন আমি সময় দিতে পারব না।

এই সময় পিছনে দুই জোড়া বুট জুতোর শব্দ কানে ঢুকল হেগেনের। নিমেষে সব বুঝে ফেলল সে। হঠাৎ অবশ, দুর্বল হয়ে উঠল তার পা দুটো।

নরম সুরে বলল সলোয়য, উঠে পড়ো। আমরা চাইলে এতক্ষণে তুমি মরে যেতে। তেমন কোন ইচ্ছে আমাদের নেই, বুঝতেই পারছ। আমাকে বিশ্বাস করতে পারো।

সলোযোকে বিশ্বাস না করেই গাড়িতে উঠল হেগেন।

.

হেগেনকে সত্যি কথাটা বলেনি মাইকেল কর্লিয়নি। নিউ ইয়র্কে আসলে সে আগেই পৌচেছে, ফোন করেছিল হোটেল পেনসিলভেনিয়ার একটা কামরা থেকে।

মাইকেল রিসিভার নামিয়ে রাখছে, ওর দিকে চোখ রেখে অ্যাশট্রেতে গুঁজে নিভিয়ে দিচ্ছে সিগারেটটা কে অ্যাডামসু, বলল, বাহ, চমৎকার মিথ্যে কথা বলতে পারো তো!

বিছানায় ওর পাশে বসল মাইকেল। পারি, বলল সে, শুধু তোমার জন্যে। বাড়ির ওরা যদি জানে এখানে রয়েছি আমরা, এক্ষুণি, ডেকে পাঠাবে। ডিনার, থিয়েটার, একসাথে ঘুমানো-চুলোয় যাবে সব। বিয়ের আগে এসব আমাদের বাড়িতে চলে না। কে-কে জড়িয়ে ধরল মাইকেল, আলতোভাবে একটা চুমো খেলো তার ঠোঁটে।

ধীরে ধীরে কে-কে বিছানার উপর শুইয়ে দিল মাইকেল। আদর পাবার উন্মুখ প্রত্যাশায় চোখ বুজে অপেক্ষা করছে কে। বড় মিষ্টি মুখ, অপার আনন্দে ভরাট মনে ভাবছে মাইকেল, যুদ্ধের রক্তাক্ত দিনগুলোয় ঠিক এই রকম মিষ্টি চেহারার একটা মেয়ের স্বপ্ন দেখত সে। কে-কে পেয়ে ধন্য হয়ে গেছে ও। জীবনের একটা দিবে সার্থকতা এসেছে ওর।

ডিনার খেয়ে থিয়েটার দেখতে যাবে, তার আগে পর্যন্ত সময়টা মত্ত আবেগে প্রেম করে কাটাল ওরা।

বাইরে বেরিয়ে ওরা দেখল উজ্জ্বল আলোকমালায় চারদিক ঝকমক করছে, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো উপচে পড়ছে ক্রেতার ভিড়ে। মাইক জানতে চাইল, বড়দিনের কি উপহার নেবে তুমি?

শুধু তোমাকে নেব, গাড়িতে মাইকের গা ঘেঁষে, তার একটা কাঁধে মাথ রেখে বলল কে। তোমার বাবা আমাকে পছন্দ করবেন বলে মনে হয়?

মৃদু গলায় বলল মাইকেল, সেটা বড় কথা নয়। তোমার মা বাবা আমাকে কিভাবে নেবেন, আমি তাই ভাবছি।

মাথা তুলল কে, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, যেভাবেই নিক, তাতে কিছু এসে যায় না।

আইনগত অধিকার নিয়ে নিজের নাম বদল করার কথাও ভেবেছি, বলল মাইকেল। কিন্তু কিছু যদি ঘটে, নাম বদলেও লাভ হবে না। তারপর ঠাট্টার সুরে জানতে চাইল, সত্যি তুমি কর্লিয়নি নামটা দিতে চাও?

প্রশ্নটাকে গাম্ভীর্যের সাথে নিল কে; দৃঢ় স্বরে বলল হ্যাঁ।

বড়দিনের হপ্তাটা শেষ হবার আগেই বিয়ে করবে বলে ঠিক করেছে ওরা। দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে গোপনে সারা হবে কাজটা। মাইকেল ভাবছে, ব্যাপারটা বাবাকে অন্তত জানানো দরকার। কিন্তু নিজের মা বাবা সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে কে-র। শুনেই ওরা ভাববে আমি অন্তঃসত্ত্বা, মাইকেলকে বলেছে সে।

মুচকি হেসে মাইকেল বলেছে, আমার ওরাওঁ তাই ভাববে, সন্দেহ নেই।

গীতি নাটক দেখে বাইরে বেরিয়ে এল ওরা, মাইকেলের গায়ে হেলান দিয়ে সে বলল, বিয়ের পর কি পেটাবে তুমি আমাকে, আর তারপর আকাশ থেকে পেড়ে এনে চাঁদ তারা উপহার দেবে?

হাসল মাইকেল, বলল, আমার উচ্চাশার কথা বলা হয়নি তোমাকে! গণিতের অধ্যাপক হব আমি। তারপর জানতে চাইল, হোটেলে ফেরার আগে কিছু খাবে নাকি?

মাথা নাড়ল কে। মাইকেলের চোখে চোখ রেখে অকারণ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল সে, মৃদু একটু শিউরে উঠল শরীরটা। সে পুলক অনুভব করছে, বুঝতে একটুও দেরি হলো না মাইকেলের। শীত লাগছে ওর। দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে রাখল কে কে, তারপর চুমো খেলো।

হোটেলের লবিতে পৌঁছে নিউজপেপার স্ট্যান্ডের দিকে কে-কে ঠেলে দিয়ে বলল মাইকেল, তুমি কাগজ কেননা, আমি চাবি আনতে যাচ্ছি।

চাবি নিয়ে ফিরতে একটু দেরি হলো মাইকেলের। অনেক লোকের ভিড় লবিতে, অধৈর্যের সাথে কে-কে খুঁজছে সে।

হাতে খবরের কাগজ নিয়ে এক ধারে দাঁড়িয়ে আছে কে, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাইকেলের দিকে। ওকে দেখতে পেয়েই পা চালিয়ে এগিয়ে এল মাইকেল।

কে-এর দুচোখ থেকে টপ টুপ করে দুফোঁটা পানি ঝরে পড়ল লবির মেঝেতে। মাইক! ও মাইক! ফুঁপিয়ে উঠল সে।

ছোঁ মেরে কাগজটা নিল মাইকেল, চোখের সামনে তুলেই দেখল বাবার ছবি, রাস্তার উপর খানিকটা রক্তের মাঝখানে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন তিনি। ছবিতে আরও দেখা যাচ্ছে, ফুটপাথ ঘেষে বসে কাঁদছে একজন লোক-মাইকেলের মেজো ভাই সে, ফ্রেডি। সাংঘাতিক একটা শীত অনুভব করছে মাইকেল-ভয় বা শোকে নয়, প্রচণ্ড আক্রোশ আর ক্রোধে। চাপা কণ্ঠে বলল ও, ঘরে চলো। কিন্তু হাত ধরে লিফটের কাছে নিয়ে যেতে হলো কে-কে। লিফটে উঠে কথা বলল না ওরা।

কামরায় ঢুকে খাটে বসল মাইকেল, কাগজটী খুলে পড়তে শুরু করল। হেডিংটা বড় বড় অক্ষরে ছাপা হয়েছে-তথাকথিত চোরাকারবারী ভিটো কলিয়নি গুলিতে আহত। কড়া পুলিশ প্রহরায় অস্ত্রোপচার। ব্যাপক রক্তক্ষয়ী গুণ্ডা-যুদ্ধের আশঙ্কা।

পায়ে জোর পাচ্ছে না মাইকেল। বাবা মারা যাননি। বাবাকে ওরা মেরে ফেলতে পারেনি, বিড়বিড় করে বলল ও। খবরটা পড়ল আরেকবার। বিকেল পাঁচটায় গুলি খেয়েছেন ডন। তারমানে, ভাবছে মাইকেল, কে-এর সাথে সে যখন, প্রেম করছিল, ডিনার খাচ্ছিল, নাটক উপভোগ করছিল বাবা তখন গুলি খেয়ে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছিলেন। সাংঘাতিক অপরাধী মনে হলো নিজেকে তার।

আমরা হাসপাতালে যাব? জানতে চাইল কে।

আগে বাড়িতে ফোন করা দরকার, বলল মাইকেল। বাবা বেঁচে গেছেন, শত্রুরা এখন বেপরোয়া হয়ে উঠবে। বুঝতে পারছি না কি চাল দেরে এখন ওরা।

বাড়ির দুটো টেলিফোনই এনগেজড, লাইন পাবার জন্যে বিশ মিনিট অপেক্ষা করতে হলো মাইকেলকে। হ্যাঁ, বলুন,শেষ পর্যন্ত সনির গলা পেল সে।

সনি, আমি মাইকেল।

বিরাট একটা হাঁফ ছাড়ল অপর প্রান্তে সনি, বলল, ও ভাই, বাঁচালি! তোর জন্যে কি দুশ্চিন্তাটাই না করছিলাম সবাই। কোথায় যে থাকিস! সেই গ্রামে লোক পাঠিয়েছি তোর খবর নিতে।

এসব কথার উপর কোন মন্তব্য করল না মাইকেল। কেমন আছেন বাবা? জানতে চাইল সে। বেশি লেগেছে?

বেশি মানে? সাংঘাতিক ভয়ঙ্কর লেগেছে! বলল সনি। পাঁচ পাঁচটা গুলি খেয়েছেন বাবা। তবে দুর্বল তো আর নন! গর্বের সুর ফুটে উঠল তার বলার ভঙ্গিতে। ডাক্তাররা সবাই বলছে সেরে উঠবেন। তুই কোথায় বল তো? সাংঘাতিক ব্যস্ত আমি, কথা বলতে পারছি না…।

নিউ ইয়র্কে, বলল মাইকেল, কেন, আমি আসছি একথা বলেনি টম?

কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলল সনি,টমকে হাইজ্যাক করেছে ওরা। সেজন্যেই তোর কথা ভেবে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। টমের স্ত্রী এখানে রয়েছে, কিন্তু সে বা পুলিশ এ ব্যাপারে কিছুই জানে না। ওরা জানুক তা চাইছি না আমি। এ কাজ যারা করেছে তারা নিশ্চয়ই পাগল। এক্ষুণি আসছিস তো? সাবধান, মুখ খুলবি না। কিছু বলবি?

না, বলল মাইকেল। এক মুহূর্ত বিরতি নিয়ে সংক্ষেপে জানতে চাইল সে, কারা, সনি?

জানি কারা, বলল সনি। লুকা ব্রাসিকে শুধু বলার অপেক্ষা, তারপরই দোকানে ঝোলানো মাংস হয়ে যাবে। ঘুটি সব এখনও আমাদের হাতে।

ট্যাক্সি নিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে আসছি, বলে ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখল মাইকেল।

চিন্তিত দেখাচ্ছে ওকে। ভাবছে। সনির কথায় বোঝা গেল লুকা ব্রাসি খবর পায়নি এখনও। কেন?

খবরের কাগজগুলো প্রেস থেকে ছেপে বেরুবার পর তিন ঘণ্টার বেশি পেরিয়ে গেছে। খবরটা নিশ্চয়ই রেডিওর মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে।.তবু লুকার কানে খবর যায়নি, তা কেমন করে হয়।

ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছে না মাইকেল। ভাবছে আর ভাবছে। কোথায় সে? কোথায় গেল লুকা ব্রাসি?

ঠিক তখন ঠিক এই প্রশ্নটা নিয়েই ভাবছে টম হেগেন।

লং বীচে সনিকর্লিয়নিও তাই ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে–লুকার হলো কি?

.

সেদিন বিকেলের ঘটনা।

জলপাই তেল কোম্পানির ম্যানেজারের তৈরি করা হিসাবের কাগজ-পত্র দেখা শেষ করে ডন কর্লিয়নি যখন উঠলেন তখন পৌনে পাঁচটা বাজে। কোটটা গায়ে চড়িয়ে মেজো ছেলের মাথায় আস্তে একটা গাট্টা মারলেন তিনি, বললেন, গাড়ি নিয়ে আসতে বলো গাটোকে। বাড়ি যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছি আমি।

বিরক্তির সাথে বলল ফ্রেডি, সেই আমাকেই গাড়ি আনতে যেতে হবে। সকালে ধ্ৰুলি জানিয়েছে শরীর খারাপ তার, ফের সর্দি লেগেছে।

একটু চিন্তিত হলেন ডন কর্লিয়নি, বললেন, এই মাসে পরপর তিনবার শরীর খারাপ করল ওর। টমকে বলবে এ-কাজের জন্যে ভাল স্বাস্থ্যের একজন লোক চাই।

সরল মনে ফ্রেডি বলল, পলি কিন্তু ভাল ছেলে। অসুখের নাম করে কঁকি, দিচ্ছে, তা নয়। নিশ্চয়ই শরীর খারাপ হচ্ছে ওর। গাড়ি নিয়ে আসা, এতে আর কষ্ট কি! অফিস কামরা থেকে বেরিয়ে গেল সে।

হেগেনের অফিসে ফোন করলেন ডন কর্লিয়নি, কিন্তু তাকে পেলেন না। ফোন করে বাড়ি থেকেও কারও সাড়া পেলেন না। বিরক্ত হয়ে জানালা দিয়ে বাইরে। তাকালেন তিনি। দালানের সামনে গাড়ি নিয়ে এসেছে ফ্রেডি দেখতে পেলেন। ফেণ্ডারে হেলান দিয়ে বুকের উপর হাত দুটো ভাজ করে অপেক্ষা করছে সে।

ওভারকোট পরতে ডনকে সাহায্য করল ম্যানেজার। মৃদু গলায় ধন্যবাদ জানিয়ে দরজার দিকে এগোলেন তিনি। দুই প্রস্থ সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামলেন, তারপর বেরিয়ে এলেন রাস্তায়।

শীতের ছোট দিন, এখুনি কমে এসেছে দিনের আলো বাবাকে দেখে সিধে হয়ে দাঁড়াল ফ্রেডি, তারপর বুইকটাকে ঘুরে ওপাশের দরজা দিয়ে ড্রাইভিং সীটে উঠে বসল।

ফুটপাথ থেকে গাড়িতে উঠতে গিয়ে একটু ইতস্তত করছেন ডন কর্লিয়নি। শেষ পর্যন্ত উঠলেন না গাড়িতে। মোড়ের কাছাকাছি ফলের একটা দোকান, সেদিকে এগোচ্ছেন।

অসময়ের ফল, দেখতে বড় ভাল লাগছে ডন কর্লিয়নির। সবুজ রঙের বাক্সে সাজানো হলুদ পীচ, কমলালেবু জুলজুল করছে। এই দোকানটার দিকে পা বাড়ানো আজকাল একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে তার। তাঁকে দেখে একেবারে লাফ দিয়ে উঠল দোকানের মালিক। হাত দিয়ে না ছুঁয়ে আঙুল তুলে ফলগুলো দেখাচ্ছেন তিনি। তার বাছাইয়ের সমালোচনা করে একবার শুধু দোকানদার দেখিয়ে দিল একটা ফলের নিচের দিকে পচন ধরেছে। কাগজের ঠোঙাটা বাঁ হাতে নিয়ে দোকানদারকে পাঁচ ডলারের একটা নোট দিলেন তিনি। কি পয়সা ফেরত নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে যাবেন, ঠিক এই সময় রাস্তার বাঁকে হাজির হলো দুজন লোক। ওদেরকে দেখামাত্র বুঝলেন তিনি, এবার কি ঘটবে।

কালো ওভারকোট পরে আছে ওরা। কপালের উপর টেনে নামানো কালো টুপি, চেহারা যাতে চিনতে পারা না যায়। ডনকর্লিয়নি সতর্ক হয়ে উঠবেন, তা ওরা ভাবতেই পারেনি। নিমেষে বিদ্যুৎ খেলে গেল ডন কর্লিয়নির শরীরে। এমন ভারি একজন মানুষ, কিন্তু তার কি আশ্চর্য ক্ষিপ্রতা! ফলের ঠোঙা ফেলে দিয়ে ঝড়ের বেগে দৌড়াচ্ছেন গাড়ির দিকে। সেই সাথে চিৎকার করে সতর্ক করছেন ছেলেকে, ফ্রিডো! ফ্রিডো!

এতক্ষণে হুঁশ ফিরুল আততায়ীদের, সাথে সাথে পিস্তল তুলে গুলি করতে শুরু করল ওরা।

প্রথম গুলির আঘাতটা হাতুড়ির বাড়ির মত পিঠে অনুভব করলেন ডন কর্লিয়নি। কিন্তু কিছুই হলো না তার, এখনও তিনি দৌড়াচ্ছেন গাড়ির দিকে। এরপর একই সাথে দুটো গুলি বিদ্ধ করল তাকে। দুটোই লাগল নিতম্বে। ছিটকে রাস্তার একধারে পড়ে গেলেন তিনি।

রাস্তায় গড়িয়ে পড়েছে ঠোঙার ফলগুলো, সেগুলোয় পা লেগে পিছলে যাবার ভয়ে খুব সাবধানে এগিয়ে আসছে আততায়ীরা। কাছে এসে পড়েছে। ডন কৃর্লিয়নিকে এবার ওরা শেষ করার জন্যে গুলি করতে যাচ্ছে।

ডন কর্লিয়নি ছেলের নাম ধরে ডাকার পর ইতিমধ্যে মাত্র পাঁচ সেকেণ্ড পেরিয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে ছাদের উপর দিয়ে উঁকি মেরে ব্যাপারটা কি বোঝার বা দেখার চেষ্টা করেছে সে।

কাছ থেকে আততায়ীদের হাতের পিস্তল গর্জে উঠল আবার। একটা গুলি ডনের মাংসল বাহুতে, অপরটা ডান পায়ের গোড়ালিতে লাগল। তার শরীরের পাশে রক্তের ছোট ছোট পুকুর তৈরি হচ্ছে। ইতিমধ্যে তিনি জ্ঞান হারিয়েছেন।

নার্ভাস হয়ে গাড়ি থেকে নামার সময় শোল্ডার হোলস্টার থেকে পিস্তলটা বের করেনি ফ্রেডি। খুনীরা ইচ্ছে করলে মেরে ফেলতে পারে তাকে। কিন্তু ফ্রেডির কাছে পিস্তল আছে ভেবে, এবং এমনিতেই কাজটায় দেরি হয়ে গেছে বলে ওরা আর সময় নষ্ট না করে ছুটে পালাতে শুরু করল, চোখের পলকে বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। রক্তাপ্লুত বাপকে নিয়ে রাস্তায় ফ্রেডি একা।

পথিকরা সবাই এখানে সেখানে গা ঢাকা দিয়েছে, কেউ কেউ সটান শুয়ে পড়েছে রাস্তার উপর। অনেকক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল ফ্রেডি। লাল, রক্তের পুকুরে নিঃসাড় পড়ে থাকা বাপের দিকে বুদ্ধর মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সে। ইতিমধ্যে রাস্তায় লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। টলে পড়ে যাচ্ছে দেখে কেউ একজন তাকে ধরে বসিয়ে দিল ফুটপাথের কিনারায়।

ভিড় জমে গেছে রাস্তায়। তীক্ষ্ণ সাইরেনের আওয়াজ তুলে ঝড়ের বেগে ছুটে এল পুলিশের প্রথম গাড়িটা। সেটার পিছনেই ডেইলি নিউজের রেডিও কার। কারটা তখনও থামেনি, লাফ দিয়ে নেমে রক্তাক্তনকর্লিয়নির ছবি তুলছে ফটোগ্রাফার।

অ্যাম্বুলেন্স এল আরও একটু পর। ফ্রেডি কাঁদছে, এবার তার উপর নজর পড়ল ফটোগ্রাফারের। বড় সড় মুখ, পুরু ঠোঁট, বিরাট নাক, অথচ চেঁচিয়ে কাঁদছে লোকটা-দৃশ্যটা মজার বলে মনে হলো ফটোগ্রাফারের।

একের পর এক আরও কয়েকটা পুলিশের গাড়ি এসে পৌঁছুল। ফ্রেডির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল একজন ডিটেকটিভ, জেরা করছে তাকে। হতভম্ব ফ্রেডি অবশ্য তার একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারল না। অবস্থাটা বুঝতে পেরে নিজেই তার পকেটে হাত ঢুকিয়ে আইডেনটিটি কার্ডটা বের করে নিল ডিটেকটিভ। তারপর শিস দিয়ে কাছে ডাকল সহকারীকে।

এক মুহূর্ত পর সাদা পোশাক পরা একদল ডিটেকটিভ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল ফ্রেডিকে। তার শোল্ডার হোলস্টার থেকে বের করে নেয়া হলো পিস্তলটা। তারপর দাঁড় করানো হলো তাকে, নাম্বার প্লেটহীন একটা গাড়িতে ভোলা হলো, ভিড়ের মাঝখান দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে চলে গেল গাড়িটা। সেটাকে অনুসরণ করল রেডিও কার।

.

ডন কর্লিয়নি গুলি খাবার আধঘণ্টার মধ্যে পর পর পাঁচটা টেলিফোন পেল সনি কর্লিয়নি। ডিটেকটিভ জন ফিলিপস ওদের টাকা খায়, সেই করল প্রথম টেলিফোন। পুলিশের প্রথম গাড়িতে চড়ে অকুস্থলে গিয়েছিল সে।

আমার গলা চিনতে পারছ? জানতে চাইল ফিলিপস।

পারছি, বলল সনি। এইমাত্র ঘুম থেকে তুলেছে তাকে স্ত্রী। শরীরটা তাজা ঝরঝরে।

কোন ভূমিকা করল না ফিলিপস। বলল, অফিসের বাইরে কেউ তোমার বাবাকে গুলি করেছে। এই মিনিট পনেরো আগে। ফ্রেঞ্চ হাসাপাতালে আছেন উনি। আঘাতগুলো মারাত্মক। ফ্রেডিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছেচেলসি থানায়, ছাড়া পেলেই একজন ডাক্তারকে দিয়ে ওকে পরীক্ষা করিয়ে নিলে ভাল হয়। আমি এখন হাসপাতালে যাচ্ছি, যখন যা খবর হয় জানাব তোমাকে।

স্বামীর চেহারা লাল, ৰীভৎস হয়ে উঠতে দেখে ভয় পেয়ে গেল সা; ফিসফিস করে জানতে চাইল, কি হয়েছে?

অধৈর্যের সাথে স্ত্রীকে চুপ করতে ইশারা করে সনি প্রশ্ন করল, বাবা বেঁচে আছেন কিনা ঠিক জানো?

জানি, বলল ফিলিপস। মারাত্মক ভাবে আঘাত পেয়েছেন, তবে বেঁচে আছেন।

ধন্যবাদ। হাজার ডলার পাবে,কাল সকালে। বাড়ি থেকো।

ফোন নামিয়ে রেখে নিজেকে স্থির রাখার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করছে,সনি। জানে, প্রচণ্ড রাগই হলো ওর নিজের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা। এবং এটা এমন একটা অভাবিত পরিস্থিতি যখন এই রাগই গোটা পরিবারটার সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে।

সবচেয়ে আগে দরকার টমকে খবর দেয়া। ফোনের দিকে হাত বাড়াতে যাচ্ছে সনি, ঝন ঝন শব্দে বেজে উঠল সেটা। ঘোড়দৌড়ের একজন বুক মেকারের ফোন, টাকা দিয়ে ডনের অফিস এলাকায় রাখা হয়েছে তাকে। জানাল, ডন কর্লিয়নি মারা গেছেন। সনি জেরা করে বুঝল বুক মেকারকে যে খুবরটা দিয়েছে সে ডনের কাছাকাছি যায়নি। ডিটেকটিভ ফিলিপসের খবরটাই সত্যি, নতুন খবরটাকে গুরুত্ব দিল না সে। এরপরই ফোন করল ডেলি নিউজের রিপোর্টার। সে নিজের পরিচয় দিতেই যোগাযোগ কেটে দিল সনি।

এবার হেগেনের বাড়িতে ফোন করল সে। টম ফিরেছে?

না।

হেগেনের স্ত্রীকে বলল সনি, টম বাড়ি ফিরলেই আমাকে যেন ফোন করে।

নিঃশব্দে বসে ভাবছে সনি। কাজটা যে সলোযোর তা সে প্রথমেই ধরে নিয়েছে। কিন্তু ডনের মত মহারথীকে আক্রমণ করার দুঃসাহস তার থাকতে পারে না। তার মানে একাজে অন্যান্য ক্ষমতাবানদের সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছে সে।

আবার টেলিফোন। অপরপ্রান্তের কণ্ঠস্বর আশ্চর্য নরম আর অস্বাভাবিক শান্ত লাগল সনির কানে। কে, সান্তিনো কর্লিয়নি?

বলছি।

টম হেগেন আমাদের হাতে, অপর প্রান্ত থেকে বলছে লোকটা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে তাকে, আমাদের প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছে সে। আগে তার মুখ থেকে আমাদের বক্তব্য শুনুন, তার আগে কিছু করে বসবেন না, তাতে শুধু অশান্তিরই সৃষ্টি হবে। যা হবার তা তো হয়েই গেছে, এবার মাথা ঠাণ্ডা রেখে বুদ্ধিমানের মত নির্দেশ মেনে চলতে হবে সবাইকে। দয়া করে আপনার সেই বিখ্যাত রাগটা দেখাবেন না! কণ্ঠস্বরে মৃদু ব্যঙ্গের সুর। সনির মনে হলো, গলাটা সলোযোর হতে পারে।

নিচু, ম্লান সুরে সে বলল, বেশ। ক্লিক করে একটা শব্দ হলে সাথে সাথে। চট করে রিস্টওয়াচটা দেখে নিল সে, তারপর টেলিফোন কলটার নির্দিষ্ট সময় টেবিল কুথের উপর লিখে রাখল।

রান্নাঘরের টেবিলে মাথা নিচু করে বসে ভাবছে সনি।

কি হয়েছে, সনি? জানতে চাইল সাণ্ডা।

স্ত্রীর দিকে তাকাল সনি। বাবাকে গুলি করেছে ওরা, শান্ত ভাবে বলল সে। কিন্তু সাণ্ডার মুখ বিকৃত হয়ে উঠছে দেখে মারমুখো হয়ে উঠে কর্কশ গলায় আবার বলল, চেঁচামেচিকোরো না, বাবা বেঁচে আছেন। ভয়ের আর কিছু নেই।

আবার ফোন এসেছে।

মোটাসোটা ক্লেমেঞ্জা হাঁপাচ্ছে অপর প্রান্তে। তোমার বাবার খবর পেয়েছ?

তবে মারা যাননি তিনি, বলল সনি। তারপর দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।

অবশেষে নিস্তব্ধতা ভাঙল ক্লেমেঞ্জাই, আবেগে রুদ্ধ হয়ে উঠছে তার কণ্ঠস্বর। থ্যাঙ্ক গড! থ্যাঙ্ক গড! পরমুহূর্তে উদ্বেগের সাথে বলল, ঠিক খবর পেয়েছ? আমি শুলাম।

বাবা বেঁচে আছেন, বলল সনি। ক্লেমেঞ্জা র প্রতিটি উচ্চারণের উত্থান পতন, স্বরের সূক্ষ্ম ভাব ইত্যাদি গভীর মনোযোগের সাথে শুনতে চেষ্টা করছে সে। আবেগটাকে খাঁটি বলেই মনে হলো তার। কিন্তু সেই সাথে একথাও মনে পড়ে গেল যে ভাল অভিনয় করাটা এই লোকের কাজেরই একটা অঙ্গ।

খেলা এবার তোমাকে চালিয়ে যেতে হবে, বলল ক্লেমেঞ্জা। কি করতে হবে বলে দাও আমাকে।

বাবার বাড়িতে চলে যাও তুমি, পলি গাটোকে ডেকে নাও।

হাসপাতালে আর তোমাদের বাড়িতে লোক পাঠাতে হবে না?

না, বলল সনি। শুধু তোমাকে আর পলি গাটোকে চাই আমি।

আবার দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ থাকল ওরা। ব্যাপারটা কি বোঝার চেষ্টা করছে ক্লেমেঞ্জা।

পরিবেশটাকে একটু স্বাভাবিক করার জন্যে আবার বলল সনি, সে হারামজাদা করছেটা কি? গেছে কোথায়?

এখন আর হাঁপাচ্ছে না ক্লেমেঞ্জা। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কথা বলছে সে। সর্দি লেগেছে বলে বাড়ি থেকে আর বেরোয়নি পলি। শীতকালটা অসুখ বিসুখেই কাটল ওর।

হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠল সনি। গত দুমাসে কবার বাড়ি ছেড়ে বেরোয়নি ও, জানো?

বেশ কয়েকবার তো হবেই,বলল ক্লেমেঞ্জা। আমি তো হাজার বার জিজ্ঞেস করেছি অন্য লোক দরকার কিনা; কিন্তু ফ্রেডির একই উত্তর, দরকার নেই। বিপদ আপদ দেখা দেয়নি, দশটা বছর নির্বিমে কেটেছে, তাই তেমন গুরুত্ব দিইনি

হু, বলল সনি। পলিকে নিয়ে বাবার বাড়িতে এসো, ওখানে দেখা হবে। রিসিভারটা খটাং করে রেখে দিল সে।

খুঁপিয়ে কাঁদছে সাণ্ডা, তার দিকে তাকিয়ে বেসুরো গলায় বলল সনি, নিজেদের লোক ফোন করলে বাবার ব্যক্তিগত নাম্বারে পাওয়া যাবে আমাকে। আর কেউ ফোন করলে কিছু জানো বলে স্বীকার করবে না। টমের স্ত্রীকে বলবে, কাজে বেরিয়েছে, ফিরতে দেরি হবে টমের। একটু চিন্তা করল সে, তারপর আবার বলল, দুজন লোককে এখানে রেখে যাচ্ছি। সাার চোখে ভয় দেখে বিরক্ত হলো সে। ভয় পেয়ো না, বেশি, অস্থির হয়ো না-খুব জরুরী না হলে ফোন কোরো না আমাকে।

বাইরে বেরিয়ে এল সনি। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, ডিসেম্বরের শীতল বাতাস ছুটোছুটি করছে প্রাঙ্গণ জুড়ে। রাতে একা বেরিয়ে একটুও ভয় পেল না সনি। এবানের সবগুলো, অর্থাৎ আটটা বাড়ির মালিক তারাই। প্রাঙ্গণে ঢোকার মুখে দুপাশের বাড়ি দুটো পারিবারিক অনুচরদের কাছে ভাড়া দেয়া হয়েছে, স্ত্রী পুত্র আর অতিথিদের নিয়ে থাকে তারা। এইসব বিশেষ অতিথিদের কোন পিছুটান নেই, সবাই তারা হাত পা ঝাজা পুরুষ মানুষ। এরা থাকে বেসমেন্টে। অর্ধবৃত্তাকারে সাজানো বাকি ছয়টার একটছবাড়িতে সপরিবারে থাকে টম হেগেন, আরেকটাতে থাকে সনি। ছোট এবং সাদাসিঁধে বাড়িটিতে থাকেন ডন। অপর বাড়িগুলোতে বিনা ভাড়ায় থাকতে দেয়া হয়েছে ডনর অবসর প্রাপ্ত বন্ধুদেরকে। তবে ডন চাইলেই তারা বাড়ি খালি করে দেবে। নিরীহুদর্শন বিশাল প্রাঙ্গণটা আসলে একটা দুর্গম দু। বিশেষ। প্রতিটি বাড়িতে ফ্লাড লাইটের ব্যবস্থা আছে।

রাস্তা পেরিয়ে বাবার বাড়িতে ঢুকল সনি, নিজের চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে পা দিয়েই চেঁচিয়ে উঠল, মা?

মিষ্টি লঙ্কা ভাজার গন্ধ নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সনির মা। একটা হাত ধরে তাকে চেয়ারে বসিয়ে দিল সনি, বল, তৈরি হয়ে নাও, হাসপাতালে যেতে হবে। ব্যস্ত হবার কিছু নেই, বাবা আহত হয়েছেন।

একদৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি ইতালীয় ভাষায় বললেন, ওরা বুঝি গুলি করেছে ওকে?

মাথা ঝাঁকাল সনি। চোখ নামিয়ে নিলেন সনির মা, তারপর ফিরে এলেন রান্নাঘরে। তার পিছু পিছু সনিও এল। দেখল, চুলোটা ভোলেন তিনি, তারপর আবার বেরিয়ে গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন উপর তলায়। প্লেট থেকে কয়েকটা মিষ্টি লঙ্কা আর ঝুড়ি থেকে একটু রুটি ছিঁড়ে নিয়ে আনাড়ি হাতে একটা স্যাণ্ডউইচ তৈরি করল সনি, তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে নামছে গরম জলপাই তেল।

এর একটু পর সর্বশেষ প্রান্তের বাবার অফিস কামরায় এল সনি, তালা মারা একটা বাক্স থেকে তাঁর ব্যক্তিগত টেলিফোনটা বের করল।এটা একটা বিশেষ টেলিফোন, নাম ঠিকানা সব ভূয়া।

প্রথমে সনি ফোন করল লুকা ব্রাসিকে। অপরপ্রান্তে সাড়া নেই কারও। এরপর ফোন করল টেসিওকে। লোকটা ব্রুকলিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার মাথা, ডমের প্রতি এর আনুগত্য সম্পর্কে কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না।

খবরটা জানিয়ে দ্রুত কয়েকটা নির্দেশ দিল সনি টেসিওকে। অতি বিশ্বস্ত পঞ্চাশজন প্রহরীর ব্যবস্থা করতে হবে তাকে, হাসপাতাল পাহারা আর লং বীচে কাজ করতে যেতে হবে তাদেরকে।

তবে কি ওরা ক্লেমেঞ্জাকেও সাবাড় করেছে? জানতে চাইল টেসিও।

ঠিক এক্ষুণি ক্লেমেঞ্জার লোকজনকে কাজে লাগাচ্ছি না, বলল সনি।

অনেক কিছু বুঝে নিল টেসিও। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বলল সে, কিছু মনে কোরো না, সনি। তোমার বাবা এখন ঠিক যে কথাগুলো বলতেন, আমি তাই বলছি-ধীরেসুস্থে এগোও, বেশি তাড়াহুড়ো করতে যেয়ো না। ক্লেমেঞ্জা বিশ্বাসঘাতক এ আমি বিশ্বাস করি না।

ধন্যবাদ, টেসিও, বলল সনি। বিশ্বাস আমিও করি না, কিন্তু তৰু সাবধান হওয়া উচিত নয় কি?

উচিত।

আরেকটা কাজের কথা; বলল সনি। বোস্টন থেকে বিশ্বস্ত কয়েকজন লোককে নিউ হ্যাম্পশেয়ারের হ্যানভার কলেজে পাঠাও, তারা মাইকেলকে এখানে এ বাড়িতে নিয়ে আসবে। গণ্ডগোল মেটা না পর্যন্ত ওকে বাইরে রাখতে চাই না। এক্ষেত্রেও শুধু সাবধান হতে চাইছি আমি, তার বেশি কিছু নয়।

ঠিক আছে, বলল টেসিও। সবাইকে কাজে লাগিয়ে দিয়ে আমিও আসছি তোমার কাছে। আমার সব লোককে তুমি তো চেনো, তাই না?

হ্যাঁ, রিসিভার রেখে দিল সনি। ওয়ালসেফ খুলে নীল রঙের চামড়া দিয়ে বাঁধানো একটা খাতা বের করল সে। ইনডেক্স নাম্বার দেখে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠায় চোখ রেখে দেখল তাতে লেখা রয়েছে রে ফ্যারেল, পাঁচশো ডলার, খৃস্টমাস ঈভ! এর নিচে টোকা রয়েছে একটা ফোন নাম্বার।

সেই নাম্বারে ডায়াল করে বলল, ফ্যারেল?

হ্যাঁ।

আমি সনি কর্লিয়নি। তোমার কাছ থেকে এখুনি একটু কাজ চাই আমি। তোমাকে দুটো ফোন নাম্বার দিচ্ছি। গত তিন মাস আগে থেকে আজ পর্যন্ত কত কল কোথা থেকে কোথায় আসা-যাওয়া করেছে, সব আমাকে জানাতে হবে। এরপর ফ্যারেলকে পলি গাটো আর ক্লেমেঞ্জার ফোন নাম্বার জানাল সনি। জরুরী কাজ। রাত বারোটার মধ্যে জানতে চাই আমি। বড়দিনটা যাতে তোমার আরও আনন্দে কাটে তার ব্যবস্থা করব।

আরেকবার ফোন করল সে লুকা ব্রাসির নাম্বারে। উত্তর নেই। দুশ্চিন্তাটাকে মন থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করল সে। একবার খবর পেলেই হয়, ভাবছে সে, সাইক্লোনের মত ছুটে আসবে লুকা।

রিভলভিং চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে সনি। একটু পরই আত্মীয়-স্বজনে গিজগিজ করবে বাড়ি। কার ঘাড়ে কি দায়িত্ব চাপাতে হবে সব ঠিক করতে হবে তাকে। নিরিবিলিতে বসে এই প্রথম টের পাচ্ছে সে পরিস্থিতিটা কতটুকু বিপজ্জনক।

কর্লিয়নি পরিবারকে আজ দশ বছর পর আবার যুদ্ধে ডাকা হয়েছে। তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করার সাহ৷ কারও থাকতে পারে, দুঃস্বপ্নেও কেউ ভাবেনি একথা। পিছনে সলোযো রয়েছে, কিন্তু নিউ ইয়র্কের বড় বড় পাঁচটি পরিবারের মধ্যে কমপক্ষে একটির সমর্থন ছাড়া এ-কাজের কথা ভাবতেও সাহস পায়নি সে।

টাটাগ্লিয়া পরিবারের কথাতেই নেচেছে সলোযো, ভাবছে সনি। এখন কি হবে? হয় সামগ্রিক যুদ্ধ, নয় সলোহোর শর্তে আপোস। চতুর তুর্ক আকস্মিক দারুণ ফন্দি এঁটেছিল, কিন্তু ওর কপাল খারাপ। বাবা মারা গেলে বিকল্প উপায়টার কথা ভাবা যেত। কিন্তু বাবা বেঁচে আছেন। এর একটাই মানে, সামগ্রিক যুদ্ধ।

সে-যুদ্ধের পরিণাম কি? আপন মনে মুচকি একটু হাসল সনি। কর্লিয়নি পরিবারের হাতে বিশেষ ক্ষমতা এবং লুকা ব্রাসি রয়েছে, সুতরাং এই যুদ্ধের পরিণাম একটাই হতে পারে।

তবু খুঁত খুঁত করছে সনির মনটা। লুকা ব্রাসি গেল কোথায়?

১.৩ পিছনের সীটে বসাল ওরা হেগেনকে

০৩.

পিছনের সীটে বসাল ওরা হেগেনকে। ওর দুপাশে উঠে বসল দুজন লোক। সামনের সীটে, ড্রাইভারের পাশে বসেছে সলোযো।

ওর দিকে একটা হাত এগিয়ে আসছে দেখে ছ্যাৎ করে উঠল হেগেনের বুক। ডান পাশের লোকটা হেগেনের টুপিটা ধরে নিজের দিকে টেনে চোখ দুটো আড়াল করে দিল। নড়বে না, উত্তেজিত চাপা কণ্ঠে বলল সে।

বিশ মিনিট পর থামল গাড়ি। নিচে নামতে বলা হলো হেগেনকে। কোন প্রশ্ন বা প্রতিবাদ না করে নামল হেগেন। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, জায়গাটা চিনতে পারছে না সে। একটা বাড়ির উঠান বলে মনে হলো।

কড়া পাহারা দিয়ে বেসমেন্টের একটা কামরায় নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। শক্ত কাঠের খাড়া পিঠওয়ালা একটা চেয়ারে বসতে বলা হলো। টেবিলের অপর দিকে একটা চেয়ারে বসল, সলোযো। তার সেই আগের চেহারা নেই এখন আর। ঘামে পিচ্ছিল মুখে শকুনের শঠতা প্রকাশ পাচ্ছে।

দেখো, টম, এর মধ্যে তোমার বিপদের কোন আশঙ্কা নেই, সলোযো আন্তরিকতার ভান করছে, অভয় দিয়ে হেগেনের মাথাটাকে ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করছে। শক্তি প্রয়োগের দিকটা তোমার এক্তিয়ারের বাইরে, আমি জানি।

কি চান আপনি? ঠোঁটে একটা সিগারেট তুলল হেগেন। হাত দুটো কাঁপছে। সলোমোর চোখে চোখ রেখে উত্তরের অপেক্ষায় আছে সে।

ঠক করে আওয়াজ হলো টেবিলে। ঘাড় ফেরাতেই হেগেন দেখল একজন লোক হুইস্কিভর্তি একটা গ্লাস রেখে সরে যাচ্ছে দরজার দিকে। নিঃশব্দে গ্লাসটা তুলে নিল হেগেন। ইচ্ছা করছে এক নিঃশ্বসে সবটুকু খেয়ে ফেলতে কিন্তু তা সে করল না। একটু একটু করে চুমুক দিল দুবার। সলোহোর চোখে চোখ রাখল। আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। হাত দুটো স্থির হয়ে গেছে তার। পায়ে এখন জোর পাচ্ছে।

ডন কর্লিয়নি নেই…

মুখে কোন প্রতিক্রিয়া নেই হেগেনের, কিন্তু নিমেষের মধ্যে দুচোখ থেকে ঝর ঝর করে পানি নামতে শুরু করল। আশ্চর্য হয়ে গেল সলোযো। গভীরভাবে, সগর্বে আবার বলল সে, ওকে আমরা ওর অফিসের বাইরে খুন করেছি। পাকা খবর পেয়েই এখানে নিয়ে এসেছি তোমাকে, কিছু কথা বলার জন্যে।

পাথর হয়ে গেছে হেগেন। চোখের পাতা নড়ছে না, শুধু পানি ঝরছে। শোকের গভীরতা অনুভব করে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে সে। একটা হাহাকার ধ্বনি ছাড়া কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। জীবনে কখনও এমন নিঃসঙ্গ বোধ করেনি সে। কেউ যদি এসে বলত, হেগেন, তুমি মারা গেছ-তাহলেও বুঝি এমন অসহায় বোধ করত না। ধীরে ধীরে শোকের প্রকোপ কমে আসছে। মৃত্যুর কথা ভাবছে এখন হেগেন। সলোযোকে ভয় পাচ্ছে, ঠিক তা নয়। দুনিয়ার সব কিছুই এখন ভীতিকর মনে হচ্ছে তার। ডন নেই, তাই স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে গেছে সে, আর দুর্বল হলে যা হয়, মৃত্যুর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।

সনি এখন কর্লিয়নি পরিবারের হাল ধরবে, চতুর শিয়ালের মত লাগছে সলোযোকে। হাসছে সে। ডনকে সরিয়ে ওর উপকারই করেছি আমি, কি বলে? বাপ বেঁচে থাকতে ওর কোন আশা ছিল না। একটু থেমে কণ্ঠস্বরটাকে দরাজ করুল সে, ডনের ওপর আমার ব্যক্তিগত কোন আক্রোশ ছিল না, এটা তোমাকে বুঝতে হবে, হেগেন। আমার ব্যবসার স্বার্থ ডন রক্ষা করতে রাজি হয়নি, কিন্তু তার ছেলে সনি বেশ একটু আগ্রহ দেখিয়েছে, সুতরাং সনিকে সুবিধে মত জায়গায় তুলে না দিয়ে উপায় ছিল না আমার।

চিন্তাশক্তি দ্রুত ফিরে পাচ্ছে হেগেন।, সনির সেই ভুলটা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এ ভয় অনেক আগেই হয়েছিল তার। ওর বিশ্বাস, ডনও ব্যাপারটা বুঝেছিলেন। হেগেনের চিন্তায় বাধাপড়ল। সলোযো আবার কথা বলছে।

আমার প্রস্তাবটা সবদিক থেকে ভাল,কণ্ঠস্বরে কাঠিন্য ফুটে উঠল সলোযোর। তাছাড়া বুদ্ধি দিয়ে বিবেচনা করলে তুমিও বুঝতে পারবে আমার প্রস্তাবটা গ্রহণ করাই তোমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। সত্যি কথা বলতে কি, এছাড়া তোমার উপায়ও নেই। একটু থেমে সলোযো আবার বলল, এর চেয়ে ভাল ব্যবসা আর হয় না। সংশ্লিষ্ট আমরা সবাই বছর দুয়েকের মধ্যে বিরাট ধনী হয়ে যাব। ডন কর্লিয়নি ছিল সেকেলে, কিন্তু তোমরা সেকেলেও নও, বোকাও নও–অন্তত আমার তাই ধারণা। তাই বলছি, নতুন করে সমঝোতা করি এসো। আমি চাই সনিকে সঠিক বুদ্ধি যোগান দিয়ে আমার প্রস্তাবে রাজি করাও ওকে তুমি।

একটুও উত্তেজনার ছাপ নেইহেগেনের চেহারায়। খুব সহজভাবে, কিন্তু পরিপূর্ণ দৃঢ় নিশ্চয়তার সাথে কলল, যা ভাবছেন তা ভুলে যান। কোন আশা নেই আপনার। সনিকে আপনি এখনও চেনেননি। ওর আক্রোশ থেকে আপনার রেহাই নেই। সমস্ত শক্তি দিয়ে আপনার বিরুদ্ধে লাগবে ও।

অধৈর্যের সাথে সলোযো বলল, রগচটা লোক সে, আমরা সবাই তা জানি। আমাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলার ইচ্ছে হবে তার, ঠিক, কিন্তু, সেটা হবে তার প্রথম প্রতিক্রিয়া। তারপর মাথা ঠাণ্ডা হবে, চিন্তাশক্তি ফিরে পাবে। তখনই বৃদ্ধির আলোতে সামনের পথটা দেখতে সাহায্য করবে তাকে তুমি। সলোযো একটু থেমে আবার বলল, সমস্ত শক্তি দিয়ে আমাকে সাহায্য করছে টাটাগ্লিয়ারা। ডন না থাকায় তোমাদের শক্তি কতটা কমে গেল তা সনিকে বোঝাতে হবে তোমার। সামগ্রিক যুদ্ধ কেউই চায় না, তাই নিউইয়র্কের আর সব পরিবারগুলো চাইবে একটা আপোস হয়ে যাক, অর্থাৎ তারাও আমাকে সমর্থন দেবে। লড়াই রেধে গেলে ব্যবসার অপূরণীয় ক্ষতি হয়, সেই ঝুঁকি কেউ নিতে রাজি হবে না। সনিকে তোমার বোঝাতে হবে, ওদের সবার সমর্থন হারাবার মত বোকামি সে যেন না করে। তাছাড়া, আল জিনিসই হারিয়ে ফেলেছ তোমরা, লড়াই করে কিছু লাভ করতে পারবে না। মাথা নাড়তে শুরু করল সলোযা, তবে গোটা ব্যাপারটা এখন নির্ভর করছে সনির ওপর। সে আমার সাথে রাগ করলে এ দেশের সবকটা পরিবার ভাববে ব্যাপারটার সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। ডন কর্লিয়নির সুহৃদরাও স্বস্তির সাথে তাই ভাববে।

মাথা নিচু করে নিজের হাতের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে আছে হেগেন। নিচু গলায় তাকে পটাতে চেষ্টা করছে সলোযো। আগের সেই প্রচণ্ড প্রতাপ ছিল না ডনের। তার শক্তি কমে যাচ্ছিল। তা নাহলে এমন বে-কায়দায় তাকে পাই? তারপর তোমার ব্যাপারটাই ধরো, তুমি ইতালীয় পর্যন্ত নও, সিসিলীয় হওয়া তো দূরের কথা, অথচ তোমাকে সে কনসিলিয়রি করল–অন্যান্য পরিবারগুলো ব্যাপারটা খুব খারাপ ভাবে নিয়েছে। ডন কর্লিয়নির ওপর তারা আস্থা হারিয়েছিল।

হেগেনের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে সঁলোযো। এত কথায় কিছু কাজ হচ্ছে কিনা বোঝার চেষ্টা করছে সে। কিন্তু হেগেনের মুখ যেন পাথর দিয়ে খোদাই করা, ভাবের কোন প্রকাশ সেখানে নেই।

আমাকে আবার ভুল বুঝো না, একটু ব্যঙ্গের সাথে বলল ধূর্ত সলোযো। ভেব না ডনকে খুন করে খুব ভয় পেয়ে গেছি। আসলে সামগ্রিক যুদ্ধ চাই না। তাতে তোমাদের একা নয়, সবার ক্ষতি হবে-আমারও। কিন্তু, যুদ্ধ যদি হয়ই, আমিও তৈরি।

একবার চোখ তুলল হেগেন। কিন্তু তার মুখ দেখে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।

টাকার চেয়ে আমাদের বেশি দরকার কর্লিয়নিদের রাজনৈতিক প্রভাবের ছত্রছায়া, সলোযো বলল। তোমাদের ওই জিনিসটা এখনও আছে বলেই এত মূল্য পাচ্ছ। ডন মারা যাওয়ায় সেই প্রভার কদ্দিন তোমাদের থাকবে তা অবশ্য সঠিকভাবে কিছু বলা যায় না। সনিকে বোঝাও লড়াই করতে গেলে খুব তাড়াতাড়ি জিনিসটি হারাতে হবে তাকে। ওর একার সাথে নয়, ক্যাপোরেজিমিদের সাথেও আলোচনা করো, নিজেরা ভাল করে বুঝে দেখো, ঠিক করো কি চাও তোমরা-রক্তপাত, নাকি শান্তি?

হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে সেটা একটু দূরে নামিয়ে রাখল হেগেন। সাথে সাথে দরজার পাশে দাঁড়ানো লোকটা এগিয়ে এসে সেটা আবার ভরে দিল। নিরপেক্ষ সুরে হৈগেন বলল, চেষ্টা করব। এর বেশি কিছু এই মুহূর্তে আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু আপনাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি, সনির গোয়ার্তুমিটা ভয়ঙ্কর। তাছাড়া, লুকা ব্রাসিকে ঠেকাবার ক্ষমতা সনিরও নেই। আপনার সাথে সন্ধি করলে সনিকেও ক্ষমা করবে না সে। আমাকে তো নয়ই।

অদ্ভুত শান্ত ভঙ্গিতে সলোযো বলল, লুকার কথা ভেবে ভয় পেতে হবে না। তার ব্যবস্থা আমি করব, সে-দায়িত্ব আমার উপর ছেড়ে দিতে পারো। তুমি তিন ভাইয়ের দায়িত্ব নাও। ওদের বলো, বাপের সাথে ফ্রেডিকেও খুন করা হত আজ। যাদেরকে এ কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলাম তারা তাই চেয়েছিল, কেননা এ ধরনের কাজে বাছ বিচার করে গুলি চালানো সম্ভব নয়। কিন্তু বিপদের ঝুঁকি নিয়ে আমি কড়া নির্দেশ দিয়েছিলাম তাদেরকে, ফ্রেডিকে খুন করা চলবে না। বুঝতেই পারছ, ঠিক যতটুকু দরকার তারচেয়ে বেশি বিদ্বেষ আমি দেখাতে চাইনি। ফ্রেডি বেঁচে আছে, সেটা আমারই মহানুভবতা, এটা বলতে ভুল কোরো না সনিকে।

সব বুঝতে পারছে হেগেন। সলোযোর উদ্দেশ্য ওকে মেরে ফেলা নয়। জিমী হিসাবে আটকে রাখতে চাইছে না। এটুকু বুঝতে পারার সাথে সাথে অদ্ভুত একটা আনন্দের সোত অনুভব করল শরীরে, কিন্তু পরক্ষণে লজ্জায় আপনা থেকেই নিচু হয়ে গেল মাথাটা। ডনের চেয়ে নিজের জীবনকে সে বেশি ভালবাসে, এটা আজ এই প্রথম বুঝতে পেরে নিজেকে অপরাধী লাগছে তার।

হেগেনের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে সলোযো। আইরিশ কনসিলিয়রির মনের প্রতিটি ভাবনা স্পষ্ট পড়তে পারছে যেন সে।

পরিস্থিতিটা নিয়ে ভাবছে হেগেন। সলোহোর প্রস্তাবে তার সমর্থন আছে, এখানে বসে এ কথা তাকে বলতেই হবে, তা না হলে তুর্কী শয়তান তাকে ছাড়বে না, মেরেই ফেলবে। ব্যাটা চাইছে কি? চাইছে তাকে দিয়ে সনির কাছে প্রস্তাবটা নতুন করে উত্থাপন করতে চাইছে প্রস্তাবের পক্ষে যত যুক্তি আছে সব যেন সে সনিকে বুঝিয়ে বলে। তা বলতেও হেগেনের আপত্তি নেই। কনসিলিয়রি হিসাবে এটাই তো তার দায়িত্ব। আরও খানিক চিন্তা করে হেগেন বুঝল, সলোযোর কথার মধ্যে অযৌক্তিক কিছু নেই। টাটাগ্লিয়া আর কর্লিয়নিদের মধ্যে একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাধতে যাচ্ছে, কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু যে কোন ভাবে এটাকে ঠেকাতেই হবে। ঠেকাতে হবে ব্যবসার খাতিরে। মারামারি করে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরামর্শ সনিকে দিতে পারে না সে। কনসিলিয়রি হিসাবে তার দায়িত্ব সবার আগে ব্যবসার স্বার্থ দেখা। গড ফাদারকে সমাধিস্থ করেই সব ভুলে যেতে হবে। নতুন করে শান্তিচুক্তি করতে হবে। তারপর অপেক্ষা করতে হবে অনুকূল সময়ের জন্যে, তখন ব্যবস্থা নেয়া যাবে সলোযো আর টার্টগ্লিয়াদের বিরুদ্ধে।

মুখ তুলল হেগেন। চোখাচোখি হতেই সলোযো সবজান্তার ভঙ্গিতে হাসল একটু।

শরীরটা শিরশির করে উঠল হেগেনের। তার ভাবনা-চিন্তা সবটুকুই গড় গড় করে পড়ে ফেলেছে সলোগো।

খানিক আগে থেকেই কি একটা ব্যাপারে মনটা খুঁত খুঁত করছিল, হঠাৎ কারণটা আবিষ্কার করে ফেলল হেগেন। লুকা ব্রাসি! তার ব্যাপারে একটুও দুশ্চিন্তা করছে না সলোযো। ব্যাপার কি? ডনের সাথে লুকা বেঈমানী করল নাকি? দূর, নিজেকে ধিক্কার দিল হেগেন, কস্মিনকালেও তা সম্ভব নয়। সেই সাথে একটা কথা মনে পড়ে গেল তার। সলোযোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেই নিজের অফিসে লুকাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন ডন। গোপনে তাকে কিছু বলেছিলেন তিনি।

এসব ব্যাপার এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়, ভাবছে হেগেন। সবচেয়ে আগে লং বীচে, কর্লিয়নিদের দুর্ভেদ্য কেল্লার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যেতে হবে তাকে। আপনার কথার মধ্যে মুক্তি আছে, একথা বত ডনও স্বীকার করতেন। এই পরিস্থিতিতে ডন কি রতেন, তাও বুঝতে পারি আমি। তিনি আপনার প্রস্তাব মেনে নিতেন।

হ্যাঁ, সলোমো একটু গম্ভীর হয়ে বলল, তোমার সাথে আমি একমত। সেকেলে বলেই তাকে মরতে হলো, কিন্তু তার ব্যবসা-বুদ্ধির প্রশংসা না করে উপায় নেই।

কিন্তু সনিকে রাজি করাতে পারব, এখানে বসে সে প্রতিশ্রুতি আপনাকে আমি দিতে পারি না, ধীর গলায় কথাগুলো বলল হেগেন। এইটুকু বলতে পারি, আমার তরফ থেকে চেষ্টার কোন ত্রুটি হবে না।

মাথা ঝাঁকিয়ে নরম গলায় সলোযো বলল, গুড, ওইটুকুই চাই আমি তোমার কাছ থেকে। ব্যবসায়ী মানুষ আমি, রক্তপাতের দাম বহুত চড়া, তাই ওসব ভালবাসি না।

ঝন ঝন করে বেজে উঠল টেলিফোনটা। হেগেনের পিছনে দাঁড়ানো একজন লোক এগিয়ে এসে রিসিভার তুলল। কি শুনল সে কে জানে, মুখটা কালো হয়ে গেল নিমেষে, বলল, আচ্ছা, দিদি, খবরটা।

সনোযোর দিকে তাকাল লোকটা। রিনির নামিয়ে রাখছে ক্র্যাডলে। তার। দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। হেলে লক্ষ করল, লোকটার কাপুনি ধরে গেছে। এগিয়ে গিয়ে সলোমোর পাশে গিঁয়ে দাঁড়াল সে, নিচু হয়ে তার কানে কানে কিছু বলল।

মুহূর্তে রক্তশূন্য ফ্যাকাসে হয়ে গেল সলোযোর চেহারা। হিংস্র একটা আক্রোশ ফুটে উঠল দুই চোখে।

অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠল হেগেনের। সলোযো তীব্র দৃষ্টিতে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে, সাংঘাতিক কোন মতলব ফঁদছে যেন।

ঘন অন্ধকারে বিদ্যুৎ চমকে উঠল যেন, হেগেন পরিষ্কার বুঝে ফেলল তাকে এখন আর ছেড়ে দেয়া হবে না। প্রতিকূল এমন কিছু ঘটেছে, এখন আর তাকে মেরে না ফেলে সলোযোর কোন উপায় নেই।

শালা বুড়ো মরেনি! দাঁতে দাঁত ঘষে বলল সলোযো। চেহারাটা বিকৃত হয়ে উঠেছে তার, ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর দেখাচ্ছে তাকে। পাঁচটা গুলি খেয়েও টিকে আছে এখনও।

হেগেনের দম বন্ধ হয়ে এল। অদ্ভুত একটা স্বস্তির পরশ অনুভব করল সে। হঠাৎ উপলব্ধি করছে, এখন আর সে নিঃসঙ্গ নয়। গডফাদার যেন ঠিক তার পাশেই উপস্থিত রয়েছেন।

কাঁধ ঝাঁকাল সলোযো। ভঙ্গিটা আত্মসমর্পণের। উপায়ও নেই তার এখন নিজেকে সম্পূর্ণ ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেয়া ছাড়া। ডন কর্লিয়নি বেঁচে থাকা মানে গোটা পরিস্থিতি ওর বিরুদ্ধে চলে যাওয়া।

হেগেনের চোখে চোখ রেখে আবার কাঁধ ঝাঁকাল সলোযো। মুখে অসহায়। ভাব ফুটিয়ে বলল, আমিও ডুবলাম, তুমিও ডুবলে-দুৰ্ভগ্য আর কাকে বলে!

১.৪ প্রবেশ পথটা শিকল দিয়ে আটকে রাখা

০৪.

প্রবেশ পথটা শিকল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। আটটা বাড়ির ফ্রাড লাইটের আলোয় দিনের মত উজ্জ্বল হয়ে আছে প্রাঙ্গণটা। ধনুকের মত বেঁকে যাওয়া কংক্রিটের রাস্তায় দশ-বারোটা গাড়ি দেখতে পাচ্ছে মাইকেল। লোহার শিকলটার উপর ভর দিয়ে যে দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে তাদের একজন জিজ্ঞেস করল, কে?

নিজের নাম বলল মাইকেল।

কাছের বাড়িটা থেকে একজন লোক বেরিয়ে এসে খুঁটিয়ে দেখল মাইকেলকে, তারপর প্রহরীদেরকে বলল, ডনের ছোট ছেলে ইনি। তারপর মাইকেলকে বলল, ভিতরে আসুন।

বাড়ি ভর্তি লোক, কিন্তু সবাই অচেনা, শেষ পর্যন্ত ড্রয়িংরুমে ঢুকে হেগেনের স্ত্রী টেরিনাকে পেল, মাইকেল। একটা সোফায় পা গুটিয়ে বসে সিগারেট খাচ্ছে। সামনের কফি টেবিলটাতে হুইস্কি ভর্তি একটা গ্লাস। সোফার আরেক ধারে ভাবলেশহীন মুখে মোটাসোটা ক্যাপোরেজিমি ক্লেমেঞ্জা বসে আছে, তার কপালের ঘাম আর হাতের চুরুটে লেগে থাকা থুথু উজ্জ্বল আলোয় চকচক করছে।

মাইকেলের হাত ধরে নাড়া দিল ক্লেমেঞ্জা, সান্তনার সুরে বলল, তোমার বাবাকে হাসপাতালে দেখতে গেছেন তোমার মা-গুর্ন সুস্থ হয়ে উঠবেন।

একটা চেয়ার ছেড়ে করমর্দনের জন্যে উঠে দাঁড়াল পলি। মাইকেল জানে, পলি গাটো বাবার দেহরক্ষী। কিন্তু পলি আজ বাড়ি থেকে বেরোয়নি, তা এখনও জানে না ও। তাই কৌতুক মেশানো কৌতূহলের সাথে পলির দিকে তাকিয়ে থাকল।

পলির তীক্ষ্ণ চেহারার মধ্যে চাপা উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। চটপটে আর দক্ষ বলৈ সুনাম আছে তার। হাঙ্গামার সৃষ্টি না করে নানা ধরনের সূক্ষ্ম কাজ সারতে জুড়ি নেই ওর। লোকটার জন্যে দুঃখ হলো মাইকেলের এই ভেবে যে আজ সে তার দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

ড্রয়িংরুমে এখানে সেখানে আরও অনেকেই বসে আছে। কাউকে চেনে না মাইকেল। তবে এরা ক্লেমেঞ্জার দলের কেউ নয়। দেখেশুনে পরিষ্কার বুঝতে পারছে সে, বিশ্বাসঘাতক বলে সন্দেহ করা হচ্ছে ক্লেমেঞ্জা আর গাটোকে।

ফ্রেডি কেমন আছে? জানতে চাইল সে।

ডাক্তার ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে ওকে, বলল ক্লেমেঞ্জা।

ঝুঁকে পড়ে হেগেনের স্ত্রী টেরিসার গালে একটা চুমো খেলো মাইকেল। খুব ভাল সম্পর্ক দুজনের মধ্যে। চিন্তা কোরো না, নিচু গলায় বলল ও, নিরাপদে আছে টম। সনির সাথে কথা হয়েছে তোমার?

মাইকেলের একটা হাত শক্ত করে ধরে কয়েক সেকেণ্ড স্থির হয়ে থাকল টেরিসা, তারপর মাথা দোলাল। এমনিতে আশ্চর্য সুন্দরী, তার উপর মাথা দোলনোটা অদ্ভুত সুন্দর লাগল মাইকেলের হাত ধরে টেনে তুলল তাকে। সাথে করে নিয়ে গেল শেষ প্রান্তে রাবার অফিস কামরায়।

ডেস্কের পিছনে রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে সনি। তার এক হাতে হলুদ রঙের প্যাড, আরেক হাতে পেন্সিল। টেসিওকে চেনে মাইকেল, সে ছাড়া আর কেউ নেই কামরায়। তাকে দেখেই বুঝে নিল ও বাড়ির সব লোক টেসিওর। কাগজ আর পেন্সিল তার হাতেও দেখতে পাচ্ছে মাইকেল।

চেয়ার ছেড়ে দ্রুত উঠে দাঁড়াল সনি, ডেস্ক, ঘুরে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল টেরিকে। একটুও চিন্তা কোরো না, বলল সে। একটা প্রস্তাব দিয়ে টমকে ফেরত পাঠাচ্ছে ওরা। আমাদের তৎপরতার সাথে ওর কি সম্পর্কও তো শুধু আমাদের উকিল। ওর ক্ষতি কেন করবে ওরা? •

টেরিসাকে ছেড়ে দিয়ে এবার মাইকেলকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো সনি।

হতভম্ব দেখাচ্ছে মাইকেলকে। অরে, করো কি! সনিকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে হাসতে শুরু করল সে। মেরে ধরে হাড়ে দাগ বসিয়ে দিয়েছ, সেটাই তো অভ্যাস হয়ে গেছে-এখন আবার এসব কি? অল্প বয়সে মারপিট লেগেই ছিল, ওদের মধ্যে।

কাঁধ আঁকাল সনি। শোন তবে তোর খোঁজ না পেয়ে ভয়ে কলজে শুকিয়ে গিয়েছিল আমার। তোকে ওরা মেরে ফেললে বা কি, বাঁচিয়ে রাখলেই বা কি কিছু এসে যেত না আমার কিন্তু বুড়ি মাকে খবরটা সেই আমাকেই গিয়ে দিতে হত, ওখানেই আমার আপত্তি।

বাবার খবরটা কিভাবে নিল মা? জানতে চাইল মাইকেল।

এ তো আর নতুন কিছু নয়, বলল সনি। এরকম আগেও হয়েছে। তখন তুই ছোট ছিলি, তাই মনে নেই। আমি বা মা-দুজনেই স্বাভাবিকভাবে নিয়েছি ব্যাপারটাকে। একটু বিরতি নিল সে। বাবার কাছেই আছে মা। বাৰা সুস্থ হয়ে উঠবেন।

আমরাও সেখানে যেতে পারি না?

একটু গম্ভীর হলো সনি। সব না মিটলে বাড়ি থেকে বেরোনোমার পক্ষে সম্ভব নয়। শব্দ শুনে টেলিফোনের দিকে হাত বাড়াল সে।

ডেস্কের উপর থেকে হলুদ প্যাডটা তুলে কি লেখা রয়েছে দেখছে মাইকেল। একটা তালিকা, তাতে সাতজনের নাম লেখা। তালিকায় প্রথম তিনজনে সাধ্যে রয়েছে সোযো, ফিলিপ টাটাগ্লিয়া, জন টাটাগ্লিয়া। কাকে কাকে মারতে হবে তার একটা অলিকা এটা, হঠাৎ চমকে উঠে বুঝতে পারল মাইকেল।

রিসিভার নামিয়ে রাখল সনি। টেরিসা আর মাইকেলকে বলল, একটু বাইরে গিয়ে বসবে তোমরা?

মাইকেল বুঝল, টেসিওর সাথে বসে তালিকাটা এখন চূড়ান্ত করবে সনি। কাঁদছে টেরিসা, তাকে ধরে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিল সনি। কামরা থেকে বেরিয়ে না গিয়ে ইতিমধ্যে একটা সোফায় গ্যাট হয়ে বসে পড়েছে মাইকেল।

দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘুরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকাল সনি। বলল, এখানে থাকলে এমন সব কথা শুনতে হবে, যা ভাল লাগবে না তোর।

একটা সিগারেট ধরাল মাইকেল। আমিও কাজে লাগতে পারি।

অসম্ভব। এর মধ্যে তোকে জড়ালে বাবা আমাকে আস্ত রাখবেন না।

হঠাৎ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল মাইকেল, চিৎকার করে বলল, উনি কি তোমার একার বাবা? এই বিপদে তাঁকে আমি সাহায্য করতে পারব না, এ তুমি কেমন কথা বলছ! বাইরে বেরিয়ে মানুষ খুন না করলেও কাজে লাগা যায়। আমার সাথে এমন আচরণ করছ, এখনও যেন কচি খোকা আমি। তুমি ভুলে যাচ্ছ আমি একজন যুদ্ধফেরত সৈনিক। গুলিও খেয়েছি, দুচারটে জাপানীও মেরেছি। আমার সামনে কাউকে মেরে ফেললে, কি মনে করো তুমি, ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাব?

দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসছে সনি। আরে রসো! বেয়াদবি মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে আমাকে না আবার তোমার গায়ে হাত তুলতে হয়। ঠিক হ্যায়, শখ যখন হয়েছে, থেকেই যাও-ফোন এলে ধরো। টেসিওর দিকে ফিরল সে। বলল, যে খবরের অপেক্ষায় ছিলাম, একটু আগের ফোনে সেটা পেয়েছি।

একটু থেমে মুচকি হাসল সনি, মাইকেলের দিকে তাকিয়ে বলল, কেউ একজন নিশ্চয়ই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ক্লামেঞ্জা হতে পারে। পলি গাটো হতে পারে। তার আবার আজ সর্দি লেগেছে বলে বাড়ি থেকে নাকি বেরোয়নি। মাইক, খুব তো কলেজে পড়িস, বল দেখি, কে সলোযোর টাকা খেয়েছে?

ধীরে ধীরে আবার সোফায় বসল মাইকেল। ভাবছে সে। কর্লিয়নি পরিবারের একজন ক্যাপোরেজিমি ক্লামেঞ্জা। ডনের বিশ বছরের পুরানো, ঘনিষ্ঠ বন্ধু সে, ডন তাকে লক্ষপতি করে দিয়েছেন। ডন মারা গেলে তার কি লাভ? আরও টাকার লোভ? কিন্তু টাকা কম নেই তার। তবে, একথাও ঠিক যে টাকার লোভ কখনও মেটে না মানুষের। নাকি আরও ক্ষমতার মোহ? নাকি কোন অপমান বা অবহেলার প্রতিশাধ? তাকে বাদ দিয়ে হেগেনকে কনসিলিয়রি করা হয়েছে বলে? অথবা ব্যবসায়ী বুদ্ধিতে বুঝেছে শেষ পর্যন্ত জিতবে সলোযো, তাই তার পক্ষ অবলম্বন করাই বুদ্ধিমানের কাজ, তাই কি?

উহু এসব সম্ভাবনা মনে মনে বাতিল করে দিল মাইকেল। ক্লেমেঞ্জা বেঈমানী করেছে একথা বিশ্বাস করতে রাজি নয় সে। কিন্তু পরমুহর্তে বিষণ্ণ মনে ভাবল, দুনিয়ায় অসম্ভব, অবিশ্বাস্য বলে কিছু আছে কি? নেই।

আসলে ভালবাসা ওর বিচার বুদ্ধিকে ঘোলা করে তুলছে। ক্লেমেঞ্জার মৃত্যু চায় না ও। ছোটবেলায়কত উপহার এনে দিত লোকটা তাকে। কাঁধে তুলে সেই তো ওকে বেড়াতে নিয়ে যেত। উঁহু, মনস্থির করে ফেলল মাইকেল, ক্লেমেঞ্জা নয়।

পলি গাটো?

ওর সম্পর্কে সবাই আশাবাদী, সংগঠনে ওর উন্নতি হবে বলে মনে করা যায়, তবে আর সবার মত খেটেই উঠতে হবে ওকে। এখনও ধনী নয় ও। কম বয়সের অসংযত উচ্চাশা এবং খাটনি কমাবার হটকারী প্রবণতা ওর মধ্যে থাকতে পারে। সম্ভবত পলিই অপরাধী। কিন্তু পরমুহূর্তে মাইকেলের মনে পড়ে গেল স্কুলে ওরা ষষ্ঠ গ্রেডে একই ক্লাসে বসে লেখাপড়া করেছে–পলি অপরাধী বলে প্রমাণ হোক তাও সে চায় না।

মাথা নেড়ে বলল মাইকেল, ওরা কেউ নয়। সনি একটু আগে আভাসে বলেছে যে কে অপরাধী তা সে টের পেয়েছে, সেজন্যেই এই উত্তরটা দিল মাইকেল। ভোট দেবার প্রশ্ন উঠলে ক্লেমেঞ্জাকে নিরপরাধ বলে ভোট দিতে হয় তার।

মাইকেলের দিকে তাকিয়ে হাসছে সনি। বলল, ভেব না, ক্লেমেঞ্জা নির্দোন কাজটা পলিই করেছে।

মাইকেল লক্ষ করল বিরাট একটা হাঁপ ছাড়ল টেসিও। সে-ও এক ক্যাপোরেজিমি; তাই ক্লেমেঞ্জা নির্দোষ প্রমাণ হওয়াতে খুশি হয়েছে সে। তার ক বিষয়টা আরও একটা কারণে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, তা হলো অত্যন্ত উঁচু প একজনকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছিল। ধীরেসুস্থে বলল সে, কাল আনা লোকদের ফেরত নিতে পারব তো?

পরশু, বলল সনি। তার আগে ব্যাপারটা প্রকাশ হোক তা আমি চাই না। এবার আমার ভাইয়ের সাথে ব্যক্তিগত কিছু আলাপ করব। বাইরের ঘরে থাকে তুমি, কেমন? তালিকাটা পরে শেষ করলেও চলবে। ক্লেমেঞ্জাকে সাথে নিয়ে তুমিই এটা করে ফেলো।

ঠিক আছে, কামরা থেকে বেরিয়ে গেল টেসিও।

পলি দোষী জানলে কিভাবে? প্রশ্ন করল মাইকেল।

এ-মাসে অসুস্থতার অজুহাতে তিনদিন কাজে আসেনি পলি, বলল সনি। এই তিন দিনই বাবার অফিসের উল্টোদিকের রাস্তার একটা বুথ থেকে কেউ ফোন করেছিল পলিকে। আজও। ওরা সম্ভবত খোঁজ নিচ্ছিল বাবার সাথে পলি যাচ্ছে, নাকি অন্য কেউ। কাঁধ ঝাঁকাল সনি। যাই হোক, ভাগ্য ভাল যে ক্লেমেঞ্জা দোনা নয়। ওকে এখন আমাদের বড় দরকার।

একটু ইতস্তত করে মাইকেল বলল, একেবারে মরণপণ যুদ্ধ বেধে যাবে নাকি?

সনির চোখ দুটোয় নিষ্ঠুরতার ঝিলিক খেলে গেল। টম এসে পৌঁছলেই শুরু করব আমি। বাবা যতক্ষণ নিষেধ না করেন।

সেক্ষেত্রে বাবা কিছু না বলা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেই তো পারো।

একটু তাচ্ছিল্য এবং কৌতুকের সাথে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকাল সনি। যুদ্ধে তুই এত পদক পেলি কিভাবে ভেবে পাই না। আমরা বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছি, দেখছিস না? যুদ্ধ না করে উপায় নেই আমাদের। আমার একটাই ভয়-টমকে যদি না ছাড়ে?,

রীতিমত বিস্মিত হলো মাইলে, কেন, ছাড়বে না কেন?

ধৈর্যের সাথে, বুঝিয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বলল সনি, বাবাকে মেরে ফেলতে পেরেছে মনে করে টুমকে হাইজ্যাক করেছিল ওরা, টমকে দিয়ে যাতে প্রস্তাব পাঠাতে পারে আমার কাছে। কিন্তু বাবা বেঁচে যাওয়ায় আমি আর কিছু নই ওদের কাছে, তাই টমও ওদের কোন কাজে আসছে না। তাকে ওরা যা খুশি করতে পারে এখন-খুনও করতে পারে, আবার ছেড়েও দিতে পারে। খুন করার একমাত্র অর্থ হবে আমাদেরকে জানিয়ে দেয়া যে ওদের সাথে লাগলে তার পরিণাম ভাল হবে না, এবং আমাদের ওপর জোর-জবরদস্তি খাটাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওরা।

মৃদু গলায় জানতে চাইল মাইকেল, বাবা মারা যাবার পর প্রস্তাব পাঠালে তুমি আপস করবে, এ-কথা সলোযোর মনে হলো কেন?

সাথে সাথে টকটকে লাল হয়ে উঠল সনির মুখটা। কয়েক মুহূর্তে চুপ করে থাকার পর বলল সে, কয়েক মাস আগে সলোহোর সাথে একটা আলোচনায় বসেছিলাম আমরা। ড্রাগ ব্যবসার একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল সে। বাবা সেটা প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু, নিজের উপর রাগে-অনুশোচনায় কালো হয়ে গেল সনির মুখটা, আমি একটু বেশি কথা বলে ফেলেছিলাম, যার ফলে সলোযো বুঝতে পেরেছিল ওর প্রস্তাবটাতে আমার সমর্থন আছে।

চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ সনি, তারপর বলল, এত বড় অন্যায় জীবনে আর করিনি। যাই হোক, বাবার সাথে আমার এই মত পার্থক্য লক্ষ করে সলোযো ভাবল ডন বেঁচে না থাকলে আমার সাথে ব্যবসাটা করতে পারবে সে। বাবা মারা গেলে এই পরিবারের অবস্থা কি দাঁড়াতে পারে তা কল্পনা করতে অসুবিধে হয়নি তার। রাতারাতি অর্ধেক কমে যেত আমাদের ক্ষমতা। বাবার গড়া ব্যবসাগুলোকে টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খেয়ে যেতাম আমরা। এই পরিস্থিতিতে ড্রাগের ব্যবসা ধরে নিজেদেরকে রক্ষার চেষ্টা করতাম। অন্তত তাই ভেবেছিল সলোমো, বাবাকে তার এই খুন করার চেষ্টা আর কিছু নয়, এর মধ্যে ব্যক্তিগত আক্রোশ বা অন্য কিছু নেই, স্রেফ ব্যবসার একটা চাল মাত্র। অবশ্য আমাকে ব্যবসায় নামিয়ে খুব সাবধানে থাকত সে, কখনও খুব কাছে ঘেঁষতে দিত না, যাতে সরাসরি গুলি করতে না পারি তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে রাখত। এবং একথাও তার জানা আছে যে একবার তার প্রস্তাবে রাজি হলে ভবিষ্যতে আর কখনোই প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে লড়াই শুরু করতে পারব না আমি। অন্য পরিবারগুলো যেভারে থোক বাধা দেবে আমাকে। আপোস হয়ে যাবার পর শান্তিভঙ্গ করার চেষ্টা একটা মারাত্মক অন্যায় বলে মনে করবে সবাই।

বাবা মারা গেলে কি করতে তুমি?

সরল এবং সত্য কথাটা সহজ ভাবে বলল সনি, সলোযো আর টাটাগিয়া পরিবারকে জড় সুদ্ধ নির্মুল করতাম। তাতে যদি নিউ ইয়র্কের পাঁচটা পরিবারের সাথে যুদ্ধ করতে হত–তাও করতাম। তাতে যদি এই পরিবারের সবাইকে নিয়ে ডুবতে হত–তাও ডুবতাম।

একটু ইতস্তত করল মাইকেল, তারপর ধীর ভঙ্গিতে, মৃদু কণ্ঠে বলল, তুমি যেভাবে নিচ্ছ, বাবা কিন্তু সেভাবে নিতেন না।

হাত নেড়ে বিরক্তি প্রকাশ করল সনি, বলল, জানি, বাবার মত আমি হতে পারিনি। কিন্তু তোমাকে বলছি, কথাটা বাবাও জানেন, যখন সত্যি কাজের সময় আসে তখন যে কোন দক্ষ লোকের মত সবদিক আমিও সামলাতে পারি। সলোযো, ক্লেমেঞ্জা, টেসিও-এদেরও জানা আছে ব্যাপারটা। শেষ পরিবারিক লড়াইয়ে বাবাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছি আমি। সুতরাং, সামলাতে না পারার ভয় আমার মধ্যে নেই। তাছাড়া, এ-ধরনের পরিস্থিতিতে লড়াই করার সবচেয়ে ভাল আয়োজন আমাদেরই রয়েছে। এখন শুধু লুকার জন্যে অপেক্ষা করছি, সে এলেই কাজ শুরু করব।

কৌতূহলী হয়ে উঠল মাইকেল, বলল, আচ্ছা, লুকার ব্যাপারটা কি? সবাই তাকে সাংঘাতিক কিছু একটা বলে মনে করে। সত্যিই কি সে তাই?

লুকা ব্রাসি? মুগ্ধ মুখভঙ্গি করে মাথা নাড়ল সনি! সে একাই একশো। টাটাগ্লিয়াদের পিছনে লেলিয়ে দেব ওকে। সলোযোর ব্যবস্থা আমি নিজে করব।

অবস্তি বোধ করছে মাইকেল। বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, মাঝেমধ্যে অদ্ভুত একটা আক্রোশ আর নিষ্ঠুরতা দেখা গেলেও মনটা আসলে ভাল সনির। অথচ সেই সনি কেমন শান্তভাবে, ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করার কথা বলছে। কাকে কাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে তার তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে সে টেসিও. আর ক্লেমেঞ্জাকে–সে যেন সিংহাসনে আসীন রোমের একজন প্রতাপশালী সম্রাট। নিজের কথা ভেবে স্বস্তি বোধ করল মাইকেল। বাবা বেঁচে আছেন, সুতরাং প্রতিশোধ নেবার জন্যে এই গণ্ডগোলে তাকে জড়িয়ে পড়তে হবে না। টুকটাক সাহায্য করবে, ফাইফরমাশ খাটবে, টেলিফোন ধরবে,-তার বেশি কিছু না। সনি, এবং সুস্থ হয়ে উঠে বাবা, এরা নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা করতে পারবে। তাছাড়া লুকা যখন আছে, চিন্তার কিছু নেই।

হঠাৎ বাইরে থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠের চিৎকার ভেসে এল।

ব্যাপার কি, ভাবল মাইকেল, গলাটা হেগেনের স্ত্রীর না? ঝট করে উঠে দরজার দিকে এগোল সে।

দরজা খুলে মাইকেল দেখল বাইরের কামরায় উঠে দাঁড়িয়েছে সবাই। টম হেগেন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে কামরার মাঝখানে, তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে তার স্ত্রী।

স্ত্রীকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে সিধে হলো: টম হেগেন। মাইকেলের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাকে দেখে খুব খুশি হয়েছি আমি, মাইক। টেরিসা কাঁদছে। এখনও, কিন্তু তার দিকে না তাকিয়ে দীর্ঘ পদক্ষেপে অফিস কামরায় এসে ঢুকল হেগেন। অদ্ভুত একটা গর্বে মুখটা লাল হয়ে উঠল মাইকেলের। ভাবছে, কর্লিয়নি পরিবারে বৃথাই কি আর দশটা বছর কাটিয়েছে টম। বাবার খানিকটা বৈশিষ্ট্য সে-ও পেয়েছে, সনিও পেয়েছে এবং কি আশ্চর্য বাড়ি থেকে দূরে দূরে কার্টালে কি হবে, বাবার কিছু গুণ তার গায়েও লেগে আছে।

১.৫ ডনের অফিস রূমে

০৫.

ভোর চারটে। ডনের অফিস রূমে গোল হয়ে বসে আছে ওরা পাঁচজন–সনি, হেগেন, ক্লেমেঞ্জা, টেসিও, মাইকেল। অভয় দিয়ে পাশেই নিজেদের বাড়িতে স্ত্রীকে পাঠিয়ে দিয়েছে হেগেন। বাইরে এখনও অপেক্ষা করছে পলি গাটো। টেসিওর। লোকেরা পাহারা দিচ্ছে তাকে। তাদেরকে নির্দেশ দেয়া আছে পলিকে চোখের আড়াল করা চলবে না। কিন্তু পলি এসব কিছুই জানে না।

সবাই গভীর মনোযোগের সাথে কনসিলিয়রির কথা শুনছে। প্রথমে সলোযোর প্রস্তাব সম্পর্কে বলল হেগেন। তারপর গডফাদার বেঁচে আছেন শুনে সলোযোর প্রতিক্রিয়াটা বর্ণনা করল।

সাথে সাথে বুঝলাম আমাকে মেরে ফেলা হবে, বলল সে। কিন্তু ডনের কাছ থেকে কম তো আর শিখিনি, সেগুলোকে কাজে লাগাতেও দেরি করলাম না। তুর্কী খচ্চরটাকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, ডন বেঁচে আছেন তো কি হয়েছে, শয্যাশায়ী তো বটে, তাকে বোঝাতে মোটেও বেগ পেতে হবে না আমার। সনির দিকে তাকিয়ে খানিকটা আবদারের, খানিকটা ক্ষমাপ্রার্থনার, খানিকটা কৌতুকের সুরে বলল আবার। সে, দেখো ভাই, রাগ-টাগ কোরো না। ওকে আমার বলতে হয়েছে যে বাপের গদিতে বসার যথেষ্ট আগ্রহ আছে তোমার, বলতে হয়েছে তুমি আমার কথায় ওঠো বসো। ওই গড! আমায় মাফ করো! কুণ্ঠিতভাবে হাসল হেগেন।

মাথা নেড়ে ইশারায় জানাল সনি, কিছু মনে করেনি সে, পরিস্থিতি অনুযায়ী ঠিকই করেছে হেগেন।

টেলিফোনটা হাতের কাছে নিয়ে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে নাইকেল। হেগেন আর সনিকে খুব মনোযোগের সাথে লক্ষ করছে ও। হেগেন কামরায় ঢুকতেই ছুটে গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে সনি, দৃশ্যটা ক্ষীণ একটু ঈর্ষার উদ্রেক করেছে ওর মনে। মনে পড়ে গেছে সনি ওর নিজের বড় ভাই হলেও, দুই ভাইয়ের মধ্যে যতটা ঘনিষ্ঠতা তার চেয়ে সনির সাথে টমের ঘনিষ্ঠতা অনেক ক্ষেত্রে অনেক বেশি।

এবার কাজের কথা হোক, বলল সনি। ঠিক করতে হবে, কি করব আমরা। টেসিওকে ইঙ্গিতে দেখিয়ে বলল, আমরা দুজন একটা তালিকা তৈরি করেছি, সেটা প্রথমে দেখো তুমি। ক্লেমেঞ্জাকে তোমার কপিটা দাও, টেসিও।

আমি মনে করি, মাইকেল বলল, চূড়ান্ত আলোচনায় ফ্রেডিরও উপস্থিত থাকা উচিত।

ছোট ভাইয়ের দিকে তাকাল সনি। নিস্তেজ গলায় বলল, ওর কাছ থেকে সাহায্য পাবার কোন আশাই নেই। ডাক্তার বলেছে, প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়েছে ও, ধকলটা সামলাতে প্রচুর সময় লাগবে। আমি ঠিক বুঝছি না। তবে ফ্রেডি তোর আমার মত নয়, একথা ঠিক। গড় আর বাবা, দুজনকে সমান চোখে দেখে ও। গডকে মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে দেখলে ভক্তের যে অবস্থা হবার কথা, ওরও ঠিক তাই হয়েছে।

ঠিক আছে, ওকে বাদ দাও, তাড়াতাড়ি বলল হেগেন। করণীয় স্থির করার আগে আরেকটা কথা, বলতে চাই আমি। সলোযো শত্রু, শত্রুকে কখনও তুচ্ছ ভাবতে নেই। এই বাড়ি ছেড়ে একপা বেরুনো চলবে না, তোমার। তোমার জন্যে, একমাত্র নিরাপদ জায়গা এই বাড়ি। সলোযোকে আমি এক বিন্দু বিশ্বাস করি না। হাসপাতাল পাহারা দেবার কি ব্যবস্থা করেছ?

পুলিশ ঘিরে রেখেছে। ভেতরে এবং বাইরের প্রতি গজে আমাদের লোকও আছে। নিজের তালিকাটা হেগেনের দিকে বাড়িয়ে দিল সনি। দেখে বলো তুমি কি মনে করো।

তালিকাটা নিল হেগেন। পড়তে গিয়ে ভুরু কুঁচকে উঠল তার। তারপর মুখ তুলে বলল, ফর গডস সেক, সনি! ব্যাপারটাকে তুমি ব্যক্তিগতভাবে নিচ্ছ নাকি? ডন কিভাবে নিতেন, ভেবে দেখেছ? যাই ঘটে গিয়ে থাকুক, আক্রোশে অন্ধ হয়ে যাওয়া আমাদের উচিত নয়। মষ্টের গোড়া একজন, সলোযো। ওকে সরিয়ে ফেললেই যে যার খোপে খাপে খাপে বসে যাবে। টাটাগ্লিয়াদের ঘাটাবার দরকারটা কি?

সনি শুনল। তার মুখ দেখে কিছুই বোঝা গেল না। একে একে দুই ক্যাপোরেজিমির দিকে তাকালসে।

কাঁধ ঝাঁকাল টেসিও। জটিল পরিস্থিতি, গম্ভীর হয়ে বলল সে।

সনি এবার ক্লেমেঞ্জার দিকে তাকাল। কিন্তু ক্লেমেঞ্জা কোন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকল। তাকে উদ্দেশ্য করে সনি বলল, আর সব ব্যাপার পরে আলোচনা করা যাবে। একটা কাজ এক্ষুণি সারা যায়। পলিকে আমাদের দরকার হবে না আর। ওর নামটাই তালিকার মাথায় রাখো।

মাথা ঝাঁকিয়ে বিশালদেহী ক্লেমেঞ্জা সমর্থন করল সনিকে।

লুকার এই অন্তর্ধান আমার ভাল ঠেকছে না, বলল হেগেন। ওর ব্যাপারে সলোযোকে ঘাবড়াতে না দেখে ভাবছি, লুকা টাকা গিলেছে নাকি?

হয়তো কোথাও মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করছে, বলল সনি।

অসম্ভব। মেয়েমানুষ নিয়ে কখনও বাইরে রাত কাটায় না সে। মাইক, উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত একটু পর পর ফোন করো ওক।

তখুনি রিসিভার তুলে ডায়াল করতে শুরু করল মাইকেল। কিন্তু অপরপ্রান্তে বেল বাজলেও কেউ রিসিভার তুলছে না। হেগেনের দিকে তাকাল মাইক। এদিক ওদিক মাথা নেড়ে রিসিভার নামিয়ে রাখল।

হঠাৎ অসহিষ্ণু কণ্ঠে সনি বলল, দুত্তোরি ছাই, এভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব নাকি! টম, তুমি কনসিলিয়রি, পরামর্শ দাও। বলো কি করা উচিত আমাদের?

হুইস্কির বোতলটা ধীরেসুস্থে তুলে নিল হেগেন। গ্লাসে খানিকটা টেলে নিয়ে এক চুমুকে সবটুকু গিলে নিয়ে বলল, সলোযোর সাথে আলোচনা চালিয়ে যাব। দরকার মনে করলে আপসও করে ফেলব। ডন সুস্থ হয়ে বাড়িতে না ফেরা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা। তারপর তিনি যা ভাল বুঝবেন আমরা তাই করব। তিনি যা করবেন তাতে বাকি সবগুলো পরিবারের সমর্থন থাকবে। এটুকু আমি জানি।

রাগে মুখটা লাল হয়ে উঠল সনির। সলোযোকে সামলাতে পারব না, আমার সৃম্পর্কে এই তোমার ধারণা?

না, সনির চোখে চোখ রেখে বলল হেগেন। কর্লিয়নিদের সমস্ত ক্ষমতা এখন তোমার হাতে, এবং সে ক্ষমতা কী ভয়ঙ্কর, কতদূর তার বিস্তার, আমার চেয়ে ভালভাবে তা আর কে জানে? ওরকম একশো সলোযোকে গর্ত থেকে বের করে নিয়ে এসে গায়েব করে দেবার ক্ষমতা তোমার আছে। ক্লেমেঞ্জা, টেসিও-এক একজন এক কথায় হাজার লোক জড়ো করে ফেলতে পারবে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, সামগ্রিক সংগ্রাম ডন চাইবেন না। আমিও চাই না। যুদ্ধের পর দেখা যাবে গোটা পূর্ব উপকূল ধ্বংসের স্তূপ হয়ে গেছে। সবগুলো পরিবার আমাদেরকে দায়ী করবে। অসংখ্য শত্রু তৈরি করব আমরা। তোমার বাবা কখনোই যা চান না।

বাবা যদি নাই বাঁচেন, তখন কি, পরামর্শ দেবে, কনসিলিয়রি?

সনির কণ্ঠস্বরের কাঠিন্য অনুভব করে কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থাকল হেগেন। তারপর কণ্ঠে আগের চেয়ে দৃঢ়তা এনে বলল, সলোযোর সাথে আপোস করো, এই পরামর্শ তখনও দেব আমি। তুমি আমার পরামর্শ শুনবে না, একথা জেনেও। একটু থেমে হেগেন আবার বলল, হিসাব করলে দেখা যাবে কর্লিয়নিদের মোট ক্ষমতার অর্ধেক ধরা হয় ডনের রাজনৈতিক যোগাযোগ আর তার ব্যক্তিগত প্রতিপত্তিকে। ডন মারা গেলে ক্ষমতার এই অংশ থেকে তুমি বঞ্চিত হবে। তখন কর্লিয়নিদেরকে সমর্থন করার কোন কারণ থাকবে না, কারও, সুতরাং সবগুলো পরিবারের সমর্থন পাবে সলোযো আর টাটাগ্লিয়ারা, কারণ দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী, সর্বনাশা যুদ্ধের সূচনা হোক তা কেউই চায় না। ডন যদি না বাঁচেন, আপোস করা ছাড়া টিকে থাকার উপায় নেই। আগে টিকে থাকার প্রশ্ন। দুর্বল ভিৎ মজবুত হোক, তখন প্রতিশোধের কথা ভাবা যাবে।

তুমি তো ব্যাপারটাকে হালকা করে দেখবেই, উত্তেজনায় কাঁপছে সনি। গুলি তো আর ওরা তোমার বাবাকে করেনি!

শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেল হেগেনের। উত্তর দিতে এক সেকেণ্ডও দেরি করল না সে। কথার ভঙ্গিতে, চোখে মুখে আশ্চর্য একটা গর্ব ফুটে উঠল তার। ভুল করছ, সনি। তোমরা যেমন তাঁর সুপুত্র, তেমনি আমিও তার সুপুত্র। তার কাছে তোমরা যতটুকু ঋণী, তারচেয়ে অনেক বেশি ঋণী আমি। তোমরা যতটুকু কৃতজ্ঞ তার চেয়ে অনেক বেশি কৃতজ্ঞ আমি। তোমরা তাকে যতটুকু শ্রদ্ধা করো তার চেয়ে ঢের বেশি শ্রদ্ধা করি আমি। একথা ঠিক, এই ভয়ঙ্কর বিপদে তোমার মত দিশেহারা হইনি আমি, তার কারণ ডনের কাছ থেকেই শিখেছি বিপদের সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরী। তোমাকে যা বলছি সব ব্যবসা-বুদ্ধির কথা। ব্যক্তিগতভাবে আমার ইচ্ছা করছে সব শালাকে নিজের হাতে খুন করি।

শেষের দিকে হেগেনের কর আবেগরুদ্ধ হয়ে পড়তে লজ্জা পেল সনি। হেগেন থামতেই তাড়াতাড়ি বলে উঠল সে। কী যন্ত্রণা, আমি কি সত্যি সত্যি তাই বলতে চাইছি! বলতে আসলে তাই চেয়েছে সনি। তার ধারণা, রক্তের সম্পর্কের সাথে আর কোন সম্পর্কের তুলনা চলে না।

একটা অস্বস্তিকর নীরবতা জমাট বাধছে। অস্বস্তি বোধ করছে সবাই।

বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে নড়েচড়ে বসল সনি। শান্তভাবে বলল, ঠিক আছে, তাই হোক। প্রতিশোধ নেবার কোন চেষ্টা আমরা করব না। বাবার নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত। মুখ তুলে হেগেনের দিকে তাকাল সে। টম, আমি চাই উঠান ছেড়ে বাইরে বেরুবে না তুমি। একবার ছেড়ে দিয়েছে, দ্বিতীয়বার ছাড়ার জন্যে ধরবে না। কোনরকম ঝুঁকি নেবে না তুমি।

ছোট ভাইয়ের দিকে তাকাল সনি। বলল, মাইক, তোরও সাবধানে থাকা উচিত। অবশ্য, ব্যবসার সাথে জড়িত নয়, এমন কাউকে নিয়ে সলোযো টানাহেঁচড়া করবে বলে মনে করি না আমি। তা করলে সবাই বিরক্ত হবে ওর ওপর। তবু, সাবধানের মার নেই।

এরপর টেসিওর দিকে ফিরল সনি। বলল, তোমার সব লোককে এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখো। শহরের কোথায় কি ঘটছে, খুঁটিনাটি সব খবর তোমার কাছ থেকে পেতে চাই আমি।

বিশালদেহী ক্লেমেঞ্জার দিকে তাকাল সনি। বেশি দেরি না করে পলি গাটোর ব্যাপারটা ইতি করো। তারপর টেসিওর লোকদের ছেড়ে দিয়ে তোমার লোকদের হাতে তুলে দাও উঠানের দায়িত্ব। টেসিওর দিকে আবার ফিরল সনি। হাসপাতালে তোমার লোকই থাকুক।

কনসিলিয়রির দিকে তাকাল সনি। বলল, কাল সকালে তোমার প্রথম কাজ সলোযো আর টাটাগ্লিয়ার সাথে আলোচনা শুরু করা! ফোন করে অথবা লোক পাঠিয়ে, যেভাবে ভাল মনে করবে, যোগাযোগ করো ওদের সাথে।

ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থাকল সনি। কি যেন ভাবছে সে।

সবাই ধৈর্য ধরে বসে আছে, সনির নির্দেশ অনুযায়ী কিভাবে কি করতে হবে তার একটা ছক তৈরি করে নিচ্ছে মনে মনে।

মাইক, বলল সনি, ক্লেমেঞ্জার দুজন লোককে সাথে নিয়ে লুকার বাড়িতে যাবি তুই কাল। যতক্ষণ সে ফিরে না আসে বা কোন খবর না পাস, অপেক্ষা করবি ওখানে। একটু থেমে চিন্তিত ভাবে আবার বলল সে, পাগলটা হয়তো.খবর শুনেই সোযোকে খুঁজতে বেরিয়ে গেছে। টাকার লোভে গড ফাদারের সাথে বেঈমানী করেছে এ আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না।

হেগেন ইতস্তত করছে দেখে তার দিকে তাকাল সনি, চোখে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি।

কাঁধ ঝাঁকাল কনসিলিয়রি, তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলল, মাইককে খোলাখুলিভাবে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। ওকে এসবের বাইরে রাখলেই বোধহয় ভাল হয়।

তাই তো! ঠিক বলেছ তুমি, টম, সায় দিয়ে বলে উঠল সনি। মাইক, কোথাও যেতে হবে না তোকে। তার চেয়ে জরুরী কাজটাই বরং কর তুই, এখানে বসে ফোন সামলা।

কথা বলল না মাইকেল। সঙ্কোচ, লজ্জা বোধ করছে ও খারাপ লাগছে এই ভেবে যে এ-বাড়িরই ছেলে হওয়া সত্ত্বেও ওর উপর তেমন আস্থা নেই কারও। সবাই ধরেই নিয়েছে, এই বিপদে সে কোন গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য করতে অক্ষম। আরেকটা ব্যাপার দৃষ্টি এড়ায়নি ওর। ক্লেমেঞ্জা আর টেসিওর চেহারায় কোনরকম ভাবের প্রকাশ নেই। ভাবল, নিশ্চয়ই ওরা অসন্তোষ আর ঘৃণা লুকাবার চেষ্টা করছে। মৃদু কাধ ঝাঁকিয়ে ক্রাডল থেকে রিসিভার তুলল ও। ডায়াল করল। শুনতে পাচ্ছে লুকা ব্রাসির বাড়িতে ফোনটা বাজছে। বেজেই চলেছে।

১.৬ একফালি তাজা ইতালীয় রুটি

০৬.

