বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী

১. বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) (৫৭০-৬৩২ খ্রি:)

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী – মাইকেল এইচ. হার্ট / সম্পাদনায় – রামশংকর দেবনাথ

প্রথম সংস্করণ : এপ্রিল ২০১৯

ভূমিকা

“বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী” শিরোনামের বইটি প্রথম রচনা ও সংকলন করেন পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব মাইকেল এইচ. হার্ট।

এ গ্রন্থে তিনি সর্বপ্রথম হযরত মুহাম্মদ (স.) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী বর্ণনা করেছেন। এরপর তিনি অন্যান্য শ্রেষ্ঠ মনীষীদের জীবনী সংকলিত করেছেন। এখানে একটা বিষয় লক্ষ্যনীয়, শুধু তিনি নন, সারা বিশ্বের মানুষ স্বীকার করেছেন, হযরত মুহাম্মদ (স.)-ই বিশ্বের সেরা মানব।

একশ জন মনীষীর জীবনীকে এক মলাটে স্থান দেয়া খুব সহজ কাজ নয়। অনেকেই মাইকেল এইচ. হার্ট-এর নাম দিয়ে নিজেদের পছন্দমত মনীষীদের জীবনী বইয়ে সংকলিত করে দেন। তবে আমাদের মনে হয় এতেও খুব একটা খারাপ কিছু নেই। একজন না হোন অন্য কোনো মনীষীর জীবনী তো গ্রন্থে সংকলিত হচ্ছে। যদিও আমাদের প্রকাশিত গ্রন্থে মাইকেল এইচ, হার্টের গ্রন্থটিকে যথাযথ অনুসরণের চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু কয়েকজন বাঙালি মনীষীকে গ্রন্থটিতে আবশ্যিকভাবে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে কয়েকজন মনীষীর (যে সকল মনীষীগণ আসলে পাশ্চাত্য দেশেই সুপরিচিত) পরিবর্তে। বাঙালিদের কাছে একেবারেই অপরিচিত এসকল মনীষীদের জীবনীর বদলে বাঙালি মনীষীদের জীবনী সংকলন করাই আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে। যদিও স্বদেশ ও বিদেশের সহস্র সহস্র মহান মনীষীদের মধ্য থেকে মাত্র একশ জন মনীষীকে বেছে নেয়া সত্যিই কঠিন কাজ।

আমরা এ গ্রন্থে জনকল্যাণকামী ধর্মপ্রচারকদের জীবনী দিয়ে জীবনী বর্ণনা শুরু করেছি। এছাড়া এ গ্রন্থে আরো সংকলিত হয়েছেন বিশ্বের বিখ্যাত বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সাহিত্যিক, রাষ্ট্রনায়ক, কবি, মানবতাবাদী জনসেবক এবং চিত্রশিল্পীদের। আমাদের প্রত্যাশা স্ব স্ব ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ায় আরোহণকারী এসকল মহান ব্যক্তিত্বদের জীবনী, তাদের বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনসংগ্রাম, প্রচেষ্টা ও সফলতা পাঠকদের অনুপ্রাণিত করবে।

১. বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) (৫৭০-৬৩২ খ্রি:)

যে মহামানবের সৃষ্টি না হলে এ ধরা পৃষ্ঠের কোন কিছুই সৃষ্টি হতো না, যার পদচারণ লাখ পৃথিবী ধন্য হয়েছে; আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালবাসা, অন্তরের পবিত্রতা, আত্মার মহত্ত্ব, ধৈৰ্য্য, ক্ষমা, সততা, নম্রতা, বদান্যতা, মিতাচার, আমানতদারী, সুরুচিপূর্ণ মনোভাব, ন্যায়পরায়ণতা, উদারতা ও কঠোর কর্তব্যনিষ্ঠা ছিল যার চরিত্রের ভূষণ; যিনি ছিলেন একাধারে ইয়াতীম হিসেবে সবার স্নেহের পাত্র, স্বামী হিসেবে প্রেমময়, পিতা হিসেবে স্নেহের আধার, সঙ্গী হিসেবে বিশ্বস্ত; যিনি ছিলেন সফল ব্যবসায়ী, দূরদর্শী সংস্কারক, ন্যায় বিচারক, মহৎ রাজনীতিবিদ এবং সফল রাষ্ট্র নায়ক; তিনি হলেন সর্বকালের সর্বযুগের এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। তিনি এমন এক সময় পৃথিবীর বুকে আবির্ভূত হয়েছিলেন যখন আরবের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা অধঃপতনের চরম সীমায় নেমে গিয়েছিল।

৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট মোতাবেক ১২ রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার প্রত্যূষে আরবের মক্কা নগরীতে সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে মাতা আমেনার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জন্মের ৫ মাস পূর্বে পিতা আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। আরবের তৎকালীন অভিজাত পরিবারের প্রথানুযায়ী তাঁর লালনপালন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অর্পিত হয় বনী সা’দ গোত্রের বিবি হালিমার উপর। এ সময় বিবি হালিমার আরেক পুত্র সন্তান ছিল, যার দুধ পানের মুদ্দত তখনো শেষ হয়নি। বিবি হালিমা বর্ণনা করেন, “শিশু মুহাম্মদ কেবলমাত্র আমার ডান স্তনের দুধ পান করত। আমি তাকে আমার বাম স্তনের দুধ দান করতে চাইলেও, তিনি কখনো বাম স্তন হতে দুধ পান করতেন না। আমার বাম স্তনের দুধ তিনি তার অপর দুধ ভাইয়ের জন্যে রেখে দিতেন। দুধ পানের শেষ দিবস পর্যন্ত তাঁর এ নিয়ম বিদ্যমান ছিল।” ইনসাফ ও সাম্যের মহান আদর্শ তিনি শিশুকালেই দেখিয়ে দিয়েছেন। মাত্র ৫ বছর তিনি ধাত্রী মা হালিমার তত্ত্বাবধানে ছিলেন। এরপর ফিরে আসেন মাতা আমেনার গৃহে। ৬ বছর বয়সে তিনি মাতা আমেনার সাথে পিতার কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদীনা যান এবং মদীনা হতে প্রত্যাবর্তনকালে আবহাওয়া নামক স্থানে মাতা আমেনা ইন্তেকাল করেন। এরপর ইয়াতীম মুহাম্মদ (সাঃ) এর লালন পালনের দায়িত্ব অর্পিত হয় ক্রমান্বয়ে দাদা আবদুল মোত্তালিব ও চাচা আবু তালিবের উপর। পৃথিবীর সর্ব শ্রেষ্ঠ যে মহামানব আবির্ভূত হয়েছেন সারা জাহানের রহমত হিসেবে; তিনি হলেন আজন্ম ইয়াতীম এবং দুঃখ বেদনার মধ্য দিয়েই তিনি গড়ে উঠেন সত্যবাদী, পরোপকারী এবং আমানতদারী হিসেবে। তাঁর চরিত্র, আমানতদারী, ও সত্যবাদিতার জন্যে আরবের কাফেররা তাঁকে, ‘আল আমীন’ অর্থাৎ ‘বিশ্বাসী’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল। তৎকালীন আরবে অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা, হত্যা, যুদ্ধবিগ্রহ ইত্যাদি ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার। ‘হরবে ফুজ্জার’ এর নৃশংসতা বিভীষিকা ও তান্ডবলীলা দেখে বালক মুহাম্মদ (সাঃ) দারুণভাবে ব্যথিত হন এবং ৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১৪ বছর বয়সে চাচা হযরত যুবায়ের (রাঃ) ও কয়েকজন যুবককে সাথে নিয়ে অসহায় ও দুর্গত মানুষদের সাহায্যার্থে এবং বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার দীপ্ত অংগীকার নিয়ে গড়ে তোলেন ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক একটি সমাজ সেবামূলক সংগঠন। বালক মুহাম্মদ (সাঃ) ভবিষ্যতে জীবনে যে শান্তি স্থাপনের অগ্রদূত হবেন এখানেই তার প্রমাণ মেলে।