ভোর।

একফালি তাজা ইতালীয় রুটি, পুরু এক টুকরো জোনোয়ার সসেজ, এক গ্লাস গ্রাপা এবং সবশেষে চীনামাটির জাগ ভর্তি ধুমায়িত কফি পান করে নাস্তা সারল ক্লেমেঞ্জা। ড্রেসিং গাডন আর লাল চামড়ার স্যাণ্ডেল পরে পায়চারি করছে সে, দিনের শুরুতেই আজকের কাজের কথাগুলো ভেবে নিচ্ছে। কাল রাতে সনি কর্লিয়নি পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছে পলি গাটোর ব্যাপারটা দেরি করা চলবে না। তার মানে আজই ব্যবস্থাটা করতে হবে।

বেশ একটু দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে ক্লেমেঞ্জা। ওর অধীনে থেকে পলি গাটো বেঈমানী করেছে বলে নয়। যা ঘটেছে তার জন্যে একজন ক্যাপোরেজিমির বিচার বুদ্ধিকে দোষ দেয়া চলে না। পলি গাটোর অতীত সম্পর্কে সবাই জানে, তাকে অবিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠেনি কখনও। সিসিলীয় পরিবারের ছেলে সে, একই পাড়ায় কর্লিয়নিদের ছেলেদের সাথে খেলাধুলো করে বড় হয়েছে, স্কুল পর্যন্ত লেখাপড়া শিখেছে। কাজে নেবার আগে সব রকম ভাবে পরীক্ষাও করা হয়েছিল তাকে, কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছিল সে। নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে এই পরিবারের কাছ থেকে ভাল বোজগারের সুযোগও আদায় করে নিয়েছিল–ঈস্ট সাইডের জুয়া ব্যবসার অংশ পেত, ইউনিয়ন থেকেও টাকা নিত। নিয়মের বাইরে গায়ের জোর দেখিয়েও এখান সেখান থেকে টাকা খেত সে, জানত ক্লেমেঞ্জা। এতে তার দক্ষতাই প্রমাণ হয়েছে। এ-ধরনের ছোটখার্ট নিয়ম ভাঙাকে সজীব প্রাণচাঞ্চল্য বলেই মনে করত তারা। তাগড়া ঘোড়া যেমন তার লাগামের সাথে লড়ে। জোর করে টাকা তোলার সময় কখনও কোন হাঙ্গামার সৃষ্টি করেনি পলি। কেউ আহত হয়নি কখনও। যাই হোক, ছেলেছোকরাদের হাত লম্বা হলে সুবিধেই হয় তাতে। কাজে আগ্রহ বাড়ে। পলির ব্যাপারটা তাই ভাল চোখেই দেখা হয়েছে। কিন্তু সে যে বেঈমানী করে বসবে:ত কে ভেবেছিল!

পলি এখন কোন সমস্যা নয়। তার শাস্তির ব্যবস্থা করা দৈনন্দিন আর সব কাজের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। ব্যবস্থাপনার বিষয়টা নিয়ে সমস্যায় পড়েছে ক্লেমেঞ্জা। নিচে থেকে কাকে টেনে তুলে পাটোর জায়গায় বসাবে সে? কে লাভ করবে পদোন্নতি?

কর্লিয়নি পরিবারে পদের বিশেষ গুরুত্ব আছে। সদ্য শূন্য পদটির নাম বাটন ম্যান। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ, যাকে তাকে এ পদে বসানো হয় না। শক্তি এবং বুদ্ধি তার থাকতেই হবে, হতে হবে অতি বিশ্বস্ত। মৌন থাকার সিসিলীয় মন্ত্র, যার নাম ওমের্তা; সেই মন্ত্রে দীক্ষিত হতে হবে তাকে, প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়ে গেলেও যে পুলিশের কাছে মুখ খুলবে না।

তারপর ভাবছে ক্লেমেঞ্জা, এই পদে যে আসবে তার আয়ের ব্যবস্থা কি করা হবে সেটাও একটা সমস্যা। ডনকে সে অনেকদিন থেকেই বলছে বাটন-ম্যানদের রোজগারের রাস্তা বড় করা দরকার, কিন্তু ডন সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেছেন। পলি গাটোর রোজগার আরও বেশি হলে সলোহোর টোপ হয়তো গিলত না সে।

মনে মনে সম্ভাব্য তিনজন প্রার্থীর একটা তালিকা তৈরি করল ক্লেমেঞ্জা।

এনফোর্সার বলা হয় যে লোকটাকে তার কথা প্রথমে বিবেচনা করল ক্লেমেঞ্জা। হার্লেমের নিগ্রো পলিসি ব্যাঙ্কার-দের সাথে কাজ করে সে, শক্তিমান প্রকাণ্ডদেহী, সবার সাথে তার বলিবনা আছে–আবার তাদের মনে ভয় ঢোকাতেও তার জুড়ি নেই। কিন্তু আধঘণ্টা ভাবনাচিন্তা করে তালিকা থেকে তার নামটা কেটে দিল ক্লেমেঞ্জা। নিগ্রোদের সাথে বড় বেশি মাখামাখি করে লোকটা, তারমানে নিশ্চয়ই তার চরিত্রে কোথাও গলদ আছে। তাছাড়া, যে পদ থেকে তাকে তুলে আনা হবে সে পদের জন্যে উপযুক্ত লোক জোগাড় করাও কঠিন হবে।

দ্বিতীয় লোকটাকেই দেয়া যেতে পারে পলি গাটোর পদটি, প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল ক্লেমেঞ্জা। প্রচণ্ড পরিশ্রমী লোক সে, সব কাজ নিপুণভাবে শেষ করে, সংগঠনের কাজে পাকা কর্মী। প্রথমদিকে বুকমেকারের চর ছিল সে, এখন কর্লিয়নিদের লাইসেন্স প্রাপ্ত মহাজনদের কাছ থেকে ডেলিঙ্কোয়েন্ট অর্থাৎ অবহেলিত অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে। কিন্তু এখনও সে কোন গুরুত্বপূর্ণ পদের যোগ্যতা অর্জন করেনি।

শেষ পর্যন্ত রকো ল্যাম্পনি নামে একজন লোককে নির্বাচন করল ক্লেমেঞ্জা। অল্পদিন হলো কর্লিয়নি পরিবারে যোগ দিয়ে হাতে কলমে কাজ শিখছে বটে, কিন্তু এরই মধ্যে কাজ দেখিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে সে। আফ্রিকাতে যুদ্ধ করে আহত হয়েছে লোকটা, সামরিক বাহিনী থেকে ছাড়া পেয়েছে উনিশশো তেতাল্লিশ সালে। আহত হবার ফলে একটু খুঁড়িয়ে হাঁটে, কিন্তু সে সময় অল্প বয়েসি লোকজনের খুব অভাব বলে বাধ্য হয়ে কাজে লাগিয়েছিল তাকে ক্লেমেঞ্জা। সেই ক্ষুদ্র পদ থেকে ধাপে ধাপে উঠে রকৌ ল্যাম্পনি আজ গোটা সংগঠনের পরিত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় গুণ ওর সূক্ষ্ম বিচার বোধ। অল্প দাম দিয়ে দামী জিনিস কেনার অদ্ভুত একটা প্রবণতা রয়েছে ওর। গায়ের জোর এবং হুমকি হলো ওর সেই অল্প দাম, এই দাম দিয়ে বড় বড় মুনাফা লাভের পক্ষপাতী ও। যে অপরাধ করলে সামান্য একটা জরিমানা অথবা বড়জোর ছয় মাসের জেল হতে পারে সে অপরাধ তেমন লাভজনক নয়, তাই গায়ের জোর বা হুমকি একেবারে না খাটালে নয় বলেই খাটায় ও। ওর বুদ্ধির এমনই গভীরতা যে এসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভীত প্রদর্শন না করে অল্প অল্প ছোটখাটো ভয় দেখিয়ে কাজ উদ্ধার করে নেয়।

রকো ল্যাম্পনিকে নির্বাচিত করে ক্লেমেঞ্জা সিদ্ধান্ত নিল আজকের কাজটায় সে নিজে উপস্থিত থাকবে। এবং তাকে সাহায্য করবে রকো। নতুন একজন লোককে বাস্তব জ্ঞান দেবার উদ্দেশ্যে কাজের সময় সশরীরে সেখানে উপস্থিত থাকার সিদ্ধান্ত নেয়নি সে, সিদ্ধান্তটা নিয়েছে পলি গাটোর সাথে তার নিজের একটা হিসাব নিকাশ আছে বলে। শুধু কর্লিয়নি পরিবারের সাথে নয়, পলি গাটো ক্লেমেঞ্জার সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সাংঘাতিক অপমানিত হয়েছে সে। এই অপমানের প্রতিশোধ নেয়া দরকার।

আগেই পলি গাটোকে বলে রাখা হয়েছে সে যেন বেলা তিনটের সময় নিজের গাড়িতে তুলে নেয় ক্লেমেঞ্জাকে।

রকো ল্যাম্পনিকে ফোন করল ক্লেমেঞ্জা এবার। নিজের পরিচয় না দিয়ে শুধু বলল, কাজ আছে, আমার বাড়িতে এসো।

ঠিক আছে, বলল রকো। এই ভোরেও তার কণ্ঠস্বরে ঘুমের জড়তা বা বিস্ময়ের সুর নেই লক্ষ্য করে খুশি হলো ক্লেমেজা।

তাড়াহুড়োর কিছু নেই, বলল ক্লেমেঞ্জা। তবে বেলা দুটোর পর আর দেরি করো না।

আবার সংক্ষিপ্ত ঠিক আছে ভেসে এল অপরপ্রান্ত থেকে। রিসিভার রেখে দিল ক্লেমেঞ্জা।

আরেকটা কাজের কথা মনে পড়ল তার। প্রাঙ্গণে টেসিওর দলের জায়গায় ওর দলের লোকেরা জায়গা নেবে। এ ব্যাপারে আগেই নির্দেশ দিয়ে রেখেছে, সে নিজের লোকজনকে। তারা অন্তত দক্ষ, ঠিকঠাক পালন করবে নির্দেশ। সুতরাং এ কাজের ব্যাপারেও চিন্তার কিছু নেই।

ক্লেমেঞ্জা ঠিক করল ক্যাডিলাকটাকে ধোবে সে। খুব প্রিয় গাড়ি এটা তার। চলার সময় একটুও শব্দ করে না। গদিগুলো এত দামী আর আরামদায়ক যে দিনটা ভাল থাকলে গাড়িতে বসে ঘন্টাখানেক সময় কাটায় সে-বাড়িতে বসে থাকার চেয়ে অনেক লোভনীয় সেটা। তারপর মনে পড়ল, বাবা বলতেন, গাধার গা ধুইয়ে দেবার সময় তার নাকি বুদ্ধি খুলত। কথাটা তার জন্যেও সত্যি। গাড়ি ধোবার সময় তারও বুদ্ধি খুলে যায়।

শীত সহ্য হয় না তার, গরম গ্যারেজে দাঁড়িয়ে কাজ করছে সে, আর চিন্তাভাবনা করছে। পলি ছুঁচোর মত চালাক, বাতাসে বিপদের গন্ধ পায়। এগোতে হবে খুব সাবধানে। তবে যতই শক্তিমান থোক, ডন বেঁচে আছেন শুনে নিশ্চয়ই ঘন্টায় ঘন্টায় প্যান্ট নষ্ট করে ফেলছে। গাধার পাছায় পিঁপড়েদের ভিড় জমলে সে যেমন ছটফট করে, এর অবস্থাও তাই হয়েছে।

রকোকে সাথে নেবার একটা অজুহাত দাঁড় করাতে হবে। তাছাড়া, তিনজনের একত্রে কোথাও যাবার একটা বিশ্বাসযোগ্য উদ্দেশ্য না দেখাতে পারলে সন্দেহ জাগবে তার মনে।

অবশ্য, এত ঝামেলায় না গিয়ে পলিকে আরও সহজে খুন করা যায়। নজরবন্দী রাখা হয়েছে, পালাতে পারবে না। কিন্তু সব কাজ নিয়ম ধরেই হওয়া চাই, এবং যার যা প্রাপ্য তাকে তা নিতেই হবে, রেহাই পাওয়া চলবে না।

ফিকে নীল রঙের ক্যাডিলাকটা ধুচ্ছে আর চিন্তা করছে সে, পলিকে কি কথা বলবে, কখন কি রকম হবে তার মুখের ভাব ইত্যাদি।

কথা বলবে কম, অসন্তুষ্ট হয়েছে এরকম একটা ভাব দেখাতে হবে। সন্দিগ্ধ স্বভাব গাটোর, বুদ্ধিটাও ধারাল, সদ্ভাব প্রকাশ করলেই সতর্ক হয়ে উঠবে। অন্যমনস্কতার ভান করে বিরক্তি দেখাতে হবে। কিন্তু রকোকে দেখে ভীষণ ঘাবড়ে যেতে পারে পলি। ড্রাইভিং সীটে হাতে হুইল নিয়ে বসে থাকা অবস্থায় এমনিতেই অসহায় মনে হবে নিজেকে তার, তার উপর রকো যদি মাথার পিছনে থাকে, ঘাবড়ে তো যাবেই পলি। তাহলে উপায়? সাথে আরেকজন লোক নিলে কেমন হয়? না। কারণ ভবিষ্যতের কথা কিছুই বলা যায় না। ভবিষ্যতে কে ওর বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে না দেবে এখনও তা বলা যায় না। ওর জবানবন্দীর বিরুদ্ধে দুজন কথা বললে বিপদ গুরুতর আকার ধারণ করবে। না, আগের উপায়টাই ভাল।

আগেই সিদ্ধান্ত নেয়া আছে, শাস্তিদানের ব্যাপারটা চেপে রাখা হবে না। অর্থাৎ, লাশটা খুঁজে পাওয়া যাবে।

লাশ লুকিয়ে ফেলার জন্যে সাধারণত নাগালের কাছে মহাসাগর অথবা নিউজার্সিতে পারিবারিক বন্ধু বান্ধবদের জমি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া, বিশেষ কারণ দেখা দিলে নানান জটিল উপায় অবলম্বন করা হয়। কিন্তু পলি গাটোর লাশ গুম করা যাবে না দুটো কারণে। এক, তার লাশ দেখিয়ে সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতকদের মনে ভয় ঢোকাতে হবে। দুই, শত্রুদেরকেও সতর্ক করা দরকার-কর্লিয়নিরা নির্বোধ এবং দুর্বল নয় এটা তাদেরকে বোঝাতে সাহায্য করবে লাশটা।

ধোঁয়া মোছর পর ঝকঝকে ক্যাডিলাকটাকে বিশালএকটা নীল রঙের ইস্পাতের তৈরি ডিমের মত দেখাচ্ছে। কাজের শেষ পর্যায়ে এসে হঠাৎ একটা বুদ্ধি পেয়ে গেল ক্লেমেঞ্জা। সব সমস্যার চমৎকার একটা সমাধান বের করে ফেলেছে সে।

পরিবারগুলোর লড়াই ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করলে সবাই তখন পরিচিত আবাসস্থল ছেড়ে গোপন ফ্ল্যাটে অস্থায়ী আস্তানা গাড়ে। সেই সব ফ্ল্যাটে সৈনিকরা তোষক বিছিয়ে রাতে শোয়। এই ব্যবস্থার অনেক সুবিধে আছে। সাধারণত বিশ্বস্ত, একজন কাঁপোরেজিমিই খুঁজে পেতে বের করে গোপন আস্তানা, সেখানে অনেকগুলো তোষকের ব্যবস্থা রাখা হয়। এই গোপন আস্তানা থেকে গা ঢাকা দিয়ে বেরিয়ে সৈনিকরা হামলা চালায় শত্রুদের উপর। এখন ক্লেমেঞ্জা যদি গোপন আস্তানা খুঁজতে বেরোয়, সেটা কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার হবে না। আস্তানার জন্যে তোষক, আসবাব মোগাড় করার জন্যে তার সাথে লোক থাকা দরকার–সুতরাং গাটো আর রকোকে নিচ্ছে সে। আপন মনে হাসল ক্লেমেঞ্জা। কথাটা শুনেই অতি লোভী পলি ভাববে এই তথ্যের বিনিময়ে সলোযোর কাছ থেকে কত টাকা আদায় করা সম্ভব।

ঠিক সময়ে এসে পৌঁছুল রকো ল্যাম্পনি। পূব কথা বলল তাকে ক্লেমেঞ্জা। বিস্ময়ে, কৃতজ্ঞতায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল রকোর মুখ। সমীহের সাথে ধন্যবাদ জানাল সে। তার কাধ চাপড়ে দিয়ে বলল ক্লেমেঞ্জা, আজ থেকে তোমার রোজগার কিছু বাড়বে। তবে এ-বিষয়ে এখন কোন আলোচনা নয়। বুঝতেই তো পারছ, হাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে আমাদের।

রকো জানাল, এসব ব্যাপারে সে ধৈর্য ধরতে জানে।

সেফ খুলে একটা পিস্তল বের করে রকোকে দিল ক্লেমেঞ্জা। পলির সাথে গাড়িতেই ফেলে রেখো এটা। সূত্র ধরে এর মালিককে খুঁজে বের করা সম্ভভ নয় কারও পক্ষে।

একটু পরই এল পলি গাটো। বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়েছে সে। পিছনে রকোকে নিয়ে গাড়ির কাছে হাজির হলো ক্লেমেঞ্জা। সামনের সীটে গাটোর পাশে, গম্ভীর মুখে বসল সে। বিরক্তির সাথে রিস্ট ওয়াচ দেখল একবার। ভাবটা এই রকম, পলি যেন আসতে দেরি করেছে।

ঘাড় ফিরিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে ক্লেমেঞ্জার দিকে তাকিয়ে আছে পলি। পিছনের সীটে ক্যাচ ক্যাচ আওয়াজ হতেই ভিউ মিররে তাকাল সে, রকো ল্যাম্পনিকে দেখেই কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে উঠল। অন্য ধারে সরে বসো, রকো। তোমার মত লম্বা চওড়া লোক ওখানে বসলে ভিউ মিররে কিছুই দেখতে পাব না।

সুবোধ বালকের মত সরে আরেক ধারে বসল রকে।

সনিটার দ্বারা কিচ্ছু হবে না, বুঝলে? ঝাঁঝ মেশানো বিরক্তির সুরে বলল ক্লেমেঞ্জা। এত ভয় পেলে চলে নাকি। চিন্তা করো, এখুনি তোষক পাততে চাইছে সে। একটু বিরতি নিয়ে আবার মুখ খুলল সে, পলি, রকোকে সাথে নিয়ে নতুন আস্তানার জন্যে লোকজন, আসবাব সব যোগাড় করতে হবে তোমাকে। কবে নাগাদ বাকি সৈনিকরা এই আস্তানায় জড়ো হবার হুকুম পাবে তা অবশ্য এখনও ঠিক হয়নি। আস্তানার জন্যে ভাল কোন জায়গার সন্ধান জানো নাকি?

মুহূর্তের জন্যে চোখ দুটো লোভে চকচক করে উঠল পলির, তা লক্ষ করে মনে মনে হাল ক্লেমেঞ্জা।

চমৎকার ভান করে যাচ্ছে রকো। জানালা দিয়ে উদাস চোখে বাইরে তাকিয়ে আছে সে।

ভেবে দেখি, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল পলি।

গাড়ি চালাতে চালাতে ভাব, মেজাজ খারাপ করে বলল ক্লেমেঞ্জা। আজই আমি নিউইয়র্কে পৌঁছুতে চাই।

অপ্রয়োজনীয় একটা কথাও হলো না গাড়িতে। ওয়াশিংটন হাইটসের দিকে যেতে বলল পলিকে ক্লেমেঞ্জা। ওখানে কয়েকটা ফ্ল্যাট বাড়ি দেখে নিয়ে আর্থার এভিনিউয়ে চলে এল। পলিকে গাড়ি থামাতে বলল সে।

রকোকে গাড়িতে রেখে নেমে গেল ক্লেমেঞ্জা। পায়ে হেঁটে ভেরা মারিয়ে, রেস্তোরাঁয় এল। স্যালাড আর মাংস দিয়ে হালকা ডিনার খেলো, এই ফাঁকে পরিচিত দুচার জনের সাথে কিছু কথাও হলো তার। ঘণ্টাখানেক রেস্তোরাঁয় কাটিয়ে আবার পায়ে হেঁটে ফিরে এল আর্থার এভিনিউয়ে। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

গাড়িতে চড়ে বলল ক্লেমেঞ্জা, বোঝো এবার। এখন বলছে লং বীচে ফিরে যেতে হবে। সনি মত বদলেছে, এ কাজ পরে করলেও চলবে। রকো, তোমাকে নামিয়ে দিয়ে যাবো নাকি?

মৃদু গলায় বলল রকো, কিন্তু আমার গাড়িটা যে আপনাদের ওখানে রেখে এসেছি।

তবে তো তোমাকে আমাদের সাথেই ফিরতে হয়।

লং বীচে ফিরছে ওরা। এবারও কথা বলছে না কেউ। শহরে ঢোকার ঠিক আগে ফাঁকা রাস্তার উপর দিয়ে ছুটছে গাড়ি। হঠাৎ বলল ক্লেমেঞ্জা, গাড়ি দাঁড় করাও, পলি। পেচ্ছাব না করলেই নয়।

ক্যাপোরেজিমির মূত্রাশয়টা একটু বেয়াদব, জানে পলি, হঠাৎ করে সময়ে, অসময়ে প্রায়ই তার পানি শ্রাগ করার বেগ চাপে। রাস্তার একধারে নরম মাটির উপর গাড়ি থামাল সে। নেমে গেল ক্লেমেঞ্জা, একটা ঝোঁপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। সেখানে সে প্রস্রাবও করল। তারপর ফিরে এসে গাড়ির দরজা খুলে চট করে রাস্তার এদিক ওদিক দেখে নিয়ে বলল, এবার মারো।

পিস্তলের আওয়াজটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মত শোনাল। সামনের দিকে লাফ দিল পলি, হুমড়ি খেয়ে পড়ল স্টিয়ারিং হুইলের উপর, সেখান থেকে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল সীটের উপর, তারপর কাত হয়ে গেল একদিকে। দ্রুত পিছিয়ে গেছে ক্লেমেঞ্জা, গায়ে যাতে খুলির কুচি বা রক্তের ছিটে না লাগে।

পিছনের সীটে ক্যাচ ক্যাচ আওয়াজ তুলে নিচে নামল রকো। হাতের পিস্তলটা ছুঁড়ে ফেলে দিল ঝোঁপের দিকে। তারপর ক্লেমেঞ্জার পিছু পিছু গিয়ে একটু দূরে দাঁড়ানো একটা গাড়িতে চড়ে বসল।

সীটের নিচে হাত দিতেই চাবিটা পেল রকো। স্টার্ট দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল সে।

ক্লেমেঞ্জাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে অন্য পথে ফিরে আসছে রকো। জেনিস বীচ কজওয়ে ধরে মেরিক শহরে পৌঁছল সে, ওখান থেকে মেডোরুক পার্কওয়ে ধরে সোজা ছুটল নর্দার্ন স্টেট পার্কওয়ের দিকে। বাক নিয়ে লং আইল্যান্ড এক্সপ্রেস ওয়েতে পড়ল সে, হোয়াইট স্টোন ব্রিজ পেরোল, তারপর ব্রঙ্কস হয়ে সোজা ম্যানহাটনের নিজের আস্তানায়।

১.৭ গুলি খেয়েছেন ডন কর্লিয়নি

০৭.

গতকাল গুলি খেয়েছেন ডন কর্লিয়নি। সাংঘাতিক ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে কাটছে আজকের দিনটা।

ফোন ছেড়ে নড়ছে না মাইকেল। অসংখ্য টেলিফোনকল একের পর এক আসছেই। ধৈর্য ধরে সবার কথা শুনছে সে, তারপর সনিকে খবরের সারমর্ম জানাচ্ছে।

ওদিকে টম হেগেনেরও এক মুহূর্ত ফুরসত নেই। সলোযোর সাথে দেখা করার। ব্যাপারে শর্তাবলী আদান প্রদানের জন্যে একজন মধ্যস্থকারী দরকার, উপযুক্ত লোক খুঁজে বের করতে হবে। তুর্ক ব্যাটা একেবারে বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে বাতাসের সাথে। তার অবশ্য কারণও আছে। ক্লেমেঞ্জা আর টেনিওর বাটনম্যানরা তার সন্ধানে শহরের প্রতিটি অলিগলি হাতড়ে বেড়াচ্ছে, এ খবর তার অজানা থাকার কথা নয়। টাটাগ্রিয়া পরিবারের মাথাগুলো নিজেদের গোপন আস্তানায় গা ঢাকা দিয়েছে, ধরে নেয়া হলো সলোযো তাদের কোলের ভিতরই লুকিয়ে আছে। শত্রুপক্ষ, প্রাথমিক সতর্কতা অবলম্বন করবে, এটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছে সনি।

পলি গাটোকে নিয়ে ক্লেমেঞ্জাও ব্যস্ত। টেসিওকে ভার দেয়া হয়েছে লুকা ব্রাসিকে খুঁজে বের করার। ডনের গুলি খাওয়ার আগের রাত থেকে কোন খবরই নেই তার, খুব অশুভ লক্ষণ এটা। কিন্তু লুকা বেঈমানী করেছে বা কেউ অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাকে মেরে ফেলেছে, একথাও বিশ্বাস করতে পারছে না সনি।

হাসপাতালের কাছাকাছি পারিবারিক কোন বন্ধুর বাড়িতে রয়ে গেছেন সনির মা। এই সঙ্কটে জামাই কার্লো রিটসি কোন সাহায্য করতে পারে কিনা জানতে চেয়েছে, উত্তরে তাকে বলা হয়েছে নিজের ব্যবসা দেখাশোনা করছে, তাই করুক, এদিকে তার মাথা গলাবার দরকার নেই, ম্যানহাটনের ইতালীয় এলাকায় রেস-এর সাথে জড়িত অত্যন্ত লাভজনক একটা ব্যবসার মালিক সে এখন, ডন কর্লিয়নিই তাকে এ ব্যবসাতে বসিয়েছেন। শহরে মার কাছেই আছে কনি, ঘনঘন যাতে হাসপাতালে গিয়ে বাবাকে দেখে আসতে পারে।

ফ্রেডিকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। ওষুধ খাইয়ে এখনও ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে তাকে। দেখে চমকে ওঠার মত চেহারা হয়েছে তার। যেন কত যুগ ধরে অসুস্থ। তাকে দেখে বাইরে বেরিয়ে এসে অবাক হয়ে সনি মাইকেলকে বলল, এমন <লো কি করে! একটাও গুলি খায়নি, অথচ বাবার চেয়ে রুগ্ন দেখাচ্ছে ওকে।

উত্তর না দিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল মাইকেল। যুদ্ধের সময় এসব দেখা আছে তার। তবে ফ্রেড যে এতটা নাড়া খাবে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি ও। ছোটবেলায় এই ফ্রেডই ছিল সবচেয়ে শক্ত। কিন্তু হলে কি হবে, সব ব্যাপারেই পিছু হটে যাবার একটা স্বভাবও ছিল তার, ব্যক্তিত্বও তেমন জোরালো ছিল না। বুদ্ধি যে একেবারেই ছিল না তা নয়, কিন্তু যেটুকু ছিল, তাতে ধার ছিল না এতটুকু। নির্মম তো সে কোনোকালেই নয়। ব্যবসাতে মেজ ছেলেটি যে উন্নতি করতে পারবে না, একথা অনেকদিন আগেই বুঝে নিয়েছিলেন বাবা।

জনি ফন্টেনের ফোন এল সন্ধ্যা নাগাদ।

ফোন ধরল সনি। খুব শান্ত, বুঝিয়ে বলার ভঙ্গিতে জনিকে সে বলল, না, ভাই, বাবাকে দেখার জন্যে অতদূর থেকে তোমার আসার দরকার নেই। তুমি আসছ, এ খবরটা তো আর চাপা থাকবে না, তাতে তোমার সুনাম ক্ষুণ্ণ হতে পারে। সে ঝুঁকি তুমি নাও, এ আমি চাই না। বাবা সুস্থ থাকলে তিনিও চাইতো না। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরুন, তখন এসো। হা হা, অবশ্যই; নিশ্চয়ই তোমার কথা বলব। ক্র্যাডলে রিসিভার রেখে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকাল সনি। জনি আসতে চেয়েছিল শুনে বাবা খুব খুশি হবেন রে।

সন্ধ্যা একটু গাঢ় হতে ক্লেমেঞ্জার একজন লোক এসে জানাল কোন এক ভদ্রমহিলা মাইকেলকে চাইছেন। কোম্পানির তালিকাভুক্ত ফোনটা ধরার জন্যে কিচেনে এল মাইক।

কেমন আছেন তোমার বাবা? ক্লান্ত কণ্ঠে প্রথমেই জানতে চাইল কে অ্যাডামস।

সাথে সাথে ব্যাপারটা বুঝে নিল মাইকেল। খবরের কাগজে বাবা পের্কে যেসব কথা বলা হয়েছে… গুণ্ডা সর্দার, চোরাকারবারী, গ্যাংস্টার, এসব দেখে ঘাবড়ে গেছে কে, বিশ্বাসই করতে পারছে না।

এখন ভালই আছেন।

হাসপাতালে তোমার সাথে আমিও যেতে চাই, বলল সে।

মনে মনে হেসে ফেলল মাইকেল। তার কথা খুঁটিয়ে সব মনে রাখে কে, এটা বুঝতে পেরে খুব ভাল লাগল ওর বুড়ো ইতালীয়দের মন জয় করতে হলে কি কি করতে হয় ঠাট্টাচ্ছলে তা একধার শেখাবার চেষ্টা করেছিল ও কে-কে, সে-কথা মনে রেখেই এখন বাবাকে দেখার জন্যে হাসপাতালে যেতে চাইছে ও।

এখন তোমার যাওয়া উচিত হবে না, বলল মাইকেল। পিরস্থিতিটা ঠিক স্বাভাবিক নয়, সে তো তুমি বুঝতেই পারছ। সাংবাদিকরা তোমার নাম জানাবে, কালই ডেলি নিউজে খবর ছাপা হবে এই হেডিংয়ে কুখ্যাত মাফিয়া গুণ্ডা-সর্দারের ছেলের সাথে প্রখ্যাত ইয়াঙ্কি পিরবারের কন্যার গোপন সম্পর্ক। তোমার গুরুজনরা কিভাবে নেবেন ব্যাপারটা, ভেবে দেখো।

ওরা ডেলি নিউজ পড়েন না, সাথে সাথে উত্তর দিল কে। একটু থেমে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চাইল, মাইক, তামাকে লুকিয়ো না, তোমার কোন বিপদের ভয় নেই তো?

আমাকে সবাই ভাল মানুষ গোবেচারা হিসাবে জানে, হাসছে মাইকেল। আমার তরফ থেকে বিপদ হতে পারে, একথা কেউ বিশ্বাসই করে না। সুতরাং, আমাকে ওরা গোণার মধ্যেই ধরে না। তাছাড়া, কে, যা হবার হয়ে টয়ে চুকে গেছে। সব, আর কিছু ঘটবে না। দেখা হলে বুঝিয়ে দের সব।

দেখাটা কবে হবে?

একটু চিন্তা করল মাইকেল। কে-র মানসিক অস্থিরতার কথা বিবেচনা করল। বলল, আজও হতে পারে, কে। একটু বেশি রাতে, কেমন? শোনো, কাউকে বলো না কথাটা। কাল সকালের কাগজে তোমার আমার ছবি বেরুক তা চাই না বুঝছ তো? জানাজানি হয়ে গেলে তোমার মা-বাবার জন্যে গোটা ব্যাপারটা অপ্রীতিকর হয়ে উঠবে।

ওসব কথা থাক। তোমার জন্যে কি করতে পারি তাই বলো। বড় দিনের কিছু কেনাকাটা করব? কিংবা…এই সময়ে তোমার কাজে লাগতে পারলে মনটা ভাল থাকত আমার।

হঠাৎ নিজেকে সাংঘাতিক ভাগ্যবান বলে মনে হলো মাইকেলের। অদ্ভুত একটা পুলক অনুভব করছে সে। বলল, আমার জন্যে অপেক্ষা করো। আর কিছু চাই না।

ওদিকে ফোনের অপরপ্রান্তে কে অ্যাডামসের শরীরে রোমাঞ্চের হোত বইতে শুরু করেছে। ছোট্ট, চাপা উত্তেজনার সাথে হাসল সে। ওটাই তো আমার আনন্দের কাজ, তোমার জন্যে অপেক্ষা করে থাকা, চিরকাল থাকব, মাইক। একটু ইতস্তত করে আবার বলল, আমি তোমাকে যে কথাটা বলতে পারি-ভালবাসিসে কথাটা, কই, তুমি তো বলো না।

কিচেনের গুণ্ডাপাণ্ডাদের দিকে চোখ বুলাল মাইকেল। নীরস গলায় বলল, পারি না।

কে-র সাড়া নেই অপরপ্রান্তে। এদিকে মাইকেলও কথা বলছে না। এভাবে অনেকক্ষণ কাটল। শেষে মাইকেল বলল, আমি আসব তো?

এসো, অস্ফুটে বলল কে।

ক্র্যাডলে রিসিভার রেখে ক্লেমেঞ্জার দিকে তাকাল মাইকেল। খানিক আগে ফিরে এসে একে-তাকে ধমক-ধামক মেরে চুলোয় এক হাঁড়ি টমেটো-সস চাপিয়েছে সে। তার উদ্দেশ্যে মাথা একটু ঝাঁকিয়ে শেষ প্রান্তের কামরায় ফিরে এল মাইকেল। হেগেন আর সনি অপেক্ষা করছে ওর জন্যে। দুজনেই উত্তেজিত।

ক্লেমেঞ্জা কোথায়?

বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মাইকেল বলল, কিচেনে।

ডাকো ওকে। সাথে টেসিওকেও নিয়ে আসতে বলো।

অফিস ঘরে হাজির হলো সবাই। ক্লেমেঞ্জাকে ছোট্ট একটা প্রশ্ন করল সনি, ওর খবর বলো?

নির্বিকার ক্লেমেঞ্জা জবাব দিল, শেষ।

শিরশির করে উঠল মাইকের শরীর। কার সম্পর্কে কথা হচ্ছে, তার পরিণতি কি হয়েছে, সবই বুঝতে পারছে সে। উৎসব অনুষ্ঠানে যে লোক সবচেয়ে বেশি আনন্দে মাতোয়ারা করে সবাইকে, সে আমুদে ক্লেমেঞ্জা খুন করেছে পলি গাটোকে।

সলোযোর বিষয়ে কতদূর কি জানা গেল? হেগেনের দিকে তাকাল সনি।

উপযুক্ত লোক এখনও ঠিক করতে পারিনি। বলল হেগেন। সলোযো বিশ্বাস করবে, এমন লোক হওয়া চাই। আপোস একটা করতেই হবে, হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে ও। বুড়ো ভদ্রলোক বেঁচে গেছেন, তার মানে সব সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে ওর।

কিন্তু আমাদের পরিবারের সাথে এতটা চাতুর্যের সাথে, এত বড় ঝুঁকি নিয়ে কেউ কখনও লাগতে আসেনি, এ-কথাটা আমাদের মনে রাখতে হবে, বলল সনি। বাবাকে সেরে ওঠার সময় দেবার জন্যে আমরা সময় নষ্ট করছি, এটাই সে ধরে নিয়েছে বলে মনে হয়।

তা সে যাই ধরে নিক না কেন, আপোস রক্ষার চেষ্টা এখন তাকে করাতেই হবে। কাল নাগাদ একটা ব্যবস্থা করতে পারব আমি।

দরজায় নক করে ক্লেমেঞ্জার একজন লোক ঢুকল কামরায়। রেডিও নিউজ। পলি গাটোর গাড়িতে তার লাশ পাওয়া গেছে।

কর্কশ গলায় হুঙ্কার ছাড়ল ক্লেমেঞ্জা। তাতে তোমার কি? যাও ভাগো!

হতভম্ব লোকটা তার ক্যাপোরেজিমির দিকে বোকার মত তাকিয়ে থাকল। কিন্তু পরমুহূর্তে ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে চরকির মত আধপাক ঘুরে দ্রুত পালিয়ে গেল কামরা ছেড়ে।

ডন এখন কেমন আছেন? ভারি গলায় জানতে চাইল সনি।

ভাল, বলল হেগেন। আর দিন দুই পর কথা বলতে পারবেন। অপারেশনের ধকলটা তো গুলি খাওয়ার চেয়েও সাংঘাতিক। করণীয় সম্পর্কে তার সিদ্ধান্ত না পাওয়া পর্যন্ত লক্ষ রাখতে হবে, সলোযো বোকার মত আবার কিছু করে না ফেলে। সেজন্যেই আমি মনে করি ওর সাথে আলোচনা শুরু করে দেয়া উচিত তোমার।

আমি তৈরি, কিন্তু ওরই তো কোন খবর নেই, বলল সনি। ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও খুঁজছে ওকে, খুজতে থাকুক। তারপর আলোচনা যখন শুরু হয় হবে।

সলোযো জানে, বলল হেগেন, আলোচনার টেবিলে একবার যদি বসে, নিজেকে প্রায় পুরোপুরি আমাদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। সম্ভবত সেজন্যেই আপস করতে মন চাইছে না তার। ওর এখন সবচেয়ে বেশি দরকার নিউ ইয়র্কের অন্যান্য পরিবারের সমর্থন। তাই পাবার চেষ্টা করছে সে। এবং যদি পায়, ওর বিরুদ্ধে চরম কোন সিদ্ধান্ত ডন নিলে তা বাস্তবায়িত করা সহজ হবে না আমাদের পক্ষে।

সনি ঠিক বুঝল না। ভুরু কুঁচকে উঠল তার। কি বলতে চাইছ? আর সব পরিবার বাবার বিরুদ্ধে চলে যাবে? কেন শুনি?

অধৈর্য না হয়ে হাসল হেগেন। তারপর বুঝিয়ে দিল, বড় গোছের একটা যুদ্ধ বেধে যাক তা কেউ চায় না, তাই। যুদ্ধ বাধলে সবার ক্ষতি, খবরের কাগজ এবং সরকারের নাক গলাবার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

সনির মুখ ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে উঠছে।

আবার বলল হেগেন, ওরা সলোযোকে সমর্থন করবে। তার মেলা কারণ আছে। সলোযোর কাছ থেকে লাভের অংশ পাবে ওরা। মাদক ব্যবসায় প্রায় সবটুকুই লাভ, এ তো আমরাও জানি। আমাদের ওসব দরকার না থাকতে পারে, জুয়ার ব্যবসাটাকেই সবচেয়ে ভাল বলে মনে করছি আমরা, কিন্তু আর সব পরিবারের খাই অনেক, অনেক বেশি। লাভের সম্ভাবনা দেখলে ওরা পাগল হয়ে যায়। ভারি চালাক-চতুর লোক সালোয়য। ওদেরকে লোভ দেখিয়ে খেপিয়ে তুলতে তার কোন অসুবিধেই হবে না। কি দাঁড়াচ্ছে তাহলে? ওদের কাছে সলোহোর অনেক দাম, তাই নয় কি? এত যার দাম, তাকে ওরা মরতে দেবে কেন?

সনির মুখের দিকে তাকিয়ে মাইকেল তার জীবনের আরেক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। রক্তশূন্য, ফ্যাকাসে হয়ে গেছে সনির চেহারা। তারপর দ্রুত রক্ত ফিরে এসে মস্ত মুখটাকে টকটকে লাল করে তুলল। অস্বাভাবিক গভীর, কিন্তু শান্ত গলায় বলল সে, ওদের লাভ লোকসানের খতিয়ান আমি শুনতে চাই না। ওদেরকে আমি গ্রাহ্যই করি না। এই যুদ্ধে কেউ যদি নাক গলাতে আসে, নিজের ধ্বংস ডেকে, আনবে সে। আমাকে ওরা এখনও চেনেনি।

কাঠের মত শক্ত হয়ে গেছে ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও। সনি এখন ডনের প্রতিনিধিত্ব করছে, তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। সামগ্রিক যুদ্ধের ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত যদি গ্রহণ করে সে, প্রতিপক্ষদের দুর্ভেদ্য দুর্গ আক্রমণ করতে হবে তাদেরকেই। লড়তে ভয় নেই ওদের, কিন্তু লড়াই করে শেষটায় কি লাভ হবে, বিজয় উৎসবে যোগ দেবার জন্যে কর্লিয়নি পরিবারের কেউ বেঁচে থাকবে কিনা, সেটাই সবচেয়ে আগে ভেবে দেখতে হবে।

ধৈর্যচ্যুতি ঘটল হেগেনের। কিন্তু গলা না চড়িয়ে সে বলল, ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করো, সনি। ডন এ ধরনের কথা শুনতে পছন্দ করেন না। কেউ গায়ের জোর দেখিয়ে কোন সমস্যার সমাধান করলে তিনি বলেন, লোকটা লোকসানের বীজ রোপন করল। কিন্তু, একথাও ঠিক, আমরা সবাই জানি, ডন যদি নির্দেশ দেন সলোযোকে সরাতে হবে, দুনিয়ার কোন শক্তি আমাদেরকে ঠেকাতে পারবে না। হেগেন আরও গম্ভীর হলো। সমস্যাটা ব্যক্তিগত নয়, ব্যবসায়িক। এর সমাধান ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে না এসে আসতে হবে ব্যবসা-বুদ্ধি থেকে।

কিন্তু তুমি বলছ অন্যান্য পরিবারগুলো সলোযোকে বাঁচাতে চাইবে, বলল সনি। আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল সে, কিন্তু হেগেন তাকে বাধা দিল।

চাইবেই তো, বলল হেগেন। নিজেদের লাভটা দেখবে না ওরা?

তাহলে…

এই সমস্যারও সমাধান আছে, মৃদু হেসে বলল হেগেন। সলোযোকে আমরা খতম করতে চাই এটা তাদেরকে স্পষ্ট ভাবে না জানিয়ে আমরা তাদেরকে কি ধরনের কি কি বাড়তি লাভের সুযোগ করে দিতে রাজি আছি তা জানালেই আমাদের ইচ্ছাটা কি তা পরিষ্কার বুঝে নেবে ওরা। তখন একটা কেন, এক ডজন সলোযোকেও যদি আমরা খুন করি, ওরা দেখেও না দেখার ভান করবে। সেজন্যেই বলছি, ক্ষেপে গিয়ে রক্তলোলুপ হয়ে উঠো না। এটা আমাদের ব্যবসা। তোমার বাবাকে ব্যক্তিগত কারণে নয়, ব্যবসায়িক কারণেই গুলি করা হয়েছে। এটুকু বোঝার ক্ষমতা তোমার থাকা উচিত।

চোখমুখ এখনও উ ক্রোধে রক্তিম হয়ে আছে সনির। আমি আর কিছু শুনতে চাই না, শুধু দেখতে চাই সলোযোর পিছনে যদি লাগি, কেউ যেন বাধা দিতে না আসে। টেসিওর দিকে ফিরল ও। লুকার খবর বলো।

খবর নেই, অসহায় ভাবে মাথা নাড়ল টেসিও। সলোমোর খপ্পরে পড়েছে কিনা…

চিন্তিতভাবে হেগেন বলল, লক্ষ্য করেছি, লুকার কথা ভেবে একটুও ঘাবড়ায়নি সলোযো। তখনই খটকা লেগেছিল আমার। মাথায় মগজ আছে এমন কেউ লুকাকে ভয় করবে না, এ হতেই পারে না।

কোথায় রাগ, আশঙ্কায় নীল হয়ে উঠল সনি। অস্ফুটে বলল, ফর গভর্স সেক, ওই একটা মাত্র ব্যাপারকে যমের মত ভয় পাই আমি। লুকা আমাদের বিরুদ্ধে চলে যায়নি তো? তোমরা কি ভাবছ, ক্লেমেঞ্জা? টেসিও?

খুব ধীর গলায় বলল ক্লেমেঞ্জা, পলির কথা ভাবো একবার। আমি বলতে চাইছি, যে কেউ দল শ্রাগ করতে পারে। কিন্তু লুকা? না! অসম্ভব।

কেন অসভব?

অসম্ভব এ জন্যে যে লুকা ব্রাসি ভয় করে না কাউকে, বিশ্বাস করে না কাউকে–শুধু একজনকে ছাড়া, বলল ক্লেমেঞ্জা। এই একজন হলেন গড ফাদার। অনেকের অনেক পথ থাকতে পারে, কিন্তু লুকার একটা পথ। গড ফাদারের ওপর ওর যে ভক্তি, তার তুলনা নেই। কথাটা শুনতে যাই হোক, কিন্তু বর্ণে বর্ণে সত্যি যে সবাই গড ফাদারকে ভক্তি করে, কিন্তু লুকার মত? না। আমার প্রাণ বাজি রেখে বলতে পারি, লুকা বেঈমানী করেনি, করতে পারে না। আবার, সলোযো যতই ধড়িবাজ চতুর হোক, লুকাকে বাগে পেয়ে সর্বনাশ ঘটিয়ে ফেলেছে বলেও আমি বিশ্বাস করি না। সম্ভাব্য যে কোন বিপদের জন্যে তৈরি থাকে সে। এমন হতে পারে, দুএকদিনের জন্যে কোথাও গেছে সে।

গম্ভীর হয়ে ক্লেমেঞ্জার দিক থেকে টেসিওর দিকে তাকাল সনি।

ব্রুকলিনের ক্যাপোরেজিমি টেসিও শ্রাগ করল। ততটা কাউকেই আমি বিশ্বাস করি না। কে কি কারণে বেঈমানী করে বসে, কিছু বলা যায় না। লুকার একটা দুর্বলতার কথা আমার জানা আছে। একটুতেই দুঃখ পে সে। ডনের কোন আচরণে মনে চোট পেয়ে থাকতে পারে। তার মানে কিন্তু আমি বলতে চাইছি না যে লুকা বেঈমানী করেছে। আমার বিশ্বাস সলোযো যেভাবেই হোক ওকে সরিয়ে দিয়েছে। ক্লেমেঞ্জার বিশ্বাসের সাথে এখানেও একমত হতে পারছি না আমি। দুনিয়ার কেউ অজেয় নয়। সবাইকেই, তা যে যত শক্তিশালী আর দুর্ধর্ষই হোক, সাবাড় করা সম্ভব। আমি বরং কনসিলিয়রির সাথে একমত, সবচেয়ে জঘন্য বিপদের জন্য নিজেদেরকে তৈরি রাখা উচিত আমাদের।

টেসিও থামতে সনি খানিক চিন্তা করল। তারপর বলল, পলি গাটোর খবর তো পেয়ে গেছে, সলোযোর প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে?

কর্লিয়নিরা নির্বোধ নয়, এটুকু অন্তত বুঝবে, প্রচণ্ড আক্রোশে মুখটা বিকৃত দেখাচ্ছে কুমেঞ্জার। নেহাত কপালের জোরে যা করার করেছে

তীক্ষ কণ্ঠে বাধা দিল সনি। কি বললে? কুপালের জোর? বোকা নাকি! এর মধ্যে কপাল কোথায় দেখতে পাচ্ছ তুমি? বলো, সাধনার জোরে। বলো পরিকল্পনার জোরে। অনেকদিন থেকে বাবার গতিবিধির ওপর নজর রেখেছে ওরা। শুধু তাই নয়, বেঈমানী করার জন্যে আমাদের লোককে প্রস্তাব দিয়েছে। পলির কথা বলছি। হয়তো লুকাকেও। তারপর টমকে হাইজ্যাক করার ব্যাপারটাও ধরো। নিখুঁত প্ল্যান ধরে প্রতিটি কাজ করেছে ওরা। ঠিক সময়টিতে নিয়ে গেছে ওকে। এবার বলো, কপালের, জোর কোথায় দেখছ? বরং, একথা বলো যে কপাল ওদের সাথে অসহযোগিতা করেছে? ওঁদের প্ল্যানে কোন খুঁত ছিল না। কিন্তু কপাল দোষে ভাড়াটে খুনেগুলো যথেষ্ট দক্ষতা দেখাতে পারেনি, বাবা এক সেকেণ্ড আগেই সব বুঝে ফেলেছিলেন। প্রথম দফায় গুলি খেয়েও পড়ে যাননি।

একটু থামল সনি। সবার দিকে তাকাল একবার করে। চুপচাপ বসে আছে মাইকেল। কি ভাবছে না ভাবছে মুখের ভাব দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

বাবা মারা গেলে আপোস না করে উপায় ছিল না আমার, আবার বলল সনি। আপোস করা মানে পরাজয় মেনে নেয়া। তাই মেনে নিতাম। তারপর সুযোগে অপেক্ষায় থাকতাম। পাঁচ বছর বা দশ বছর কেটে যেত, তারপর প্রতিশোধ নেবার সূযোগ আসত। এই যে সুযোগটা আসত, এটাকে তুমি কি বলবে, পীট? কপালের জোর? মোটেই না। এরই নাম কৌশল, এরই নাম প্ল্যান। শেষের দিকে সনির কথায় ঝাঁঝের মাত্রা কমে গেল।

কিচেন থেকে মস্ত এক ডিশে করে নিয়ে আসা হলো স্প্যাগেটি। সাথে কয়েকটা প্লেট, কাঁটা চামচ, গ্লাস এবং মদের বেশ কয়েকটা বোতল। কথা ওদের থামেনি, কিন্তু খাবারের প্রতি অবহেলাও করছে না কেউ, শুধু মাইকেল ছাড়া। অবাক হয়ে দেখছে সে ব্যাপারটা। ভেবেই পাচ্ছে না এই পরিস্থিতিতে খিদে আসে কোত্থেকে! ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও নড়েচড়ে বসে তৈরি হয়ে নিয়ে খাবারের উপর হামলা চালাল। সমিকেও প্রস্তুতি নিয়ে শুরু করতে দেখা গেল। এটা যদি সম্ভব হয়, খাবার নিয়ে তিনজনের মধ্যে মারামারি লেগে গেলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই, কথাটা ভেবে হাসি পেল মাইকেলের। টম অবশ্য এসব লক্ষ্যই করছে না। শোকে বা ভয় কাহিল হয়নি সে, বুদ্ধির ধার দিয়ে জট ছিঁড়ে প্রকৃত অবস্থাটা অনুধাবন করতে এতই মগ্ন যে, কারও নড়াচড়া তার দৃষ্টিতে ধরাই পড়ছে না ভাল করে, শুধু কে কি বলছে তাই শুনতে পাচ্ছে।

সলোযোর প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে, সে ব্যাপারেও ক্লেমেঞ্জার সাথে দ্বিমত পোষণ করল টেসিও। তার ধারণা খবরটা পেয়ে ঘাবড়াবে না সলোমো। সে বরং ভাববে, বুদ্ধুটা খুন হয়ে ভালই হয়েছে, মাসে মাসে আর বেতন গুণতে হবে না। ভয়ও সে পাবে না। এই অবস্থায় পড়লে কর্লিয়নিরা কি ভয় পেত?