যুবক মুহাম্মদ (সাঃ) এর সততা, বিশ্বস্ততা, চিন্তা চেতনা, কর্ম দক্ষতা ও ন্যায় পরায়ণতায় মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন আরবের ধনাঢ্য ও বিধবা মহিলা বিবি খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ বিবাহের প্রস্তাব দেন। এ সময় বিবি খাদিজার বয়স ছিল ৪০ বছর এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স ছিল ২৫ বছর। তিনি চাচা আবু তালিবের সম্মতিক্রমে বিবি খাদিজার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। বিবাহের পর বিবি খাদিজা তাঁর ধন-সম্পদ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর হাতে তুলে দেন। কিন্তু তৎকালীন আরবের কাফের, মুশরিক, ইহুদি, নাসারা ও অন্যান্য ধর্ম মতাবলম্বীদের অন্যায়, জুলুম, অবিচার, মিথ্যা, ও পাপাচার দেখে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর হৃদয় দুঃখ বেদনায় ভরে যেত এবং পৃথিবীতে কিভাবে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায়, সে চিন্তায় তিনি প্রায়ই মক্কার অনতিদূরে ‘হেরা’ নামক পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। বিবি খাদিজা স্বামীর মহৎ প্রতিভা ও মহান ব্যক্তিত্ব উপলব্ধি করতে পেরে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিশ্চিত মনে অবসর সময় ‘হেরা’ পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকার পূর্ণ সুযোগ দিয়েছিলেন। ক্রমান্বয়ে তাঁর বয়স যখন ৪০ বছর পূর্ণ হয় তখন তিনি নয়্যত লাভ করেন এবং তাঁর উপর সর্ব প্রথম নাজিল হয় পবিত্র কোরআনের সূরা-আলাকের প্রথম কয়েকটি আয়াত। এরপর সুদীর্ঘ ২৩ বছরে বিভিন্ন ঘটনা ও প্রয়োজন অনুসারে তাঁর উপর পূর্ণ ৩০ পারা কোরআন শরীফ নাজিল হয় ৷

নবুয়্যত প্রাপ্তির পর প্রথম প্রায় ৩ বছর তিনি গোপনে স্বীয় পরিবার ও আত্মীয়ের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত প্রচার করেন। সর্ব প্রথম ইসলাম কবুল করেন বিবি খাদিজা (রাঃ)। এরপর যখন তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং ঘোষণা করেন, ‘লা–ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ’ তখন মক্কার কুরাইশ কাফেররা তাঁর বিরোধিতা করতে শুরু করে। এতদিন বিশ্বনবী (সাঃ) কুরাইশদের নিকট ছিলেন ‘আল্ আমীন’ হিসেবে পরিচিত; কিন্তু এ ঘোষণা দেয়ার পর তিনি হলেন কুরাইশ কাফেরদের ভাষায় একজন জাদুকর ও পাগল। যেহেতু কোরআন আরবী ভাষায় নাজিল হয়েছে এবং আরববাসীদের ভাষাও ছিল আরবী, তাই তারা হযরদ মুহাম্মদ (সাঃ) এর বাণীর মর্মার্থ অনুধাবন করতে পেরেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, মুহাম্মদ (সাঃ) যা প্রচার করছেন তা কোন সাধারণ কথা নয়। যদি এটা মেনে নেয়া হয় তাহলে তাদের ক্ষমতার মসনদ টিকে থাকবে না। তাই তারা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে বিভিন্ন ভয়, ভীতি, হুমকি; এমনকি ধন-দৌলত ও আরবের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী যুবতী নারীদের দেবার লোভ দেখাতে শুরু করে। মুহাম্মদ (সাঃ) কাফিরদের শত ষড়যন্ত্র ও ভয়ভীতির মধ্যেও ঘোষণা করলেন, “আমার ডান হাতে যদি সূর্য আর বাম হাতে চাঁদও দেয়া হয়, তবু আমি সত্য প্রচার থেকে বিরত থাকব না।” কাফিরদের কোন লোভ লালসা বিশ্বনবী (সাঃ) কে ইসলাম প্রচার থেকে বিন্দুমাত্র বিরত রাখতে পারেনি। মক্কায় যারা পৌত্তলিকতা তথা মূর্তি পূজা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করেছিল কুরাইশরা তাদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন শুরু করে। কিন্তু ইসলামের শাশ্বত বাণী যারা একবার গ্রহণ করেছে তাঁদেরকে শত নির্যাতন করেও ইসলাম থেকে পৌত্তলিকতায় ফিরিয়ে নিতে পারেনি।

৬২০ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবন সঙ্গিনী বিবি খাদিজা (রাঃ) এবং পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করেন। জীবনের এ সংকটময় মুহূর্তে তাঁদেরকে হারিয়ে বিশ্বনবী (সাঃ) শোকে দুঃখে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। বিবি খাদিজা ছিলেন বিশ্বনবীর দুসময়ের স্ত্রী, উপদেষ্টা এবং বিপদ আপদে সান্ত্বনা স্বরূপ। চাচা আবু তালিব ছিলেন শৈশবের অবলম্বল, যৌবনের অভিভাবক এবং পরবর্তী নবুয়্যত জীবনের একনিষ্ঠ সমর্থক। তারা যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন কুরাইশরা মুহাম্মদ (সাঃ) এর বিরোধিতা করলেও সন্ধান করতে থাকে। ইতিমধ্যে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি স্বীয় পালিত পুত্র হযরত যায়েদ বিন হারেসকে সংগে নিয়ে তায়েফ গমন করলে সেখানেও তিনি তায়েফবাসীদের কর্তৃক নির্যাতিত হন। তায়েফবাসীরা প্রস্তরাঘাতে বিশ্বনবীকে জর্জরিত করে ফেলে।

অবশেষে ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২ জুলাই (নবুয়্যতের ত্রয়োদশ বছর) ইতিমধ্যে মদীনায় ইসলামী আন্দোলনের একটি উপযুক্ত ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছিল। মদীনাবাসীগণ মুহাম্মদ (সাঃ) এর কার্যপদ্ধতিতে এক বিরাট পরিবর্তন এনে দেয়। এতদিন মক্কায় ইসলাম ছিল কেবলমাত্র একটি ধর্মের নাম; কিন্তু মদীনায় এসে তিনি দৃঢ় ভিত্তির উপর ইসলামী রাষ্ট্র গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। এতদুদ্দেশ্যে তিনি সেখানে চিরাচরিত গোত্রীয় পার্থক্য তুলে দেন। সে সময় মদীনায় পৌত্তলিক ও ইহুদিরা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল। মুহাম্মদ (সাঃ) মনে প্রাণে অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায় লোকের বাস সেখানে সকল সম্প্রদায়ের সমর্থন ও সহযোগিতা না পেলে ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই তিনি সেখানে সকল সম্প্রদায়ের লোকদের নিয়ে একটি সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং একটি আন্তর্জাতিক সনদপত্রও সাক্ষরিত হয়, যা ইসলামের ইতিহাসে, মদীনার সনদ’ নামে পরিচিত। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র বা সংবিধান। উক্ত সংবিধানে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করা হয়। মুহাম্মদ (সাঃ) হন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সভাপতি। তিনি যে একজন দূরদর্শি ও সফল রাজনীতিবিদ এখানেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মদীনার সনদ নাগরিক জীবনে আমূল পরিবর্তন আনে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্থাপিত হয় ঐক্য। বিশ্বনবী (সাঃ) তলোয়ারের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেননি বরং উদারতার মাধ্যমেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর ও নবদিক্ষিত মুসলমানগণের (সাহাবায়ে কেরাম) চালচলন, কথাবার্তা, সততা ও উদারতায় মুগ্ধ হয়ে যখন দলে দলে লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল তখন কুরাইশ নেতাদের মনে হিংসা ও শত্রুতার উদ্রেক হয়। অপরদিকে মদীনার কতিপয় বিশ্বাসঘাতক মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রাধান্য সহ্য করতে না পেরে গোপনভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। কাফিরদের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করার। জন্যেই মুহাম্মদ (সাঃ) তলোয়ার ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে ঐতিহাসিক বদর, উহুদ ও খন্দক সহ অনেকগুলো যুদ্ধ সংগঠিত হয় এবং সকল যুদ্ধের প্রায় সবগুলোতেই মুসলমানগণ জয়লাভ করেন। বিশ্বনবী (সাঃ) মোট ২৭টি যুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

৬২৭ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ষষ্ঠ হিজরীতে ১৪০০ নিরস্ত্র সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে মুহাম্মদ (সাঃ) মাতৃভূমি দর্শন ও পবিত্র হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা রওনা দেন। কিন্তু পথিমধ্যে কুরাইশ বাহিনী কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা ইসলামের ইতিহাসে ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত। সন্ধির শর্তাবলীর মধ্যে এ কথাগুলো ও উল্লেখ ছিল যে–(১) মুসলমানগণ এ বছর ওমরা আদায় না করে ফিরে যাবে, (২) আগামী বছর হজ্জে আগমন করবে, তবে ৩ দিনের বেশি মক্কায় অবস্থান করতে পারবে না, (৩) যদি কোন কাফির স্বীয় অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত মুসলমান হয়ে মদীনায় গমন করে তাহলে তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে। পক্ষান্তরে মদীনা হতে যদি কোন ব্যক্তি পলায়ন পূর্বক মক্কায় চলে আসে তাহলে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হবে না, (৪) প্রথম থেকে যে সকল মুসলমান মক্কায় বসবাস করছে তাদের কাউকে সাথে করে মদীনায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। আর মুসলমানগণের মধ্যে যারা মক্কায় থাকতে চায় তাদেরকে বিরত রাখা যাবে না। আর মুসলমানগণের মধ্যে যারা মক্কায় থাকতে চায় তাদেরকে বিরত রাখা যাবে না, (৫) আরবের বিভিন্ন গোত্রগুলোর এ স্বাধীনতা থাকবে যে, তারা উভয় পক্ষের (মুসলমনি ও কাফির) মাঝে যাদের সঙ্গে ইচ্ছে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে, (৬) সন্ধিচুক্তির মেয়াদের মধ্যে উভয় পক্ষ শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে যাতায়াতের সম্পর্ক চালু রাখতে পারবে। এছাড়া কুরাইশ প্রতিনিধি সুহায়েল বিন আমর সন্ধিপত্র থেকে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ এবং মুহাম্মদুর রাসূলল্লাহ’ বাক্য দুটি কেটে দেয়ার জন্যে দাবি করেছিল। কিন্তু সন্ধি পত্রের লেখক হযরত আলী (রাঃ) তা মেনে নিতে রাজি হলেন না। অবশেষ বিশ্বনবী (সাঃ) সুহায়েল বিন আমরের আপত্তির প্রেক্ষিতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহীম’ এবং ‘মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ’ বাক্য দু’টি নিজ হাতে কেটে দেন এবং এর পরিবর্তে সুহায়েল বিন আমরের দাবি অনুযায়ী ‘বিছমিকা আল্লাহুম্মা’ এবং কে নির্দেশ দেন। সুতরাং বাহ্যিক দৃষ্টিতে এ সন্ধি মুসলমানদের জন্যে অপমানজনক হলেও তা মুহাম্মদ (সাঃ) কে অনেক সুযোগ সুবিধা ও সাফল্য এনে দিয়েছিল। এ সন্ধির মাধ্যমে কুরাইশরা মুহাম্মদ (সাঃ) এর রাজনৈতিক সত্তাকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে স্বীকার করে নেয়। সন্ধির শর্তানুযায়ী অমুসলিমগণ মুসলমানদের সাথে অবাধে মেলামেশার সুযোগ পায়। ফলে অমুসলিমগণ ইসলামের মহৎ বাণী উপলব্ধি করতে থাকে এবং দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এ সন্ধির পরই মুহাম্মদ (সাঃ) বিভিন্ন রাজন্যবর্গের নিকট ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্র প্রেরণ করেন এবং অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেন। মুহাম্মদ (সাঃ) যেখানে মাত্র ১৪০০ মুসলিম সৈন্য নিয়ে হুদায়বিয়াতে গিয়েছিলেন, সেখানে মাত্র ২ বছর অর্থাৎ অষ্টম হিজরীতে ১০,০০০ মুসলিম সৈন্য নিয়ে বিনা রক্তপাতে মক্কা জয় করেন। যে মক্কা থেকে বিশ্বনবী (সাঃ) নির্যাতিত অবস্থায় বিতাড়িত হয়েছিলেন, সেখানে আজ তিনি বিজয়ের বেশে উপস্থিত হলেন এবং মক্কাবাসীদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। মক্কা বিজয়ের দিন হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানকে গ্রেফতার করে মুহাম্মদ (সাঃ) এর সম্মুখে উপস্থিত করেন। কিন্তু তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের শত্রুকে হাতে পেয়েও ক্ষমা করে দেন। ক্ষমার এ মহান আদর্শ পৃথিবীর ইতিহাসে আজও বিরল। মক্কায় আজ ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডিয়মান। সকল অন্যায় অসত্য, শোষণ ও জুলুমের রাজত্ব চিরতরে বিলুপ্ত।