এতক্ষণ নির্বাক শ্রোতার ভূমিকা পালন করেছে মাইকেল। টেসিও থামতে নরম গলায় সে বলল, এসব ব্যাপারে আমি একেবারে আনাড়ী, কিন্তু তবু একটা কথা বলতে চাই। সলোযে লোকটা সম্পর্কে তোমাদের মুখে মোটামুটি সবই তো শুনলাম। টমের সাথে যোগাযোগ কেটে দিয়েছে সে, এটাকে ভাল লক্ষণ বলে মনে করছি না আমি। আমার ধারণা গোপনে কোন সুবিধে করে নিচ্ছে ও। তৈরি হয়েই হয়তো এমন কোন চাল চেলে বসবে, দেখতে পাব নিরাপদ জায়গায় বসে কর্লিয়নিদের মাথার ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে সে। এখন আমাদের উচিত আগে থেকে সঠিক আঁচ করা সেই চালটা ওর কি হবে। নির্ভুলভাবে তা যদি জানতে পারি, ও কোন সুবিধে করতে পারবে না, আমরাই লাঠি ঘোরাব।

মাইকেলের বক্তব্যের সাথে সবাই একমত হয়ে মাথা নাড়ল। ঠিক এই কথাগুলো গুছিয়ে সে কেন আগে বলতে পারেনি ভেবে নিজের উপর একটু রাগ হলো সনির। মুখ একটু ভার করে ফেলল সে। বলল, আমি তাই ভেবেছি। কি সুবিধে করে নিতে পারে তাও জানা আছে আমার। লুকাকে সরাতে পারলেই মস্ত সুবিধে হয়ে যায় সলোহোর। একটু থেমে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। চারদিকে রটিয়ে দেয়া হয়েছে কর্লিয়নিরা লুকাকে তার পুরানো দায়িত্বগুলো দেবার জন্যে খুঁজছে, দেখা যাক কি হয়।

থামল সনি। তারপর গ্লাসে মদ ঢালতে শুরু করে আবার বলল, আরেকটা সুবিধে পাবার চেষ্টা করতে পারে সলোযো। নিউ ইয়র্কের আর সব পরিবারগুলোর সমর্থন। কাঁধ ঝাঁকাল সে। ঢক ঢক করে গলায় মদ ঢালল। কালই হয়তো খবর আসবে। আমাদেরকে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়া হবে সংগ্রাম শুরু হলে ওরা সবাই আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।

সেক্ষেত্রে?

সলোযোর প্রস্তাব মেনে না নিয়ে উপায় থাকবে না, মাথা নিচু করে বলল সনি।

মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল হেগেন। ঠিক। ডনের অনুমতি ছাড়া যুদ্ধ ঘোষণা করার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি সব বোঝেন, এবং সবকটা পরিবারের বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণার ঝুঁকি একমাত্র তিনিই নিতে পারেন। ডনের রাজনৈতিক ক্ষমতার ওজন জানা আছে সবার, সেই ক্ষমতার সাহায্য সব সময় দরকার হয় সবগুলো পরিবারের, সুতরাং কিসের বিনিময়ে কি চেয়ে বোঝাঁপড়া করতে হবে তা একমাত্র ডনই ভাল বুঝবেন।

কোথাকার পানি কোথায় গড়াবে, কিছুই বলা যায় না, বলল সনি।

চিন্তিতভাবে উপর নিচে মাথা নাড়ল হেগেন।

দপ করে যেন জ্বলে উঠল ক্লেমেঞ্জ। কর্কশ, রূঢ় গলায় বলল, এ-বাড়িয় কাছেপিঠে খোদ যমও ঘেষতে পারবে না, সনি। এব্যাপারে তুমি চিন্তা করো না। যার বাটনম্যান ইদানীং বেঈমানী করেছে তার মুখে দৃঢ় ভঙ্গির কথাগুলো ঠিক যেন মানাল না।

ভুরু কুঁচকে কয়েক সেকেণ্ড ক্লেমেঞ্জার দিকে তাকিয়ে থাকন সনি। তারপর ধীরে ধীরে টেসিওর দিকে ফিরল। হাসপাতালের খবর বলো। যারা পাহারা দিচ্ছে সবাই তোমার বাছাই করা লোক তো?

আজকের আলোচনায় এই প্রথম টেসিওর চেহারায় আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠল। ধীরস্থির ভঙ্গিতে কথা বলছে সে, বাছাই করা লোকদের নিয়েই আমার দল। হাসপাতালের ভিতরে ওরা প্রতিটি ইঞ্চির ওপর চোখ রেখেছে। বাইরে, চারদিক থেকে একরকম গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। ওরা না চাইলে বাতাসেরও ভিতরে ঢোকার অনুমতি নেই। একটু থেমে টেসিও বলল, পুলিশ বিভাগও কড়া পাহারার ব্যবস্থা করেছে। তবে একটা হাস্যকর ব্যাপার হলো, ভনের কামরার বাইরে গোয়েন্দারা বসে অপেক্ষা করছে, উনি জ্ঞান ফিরে পেলেই কথা বলবে, তাই। কিচেনেও পাহারা আছে, কিন্তু খাবার পরীক্ষা করা হচ্ছে না তার কারণ, ডন এখনও কিছু খাচ্ছেন না। কোন দিক থেকে কোন সুবিধে করতে পারবে না হাসপাতালে, উনকে ওদের নাগালের একেবারে বাইরে রেখেছি আমরা।

রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিল সনি। হাইজ্যাকের সম্ভাবনা ষোলো আনা। প্রশ্ন হলো, কাকে? একটু হাসল সে। আমাকে? এদিক ওদিক মাথা দোলাল সে। আমাকে নিয়ে গেলে ওদের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। এখন আমি পরিবারের মাথা, কারবার করতে হবে আমার সাথে। উঁহু, আমাকে নিয়ে যাবার মতলব নেই, ওদের। ছোট ভাই মাইকেলের দিকে তাকাল সনি, আবার হাসল সে। কে জানে, তোমাকে দিয়ে ওদের কাজ চলবে কিনা! সলোমোর মতলব কিছুই বলা যায় না। তোমাকে আটকে রেখে আমার সাথে রফা করার প্রস্তাব পাঠাবে, এই রকম ভেবে থাকতে পারে।

অসন্তুষ্ট চিত্তে ভাবছে মাইকেল, কে-র সাথে দেখা করা বুঝি শিকেয় উঠল। বাড়ি থেকে সনি বোধহয় বেরুতেই দেবে না তাকে।

দূর! বিরক্তির সাথে বলল হেগেন। জিম্মি রাখার কথা ভেবে থাকলে মাইককে ওরা কত আগেই তো ধরে নিয়ে যেতে পারত। জানতে কারও বাকি। আছে, পারিবারিক ব্যবসার সাথে মাইকের কোন সম্পর্ক নেই? মাইক একজন সাধারণ সিটিজেন, ওর সাথে এই রেষারেষির কোন সম্পর্ক নেই। সলোযো এত নীচ কাজ করতে সাহসই পাবে না। জানে, এ কাজ করলে আর সব পরিবারগুলো মুহূর্তে তার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করবে। শুধু তাই নয়, সবগুলো পরিবার টাটাগ্লিয়াদের বাধ্য করবে সনোযোকে ধরে আমাদের হাতে তুলে দেবার জন্যে।

মুখের বিরক্তিভাব বদলে গেল হেগেনের। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। যেন বহুদূর অবধি দেখতে পাচ্ছে। আবার কথা বলল সে, পরিবারগুলোর সমর্থন আদায় করছে ও, এটাই তার গোপন সুবিধে। কাল হয়তো সবার তরফ থেকে একজন প্রতিনিধি আসবে আমাদের কাছে। বলবে, সলোযোর সাথে ব্যবসা করতেই হবে আমাদের।

ধীরে ধীরে নিঃশব্দে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে মাইকেল বলল। একটা কথা। রাতে আমাকে একটু বেরুতে হবে।

বিস্ময়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল সনি, কি বলছ তুমি?

বাবাকে দেখতে চাই, হাসছে মাইকেল, আরও একটা কাজ আছে। বাবা ডন কর্লিয়নির স্বভাব পেয়েছে সে, আসল উদ্দেশ্যটা কাউকে জানায় না। না জানাবার পিছনে কোন কারণ থাকে না, এমনি এটা একটা অভ্যাস ওর।

কিচেন থেকে উত্তেজিত গলা ভেসে আসছে শুমতে পেয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল ক্লেমেঞ্জা। প্রায় তখুনি ফিরে এলো সে। হাতে একটা বুলেট প্রুফ গেঞ্জি দেখা যাচ্ছে। বিরাট একটি মাছকে গেঞ্জিটা দিয়ে জড়িয়ে রাখা হয়েছে।

গেঞ্জিটা দেখেই ছ্যাৎ করে উঠল সনির বুক।

ঝট করে উঠে দাঁড়াল হেগেন। কাঁপছে সে।

ক্লেমেঞ্জা বলল, পলি পাটোর খবর পেয়ে প্রতিদান হিসাবে এই খবরটা পাঠিয়েছে সলোযো।

কেঁপে গেল টেসিওর কণ্ঠস্বর, অস্ফুটে বলল সে, যা ভেবেছিল্লাম তাই! লুকা ব্রাসিকে কতল করেছে সলোয়যা।

চুরুট ধরাতে গিয়ে সনি লক্ষ্য করল, তার হাত দুটো কাঁপছে। গ্লাসে মদ ঢেলে নিয়ে ঢক ঢক করে নিঃশেষ করল। ঠক করে নামিয়ে রাখল গ্লাসটা, মেঝেতে ছিটকে পড়ল ভাঙা কাঁচ।

কিছু বুঝতে পারছে, কিছু গোলমেলে লাগছে, মাইকেলের। এর-ওর মুখের দিকে বোকার মত তাকাচ্ছে সে। কিন্তু কেউ কথা বলছে না দেখে নিজেই জানতে চাইল, মরা মাছ কেন? ওটার মানে কি?

সে প্রশ্নের উত্তর এলো আইরিশ কনসিলিয়রি টম হেগেনের মুখ থেকে, মহাসাগরের নিচে ঘুমাচ্ছে লুকা ব্রাসি। এটা একটা সিসিলীয় সাঙ্কেতিক বার্তা।

১.৮ ডন গুলি খাওয়ার কয়েক মাস আগে

০৮.

ডন গুলি খাওয়ার কয়েক মাস আগেই সলোমোর দলের সাথে যোগাযোগ করে লুকা ব্রাসি। যোগাযোগটা খুব সহজেই করতে পেরেছিল সে। টাটাগ্রিয়া পরিবারের পরিচালনাধীন কয়েকটা নাইট ক্লাব আছে, সেগুলোয় নিয়মিত যায় সে। ওদের ভাড়াটে মেয়েগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সেরা যে তার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। মেয়েটার পাশে শুয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, আর মনের দুঃখ প্রকাশ করে। কর্লিয়নি পরিবারের উপর মোটেও সন্তুষ্ট নয় সে। তাকে ওরা যথোচিত মূল্য দেয় না, ওর কদর বোঝে না।

এভাবে এক হপ্তা কাটল। তারপর একদিন ডাক পড়ল তার নাইট ক্লাবের ম্যানেজার ব্রুনো টাটাগ্লিয়ার অফিসে।

পরিবারের সবচেয়ে ছোট ছেলে ব্রুনো। বাইরে থেকে দেখে সবাই মনে করত টাটাগ্লিয়া পরিবারের কলগার্ল বিজনেসের সাথে ব্রুনোর কোন সম্পর্ক নেই। আসলে ব্যাপারটা ঠিক তার উল্টো। নারী-ব্যবসার গোটা ব্যাপারটাই পরিচালনা করে ব্রুনো।

প্রথম সাক্ষাৎ করেই ব্রুনো তাদের পরিবারের পক্ষে শক্তি প্রয়োগের দায়িত্ব নেবার প্রস্তাব দিল লুকা ব্রাসিকে। রাজি হবে কি হবে না, এই রকম দোটানা ভাব, দেখা গেল লুকার মধ্যে, এই করে মাসখানেক কাটল। লুকার আচরণ দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে মনের খেদ প্রকাশ করার পিছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই তার, সে আসলে তার এই বেশি বয়সে সুন্দরী মেয়েটার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।

ব্রুনোর হাবভাব সম্পূর্ণ অন্য রকম। ব্যবসায়ী লোক সে, তার আচরণে সেটা পরিষ্কার ফুটেও উঠল। প্রতিদ্বন্দ্বীর একজন জবরদস্ত লোককে দল থেকে ভাগিয়ে নিয়ে আসাটাই যেন তার একমাত্র উদ্দেশ্য।

ওদের আবার দেখা হলো। এবার লুকার হাবভাব একটু অন্যরকম। সুন্দরী মেয়েটার সান্নিধ্য ছাড়া সে বাঁচবে না, তাই নোর প্রস্তাবে সে মোটামুটি রাজি। কিন্তু সম্মতি জ্ঞাপনের পরপরই স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিল, কিন্তু একটা শর্ত আছে। কাউকে যদি শ্রদ্ধা করি তো তিনি ডন কর্লিয়নি। গড ফাদারের বিরুদ্ধে কখনও আমি যাব না। দল শ্রাগ করার কথা ভাবছি এইজন্যে যে পারিবারিক ব্যবসায় তার ছেলেদের চেয়ে আমাকে বেশি সুযোগ দেয়া সম্ভব হবে না কখনোই। অর্থাৎ আমার ভবিষ্যৎ ওখানে খুবই সীমিত।

সেকাল তো আর নেই, ব্রুনো বলল, আজকাল সবার সাথে সবার মিল মহব্বত। আমার বাবা আপনাকে কখনোই কর্লিয়নিদের ক্ষতি করতে বলবেন না। আপনি কঠিন লোক, ব্যবসা চালু রাখার জন্যে আপনার মত লোক সবসময়ই দরকার হয়। আগে মনস্থির করুন, তারপর আসুন আমার কাছে। আমাদের সাথে আপনার বনিবনা চালই হবে।

শ্রাগ করে বলল লুকা, যাই হোক, ওদের সাথে থাকছি না আমি আর। সেদিনের আলোচনা এর বেশি এগোয়নি।

পরবর্তী ঘটনা ঘটল ডন কর্লিয়নি গুলি খাওয়ার আগের রাতে। নাইটক্লাবে লুকা ব্রাসি ঢুকতে না ঢুকতে ওর টেবিলে চলে এল ব্রুনো টাটাগ্লিয়া।

মুখ তুলে তাকাল লুকা।

একগাল হেসে ব্রুনো বলল, আমার এক বন্ধু, বুঝলেন, বিশেষ একটা ব্যাপারে আপনার সাথে আলাপ করার জন্যে খুব আগ্রহ দেখাচ্ছে।

বেশ তো, নির্বিকার মুখে বলল লুকা, এখানে নিয়ে আসুন তাকে।

মুখের হাসিটা অম্লান রেখে রুনো বলল, আপনিও যেমন! বিশেষ কথা কি এত লোকজনের সামনে হয়, না হওয়া উচিত?

কোন রকম ভাব ফুটল না লুকার চেহারায়। জানতে চাইল, তার পরিচয়?

আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আপনার জন্যে একটা প্রস্তাব নিয়ে আসবে। আরেকটু রাত হোক, তারপর দেখা করার ব্যবস্থা করি, কি বলেন?

ঠিক আছে, বলল লুকা, ঠিক কখন? কোথায়?

লোকজনের ভিড় না থাকলে এই জায়গাটাও মন্দ নয়, একটু চিন্তা করে বলল রুনো। ভোর চারটেয় বন্ধ হয়ে যাবে ক্লাব। সাফ সুতরো করার জন্যে শুধু ওয়েইটাররা থাকবে। তখনই, কি বলেন?

ভোর চারটের সময় আলোচনার জন্যে বসার ব্যাপারটা অদ্ভুত বলে মনে হলেও ব্যাপারটা আসলে অদ্ভুত নয়। প্রায় রোজই বিকেল তিনটের সময় ঘুম থেকে ওঠে লুকা, তারপর ব্রেকফাস্ট খায়। বিকেলের বাকি অংশ এবং প্রায় পুরোটা রাত কারও সাথে জুয়া খেলে বা কোন মেয়ের সাথে সময়টা কাটায় সে। মাঝে মধ্যে সিনেমাও দেখে। ক্লাবে গিয়ে মদ খেয়েও কিছু সময় কাটায়। মনে মনে লুকা ভাবল, ওর ওপর বেশ কিছু দিন থেকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা হয়েছে, তার দৈনন্দিন জীবনের রুটিন ওদের মুখস্থ হয়ে গেছে।

ঠিক হ্যায়, বলল লুকা। বেশ উত্সাহিত হয়ে উঠেছে সে, চেহারা দেখে স্টো বোঝা গেল। চারটের দিকে এখানে তাহলে আবার ফিরে আসব আমি।

এর একটু পরই ক্লাব ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল লুকা। ট্যাক্সি নিয়ে টেনথ এভেনিউয়ে নিজের বাড়িতে এল। একটা ইতালীয় পরিবারে পেয়িং গেস্ট হিসাবে থাকে সে। পরিবারটা দূর-সম্পৰ্কীয় আত্মীয় হয় তার। বাড়িটার একটা আলাদা অংশে ওর ঘর দুটো, আসা-যাওয়ার জন্যে আলাদা দরজা।

খাটের তলা থেকে একটা ট্রাঙ্ক বের করল লুকা! তালা খুলল। ভিতর থেকে বের করল খুব ভারি একটা বুলেট প্রুফ গেঞ্জি।

পোশাক ছাড়ল লুকা। গরম কাপড়ের অন্তর্বাসের উপর গেঞ্জিটা পরল। তার উপর চড়াল শার্ট আর কোট।

লাইসেন্সসহ পিস্তল আছে লুকার। এই লাইসেন্সটা যোগাড় করতে চূড়ান্ত ঝামেলা তো পোহাতে হয়েছেই, দামও দিতে হয়েছে অসম্ভব বেশি-দশ হাজার ডলার। এত দাম দিয়ে লাইসেন্স যোগাড় করার ঘটনা আর কারও বেলায় বোধহয় ঘটেনি। যাই হোক, কর্লিয়নিদের একটা শুভ হিসেবে এই রকম দামী একটা লাইসেন্স পাবার যোগ্যতা তার আছে। কিন্তু লাইসেন্সওয়ালা পিস্তলটা আজ সে নিল না। বলা তো যায় না, সূচনাতেই হয়তো গোটা ব্যাপারটাকে খতম করে দিতে হতে পারে। তাই একটা নিরাপদ পিস্তল সাথে নিল। এটা নিয়ে সে যদি ধরাও পড়ে, কিছু এসে যাবে না। পিস্তলটা তারই এটা প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

আবার ক্লাবে একবার ঢুঁ মারুল লুকা, কিন্তু বেশিক্ষণ বসলও না, মদও ছুঁল না। ওখান থেকে বেরিয়ে ফোর্টিএইটথ স্ট্রীটে খামোকা ঘুরঘুর করল কিছুক্ষণ। তারপর ঢুকল ওর সবচেয়ে প্রিয় রেস্তোরাঁ প্যাটসিতে। আয়েশ করে,, অলস ভঙ্গিতে সাপার খেল ওখানে।

ঠিক সময়ে আবার শহরের মাঝখানে ফিরে এল লুকা। ক্লাবে ঢোকার সময় দেখল, দারোয়ানেরও ছুটি হয়ে গেছে, টুপি জমা রাখে যে মেয়েটা সেও নেই।

ব্রুনোকে ছাড়া আর কাউকে দেখল না লুকা। সেই তাকে সাদরে নির্জন বারে নিয়ে গিয়ে বসাল। খালি টেবিলগুলো চারপায়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে প্রকাণ্ড একটা হীরক খণ্ডের মত পালিশ করা হলুদ কাঠের ড্যান্সফ্লোরটা জ্বলজ্বল করছে। পিছনে, ছায়ায় ঢাকা পড়ে আছে ব্যাণ্ডস্ট্যাণ্ড, ধাতব মাইক্রোফোনটাকে কঙ্কালের মত লাগছে দেখতে।

কাউন্টারের ওপারে বসেছে ব্রুনো টাটাগিয়া। এপারে লুকা। মদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে একটা সিগারেট ধরাল সে। ভাবছে সলোযোর সাথে হয়তো এর কোন সম্পর্ক নেই। নো হয়তো সম্পূর্ণ অন্য কোন বিষয়ে অন্য লোকের মাধ্যমে কথা বলতে চায়। আচ্ছা, দেখাই যাক না।

চিন্তায় বাধা পড়ল লুকার। সলোযোকে দেখতে পেয়েছে সে। কামরার গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা একটা কোণ থেকে বেরিয়ে এদিকে এগিয়ে আসছে সে।

কথা বলল না, শুধু হাতটা বাড়িয়ে দিল সলোযো হ্যাণ্ডশেকের জন্যে। নির্বিকারভাবে হ্যাণ্ডশেক করল লুকা। তার পাশেই বসল সলোযো। ব্রুনো, কাউন্টারে এক গ্লাস মদ রাখতেই মাথা ঝাঁকিয়ে ধন্যবাদ জানাল তুর্কী।

আমার পরিচয় জানা আছে তোমার? লুকার দিকে ফিরে প্রশ্ন করল সলোযো।

ইতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা কাত করল লুকা। বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠেছে তার মুখে। অন্তরের পুলকটা ঢাকার মতলবেই এই হাসি ফুটিয়ে তুলেছে সে।

তাহলে আমার প্রস্তাবটাকি তাও তোমার জানা আছে?

এবারও একই ভঙ্গিতে মাথা কাত করল লুকা।

একটু নড়েচড়ে বসল সলোযো। তীক্ষ্ণ; অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সারাক্ষণকার দিকে। বলল, খুবই ভাল ব্যবসা, লাভের সম্ভাবনা প্রচুর। কর্মকর্তা পর্যায়ে যারা এতে অংশগ্রহণ করবে তাদের প্রত্যেকের ভাগে আসবে লক্ষ লক্ষ ডলার। কথা দিতে পারি প্রথম চালানের মাল তোলার সাথে সাথে নগদ পঞ্চাশ হাজার ডলার পেয়ে যাবে তুমি। মাল মানে মাদকদ্রব্যের কথা বলছি, বুঝছ তো? উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, সবটাই লাভ।

কিন্তু আপনার উদ্দেশ্য আমার কাছে পরিষ্কার নয়, বলল লুকা। ডনকে এ সম্পর্কে বলব, এই চান আপনি?

রাগে বিকৃত হয়ে উঠল সলোযোর মুখ। তার সাথে আর কথা বলার কোন মানে হয় না। একবার যখন রাজি হয়নি, কখনোই সে মাথা নোয়বে না। তাকে বাদ দাও। আমার দরকার তোমার মত একজন জবরদওলোকের, আমাদের ব্যবসাটাকে টিকিয়ে রাখার জন্যে প্রয়োজনে যে গায়ের জোর খাটাবে। শুনেছি, কর্লিয়নিরা নাকি তোমাকে যথাযোগ্য মূল্য দিচ্ছে না। সেজন্যেই ভাবছি, তুমি হয়তো চাকরিটা বদল করতেও পারো।

বদল করে যদি অবস্থার উন্নতি হবে বলে মনে করি, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল লুকা।

সলোযোর সেই তী, অন্তর্ভেদী দৃষ্টিটা বদলে গেল। কি যেন আবিষ্কার করার চেষ্টা করছিল সে। আবিষ্কার করা হয়ে গেছে।

কটা দিন দেখো। তারপর জানাও। কথা শেষ করে হ্যাণ্ডশেকের জন্যে হাত বাড়িয়ে দিল সলোযো।

কিন্তু সলোযোর হাতটা ধরার জন্যে নিজের হাতটা বাড়াল না লুকা। তার ভাব দেখে মনে হলো, ব্যাপারটা তার চোখেই পড়েনি। প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে সেটা ঠোঁটে তুলতে ব্যস্ত সে এখন।

কাউন্টারের ওপাশ থেকে ব্রুনোর লাইটার ধরা হাতটা এগিয়ে এল হঠাৎ করেই, অপ্রত্যাশিতভাবে। খুট করে লাইটার জালাল ব্রুনো। সেটার আগুনে সিগারেট ধরাবার জন্যে মুখ বাড়াল লুকা, ঠিক এই সময় হাত থেকে ছেড়ে দিল ব্রুনো লাইটারটা। খট করে পড়ল সেটা কাউন্টারের উপর। তার আগেই ব্রুনো প্রচণ্ড শক্তিতে লুকার ডান হাতটা কাউন্টারের সাথে চেপে ধরেছে।

এক নিমেষে টুল থেকে পিছলে নেমে পড়েই পাক দিয়ে সরে যাবার চেষ্টা করল লুকা। এরই মধ্যে তার অপর হাতটা ধরে ফেলেছে সলোযো। কিন্তু তাতেও কিছু এসে যায় না, ওদের দুজনের চেয়ে তার একার গায়ে অনেক বেশি জোর।

ব্রুনো লাইটার ফেলে দেয়ার পর থেকে দুই সেকেণ্ডের মধ্যে ঘটে গেল ঘটনাটা। মাত্র এক সেকেণ্ড ধরে থাকতে হলো ওদেরকে লুকার হাত দুটো। এর মধ্যেই লুকার পিছনে একজন লোককে দেখা গেল। বিদ্যৎ গতিতে নড়ে উঠল লোকটার হাত দুটো! রেশমী:দড়ির একটা ফাস লুকার গলায় পরিয়ে দিয়েই হেঁচকা টান মারল সে। দম বন্ধ হয়ে গেল লুকার। প্রচণ্ড শক্তিতে গা ঝাড়া দিতে চাইল সে, কিন্তু নিমেষে বেগুনী হয়ে গেছে মুখের রঙ, গায়ের জোর সব উবে গেছে।

গোটা ব্যাপারটা হাস্যকর, অবিশ্বাস্য-যার গায়ের শক্তি কিংবদন্তীকেও হার। মানায়, মাত্র তিন সেকেণ্ডে ফুরিয়ে গেল তার সবটুকু-তেজ। লুকার সামনে আর পাশে আরও হাস্যকরভাবে দাঁড়িয়ে আছে ব্রুনো আর সলোযো। করার কিছুই নেই দেখতে পেয়ে কেমন যেন অপ্রতিভ, বোকা হয়ে হয়ে গেছে দুজনেই।

লুকার পিছনে দাঁড়িয়ে লোকটা গায়ের জোরে আরও এটে দিচ্ছে ফাঁসটাকে। ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে লুকার পা দুটো। চেহারা বীভৎস দেখাচ্ছে। ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেছে, দুপাটি দাঁতই মাড়িসহ দেখা যাচ্ছে, কোর্টর ছেড়ে এতটা বেরিয়ে এসেছে চোখের মণি দুটো যে টুপ-টুপ করে খসে পড়ে যেতে পারে বলে মনে হচ্ছে। গলার রগগুলো ফুলে উঠেছে, ত্বকের নিচে যেন লম্বা লম্বা কৃমি শুয়ে আছে।

শরীরটা মেঝেতে পড়ে গেল লুকার। মেঝেতে হাঁটু গেড়ে লোকটাও সাথে সাথে বসে পড়ল। অত্যন্ত মগ্ন ভঙ্গিতে যত্নের সাথে ফাসটাকে আরও এঁটে দিচ্ছে। সে লুকার গলায়, যেন এখনও এ-কাজের গুরুত্ব আছে। সশংস দৃষ্টিতে তার কাজ দেখছে সলোযো আর ব্রুনো। লুকার গলার মাংসে সেঁধিয়ে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল রেশমী দড়িটা। লুকা অবশ্য আগেই মারা গেছে।

এই লাশ কোনভাবেই কারও খুঁজে পাওয়া চলবে না, গুরু গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল সনোযযা। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এটা। ও মারা গেছে জানাজানি হয়ে গেলে সব মাটি হয়ে যাবে, আমাদের কোন আশাই থাকবে না আর।

কাকের চেয়েও ধূর্ত ও সতর্ক এই তুর্কী লোকটা। লুকার অভিনয় মন্দ হয়নি, কিন্তু আসল সত্য ঠিকই বুঝে নিতে পেরেছে সলোযো।

ডন কর্লিয়নিই তার একটা স্তম্ভকে বিশেষ নির্দেশ দিয়ে শত্রু পক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। তার হুকুম পেয়েই মূকা বাসি, এ-পথে পা বাড়িয়েছিল।

স্তম্ভটা ধূলিসাৎ করে নিষ্ঠুর এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল তুর্কীর ঠোঁটে।

এইবার! এইবার জমবে খেলা!

২.১ মন ভাল নেই মাইকেল কর্লিয়নির

দ্বিতীয় পর্ব

০১.

মন ভাল নেই মাইকেল কর্লিয়নির। বুঝতে পারছে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে পারিবারিক ব্যবসায় জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে ওকে। এই যে ওকে দিয়ে টেলিফোন ধরাচ্ছে সনি, এও একটা ষড়যন্ত্র বলে মনে হচ্ছে ওর। পারিবারিক শলা-পরামর্শের মাঝখানে যেভাবে টেনে নেয়া হয়েছে ওকে, সাংঘাতিক অস্বস্তিবোধ করছে ও, যেন খুন-খারাবির মত অন্যায় আর গোপন কাজ দিয়েও সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায় ওকে।

এখন, কে-র সাথে দেখা করতে শহরে যাবার সময়, তাকে সব কথা খোলসা করে বলা হয়নি ভেবে নিজেকে অপরাধী লাগছে মাইকেলের। পরিবারের কথা কিছু কিছু তাকে বলেছে বটে, কিন্তু সেসব ঠাট্টার সুরে, রঙ চড়িয়ে এমনভাবে বলেছে যে বাস্তবের চেয়ে ছায়াছবির অতি-নাটুকে কাহিনীর মত গুনতে লাগে। অথচ এখন? এখন ওর বাবা বুলেট খেয়ে রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন, আর ওর বড় ভাই প্রতিশোধ নেবার জন্যে কাকে কাকে খুন করবে তার লম্বা তালিকা তৈরি করছে। সহজ সরল সার সত্য তো এই, অথচ এভাবে কথাণুলো বলা যাবে না কে-কে, অনেক কারণেই তা সম্ভব নয়। তাই আগেই তাকে আশ্বাস দিয়ে বলে রেখেছে যে ওর বাবার গুলি খাওয়াটা বেফ আকস্মিক একটা দুর্ঘটনা, সর্ব গোলমাল এর মধ্যে মিটেও গেছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এই তো সবে শুরু।

সনি আর টম চিনতে পারছে না সলোয়যাকে, তাকে ওরা এখনও ছোট করে দেখছে। বিপদ দেখতে পাবার মত বুদ্ধি সনির নেই তা নয়, কিন্তু সলোযো এরপর কি চাল দেবে তা সে দূরদৃষ্টি দিয়ে আঁচ করতে পারছে না।

আচ্ছা, তুর্কি ব্যাটার মতলবটা কি? ভাবতে চেষ্টা করছে মাইকেল। সাহস, বুদ্ধি, শক্তি–এসব যথেষ্ট পরিমাণে আছে সলোযোর, সন্দেহ নেই। তার তরফ থেকে আচমকা হামলা আসার সম্ভাবনা পুরোমাত্রায় রয়েছে। কিন্তু সনি, টম, আর টেসিওর ধারণা অন্য রকম, ওরা মনে করে অবস্থাটাকে সামাল দেয়া গেছে। মনে মনে একটা কথা স্বীকার করল মাইক, তার চেয়ে ওদের অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেক বেশি ভারি। আপন মনে হাসছে সে, ভাবছে, এই যুদ্ধে সাধারণ নাগরিক বলতে একমাত্র তাকেই বোঝায়। এ-যুদ্ধে যোগ দিতে তাকে রাজি করতে হলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে, যে-সব পদক সে পেয়েছে তার চেয়েও অনেক বেশি ভাল কিছু দেবার লোভ দেখাতে হবে তাকে।

চিন্তাটা মনে আসতেই, বাবার জন্যে আরও কেন দুঃখ বোধ করছে না ভেবে আবার নিজেকে অপরাধী বলে মনে হতে লাগল মাইকেলের। গোলাগুলিতে ওর বাবার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেছে, অথচ কি এক আশ্চর্য উপায়ে সবার আগে সেই বুঝতে পেরে গেছে টমের সেই কথার মানে যে গোটা ব্যাপারটার মধ্যে ব্যক্তিগত কিছু নেই, এ হলো ব্যবসার কথা। এতদিন যে ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন বাবা, সবার কাছ থেকে যে সম্মান আদায় করেছেন, এখন তার মাসুল দিতে হচ্ছে।

অকারণ বিষাদে ভরে আছে মনটা, কিছুই ভাল লাগছে না ওর। সমস্ত কিছু ছেড়ে দূরে কোথাও পালাতে ইচ্ছা করছে তার, অন্য কোথাও নিজের পছন্দ মত জীবন কাটাতে চাইছে। কিন্তু পরিবারের এই সংকট কেটে না যাওয়া পর্যন্ত কোথাও চলে যাওয়া সম্ভব নয়। যুদ্ধে একজন সাধারণ নাগরিকেরও কিছু দায়িত্ব থাকে, যতটা সম্ভব সাহায্য করে সে-দায়িত্ব পালন করতে হবে তাকে। হঠাৎ চোখ খুলে গেল মাইকেলের, বুঝতে পারল, সাধারণ নাগরিক মানে বিশেষ সুবিধাভোগী অসামরিক ব্যক্তির ভূমিকা, একজন যোদ্ধার জন্যে অত্যন্ত অসম্মানজনক ভূমিকা-অথচ এই ভূমিকাটাই চাপানো হয়েছে তার ঘাড়ে, সেজন্যেই সাধারণ নাগরিক কথাটা মনে এলেই এত খারাপ লাগছে তার।–

ক্লেমেঞ্জার দুজন লোক গাড়ি করে শহরে পৌঁছে দিচ্ছে মাইকেলকে। খুব ভাল করে তারা আগে দেখে নিল কেউ পিছু নিয়েছে কিনা, তারপর হোটেলের কাছাকাছি একটা মোড়ে নামিয়ে দিল মাইকেলকে। হোটেলে পৌঁছে মাইকেল দেখল, লবিতে তার জন্যে অপেক্ষা করছে কে।

হুইস্কি দিয়ে গলা ভিজিয়ে নিয়ে ডিনারে বসল ওরা। তোমার বাবাকে দেখতে যাচ্ছ কখন? জানতে চাইল কে।

রিস্টওয়াচ দেখল মাইকেল, বলল, সাড়ে আটটার পর হাসপাতালে থাকার নিয়ম নেই কারও, ভাবছি কেউ যখন থাকবে না তখন আমি যাব। দেরি করে গেলেও ওরা আমাকে ঢুকতে দেবে। বাবার কাছে একটু বসতে চাই আমি। এখনও হুঁশ ফিরেছে বলে মনে হয় না, আমি যে গেছি তা টেরই পাবেন না, কিন্তু বাবাকে অনেক ভালবাসি তো, তাঁকে শ্রদ্ধা জানাবার জন্যে একাই যেতে হবে আমাকে।

তোমার বাবার জন্যে মনটা ভাল নেই আমার, শান্ত ভাবে বলল কে, তোমার বোনের বিয়ের সময় দেখেছিলাম, আশ্চর্য ভাল মানুষ বলে মনে হয়েছিল। খবুরের কাগজে ওঁর সম্পর্কে অনেক যা তা কথা লিখেছে, সে-সব আমি একটুও বিশ্বাস করি না।

আমিও সৌজন্য রক্ষা করে মৃদু গলায় বলল মাইকেল। কে-র সাথে কথা বলার সময় অনায়াসে অনেক কিছু চেপে রাখতে পারছে দেখে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে সে। ওকে ভালবাসে নে, বিশ্বাস করে, কিন্তু তবু ওকে বাবার আসল পরিচয় বা পারিবারিক ব্যবসার গোপ তথ্য কোনদিনও বলবে না। যত যাই হোক, কে তো আর পরিবারের ভিতরের কেউ নয়, সে হলো বাইরের মানুষ।

কি করবে বলে ঠিক করেছ তুমি? জানতে চাইল কে। খবরের কাগজে কিসব লিখেছে, এবার নাকি প্রচণ্ড দল-যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে–এসবের সাথে তুমিও জুড়িয়ে পড়বে নাকি, মাইক?

নিঃশব্দে হাসল মাইকেল, কোর্টের বোতাম খুলে সামনেটা ফাঁক করে দেখল, বলল, এই দেখো, আমার কাছে কোন অস্ত্র-টস্ত্র নেই।

ফিক করে হেসে ফেলল কে।

বেশি রাত হয়ে যাচ্ছে, তাই নিজেদের কামরায় চলে এল ওরা। দুজনের জন্যে গ্লাসে হুইস্কি ঢেলে নিয়ে ফিরে এল কে, চড়ে বসল মাইকেলের কোলে। ওর পোশাকের নিচে রেশমী অন্তর্বাস, মাইকেলের আঙুলগুলো ওর উন্মুক্ত উরুর উপর দিয়ে এগোচ্ছে, ঢুকে যাচ্ছে অন্তর্বাসের ভিতর। গ্লাস দুটো নিঃশেষ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল ওরা, কাপড়চোপড় না ছেড়েই পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চুমো খাচ্ছে। তারপর অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ শুয়ে আছে, ওরা, শরীরে উষ্ণতা অনুভব করছে। চাপা কণ্ঠে একসময় জানতে চাইল কে, সৈনিকরা একেই কি কুইকি বলে?

হ্যাঁ।

মন্দ লাগে না কিন্তু!

আবেশে ঝিমিয়ে পড়েছে দুজনেই, হঠাৎ ড়মড় করে উঠে বসল মাইকেল। রিস্টওয়াচে চোখ রেখে আঁতকে উঠল ও, বলল, ইস্, দশটা বেজে এল। আর তো দেরি করা যায় না, এবার হাসপাতালে যেতে হয়।বাথরম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এল সে।

বিছানা থেকে উঠে এসে মাইকেলের পাশে দাঁড়াল কে, তার কোমর জড়িয়ে ধরে বলল, আমাদের বিয়ের আর কত দেরি?

এই ব্যাপারটা মিটে গেলে তুমি যেদিন বলবে সেদিনই। কিন্তু তার আগে সব কথা তোমার মা-বাবাকে ভাল করে বুঝিয়ে বলা দরকার।

কি বুঝিয়ে বলব?

চুলে চিরুনি চালাচ্ছে মাইকেল, বলল, তাঁদেরকে শুধু এইটুকু জানাও যে ইতালীয় পরিবারের এক সুদর্শন, সাহসী ছেলের সাথে পরিচয় হয়েছে তোমার? ছেলেটি ডার্টমাথের ছাত্র, যুদ্ধে ডিসটিংগুইশড সার্ভিস ক্রশ, পার্পল হার্ট পেয়েছে। সৎ। পরিশ্রমী। কিন্তু ছেলের বাপ একজন মাফিয়া নেতা। দরকার হলে দৃষ্ট লোকদের মেরে ফেলতে বাধ্য হন তিনি, ঘুষ দেন সরকারী কর্মচারীদেরকে। আর এসব কাজ করতে গিয়ে নিজেও গুলি খেয়ে ঝাঁঝরা হন। তবে এসবের সাথে তার ছেলের কোন সম্পর্ক নেই। এতসব কথা মনে থাকবে তো?

মাইকেলকে ছেড়ে দিয়ে বাথরুমের দরজায় হেলান দিল কে। সত্যি? তাই? ওসব করতে হয় তাকে? একটু চুপ করে থেকে আবার জানতে চাই, খুন করেন?

সেটা ঠিক বলা যাচ্ছে না। কেউ বলতে পারে না। কিন্তু যদি শুনি লোক মেরেছেন, একটুও অবাক হব না আমি।

দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবে মাইকেল, এই সময় জানতে চাইল কে, আবার কখন দেখা হবে?

ওকে চুমো খেল মাইকেল, তারপর বলল, আমি চাই তুমি তোমাদের গ্রামে ফিরে গিয়ে গোটা ব্যাপারটা ভাল করে ভেবে দেখো। ঝোঁকের বশে জড়িয়ে পড়, তা আমি চাই না। বড়দিনের ছুটি শেষ হলে কলেজে ফিরব, তখন আবার আমাদের দেখা হবে, ঠিক আছে?

বেশ, একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল কে। ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে দেখল দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে মাইকেল, এলিভেটরে ওঠার আগে ওর দিকে ফিরে হাত নাড়ল একবার। আজকের মত এত আপনজন বলে মনে হয়নি ওর মাইকেলকে, আজ হঠাৎ যেন আবিষ্কার করতে পেরেছে কত, গভীরভাবে ভালবাসে তাকে ও। এখন যদি কেউ ওকে বলে আগামী তিন বছর মাইকের সাথে আর দেখা হবে না, ওর, সে ব্যথা সহ্য করতে পারবে না।

ট্যাক্সি থেকে ফ্রেঞ্চ হাসপাতালের সামনে নামল মাইকেল। নেমেই হকচকিয়ে গেল সে। কোথাও কেউ নেই, রাস্তা একেবারে খা খা করছে-ব্যাপার কি? আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছে তার জন্যে, হাসপাতালের ভিতর ঢুকে দেখল লবিতেও কেউ নেই। এর মানেটা কি? ভাবছে মাইকেল। ক্লেমেঞ্জা আর টেসিওর এ কেমন দায়িত্ববোধ? ওয়েস্ট পয়েন্টের সামরিক ট্রেনিং না হয় পায়নি ওরা, তবু পাহারাদার রাখা যে দরকার এটুকু সামরিক শিক্ষা তো ওদের থাকা উচিত।

সতর্ক হয়ে উঠেছে মাইকেল, বুঝতে পারছে, সাংঘাতিক কোন গোলমাল হয়েছে কোথাও। প্রায় সাড়ে দশটা বাজে, শেষ আগন্তুকও অনেক্ষণ আগে চলে গেছে। অনুসন্ধান ডেস্কে দাঁড়াল না ও, চার তলায় বাবার কামরার নম্বর জানা আছে ওঁর। এলিভেটরে চড়ে সোজা উপরে উঠে এল। চারতলায় নার্সদের বসবার জায়গায় না পৌঁছানো পর্যন্ত কেউ ওকে বাধা দিল না দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। একজন মাত্র নার্স, তার প্রশ্ন গায়ে না মেখে সোজা বাবার কামরার দিকে এগোল। কেউ নেই দরজার সামনে। দুজন গোয়েন্দার থাকার কথা ওখানে, কেউ যদি ভিতরে ঢুকতে চায় তাকে প্রশ্ন করার এবং বাবাকে পাহারা দেয়ার কথা ওদের–এরাই বা কোন চুলোয় গেছে? তাছাড়া, ভাবছে মাইকেল, টেসিও? ক্লেমেঞ্জা? ওরা কি কামরার ভিতর রয়েছে?

দরজাটা খোলা। ভিতরে ঢুকল মাইকেল। কেউ নেই কামরায়। শুধু বিছানায় শুয়ে আছে একজন। ডিসেম্বরের ঠাণ্ডা চাঁদের আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে বিছানার উপর এসে পড়েছে, বাবার মান মুখটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে মাইকেল। চেহারায় ভাবের লেশ মাত্র নেই, নিঃশ্বাসগুলো ছোট-বড়, বুকের উত্থান-পতন টের পাওয়া যায় কি যায় না। একটা নল এসে ঢুকেছে নাকের ফুটোয়, নিচের মেঝেতে কাঁচের একটা পাত্র, তাতে পেটের যত অশুদ্ধ তরল পদার্থ নল বেয়ে এসে জমা হচ্ছে। মাত্র কয়েক সেকেণ্ড দাঁড়াল মাইকেল, দেখল ভালভাবেই আছেন বাবা। তারপর ধীরে ধীরে পিছু হটে বেরিয়ে এল কামরা থেকে।

আমার নাম মাইকেল কর্লিয়নি, নার্সকে বলল সে, বাবার পাশে শুধু একটু বসে থাকতে চাই আমি। আচ্ছা, বলতে পারো, এখানে যাদের পাহারা দেবার কথা ছিল তারা কোথায় গেছে?

বয়স কম নার্সের, দেখতে ভাল, নিজের পদ-মর্যাদা সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। জানাল, আপনার বাবাকে দেখার জন্যে বড় বেশি লোকজন আসছিল কিনা, তাতে, কাজের খুব অসুবিধে হচ্ছিল, তাই পুলিশ এসে সবাইকে ভাগিয়ে দিয়েছে। তারপর, এই তো পাঁচ মিনিট আগে হেডকোয়ার্টার থেকে জরুরী ফোন পেয়ে পুলিশরাও সবাই চলে গেল। অবশ্য চিন্তার কিছু নেই, একটু পরপরই উঁকি দিয়ে দেখে আসছি আমি আপনার বাবাকে। এখনও কোন সাড়া পাচ্ছি না তার। দরজা তো সেই জন্যেই খুলে রেখেছি।

ধন্যবাদ, বলল মাইকেল। বাবার কাছে আমি একটু বসি, কেমন?

একটু হাসল মেয়েটা, বলল, কিন্তু একটু পরই চলে যেতে হবে আপনাকে, তাই না? নিয়মের কথা আপনার তো জানাই আছে।

বাবার কামরায় ফিরে এল মাইকেল। দ্রুত ফোনের রিসিভার। তুলে হাসপাতালের অপারেটরকে লং বীচের নম্বর দিতে বলল। উত্তর দিল সনি। ফিসফিস করে তাকে বলল মাইকেল, হাসপাতাল থেকে বলছি, ভাই। দেরি করে এখানে এসে দেখি কোথাও কেউ নেই। টেসিও, ক্লেমেঞ্জা-ওদের কারও একজন মোকও দেখিনি। দরজায় যাদের থাকার কথা ছিল, সেই গোয়েন্দারাও বাতাসে মিলিয়ে গেছে। বাবা এখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছেন।

ভয়ে আর বিস্ময়ে অনেকক্ষণ কোন কথা বলতে পারল না সনি, তারপর চাপা উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর শুনতে পেল মাইকেল, তোর মনে আছে, বলেছিলি সনোযো একটা চাল চালবে? এটা হলো তার সেই চাল, বুঝলি?

আমারও তাই মনে হচ্ছে, বলল মাইকেল। কিন্তু পুলিশের সব লোকদের সরাতে পারল কিভাবে? তারা গেছেই বা কোথায়? আর টেসিওর লোকজন? কি সর্বনাশ, তুমি কি বলতে চাও..মাই গড! তবে কি বিশ্বাস করতে হবে ব্যাটা শয়তান সলোযো নিউ ইয়র্কের পুলিশ বিভাগকেও হাত করে ফেলেছে?

অভয় দিয়ে ছোট ভাইকে বলল সনি, শান্ত হ মাইক। কপাল ভাল বলতে হবে যে তুই এত দেরি করে হাসপাতালে পৌচেছিস। বাবার কামরা ছেড়ে কোথাও এক পা নড়বি না। ভেতর থেকে বন্ধ করে দে দরজাটা। কয়েকটা ফোন করতে যেটুকু সময় লাগবে, তারপরই পনেরো জন নোক পৌঁছে যাচ্ছে তোর কাছে। শান্ত হয়ে বসে থাক, একটুও ঘাবড়াবি না। ঠিক আছে?

না, ঘাবড়াচ্ছি না, বলল মাইকেল। ব্যাপারটা শুরু হবার পর এই প্রথম প্রচণ্ড রাগে সারা শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠল ওর, বাবার শত্রুদের উপর ঠাণ্ডা একটা ঘৃণা আর বিদ্বেয়ে ছেয়ে গেল মন। রিসিভার নামিয়ে রেখে কলিংবেলের বোতামে চাপ দিল ও। কামরায় নার্স ঢুকতেই তাকে বলল, তুমি ভয় পাও তা চাই না, তবে এক্ষুণি এখান থেকে সরাবার ব্যবস্থা করতে হবে বাবাকে। অন্য কোন কামরায় অথবা অন্য কোন ফ্লোরে। নলগুলো খুলতে পারবে? পায়ার সাথে চাকা রয়েছে, খার্টটাকে আমি ঠেলে বের করে নিয়ে যেতে চাই।

আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে? চোখ কপালে তুলে বলল নার্স। ডাক্তারের অনুমতি ছাড়া এসব কিছুই সম্ভব নয়।

কাগজে বাবার কথা পড়েছ তুমি, তাই না? দ্রুত এবং জরুরী ভঙ্গিতে কথা বলতে শুরু করেছে মাইকেল। আমি এক্ষুণি খবর পেলাম, ওঁকে খুন করার জুন্যে রওনা হয়ে গেছে কয়েকজন লোক। যে-কোন মুহূর্তে এই হাসপাতালে এসে পৌঁছুবে তারা। পাহারা দেবার জন্যে এই যে কাউকে দেখছ না, এটাও ওই পক্ষের একটা চাল। দয়া করে বিশ্বাস করো আমার কথা। সাহায্য করো আমাকে। প্রয়োজনের সময় ইচ্ছা করলে যে-কোন মানুষকে প্রভাবিত করার আশ্চর্য একটা গুণ আছে মাইকেলের, এক্ষেত্রেও সেটা কাজে লেগে গেল।

নল খোলার দরকার নেই, বলল নার্স, স্ট্যাণ্ডগুলোরও চাকা আছে, গড়িয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে।

আশপাশে কোথাও খালি কামরা আছে? ফিসফিস করে জানতে চাইল মাইকেল।

আছে, হলের শেষ মাথায়।

দ্রুত, দক্ষতার সাথে সারা হলো কাজটা। তারপর নার্সকে বলল মাইকেল, আমাদের লোকজন না আসা পর্যন্ত বাবার সাথে এখানেই থাকো তুমি। বাইরে তোমার নিজের জায়গায় থাকতে নিষেধ করছি, তার কারণ ওখানে থাকলে তুমিও আহত হতে পারো।

ঠিক এই সময় অপ্রত্যাশিতভাবে বিছানার দিক থেকে বাবার গলা ভেসে আসতে শুনল মাইকেল, ভাঙা ভাঙা, কিন্তু জোরাল আওয়াজ, কে, মাইকেল নাকি? কি ঘটেছে? ব্যাপারটা কি?