৬৩১ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক দশম হিজরীতে মুহাম্মদ (সাঃ) লক্ষাধিক মুসলিম সৈন্য নিয়ে বিদায় হজ্জ সম্পাদক করেন এবং হজ্জ শেষে আরাফাতের বিশাল ময়দানে প্রায় ১,১৪,০০০ সাহাবীর সম্মুখে জীবনের অন্তিম ভাষণ প্রদান করেন যা ইসলামের ইতিহাসে “বিদায় হজ্জের ভাষণ” নামে পরিচিত। বিদায় হজ্জের ভাষণে বিশ্বনবী (সাঃ) মানবাধিকার সম্পর্কিত যে সনদপত্র ঘোষণা করেন দুনিয়ার ইতিহাসে তা আজও অতুলনীয়। তিনি দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, (১) হে বন্ধুগণ, স্মরণ রেখ, আজিকার এ দিন, এ মাস এবং এ পবিত্র নগরী তোমাদের নিকট যেমন পবিত্র, তেমনি পবিত্র তোমাদের সকলের জীবন, তোমাদের ধন-সম্পদ, রক্ত এবং তোমাদের মান-মর্যাদা তোমাদের পরস্পরের নিকট। কখনো অন্যের উপর অন্যায় ভাবে হস্তক্ষেপ করবে না। (২) মনে রেখ, স্ত্রীদের উপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে, তোমাদের উপরও স্ত্রীদের তেমন অধিকার আছে।(৩) সাবধান, শ্রমিকের মাথায় ঘাম শুকাবার পূর্বেই তার উপযুক্ত পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দিবে। (৪) মনে রেখ, যে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে সে প্রকৃত মুসলমান হতে পারে না। (৫) চাকর চাকরাণীদের প্রতি নিষ্ঠুর হইও না। তোমরা যা খাবে, তাদেরকে তাই খেতে দিবে; তোমরা যা পরিধান করবে, তাদেরকে তাই (সমমূল্যের) পরিধান করতে দিবে। (৬) কোন অবস্থাতেই ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করবে না। এমনি ভাবে মানবাধিকার সম্পর্কিত বহু বাণী তিনি বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে পেশ করে যান। তিনি হলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী, মানবজাতির একমাত্র আদর্শ এবং বিশ্ব জাহানের রহমত হিসেবে প্রেরিত।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর নবুয়্যতের ২৩ বছরের আন্দোলনে আরবের একটি অসভ্য ও বর্বর জাতিকে একটি সভ্য ও সুশৃঙ্খল জাতিতে পরিণত করেছিলেন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার সাধিত হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চিরাচরিত গোত্রীয় পার্থক্য তুলে দিয়ে, তিনি ঘোষণা করেন, ‘অনারবের উপর আরবের এবং আরবের উপর অনারকের; কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের এবং শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের কোন পার্থক্য নেই। বরং তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে অধিক মুত্তাক্বিন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি সুদকে সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং যাকাত ভিত্তিক অর্থনীতির মাধ্যমে এমন একটি অর্থ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক তাদের আর্থিক নিরাপত্তা লাভ করেছিল। সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর কোন মর্যাদা ও অধিকার ছিল না। বিশ্বনবী (সাঃ) নারী জাতিকে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করলেন এবং ঘোষণা করলেন “মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেস্ত।” নারী জাতিকে শুধু মাত্র মাতৃত্বের মর্যাদাই দেননি, উত্তরাধিকার ক্ষেত্রেও তাদের অধিকারকে করেছেন সমুন্নত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। ক্রীতদাস আযাদ করাকে তিনি উত্তম ইবাদত বলে ঘোষণা করেন। ধর্মীয় ক্ষেত্রে যেখানে মূর্তিপূজা, অগ্নিপূজা এবং বিভিন্ন বস্তুর পূজা আরববাসীদের জীবনকে কলুষিত করেছিল সেখানে তিনি আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করেন। মুদ্দ কথা তিনি এমন একটি অপরাধমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে কোন হানাহানি, রাহাজানি, বিশৃঙ্খলা, শোষণ, জুলুম, অবিচার, ব্যভিচার, সুদ ঘুষ ইত্যাদি ছিল না।

অবশেষে এ মহামানব ১২ রবিউল আউয়াল, ১১ হিজরী মোতাবেক ৭ জুন, ৬৩২ খ্রি: ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি হলেন সর্বশেষ নবী ও রাসূল। পৃথিবীর বুকে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবীর আবির্ভাব হবে না। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) গোটা মুসলিম জাতিকে উদ্দেশ্য করে বলে গিয়েছেন, “আমি তোমাদের জন্যে দু’টি জিনিস রেখে গেলাম। যতদিন তোমরা এ দুটি জিনিসকে আঁকড়ে রাখবে ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হল আল্লাহর কিতাব অর্থাৎ কোরআন আর অপরটি হল আমার সুন্নাহ অর্থাৎ হাদিস। বিশ্বনবী (সাঃ) এর জীবনী লিখতে গিয়ে খ্রিস্টান লেখক ঐতিহাসিক উইলিয়াম মুর বলেছেন, “He was the mater mind not only of his own age but of all ages” অর্থাৎ মুহাম্মদ (সাঃ) যে যুগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন তাকে শুধু সে যুগেরই একজন মনীষী বলা হবে না, বরং তিনি ছিলেন সর্বকালের, সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী।

শুধুমাত্র ঐতিহাসিক উইলিয়াম মুরই নন, পৃথিবীর বুকে যত মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে প্রায় প্রত্যেকেই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে তাদের মূল্যবান বাণী পৃথিবীর মানুষের সামনে পেশ করে গিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের জন্যে আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সূরা-আহযাব, আয়াত ২১)।

বর্তমান অশান্ত, বিশৃঙ্খল ও দ্বন্দ্ব মুখর আধুনিক বিশ্বে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর আদর্শকে অনুসরণ করা হলে বিশ্বে শান্তি ও একটি অপরাধমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা নিঃসন্দেহে সম্ভব।

 ১০. আল বেরুনী (৯৭৩–১০৪৮ খ্রি:)

দশম শতাব্দীর শেষ এবং একাদশ শতাব্দীর যে সকল মনীষীর অবদানে পৃথিবীর জ্ঞান বিজ্ঞান ও সভ্যতা কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল, আল বেরুনী তাঁদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বিচিত্র প্রতিভার অধিকারী। জ্যোতিবিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান, রসায়ন, জীবতত্ত্ব, ভূতত্ত্ব, উদ্ভিদতত্ত্ব, গণিত, দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র, দিনপঞ্জির তালিকা ও ইতিহাস, সভ্যতার ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে তিনি ছিলেন অগাধ পান্ডিত্বের অধিকারী। তিনিই সর্ব প্রথম প্রাচ্যের জ্ঞান বিজ্ঞান বিশেষ করে ভারতের জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। অধ্যাপক মাপা বলেন, “আল বেরুনী শুধু মুসলিম বিশ্বেরই নয় বরং তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তি।” তিনি পৃথিবীর ইতিহাস জগত্বাসীর সামনে রেখে গেছেন; কিন্তু ইতিহাসের পাতায় আত্মপরিচয় অনুপস্থিত। তাঁর বাল্য জীবন, শিক্ষা জীবন, দাম্পত্য জীবন ও সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না। সম্ভবত ঐতিহাসিকগণ ও মহাজ্ঞানী ব্যক্তির বিস্তারিত পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি।

ইতিহাসের পাতা থেকে যতদূর জানা যায়, ৩৬২ হিজরীর ৩ জিলহজ্জ মোতাবেক ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর রোজ বৃহস্পতিবার খাওয়ারিজমের শহরতলীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম ছিল আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বেরুনী। তিনি নিজের নাম আবু রায়হান লিখতেন কিন্তু ইতিহাসে তিনি আল বেরুনী নামে অধিক পরিচয় হন। তাঁর বাল্যকাল অতিবাহিত হয়েছিল আল ইরাক বংশীয় রাজপতি বিশেষ করে আবু মনসুর বিন আলী বিন ইরাকের তত্ত্বাবধানে। এখানে তিনি সুদীর্ঘ ২২ বছর রাজকীয় অনুগ্রহে কাটিয়েছিলেন। এখানে অবস্থানকালেই আস্তে আস্তে তাঁর বিচিত্র প্রতিভা ছড়িয়ে পড়ে। আব্বাসীয় বংশের খলিফাঁদের অযোগ্যতা ও দুর্বলতার সুযোগে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বহু স্বাধীন রাজবংশের উদ্ভব ঘটে। এ সময় খাওয়ারিজম প্রদেশে ও দুটি রাজশক্তি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রদেশের দক্ষিণাংশে রাজত্ব করতেন আল বেরুনীর প্রতিপালক আল ইরাক বংশীয় আবু আবদুল্লাহ এবং উত্তরাংশে রাজত্ব করতেন মামুন বিন মাহমুদ। ৯৯৪-৯৫ খ্রিস্টাব্দে মামুন বিন মাহমুদ আবু আকদুল্লাহকে হত্যা করে রাজ্য দখল করে নিলে আল বেরুনীর জীবনে নেমে আসে দুঃখ দুর্দশা। যাদের তত্ত্বাবধানে তিনি সুদীর্ঘ ২২টি বছর কাটিয়েছেন তাদেরকে হারিয়ে তিনি বিমূঢ় হয়ে পড়েন। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে ত্যাগ করেন খাওয়াজরিজম এবং চলতে থাকেন আশ্রয়হীন ও লক্ষহীন পথ ধরে। দিনের পর দিন রাতের পর রাত তিনি কাটিয়েছেন অনাহারে অর্ধাহারে। এ সময় জ্বরজানের রাজা কাবুসের সুনজের পড়েন তিনি। রাজা কাবুস ছিলেন বিদ্যুসাহী। জ্ঞানী ব্যক্তিদের তিনি খুব ভালবাসতেন। তিনি ইতিপূর্বে আল বেরুনীর সুনাম শুনেছিলেন। রাজা আল বেরুনীর উন্নত আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন। এখানের দিনগুলো আল বেরুনী সুখেই কাটিয়ে ছিলেন কিন্তু যাদের আদর স্নেহ তিনি ২২টি বছর কাটিয়েছিলেন সেই আল ইরাক বংশীয় অভিভাবকদের কথা ক্ষণিকের জন্যেও ভুলতে পারেননি। এখানে অবস্থানকালে ১০০১-১০০২ খ্রিস্টাব্দে তিনি আসারুল বাকিয়া এবং ‘তাজরী দুশ শুয়াত’ নামক দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। রাজার প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ তিনি ‘আসারুল বাকিয়া’ গ্রন্থটি রাজা কাবুসের নামে উৎস্বর্গ করেন।

খাওয়ারিজমের রাজা সুলতান মামুন বিন মাহমুদ ছিলেন বিদ্যুৎসাহী এবং তিনি আল বেরুনীর জ্ঞানে ও গুণে মুগ্ধ ছিলেন। সুলতান মামুন এক পত্রে আর বেরুনীকে দেশে ফিরে আসার অনুরোধ জানান। তিনিও সুলতানের অনুরোধে ১০১১ খ্রিস্টাব্দে মাতৃভূমি খাওয়ারিজমে ফিরে আসেন এবং সুলতানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রীয় কার্য পরিচালনার সাথে সাথে তিনি জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার কাজও চালিয়ে যেতেন। মানমন্দির নির্মাণ করে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানে পর্যবেক্ষণ কার্য চালান। এখানে তিনি ৫/৬ বছর অবস্থান করেছিলেন এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন।

গজনীর দিগ্বিজয়ী সুলতান মাহমুদ জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিদের খুব সম্মান করতেন এবং তার শাহী দরবারে প্রায় প্রতিদিন দেশ বিদেশের জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিদের মধ্যে জ্ঞান বিজ্ঞান ও সাহিত্য চর্চা নিয়ে আলোচনা হত। সুলতান মামুনের শাহী দরবারের জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে গজনীতে পাঠানোর জন্যে সুলতান মাহমুদ একটি সম্মানজনক পত্রে পরোক্ষ নির্দেশ দিয়ে পাঠান। পত্র পাবার পর আল বেরুনী কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে ১০১৬ খ্রি: গজনীতে সুলতান মাহমুদের শাহী দরবারে উপস্থিত হন। মামুনের দরবারের অন্যতম বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ইবনে সিনা এ প্রস্তাবকে অপমান ও আত্মমর্যাদাকে বিকিয়ে দেয়ার সামিল আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করেন এবং কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে খাওয়ারিজম ত্যাগ করেন। সুলতান মাহমুদ ইবনে সিনাকে না পেয়ে এবং ইবনে সিনার বিদ্রোহের অজুহাতে খাওয়ারিজম রাজ্য দখল করে নেন। আল বেরুনী সুলতান মাহমুদের একান্ত সঙ্গী হিসেবে ১০১৬ হতে ১০১৯ খ্রি: পর্যন্ত গজনীতে অবস্থান করেন। উল্লেখ্য যে, সুলতান মাহমুদ ১৭ বার ভারত আক্রমণ করেছিলেন এবং আল্ বেরুনী কয়েকবার সুলতানের সাথে ভারত এসেছিলেন। তিনি তৎকালীন ভারতীয় শিল্প, সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের সমৃদ্ধি দেখে বিস্মিত হন। পরবর্তীতে রাজসমন নিয়ে ১০১৯–১০২৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ভারতে অবস্থান করে সেখানকার জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে মিলিত হয়ে তাঁদের সঙ্গে ভূগোল, গণিত ও ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে মতের আদান প্রদান করেন এবং সেখানকার জ্ঞান বিজ্ঞানের গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। ভারত থেকে প্রত্যাবর্তন করেই তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাবুল হিন্দ’। তৎকালীন সময়ের ভারতীয় জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মীয় অনুশাসন জানার জন্যে এটি একটি নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। অধ্যাপক হামারনেহের লিখেছেন,

“As a result of his profound and intimate knowledge of the country andits people, the author left us in his writing the wealth of information of undying interest on civilization in the sub-continent during the first half at the eleventh century.”