বিছানার উপর ঝুঁকে পড়ে বাবার একটা হাত ধরল মাইকেল। বলল, হ্যাঁ, আমি মাইক। ভয় পেয়ো না। শোনো, বারা, একটুও আওয়াজ কোরো না তুমি, বিশেষ করে কেউ যদি তোমার নাম ধরে ডাকে। কিছু লোক তোমাকে খুন করতে চাইছে, বুঝলে? কিন্তু আমি এখানেই আছি, তোমার ভায়ের কিছুই নেই।

তাঁর কি হয়েছে তা এখনও ভার্ল ঠাহর করতে পারছেন না ডন কর্লিয়নি, সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, তবু ছোট ছেলের কথা শুনে অতি কষ্টে অমায়িক হাসলেন তিনি, বললেন, আজ কেন ভয় পাব? সেই বারো বছর বয়স থেকে কত অচেনা লোক আমাকে মেরে ফেলার জমে এসেছে।

২.২ ছোট বেসরকারী হাসপাতাল

০২.

এটা একটা ছোট বেসরকারী হাসপাতাল, ভিতরে ঢোকার একটাই পথ। জানালা দিয়ে নিচে রাস্তার দিকে তাকাল মাইকেল। উঁচু উঠান থেকে সিঁড়িটা রাস্তায় গিয়ে নৈমেছে, রাস্তার এদিক ওদিক কোথাও কোন লোক বা গাড়ি দেখা যাচ্ছে না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে বুঝে নিল, সে হাসপাতালের ভিতর কেউ যদি ঢুকতে চায় তাকে ওই একটা প্রবেশ পথ দিয়েই ঢুকতে হবে। কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, এ-ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই তার। সময়ও হয়ে এসেছে। কামরা থেকে ছুটে বেরিয়ে এল সে, চারটে সিঁড়ির সবগুলো ধাপ টপকে নিচে পৌঁছুল, তারপর সদর দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার সময় লক্ষ করল, পাকা চত্বরটায় কোন গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স নেই।

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসে ফুটপাথে দাঁড়াল মাইকেল, সিগারেট ধরাবার সময় লক্ষ করুল হাত দুটো একটু একটু কাঁপছে তার। কোটের বোম খুলে ফেলল সে, এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল একটা লাইট-পোস্টের নিচে, যাতে সবাই ওর মুখ দেখতে পায়। বগলে একটা প্যাকেট নিয়ে নাইনথ এভিনিউ থেকে হন হন করে এগিয়ে আসছে এক যুবক, পরনে কষ্যাট জ্যাকেট, মাথা ভর্তি একরাশ আঁকড়া চুল। আলোর নিচে আসতেই তাকে চেনা চেনা লাগল মাইকেলের, কিন্তু এর আগে কোথায় দেখেছে তা স্মরণ করতে পারল না। ঠিক ওর সামনে এসে দাঁড়াল যুবক, হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে প্রকট ইতালীয় সুরে বলল, ডন মাইকেল, আমাকে আপনি চিনতে পারছেন না? আমি এনজো, বেকারী মালিক নাজরিনির সহকারী, তার জামাইও। সরকারকে বলে আমার আমেরিকায় থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে আপনার বাবা আমার মস্ত উপকার করেছিলেন।

করমর্দনের জন্যে এনজের হাতটা ধরল মাইকেল, এখন তাকে চিনতে পারছে ও।

আপনার বাবাকে শ্রদ্ধা জানাব বলে এসেছি, বলছে এনজো। এত রাতে ওরা কি আমাকে ঢুকতে দেবে ভিতরে?

একটু হেসে এদিক ওদিক মাথা, দোলাল মাইকেল, বলল, না, তা দেবে না–তুমি এসেছ সেজন্যে তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তুমি যে এসেছিলে তা আমি ডনকে জানাব। ঝড়ের বেগে, প্রচণ্ড গর্জন তুলে একটা গাড়ি আসছে দেখে সতর্ক হয়ে উঠল মাইকেল, এনজোকে দ্রুত বলল, তুমি বরং শিগগির পালাও। এখানে একটা গোলমাল হবে। পুলিশের ঝামেলায় জড়িয়ে কাজ নেই।

ভয়ে শুকিয়ে গেল এনজোর মুখ। পুলিশেব কুনজরে পড়লে আমেরিকা থেকে বের করে দেয়া হতে পারে-ওকে, হয়তো নাগরিকত্বও পাবে না সে। তবু একচুল নড়ল না, সটান নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ফিসফিস করে ইতালী ভাষায় বলল, যদি গোলমাল বাধে, এখানে দাঁড়িয়ে আপনাকে সাহায্য করতে চাই। গড ফাদারের ঋণ শোধ করার একটা সুযোগ যদি পাই, মন্দ কি?

কথাগুলো হৃদয় স্পর্শ করল মাইকেলের। কেটে পড়ার জন্যে আবার তাড়া লাগাতে যাচ্ছিল, হঠাৎ কি মনে করে ভাবল, না হয়থেকেই যাক না ছোকরা। কাজ হাসিল করার জন্যে সলোমো যাদেরকে পাঠাবে তারা হাসপাতালের সামনে দুজনকে দেখলে হয়তো পিছু হটতেও পারে। একজনকে দেখলে অবশ্যই পিছু হটবে না। এনজোর হাতে একটা সিগারেট গুঁজে দিয়ে সেটা ধরিয়ে দিল মাইকেল। ডিসেম্বরের হাড় কাঁপানো শীতের রাতে লাইটপোস্টের আলোর নিচে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ওরা। বড়দিন উপলক্ষ্যে হাসপাতালের জানালাগুলো সবুজ পাতার মালা দিয়ে সাজানো হয়েছে, হলুদ সার্সিগুলো দুভাগ হয়ে গিয়ে জোড়া চোখের মত, লাগছে, জুল জুল চোখে তাকাচ্ছে ওদের দিকে।

ওদের সিগারেট প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এই সময় নিচু, লম্বা, কালো একটা গাড়ি নাইন এভিনিউ থেকে বাঁক নিয়ে থার্টিয়েথ স্ট্রীটে ঢুকল। ফুটপাথ ঘেঁষে আসছে গাড়িটা, সোজা ওদের দিকে।

প্রায় দাঁড়িয়ে পড়েছে গাড়িটা। সামনের দিকে ঝুঁকে নিচু হলো মাইকেল, উঁকি দিয়ে গাড়ির ভিতরটা দেখতে চেষ্টা করছে। নিজের অজ্ঞাতেই কুঁকড়ে যাচ্ছে তার শরীরটা। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছে গাড়িটা, কিন্তু হঠাৎ স্পীড বাড়িয়ে দিয়ে হুস করে ছুটে গেল। গাড়ির ভিতর থ্রেকে চিনতে পেরেছে ওরা মাইকেলকে। আরেকটা এনজোর দিকে সিগারেট বাড়িয়ে দিল মাইকেল লক্ষ করল, এনজার হাত দুটো কাঁপছে, কিন্তু এখন আর ওর নিজের হাত কাঁপছে না দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল সে।

সিগারেট ফুঁকছে দশ মিনিটও হয়নি, আচমকা রাতের বাতাস চিরে তীক্ষ্ণ সুরে বেজে উঠল পুলিশের সাইরেন। নাইনথু এভিনিউয়ের মোড়ে একটা টহলদার পুলিশ কারের নাক দেখা গেল, এত দ্রুত বাক নিচ্ছে য়ে টায়ারের সাথে রাস্তার প্রচণ্ড ঘ লেগে বিকট শব্দে গোটা এলাকা সচকিত হয়ে উঠল। য্যাচ করে কে কবে হাসপাতালের সামনে থামল কারটা। ওটার পিছনে এসে দাঁড়াল আরও দুটো স্কোয়াড কার। হাসপাতালের গেটের সামনে ইউনিফর্ম পরা পুলিশের ভিড় লেগে গেল। স্বস্তির হাঁফ ছাউল মাইকেল। মনে মনে প্রশংসা করল সনির ভাবল, পুলিশে খবর পাঠাতে দেরি করেনি ও। লাইটপোস্টের নিচ থেকে ভিড়টার দিকে এগোল সে।

যেন সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, মাইকেলকে নড়তে দেখেই দুদিক থেকে স্যাঁত করে এগিয়ে এসে ওর দুটো হাত চেপে ধরল দুজন পুলিশ। আরেকজন ওকে সার্চ করতে শুরু করল। ওদিকে ভিড় ঠেলে দ্রুত এগিয়ে আসছে একজন পুলিশ ক্যাপ্টেন, লোকটা যেমন লম্বা তেমনি চওড়া, চেহারায় রগচটা ভাব, সবাই তাকে, সসম্মানে পথ ছেড়ে দিচ্ছে। অমন প্রকাণ্ড শরীর নিয়ে এমন ক্ষিপ্রতার সাথে হাঁটছে, দেখে অবাক হয়ে গেল মাইকেল। সোনালী ফিতে বসানো টুপির নিচে পাকা চুল দেখা যাচ্ছে। কাঁচা গরুর মাংসের মত লাল মুখটা। সোজা এগিয়ে এসে মাইকেলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, তোমার মত সব হারামী গুণ্ডাকে হাজতে ভরতে পেরেছি বলে মনে করেছিলাম, এখন দেখছি ভুল হয়েছে আমার। কোথাকার মস্তান তুমি, এখানে কোন মতলবে?

ওর কাছে কোন অস্ত্র নেই, ক্যাপ্টেন, মাইকেলের পাশ থেকে একজন পুলিশ জানাল।

কোন কথা বলছে না মাইকেল। আবেগ বা ভাবের কোন চিহ্নমাত্র নেই ওর চেহারায়, শুধু ইস্পাতের মত নীল চোখের তীক্ষ্ণ কিন্তু ঠাণ্ডা দৃষ্টি দিয়ে দেখছে ক্যাপ্টেনকে।

ডনের ছেলে, মাইকেল কর্লিয়নি ও, সিভিল ড্রেস পরা একজন ডিটেকটিভ বলল।

বাবাকে পাহারা দিচ্ছিল গোয়েন্দারা, তারা হঠাৎ গেল কোথায়? কে সরিয়েছে তাদেরকে? মৃদু, শান্ত গলায় জানতে চাইল মাইকেল।

প্রচণ্ড রাগে টকটকে লাল হয়ে উঠল ক্যাপ্টেনের মুখ। ব্যাটা বদমাশ, গুণ্ডা, স্পর্ধা তো কম নয়। হুংকার ছেড়ে বলল ক্যাপ্টেন, শালা হারামী, আমার কাছে জুবাবদিহি চাও? নরকের কীট যত, সব গুণ্ডারা কে কাকে খুন করল না করল তাতে আমার বয়েই গেল। সে-ক্ষমতা যদি থাকত আমার, তোমার ওই স্বনামধন্য বাপকে বাঁচাবার জন্যে একটা আঙুলও তুলতাম না যাও, এবার ভাগো এখান থেকে। ফের যদি ভিজিটিং আওয়ারের আগে বা পরে এখানে দেখি তোমাকে, হাড় গুড়ো করে ফেলব।

একদৃষ্টিতে, গভীর মনোযোগর সাথে এখনও ক্যাপ্টেনকে লক্ষ করছে মাইকেল। লোকটার কথায় একটুও রাগ হয়নি ওর। মাথার ভিতর শুধু ঝড়ের গতিতে চিন্তা চলছে। তবে কি ওই প্রথম গাড়িটায় সনোযো ছিল, ওকে হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গেছে সে? এও কি সম্ভব যে সেই ফোন করে ক্যাপ্টেনকে বলেছে-ক্যাপ্টেন, তুমি কোন কাজেরই নও, কর্লিয়নি পরিবারের লোকেরা এখনও হাসপাতালের আশপাশে রয়েছে। এজন্যেই কি টাকা দেয়া হয়েছে তোমাদেরকে? গোটা ব্যাপারটাই পূর্বপরিকল্পিত, সনির এই কথাটাই কি তবে ঠিক? হ্যাঁ, ভাবছে মাইকেল, কাঁটায় কাঁটায় মিলে যাচ্ছে।

এতসব চিন্তা করেও মাথা ঠাণ্ডা রেখেছে মাইকেল। মৃদু শান্ত কণ্ঠে ক্যাপ্টেনকে জানাল, আগে তুমি বাবার কামরার চারদিকে পাহারা বসাও, তা নাহলে এখান থেকে যাচ্ছি না আমি।

ঝট করে পাশে দাঁড়ানো ডিটেকটিভের দিকে তাকাল ক্যাপ্টেন, ইঙ্কার ছেড়ে বলল, একে গ্রেফতার করো, ফিল।

ইতস্তত করছে ডিটেকটিভ। …মানে, ওর কাছে অস্ত্র পাওয়া যায়নি, ক্যাপ্টেন। যুদ্ধে বীরত্ব দেখিয়ে সুনাম কিনেছে, তাছাড়া এমনিতেও শান্ত প্রকৃতির ছেলে, কখনও কোন বেআইনী ঝামেলায় নিজেকে জড়ায়নি। এ নিয়ে কড়া সমালোচনা হতে পারে খবরের কাগজে।

মারমুখো হয়ে ডিকেটটিভের দিকে ফিরল ক্যাপ্টেন, রাগে অন্ধ হয়ে গেছে। ওকালতি করতে বলিনি, এই হারামজাদাকে গ্রেফতার করতে বলেছি তোমাকে, ফিল।

এখনও সম্পূর্ণ শান্ত মাইকেল। রাগের সাথে নয়, হিমশীতল বিদ্বেষের সাথে মৃদু গলায় বলল ও, বাবাকে শেষ করার জন্যে সলোযো তোমাকে কত টাকা দিয়েছে, ক্যাপ্টেন?

মাইকেলের দিকে ফিরল ক্যাপ্টেম। ওকে ধরো, মাইকেলের দুপাশে দাঁড়ানো ডিটেকটিভদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠল সে।

মাইকেল অনুভব করল দুই জোড়া হাত ওর শরীরটাকে পেঁচিয়ে ধরেছে শক্ত করে। দেখতে পাচ্ছে ক্যাপ্টেনের পাকানো মুঠো ধনুকের মত বাঁকা হয়ে এগিয়ে আসছে ওর মুখের দিকে। মাথাটা সরিয়ে নেবার চেষ্টা করল ও, নাকে না লেগে ঘুষিটা লাগল চোয়ালের হাড়ে। মাথার ভিতরটা যেন বিস্ফোরিত হলো ওর, রক্ত আর ছোট ছোট হাড়ের কুঁচিতে ভরে গেছে মুখের ভিতরটা, সেগুলো যে দাঁতের টুকরো, বুঝতে পারল মাইকেল। মাথার একটা দিক তেকোণা আলুর মত ফুলে উঠেছে ওর। শক্তি পাচ্ছে না পায়ে, পড়েই যাচ্ছিল, কিন্তু ওকে টেনে দাঁড় করিয়ে রাখল পুলিশ দুজন। তবে জ্ঞান আছে এখনও ওর। ক্যাপ্টেন আর ওর মাঝখানে সিভিল ড্রেস পরা সেই ডিটেকটিভ লোকটা এসে দাঁড়াল, অনেকটা ক্যাপ্টেনকে বাধা দেবার ভঙ্গিতে। সে বলল, হায়হায়, ক্যাপ্টেন, আপনি সত্যিই ওকে মারলেন!

সবাইকে শুনিয়ে চিৎকার করে বলল ক্যাপ্টেন, আমি? অসম্ভব। ওকে আমি চুইনি, ওই তো আমাকে প্রথম মারতে এসেছিল। খেয়াল থাকবে তো? আপত্তি করছিল গ্রেফতার হতে।

একটা লাল কুয়াশার ভিতর দিয়ে সব কিছু ঝাপসা দেখছে মাইকেল। দেখতে পাচ্ছে আরও কয়েকটা গাড়ি রাস্তার ধারে এসে দাঁড়াল, গাড়ি থেকে যারা নামছে তাদের মধ্যে, চিনতেও পারছে একজনকে, লোকটা ক্লেমেঞ্জার উকিল। দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সাথে ক্যাপ্টেনকে বলছে সে, মি. কর্লিয়নিকে পাহারা দেবার জন্যে তাঁর পরিবার একটা বেসরকারী গোয়েন্দা সংস্থাকে ভাড়া করেছে। আমার সাথে এরা যারা এসেছে, এদের সবার কাছে ফায়ার-আর্মসের লাইসেন্স আছে, ক্যাপ্টেন। কাউকে যদি গ্রেফতার করার দুর্মতি হয় আপনার। কাল সকালেই বিচারকের সামনে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে আপনাকে।

মাইকেলের দিকে ফিরল উকিল, বলল, আপনার এই অবস্থার জন্যে যে দায়ী তার বিরুদ্ধে আপনি অভিযোগ আনতে চান, মাইকেল কর্লিয়নি?

প্রচণ্ড ব্যথায় চোখে শর্ষে ফুল দেখছে মাইকেল, দুই চোয়াল এক করতে পারছে না, তবু বিড় বিড় করে বলল, আমি হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। দেখল, ওর দিকে ফিরে বিজয়ের উল্লাসে হাসছে ক্যাপ্টেন। জবাবে সেও একটু হাসতে চেষ্টা করল। যে-কোন মূল্যে শরীরের ভিতর প্রবাহিত ঠাণ্ডা আক্রোশের মোটা গোপন করতে চায় সে। ওর মনের ইচ্ছার কথাটা কেউ জেনে ফেলে সতর্ক হয়ে উঠুক তা চাইছে না। ডনও চাইতেন না। হঠাৎ টের পেল, তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারপর আর কিছু মনে নেই মাইকেলের।

.

সকালে ঘুম ভাঙতে মাইকেল দেখল তার চোয়াল দুটো তার দিয়ে বাঁধা হয়েছে, মুখের বাঁ দিকের চারটে দাঁত নেই। বিছানার পাশে বসে রয়েছে হেগেন।

ওষুধ দিয়ে অচেতন করা হয়েছিল আমাকে, টুম? জানতে চাইল মাইকেল।

এমনিতেও তুমি প্রায় বেহুশ হয়ে ছিলে, কিন্তু হাড়ের কুঁচি বের করার সময় খুব বেশি ব্যথা লাগবে বলে ওষুধ দেয়া হয়েছিল তোমাকে।

আর কোথাও চোট পেয়েছি?

না। লং বীচের বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইছে তোমাকে সনি, যেতে পারবে বলে মনে করো?

পারব, বলল মাইকেল। ডন কেমন আছে?

গভীর, লাল হয়ে উঠল হেগেনের মুখ, বলল, সংকটটা বোধ হয় এবারের মত কাটিয়ে ওঠা গেছে। একটা বেসরকারী গোয়েন্দা সংস্থাকে পুরো দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, আমাদের লোক ভিড় করে আছে গোটা এলাকায়। গাড়িতে উঠে সব শুনবে।

গাড়ি চালাচ্ছে ক্লেমেঞ্জা, ব্যাক সীটে বসেছে হেগেন আর মাইকেল। মাথাটা দপ দপ করছে মাইকেলের। কাল রাতের রহস্যটা উদ্ধার করতে পেরেছ তোমরা? জানতে চাইল ও।

ফিলিপস বলে যে গোয়েন্দাটা তোমাকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছিল সে হলো সনির পোষা লোক, শান্তভাবে রুলছে হেগেন। তার মুখ থেকেই জানা গেছে সব। ক্যাপ্টেনের নাম ম্যাকক্লাস্কি, চাকরিতে ঢোকার পর থেকেই ধুমসে ঘুষ খাচ্ছে। কর্লিয়নি পরিবারও প্রচুর টাকা দিয়েছে ওকে। সাংঘাতিক লোভী নোক, তার ওপর একবিন্দু বিশ্বস্ত নয়। সন্দেহ নেই, অঢেল টাকা দিয়েছে ওকে সলোযো। ভিজিটিং আওয়ার শেষ হবার পরপরই হাসপাতাল থেকে টেসিওর সব লোককে গ্রেফতার করে ও, তারপর অন্য একটা জরুরী কাজের নাম করে ডনের দূরজা থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় সরকারী গোয়েন্দাদেরকে। তাদেরকে বলা হয়েছিল, আরেক দল পুলিশ এসে দায়িত্ব নেবে। এসব ওর চালাকি। উনকে খতম করার জন্যে পরিবেশ তৈরি করে দেবে, এর বিনিময়ে সলোহোর কাছ থেকে টাকা খেয়েছিল ও। ফিলিপস-এর ধারণা, নাছোড়বান্দা, ছ্যাচড়া লোক ম্যাকক্লাস্কি, সে আবার চেষ্টা করবে। সন্দেহ, নেই, কাজের আগেই প্রচুর টাকা দিয়ে রেখেছে ওকে সলোমো, তারপর কাজ শেষ হলে আরও অনেক দেবে বলে লোভ দেখিয়ে রেখেছে।

আমার কথা খবরের কাগজে কিছু লিখেছে নাকি?

কেউ চায় না ব্যাপারটা জানাজানি হোক, বলল হেগেন। আমরাও না, পুলিশও না। চেপে যাওয়া হয়েছে।

ভাল হয়েছে। আচ্ছা, এনজো কি কেটে পড়তে পেরেছিল?

পুলিশের গাড়ি থামতেই ছুটে পালায় ও, বলল হেগেন; এখন বলতে চাইছে, সোযোর গাড়ি যাবার সময় ও নাকি তোমাকে কাভার দিয়েছে। তাই কি?

তাই, স্বীকার করুল মাইকেল। ছেলেটা ভাল।

তাহলে তো ওর একটা ভাল ব্যবস্থা করতে হয়, বলল হেগেন। কেমন বোধ করহু তুমি এখন? উদ্বেগ ফুটে উঠল হেগেনের চেহারায়। দেখে তো অবস্থা বিশেষ সুবিধের বলে মনে হচ্ছে না।

আমি ঠিক আছি, বলল মাইকেল! কি যেন নাম বললে ক্যাপ্টেনের?

ম্যাকক্লাস্কি, বলল হেগেন, তুমি হয়তো এনে খুশি হবে যে শেষ পর্যন্ত কর্লিয়নি পরিবার একটা চাল দিতে পেরেছে। ভোর চারটের সময়, ব্রুনো টাটাগ্লিয়া।

শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেল মাইকেলের। সে কি! আমাদের না হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার কথা?

শ্রাগ করল হেগেন। হাসপাতালের ব্যাপারটা শক্ত হতে সাহায্য করেছে সনিকে। নিউ ইয়র্ক আর নিউজার্সিতে ছড়ানো আছে আমাদের বাটন-ম্যানরা, রাতের মধ্যে তালিকা তৈরি হয়ে গেল। সনিকে আমি বাধা দেবার চেষ্টা করছি, মাইক! আমি চাই তুমি ওর সাথে কথা বলো। আমি এখনও মনে করি বড় রকমের যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়েও গোটা ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলা যায়।

ঠিক আছে, ওর সাথে কথা বলব আমি, বলল মাইকেল। আজ সকালে আলোচনা হবে নাকি?

হ্যাঁ, বলল হেগেন। উপায় নেই দেখে অবশেষে আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছে সলোযো, একসাথে বসতে চায়। আয়োজনের খুঁটিনাটি দিকগুলো দেখছে একজন মধ্যস্থতাকারী। এর অর্থ আমাদের জিত হয়েছে। পরাজয় মেনে নিয়েছে সলোযো, প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলে বাঁচে এখন। মিটিমিটি হাসছে হেগেন, তারপর আবার বলল, ওরা হয়তো ভেবেছিল দুর্বল হয়ে পড়েছি আমরা, কারণ পাল্টা আঘাত করিনি। কিন্তু টাটাগ্লিয়াদের একটা ছেলে হারিয়ে এখন ওরা বুঝতে পারছে আমরাও সহজে ছেড়ে দেব না। ডনকে আক্রমণ করে মন্ত ঝুঁকি নিয়েছিল ব্যাটা। ওদিকে, পাকা খবর পাওয়া গেছে লুকা সম্পর্কে। ডন যেদিন গুলি খেলেন তার আগের রাতে তাকে ওরা খুন করে। কোথায়, জানো? ব্রুনোর নাইট-ক্লাবে। ভাবতে পারো?

নিশ্চয়ই তাকে ওরা আচমকা আক্রমণ করেছিল, বলল মাইকেল।

.

লং বীচ।

প্রাঙ্গণে ঢোকার মুখে আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে পথ আটকে রেখেছে কালো একটা লম্বা গাড়ি। গাড়ির হুডে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজন লোক। দুপাশের বাড়ি দুটোর উপরতলার সবগুলো জানালা খোলা, লক্ষ করল মাইকেল। তার মানে আঁটঘাট বেঁধে নেমেছে সনি, সহজে ছাড়বে না সে।

প্রাঙ্গণের বাইরে গাড়ি দাঁড় করাল ক্লেমেঞ্জা, পায়ে হেঁটে ভিতরে ঢুকল ওরা। সেন্ট্রিরা ক্লেমেঞ্জার লোক, তাদের দিকে তাকিয়ে ভুরু কোঁচকাল সে-এটাই তার অভিবাদনের ধরন। সেন্ট্রিরাও মাথা ঝাঁকিয়ে স্বীকৃতি জানাল। কেউ হাসল না বা ঠোঁট নাড়ল না। মাইকেল আর হেগেনকে নিয়ে বাড়ির অন্দরমহলে এল ক্লেমেঞ্জা, ওরা বেল বাজাবার আগেই একজন সেন্ট্রি ভিতর থেকে খুলে দিয়েছে দরজা। বোঝা গেল, উপরের কোন একটা জানালা দিয়ে ওদেরকে আসতে দেখেছে সে।

শেষ প্রান্তের অফিস কামরায় ওদের জন্যে অপেক্ষা করছে সনি আর টেসিও। মাইকেলকে দেখে উঠে দাঁড়াল সনি, এগিয়ে এসে ছোট ভাইয়ের মাথাটা দুহাতে ধরে বলল, চমৎকার, অপূর্ব!

ঠেলে বড় ভাইয়ের হাত দুটো সরিয়ে দিল মাইকেল, ধীর পায়ে হেঁটে ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, গ্লাসে স্কচ হুইস্কি ঢেলে নিচ্ছে। তার দিয়ে বাঁধা চোয়াল দুটো ভীষণ ব্যথা করছে ওর, হুইস্কি খেলে যদি একটু কমে।

কামরার ভিতর পাঁচজন বসেছে ওরা, কিন্তু পরিবেশটা আর আগের বারের মত নেই। আরও খুশি আর উত্তেজিত দেখাচ্ছে সনিকে। এর অর্থ পরিষ্কার বুঝতে পারছে মাইকেল। সনির মনে এখন আর কোন সংশয় নেই। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে, সেখান থেকে এখন আর তাকে টলানো যাবে না। গতরাতে সলোযোর ওই অপচেষ্টার পর আর কোন কথা নয়। আপস করার প্রশ্নই ওঠে না।

হেগেনকে বলছে সনি, যে লোকটা মধ্যস্থতা করছে তার কাছ থেকে খবর পেলাম ঈর্ক এখন সরাসরি দেখা করতে চায়। হাসছে সনি। শয়তানটার দুঃসাহস দেখেছ? কণ্ঠে শ্রদ্ধা আর প্রশংসার সুর। কাল অমন তাড়া খেয়ে আজই দেখা করার প্রস্তাব পাঠিয়েছে। ভেবেছে, ও যা বলৰে আমরা তাই মেনে নেব। কি স্পর্ধা, ভারতে পারো?

সতর্ক ভঙ্গিতে জানতে চাইল হেগেন, উত্তরে কি বলেছ তুমি?

নিঃশব্দে হেসে বলল সনি, এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম, বললাম, অবশ্যই দেখা করব না কেন? ওর যখন সময় হবে তখনই দেখা করব আমরা। আবার হাসছে সনি। আমাদের কোন ব্যস্ততা নেই। একশোর ওপর বাটন-ম্যান ছেড়ে দিয়েছি রাস্তায় আমরা। সলোযো তার পাছার ব্লোয়াটুকু একবার দেখালে হয় শুধু, অমনি তাকে ওরা দুটুকরো কররে। যত ইচ্ছা সময় নিক না ব্যাটা।

স্পষ্ট কোন প্রস্তাব দিয়েছে কি? জানতে চাইল হেগেন।

দিয়েছে বৈকি, বলল সনি, ও যা বলতে চায় তা মাইককে গিয়ে শুনে আসতে হবে। ওর জামিন হবে মধ্যস্থতাকারী লোকটা। চাওয়ার কোন কারণ নেই, জানে ও, তাই নিজের নিরাপত্তার জামিন চায়নি সোযো। সাক্ষাতের আয়োজন ওরাই করবে। ওরাই রাস্তা থেকে মাইককে তুলে আলোচনার জায়গায় নিয়ে যাবে। সোযো সেখানে প্রস্তাবটা ব্যাখ্যা করে শোনাবে মাইককে, তারপর ওকে ছেড়ে দেয়া হবে। ওরা জোর দিয়ে বলছে, প্রস্তাবটা এত ভাল যে আমরা নাকি তা প্রত্যাখ্যান করতে পারব না।

টাটাগ্লিয়াদের খবর? প্রশ্ন করল হেগেন। কনোর ব্যাপারটা নিয়ে কি করবে ওরা?

প্রস্তাবের মধ্যে এ-বিষয়টাও আছে, বলল সনি। টাটাগ্লিয়া পরিবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা সলোযোকে সমর্থন দিয়ে যাবে। তার মানে, আলোচনাকারী দিয়ে বুলে পাঠিয়েছে, ব্রুনোর কথা মন থেকে মুছে ফেলবে ওরা। বাবাকে আহত করার বিনিময়ে এই দাম দিতে হয়েছে রুনোকে। সব নাকি শোধ-বোধ হয়ে গেছে। আবার হাসছে সনি। বিপদে পড়ে কেমন সহনশীলতার পরিচয় দিচ্ছে, তাই না?

সতর্ক ভঙ্গিতে বলল হেগেন, ওদের বক্তব্য আমাদের শোনা উচিত।

দ্রুত এদিক ওদিক মাথা দোলাচ্ছে সনি। না, না কনসিলিয়রি, এবারটি নয়। ওর বুলার মধ্যে ইতালীয় ভঙ্গি এবং সুর ফুটে উঠল। কৌতুক করার জন্যে বাবার বাচনভঙ্গি নকল করে আবার বলল ও, আর আলোচনা নয়। আর মীটিং নয়। সলোযোরধূর্তামি আর নয়। আমাদের জবাব শোনার জন্যে ওরা যোগাযোগ করলেই, আমি চাই তুমি এক কথায় জানিয়ে দেবে-আমরা সলোযোকে চাই। তা না হলে সামগ্রিক লড়াই। ব্যবসার ক্ষতি হবে, নিরুপায় ভঙ্গিতে কাধ ঝাঁকাল সনি, কিছু করার নেই, সেটুকু মেনে নিতে হবে আমাদেরকে।

কিন্তু আর সব পরিবার সামগ্রিক লড়াইয়ে রাজি হবে না, বলল হেগেন। তাতে সবার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল সনি, ওদের সামনে সহজ একটা পথ খোলা রয়েছে। হয় সলোযোকে তুলে দিক আমার হাতে, নয়তো কর্লিয়নি পরিবারের সাথে লড়াই করার জন্যে তৈরি থোক। একটু থেমে আবার দৃঢ় গলায় বলল সে, আপসের বিষয়ে কোন কথা নয়, টম। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেছে। এখন তোমার কাজ হলো জেতার জন্যে আমাকে সাহায্য করা। বুঝেছ?

অনুগত ভঙ্গিতে মাথা নত করুল হেগেন। কয়েক মুহূর্তের জন্যে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল সে। তারপর মাথা তুলে বলল, থানায় তোমার চর ফিলিপস-এর সাথে কথা হয়েছে আমার। সে বলছে, ম্যাকক্লাস্কি সলোযোর কাছ থেকে মোটা টাকাই শুধু খায় না, তাকে ড্রাগ ব্যবসা থেকে লাভের একটা ভাগও দেয়া হবে। সলোহোর বডিগার্ড হতে রাজি হয়েছে সে। সাথে পুলিশ ক্যাপ্টেন ম্যাককুাস্কি না থাকলে গর্ত থেকে নাকের ডগাও বের করবে না তুর্ক। আলোচনার টেবিলে মাইকেলের সামনে বসবে সে, তার পাশেই বসবে ম্যাকক্লাস্কি। সিভিল ড্রেসে থাকবে সে, সাথে অবশ্যই আগ্নেয়াস্ত্র থাকবে। ব্যাপারটা বুঝছ তো? এভাবে পাহারা নিয়ে থাকলে ওকে তুমি ছুঁতেই পারবে না। নিউ ইয়র্কের একজন পুলিশ ক্যাপ্টেনকে খুন করে আজ পর্যন্ত রেহাই পায়নি কেউ। এমন ঘটনা ভুল করে কেউ যদি ঘটায়, গনগনে আগুন হয়ে উঠবে শহর-ব্বরের কাগজ, আইন বিভাগ, পুলিশ বিভাগ, গির্জা পরিষদ সবাই একেবারে উন্মাদ হয়ে উঠবে। সে এক ভয়ঙ্কর অবস্থা, কল্পনা করা যায় না। শুলো ইতালীয় পরিবার তোমাদের বিপক্ষে চলে যাবে। একঘরে করা হবে কর্লিয়নি পরিবারকে। শুধু তাই নয়, ডনের রাজনীতিক বন্ধুরাও পিঠটান দেবে। আমি বলতে চাই, সব দিক ভালভাবে ভেবেচিন্তে দেখে নিয়ে তারপর কাজে হাত দাও।

আমরাও অপেক্ষা করব, বলল সনি, সনোযোকে তো আর চিরকাল পাহারা দিয়ে রাখতে পারবে না ম্যাকক্লাস্কি।

অস্বস্তিতে ছটফট করছে টেসিও আর ক্লেমেঞ্জা, ঘন ঘন চুরুট ফুকছে। কিছু বলতে চায়, কিন্তু সাহস পাচ্ছে না। ঘেমে গোল হয়ে যাচ্ছে দুজনেই। সিদ্ধান্ত নিতে একটু যদি ভুল হয়, ওদেরই ছাল ছাড়িয়ে দড়িতে শুকাতে দেয়া হবে।

এতক্ষণে এই প্রথম কথা বলছে মাইকেল, হেগেনের দিকে ফিরে জানতে চাইল সে, হাসপাতাল থেকে বাবাকে এখানে নিয়ে আসা যায় না?

এদিক ওদিক মাথা দোলাল হেগেন। কথাটা প্রথমেই জানতে চেয়েছিলাম আমি। সম্ভব নয়। ডনের অবস্থা খুব খারাপ। নানারকম যত্ন আর বো পেলে তবেই টিকে থাকবেন তিনি। আরও অপারেশনের দরকার হতে পারে। না, অস্তব।

তাহলে আর দেরি করা যায় না, বলল মাইকেল, সলোযোকে এখুনি ধরতে হবে। লোকটা সাংঘাতিক, কখন কি মতলব আঁটে ঠিক নেই। জানো তো, বাবাকে সরাতে পারলেই জিতে যাবে ও। নিজের অবস্থা এখন ভাল নয়, তাই প্রাণের নিরাপত্তা পেলে সাময়িক পরাজয় মেনে নিতে আপত্তি নেই ওর। কিন্তু ওর কপালে যদি শেষ পর্যন্ত মৃত্যু লেখা থাকে, তাহলে ডনকে সরাবার আরেকবার চেষ্টা করবে ও। সাথে ওই ব্যাটা পুলিশ ক্যাপ্টেন থাকলে কখন কি হয় কিছুই বলা যায় না। কোন ঝুঁকি আমরা নিতে পারি না। সলোযোকে এখুনি সরিয়ে ফেলতে হবে।

চিন্তিতভাবে দাড়ি চুলকাচ্ছে সনি। বলল, ঠিক বলেছিস, মাইক। একেবারে খাঁটি কথা। বাবার ওপর আরেকটা হামলা চালাবার সুযোগ ওকে আমরা দিতে পারি না।

ধীর, মৃদু গলায় জানতে চাইল হেগেন, ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কির কি হবে?

ঠোঁটে অদ্ভুত একটা হাসি নিয়ে ছোট ভাই মাইকেলের দিকে তাকাল সনি, বলল, হ্যাঁ, জবাব দে, জাহাবাজ পুলিশ ক্যাপ্টেনের কি হবে?

আশ্চর্য শান্তভাবে বলল মাইকেল, সন্দেহ নেই, এটা একটা চরম ব্যবস্থা। কিন্তু এমন সময়ও আসে যখন শুধু চরম ব্যবস্থাই সব দিক থেকে ভাল আর একান্ত প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দেয়। চিন্তার ধারা পাল্টাতে হবে আমাদেরকে, ম্যাকাঙ্কিকে মেরে ফেলতে হবে এটা ধরে নিয়েই এগোতে হবে এখন। একটু কৌশলে করতে হবে কাজটা, অর্থাৎ জটিল ভাবে জড়িয়ে ফেলতে হবে ওকে, যেন কেউ মনে করতে না পারে একজন আদর্শ, পুলিশকে খুন করা হয়েছে। সবাই যেন দেখতে পায় একজন দুর্নীতিপরায়ণ পুলিশ অফিসার উচিত সাজা পেয়েছে, লোকটা নানান বেআইনী কীর্তিকলাপের সাথে জড়িত ছিল। পোষা সাংবাদিক আছে আমাদের, তাদেরকে ডেকে বিবৃতি দেয়া যায়, বিবৃতির সমর্থনে প্রয়োজনীয় প্রমাণও দেয়া। তাতে অনেকটা হালকা হবে পরিবেশ, গরম ভাবটা কমবে। তোমরা কি মনে করো? সবিনয়ে একে একে সকলের দিকে তাকাচ্ছে মাইকেল।

ক্লেমেঞ্জা আর টেসিওর মুখ গভীর, থমথম করছে, কিছু বলতে নারাজ ওরা।

বেড়ে বলেছিস, ভাই, সেই অদ্ভুত বাঁকা হাসিটা মুখে নিয়ে কথা বলছে সনি। থামলি কেন, চালিয়ে যা। ডন তো সব সময় বলতেন, শিশুদের মুখ থেকেই…। থামলি কেন, আরও বল শুনি।

একটু হেসে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে হেগেনও।

মুখটা লাল হয়ে উঠেছে মাইকেলের। কিন্তু রাগ বা দুঃখের চিহ্নমাত্র নেই ওর চেহারায়, ওর বিশ্বাস ও যা বলছে ভেবেচিন্তেই বলছে, এবং কেউ মানুক, বা না মানুক, নিজের কথা শেষ করবে ও। ওদের প্রস্তাব মতই ব্যবস্থা হোক। আমার সাথে কথা বলতে চায়, বেশ তো, যাব আমি। সলোযো, ম্যাকাঙ্কি আর আমি, এই তিনজন ছাড়া সেখানে আর কেউ থাকতে পারবে না। তারিখ দাও আজ থেকে দুদিন পর। ইতিমধ্যে আমাদের গুপ্তচরদের লাগাও, খুঁজে বের করুক তারা মীটিংয়ের জায়গাটা। জানিয়ে দিয়ে বৈঠকটা প্রকাশ্য কোন জায়গায় হতে হবে। আমি কোন ফ্ল্যাটে বা কারও বাড়িতে যেতে রাজি নই। রেস্তোরাঁ বা বার হলে চলবে, ডিনার খাবার ভিড় থাকলে নিরাপদ রোধ করব আমি। এই ব্যবস্থা ওদের মনেও নিরাপত্তা বোধ এনে দেবে। এই রকম আয়োজন করা গেলে এমন কি সলোযোও ঘুণাক্ষরে ভাবতে পারবে না যে ক্যাপ্টেনকে গুলি করতে যাচ্ছি আমরা। প্রথমেই ওরা আমাকে সার্চ করে দেখে নেবে আমার কাছে পিস্তল আছে কিনা, তার মানে তখন আমার কাছে অস্ত্র থাকলে চলবে না। ওদের সাথে আলোচনা চালাচ্ছি, এই সময় কি উপায়ে আমার কাছে অস্ত্র পৌঁছে দেয়া যায় সেটা ভেবেচিন্তে বের করো তোমরা। তা যদি পারো, ওদের দুজনকেই খতম করব আমি।

অবিশ্বাস ভরা চার জোড়া চোখ অপলক তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও হতভম্ব। হেগেন অবাক হয়নি, কিন্তু বিষণ্ণ দেখাচ্ছে তাকে। শুধু কিউপিড় মুখটা কৌতুকে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সনির।

হঠাৎ পাগলের মত হো হো করে হেসে উঠল সনি। কৃত্রিম নয়, তলপেটের ভিতর থেকে উঠে আসা অট্টহাসি। মাইকেলের দিকে আঙুল তুলে প্রচণ্ড হাসির ফাঁকে কথা বলার চেষ্টা করছে সে। তুই, কলেজের সেরা ছেলে তুই, পারিবারিক ব্যবসার সাথে নিজেকে কখনও জড়াতে চাসনি, আর আজ হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই সেই তুই-ই কিনা দুদুজন লোককে একেবারে খুন করে ফেলতে চাইছিস? তাও শুধু সলোযোকে নয়, তার সাথে একজন পুলিশ ক্যাপ্টেনকেও? কারণ ক্যাপ্টেন ম্যাককুাস্কি তোর মুখ ভেঙে দিয়েছে। দেখ মাইক, ব্যাপারটাকে তুই ব্যক্তিগতভাবে নিচ্ছিস। আহা, বুঝছিস না কেন, এটা ব্যবসা-ব্যক্তিগত কিছু নয়। সামান্য একটা চড় খেয়েই তোর এই অবস্থা? এতেই দুজন লোককে মেরে ফেলতে চাইছিস? যত্তোসব! এই করেই এতগুলো বছর কাটিয়ে দিয়েছিস!

ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুল বুঝল ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও। ওরা ভাবছে ছোট ভাইয়ের এমন একটা দুঃসাহসিক প্রস্তাব শুনে প্রশংসায় হাসছে সনি। তাই ওরাও মাইকেলের দিকে ফিরে তাকে উৎসাহ দিয়ে হাসতে শুরু করল। শুধু হেগেন ব্যাপারটা ধরতে পেরে সাবধান হয়ে গেল, সতর্কতার সাথে সব রকম ভাব মুছে ফেলল মুখ থেকে।

এক এক করে সবার দিকে তাকাল মাইকেল, তারপর ফিরল সনির দিকে। এখনও হাসি থামাতে পারেনি সনি। বলে চলেছে, এ কি শুনছি আমি? আমার ছোট ভাই মাইকেল, তুই, তুই কিনা দুজন লোককে খুন করবি? দেখ ভাই, এ-কাজে তুই কিন্তু কোন পদক পাবি না। বিনিময়ে ওরা তোকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসাবে। জানিস তো? আবার একচোট হেসে নিল সনি। এটা ছেলেমানুষি কোন কাজ নয়, ভাই, এক মাইল দূর থেকে কাউকে গুলি করা নয়। একজন লোকের চোখের সাদা অংশটা পরিষ্কার দেখা গেলে তবে গুলি করতে হয়, মনে আছে, স্কুলে শেখানো হয়েছিল? একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে খুলি উড়িয়ে দিতে হয়, তাতে তোমার সুন্দর আইভি লীগের সটে তার মাথার মগজ ছিটকে এসে লাগে। এক ব্যাটা হাঁদারাম পুলিশ তোমাকে চড় মেরেছে আর তাতেই এইসব করতে ইচ্ছা করছে তোমার? হাসিটা এখনও থামাতে পারছে না সনি।

সবাই তাকিয়ে আছে ওর দিকে, বুঝতে পারছে মাইকেল। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল ও। এবার হাসিটা থামাও তোমার শান্ত কিন্তু আশ্চর্য দৃঢ়তার সাথে বলল মাইকেল। ঋজু ভঙ্গিতে, শক্ত পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ও। ওর মধ্যে এমন অভাবিত পরিবর্তন দেখে নিমেষে মুখের হাসি মুছে গেল ক্লেমেঞ্জা আর টেসিওঁর। মুহূর্তে বদলে গেছে পরিবেশটা। তেমন বিশালদেহী বা শক্তিশালী নয় মাইকেল, প্রচণ্ড রাগে গনগনে আগুনের মত চেহারা হয়েছে ওর, এখন ওর দিকে তাকিয়ে থাকার জন্যে সাহসের দরকার। সটান অনড় দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গির মধ্যে বিচ্ছুরিত হচ্ছে বিপদের সংকেত। চোখের রঙ হয়ে উঠেছে আশ্চর্য ফিকে বাদামী, মুখের চেহারা সম্পূর্ণ বিবর্ণ। ভয়ে টিপটিপ করছে সবার বুক, এই বুঝি বড় ভাইয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল মাইকেল। বুঝতে বাকি নেই কারও, এখন যদি হাতে অস্ত্র থাকত মাইকেলের, বিপদ হত অগ্রজের।

ধীরে ধীরে মুখের হাসি মান হয়ে গেল সর্নির।

মৃদু, ঠাণ্ডা গলায় জানতে চাইল মাইকেল, তুমি বলতে চাইছ কাজটা আমি করতে পারব না?

হাসির শেষ রেশটুকুও মুখ থেকে মুছে নিয়েছে সনি। আপসের সুর ফুটল তার গলায়, বলল, পারবি না তা বলিনি, আমি জানি তুই পারবি। আমি তোর বক্তব্য শুনে হাসিনি। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা কি রকম অদ্ভুত দাঁড়াচ্ছে তাই ভেবে হাসছি। আর কেউ না জানুক, আমি তো জানি আর সব সময় বলেও এসেছি যে কর্লিয়নি পরিবারে তুই-ই সবচেয়ে শক্ত বান্দা, এমন কি ডনের চেয়েও কঠিন পাত্র। বাবার প্রভাব এড়িয়ে একমাত্র তুই-ই তো মাথা তুলে নিজের শক্তির জোরে গড়ে উঠেছিস। ছোট বেলার কথা ভুলে গেছি মনে করেছিস? এমন বেপরোয়া আর মেজাজী ছিলি, বাপরে! আমার সাথে মারামারি করতেও তুই পিছপা হতিস না, অথচ তোর চেয়ে আমি কত বড়। আর ফ্রেডিকে তো হপ্তায় অন্তত একবার না পেটালে তোর পেটের খাবার হজম হত না। কিন্তু এসব কথা জানে কে? সবাই জানে তুই ভীতুর ডিম না হলেও সাদাসিধে গোবেচারা তো বটেই, যাকে বলে ভাল-মানুষ। সলোয়যাও তোকে সেই রকম বোকাসোকা আর নিরীহ কিছু একটা ধরে নিয়েছে, সেজন্যে তাকে দোষ দেয়া যায় না। পারিবারিক হাঙ্গামা থেকে তুই তো সব সময় দূরে সরে থেকেছিস। ম্যাকক্লাস্কিও ধরে নিয়েছে তোর সাথে মুখোমুখি দেখা করলে বিপদের কোন ভয় নেই।

একটু থেমে, গলার স্বর খাদে নামিয়ে আবার বলল সনি, কিন্তু, ওরে হারামজাদা, তুইও একজন কর্লিয়নি! কথাটা শুধু আমারই মনে ছিল, তাই বাবা গুলি খাবার পর থেকে এখানে বসে অপেক্ষা করছি কখন তুই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে পড়বি। অপেক্ষা করছি কখন তুই আমার ডান হাত হয়ে উঠবি। যারা আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করতে চাইছে তুই আর আমি মিলে তাদের সব কটাকে মুছে ফেলব দুনিয়ার বুক থেকে। আমি কি ছাই জানতাম, সেফ চোয়ালে একটা ঘুসির অপেক্ষায় আছে সব? জানলে তো…এবার কি বলবি, বল। সকৌতুকে একটা ঘুসি পাকাল সনি; তারপর আবার বলল, বল, এবার কি বলবি?

কামরার পরিবেশ থেকে আড়ষ্ট ভাবটা কেটে গেছে। মৃদু একটু মাথা নেড়ে বলল মাইকেল, আর কোন উপায় নেই দেখেই এই চরম ব্যবস্থার কথা বলছি আমি, সনি। যে লোক বাবাকে খুন করবে বলে জানি তাকে আর সুযোগ দেয়া যায় না। শুধু আমিই ওর সবচেয়ে কাছে যেতে পারব, তাই না? সুতরাং কাজটা আমার। একজন পুলিশ ক্যাপ্টেনকে খুন করার সুযোগ তোমরা কেউ পাবে বলে মনে হয় না। কাজটা তুমি হয়তো করতে পারো, সনি, কিন্তু তুমি একজনের স্বামী, তার ছেলে-মেয়ের বাবা–তাদেরকে বিপদে ফেলার ঝুঁকি তুমি নিতে পারো না। আরেকটা কারণ, বাবা যতদিন অসুস্থ থাকবেন ততদিন তোমাকেই তো দেখতে হবে পারিবারিক ব্যবসাটাও! বাকি রইলাম আমি আর ফ্রেডি। ফ্রেডি শক খেয়েছে, ওর কথা বাদ দাও। শেষ পর্যন্ত টিকে যাচ্ছি শুধু আমি। আমার কথায় যুক্তির কোন অভাব দেখতে পেলে বলো। চোয়ালে ঘুসির সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সনি, এগিয়ে এসে ছোট ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরল। দরাজ গলায় বলল, কেন কি বলেছিস তাতে আমার কিছুই এসে যায় না। আমাদের দলে আছিস, এটাই সবচেয়ে বড় কথা। তবে শোন, এতক্ষণ যা বলেছিস তার প্রতিটি কথা খাঁটি। একটাও বাজে কথা বলিসনি তুই। কিরলো, টম?