আল বেরুনী ভারত থেকে গজনীতে প্রত্যাবর্তন করার কিছুদিন পরেই সুলতান মাহমুদ ইন্তেকাল করেন এবং তাঁর পুত্র সুলতান মাসউদ ১০৩১ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসন আরোহণ করেন। সুলতান মাসউদও আল বেরুনীকে খুব সম্মান করতেন। এ সময়ে আল বেরুনী রচনা করেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘কানুনে মাসউদী’। এ সুবিশাল গ্রন্থখানা সর্বমোট ১১ খণ্ডে সমাপ্ত। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গ্রন্থটিতে আলোচনা করা হয়। ১ম ও ২য় খণ্ডে আলোজনা করা হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে; ৩য় খণ্ডে ত্রিকোণমিতি; ৪র্থ খণ্ডে–Spherical Astronomy; ৫ম খণ্ডে–গ্রহ, দ্রাঘিমা, চন্দ্র সূর্যের মাপ; ৬ষ্ঠ খণ্ডে–সূর্যের গতি; ৭ম খণ্ডে –চন্দ্রের গতি; ৮ম খণ্ডে–চন্দ্রের দৃশ্যমান ও গ্রহণ; ৯ম খণ্ডে স্থির নক্ষত্র; ১০ম খণ্ডে–৫টি গ্রহ নিয়ে এবং একাদশ খণ্ডে আলোচনা করা হয়েছে জ্যোতিষ বিজ্ঞান সম্পর্কে। এ অমূল্য গ্রন্থটি সুলতানের নামে নামকরণ করায় সুলতান মাসউদ অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে আল বেরুনীকে বহু মূল্যবান রৌপ্য সামগ্রী উপহার দেন। কিন্তু আল বেরুনী অর্থের লোভী ছিলেন না। তাই তিনি এ মূল্যবান উপহার সামগ্রী রাজকোষে জমা দিয়ে দেন।

আল বেরুনী বহু জ্ঞান বিজ্ঞান সভ্যতার ইতিহাস, মৃত্তিকা তত্ত্ব, সাগর তত্ত্ব এবং আকাশ তত্ত্ব মানবজাতির জন্যে অবদান হিসেবে রেখে গেছেন। ইউরোপীয় পণ্ডিতগণের মতে বেরুনী নিজেই বিশ্বকোষ। একজন ভাষাবিদ হিসেবেও তিনি ছিলেন বিখ্যাত। আরবী, ফারসী, সিরিয়া গ্রীক, সংস্কৃতি, হিব্রু প্রভৃতি ভাষার উপর ছিল তাঁর পাণ্ডিত্য। ত্রিকোণমিতিতে তিনি বহু তথ্য আবিষ্কার করেছেন। কোপানিকাস বলেছিলেন, পৃথিবী সহ গ্রহগুলো সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে অথচ কোপানিকাসের জন্মের ৪২৫ বছর পূর্বেই আল বেরুনী বলেছেন, “বৃত্তিক গতিতে পৃথিবী ঘুরে।” তিনি টলেমি ও ইয়াকুবের দশমিক অংকের গণনায় ভুল ধরে দিয়ে তাঁর সঠিক ধারণা দেন। তিনিই সর্ব প্রথম প্রাকৃতিক ঝর্ণা এবং আর্টেসীয় কূপ এর রহস্য উদ্ঘাটন করেছিলেন। জ্যোতিষ হিসেবেও তার প্রসিদ্ধি ছিল অত্যাধিক। তিনি যে সব ভবিষ্যৎ বাণী করতেন সেগুলো সঠিক হত। তিনি শব্দের গতির সাথে আলোর গতির পার্থক্য নির্ণয় করেছিলেন। তিনি এরিস্টটলের ‘হেভেন’ গ্রন্থের ১০টি ভুল আবিষ্কার করেছিলেন। ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের সম্পর্কেও তিনি আবিষ্কার করেন।

সূক্ষ্ম ও শুদ্ধ গণনায় আল বেরুনী একটি বিস্ময়কর পন্থা আবিষ্কার করেন যার বর্তমান নাম The Formula of Intarpolation. পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ এটিকে নিউটনের আবিষ্কার বলে প্রচার করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। অথচ নিউটনের জন্মের ৫৯২ বছর পূর্বেই আল বেরুনী এটি আবিষ্কার করেন এবং একে ব্যবহার করেন বিশুদ্ধ সাইন তালিকা প্রস্তুত করেন। এরপর এ ফর্মুলা পূর্ণতা দান করে তিনি একটি ট্যানজেন্ট তালিকাও তৈরি করেন। তিনিই বিভিন্ন প্রকার ফুলের পাপড়ি সংখ্যা হয়, ৩, ৪, ৫, ৬ এবং ১৮ হবে কিন্তু কখনো ৭ বা ৯ হবে না; এ সত্য আবিষ্কার করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানেও তার অবদান ছিল সর্বাধিক। চিকিৎসা বিজ্ঞানে তিনি একটি অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থে তিনি বহু রোগের ঔষধ তৈরির কলাকৌশল বর্ণনা করেছেন। অধ্যাপক হামারনেহ বলেছেন, “শুধু মুসলিম জগতেই নয় পৃথিবীর সমস্ত সভ্য জগতের মধ্যে আল বেরুনীই সর্ব প্রথম ব্যক্তি, যিনি খ্রিস্টপূর্বকাল থেকে তাঁর সময়কাল পর্যন্ত ঔষধ তৈরি করার পদ্ধতি ও তার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন।

বিজ্ঞানী আল বেরুনী বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। মৃত্যুর ১৩ বছর পূর্বে তিনি তাঁর রচিত গ্রন্থের যে তালিকা দিয়েছেন সে অনুযায়ী তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা ১১৪টি। পরবর্তী ১৩ বছরে তিনি আরো বহু গ্রন্থ রচনা করেন। উপরে উল্লেখিত গ্রন্থগুলো ছাড়া উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে–”কিতাবুত তাফহিম। এটি ৫৩০ অধ্যায়ে বিভক্ত। এতে অংক, জ্যামিতি ও বিশ্বের গঠন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ‘ইফরাদুল ফাল ফিল আমরিল আযলাল’–এটিতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ছায়াপথ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ‘আল আছারুল বাকিয়া আলাল কুবানিল কালিয়া’–এটিতে পৃথিবীর প্রাচীন কালের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। যিজে আবকন্দ (নভোমণ্ডল ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত)। আলাল ফি যিজে খাওয়ারিজমি (যুক্তিবিদ্যা সম্পর্কে) তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। বিশাল আকৃতির শতাধিক গ্রন্থ এক ব্যক্তির পক্ষে রচনা করা কত যে দুঃসাধ্য ব্যাপার তা ভাবতেও অবাক লাগে।