শ্রাগ করল হেগেন। যুক্তিতে খুঁত আছে তা বলতে পারি না। কারণ আপোসের ব্যাপারে সলোযো আন্তরিক নয়, তার কুমতলব আছে। আমার বিশ্বাস, মুখে যাই কলুক, ডনের ক্ষতি করতে চায় ও। তাই আমিও মনে করি, ওকে খতম করতে হবে। তা করতে হলে যদি পুলিশ মারতে হয়, তাতেও আমার আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু কাজটা যে করবে তার ওপর ভয়ংকর বিপদ নেমে আসবে। তাছাড়া আমি এ-কথাও ভাবছি, কাজটা মাইক করতে পারবে তো?

আমি পারব, মৃদুকণ্ঠে বলল সনি।

ধৈর্য হারিয়ে দ্রুত মাথা নাড়ল হেগেন, বলল, বুঝছ না কেন, বডিগার্ড হিসেবে দশজন পুলিশ ক্যাপ্টেন পাশে থাকলেও তোমাকে কাছে ঘেষতে দেবে না সলোযো। তাছাড়া আপাতত তুমি আমাদের পরিবারের মাথা, তোমাকে এ-ধরনের ঝুঁকি নিতে দিতে পারি না।ক্লেমেঞ্জা আর টেসিওর দিকে তাকাল সে। তোমাদের বাটন ম্যানদের মধ্যে দক্ষ, ওস্তাদ কেউ আছে নাকি, যে কাজটা করতে রাজি হবে? বাকি জীবনটা আর কোন কাজ না করেই সচ্ছলতার মধ্যে কাটাতে পারবে সে।

দুজনের হয়ে উত্তর দিল ক্লেমেঞ্জাই, এমন কেউ নেই যাকে সলোযো চেনে না। দেখলেই সব বুঝে ফেলবে সে। একই কথা আমি বা টেসিও গেলে।

এখনও নাম করেনি, কিন্তু খুব কঠিন পাত্র, এমন কেউ নেই? জানতে চাইল হেগেন।

ক্যাপোরেজিমিরা মাথা দোলাল। ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার ভঙ্গিতে একটু হেসে বলল টেসিও, নোক আমরা দিতে পারি, কিন্তু তা হবে আন্তর্জাতিক খেলায় রংরুট নামাবার মত।

অগত্যা সিদ্ধান্ত দেবার ভঙ্গিতে বলল সনি, মাইককেই যেতে হয় তাহলে। যেতে যদি হয়, ওর যাবার পক্ষেই লক্ষ লক্ষ কারণ আছে। সবচেয়ে বড় কারণ, ওকে ওরা আনাড়ী বলে মনে করছে। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, কাজটা করতে পারবে ও। এটাও কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়, কারণ ব্যাটা তুর্ক বেন্নিককে খতম করার ওই একটা সুযোগই পাওয়া যাবে। একটা ব্যাপার নিয়েই শুধু মাথা ঘামাতে হবে এখন আমাদেরকে, তা হলো, কি উপায়ে যত বেশি সম্ভব সুবিধে করে দেয়া যায় মাইকের।

সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে সনির কথা।

টম, ক্লেমেঞ্জা, টেসিও, খুঁজে বের করো তোমরা, কোথায় ওরা নিয়ে যাবে মাইককে। এর পিছনে যত খরচ হয় হবে। আগে জায়গাটা খুঁজে বের করতে হবে, তারপর ভাবা যাবে কিভাবেওর কাছে অস্ত্র পৌঁছে দেয়া যায়। ক্লেমেঞ্জা, তোমার গোপন সংগ্রহ থেকে সবচেয়ে নিরাপদ পি দেবে ওকে। একেবারে ঠাণ্ডা অস্ত্র, যার কোন সূত্র ধরা যাবে না। মনে রেখো, ব্যারেল ছোট আর বিস্ফোরণের ক্ষমতা বেশি হবে। লক্ষ্যভেদ করার ক্ষমতা খুব বেশি না হলেও চলবে, কারণ ওটা যখন ব্যবহার করবে মাইক, তখন একেবারে ওদের ঘাড়ের ওপর থাকবে ও। মাইক, গুলি করেই পিস্তলটা মেঝেতে ফেলে দিবি তুই। যদি ধরা পড়িস, হাতে ওটা নিয়ে ধরা পড়িস না, খবরদার!

ক্লেমেঞ্জা, ব্যারেল আর ট্রিগারে তোমার সেই বিশেষ জিনিসটা লাগিয়ে দিয়ো, তাহলে আর আঙুলের ছাপ পড়বে না। আবার মাইকেলের দিকে ফিরল সনি। মনে রাখিস, প্রত্যক্ষদর্শী ইত্যাদির সব ব্যবস্থা করতে পারব, কিন্তু অ্যারেস্ট হবার সময় হাতে যদি পিস্তল থাকে, কিছুই করতে পারব না আমরা। গাড়ি, নিরাপত্তা সব ব্যবস্থা, করা থাকবে-কাজ সেরে একবার সরে আসতে পারলে আর কিছু ভাবতে হবে না তোকে। একটু থেমে কণ্ঠস্বর খাদে নামাল সনি, তারপর একেবারে বাতাসে মিলিয়ে যেতে হবে তোক। লম্বা ছুটি নিয়ে চলে যাবি অনেক দূরে, যতদিন না

এদিকটা ঠাণ্ডা হয়ে আসে ততদিনের জন্যে। কিন্তু আমি চাই না তুই তোর বান্ধবীর কাছ থেকে বিদায় নিস না, তাকে ফোন করাও চলবে না তোর। তুই নিরাপদে বিদেশে পৌঁছুলে, এদিকটা ঠাণ্ডা হয়ে এলে, আমি ওকে জানাব যে তুই ভাল আছিস। এটা আমার আদেশ।

ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল সনি, তারপর আবার বলল, এখন থেকে ক্লেমেঞ্জার কাছাকাছি থাক, যে পিস্তলটা দেবে তোকে সেটা প্র্যাকটিস কর। বাকি সব ব্যবস্থা আমরা করব। ঠিক হ্যায়, ভাইয়া?

সারা শরীরে আরেকবার হিমশীতল একটা সজীবতার আবেশ অনুভব করল মাইকেল। সনিকে বলল, এ-ধরনের একটা বিষয়ে বান্ধবী বা আর কাউকে কিছু বলব বলে মনে করে আমাকে সাবধান করে দেবার কোন মানে হয় না। ফোন করে বিদায় নেব ওর কাছ থেকে তা তুমি ভাবলে কিভাবে?

তাড়াতাড়ি বলল সনি, ঠিক আছে, ভুল স্বীকার করছি কিন্তু এখনও তো তুই একজন রংরুট; তাই ভাবলাম বানান-টানানগুলো শিখিয়ে দেবার দরকার আছে। যাক, কি বলেছি ভুলে যা।

একমুখ হেসে বলল মাইকেল, এ আরার কি কথা হলো? রংরুট? তুমি যেমন মন দিয়ে বাবার কথা শুনতে, আমিও তেমনি শুনতাম। তা নাহলে এত চালাক হলাম কিভাবে?

ওরা দুজনেই হাসতে শুরু করল।

সবার জন্যে গ্লাসে হুইস্কি ঢালল হেগেন। গম্ভীর দেখাচ্ছে তাকে। রাজনীতিবিদকে জোর করে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে, আর আইনবিদকে শরণ নিতে হচ্ছে আইনের-গোটা ব্যাপারটাকে এভাবে দেখছে সে। অবশেষে বলল, তা সে। যাই হোক গে, কি করা হবে সেটুকু অন্তত জানা গেল।

 ২.৩ রেসের তিনটে বাজির স্লিপ

০৩.

অফিসে বসে রেসের তিনটে বাজির স্লিপ নাড়াচাড়া করছে ক্যাপ্টেন ম্যাককাশ্মি। কপালে চিন্তার রেখা, ভাবছে, স্লিপে লেখা সাংকেতিক শব্দগুলো পড়তে পারলে কাজ হত। গত রাতে ওর লোকেরা কর্লিয়নিদের এক বুকমেকারের আস্তানায় হানা দিয়ে সংগ্রহ করেছে এগুলো। দাম দিয়ে এগুলো আবার ফিরিয়ে নিতে হবে বুকমেকারকে, তা না হলে খেলোয়াড়েরা তাদের জেতা টাকা দাবি করতে পারবে না–আর তা যদি ঘটে, বুকমেকারের পিঠের ছাল তুলে ফেলবে তারা।

স্লিপে লেখা কথাগুলোর অর্থ উদ্ধার করা ম্যাকক্লাস্কির জন্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা না হলে বুকমেকারের কাছে এগুলো ক্বিক্রি করার সময় ঠকতে হবে তাকে। কারবার যদি পঞ্চাশ হাজার ডলারের হয় তাহলে পাঁচ হাজার দাবি করা যেতে পারে, কিন্তু বাজিগুলো যদি অস্বাভাবিক বড় ধরনের হয়ে থাকে। যদি লাখ লাখের ব্যাপার হয়, তাহলে তো সেই অনুপাতে দামও অনেক বাড়বে। ঠিক আছে, বুকি ব্যাটা খানিক ভেবে মরুক, তারপর সেই একটা প্রস্তাব দিক, তখন বোঝা যাবে ঠিক কত দাম চাওয়া যেতে পারে।

দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ম্যাকক্লাস্কি দেখল তুর্ক সলো:কে তুলে নেবার সময় হয়েছে, কর্লিয়নিদের সাথে কথা বলার জন্যে কোথায় যে কে নিয়ে যেতে হবে। পোশাক পাল্টে ইউনিফর্ম পরল সে, স্ত্রীকে ফোনে ডেকে বলে দিল আজ রাতে বাড়িতে খাবে না, জুরুরী একটা কাজে যাচ্ছে সে, ফিরতে দেরি হবে। পেশা সংক্রান্ত কোন কথা স্ত্রীকে কখনও জানায় না সে, তার কারণ স্ত্রীর ধারণা পুলিশ স্বামীর বেতনেকটাকাতেই তাদের সংসারে এই সচ্ছলতা। আপন মনে হাসল সে, মনে পড়ে গেছে তার মায়েরও এই রকম ধারণা ছিল। কিন্তু তার নিজের ব্যাপারটা আলাদা, খুব কম বয়সেই সব শেখা হয়ে গিয়েছিল তার। বাবাই তাকে পথ চিনিয়ে ছিলেন।

পুলিশ সার্জেন্ট ছিলেন বাবা। ছেলেকে সাথে নিয়ে হপ্তায় ছয়বার নিজের এলাকায় যেতেন তিনি, দোকানদারদেরকে বলতেন, এটি আমার ছেলে। দোকানদাররা ওর গায়ে মাথায় আদরের হাত বুলাত, ওর সাথে করমর্দন করত, ওর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করত, পাঁচ-দশ ডলার উপহারও দিত। দিনের শেষে দেখা যেত, খুদে ম্যাকক্লাস্কির সবগুলো পকেট কাগুঁজে নোটে বোঝাই হয়ে গেছে। ছোট তো, তাই ভাবত যে তার বাবার বন্ধুরা এত ভাল আর ধনী যে যতবার দেখা হয় ততবারই তাকে টাকা উপহার দেয়। টাকাগুলো ব্যাংকে তার নামে জমা রাখতেন বাবা, তার কলেজের খরচ মেটানো হবে বলে। খোকা মার্কের কপালে বড়জোর পঞ্চাশ সেন্ট জুটত হত-খরচের জন্যে।

বাড়িতে পুলিশ কাকারা জানতে চাইত, বড় হলে তুমি কি হবে? সাথে সাথে জবাব দিত সে, পুলিশ হব। গলা ছেড়ে হাসত সবাই। বাবার ইচ্ছা ছিল আগে কলেজের পড়া শেষ করুক সে, তারপর না হয় পুলিশেই ভর্তি হবে, কিন্তু হাই স্কুল শেষ করেই পুলিশে ঢোকার জন্যে পড়াশোনা শুরু করে দিল সে।

পুলিশ হিসেবে খুব সাহসী আর কড়া ম্যাকক্লাস্কি, প্রথম দিকে রাস্তার মোড়ে যত গুণ্ডা আর রংবাজ শয়তানি করে বেড়াত তারা ওকে আসতে দেখলেই ছুটে পালাতে দিশা পেত না। টিকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তারা ওর এলাকা ছেড়েই চলে গেছে। ওর বিচক্ষণতারও প্রশংসা করতে হয়, নিজের ছেলেকে কখনও দোকানদারদের কাছে নিয়ে যায় না। ঘুষ খায়, নিজেই হাত পেতে খায়। আর সব পুলিশের মত পায়ে হেঁটে টহল দেবার সময় শীতের ভয়ে সিনেমায় বা কোন রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়বে না সে। ব্যবসায়ী আর দোকানদারদের নিরাপত্তার দিকটা তো দেখেই, তাদের অনেক সুবিধেও করে দেয়। মদ্যপ মাতাল, আর গুণ্ডা পাণ্ডারা বাওয়ারির দিক থেকে ওর এলাকায় এসে উৎপাত শুরু করলে রক্ষচক্ষু মেলে এমনভাবে তাড়া করে যে বাছাধনেরা ভুলেও আর এদিকে পা বাড়াতে সাহস পায় না। এসব কারণে দোকানদাররা তার প্রতি কৃতজ্ঞ।

সব ব্যাপারে একটা নিয়ম মেনে চলতে চেষ্টা করে ম্যাকক্লাস্কি। তার এলাকার বুকিরা সবাই জানে নিজে বেশি লাভ করার জন্যে সে কখনও ওদেরকে বিপদে ফেলবে না। থানার কমিশনের বরাদ্দ ভাগ নিয়েই খুশি সে। আসলে কাজে ফাঁকি দেয় না লোকটা, ঘুষ খায় ন্যায্য ভাবে, তাই চাকরিতে তার পদোন্নতি নিয়মিত ভাবেই হয়ে আসছে।

চারটে ছেলে নিয়ে বড় একটা পরিবার প্রতিপালন করছে সে। ছেলেদের কাউকে পুলিশে পাঠায়নি। সকলেই ফর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। ক্যাপ্টেনের পদে ওঠার পর তার পরিবারকে কখনও অভাবের মুখ দেখতে হয়নি। তবে একটা সময় এল যখন সবাই বলতে শুরু করল যে ম্যাকক্লাস্কির টাকার বাইবেড়ে গেছে। শহরের আর সব এলাকার চেয়ে তার এলাকার বুকমেকারদেরকে বেশি ঘুষ দিতে হচ্ছে। এর কারণ সম্ভবত চারটে ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ যোগাবার জন্যে একটু বেশি লোভী হয়ে উঠতে হয়েছে তাকে।

ম্যাকক্লাস্কির পুরানো বন্ধুর মধ্যে একজন হলো ব্রুনো টাটাগ্লিয়া। তার এক ছেলের সাথে নো ফর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটিতে পড়েছে। পড়া শেষ করে একটা নাইট-ক্লাব খুলেছে ব্রুনো, কখনও যদি সপরিবারে শহরে বেড়াতে আসে ম্যাকক্কাস্কি, এই নাইট-ক্লাবে নিখরচায় ভুরিভোজন আর ক্যাবারে শো তার উপরি পাওনা হয়। প্রত্যেক নতুন বছরের আগের সন্ধ্যায় ম্যানেজমেন্টের তরফ থেকে মেহমান হবার জন্যে এনগ্রেভ করা দাওয়াতপত্র পায় তারা। তাদের জন্যে সবচেয়ে ভাল টেবিলগুলোর একটা বেছে রাখা হয়। ব্রুনোর উদ্দেশ্য ছিল ওর নাইটক্লাবে নাম করা যে সব মেহমানরা নাচ-গান করতে আসে তাদের সাথে ম্যাককারি। পরিচয় করিয়ে দেয়া। পরিচয় হয়। এদের মধ্যে অনেকে হলিউডের বিখ্যাত গাইয়ে আর তারকাও আছে। তবে মাঝেসাঝে ছোটখাটো ব্যাপারে সাহায্য দরকার হয় ব্রুনোর। হয়তো ক্যাবারেতে কাজ করার লাইসেন্স পাবার জন্যে কোন মেয়ে-কর্মীর রেকর্ড অনুমোদিত হওয়া দরকার, অথচ সুন্দরী মেয়েকমটির নামে পুলিশের খাতায় খারাপ রেকর্ড আছে। এ-ধরনের কাজ খুশির সাথেই করে দেয় ম্যাকক্লাস্কি।

কারও কীর্তিকলাপ সম্পর্কে যদি কিছু টের পায় তা তাকে বা আর কাউকে বুঝতে দেয় না সে। তাই সলোযো যখন তাকে অনুরোধ করল যে ডন কর্লিয়নিকে হাসপাতালে অরক্ষিত অবস্থায় রাখতে হবে, কোন প্রশ্ন করেনি সে। কিন্তু কাজটার জন্যে কত টাকা পাবে তা জেনে নিতেও ভুল করেনি। সলোযো দশ হাজার ডলারের কথা বলতেই সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল তার কাছে। কাজটা করে। দেবার প্রতিশ্রুতি দিতে কোনরকম ইতস্তত ভাক দেখায়নি সে। তার জানা আছে, ডন কর্লিয়নি দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী মাফিয়া দলের মাথা। তার যত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক আছে, আল কাপুরও তা নেই। তার বিশ্বাস, এই লোককে খতম করা গেলে দেশের একটা মস্ত উপকার হবে। অগ্রিম টাকা নিয়ে নিখুঁতভাবে সলোযোর কাজটা করে দিল সে।

কিন্তু খানিক পর সলোযো খবর দিল এখনও কর্লিয়নিদের দুজন লোক হাসপাতালে রয়েছে, খবরটা শুনে প্রচণ্ড রাগে প্রায় অন্ধ হয়ে গেল ম্যাককুাস্কি। টেসিওর সব লোককে কয়েদ করেছে সে, ডন কর্লিয়নির কামরার দরজা থেকে সরিয়ে দিয়েছে ডিটেকটিভদেরকে, অথচ এখন কিনা দশ হাজার ডলার ফিরিয়ে দিতে হবে তাকে। এই রাগেই হাসপাতালে মাইকেলকে ঘুসি মেরেছিল সে।

তবে শেষ পর্যন্ত যা হবার তা ভালই হয়েছে। টাটাগ্লিয়া নাইটক্লাবে তার সাথে দেখা হয়েছিল সলোযোর, এবং ওর সাথে আগের চেয়ে লাভজনক রফায় পৌঁছানো গেছে। এবারও কোন প্রশ্ন করেনি সে, শুধু টাকার ব্যাপারটা জেনে নিয়েছে। ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি সে এর মধ্যে তার জন্যে কোন বিপদ থাকতে পারে। তা ভাবার কোন কারণও নেই। অতি বড় দুঃসাহসীও একজন পুলিশ ক্যাপ্টেনকে খুন করার কথা ভাবতে পারে না। মাফিয়াদের সবচেয়ে শক্তিশালী গুণ্ডাও নিচু স্তরের একজন পুলিশের চড় খেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, এটাই স্বাভাবিক। আসনে পুলিশ মেরে লাভ নেই। তেমন ঘটনা যদি ঘটে শুধু শুধু একগাদা গুণ্ডা গ্রেফতার এড়াতে গিয়ে গুলি খেয়ে মারা পড়বে। এ ধরনের ব্যাপারে পুলিশ বিভাগ কখনও আপস করবে না। গোলমালটা লেগেই থাকবে, এর কোন সুরাহা হবে না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে থানা থেকে বেরুবার জন্যে তৈরি হচ্ছে ম্যাকক্লাস্কি। মাথার ভিতর নানা সমস্যা গিজগিজ করছে তার। সবে আয়ারল্যাণ্ডে মারা গেছে তার শ্যালিকা, ক্যানসার বাধিয়ে প্রচুর টাকা খসিয়ে দিয়ে গেছে তার, এখন তাকে কবর দেবার জন্যে আরও টাকা খরচ করতে হবে। দেশে রয়েছে বুড়ো কাকা আর ফুফুরা, তাদেরও সাহায্য করতে হয়। যাই হোক, হাতে এতগুলো টাকা এসে যাচ্ছে, এবার স্ত্রীকে নিয়ে আরেকবার দেশে যাওয়া যেতে পারে, বিশেষ করে যুদ্ধ যখন থেমে গেছে। তাকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে তা একজন কেরানীকে জানিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে। কোনরকম সতর্কতা অবলম্বন করার কথা ভাবল না। যদি প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন বললেই হবে যে সলোযো কিছু তথ্য দেবে বলে ডেকে পাঠিয়েছিল। একটা ট্যাক্সি নিয়ে সনোযোর দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী একটা বাড়িতে এসে পৌঁছল সে।

.

মাইকেলের দেশ ত্যাগের সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে টম হেগেন। নকল পাসপোর্ট, ন্যাভাল কার্ড, একটা ইতালীয় মালবাহী জাহাজে ওর জন্যে বার্থ—সব ব্যবস্থা সারা। একটা সিসিলীয় বন্দরে গিয়ে পৌঁছুবে জাহাজটা। এরই মধ্যে প্লেনে চড়ে ওদের অনুচর চলে গেছে, সে সিসিলির পাহাড়ী এলাকার একজন মাফিয়া নেতার কাছে মাইকেলের লুকিয়ে থাকার ব্যবস্থা করবে।

একটা গাড়ি আর একজন অতি বিশ্বস্ত ড্রাইভারের বন্দোবস্ত করে রেখেছে সনি। সলোযোর সাথে যে রেস্তোরাঁয় দেখা করার ব্যবস্থা হয়েছে সেখান থেকে বেরিয়েই ওই গাড়িতে উঠতে পারবে মাইকেল। ড্রাইভার স্বয়ং টেসিও। নিজে যেচে পড়ে কাজটা নিয়েছে ও। গাড়িটার চেহারা খুবই খারাপ, যেন যে-কোন মুহূর্তে ভেঙে পড়বে, কিন্তু এঞ্জিনটা প্রায় আনকোরা নতুন। নকল লাইসেন্স প্লেট ঝুলানো থাকবে গাড়িতে, কেউ এর হদিস খুঁজে বের করতে পারবে না। এই গাড়িটা তুলৈ রাখা হয়েছিল বিশেষ প্রয়োজনের কথা মনে রেখেই।

যে পিস্তলটা ওকে দেয়া হবে সেটা ক্লেমেঞ্জার সাথে প্র্যাকটিস করে দিনটা কাটল মাইকেলের। ২২ পিস্তলটায় নরম নাকের বুলেট ভরা হয়েছে, বৈশিষ্ট্য হলো ঢোকার সময় পিন ফোঁটার খুদে ফুটো আর বেরুবার সময় বিরাট হাঁ করা গর্ত তৈরি করে। প্র্যাকটিস করতে গিয়ে মাইকেল আবিষ্কার করল টার্গেটের কাছ থেকে পাঁচ পা দূরে থাকলে লক্ষ্য অব্যর্থ হয়। এর চেয়ে দূর থেকে গুলি ছুঁড়লে গুলিটা, এদিক সেদিক সরে যেতে চায়। ট্রিগারটা বড় শক্ত, তরে কয়েকটা যন্ত্র দিয়ে ঠোকাঠুকি করে সেটাকে ঢিলে করে দিল ক্লেমেঞ্জা। আগেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, বিস্ফোরণের শব্দ চাপা দেয়া হবে না। পরিস্থিতিটা বুঝতে না পেরে কোন নির্দোষ পথিক মিছেমিছি বীরত্ব, দেখাবার অর্থাৎ নাক গলাবার চেষ্টা করুক তা ওরা চায় না। পিস্তলের আওয়াজ শুনতে পেলে মাইকেলের কাছ থেকে দূরে সরে থাকবে তারা।

মাইকেলকে তালিম দেবার সময় বার বার পাখি-পড়ানো করছে ক্লেমেঞ্জা, গুলি করা হয়ে গেলেই হাত থেকে ফেলে দিবে পিস্তলটা। শরীরের পাশে ঝুলিয়ে দেবে হাতটা, ছুঁড়ে নয়, বেফ ছেড়ে দেবে পিস্তলটা। কেউ দেখতে পাবে না। সবাই মনে করবে তখনও তোমার হাতে আছে সেটা। কারণ সবাই ওরা তাকিয়ে থাকবে তোমার মুখের দিকে। তারপর? অভয় দিয়ে মিটিমিটি হাসছে ক্লেমেঞ্জা।

তারপর, আবার বলতে শুরু করল সে, খুব তাড়াতাড়ি, হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে আসবে ওখান থেকে। কিন্তু খবরদার, দৌড় দেবে না। সরাসরি কারও চোখের দিকে তাকাবে না, আবার কারও দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেবারও দরকার নেই। বিশ্বাস করো, ওরা সবাই ভয় করবে তোমাকে যমের মত। কেউ বাধা দিতে এগিয়ে আসবে না। বাইরে বেরিয়ে এসেই দেখবে গাড়ি নিয়ে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে টেসিও। দ্রুত উঠে বসবে তুমি, তারপর আর কিছু করার নেই তোমার, বাকিটা টেসিওর ওপর নিশ্চিন্তে ছেড়ে দিয়ে। দুর্ঘটনা ঘটবে মনে করে ভয় কোরো না। এই আমি বলছি এসব এমন সুই আর সহজভাবে সমাধা হবে যে দেখে তুমি অবাক হয়ে যাবে। এই টুপিটা পরো এবার। দেখি কেমন মানায়।

ছাই রঙের একটা ফিডরা টুপি মাইকেলকে পরিয়ে দিল ক্লেমেঞ্জা। মুখ বাঁকাল মাইকেল, টুপি পরার অভ্যাস নেই ওর।

ওকে আশ্বাস দিয়ে ক্লেমেঞ্জা বলল, সে-রকম পরিস্থিতি যদি দেখা দেয়, এই টুপি থাকায় তোমাকে চিনতে অসুবিধে হবে। সাধারণত সাক্ষীদেরকে যদি আমাদের অনুকূলে কথা বলতে রাজি করাতে পারি, এই টুপি তখন ওদের মত পাল্টাবার একটা অছিলা এনে দেয়। মনে রেখো, আঙুলের ছাপ নিয়ে মাখা ঘামাতে হবে না তোমাকে। পিস্তলের ট্রিগার আর হাতলে বিশেষ টেপ লাগানো থাকছে। তবে পিলের অন্য কোথাও হাত দিয়ো না।

সনি কি জানতে পেরেছে আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে সলোযো? প্রশ্ন করুল মাইকেল।

মৃদু কাঁধ ঝাঁকাল ক্লেমেঞ্জা। বলল, না, এখনও জানতে পারেনি। সাংঘাতিক সতর্কতার সাথে কাজ করছে সলোযো। কিন্তু তাই বলে ভেব না সে তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে। তুমি না ফেরা পর্যন্ত তো মধ্যস্থতাকারী আমাদের হাতে থাকছেই। তোমার কিছু হলে ওকে তার দাম দিতে হবে।

সে বিপদের ঝুঁকি নিচ্ছে কেন? জানতে চাইল মাইকেল।

মোটা লাভ পাবে, তাই। ছোটখাটো একটা রাজার ভাণ্ডার বলতে পারো। তাছাড়া, পরিবারগুলোর মধ্যে এই লোকের যথেষ্ট সম্মান রয়েছে, সে জানে, তার কোন ক্ষতি হতে দেবার সাধ্য সলোযোর নেই। আসলে এই মধ্যস্থর্টির প্রাণের মূল্য তোমার প্রাণের মূল্যের চেয়ে বেশি। পানির মত সহজ ব্যাপার। কোন বিপদ হতে পারে না তোমার। পরে অবশ্য যা করছি সেজন্য আমাদেরকে ভূগতে হবে।

অবস্থা কতটা খারাপ দাঁড়াবে বলে মনে করো তুমি? জানতে চাইল মাইকেল।

যতটা খারাপ হতে পারে, বলল ক্লেমেঞ্জা! কর্লিয়নিদের সাথে টাটাগ্লিয়া পরিবারের সামগ্রিক যুদ্ধ। অন্যান্য পরিবারগুলো প্রায় সবাই ওদের ক্ষ নেবে। প্রচণ্ড শীতে স্বাস্থ্য সংরক্ষণ বিভাগকে এক গাদা লাশ সরাতে হবে। শ্রাগ করে একটু গম্ভীর হলো ক্লেমেঞ্জা। সাধারণত দশ বছর পর পর একবার করে এইধরনের গোলমাল দেখা দেয়। ব্যাপারটা ঠিক খারাপ না, এতে দৃষিত রক্ত সব দূর হয়ে যায়। আমরা ওদেরকে এমনিতে ছেড়ে দিতে পারি না। কারণ ছোটখাটো ব্যাপারে ওদের কাছে যদি হার মানি, একেবারে পেয়ে বসবে ওরা আমাদেরকে, আমাদের যথাসর্ব গিলে নিতে চাইবে। প্রথমেই ওদের জড় কেটে দেয়া ভাল। ঠিক যেমন উচিত ছিল মিউনিকেই হিটলারের জড় কেটে দেয়া ওখানে তাকে ছেড়ে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি।

মাইকেলের মনে আছে, উনিশশো উনচল্লিশ সালে যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে, বাবাও এই কথা বলত। নিঃশব্দে হেসে ভাবল সে, নিউ ইয়র্কের পাঁচ পরিবারের হাতে যদি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব থাকত তাহলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ঘটতই না।

প্রাঙ্গণে ডনের বাড়িতে ফিরে এল ওরা, এখনও এটা সনির হেডকোয়ার্টার। ভাবছে মাইকেল, আর কত দিন প্রাঙ্গণের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে পারবে সনি? বেরুতে তো ওকে হবেই।

দুপুরে দেরি করে খেয়েছে সনি, একটা কফি টেবিলে অভুক্ত খাবার পড়ে আছে-স্টেকের টুকরো, রুটির ছাল, আধ বোতল হুইস্কি। একটা কাউচে শুয়ে আছে সনি, ঘুমাচ্ছে সে।

ডরে পরিষ্কার কামরাটা নোংরা হয়ে গেছে। বড় ভাইকে ধরে ঝাঁকি দিয়ে জাগাল মাইকেল। বলল, এই রকম ছন্নছাড়ার মত কত দিন থাকবে আর এখানে? জায়গাটা একটু পরিষ্কার করিয়ে নিলে তো পারো।

একটা হাই তুলল সনি এ্যাই, তুই কি এখানে ব্যারাক পরিদর্শনে এসেছিস? মাইক, চিন্তায় আছি রে, এখনও খবর পেলাম না কোথায়, তোকে নিয়ে যাবে সলোগো ব্যাটা। তা না জানতে পারলে পিস্তলটা কিভাবে পৌঁছে দেব তোর কাছে!

সাথে নিতে পারব না? জানতে চাইল মাইকেল। ওরা হয়তো আমাকে সার্চ করবে না। অথবা আমরা যদি তেমন বুদ্ধি খরচ করি, ওরা টেরও পাবে না। আর যদি টের পায়ও, কি এসে যায় তাতে? কেড়ে নেবে, এই তো, তা নিক।

এদিক ওদিক মাথা নাড়ল সনি। বলল, না। সলোযো শয়তানটাকে এই সুযোগে খতম না করলেই নয়। মনে রাখিস, যদি সম্ভব হয় ওকেই আগে মারবি। ম্যাকক্লাস্কিবোকা, সে আরও আস্তে ধীরে নড়াচড়া করে। তাকে খতম করার যথেষ্ট সময় পাবি তুই। পিস্তলটা মাটিতে ফেলে দিতে হবে এ-কথা তোকে বলেছে ক্লেমেঞ্জা?

কম করেও দশ লক্ষ বার বলেছে, বলল মাইকেল।

সোফা থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙল সনি। তোর চোয়ালের নতুন কোন খবর আছে নাকি?

আগের মতই, ভাল না, বলল মাইকেল। ওর মুখের বাঁ দিকের খানিকটা অসাড় হয়ে আছে, তার কারণ ভাঙা চোয়াল বাধা হয়েছে ওষুধ মাখা তার দিয়ে, মুখের বাকি অংশ টনটন করছে ব্যথায়। হুইস্কির বোতলটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে লম্বা একটা চুমুক দিতে একটু কমল ব্যথা।

সাবধান, মাইক, বলল, সনি, মদ খেয়ে হাতের টিপ কমাবার সময় নয় এটা।

হয়েছে, হয়েছে। তোমাকে আর দাদাগিরি ফলাতে হবে না, সনি। আরও সঙ্গীন অবস্থায় সলোযোর চেয়ে ধুরন্ধর শত্রুর সাথে লড়াই করার অভিজ্ঞতা আছে আমার। ওর মর্টার আছে? মাথার ওপর ফাইটার বিমান আছে? ভারি কামান, ল্যাণ্ড লাইন? ও তো স্রেফ একটা অতি চালাক বেজন্ম, আর সঙ্গীটা তার অযোগ্য এক পেয়াদা। একবার যদি মন ঠিক করে ফেলা যায় যে ব্যাটাদের মারতে হবে, ব্যস, হয়ে গেল, তারপর আর কোন সমস্যা নেই। কে যে ওদেরকে খতম করল তা টেরই পাবে না।

ঝনঝন শব্দে বেজে উঠল ফোন। একহাতে রিসিভার ধরে আরেক হাত এমন ভারে তুলল সনি, যেন ওদেরকে চুপ করে থাকতে বলছে, যদিও কেউই কোন কথা বলছে না ওরা। একটা প্যাডে কিছু টুকে নিল সনি। ঠিক আছে, ওখানে যাবে ও, বলে রিসিভার নামিয়ে রাখল ও।

হাসছে সনি। বলল, শালা মহাশয়তান, সলোযোর কথা বলছি। কি ব্যবস্থা করেছে সে, শোনো। ও আর ক্যাপ্টেন ম্যাককাঙ্কি আজ রাত আটটার সময় ডওঁয়ের ওপর জ্যাক ডেম্পলির বারের সামনে থেকে তুলে নেবে মাইকেলকে। ওখান থেকে ওদের নির্বাচিত কোন জায়গায় যাবে ওরা আলোচনার জন্যে। আরও ব্যাপার আছে। মাইক কথা বলবে সলোযোর সাথে, অন্য কোন ভাষায় নয়, ইতালীয় ভাষায়। এই ব্যবস্থার একমাত্র কারণ আলোচনাটা ক্যাপ্টেনকে বুঝতে দিতে চায় না। সে। প্রসঙ্গক্রমে বলল, ক্যাপ্টেন, ইতালী ভাষার একটা বর্ণও বোঝে না। আরও বলল, তুমি যে সিসিলীয় পর-ভাবাও বোঝো সে-খবরও রাখে ও।

বুঝি, তবে খুব ভাল বুঝি না। যাই হোক, বেশিক্ষণ তো আর কথা বলতে হবে না, নীরস গলায় বলল মাইকেল।

জামিন লোকটা আগে আসবে, তারপর আমরা মাইককে ছাড়ব, ঠিক তো? জানতে চাইল টম হেগেন।

মাথা নেড়ে সায় দিল ক্লেমেঞ্জা । এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে সে, আমার বাড়িতে বসে আমার তিনজন লোকের সাথে পিকল খেলছে। আমার কাছ থেকে হুকুম পেলে তবে তাকে ছাড়বে ওরা।

আরাম কেদারায় বসে হেলান দিল সনি। আলোচনার জায়গাটা চেনার কি উপায় তাহলে? টম, আমাদের চর তো টাটাঙ্গিয়া পরিবারের মধ্যেই রয়েছে, তারা কোন খবর দিচ্ছে না, ব্যাপারটা কি?

শ্রাগ করে হেগেন বলল, এ ব্যাপারে সম্ভাব্য সব রকম সতর্কতা অবলম্বন করে কাজ করছে সলোযো, এমন কি নিরাপত্তার জন্যেও কোন লোক রাখছে না। তার ধারণা সাথে ক্যাপ্টেন থাকলেই যথেষ্ট, এক ডজন বন্দুকধারী যে নিরাপত্তা দিতে পারে তার চেয়ে বেশি নিরাপত্তা পেয়ে যাচ্ছে সে। তার এই ধারণা যুক্তিসঙ্গত তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখন একমাত্র উপায় যা দেখতে পাচ্ছি, মাইকের পিছনে ফেউ লাগিয়ে আশায় আশায় থাকতে হবে আমাদেরকে।

এদিক ওদিক মাথা নাড়ল সনি। উঁহু, যে-কেউ ইচ্ছা করলে ঝেড়ে ফেলতে পারে ফেউ। ফেউ পিছু নিয়েছে কিনা তা ওরা প্রথমেই দেখে নেবে।

শেষ বিকেলে পৌঁছে গেছে বেলা, পাঁচটা বাজে। কপালে চিন্তার রেখা, উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে সনিকে। তাহলে বোধ হয় মাইকেলকে গাড়িতে তুলে নেবার জন্যে যে আসবে তাকে গুলি করাই ভাল।

কিন্তু গাড়িতে যদি না থাকে সলোযো? বলল হেগেন। তাতে শুধু মিছিমিছি নিজেদের হাতের কার্ড দেখানো হয়ে যাবে। কি যন্ত্রণা, ওরা কোথায় নিয়ে যাবে মাইককে সেটা তো জানা দরকার!

প্রকাণ্ড গম্ভীর মুখটাকে আরও গভীর করে তুলে বলল ক্লেমেঞ্জা, সলোযোই বা এত লুকোছাপা করছে কেন, সেটাও আমাদেরকে ভাল করে ভেবে চিন্তে দেখতে

বিরক্তির সাথে বলল মাইকেল, হারজিত বা লাভ-লোকসানের ব্যাপারটাই তো ওখানে। কিছু যদি গোপন করা সব হয়, কেনই বা জানাবে? তাছাড়া বিপদের গন্ধও কি পাচ্ছে না? পাশে পুলিশ ক্যাপ্টেন থাকলেও হাত-পা ঠাণ্ডা বরফ তার।

আঙুল মটকাচ্ছে হেগেন, বলল, আচ্ছা, সনি, ডিটেকটিভ ফিলিপসকে একবার ফোন করে দেখলে হয় না? ক্যাপ্টেনের সাথে যোগাযোগ করতে হলে কোথায় তাকে পাওয়া যাবে তা হয়তো সে বলতে পারবে। ও কোথায় যাচ্ছে না যাচ্ছে তা কেউ জাল কি না জাল তা মোটেও পরোয়া করবে না ম্যাকক্লাস্কি।

ফোন তুলে একটা নাম্বারে ডায়াল করুল সনি। চাপা কণ্ঠে কিছু বলে রিসিভারট্টা নামিয়ে রেখে দিল ও, বলল, একটু পর জানাবে।

ঝাড়া ত্রিশ মিনিট অপেক্ষা করার পর ফোনের বেল বেজে উঠল। রিসিভার তুলে ফিলিপসের কথা শুনছে সনি, প্যাডে নোট করছে দ্রুত। রিসিভার রেখে দিয়ে মুখ তুলে তাকাল সে, পেশীগুলো শক্ত হয়ে গেছে। বলল, মনে হচ্ছে পাওয়া গেছে। অভ্যাস মত আজও ম্যাকক্লাস্কি বলে গেছে কোথায় তাকে পাওয়া যাবে। ব্রঙ্কসে লুনা অ্যাজিওর রেস্তোরাঁয় থাকরে সে, আজ রাত আটটা থেকে দশটা পর্ষন্ত। কেউ চেনো নাকি জায়গাটা?

আমি চিনি, বলল টেসিও। আমাদের জন্যে খুব ভাল জায়গা। ছোট একটা ঘরোয়া পরিবেশ, কেবিনগুলো বেশ বড় বড়, নিরিবিলিতে কথা বলার আদর্শ জায়গা। ওখানের খাবারটাও খুব ভাল। যে যার নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে ওখানে সরাই। ভালই হয়েছে। সনির ডেস্কের ওপর ঝুঁকে পড়ে কয়েকটা পোড়া সিগারেটের টুকরো দিয়ে একটা নকশা তৈরি করছে সে। এটা প্রবেশ পথ। মাইক, কাজ শেষ করে বা দিকে ঘুরতে হবে তোমাকে, তারপর একটা মোড়নেবে। আমি খুঁজে নেব তোমাকে, গাড়ির হেডলাইট জেলে রাখব, চলন্ত গাড়িতে ছুটে উঠে পড়বে তুমি। কোন অসুবিধে দেখতে পেলে চিৎকার করবে। ভেতরে গিয়ে। তোমাকে আমি বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করব। ক্লেমেঞ্জা, খুব তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে তোমাকে। দেরি না করে পিস্তল রেখে আসার জন্যে ওখানে কাউকে পাঠিয়ে দাও। ওখানে যে ল্যাট্রিনটা আছে সেটা সেকেলে..ধরনের, পানির টাঙ্কি আর দেওয়ালের মাঝখানে একটু ফাঁকা জায়গা আছে.। পিস্তলটা টেপ দিয়ে ওখানে আটকে রেখে আসতে হবে তোমার লোককে। মাইকেলের দিকে ফিরল টেসিও। শোনো, মাইক, গাড়িতে তুমি ওঠার পর তোমাকে ওরা সার্চ করবে, যখন দেখবে তোমার কাছে অস্ত্র নেই, তারপর থেকে তোমার ব্যাপারে মাথা ঘামানো ছেড়ে দেবে ওরা। রেস্তোরাঁয় ঢুকে অপেক্ষা করবে তুমি, তারপর উঠে দাঁড়াবার অনুমতি চাইবে। সবচেয়ে ভাল হয় যদি ল্যাট্রিনে যেতে চাও। তার আগে এমন ভাব দেখাবে। যেন একটু অসুবিধে হচ্ছে তোমার। এ তো খুবই স্বাভাবিক। এতে সন্দেহ করার কিছুই থাকবে না ওদের। ল্যাট্রিন থেকে বেরিয়ে এসে মোটেও আর সময় নষ্ট করবে না। চেয়ারে বসতে যেয়ো না আবার ফিরে এসেই গুলি করতে শুরু করবে। কোন ঝুঁকি নেবার দরকার নেই। দুজনেরই মাথায় মারবে, প্রত্যেককে দুবার। তারপর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করবে।

টেসিওর সব কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনল সনি, তারপর ক্লেমেঞ্জাকে বলল, পিস্তল রেখে আসার জন্যে সবচেয়ে এক্সপার্ট লোককে পাঠানো হোক, আমি চাই না আমার ভাই ল্যাট্রিন থেকে খালি হাতে বেরিয়ে আসুক।

আত্মবিশ্বাসের সাথে জোর দিয়ে বলল ক্লেমেঞ্জা, পিস্তল ওখানে ঠিকই থাকবে।

বেশ, বলল সনি। যার যা কাজ শুরু করে দাও তাহলে।

বিদায় নিয়ে চলে গেল টেসিও আর ক্লেমেঞ্জা।

সনি, জানতে চাইল টম হেগেন, মাইকেলকে নিউ ইয়র্কে পৌঁছে দেয়া উচিত আমার?

না। এখানে চাই আমি তোমাকে। মাইকের কাজ শেষ হওয়া মাত্র শুরু হবে আমাদের কাজ। তোমাকে তখন দরকার হবে আমার। ভাল কথা, সাংবাদিকদের ব্যবস্থা করে রেখেছ তো?

ঘাড় কাত করে বলল হেগেন, ঘটনা ঘটতে শুরু হওয়া মাত্র ওদেরকে তথ্য দিতে শুরু করব আমি।

উঠে দাঁড়াল সনি। এগিয়ে এসে ছোট ভাইয়ের সামনে দাঁড়াল। মাইকেলের হাত ধরে নাড়া দিল সে, বলল, ঠিক হ্যায়, ভাইয়া। শুরু করে দে কাজ। মাকে। আমি বুঝিয়ে বলে দেব যাবার আগে কেন দেখা করে যেতে পারিসনি। তোর বান্ধবীকেও খবর পৌঁছে দেব, সময় হয়েছে বলে মনে করব যখন। কোন ব্যাপারে কিছু বলার আছে তোর?

সব ঠিক আছে, বলল মাইকেল। আবার কবে ফিরতে পারব বলে মনে করো?

এক বছরের আগে নয়।

ওদের কথার মাঝখানে হেগেন বলল, আমি মনে করি ডন সম্ভবত আরও আগে বন্দোবস্ত করতে পারবেন। কিন্তু সেটার ওপর আশা করে থেকো না, মাইক। কখন তোমার ফিরে আসার সময় হবে তা নির্ভর করে অন্যান্য অনেক বিষয়ের ওপর। খবরের কাগজে আমাদের বিবৃতি আমরা কতটা সাফল্যের সাথে ছাপাতে পারি, আর সব পরিবারগুলো গোটা ব্যাপারটা কতটা তীব্রভাবে নেয়, পুলিশ বিভাগ কি পরিমাণ ধামাচাপা দিতে রাজি হয়–আরও অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে ব্যাপারটা। প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি হবে, সাংঘাতিক উত্তপ্ত হয়ে উঠবে আবহাওয়া। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

টম হেগেনের সাথে হ্যাণ্ডশেক করল মাইকেল। বলল, যতটা পারো চেষ্টা করো। বাড়ি ছেড়ে আরও তিন বছর দূরে সরে থাকতে চাই না আমি।

নরম সুরে বলল, হেগেন, ভেবে দেখো, মাইক, পিছিয়ে আসার এখনও সময় আছে। তোমার বদলে আর কাউকে পাঠানো যায়, আর যারা রয়েছে তাদের কথা না হয় আরেকবার ভেবে দেখা যেতে পারে। হয়তো সোযোকে খুন করার সত্যি কোন দরকার নেই।

হাসল মাইকেল। নিজেদেরকে বোধহয় যা খুশি বোঝানো যায়। কিন্তু প্রথমে যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছি সেটাই ঠিক। আমি তো চিরকাল আরামই করে এসেছি, এবার একটু কাজ না করলে চলবে কেন?

ওই ভাঙা চোয়ালটা যেন খুব বেশি প্রভাবিত না করে তোমাকে। এক নম্বরের বোকা লোক ম্যাককাকি, তাছাড়া, ঘটনাটাও ব্যবসার স্বার্থে ঘটেছে, এর মধ্যে ব্যক্তিগত কিছু নেই।

এবার নিয়ে এই দ্বিতীয়বার দেখল হেগেন, নিমেষে মাইকেলের মুখটা জমাট পাথরের মত হয়ে গেল, ঠিক যেন ডনের মুখের হবহু প্রতিকৃতি।

টম, নিজেকে বোকা বানিয়ো না, বলল মাইকেল এর সমস্তটাই ব্যক্তিগত বিষয়, ব্যবসার প্রতিটি বিন্দুমাত্রই তাই। যে অপমান মানুষকে রোজ সারা জীবন ধরে হজম করতে হয় তার সবটুকুই নিখাদ ব্যক্তিগত ব্যাপার। তোমরা এটাকে ব্যবসা বলছ। বেশ, তাই। কিন্তু তবু নরকযন্ত্রণার মত সবটাই একান্ত ব্যক্তিগত। কার কাছ থেকে শিখেছি এ কথা, জানো? উন। আমার বাবা। গড ফাদার। তার কোন বন্ধুর মাথায় বজ্রাঘাত হলে বাবা সেটাকে ব্যক্তিগত ভাবে নেন। নৌ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলাম আমি, বাবা সেটাকে ব্যক্তিগত ভাবে নিয়েছিলেন। তাই তিনি মহৎ। সেজন্যেই তিনি মহান ডন। যাই ঘটুক, সব তাকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করে। সৃষ্টিকর্তার মত চড়ুই পাখির লেজ থেকে যদি একটা পালক খসে পড়ে, তাও তিনি জানতে পারেন, কোন চুলোয় গেল সেটা তাও তার অজানা থাকে না। ঠিক? আর কি জানো? দুর্ঘটনাকে যারা ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেয় তাদের জীবনে কখনও দুর্ঘটনা ঘটে না। স্বীকার করি, দেরিতে এসেছি, কিন্তু সবটা পথ পেরিয়ে এসেছি আমি। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, ভাঙা চোয়ালটাকে ব্যক্তিগতভাবে নিচ্ছি আমি। হ্যাঁ, বাবাকে মারার জন্যে সোযোর এই যে নাছোড় চেষ্টা, এটাকে ব্যক্তিগত ভাবে নিচ্ছি! হাসল মাইকেল। গড ফাদারকে জানিয়ো এসব আমি তার কাছেই শিখেছি। আর, জানাতে ভুলো না, তিনি যে আমার জন্যে এত কিছু করেছেন, তার বিনিময়ে সামান্য কিছু করার এই সুযোগটা পেয়ে আমি ভীষণ সুখী। বাবা আমার খুব ভাল মানুষ।

একটু থেমে, চিন্তিতভাবে আবার হেগেনকে বলল মাইকেল, জানোবাবা আমাকে কবে মেরেছেন তা আমি মনে করতে পারি না।-সনি বা ফ্রেডিকেও মেরেছেন বলে মনে পড়ে না। আর কনিকে তো জোরে বকেননি পর্যন্ত। ঠিক করে বলো তো, টম, কয়জন লোককেই বা খুন করেছেন ডন বা করিয়েছেন?

অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে টম হেগেন বলল, আমিও তোমাকে একটা জিনিস মনে করিয়ে দিচ্ছি, যা তোমার বাবার কাছ থেকে শেখোনি তুমি–এখন যেভাবে কথা বলছ,। এমন অনেক ব্যাপার আছে যা শুধু কাজ করে দেখাতে হয়, করতে হয়, তা নিয়ে কথা বলতে হয় না, সেটার ন্যায্যতা প্রমাণ করার চেষ্টা করতে হয় না। আসলে তা প্রমাণ করা যায় না। কাজটা শুধু করে ফেলতে হয়। এবং তারপর ভুলে যেতে হয়।

ভুরু কুঁচকে উঠল মাইকেল কর্লিয়নির। শান্ত গলায় জানতে চাইল সে, কনসিলিয়রি হিসেবে স্বীকার করো তুমি সলোযোকে বাঁচিয়ে রাখা বাবা, আর আমাদের পরির্বারের জন্যে বিপদজনক?

হ্যাঁ, বলল হেগেন।

ঠিক আছে, বলল মাইকেল, তাহলে সলোযোকে খুন করতেই হয় আমার।

২.৪ জ্যাক ডেম্পসির রেস্তোরাঁ

০৪.

ব্রডওয়েতে, জ্যাক ডেম্পসির রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করছে মাইকেলরিস্টওয়াচ দেখল ও, আটটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। ঠিক সময় মতই আসবে সলোঁযো! ইচ্ছা করেই হাতে একটু বেশি সময় রেখেছে মাইকেল। প্রায় মিনিট পনেরো হলো এখানে অপেক্ষা করছে ও।

লং বীচ থেকে শহরে আসার পথে হেগেনকে বলা ওর কথাগুলো ভুলতে চেষ্টা করেছে মাইকেল, কারণ যা সে বলেছে তা যদি বিশ্বাস করে থাকে তাহলে দুড়ে দেয়া একটা ঢিলে পরিণত হয়েছে তার জীবন, অপ্রতিহত গতিতে এখন শুধু ছুটে যাওয়া, থেমে যাবার উপায় নেই। আজ রাতের পর অন্য আর কিছু আশা করা যায় কি? এসব আজেবাজে চিন্তা মাথা থেকে না সরালে আজ রাতে ওর মৃত্যুও হতে পারে, গভীরভাবে ভাবল মাইকেল। সামনে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে, যেটা সম্পূর্ণ মনোযোগ দাবি করে। নিষ্প্রাণ পুতুল নয় সলোযো, আর ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কিকেও হালকা ভাবে নেয়া উচিত হবে না। তার দিয়ে বাঁধা চোয়ালে ব্যথা অনুভব করছে, ব্যথাটাকে স্বাগত জানাল ও, এর জন্যেই সজাগ থাকতে হবে তাকে।

থিয়েটার ভাঙার সময় হলেও ঠাণ্ডা শীতের রাতে তেমন ভিড় নেই ব্রডওয়েতে। লম্বা কালো একটা গাড়ি ফুটপাথের কিনারা ঘেঁষে থামতেই কুঁকড়ে উঠল মাইকেল। দরজা খুলে বাইরের দিকে ঝুঁকে ড্রাইভার বলল, উঠে এসো, মাইক। ড্রাইভারকে চেনে না মাইকেল। ছোকরা রঙবাজের মাথায় একরাশ কালো চুল, গায়ে বুক খোলা শার্ট, তবু গাড়িতে উঠল মাইকেল। তারপর দেখল পিছনের সীটে বসে রয়েছে ক্যাপ্টেন ম্যাককুাস্কি আর সলোযো।

সীটের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল সলোযো, হ্যাণ্ডশেক করল মাইকেল। স্থির, গরম, শুকনো একটা হাত। তুমি এসেছ, সেজন্যে আমি খুব খুশি হয়েছি, মাইক, বলল সলোযো। আশা করি আমরা সব মিটিয়ে ফেলতে পারব। গোটা ব্যাপারটা সাংঘাতিক এক পর্যায়ে চলে গেছে, পরিস্থিতি যে এরকম দাঁড়াবে তা আমি আদৌ ভাবিনি, চাইওনি। আসল কথা, এমনটি হওয়া উচিত হয়নি।

অত্যন্ত শান্তভাবে বলল মাইকেল, আমিও আশা করি আজ রাতে সব ঠিক করে ফেলা যাবে। বাবাকে আবার বিরক্ত করা হোক তা আমি চাই না।

তাকে আর বিরক্ত করা হবে না, আন্তরিকতার সাথে বল সনোযো। মিথ্যে কথা বললে আমার ছেলে মেয়েদের মাথা খাব, তাকে আর বিরক্ত করা হবে না। আলোচনার সময় তুমি শুধু মনটাকে ভোলা রেখো। আশা করি সনির মত তোমারও মাখাটা গরম শ্ম। ওর এত রাগ যেকোন কাজের কথা তোলাই সম্ভব নয়।

ভারি, হেঁড়ে গলায় ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কি বলল, ছেলে হিসেবে এটি খুব ভাল, এর ব্যাপারে কোন চিন্তা নেই। সামনে একটু ঝুঁকে সস্নেহে মাইকলের কাঁধ চাপড়ে দিল সে। সেদিনের ঘটনার জন্যে আমি দুঃখিত, মাইক। এই কাজের জন্যে একটু বোধহয় বেশি বুড়ো হয়ে গেছি, মেজাজ ঠিক রাখতে পারি না। সভবত তাড়াতাড়ি অবসর নেয়া উচিত আমার। ঝামেলা একেবারেই সহ্য হয় না, সুখচ একের পর এক ঝামেলা লেগেই আছে। বোঝোই তো কি রকম.জালা! এরপর হতাশ ভঙ্গিতে একটা মস্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব ভালভাবে সার্চ করে দেখে নিল সে মাইকেলের কাছে কোন অস্ত্র আছে কিনা।

ড্রাইভারের মুখে মৃদু একটু হাসি লক্ষ করল মাইকেল। পশ্চিম দিকে যাচ্ছে ওরা, ভাব্য অনুসরণকারীকে খসিয়ে ফেলার কোন চেষ্টা লক্ষ করছে না মাইকেল। নানা ধরনের যানবাহনের মাঝখান দিয়ে ওয়েস্ট সাইড হাইওয়ে ধরে ছুটছে গাড়ি। কেউ পিছু নিয়ে থাকলে তাকেও এই রাস্তা ধরেআসতে হবে। হঠাৎ মন খারাপ হয়ে গেল মাইকেলের, কারণ জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজে ঢোকার পথটা ধরেছে গাড়ি। নিউ জার্সির দিকে যাচ্ছে ওরা। আলোচনায় বসার জায়গা সম্পর্কে যে খবর পেয়েছিল সনি সেটা তা হলে ভুয়া খবর ছিল! ভাবছে মাইকেল।

ব্রিজ পেরিয়ে এল গাড়ি, পিছনে পড়ে রইল আলোক মালায় সাজানো শহর। মুখের চেহারায় নির্বিকার একটা ভাব ফুটিয়ে রেখেছে মাইকেল। দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে ওরা তাকে পানিতে চুবিয়ে মেরে ফেলবে নাকি।ভাবছে ও। নাকি শেষ মুহূর্তে জায়গা বদল করেছে সলোযো? কিন্তু রাস্তার প্রায় সবটা পেরিয়ে এসে হুইল ধরে মোচড় দিল ড্রাইভার। শহরে ফিরে যাবার লেনগুলোকে আলাদা করে রেখেছে যে বেড়াটা সেটার সাথে ধাক্কা খেয়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠল ভারি গাড়িটা, প্রচণ্ড ঝাঁকি খেয়ে ফিরতি পথে ছুটতে শুরু করেছে। ঝট করে ঘাড় ফিরিয়ে পিছন দিকে তাকাল সোযযা আর ম্যাকাস্কি। ওদের মত আর কেউ বেড়া ডিঙাবার চেষ্টা করছে কিনা দেখছে। আবার নিউ ইয়র্কে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ড্রাইভার ওদেরকে। ঝড়ের বেগে ছুটছে গাড়ি। ব্রিজ পেরিয়ে বাক নিয়ে এখন ইস্ট ব্রঙ্কসের দিকে যাচ্ছে। রাস্তাটা এদিকে ছোট, বোঝাই যাচ্ছে কেউ পিছু নেয়নি। ইতিমধ্যে প্রায় নটা বেজে গেছে। ম্যাকক্লাস্কি, আর মাইকেলকে সিগারেট অফার করল সলোযো, কিন্তু ওরা কেউ নিল না, সে একাই ধরাল একটা। ড্রাইভারকে বলল, দারুণ দেখিয়েছ, ব্যাপারটা আমার মনে থাকবে।

দশ মিনিট পর ইতালীদের পাড়ায় ছোট একটা রেস্তোরাঁর সামনে থামল গাড়ি। রাস্তাটা একেবারে ফাঁকা, রাত হয়েছে, ভিতরেও মাত্র কয়েকজন লোক ডিনার খাচ্ছে। ড্রাইভারও ওদের সাথে ভিতরে ঢুকবে কিনা ভেবে দুশ্চিন্তা হচ্ছে। মাইকেলের। কিন্তু গাড়িতেই থেকে গেল সে। মধ্যস্থতাকারী লোকটা বা আর কেউ ড্রাইভারের উপস্থিতি সম্পর্কে কিছু বলেনি। নিয়মের কথা উঠলে, ড্রাইভারকে নিয়ে এসে চুক্তি ভেঙেছে সোয়য়া। মাইকেল সিদ্ধান্ত নিল প্রসঙ্গটা তুলবে না সে, জানে, না তুললে ওরা ভাববে ভয় পেয়েছে সে আলোচনা ভেঙে যাবার ঝুঁকি নিতে।

কেবিনে বসতে রাজি হলো না সলোযো, তাই কামরার একমাত্র গোল টেবিলটায় বসল ওরা তিনজন। এখন আর মাত্র দুজন লোক আছে রেস্তোরাঁয়। মাইকেল ভাবছে, এরা সোযোরই লোক কিনা। তা হলেও কিছু এসে যাবে না, ওরা নাক গলাবার আগেই ঝামেলা চুকিয়ে ফেলবে সে।

এখানের ইতালীয় খাবার নাকি খুব ভাল? অকৃত্রিম আগ্রহের সাথে জানতে চাইল ম্যাকক্লাস্কি।

ভীলটা খেয়ে দেখো, সায় দিয়ে বলল সনোযো, এত ভাল নিউ ইয়র্কের কোথাও পাবে না।

একজন মাত্র ওয়েইটার, ওদের জন্যে ওয়াইন নিয়ে এসে বোতলের ছিপি খুলে দিল সে, তিনটে গ্লাসে মদ ঢালল। আমিই বোধহয় একমাত্র আইরিশ যে মদ ছোঁয় না, বলল ম্যাকক্কাস্কি। মদখোর বহু লোককে বিপদে পড়তে দেখেছি কিনা।

আবদারের সুরে ক্যাপ্টেনকে বলল সলোয়যা, তোমাকে বিশ্বাস করি না বলে নয়, ইংরেজী ভাষায় আমার ভাল দখল নেই বলে আমি মাইকের সাথে ইতালিয়ানে কথা বলব। আমার উদ্দেশ্যটা যে ভাল সেটুকু অন্তত মাইক বুঝুক, এই চাই আমি। আজ রাতে আমরা একটা রফা করে ফেলতে পারলে তাতে সবারই মস্ত সুবিধে হয়ে যাবে। তুমি কিন্তু অপমানিত বোধ কোরো না। ভেব না যে তোমাকে আমি অবিশ্বাস করি।

শুকনো হেসে ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কি বলল, অবশ্যই, তোমরা শুরু করে দাও, আমি বরং ভীল আর স্প্যাগেটির দিকে একটু নজর দিই।

দ্রুত একনাগাড়ে সিসিলীয় ভাষায় মাইকেলকে বলতে শুরু করল সোযো, সবচেয়ে আগে বুঝতে হবে তোমাকে যে তোমার বাবার সাথে যাই ঘটে থাকুক আমার, ব্যাপারটা ব্যবসা ছাড়া আর কিছু নয়। তোমার বাবা, ডন কর্লিয়নিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি আমি, তাকে সাহায্য করার একটা সুযোগ ভিক্ষা চাই শুধু। কিন্তু এ-কথাও তোমাকে বুঝতে হবে যে উনি বড্ড সেকেলে টাইপের মানুষ। উন্নতির পথে তিনি একটা বাধা। আমার ব্যবসার ভবিষ্যৎ, এক কথায় উজ্জ্বল। এই ব্যবসার তুঙ্গে উঠে যে-কেউ কোটি কোটি ডলার কামাতে পারে। কিন্তু নিজের কিছু অযৌক্তিক সংস্কারের জন্যে তোমার বাবা এই উন্নতিতে বাধা দিচ্ছেন। আর বাধা দিতে গিয়ে তিনি আমার মত লোকজনের ওপর নিজের ইচ্ছাটা চাপিয়ে দিচ্ছেন। হ্যাঁ, হ্যাঁ, জানি, আমাকে তিনি বলেছেন–তোমার ব্যবসা তুমি চালিয়ে যাও। কিন্তু কথাটা যে কতটা অবাস্তব তা আমরা দুজনেই বুঝতে পারি, তাই নয় কি? ব্যবসা চালিয়ে গেলে আমি তার বিরক্তির কারণ হব। আসলে তিনি বলতে চান, এ ব্যবসা আমার করা চলবে না। আমি একজন আত্মমর্যাদাজ্ঞান সম্পন্ন লোক, আরেকজন লোক আমার ওপর তার যা খুশি ইচ্ছা চাপিয়ে দেবে তা আমি হতে দিতে পারি না। এর পরিণতিতে যা হবার তাই হয়েছে। তোমাকে শুধু এটুকু জানাতে চাই যে নিউ ইয়র্কের সবগুলো পরিবার নীরবে সমর্থন করছে আমাকে। আর টাটাগ্লিয়া পরিবার আমার পার্টনার হয়েছে। বুঝতেই পারছ, ঝগড়া যদি চলতেই থাকে, সমস্ত পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে একা পঁড়াতে হবে কর্লিয়নিদেরকে। জানি, তোমার বাবা সচল থাকলে সেটা তিনি চাইতেন না। আমি কাউকে কোন রকম অসম্মান করতে চাই না, কিন্তু তবু এ-কথা বলব যে তার বড় ছেলেটি গড ফাদারের মত হয়নি। তাছাড়া, তোমাদের এই আইরিশ কনসিলিয়রি হেগেন কোন দিক থেকেই গেনকো আবানদাণ্ডোর মত নয়, যীশু তার মঙ্গল করুন। তাই শান্তি প্রস্তাব আনছি আমি, যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব আনছি। তোমার বাবা যতদিন না সুস্থ হয়ে উঠে দরকষাকষির দায়িত্ব নিতে পারেন ততদিন বিরোধিতা বন্ধ থাকুক। আমার খাতিরে, আমার জামিনে ব্রুনোর প্রতিশোধ নেবার দাবি ছেড়ে দিতে রাজি আছে টাটাগ্লিয়া পরিবার। আমরা এ-পক্ষরা সবাই শান্তি চাই। আমাদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। মাঝখানে শুধু একটা কথা বলতে চাই, আমাকেও তো ব্যবসা করে বেঁচে থাকতে হবে। তোমরা না হয় সাহায্য না করলে, কিন্তু অনুরোধ করছি কর্লিয়নি পরিবার যেন আমাকে ব্যবসা করতে বাধা না দেয়। আমার তরফ থেকে এটাই প্রস্তাব। আপস করার অধিকার তোমাকে দেয়া হয়েছে তা আমি ধরেই নিচ্ছি।

সিসিলীয় ভাষায় বলল মাইকেল, ঠিক কিভাবে ব্যবসা করতে যাচ্ছেন আপনি তা আরেকটু খোলসা করে বলুন–আমি জানতে চাই, আমাদের পরিবার ঠিক কি ভূমিকা নিতে পারে, আর তাতে লাভের পরিমাণই বা কতটা আশা করা যায়।

তবে কি তুমি গোটা পরিকল্পনাটা প্রথম থেকে নতুন করে শুনতে চাও? উৎসাহের সাথে জানতে চাইল সলোযো.

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার একটাই, গম্ভীর মুখে বলল মাইকেল, বাবার প্রাণের ওপর আর কোন হামলা হবে না, এ-ব্যাপারে নিশ্চিত গ্যারান্টি চাই আমি।

আবেগ ভরা উত্তেজনায় দুই হাত উপরে তুলে বলল সলোযো, আমি কি গ্যারান্টি দেব তোমাকে? আমিই তো শিকার। সুবর্ণ সুযোগটা আমিই তো হারিয়েছি। তুমি আমাকে বড় বেশি সম্মান দেখাচ্ছ, বন্ধু। আমি অতবড় সম্মানের যোগ্য নই।

নিশ্চিতভাবে এতক্ষণে বুঝতে পারছে মাইকেল, আলোচনার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো হাতে কিছু সময় পাওয়া। তার মানে, আরেকবার চেষ্টা করবে সোযো ডনকে খুন করার। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো শয়তানটা তাকে একেবারে আনাড়ী ছোকরা ভেবে নিয়েছে। আরও একবার সারা শরীরে হিমশীত শিহরণ অনুভব করল মাইকেল। মুখের চেহারায় জোর করে উদ্বেগের ভার ফুটিয়ে তুলল ও।

সাথে সাথে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জানতে চাইল সলোযো, কি ব্যাপার?

আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বলল মাইকেল, মটা একেবারে আমার রাডারে গিয়ে পৌঁছেছে। কতক্ষণ চেপে রাখা যায়। একবার টয়লেটে যেতে পারলে হত।

কালো চোখের নিবিষ্ট দৃষ্টি দিয়ে মাইকেলের মুখ দেখছে সলোযো। ঝট করে হাতটা বাড়িয়ে দিল সে, কর্কশ ভাবে মাইকেলের কুঁচকির-চারদিকে হাতড়ে কোন অস্ত্র আছে কিনা দেখে নিল। মুখে রাগের ভাব নিয়ে বসে আছে মাইকেল। ম্যাকক্লাস্কি দ্রুত বলল, দেখেছি আমি। অমন হাজার হাজার পাণ্ডাকে সার্চ করেছি। ওর কাছে নেই কিছু।

ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছে না সলোযো। কোন কারণ নেই, তবু ভাল ঠেকছে না তার। ওদের উল্টোদিকের একটা টেবিলে বসে থাকা একজন লোকের দিকে তাকাল সে, ইঙ্গিতে তাকে টয়লেটের দরজাটা দেখিয়ে দিল। উত্তরে নোকটাও নিঃশব্দে মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল যে আগেই সে পরীক্ষা করেছে জায়গাটা, ভিতরে নেই কেউ। অগত্যা অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাইকেলকে বলল সলোযো, যাও, কিন্তু বেশি দেরি কোরো না। আশ্চর্য প্রখর ওর অনুভূতি, কিছু একটা ঘটার আশঙ্কায় টান টান হয়ে উঠেছে শরীরের পেশী, ভয়ে ধুকধুক করছে বুকের ভিতরটা।

উঠে দাঁড়াল মাইকেল। স্বাভাবিকভাবে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে টয়লেটের দিকে। ভিতরে ঢুকে দেখল প্রস্রাব পাত্রে তারের জালের উপর গোলাপী রঙের এক টুকরো সাবান রয়েছে। বুথে ঢুকল মাইকেল। সত্যি পেচ্ছাব পেয়েছে ওর, টন-টনে একটা মৃদু বেদনা অনুভব করছে তলপেটে। তাড়াতাড়ি কাজটা সারুল ও, তারপর এনামেল দিয়ে পালিশ করা জলাধারের পিছনটা হাতড়াতে শুরু করল। টেপ দিয়ে আটকানো ছোট্ট, ভোতা নাকের পিস্তলটা ঠেকল ওর হাতে। সেটাকে টেনে বের করে আনার সময় মনে পড়ল, ক্লেমেঞ্জা বলেছিল, আঙুলের ছাপ পড়লেও ঘাবড়াবার কিছু নেই। পিস্তলটা কোমরে খুঁজে নিয়ে সেটার উপর কোটের বোতাম এঁটে দিল ও। তার হাত ধুলো, চুল ভিজিয়ে নিল, কলের গায়ে রুমাল ঘষে মুছে ফেলল আঙুলের ছাপ।

বাথরূমের দরজার দিকে তাকিয়ে বসে আছে সলোযো; কালো চোখ দুটো সজাগ সতর্ক-চকচক করছে। দূরজা খুলে বেরিয়ে এল মাইকেল, সাথে সাথে চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠল তার। মাইকেলের অন্তরের অন্তস্তল পর্যন্ত দেখে নিতে চাইছে তার তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি।

একটু হেসে হাঁফ ছাড়ার ভঙ্গি করল মাইকেল। বলল, এখন আর কথা বলতে কোন অসুবিধে হবে না।

ভীল আর স্প্যাগেটি এসে পৌঁছেছে, পুরোদমে সেগুলোর উপর হামলা চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কি। দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে যে লোকটা, এতক্ষণে ঢিল পড়ল তার পেশীতেও।

নিজের চেয়ারে আবার বসল মাইকেল। ক্লেমেঞ্জা ওকে বসতে নিষেধ করেছিল, মনে আছে ওর। কোন সহজ ত সতর্কবোধ-এর কারণেই হোক বা স্রেফ ভয়েই হোক, নিষেধটা পালন করছে না ও। ওর মনে হচ্ছে তাড়াহুড়োর সাথে কিছু করতে গেলেই ওকে ওরা ধরে ফেলে দুটুকরো করে ফেলবে। তবে এখন তবু অনেকটা নিরাপদ লাগছে নিজেকে। ভয় যে একটু পেয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই, কারণ পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে না বলে এখন বেশ আরাম লাগছে ওর।

মাইকেলের দিকে ঘুরে বসল সলোযো। আবার শুরু করল সে।

টেবিলটা তলপেট আড়াল করে রেখেছে মাইকেলের, কোটের বোতাম খুলে সলোযোর কথা মন দিয়ে শুনতে চেষ্টা করছে ও। কিন্তু কি ছাই বলছে লোকটা, তার একটা হরফও বুঝতে পারছে না। মনে হচ্ছে পাগলের অর্থহীন প্রলাপ বকে চলেছে। শরীরের ভিতর ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেছে উত্তেজিত রক্তস্রোতের। ধীরে ধীরে হাত নামাচ্ছে ও, কোমরে গোজা পিস্তলে আঙুল ঠেকতেই দম আটকে এল ওর। তারপর সেটাকে টেনে বের করে আনল। এই সময় ওদের অর্ডার নিতে এল ওয়েইটার। তার সাথে কথা বলার জন্যে মুখ ফেরাল সলোযো। পরমুহূর্তে মাইকেলের বা হাতে বিদ্যুৎ খেলে গেল। এক ধাক্কায় টেবিলটাকে সরিয়ে দিয়ে স্যাঁত করে বাড়িয়ে দিল পিস্তুল ধরা হাতটা, পিস্তলের নলটা প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে সলোযোর মাথা।

বিস্ময়কর ক্ষিপ্রতার সাথে মাইকেলের হাত নড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিজের শরীরটাকে একপাশে সরিয়ে নিতে চেষ্টা করল সে। কিন্তু বয়স কম বলে তার চেয়েও ক্ষিপ্রগতির অধিকারী মাইকেল, সলোযো মাথা সরিয়ে নেবার আগেই পিস্তলের ট্রিগার টিপে দিল ও।

সলোযোর চোখ আর কানের ঠিক মাঝখানে ফুটো করে উল্টো দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল বুলেটটা, ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা খানিকটা রক্ত আর খুলির টুকরো হতভম্ব ওয়েইটারের কোটের গায়ে ছিটকে পড়ল। বুঝতে পারছে মাইকেল, সলোযোকে আর গুলি করতে হবে না, একটাই যথেষ্ট।

শেষ মুহূর্তে মাথা ঘুরিয়েছিল সলোযো, পরস্পরের চোখের দিকে এক সেকেণ্ডের জন্যে তাকিয়েছিল ওরা, তার চোখে প্রাণ প্রদীপের আলো নিভে যেতে দেখেছে মাইকেল-ঠিক যেভাবে মোমবাতির শিখা দপ করে নিভে যায়, সেই রকম স্পষ্ট ভাবে।

ঘুরে ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কির দিকে পিস্তল তাক করতে এক সেকেণ্ডও লাগল না মাইকেলের। ম্যাকক্লাস্কি সলোযোর দিকে এমন নিরুদ্বেগ বিস্ময়ের সাথে তাকিয়ে আছে যেন, ব্যাপারটার সাথে তার কোন সম্পর্কই নেই। নিজের বিপদ হতে পারে তা সে বিশ্বাস করছে না, তাই তাকে একটুও বিচলিত দেখাচ্ছে না। মাংস গাঁথা কাঁটা চামচটা এখনও ধরে রয়েছে, এইমাত্র চোখ দুটো ফেরাচ্ছে মাইকেলের দিকে। মুখে এমন একটা ক্ষুব্ধ আত্মপ্রত্যয়ের ভাব, যেন আশা করে আছে হয় এখুনি মাফ চাইবে মাইকেল নয়ত ছুটে পালিয়ে যাবে। তাই দেখে ট্রিগার টেপার সময় মৃদু মৃদু হাসছে মাইকেল।

জায়গা মত লাগল না বুলেট, লোকটা বেঁচে রয়েছে। গালটা ষাঁড়ের মত মোটা, সেটার ভিতর দিয়ে ঢুকেছে বুলেট। বিষম খেলো ম্যাকক্লাস্কি, যেন মাংসের বড় একটা টুকরো আটকে গেছে গলায়। খক খক করছে সে, তারপর বিদীর্ণ ফুসফুস থেকে গাঢ় রক্তের ঝর্ণা উঠে এল। পরমুহূর্তে আশ্চর্য শান্তভাবে, অত্যন্ত নিপুণতার সাথে তার পাকা চুলে ঢাকা মাথায় দ্বিতীয়বার গুলি করল মাইকেল।

ঝট করে দেয়াল ঘেঁষে বসা লোকটার দিকে ফিরল মাইকেল। এক চুল নড়েনি। লোকটা। স্থির একটা মূর্তি হয়ে আছে। এবার সে খুব সাবধানে টেবিলের উপর তুলল খালি হাত দুটো, তারপর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।

টলতে টলতে পিছু হটছে ওয়েইটার, রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে সে, এখনও আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে আছে তার চোখ দুটো, অবিশ্বাস ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাইকেলের দিকে।চেয়ারে এখনও বসে আছে সলোযো, টেবিলের গায়ে হেলান দিয়ে আছে শরীরটা। ভারি শরীর নিয়ে নিচের দিকে ঝুলে পড়েছিল ম্যাককুাস্কি, চেয়ার থেকে মেঝেতে পড়ে গেছে সে। শরীরের পাশে ঝুলে থাকা হাত থেকে পিস্তলটা ছেড়ে দিল মাইকেল, গায়ে মৃদু ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে গেল সেটা, কোন শব্দ হলো না। মাইকেল দেখে নিয়েছে দেয়াল ঘেঁষে বসা লোকটা বা ওয়েইটার কেউই ওর পিস্তল ফেলে দেয়াটা লক্ষ করেনি। কয়েক পা দ্রুত এগিয়ে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল ও, খুলে ফেলল দরজাটা। ফুটপাথ ঘেঁষে এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে সলোযোর গাড়িটা, কিন্তু কোথাও ছায়া পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না ড্রাইভারের। বাঁদিকে ফিরে হনহন করে এগোচ্ছে মাইকেল, বাক নিয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল আরও। প্রায় সাথে সাথে হেডলাইট জ্বালা একটা ভাঙাচোরা সিডান ঘ্যাচ করে বেক করে দাঁড়িয়ে পড়ল ওর পাশে, দ্রুত খুলে গেল দরজাটা। লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল মাইকেল, পরমুহূর্তে গাড়িটাও লাফ দিয়ে সগর্জনে ছুটতে শুরু করল। টেসিওকে গাড়ি চালাতে দেখছে মাইকেল। তার মেদহীন, নিশেভ, পরিচ্ছন্ন মুখটা শ্বেত পাথরের মত কঠোর।

সলোযোকে করলে? জানতে চাইল টেসিও।

টেসিওর ভাষা শুনে মুহূর্তের জন্যে বিমূঢ় হয়ে গ্লোল মাইকেল। কথার এই ভঙ্গি সাধারণত যৌন সঙ্গমের বেলায় ব্যবহার করা হয়। কোন মেয়েকে করা মানে তার সাথে সহবাস করা। তাই এক্ষেত্রে কথাটা টেসিও ব্যবহার করায় কেমন যেন অদ্ভুত শোনাল মাইকেলের কানে। দুজনকেই, বলল মাইকেল।

কোন সন্দেহ নেই তো? জানতে চাইল টেসিও।

হলুদ মগজ দেখেছি ওদের।

গাড়িতে কাপড় রয়েছে, পোশাক পাল্টে নিল মাইকেল। বিশ মিনিট পর একটা সিসিলিগামী ইতালীয় মালবাহী জাহাজে উঠল ও। এরদু ঘণ্টা পর সাগর পাড়ি দিতে শুরু করল জাহাজটা, নিজের কেবিন থেকে মাইকেল দেখছে নিউ ইয়র্ক শহরের আলোগুলো নরকের মত দাউ দাউ জ্বলছে। গভীর একটা স্বস্তির ঝিরঝির শান্তি অনুভব করছে ও। সব ছেড়েছুঁড়ে এবার তাহলে সত্যি বেরিয়ে পড়া গেল। ভাবছে ও। এবার যা হয় হোক, শহরের মাথার ওপর ভেঙে পড়ুক নরক, কিন্তু সে এখানে থাকছে না।

.

ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কি এবং সলোযো খুন হবার পরদিন নিউ ইয়র্ক শহরের প্রত্যেক থানা থেকে পুলিশ ক্যাপ্টেন আর লেফটেন্যান্টরা কঠোর নির্দেশ পাঠাল-খুনী ধরা না পড়া পর্যন্ত আজ থেকে জুয়া খেলা বন্ধ, নারী ব্যবসা বন্ধ, কোন রকম বেচাল সহ্য করা হবে না। শহর জুড়ে সর্বত্র ব্যাপক ভাবে হানা দিতে শুরু করল পুলিশ। বে আইনী সমস্ত কার্যকলাপ রাতারাতি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল।

সেদিন পরিবারগুলো তাদের একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি পাঠিয়ে কর্লিয়নিদেরকে জিজ্ঞেস করল খুনীকে তারা হস্তান্তর করতে রাজি আছে কিনা। তাদেরকে জানানো হলো এই খুন-খারাবির সাথে কর্লিয়নিদের কোন সম্পর্ক নেই। সেই রাতে লং বীচে কর্লিয়নিদের প্রাঙ্গণে একটা বোমা বিস্ফোরিত হলো। প্রবেশ পথের মুখে শিকলের কাছে এসে বোমাটা ছুঁড়ে বিদ্যুৎ গতিতে আবার চলে গেল একটা গাড়ি। সেই রাতেই কর্লিয়নিদের দুজন বাটন-ম্যান খুন হয়ে গেল গ্রিনিচ ভিলেজে। ছোট একটা রেস্তোরাঁয় বসে ডিনার খাচ্ছিল তারা।

এইভাবে শুরু হয়ে গেল উনিশশো ছেচল্লিশ সালের পাঁচ পরিবারের যুদ্ধ।

২.৫ চাকরটাকে হাত নেড়ে বিদায়

০৫.

চাকরটাকে হাত নেড়ে বিদায় করে দিয়ে জনি ফন্টেন বলল, সকালে দেখা হবে, বিলি নিগ্রো বাটলারুপ্রকাণ্ড ডাইনিং-কাম-সীটিং রুম থেকে বেরিয়ে যাবার আগে বাও করল, অনেকটা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মত, তাও,ডিনারের জন্যে একজন মেহমান উপস্থিত রয়েছে বলে, নাহলে বাও-ও করত না সে।

শ্যারন মুর নামে-র অতিথিটি নিউ ইয়র্ক শহরের গ্রিনিচ ভিলেজ থেকে হলিউডে এসেছে তার পুরানো প্রেমিক প্রযোজিত একটা ছায়াছবিতে অভিনয় করার চান্স পাওয়া যায় কি না দেখতে। মেয়েটা যখন সেটা দেখতে আসে জনি তখন ওলটসের ছবিতে অভিনয় করছে। ও লক্ষ করে, মেয়েটা অল্প বয়েসী, তাজা ঝরঝরে, মিষ্টি, আর সুরসিকা। নিজের বাড়িতে ওকে ডিনার খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানায় সে। জনির ডিনারের নিমন্ত্রণ এরই মধ্যে খ্যাতি অর্জন করেছে, তা অনেকটা অলঙ্ঘনীয় আদেশের মতও বটে, এবং বলাই বাহুল্য যে নিমন্ত্রণটা সানন্দে গ্রহণ করেছিল মেয়েটি।

জনি সম্পর্কে যে-সব কথা প্রচলিত আছে তার প্রেক্ষিতে শ্যারন মুর ভেবে নিয়েছে ও তাকে প্রথমেই গপ্‌ করে গিলে নিতে চেষ্টা করবে। কিন্তু গোগ্রাসে মাংস গেলার হলিউডি ভঙ্গিটি ঘৃণার উদ্রেক করে জনির মধ্যে। ভুবন ভুলানো কোন গুণ, দেখতে না পেলে সে-মেয়ের সাথে শোয়না জনি। অবশ্য মাঝে মধ্যে খুব বেশি মদ খাবার পর সকালে যখন ঘুম ভাঙে, দেখে পাশে যে মেয়েটি শুয়ে রয়েছে তাকে সে চেনে না বা কখনও দেখেছে বলেও মনে পড়ে না। এখন যেহেতু পঁয়ত্রিশ বছর বয়স জনির, বিয়ে ভেঙেছে একটা, দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে বনিবনা হচ্ছে না, হাজার মেয়ের শরীর অধিকার করলেও, আগের সেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে ও। তবে শ্যারন মুরের মধ্যে এমন কিছু দেখেছে ও যে মেয়েটির প্রতি ওর ভিতর থেকে স্নেহ উথলে উঠেছে। সেটাই ওকে দাওয়াত করার কারণ।

খাওয়াদাওয়ার প্রতি তেমন আকর্ষণ নেই জনির, কিন্তু জানা আছে ওর, সুন্দরী মেয়েরা অভুক্ত থেকে টাকা জমায়, সেই টাকায় দামী পোশাক কেনে, আর কেউ দাওয়াত করলে অনেক দিনের জমে থাকা খিদে মিটিয়ে নেবার সুযোগটা হাতছাড়া করে না, তাই টেবিলে প্রচুর খাবারের আয়োজন রাখা হয়েছে। সাথে যথেষ্ট পানীয়ও রয়েছে বালতি ভর্তি শ্যাম্পেন ছাড়াও রয়েছে স্কচ, রাই, ব্রাণ্ডি, আর সাইডবোর্ডের উপর লিকার। প্লেটে সাজানো খাবার আর পানীয় পরিবেশন করল জনি। খাওয়া শেষ করে শ্যারনকে বিশাল সীটিংরুমে নিয়ে এল। কামরাটার একদিকের দেয়াল সম্পূর্ণ কাঁচের, বাইরে তাকালে প্রশান্ত মহাসাগর দেখা যায়। হাইফাই-এর উপর এলাফ্রিটজেরাল্ডের একগাদা রেকর্ড রেখে সোফার উপর শ্যারনের পাশে এসে বসল জনি। কিছুক্ষণ গল্প করে শ্যারন ছোটবেলায় কেমন ছিল তা আবিষ্কার করার চেষ্টা করল ও। শ্যারন কি ছেলে ঘেঁষা ছিল, নাকি ছেলে দেখলেই তাদেরকে ভাড়া করত? সে কি সাদামাঠা ভাবে থাকতে পছন্দ করত, নাকি খুব স্টাইল করত? নির্জনতা ভালবাসত, নাকি দলে ভিড়ে হৈ-হুঁল্লোড়ে মেতে থাকত? শুধু কথা বলার জন্যে নয়, এই সব ছোটখাটো তথ্য হৃদয় স্পর্শ করে ওর, এগুলো জেনে নরম হয়ে ওঠে ওর মনটা। মেলামেশা করার জন্যে কোমলতার প্রয়োজন হয়,ওর, এসব থেকে সেটুকু পেয়ে যায়।

সোফার উপর পাশাপাশি আরাম করে বসে আছে ওরা, শ্যারনের ঠোঁটে চুমা খেলো জনি। নিষ্কাম বন্ধুত্বের চুমো। নির্মল ভঙ্গিটা শ্যারনও বজায় রাখছে দেখে আর এগোল না জনি। বিশাল জানালার বাইরে চাঁদের আলোয় গভীর নীল মহাসাগরের সমতল বিস্তার দেখা যাচ্ছে।

তোমার কোন রেকর্ড বাজিয়ে শোনাচ্ছ না যে? একটু বিক্রপের সুরে জানতে চাইল শ্যারন। ওর দিকে ফিরে হাসল জনি। তাকে শ্যারন পরিহাস করছে দেখে মজা লাগছে ওর। আমাকে তুমি অতটা হলিউডি না ভাবলেও তো পারো, বলল ও।

কিছু বাজাও, বলল শ্যারন। না হয় গান গেয়ে শোনাও। সিনেমায় যেমনটি করে ওরা। তুমি গাইবে আর আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে একেবারে গলে পড়ব তোমার ওপর।

হেসে ফেলল জনি। অল্প বয়সে এই কাণ্ডই করত বটে ও, আর তার ফলও হত বেশ নাটকীয়। চেহারায় কামনার ভাব ফুটিয়ে বিগলিত মোহিনীর রূপ ধারণ করার সে কি আপ্রাণ চেষ্টা, মেয়েদের। মনগড়া একটা ক্যামেরার উদ্দেশে চোখে কামনামদির দৃষ্টি এনে নিজেদেরকে লোভনীর করে তোলার সাধনা শুরু হয়ে যেত। এখন আর কোন মেয়েকে গান গেয়ে শোনাবার কথা ভাবতেও পারে না জনি। একটা কারণ, কয়েক মাস ধরে গান গাইছে না ও, নিজের গলার উপর আস্থা নেই। দ্বিতীয় কারণ, পেশাদার গায়করা যে এত ভাল গান করে তা কতটা যান্ত্রিক সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল সে-ব্যাপারে সাধারণ মানুষ বা সৌখিন শিল্পীদের কোন ধারণাই নেই। তবে, নিজের রেকর্ড বাজিয়ে শোনাতে পারে ও, কিন্তু আগের সেই তাজা উদ্দীপ্ত কণ্ঠস্বর শুনতে আজকাল কেমন যেন কুণ্ঠাবোধ করে ও। গলাটা তেমন সুবিধে লাগছে না, বলল-জনি, তাছাড়া কত আর নিজের গান শোনা যায়, বিরক্তি ধরে গেছে।

গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে ওরা। শুনলাম এই ছবিটায় তুমি নাকি দারুণ অভিনয় দেখিয়েছ, যাকে বলে একেবারে মাত করে দেয়া। সত্যি টাকা পয়সা কিছু নাওনি?

ওই না নেবার মতই, বলল জনি।

শ্যারনের ব্র্যাণ্ডির গ্লাস আবার ভরে দেবে বলে উঠে দাঁড়াল জনি। সোনালী মনোগ্রাম করা একটা সিগারেট দিল ওকে, লাইটার জ্বেলে বাড়িয়ে দিল সেটা ধরাবার জন্যে। সিগারেট টানছে আর গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে শ্যারন। আবার তার পাশে বসল জনি।

নিজের গ্লাসে অনেক বেশি ব্র্যাণ্ডি নিয়েছে জনি, শরীর গরম আর মনটাকে চাঙা করে তুলতে এটুকু দরকার। ওর অবস্থা সাধারণ প্রেমিকদের ঠিক উল্টো। মেয়েটিকে নয়, নিজেকেই উত্তেজিত করে তুলতে হয়। সাধারণত মেয়েটিই উন্মুখ, অস্থির হয়ে থাকে, কিন্তু ও নিজে নড়ে চড়ে না। গত দুবছর ধরে ওর আত্মসম্মানে বড় বেশি আঘাত লেগেছে, সেই ঘা সারাবার জন্যে অতি সহজ একটা উপায় বেছে নিয়েছে ও সুন্দরী কুমারী তরুণীকে এক রাতের জন্যে পাশে নিয়ে শোয়ার পর, কয়েকবার তাকে ডিনার খেতে নিয়ে গিয়ে, দামী কিছু একটা উপহার কিনে দিয়ে, খুব নযভাবে খসিয়ে ফেলা, যাতে মনে দুঃখ না পায়। পরে এইসব মেয়েরা বলে বেড়াতে পারে যে বিখ্যাত জনি ফন্টেনের সাথে তাদের বিশেষ সম্পর্ক ছিল। এর মধ্যে সত্যিকার প্রেম নেই, কিন্তু মেয়েটি যদি আশ্চর্য সুন্দরী আর ভাল হয় তাহলে তাকে সহজে ভুলে যাওয়াও যায় না। কড়া, রাক্ষুসী টাইপের মেয়েগুলোকে দুচোখে দেখতে পারে না ও, এরা ওর সাথে সহবাস করেই বন্ধু-বান্ধবদেরকে বলতে ছোটে যে বিখ্যাত জনি ফন্টেনের সাথে আজ প্রেম হয়েছে। সেই সাথে এ-কথাও বলতে ভোলে না যে জনি ফন্টেনের চেয়ে যৌন অভিজ্ঞতা অনেক বেশি তার। সবচেয়ে বিমূঢ় করে জনিকে এইসব মেয়েদের সহানুভূতিশীল, মহৎপ্রাণ স্বামীরা। তারা প্রায় ওর মুখের ওপর বলতে দ্বিধাবোধ করে না যে কিছু মনে না রেখেই তারা তাদের স্ত্রীদের ক্ষমা করে দিয়েছে, কারণ, আদর্শ সতী স্ত্রীকেও জনি ফন্টেনের সাথে অবৈধ অন্যায় ব্যভিচার করতে দেয়া যেতে পারে, তাতে দোষের কিছু নেই। এসব শুনে হতভম্ব না হয়ে উপায় কি জনির!

রেকর্ডে এলাফিটজেরাল্ডকে ভাল লাগে ওর। গলায় ব্যাণ্ডির উষ্ণতা অনুভব করছে ও, রেকর্ডের সাথে সুর মিলিয়ে গাইতে ইচ্ছে করছে এখন ওর, কিন্তু বাইরের একজনের সামনে তা তো আর সম্ভব নয়। এক হাতে গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে ও, অপর হাতটা শ্যারনের কোলের উপর রাখল। ছল-চাতুরির ধার দিয়ে গেল না, উষ্ণতার সন্ধানে শিশুর মত শ্যারনের কোলে রাখা হাতটা দিয়ে রেশমী পোশাক টেনে তুলল একটু, সাদা বুনটের মোজার উপর খানিকটা উরু দেখা যাচ্ছে সাদা দুধের মত। ওইটুকু দেখে এতগুলো মেয়ে, এতলো বছর, এতদিনের অভ্যাস, সব বেমালুম ভুলে গেল জনি। উত্তপ্ত লাভার মত কামোত্তেজনার স্রোত বয়ে যাচ্ছে তার শরীরে। উত্তেজিত হওয়া প্রায় অভব একটা ব্যাপার, কিন্তু সেই অসম্ভবও সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু যখন আর তা হবে না, ওর গলার মত যখন অসভব অবই থেকে যাবে, তখন কি করবে জনি?

লম্বা ককটেল টেবিলের উপর হাতের গ্লাস নামিয়ে রেখে শ্যারনের দিকে শরীরটা ঘুরিয়ে নিল জনি। চুমো খেলো ওর ঠোঁটে, হাত দিয়ে বুক ছুঁলো, কোমল আর মসৃণ উরুতে হাত বুলাচ্ছে। সামনে আরও সরে এসে শ্যারনও চুমো খেলো ওকে, তার এই চুমোয় মমতা আছে, কিন্তু, কামের নামগন্ধ নেই। ভালই লাগছে জনির। হঠাৎ গরম হয়ে ওঠে যেসব মেয়েরা তাদেরকে পছন্দ করে নাও।

যা সব সময় করে, এইবার তাই করল জনি। এটা এমন একটা পন্থা যা কখনও ব্যর্থ নিরাশ করেনি ওকে। চরম সতর্কতার সাথে, ধীর এবং কোমলতার সাথে, যাতে মাত্র ছোঁয়াটুকু শুধু টের পাওয়া যায়, ওর মধ্যম আঙুলের ডগাটী শ্যারনের দুই উরুর মাঝখানের গভীর গহন অন্তঃপুরে পৌঁছে গেল। এমন অনেক মেয়ে আছে, প্রেম করার এই পদ্ধতি টেরই পায় না, তারা এর মজাটা বুঝে উঠতে অক্ষম। এটা যে আলাদা কিছু, তাই জানে না। আবার কোন কোন মেয়ে প্রচণ্ড বিহ্বল হয়ে উঠে, তাদের বুঝতে কষ্ট হয় ওটা শারীরিক স্পর্শ কিনা, কেননা একই সাথে ওদের ঠোঁটে গভীর আশ্লেষে চুমোও খায় জনি। কিছু মেয়ে ওর এই মধ্যম আঙুলটাকে প্রিয় সুখাদ্যের মত লেহন করত, চুষে খেত, যেন কত দিনের ক্ষুধার্ত। তবে, একথাও ঠিক যে নাম করার আগে এই কাণ্ডের জন্যে জনির গালে টেনে চড় মারত কোন কোন মেয়ে। কিন্তু এটাই জনির গোপন কৌশল, সাধারণত খুব ভাল ফল আদায় হয় এর সাহায্যে।

অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হলো শ্যারনের। অনায়াসে, নির্দ্বিধায় সবটুকু গ্রহণ করল সে-আঙুলের ছোঁয়াটুকু, চুমোটা, কিছুতেই আপত্তি জানাল না। তারপর জনির মুখ থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে, জনির শরীর থেকে নিজেকে সামান্য একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে। হাত বাড়িয়ে ব্রাণ্ডির গ্লাসটা তুলে নিল টেবিল থৈকে। শীতল নির্দয়তার সাথে, কিন্তু। সুনিশ্চিত প্রত্যাখ্যান। নিজের গ্লাসটা তুলে নিয়ে জনিও অগত্যা সিগারেট ধরাল একটা।

অদ্ভুত মিষ্টি সুরে, আশ্চর্য হালকা ভঙ্গিতে কি যেন বলছে শ্যারন। তোমাকে যে আমার ভাল লাগেনি, ব্যাপারটা তা নয়, জনি। যতটা ভাল লাগবে বলে আশা করেছিলাম, তোমাকে আমার তার চেয়ে বেশি ভাল লেগেছে। আমি সে-ধরনের মেয়ে নই, ব্যাপারটা তাও নয়। আসলে ওরকম কিছু একটা করতে হলে সঙ্গীর সাথে তার মত মেতে ওঠার জন্যে আমার কিছু প্রেরণার দরকার হয়। ঠিক কি বলতে চাইছি বুঝতে পারছ তুমি?

ওর দিকে ফিরল জনি ফন্টেন, নিঃশব্দে হাসল একটু। এখনও ভাল লাগছে, মেয়েটাকে ওর। বলল, আমি তোমাকে অনুপ্রাণিত করতে পারছি না, এই তো?

একটু কুণ্ঠিত হয়ে উঠল শ্যারন। বলল, শোনো, তুমি যখন খুব বিখ্যাত গায়ক ছিলে, আমি তখনও ছোট, একেবারে কচি খুকী। আমি তোমার এক পুরুষ পরে জন্মেছি, ঠিক নাগালের মধ্যে পাই না তোমাকে। স্বীকার করি, যাকে বলে সতী মেয়ে, আমি তা নই। তুমি যদি আমার সাথে বেড়ে উঠতে, যাকে ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি, প্রায় সমবয়েসী, তোমার সামনে কাপড় খুলতে এক সেকেণ্ডও লাগত না আমার।

এখন আর শ্যারনকে আগের মত ভাল লাগছে না জনির। মেয়েটা মিষ্টি, বুদ্ধিমতী, সুরসিকা, সন্দেহ নেই। ওর সাথে সহবাস করার জন্যে হন্যে হয়ে ছুটেও আসেনি, ওর সাথে ভাল সম্পর্ক থাকলে ছবিতে কাজ পেতে সুবিধে হবে ভেবে নিজেকে নির্লজ্জের মত মেলেও দেয়নি বা প্রেমেও গদ গদ হয়ে ওঠেনি–সন্দেহ নেই, খাঁটি মানুষ, সরল মানুষ। কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে আরেকটা বিষয় আবিষ্কার করতে পেরেছে জনি। এর আগেও কয়েকবার এমনটি হয়েছে। কিছু মেয়ে, ওর। সাথে সন্ধ্যা কাটাতে আসার আগেই মনে মনে ঠিক করে রাখে বিছানায় উঠবে না। তারা, কাপড় খুলবে না, তা সে যত ভালই লাগুক না কেন ওকে তাদের। এর কারণ, মেয়েরা চায়, ফিরে গিয়ে তারা যেন বন্ধু-বান্ধবদের, এবং নিজেদেরকেও বলতে পারে যে বিখ্যাত জনি ফন্টেনের সাথে শোবার সুযোগ পেয়েও তারা সুযোগটা নেয়নি। জনির এখন বয়স হয়েছে, সব বুঝতে পারে ও। শ্যারনের মনোভাব বুঝতে পেরেও তার ওপর রাগ হলো না ওর। শুধু আগের মত আর আকর্ষণ বোধ করছে না ওর প্রতি।

মোহটা কেটে গেছে বলে স্বস্তিবোধ করছে জনি। জানালা দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে তাকাল ও, মাঝে মধ্যে চুমুক দিচ্ছে গ্লাসে।

আশা করি আমার ওপর রাগ করোনি তুমি, জনি, বলল শ্যারন। হলিউডের নিয়ম হয়তো রক্ষা করতে পারিনি। হয়তো আমার ব্যবহার অদ্ভুত লাগছে তোমার কাছে। সঙ্গীকে বিদায় জানাবার সময় চুমো খাওয়াও যা, তার সাথে সহবাস করাও তাই-হলিউডের এই রকমই বোধ হয় নিয়ম। এসব ব্যাপারে এখানে কেউ কিছু মনে করে না, একেবারে পানির মত সহজ ব্যাপার ভেবে নেয় সবাই। আমার ব্যাপারটা হলো, আমি তো আর এখানে খুব বেশি দিন আসিনি।

মৃদু হেসে শ্যারনের মুখে একবার হাত বুলিয়ে দিল জনি, তারপর হাতটা নামিয়ে স্কার্টটাকে টেনে ঢেকে দিল মসৃণ হাঁটু দুটো। না, রাগ করিনি। সেকেলে মেয়েদের সাথে কাটাতে ভালই তো লাগে। খোঁচাটা ইচ্ছা করেই দিল ও।

আরেকটু ব্র্যান্ডি খেলো ওরা। আরও কিছু ঠাণ্ডা চুমোর দেয়া নেয়া হলো। এবার ঠিক করল শ্যারন, তার যাবার সময় হয়েছে।

সৌজন্যের খাতিরে বলল জনি, তোমাকে কোথাও একদিন ডিনার খেতে নিয়ে যেতে পারি?