আল বেরুনী ছিলেন সর্বকালের জ্ঞানী শ্রেষ্ঠদের শীর্ষ স্থানীয় এক মহাপুরুষ। তাঁর ও অন্যান্য মুসলিম বিজ্ঞানীদের মৌলিক আবিষ্কারের উপরই গড়ে উঠেছে আধুনিক বিজ্ঞান। আল বেরুনী আজ বেঁচে নেই; কিন্তু তাঁর নাম জেগে থাকবে উজ্জ্বল তারকার ন্যায়। দশম শতাব্দীর শেষ এবং একাদশ শতাব্দীতে যার একান্ত সাধনায় জ্ঞান বিজ্ঞানের দিগন্ত এক নব সূর্যের আলোতে উদ্ভাসিত হয়েছিল তিনি হলেন আল বেরুনী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক। তিনি বিশ্বাস করতেন আল্লাহই সকল জ্ঞানের অধিকারী। এ মনীষী ৬৩ বছর বয়সে গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন। আস্তে আস্তে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন। কোন চিকিৎসাই তাকে আর সুস্থ করে তোলা যায়নি। অবশেষে ৪৪০ হিজরীর ২ রজব মোতাবেক ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১২ ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার ৭৫ বছর বয়সে আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বেরুনী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 ১০০. স্যার আইজ্যাক নিউটন (১৬৪২-১৭২৭)

বিজ্ঞানের আশ্চর্য প্রতিভা নিউটন মাত্র সাত মাস বয়সেই মায়ের গর্ভ থেকে জন্মে নিশ্চিত মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন আশ্চর্যভাবে। নিজের প্রতিভায় জগৎকে আশ্চর্য করবার, চমকিত করবার পালা শুরু হয় তাঁর তখন থেকেই। এরপর দীর্ঘ জীবনে একের পর এক আশ্চর্যের মালা গেঁথে বিশ্ববিজ্ঞানের ইতিহাসকে স্বকীয় কৃতিত্বের মালিকায় ভূষিত করেছেন।

জন্মের তিন মাস আগেই বাবা মারা গিয়েছিলেন। দুবছর বয়স হতে না হতেই মা দ্বিতীয়বার বিয়ে করে বসলেন।

নিউটনের নতুন বাবা ছিলেন পাদ্রী। তিনি রোগা পটকা নিউটনের দায়িত্ব নিতে রাজি হননি। ফলে উলসথরপের খামার বাড়িতে ঠাকুমার কাছেই মানুষ হতে থাকেন তিনি।

বাবাকে হারিয়েছেন, মা নেই, নেই কোন ভাইবোন। এই অবস্থায় একাকীত্বের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি আসবার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। চারপাশের সবকিছু খুঁটিয়ে দেখার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল তখন থেকেই।

আর এই অভ্যাসের ফলেই তো পরিণত বয়সে একদিন গাছ থেকে আপেল পড়ার সামান্য ঘটনা থেকে মাধ্যাকর্ষণের সূত্র আবিষ্কার করে গোটা পৃথিবীকে চমকে দিয়েছিলেন।

বয়স বারো বছর পূর্ণ হতেই ঠাকুমা নিউটনকে পাঠিয়ে দিলেন গ্রাণঘাম শহরে তাঁর পরিচিতি ক্লার্ক নামে এক ভদ্রলোকের বাড়িতে।

ক্লার্ক-এর স্ত্রী ছিলেন নিউটনের মায়ের বান্ধবী। সেই সূত্রে এখানেই প্রথম তিনি মাতৃস্নেহের স্বাদ পান।

ক্লার্ক ভদ্রলোক ওষুধের ব্যবসা করতেন। নিজেই বাড়িতে তৈরি করতেন সেসব। বিজ্ঞানের বিশেষ করে রসায়ন ও পদার্থ বিদ্যায় যথেষ্ট পড়াশোনা ছিল তাঁর। পারিবারিক অবস্থাও স্বচ্ছল।

এখানে চার বছর ছিলেন নিউটন। এখানেই বিজ্ঞানী নিউটনের জীবনের ভিত তেরি হয়েছিল বলা যায়।

বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে হঠাৎ একদিন রত্নভান্ডার আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন নিউটন। চিকিৎসাবিদ্যা, রসায়ন, সৌরজগতের বিষয়ে প্রচুর বই জড়ো করা ছিল সেই ঘরে।

নিউটন সেই সব বইতে ডুবে গেলেন। সব কি আর বুঝতে পারেন, তবু পড়ার নেশায় পড়ে যান।

এইভাবে ক্লার্কের ওষুধ তৈরির ল্যাবরেটরির সন্ধানও পেয়ে যান একদিন। কৌতূহল নিয়ে কাঁচের যন্ত্রপাতি, রসায়নিক বোঝাই শিশি-বোতল সব নাড়াচাড়া করে দেখেন।

এই বাড়ির নিরিবিলি চিলেকোঠায় বসেই সর্বপ্রথম সৃষ্টির নেশায় মেতে উঠেছিলেন বালক নিউটন।

বাতাসি কলযন্ত্রের গাড়ি, জলঘড়ির নানা মডেল বানিয়েছেন তিনি। কখনও নানা রসায়নিকের গুণাগুণ পরীক্ষা করে দেখেছেন।

ক্লার্ক ভবনে নিউটনের সঙ্গী ছিল ক্লার্কের একমাত্র মেয়ে স্টোরি। বন্ধুত্বের সহজ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল তাদের মধ্যে।

নিউটনের যখন মোল বছর বয়স, তখন উলসথরপ থেকে মায়ের চিঠি পেয়ে জানতে পারেন তার নতুন বাবা মারা গেছেন। জামিদারির ব্যাপার নিয়ে হিমসিম খাচ্ছেন তিনি।

ক্লার্ক পরিবারের চার বছরের জীবনে ছেদ পড়ে এরপর। নিউটন উলসফরপ মায়ের কাছে চলে আসেন।

কিন্তু জমিদারির লাভক্ষতি আর চাষ-আবাদের হিসেবের মধ্যে অল্পদিনেই হাঁপিয়ে ওঠেন নিউটন। মাকে জানালেন কলেজে পড়বেন। লেখাপড়ায় ছেলের আগ্রহ দেখে মা খুশি হন। ছেলেকে পাঠিয়ে দেন কেমব্রিজে। নিউটন ভর্তি হন ট্রিনিটি কলেজে।

এই কলেজে আইজ্যাক ব্যারো নামে অঙ্কের অধ্যাপক ছিলেন খাঁটি জহুরী। নিউটনের সুপ্ত প্রতিভার পরিচয় তার কাছে গোপন রইল না।