শেষদিকে খোলা মন নিয়ে কথা বলল শ্যারন, বলল, সময় নষ্ট করে নিরাশ হতে চাও না তুমি, এ আমি জানি। আজকের এই আশ্চর্য সুন্দর সন্ধ্যাটির জন্যে তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমার ছেলেমেয়েদেরকে একদিন গল্প শোনাব, বিখ্যাত জনি ফন্টেনের সাথে তার অ্যাপার্টমেন্টে আমি একা একটা সন্ধ্যা কাটিয়েছিলাম।

এবং তুমি ধরা দাওনি, মৃদু হেসে বলল জনি। তারপর দুজনেই হেসে উঠল।

যদি বলিও, তা ওরা কক্ষনও বিশ্বাস করবে না।

তুমি চাইলে লিখে দিই, বলল জনি, এখনও হাসছে ও। তাই চাও নাকি?

মাথা নাড়ল শ্যারন।

শোনো, কেউ যদি বিশ্বাস না করে, তাকে বলো আমাকে যেন ফোন কয়ে, আমি তোমার হয়ে সাক্ষী দেব। তাকে জানাব, গোটা বাড়িময় আমি তোমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছিলাম, তবু তুমি নিজের সতীত্ব বিসর্জন দাওনি, ঠিক আছে?

শেষ পর্যন্ত একটু নির্দয় হয়ে গেল ব্যবহারটা, শ্যারনের কচি মুখে বেদনা দেখে নিজেই খুব দুঃখ পেল জনি। জনি বলতে চাইছে যথেষ্ট চেষ্টা করেনি সে, বক্তব্যটা বুঝতে পেরে মন খারাপ হয়ে গেল তার। হার না মানার আনন্দটুকু কেড়ে নিল তার কাছ থেকে জনি। এখন ওকে ধরে নিতে হবে জনি ফন্টেনকে আকৃষ্ট করার মত যথেষ্ট মাধুর্য ছিল না তার মধ্যে, সেজন্যেই তেমন জোর দিয়ে চেষ্টা করেনি জনি। কিন্তু শ্যারন যে-ধরনের মেয়ে, যখনই কাউকে বলবে যে জনি ফন্টেনের ফাঁদ ও এড়িয়ে যেতে পেরেছিল, জয় করেছিল তার প্রলোডন, সেই সাথে এই কথাটাও জুড়ে দেবে যে, তবে সে তেমন চেষ্টাও করেনি। এইসব ভেবে শ্যারনের প্রতি করুণবোধ করল জনি।

বলল, কখনও যদি খুব বিষণ্ণ বোধ করো, একটা ফোন কোরো আমাকে, কেমন? আমি যত মেয়ের সাথে পরিচিত হই, তাদের সবার সাথে শুই না।

ফোন করব, বলে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল শ্যারন মুর।

মস্ত একটা ফাঁকা, নির্জন সন্ধ্যা পড়ে রয়েছে জনির সামনে। জ্যাক ওলটস যাকে বলে মাংসের কারখানা সেখানে যেতে পারে ও, যেতে পারে উৎসুক হবু তারকাদের খুদে আস্তানার যে-কোন একটাতে, কিন্তু, জনি এসব চাইছে নাও চাইছে সত্যিকার একজন মরমী মানুষের সাথে মন খুলে কথা বলতে। ওর প্রথমা স্ত্রী ভার্জিনিয়া, তার কথা মনে পড়ল ওর। ছবির কাজ শেষ হয়েছে, এখন একটু সময় দেয়া যাবে মেয়েদেরকে। ওর ইচ্ছে করছে আবার সে ওদের জীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠে। ভার্জিনিয়ার কথা ভেবে চিন্তা হয় ওর। হলিউডের মস্তানগুলোকে সামাল দেবার ক্ষমতা নেই ওর, তারা হয়তো পিছু নিয়ে বিরক্ত করবে তাকে, পরে যাতে গর্ব করে বলে বেড়াতে পারে যে জনি ফন্টেনের স্ত্রীর সাথে তাদের প্রেম ছিল। যতদূর জানে জনি, এখন পর্যন্ত এ-ধরনের কথা কেউ বলতে পারেনি। পরমুহূর্তে মনে পড়ল, ওর দ্বিতীয় স্ত্রী সম্পর্কে এ-কথা প্রায় সবাই বলতে পারে। মনটা বিরূপ হয়ে উঠল সাথে সাথে। ফোনের রিসিভারের দিকে হাত বাড়াল জনি।

কানে ঢুকতেই ভার্জিনিয়ার কণ্ঠস্বর চিনতে পারল ও। ওর যখন দশ বছর বয়স, এক সাথে ফোর-বি ক্লাসে পড়ত দুজনে, সেই প্রথম শুনেছিল ওই কণ্ঠস্বর। শোনো, জিনি, তুমি কি খুব ব্যস্ত থাকবে আজ রাতে? একটু সময়ের জন্যে আসতে পারি তোমার কাছে?

বেশ, বলল জিনি। মেয়েরা কিন্তু সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ওদের ঘুম ভাঙাতে চাই না।

ঠিক আছে, বলল জনি। আমি তোমার সাথেই একটু কথা বলতে চাই আর কি।

অপরপ্রান্তে একটু ইতস্তুত করুল জিনি, তারপর খুব সাবধানে, যাতে কোন দুশ্চিন্তার ভাব প্রকাশ না পায়, ধীরে শান্ত গলায় বলল, গুরুতর কোন ব্যাপার নাকি? জরুরী কিছু?

না, বলল জনি। ছবির কাজ শেষ হয়ে গেছে কিনা, তাই ভাবলাম তোমাকে একটু দেখে আসি, একটু গল্প করে আসি। যদি মনে করে ওদের ঘুম ভেঙে যাবে না তাহলে হয়তো মেয়েদেরকেও একবার দেখা হয়ে যায়।

ঠিক আছে, বলল জিনি। ছবিতে যে ভূমিকাটা চেয়েছিলে তুমি সেটা পেয়েছ শুনে খুশি হয়েছিলাম।

ধন্যবাদ, বলল জনি। আধঘণ্টার মধ্যে আসছি আমি।

বেভারলি হিলসের বাড়িটার সামনে পৌঁছুল জনি, এটাই একদিন বাসস্থান ছিল ওর। গাড়ির ভিতর চুপ করে বসে থাকল ও, তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে বাড়িটার দিকে। গড ফাদারের একটা কথা মনে পড়ে গেল তার, তিনি বলেছিলেন, জীবনটাকে যেভাবে ইচ্ছা গড়ে নেয়া যায়। ইচ্ছাটা কি জানা থাকলেই চলে, তাতেই যেটুকু সুবিধে দরকার পাওয়া যায়। কিন্তু, ভাবছে জনি, ওর নিজের ইচ্ছাটা কি?

ওর প্রথম স্ত্রী ভার্জিনিয়া ওর জন্যে অপেক্ষা করছে দরজায়। ছোটখাটো গড়ন, লাবণ্যময়ী, সুন্দর গাঢ় রঙের চুল, মিষ্টি ইতালীয় মেয়ে। পাশের বাড়ির যুবতী, অন্য কোন পুরুষের দিকে তাকাবে না কখনও, সে সময় এই ব্যাপারটাকেই সবচেয়ে বড় কথা বলে মনে হয়েছিল। ওকে কি তার এখনও আপন করে পেতে ইচ্ছে করে, প্রশ্নটা করে নিজের কাছ থেকে উত্তর পেল জনি, না। তার একটা কারণ হলো, জিনির সাথে আর প্রেম করা চলে না, পরস্পরের প্রতি যে ভালবাসা ছিল সেটায় এখন ঘুণ ধরেছে। যৌন সম্পর্কের কথা বাদ দিলেও আরও কিছু কিছু ব্যাপার আছে যা কখনও সহ্য করতে বা ক্ষমা করতে পারে না জিনি। তবে এখন আর ওদের মধ্যে কোন শত্রুতাও নেই।

ওকে কফি খেতে দিল জিনি, বসার কামরায় আরাম করে বসিয়ে বাড়িতে তৈরি মিষ্টি খাওয়াল। বলল, পা মেলে দিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ো তুমি, তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।

জুতো আর কোট খুলে ফেলল জনি, টাইটা ঢিলা করে দিল।

জনির সামনে একটা চেয়ারে বসল জিনি, মৃদু গাম্ভীর্যের সাথে একটু হেসে বলল, ভারি মজার ব্যাপার তো!

কফিতে চুমুক দিচ্ছিল জনি, হাতটা কেঁপে যাওয়ায় কাপ থেকে ছলকে একটু কফি পড়ে গেল শার্টের উপর। কি ভারি মজার ব্যাপার? জানতে চাইল ও।

বিখ্যাত জনি ফন্টেন সন্ধ্যা কাটাবে, কিন্তু তার কোন সঙ্গী নেই।

বিখ্যাত জনি ফন্টেন যদি আবার সুস্থ হয়ে উঠতে পারে তাহলে সেটাই তার সবচেয়ে বড় ভাগ্য!

এত স্পষ্টভাবে সাধারণত কথা বলে না জনি। জিনি জানতে চাইল, সত্যি কিছু ঘটেছে নাকি?

নিঃশব্দে হাসল জনি। একটা মেয়ের সাথে ডেট ছিল, আমাকে সে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য কি জানো, তাতে সাংঘাতিক স্বস্তি বোধ করেছি আমি।

কথাটা শেষ করেই পলকের জন্যে লক্ষ করল জনি, নিমেষের জন্যে জিনির মুখে রাগের ভাব ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল।

ওসব বাজে মেয়েদের ব্যাপার নিয়ে মন খারাপ কোরো না, বলল জিনি। মেয়েটা হয়তো ভেবেছে ধরাছোঁয়া না দিলেই তোমার আগ্রহ বেড়ে যাবে।

মেয়েটা ওকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলে মেয়েটার উপর রেগে যাচ্ছে জিনি, ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মজা লাগছে জনির। বলল, ধেত্তেরী হাই, এসব কথা থাক, চুলোয় যাক ওসব, আমার বিরক্তি ধরে গেছে। এক দিন তো আমাকে পরিণত হতে হতই, সুতরাং নারী জাতির ব্যাপারে একটু কষ্ট তো আমাকে পেতেই হবে। তুমি অন্তত জানো, শুধু চেহারার জোরে খুব একটা সুবিধে করতে পারি না আমি।

বিশ্বস্ততা বজায় রেখে বলল জনি, ক্যামেরায় তোলা তোমার ছবির চেয়ে তুমি আসলে অনেক ভাল দেখতে।

এদিক ওদিক মাথা নাড়ল জনি। মেদ জমছে শরীরে, মাথায় টাক পড়ছে। এই ছবিটার গুণে যদি হারিয়ে ফেলা খ্যাতি ফিরে না আসে, পিটসা পাই তৈরি করতে শেখা উচিত আমার। তা নাহলে তোমাকে পর্দায় নামানো যেতে পারে, খাসা চেহারা তোমার।

জিনির দিকে তাকালে বোঝা যায় পঁয়ত্রিশের কম নয় বয়স। সযত্নে লালিত হলেও, পঁয়ত্রিশ তো বটে। আর হলিউডে পঁয়ত্রিশ যা একশোও তাই। সুন্দরী তরুণী মেয়েরা হাজারে হাজারে ছড়িয়ে আছে শহরে, এদের কেউ এক বছর টেকে, কেউ বা দুবছর। এদের মধ্যে এমন রূপসী মেয়েও আছে যাদের দিকে তাকালেই হার্টবিট বন্ধ হয়ে আসে। যতক্ষণ না বুলি ছাড়ছে, যতক্ষণ না সাফল্যের নির্লজ্জ লোভে চেহারার অপরূপ মাধুর্য ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। শারীরিক সৌন্দর্যের দিক থেকে সাধারণ মেয়েরা এদের সাথে প্রতিযোগিতায় কখনোই পেরে উঠতে পারে না। বুদ্ধিমত্তা, মাধুর্য, ব্যক্তিত্ব আর গাম্ভীর্যের কথা তুলে লাভ নেই, ওইসব মেযেদের আনকোরা সৌন্দর্যের কাছে সব মান হয়ে যায়। হলিউডে এত সুন্দরী মেয়ে না থাকলে সাধারণ সুশ্রী মেয়েরাও কিছু সুযোগ সুবিধে পেত। আর কে না জানে যে এই সব সুন্দরী মেয়েদের প্রায় সবাইকে চাইলেই অধিকার করতে পারে জনি ফন্টেন। তার মানে, ভাবছে জিনি, কথাগুলো শুধু তাকে খুশি করার জন্যেই বলা হলো। এসব ব্যাপারে জনি বরাবরই ভাল ব্যবহার করে থাকে। সাফল্যের শিখরে উঠেও মেয়েদের প্রতি সৌজন্য দেখাতে বা তাদের প্রশংসা করতে কার্পণ্য করে না কখনও। সিগারেট ধরাবার জন্যে লাইটার জ্বেলে দেয়, নিজে উঠে গিয়ে খুলে দেয় দরজা।

প্রীতিমধুর হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল জিনির মুখ। ওকে বলল, তোমার দখলেই তো ছিলাম আমি, মনে নেই? একটানা বারো বছর। আমি সুন্দরী এ-কথা বলে আজ আমাকে ভোলাবার কোন দরকার নেই।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফার উপর লম্বা হলে জনি।. না, ঠাট্টা নয়, জিনি-তুমি দেখতে সুত্যি খুব ভাল। তোমার তুলনায় আমি এখন একটা কুৎসিত পশু ছাড়া কিছুই নই।

বুঝতে পারছে জিনি, ওর মন খারাপ। প্রসঙ্গটা চাপা দিয়ে জানতে চাইল, ভালই তো হয়েছে ছবিটা, তাই না? পরিস্থিতি আরও ভাল হবে, কি বলো?

তা হয়তো হবে, বলল জনি, বলা যায় না, আগের প্রতিষ্ঠা ফিরে পেতেও পারি। একাডেমির প্রাইজটা যদি পেয়ে যাই, আর বোকার মত কিছু করে না বসি, তাহলে গান না গাইলেও কিছু এসে যাবে না, আগের মত আবার নাম করতে পারব। তা যদি হয়, মেয়েদেরকে আর তোমাকে আরও কিছু বেশি টাকা দিতে পারব আমি।

আরও টাকার দরকারটা কি? প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে আমাদের।

মেয়েদের জন্যে মন কেমন করে আমার, ওদেরকে আরও ঘন ঘন দেখতে চাই। এবার একটু সুস্থির হতে, না পারলে চলবে না আমার। আচ্ছা, খানিক ইতস্তত করে বলল জনি, প্রত্যেক শুক্রবার তোমার কাছে এসে যদি খাওয়াদাওয়া করি, তোমার অসুবিধে হবে?:বিশ্বাস করো, একটা শুক্রবারও বাদ দেব না, যতদূরেই থাকি বা যত কাজই থাকুক না কেন, তাছাড়া শনি রবিগুলো যখনই সম্ভব এখানে এসে কাটিয়ে যেতে পারি আমি, অপঘা ওরা আমার কাছে গিয়ে দুটির কিছুটা কাটিয়ে আসতে পারে।

জনির বুকের উপর একটা অ্যাশট্রে রাখল জিনি। আমার কোন অসুবিধে হবে না। আবার বিয়ে করলাম না তো এই জন্যেই, তুমি ছাড়া আর কেউ যাতে ওদের বাবার ভূমিকায় আসতে না পারে। তার কথায় আবেগের লেশমাত্র নেই। কিন্তু সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছে জনি, সেই যখন অবনতি শুরু হয়েছিল ওর, বিয়েটা যখন,ভেঙেই গেল, তখন যে-সমস্ত হৃদয়হীন নিষ্ঠুর কথা বলেছিল জিনি এখনকার কথাগুলো তারই ক্ষতিপূরণের চেষ্টা মাত্র।

আচ্ছা, বলো তো, জানতে চাইল জিনি, কে ফোন করেছিল আমাকে?

অনুমান করার ব্যাপারে কোনদিনই ছিল না জনি, আজও নেই। পাল্টা প্রশ্ন করল ও, কে?

আহা, একবার না হয় আন্দাজ করে দেখে না।

কিন্তু কথা না বলে চুপ করেই থাকল জনি।

তোমার গড ফাদার।

আকাশ থেকে পড়ল জনি। বলো কি? উনি তো কাউকে ফোন করেন না। কি বললেন তোমাকে?

বললেন আমি যেন তোমাকে সাহায্য করি। বললেন, আস্থা রাখতে পারো এমন একজন মানুষ দরকার তোমার!

জিনির দিকে অদ্ভুত একটা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জনি, যেন জানতে চাইছে, উত্তয়ে তুমি কি বললে?

জিনিও ব্যাপারটা ধরতে পেরে বলল, তোমার গড ফাদারকে প্রশ্ন করলা, আমার কি দায় পড়েছে যে জনিকে আমি সাহায্য করতে যাব? ক্ষীণ একটু হাসল জিনি। উনি বললেন, জনি ভোমার সন্তানদের বাবা, তাই। একটু থেমে আবার বলল ও, আশ্চর্য বিচক্ষণ আর মিষ্টি স্বভাবের মানুষ, অথচ লোকে কত আজেবাজে কথাই না বলে ওঁর সম্পর্কে।

এই সময় বেজে উঠল কিটেনের টেলিফোনটা। তাড়াতাড়ি উঠে গেল জিনি। প্রায় সাথে সাথে চোখে মুখে একরাশ বিস্ময় নিয়ে ফিরে এল সে, বলল, জনি, তোমার ফোন। খুব নাকি জরুরী ব্যাপার, টম হেপেন তোমাকে ডাকছে।

কিচেনে এসে টেবিল থেকে ফোনের রিসিভার তুলল জনি। কি ব্যাপার, টম?

অপর প্রান্ত থেকে নিরুদ্বেগ গলায় টম হেগেন বলল, অনি, গড ফাদার চাইছেন, তোমার ওখানে গিয়ে কিছু ব্যবস্থা সেরে আসি আমি, তোমার ভাল হবে তাতে, ছবির কাজ তো শেষই হয়ে গেছে। সকালের প্লেন ধরতে বলছেন আমাকে, তুমি কি লস এঞ্জেলসে আসবে আমাকে রিসিভ করতে? আমি আবার রাতের মধ্যেই ফিরব নিউ ইয়র্কে, সুতরাং আমার জন্যে তোমাকে পুরো রাতটা অপচয় করতে হবে তা ভেব না।

অবশ্যই, টম, বলল জনি, আমার একটা রাত নষ্ট হবে মনে করে দুশ্চিন্তা কোরো না তুমি আসছ যখন, একটু বিশ্রাম নিয়ে যেয়ো। একটা পার্টির আয়োজন করছি আমি, এই সুযোগে সিনেমা জগতের কিছু হোমরা-চোমরাদের সাথে পরিচয় হয়ে যাক তোমার। এ-ধরনের আমন্ত্রণ সুযোগ পেলেই করে থাকে জনি, যাতে ওর পুরানো শুভানুধ্যায়ীরা মনে না করে যে তাদেরকে নিয়ে লজ্জিত সে।

ধন্যবাদ,বলল হেগেন, কিন্তু জরুরী কাজ আছে আমার, ভোরের প্লেন ধরে ফিরতেই হবে আমাকে। তুমি কি সকাল এগারোটায় নিউ ইয়র্ক-এর প্লেন নামার সময় এয়ারপোর্টে থাকতে পারবে?

একশোবার থাকতে পারব।

সীটিংরূমে ফিরে এসে জিনির প্রশ্নবোধক দৃষ্টির উত্তরে জনি জানাল, আমার কিছু সুবিধে করে দেবার ফন্দি এঁটেছেন-গড ফাদার। জানো, কিভাবে যে ওই ছবিটায় আমাকে ঢোকালেন তা আজও একটা রহস্য হয়ে আছে আমার কাছে। একটু চিন্তিতভাবে বলল, কিন্তু আর কোন ব্যাপারে ওঁর জড়িয়ে না পড়লেই বোধ হয় ভাল হত। সোফায় ফিরে এল ও, ক্লান্ত বোধ করছে।

আমাদের গেস্টরুমে শুতে পারো তুমি, বলল জিনি। তাহলে এত রাতে আর গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় না, মেয়েদের সাথে ব্রেকফাস্টও খেতে পারবে। ওই বাড়িতে তোমাকে একা থাকতে হয় ভেবে খারাপ লাগে আমার। একা লাগে না তোমার?

বাড়িতে আর থাকি কতক্ষণ?

তার মানে আগের মতই আছ তুমি, বলল জিনি। একটু থেমে আবার বলল, গেস্ট রূমটা তাহলে ঠিক করে দিই?

তোমার শোবার ঘরে জায়গা হয় না আমার?

রাঙা হয়ে উঠল জিনির মুখ। বলল, না।

ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে জিনি। হাসছে জনিও। এখনও সদ্ভাব বজায় আছে ওদের মধ্যে। পরদিন অনেক বেলায় ঘুম ভাঙল জনির। দেখল জানালার পর্দাগুলো সরানো হয়েছে, সেই ফাঁক দিয়ে রোদ ঢুকছে ঘরে। তুমি কোথায়, জিনি? চেঁচিয়ে উঠল জনি। অনেক দেরি করে ফেলেছি। ব্রেকফাস্ট পাব?

দাঁড়াও, একসেকেণ্ড, দূর থেকে ভেসে এল জিনির কণ্ঠস্বর।

সত্যি এক সেকেণ্ড। নিশ্চয়ই সব কিছু তৈরি করে রেখেছিল জিনি, দিনের প্রথম সিগারেট ধরাতে না ধরাতে খুলে গেল দরজা, চাকা লাগানো ব্রেকফাস্টের ট্রেটা ঠেলে নিয়ে ভিতরে ঢুকছে ওর ছোট ছোট মেয়ে দুটো।

কচি মুখগুলো এত সুন্দর, দেখে ব্যথায় বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল জনির। পরিষ্কার, উজ্জল চোধগুলোয় চিকচিক করছে কৌতূহল, ওর কাছে ছুটে আসার জন্যে ব্যর্থতায় উদ্ভাসিত হয়ে আছে মুখগুলো। সেকেলে ঢংয়ে লম্বা লম্বা বেণী করে বাঁধা ওদের চুল। পরনের ফ্রকগুলোও সেকেলে। পেটেন্ট লেদারের সাদা জুতো পায়ে। ইশারা করতেই ছুটে এল ওরা। ট্রের পাশে দাঁড়িয়ে বাবার সিগারেট নেভানো দেখছে, অপেক্ষা করছে কখন ওদেরকে দুহাত বাড়িয়ে ডাকবে বাবা। ইশারা করতেই ছুটে এল ওরা। ওদের কচি মুখে কর্কশ দাড়ি গজানো মুখ ঘষে দিচ্ছে জনি, ওরাও চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছে। দরজায় উদয় হলো জিনি, ব্রেকফাস্ট ট্রেটা ঠেলে নিয়ে এল সে বাকি পথটা, যাতে বিছানায় শুয়েই নাস্তা সারতে পারে জনি। খাটের কিনারায় ওর পাশে বসল জিনি, কাপে কফি ঢেলে দিচ্ছে, মাখন লাগিয়ে দিচ্ছে রুটিতে। সোফায় বসে মেয়ে দুটো দেখছে বাবাকে। বালিশের দখল নিয়ে লড়াই করার বয়স পেরিয়ে এসেছে ওরা, বাবার কাছ থেকে আদর পাবার পর এরই মধ্যে যে যার এলোমেলো চুল ঠিকঠাক করে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কি সর্বনাশ, ভাবছে জনি, কদিন পরই যে সেয়ানা হয়ে যাবে ওরা! ছায়ার মত লেগে থাকবে ওঁদের পিছনে হলিউডের ছোকরাগুলো। মেয়েদেরকে টোস্ট আর বেকনের ভাগ দিচ্ছে জনি, কফির কাপে চুমুক দিতে দিচ্ছে।

দুচারজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর জিনি ছাড়া কেউ জানে না, মেয়েদেরকে কি ভীষণ ভালবাসে জনি। বিয়ে ভেঙে বাড়ি ছাড়া হবার সময় এই তীব্র ভালবাসাই সবচেয়ে বেদনাময় হয়ে উঠেছিল। ওদের বাবার পদে যাতে আসীন থাকতে পারে তার জন্যে জনি কোর্টে মামলা পর্যন্ত লড়েছে। কৌশলে জিনিকে জানিয়ে দিয়েছিল ও, সে যদি আবার বিয়ে করে তাহলে খুশি হবে না ও, ঈর্ষাজনিত কোন কারণে নয়, মেয়েদের বাবার পদ হারাতে হবে বলে। ওদেরকে টাকা-পয়সা দেবারও এমন ব্যবস্থা করেছিল যাতে বিয়ে না করলেই বেশি লাভ হয় জিনির। আভাসে দুজনের মধ্যে এমন কি এই বোঝাঁপড়াও হয়ে গেছে যে জিনি ইচ্ছা করলে গোপন প্রেমিক পর্যন্ত জোটাতে পারবে, কিন্তু ওদের পারিবারিক জীবনে তার বা তাদের প্রবেশ করা চলবে না।

জিনিকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে জনি। তাছাড়া জানে, যৌন বিষয়ে সব সময়ই গোড়া আর লাজুক সে। জনি তাকে কত টাকা দিয়েছে তা জানার আশায় তার পিছনে ঘুর ঘুর করে বেড়ায় হলিউডের রোমিওরা, স্বামীর কাছ থেকে আরও কত রকম সুযোগ সুবিধে আদায় করে দেয়া যায় সে-ব্যাপারে অযাচিত পরামর্শ দান করে তাকে। এখন পর্যন্ত সবাইকে শুধু নিরাশই করেছে জিনি।

গতরাতে একসাথে শুতে চাওয়ায় জিনি ভুল বুঝবে, সে ভয় নেই জনির। দুজনের কেউই আর আগের সম্পর্কে ফিরে যেতে চায় না। সৌন্দর্য আর রূপের পূজারী জনি, এটা জিনি বুঝতে পারে। তার চেয়ে শতগুণ সুন্দরী মেয়েদের প্রতি জনির আকর্ষণ দুর্নিবার। কে না জানে সহকর্মী চিত্রনায়িকাদের সাথে কমপক্ষে একবার করে শোবেই জনি। জনির সুকুমার মাধুর্যের প্রতি মেয়েদেরও রয়েছে অদম্য আকর্ষণ।

টমের প্লেন আসতে খুব বেশি দেরি নেই, বলল জিনি। কাপড়চোপড় পরে তৈরি হয়ে নাও। আদরের ধমক লাগিয়ে মেয়েদেরকে ঘর থেকে বের করে দিল সে।

হুঁ, বলল জনি। ভাল কথা, জিনি, তুমি জানো বিয়েটা ভেঙে যাচ্ছে আমাদের? আবার একজন বন্ধনহীন মুক্ত পুরুষ হয়ে যাচ্ছি আমি।

জনির কাপড় পরা দেখছে জিনি। কনি কর্লিয়নির বিয়ের পর পরই ওদের মধ্যে গড়ে উঠেছে নতুন একটা সুসম্পর্ক। সেই থেকে এ-বাড়িতে এক প্রস্থ পোশক রাখে জনি।

আর মাত্র দুহপ্তা বাকি বড় দিনের, বলল জিনি। তুমি এখানে থাকবে ধরে নিয়ে উৎসবের আয়োজন করব?

ছুটির কথা এই প্রথম মাথায় ঢুকল জনির। যখন ভাল গাইতে পারত তখম কত জায়গা থেকে লোভনীয় আমন্ত্রণ আসত, তবু সে-সব দিনে বড় দিনকে পবিত্র একটা উৎসব বলেই মনে হত ওরা, এবারের বড় দিনটাও যদি হারাতে হয়, এই নিয়ে দুবার হবে। গত বছর বড়দিনে স্পেনে ছিল ও, দ্বিতীয় স্ত্রীকে বিয়েতে রাজি করাবার সাধনায়।

হ্যাঁ, বলল জনি। বড়দিন আর তার আগের দিনটা। নিউ ইয়ারস ঈভ অর্থাৎ নতুন বছরের আগের রাত সম্পর্কে কিছু বলল না ও। কিছুদিন পরপরই উন্মত্ত, বেপরোয়া একটা রাতের দরকার হয় ওর, ওটা হবে সেই রকম একটা রাত। বন্ধু বান্ধব নিয়ে হৈ-চৈ করবে, প্রাণ ভরে মদ খাবে। তখন সেখানে বউ-টউ থাকলে পোষাবে না।

জ্যাকেটটা পরতে ওকে সাহায্য করল জিনি, ব্রাশ দিয়ে ঝেড়ে দিল সেটা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সব সময়ই একটা খুঁতখুঁতে ভাব থেকে যায় জনির মধ্যে। লক্ষ করল জিনি, আজ যে শার্টটা পরেছে সেটার ধোলাই পছন্দসই হয়নি বলে ভুরু কোঁচকাল জনি। অনেক দিন ব্যবহার করা হয়নি হাতার বোতামগুলোও, আজকাল ও এত জমকালো আর রঙচঙে বোম পরে না।

মৃদু হেসে বলল জিনি, তুমি যে বদলেছ, তা টেরই পাবে না টম।

মেয়েরাও বেরিয়ে এসে গাড়ি পর্যন্ত এল জনিকে বিদায় জানাতে। মেয়েরা ওর হাত দুটো ধরে আছে। স্ত্রী একটু পিছনে। কত সুখী দেখাচ্ছে জনিকে, লক্ষ করে অদ্ভুত এক আনন্দে ভরে উঠল জিনির বুকও।

গাড়ির কাছে পৌঁছে পালা করে দুই মেয়েকে শূন্যে, অনেক উঁচুতে তুলে মিল জনি, তারপর নামাবার সময় চুমো খেলো। সবশেষে জিনিকে চুমো খেয়ে উঠে বসল, গাড়িতে। ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে অনেকক্ষণ ধরে বিদায় নেয়া পছন্দ করে সে।

ওর সহকারী এবং জনসংযোগ কর্মী সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। সোফার সহ একটা ভাড়াটে গাড়ি অপেক্ষা করছে ওর বাড়িতে। জনসংযোগ কর্মী অর্থাৎ পি. আর, অপর এক সহযোগীকে নিয়ে বসে আছে গাড়িতে। নিজের গাড়ি পার্ক করে ওই গাড়িতে চড়ল জনি। সাথে সাথে গাড়ি ছেড়ে দিল সোফার, এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছে ওরা।

এয়ারপোর্টে পৌঁছে পি, আর, নেমে গেল টম হেগেনকে রিসিভ করতে, গাড়ি থেকে নামল না জনি। একটু পরই গাড়িতে উঠল টম হেগেন। জনি তার সাথে হ্যাণ্ডশেক করল। গাড়ি আবার ছুটতে শুরু করেছে ফিরতি পথে।

জনির বাড়িতে পৌঁছুল গাড়ি। নিরিবিলি লিভিংরূমে টম হেগেনের মুখোমুখি হলো জনি। দুজনের সম্পর্কের মধ্যে ঠাণ্ডা, নিস্তেজ একটা ভাব আছে। কনি কর্লিয়নির বিয়ের আগে, ডন যখন ওর উপর রেগে ছিলেন, তখন তার সাথে যোগাযোগ করার পথে একমাত্র বাধাদানকারীর ভূমিকা নিয়েছিল এই টম হেগেন, কথাটা আজও ভোলেনি জনি। রাগটা তার রয়েই গেছে।

এই অবাঞ্ছিত ভূমিকার জন্যে হেগেন কখনও কোন অজুহাতও দেখায়নি। ওর পক্ষে তা সম্ভবই ছিল না। গরম লোহা দিয়ে অপ্রীতিকর ছ্যাঁকা দেয়াটাও ওর চাকরির একটা অংশ, কিন্তু এই শাস্তিটা যে ডনের তরফ থেকে এল তা লোকে ভয়ে আর শ্রদ্ধায় বিশ্বাস করতে প্রস্তুত থাকে না কখনও। যত রাগ তাদের এই টম হেগেনের ওপর, অথচ এ সবই ডনের প্রাপ্য।

তোমার গড ফাদার কেন আমাকে পাঠিয়েছেন তা তো তোমাকে আমি আগেই বলেছি, আনুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে শুরু করল টম হেগেন। নিশ্চয়ই জানো যে তোমার জন্যে ভাল হবে এমন সব কাজ তিনি করতে চান। যে দায়িত্বটা আমার ঘাড়ে চেপেছে সেটা আমি বড়দিনের আগেই নামিয়ে ফেলতে চাই।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল জনি, ছবির কাজ তো শেষ। পরিচালক চৌকশ লোক, কাজ দেখাবার প্রচুর সুযোগ করে দিয়েছে আমাকে সে। ওলটস এখনও আমার ক্ষতি করতে চাইলেও ছবিতে আমার দৃশ্যগুলো এতই গুরুত্বপূর্ণ যে কাঁচি দিয়ে সেগুলো কেটে ফেলে দিতেও পারবে না। আর যাই হোক, এক কোটি ডলারের একটা ছবির বারোটা বাজানো তো আর সম্ভব নয় তার পক্ষে। তার মানে আমার অভিনয় দর্শকরা কতটা ভাল হয়েছে বলে মনে করবে তার ওপর নির্ভর করছে সব।

সতর্ক ভঙ্গিতে জানতে চাইল হেগেন, এখন প্রশ্ন হলো, এই একাডেমি পুরস্কারটা কি সত্যিই একজন অভিনেতার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ? এতে কি আরও উন্নতির পথ সুগম হবে? যশ, খ্যাতি সত্যিই কি বাড়বে? নাকি আর সব সাধারণ ব্যাপারের মত প্রচারণার খাতিরে, নেহাত মোহের বশে এই পুরস্কার পেতে চায় লোকে?

নিঃশব্দে হাসছে জনি। বলল, যশ, খ্যাতি এসব তো আমার গড ফাদারের দরুকার নেই। বা তোমারও। না টম, জিনিসটা অত ঠুনকো নয়। একটা,একাডেমি পুরস্কার একজন অভিনেতাকে দশ বছরের স্থায়ীত্ব দিতে পারে। চরিত্র বাছাই করার অধিকার এসে যায় তার। লোকজন তার সাথে দেখা করতে যায়। সব কিছু নয় বটে, অমরত্ব প্রাপ্তি নয়, কিন্তু একজন অভিনেতার জীবনে এরচেয়ে বড় কিছু আর হতেও পারে না। পুরস্কারটা আমি পাব বলে ভরসা রাখি। আবার যদি উঠি, এটাই আমাকে ওঠাবে। পাব, কিন্তু আমি খুব বড় অভিনেতা বলে নয়, একজন গায়ক হিসেবে প্রাথমিক পরিচিতিটা আছে আর এই ছবিটায় আমার ভূমিকা সব দিক থেকে নিচ্ছিদ্র বলে পাব। ঠাট্টা নয়, সত্যি খুব ভাল অভিনয় করেছি আমি।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল হেগেন, পরিস্থিতির সব দিক বিবেচনা করে তোমার গড ফাদার আমাকে ঠিক উল্টো কথা বলছেন। তিনি বলছেন, পুরস্কারটা পাবার কোন সম্ভাবনা নেই তোমার।

কথাটা শুনেই রেগে ঠাঁই হয়ে উঠল জনি। কি আবোল-তাবোল বকছ। ছবিটা এখনও সম্পাদনাই করা হয়নি, দেখানো CT দূরের কথা। আর ডন তো সিনেমা। ব্যবসার ধারে কাছেও নেই। স্রেফ এ ধরনের প্রলাপ বকার জন্যে তিন হাজার মাইল উড়ে কেন আমার কাছে এসেছ তুমি? হেগেনের কথায় এমন ধাক্কা খেয়েছে জনি যে চোখে প্রায় পানি বেরিয়ে আসার অবস্থা হয়েছে ওর।

কণ্ঠরে উদ্বেগ ফুটিয়ে তুলে বলল হেগেন, দেখো, জনি, ছবির জগতের এসব বিষয়ে বিন্দুবিসর্গ কিছুই আমি জানি না। মনে রেখো, আমি ডনের নিজস্ব সংবাদদাতা ছাড়া কিছুই নই। তবে তোমার এ-বিষয়টা নিয়ে বেশ কয়েকবার আলোচনা করেছি আমরা। তিনি তোমার সম্পর্কে উদ্বিগ্ন, তোমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে চিন্তিত। তিনি মনে করেন, তার সাহায্য এখনও দরকার তোমার। এমন একটা সমাধান দিতে চান তিনি যাতে তোমার সমস্ত সমস্যার স্থায়ী সুরাহা হয়ে যাবে। সেই উদ্দেশ্যেই এখানে আমার আসা, যাতে বাক নিয়ে তোমার অনুকূলে বইতে শুরু করে বাতাস। কিন্তু আর ছেলেমানুষি নয়, জনি, এবার তোমাকে গুরুত্ব দিয়ে সব ব্যাপার বুঝতে শিখতে হবে। নিজেকে একজন গায়ক বা অভিনেতা ধরে, নিয়ে চিন্তাভাবনা করা থামাও দেখি। নিজেকে প্রধান ব্যক্তি বলে মনে করতে শেখো, মনে করো তুমি হর্তাকর্তা-বিধাতা। দাপট দেখিয়ে বেড়াবার জন্যে তৈরি হয়ে নাও।

হেসে নিজের গ্লাসে হুইস্কি ভরে নিল জনি। ওই অস্কার পুরস্কারটা আমি যদি পাই, আমার ছোট্ট মেয়েদের মত দাপট দেখাবার শক্তিও আর অবশিষ্ট থাকবে না আমার মধ্যে। গলাটা গেছে, ওটা যদি ফিরে পেতাম, চিন্তা করতাম না, আবার আমি কেউকেটা হয়ে উঠতে পারতাম। বুঝতে পারছি, অভাগার কপাল পুড়েছে, গলাটা ফিরে পাবার কোন আশাই নেই। কিন্তু আমার গড ফাদার জানলেন কিভাবে পুরস্কারটা আমি পাচ্ছি না? ঠিক আছে, বিশ্বাস করছি তিনি জানেন। তার জানায় কখনও ভুল থাকে না।

মোটা একটা চুরুট ধরাল হেগেন। আমরা জানতে পেরেছি তোমার প্রার্থীপদ সমর্থন করার জন্যে স্টুডিওর একটা কানাকড়িও খরচ করবে না জ্যাক ওলটস। শুধু তাই নয়, যারা ভোট দেবে তাদের প্রত্যেককে খবর পাঠিয়ে জানিয়ে দিয়েছে। যে পুরস্কারটা তুমি পাও তা সে চায় না। আরেকজন সভাব্য প্রার্থী যাতে তোমার মতই বিরোধীতার সম্মুখীন হয় তার জন্যেও যথাসাধ্য চেষ্টা করছে সে। ঘষ দেবার সমস্ত কায়দা কাজে লাগাচ্ছে–চাকরি, টাকা, মেয়েমানুষ–সব। আর এসব সে করছে ছবিটার কোন ক্ষতি না করেই বা যতটা কম ক্ষতি করে পারা যায়।

কাঁধ ঝাঁকাল জনি। গ্লাসে হুইস্কি ভরে সেটা ঢকঢক করে গিলে নিল। তাহলে শেষ হয়ে গেছি আমি।

ঠোঁটের একদিকের কোণ বেঁকে গেল, তীর তিরস্কারের দৃষ্টি ফুটে উঠল হেগেনের চোখে। কি মনে করো, মদ গিললে ভাল হয়ে যাবে তোমার গলা? বলল সে।

দূর হও তুমি! খেঁকিয়ে উঠল জনি।

নিমেষে নিভাঁজ, গম্ভীর হয়ে উঠল হেগেনের চেহারা। বলল, ঠিক আছে, শুধু কাজের কথাই হবে তোমার সাথে।

গ্লাসটা কাত করে হুইস্কিটুকু ফেলে দিল জনি, উঠে পড়ল সোফা ছেড়ে, এগিয়ে এসে দাঁড়াল হেগেনের সামনে। কথাটা বলে অন্যায় করেছি আমি, টম, বলল সে। দুঃখিত। আসলে জ্যাক ওলটসকে খুন করতে চাই, কিন্তু কথাটা গড ফাদারকে বলার সাহস আমার নেই, সেই রাগের ঝালটা তোমার ওপর ঝাড়ছি আমি। চোখ দুটো ছলছল করছে জনির। হাতের খালি গ্লাসটা ছুঁড়ে মারল সে, কিন্তু এমন দুর্বলভাবে যে মোটা কাঁচের ভারি গ্লাসটার কোথাও চিড় পর্যন্ত ধরল না, দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ওর পায়ের কাছে গড়িয়ে ফিরে এল সেটা। প্রচণ্ড রাগে সেটার দিকে তাকিয়ে আছে ও। তারপর হঠাৎ হেসে উঠল। বলল, হায় যীশু?

কামরার অপর প্রান্তে সরে গিয়ে হেগেনের দিকে মুখ করে বসল ও। তুমি তো জানো, একটানা অনেকদিন সব কিছু ঠিক নিজের ইচ্ছা মত করে পেয়েছি আমি। তারপর জিনিকে শ্রাগ করার সাথে সাথে সব কিছু বিরূপ হয়ে উঠল আমার জীবনে। গলাটা হারালাম। আমার রেকর্ড আর বিক্রি হয় না। কোন ছবিতে কাজ করার জন্যে আমাকে কেউ আর ডাকে না। আর এই ঠিক সময়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন আমার গড় ফাদার, ফোনে কথা বলেন না; নিউ ইয়র্কে এলে দেখা দেন না। তাঁর আর আমার মাঝখানে সব সময় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছ তুমি, তোমার ওপরই রাগ হয়েছে আমার, কিন্তু সেই সাথে এও জানতাম যে ডনের নির্দেশ ছাড়া এ-কাজ করছ না তুমি। কিন্তু তার ওপর কিভাবে চটি আমি! সষ্টিকর্তার ওপর চটে ওঠার মত অসম্ভব একটা ব্যাপার নয় সেটা? তাই তোমার ওপরই যত রাগ আমার। কিন্তু তুমি বরাবরই সঠিক পথ দেখিয়ে এসেছ। আমি যে সত্যি ক্ষমাপ্রার্থী তা তোমার পরামর্শ গ্রহণ করে প্রমাণ করব। গলাটা ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত মদ ছোঁব না, ঠিক আছে?

মাফ চাওয়াটা আন্তরিক বুঝতে পেরে রাগ পানি হয়ে গেল হেগেনের। পঁয়ত্রিশ বছরের এই খোকার মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু একটা আছে, তা নাহলে ডন এত স্নেহ করতেন না। ভুলে যাও, জনি। জনির কাতর অনুভূতির গভীরতা উপলব্ধি করে অস্বস্তিবোধ করছে ও, অস্বস্থিবোধ করছে এই সন্দেহ করে যে এই কাতরতার উৎস ভীতিও হতে পারেন তার বিরুদ্ধে চলে যাবেন এই ভীতি। অথচ কারও কথায় প্রভাবিত হয়ে কখনই কোন কারণে কারও বিরুদ্ধে চুলে যান না ডন। স্নেহ ভালবাসার ব্যাপারেও ডন শুধু নিজের ইচ্ছেয় পরিচালিত হন।

অবস্থা অতটা খারাপ নয়, জনিকে বলল ও! ডন জানিয়েছেন ওলটস তোমার বিরুদ্ধে যাই করুক না কেন, সবই তিনি বাতিল করতে পারবেন। বলেছেন, প্রায় নিশ্চিত ভাবে ধরে নিতে পারো পুরস্কারটা তুমিই পাবে। কিন্তু তিনি মনে করেন, পুরস্কার পেলেই তোমার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। তিনি জানতে চেয়েছেন, তুমি নিজেই একজন প্রযোজক হবার মত যোগ্যতা এবং সাহস রাখো কিনা। আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত একটা ছবি বানাতে পারবে?

দুই চোখে অবিশ্বাস নিয়ে কয়েক সেকেণ্ড তাকিয়ে থাকল জনি। কিভাবে? কিভাবে তা সম্ভব? কিভাবে ডন আমাকে পুরস্কারটা পাইয়ে দিতে পারেন?

তীক্ষ্ণ গলায় বলল হেগেন, এটাই বা তুমি এত সহজে বিশ্বাস করতে পারছ কিভাবে যে ওলটস যা পারবে তোমার গড ফাদার তা পারবেন না? আমাদের চুক্তির অপর অংশ সম্পর্কে তোমার মনে আস্থার ভাব আনা দরকার, তাই কথাটা তোমাকে না বলে পারছি না। দেখো, কথাটা যেন দুকান না হয়। তোমার গড ফাদার জ্যাক ওলটসের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাবান। এর চেয়ে আরও অনেক কঠিন পরিবেশেও তার প্রভাব আর ক্ষমতার তুলনা হয় না। তোমাকে তিনি পুরস্কারটা পাইয়ে দেবেন-কিভাবে? তিনি পরিচালনা করেন বরং বলা উচিত, যারা এই শিল্পের ইউনিয়নগুলো পরিচালনা করে, তিনি তাদেরকে পরিচালনা করেন। যারা ভোট দেয় তাদের সবাই, বা তাদের প্রায় সবাই তার কথা মেনে চলে। তবে, অবশ্যই তোমাকেও ভাল হতে হবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মোগ্যতা তোমারও থাকতে হবে। জ্যাক ওলটসের চেয়ে অনেক অনেক বেশি বুদ্ধি রাখেন তোমার গড ফাদার। সংশ্লিষ্ট লোকদের কাছে গিয়ে তিনি তাদের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বলবেন না যে, জনি ফন্টেনকে ভোট দাও তা না হলে চাকরি হারাও। যেখানে গায়ের জোর খাটে না বা খাটালে মানুষের মন আহত হয় সেখানে তিনি এসব প্রয়োগ করেন না। তিনি এদেরকে তোমার পক্ষে ভোট দেওয়াবেন, কারণ এরা তোমাকেই ভোট দিতে চায়। কিন্তু তা এরা চাইবে না, যদি না তোমার গড ফাদার এ-ব্যাপারে আগ্রহ দেখান। এখন তুমি আমার কথায় পূর্ণ আস্থা রেখে বিশ্বাস করো, পুরস্কারটা তুমিই পাচ্ছ। মনে রেখো, তিনি না চাইলে সারা জীবন চেষ্টা করলেও ওটার নাগাল পাবে না তুমি।

ঠিক আছে, বলল জনি। তোমার ওপর বিশ্বাস রাখছি আমি। একজন প্রযোজক হবার যোগ্যতা আর সাহসও আমার আছে, কিন্তু টাকা নেই। কোন। ব্যাংক টাকা পয়সাও ধার দেবে না আমাকে। একটা ছবি করা তো আর মুখের কথা নয়, লক্ষ লক্ষ ডলার লাগে।

শান্ত ভঙ্গিতে বলল হেগেল, পুরস্কারটা পাবার পর একসাথে নিজের তিনটে ছবি তৈরি করার পরিকল্পনা হাতে নাও। এই ব্যবসায় জড়িত সেরা লোকদেরকে ভাড়া করবে-সেরা টেকনিশিয়ান, সেরা তারকা, যাকে যাকে দরকার। তিন থেকে পাঁচটা ছবির জন্যে প্রস্তুতি নেবে তুমি।

পাগল হয়ে গেছ! বলল জনি! অতগুলো ছবি করতে প্রায় দুকোটি ডলার দরকার।

যখন দরকার হবে টাকাটার, বলল হেগেন, আমার সাথে যোগাযোগ কোরো। টাকা মোগান দেবার জন্যে ক্যালিফোর্নিয়ার কোন ব্যাঙ্ককে অনুরোধ করতে হবে তা জানিয়ে দেব তোমাকে আমি চিন্তার কিছু নেই, ছবির জন্যে টাকা তো দেয়ই ওরা। সঙ্গত কারণ দেখিয়ে সাধারণ নিয়ম মত টাকাটা চাইবে তুমি, ঠিক যেভাবে ব্যবসায়ীরা চেয়ে থাকে। তুমি চাইলেই দেবে ওরা। তবে তার আগে আমার সাথে একবার দেখা করতে হবে তোমাকে দেখা করে টাকার অঙ্ক আর, প্ল্যানটা জানাতে হবে আমাকে। ঠিক আছে?

অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে কি যেন ভাবল জুনি। তারপর খুব ধী