ব্যারো নিজে ছিলেন এক প্রতিভা। বিজ্ঞান, বিশেষ করে পদার্থ বিদ্যায় তাঁর ছিল অসামান্য দখল।

নিজস্ব কিছু গবেষণাও ছিল তাঁর। ব্যারোর সুপারিশে কলেজ কর্তৃপক্ষ নিউটনকে অঙ্কে ছাত্রবৃত্তি পড়ার সুযোগ দিলেন।

এই সময় থেকেই অধ্যাপক ব্যানোর প্রেরণায় নিউটনের বিজ্ঞান প্রতিভার উন্মেষ ঘটতে থাকে। নিউটনকে তিনি জ্যামিতি ও আলোকবিজ্ঞানের রহস্যালোকের সন্ধান দেন।

অল্প সময়ের মধ্যেই গণিতের মূলনীতিগুলো নিউটন চমৎকার রপ্ত করে ফেললেন।

তবে বিশুদ্ধ গণিতের চেয়ে ব্যবহারিক গণিতই তার পছন্দ ছিল বেশি। এই গণিতের মধ্যেই ছিল প্রকৃতি জগৎ ও সৌরবৈচিত্র্যের রহস্যালোকের চাবিকাঠি।

ব্যারোর তত্ত্বাবধানে থেকে নিজের বিচারবুদ্ধি ও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশ্লেষণ নিয়ে মেতে রইলেন নিউটন।

নিউটন বৃত্তি পান ১৬৬৪ খ্রি:। সেই বছরই গোড়ার দিকে ইংল্যান্ড জুড়ে মহামারীর আকারে দেখা দিল প্লেগ। কাতারে কাতারে লোক মরল। দিশাহারা লোক জন দলে দলে যে যেদিকে পারল শহর ছেড়ে পালাতে লাগল। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়। মড়ক-পীড়িত লণ্ডন ছেড়ে উলসথরপের খামার বাড়িতে চলে এলেন নিউটন।

এখানে এসে মায়ের সঙ্গে জমিদারি দেখাশোনার কাজে হাত লাগালেন। তবে পাশাপাশি বিজ্ঞানের গবেষণাও চালিয়ে চললেন।

উলসথরপে দেড় বছর ছিলেন নিউটন। এই সময়ের মধ্যে এক এক করে তিনটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কাজ সম্পূর্ণ করলেন।

তার প্রথম আবিষ্কার দ্বিপদতত্ত্ব অর্থাৎ দুই অংশযুক্ত রাশি ও দ্বিতীয় আবিষ্কার প্রভেদক গণনা গণিতের মৌলসূত্র।

এই দুটির বৈজ্ঞানিক নাম যথাক্রমে বাইনোমিরাল থিয়োরেম ও ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস।

প্রভেদক গণনা গণিতের সাহায্যে অনবরত পরিবর্তনীয় রাশির পরিবর্তনের হার বার করা যায়। এই রাশিগুলোর নাম হল প্রবাহপুঞ্জ বা Fluxions।

কিছুদিনের মধ্যেই প্রবাহপুঞ্জের বিকল্প প্রবাহেরও সন্ধান পেয়ে গেলেন নিউটন। এইভাবেই পাওয়া গেল গণনা গণিতের এক শাখা অখন্ড গণনা গণিত বা ইনটিগ্রাল ক্যালকুলাস।

এই সঙ্গেই আরও একটি কাজ করলেন নিউটন। শংকুর কোন এক অংশ নিয়ে যে বক্ররেখা বা কারভ রচিত হয় সেই পরা বলয়ের ক্ষেত্রফল ও ঘনবস্তুর আয়তনের পরিমাপের উপায়ও বার করে ফেললেন।

এইভাবে জমিদারির কাজ আর নিজের গবেষণা নিয়ে দেখতে দেখতে দেড়টি বছর কেটে গেল। নিউটন আবার কেমব্রিজে ফিরে এলেন।

এখানে এসে তাঁর তিনটি গবেষণা প্রকাশ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে গণিত বিজ্ঞানী মহলে সাড়া পড়ে গেল। প্রভেদক গণনা গণিতের উদ্ভাবক হিসাবে বিজ্ঞানী মহল তাকে স্বীকৃতি জানাল।

কোপারনিকাশের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব থেকে নিউটন জেনেছিলেন, গ্রহমণ্ডলী অধিবৃত্ত পথে নিজ নিজ কক্ষে ঘুরপাক খায়। গ্যালিলিওর গতিসূত্র ও চলমান বস্তুর যান্ত্রিকতা সম্পর্কেও তাঁর ধারণা পরিষ্কার ছিল। এই ধারণার ভিত্তিতেই তাঁর দ্বিতীয় আবিষ্কার রূপ পেয়েছিল।

সেইকালে বিজ্ঞানীরা জানতেন না গ্রহরা নিজ নিজ কক্ষপথে কার প্রভাবে নিয়মিতভাবে আবর্তিত হয়ে চলেছে।

নিউটন তার অঙ্কের সাহায্যে বুঝতে পারলেন যে সূত্রের সাহায্যে পৃথিবীর সমস্ত বস্তু ও তাদের গতির নিয়ন্ত্রণ ঘটে সেই একই সূত্রের প্রভাবে সৌরজগতের গ্রহতারকাদের কক্ষনির্ভর আবর্তনও নিয়ন্ত্রিত হয়। যে সূত্র বা বলের টানে গাছের আপেল আকাশে না উঠে মাটিতে এসে পড়ে, সেই একই বল সৌরমন্ডলের গ্রহতারাদেরও পরিচালিত করে।

নিউটন এই বলেরই নাম দিলেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। যে সূত্রের সাহায্যে তিনি এই। বলকে প্রকাশ করলেন তারই নাম হল মাধ্যাকর্ষণ সূত্র বা Law of gravitation।

এরপর নিউটন দেখলেন যেই অভিকর্ষ বলকে কেন্দ্র করে সৌরস্তুদের নড়াচড়া সেই কেন্দ্র থেকে সৌর বস্তুর দূরত্বের বর্গের বিষয়ানুপাতিক। অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে সৌর বস্তুর দূরত্ব যদি বাড়ে অভিকর্ষ কমে আসে, আবার যদি দূরত্ব কমে অভিকর্ষ বলের পরিমাণও বেড়ে যায়।

নিউটন তার আবিষ্কৃত মাধ্যাকর্ষণ সূত্র ও অভিকর্ষ বলের কথা বাইরে প্রকাশ করবার আগেই বুঝতে পারলেন, এই মহাসত্য ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই পদার্থ বিজ্ঞান ও সৌরবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিপ্লব উপস্থিত হবে, নিয়ে আসবে নতুন যুগ।

আবিষ্কৃত সত্যকে দৃঢ় মূল ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য পুনঃ পুনঃ বিশ্লেষণ ও পরীক্ষার দরকার। তাই নিয়েই মেতে উঠলেন তিনি।

১৬৬৫-৬৬ খ্রি: মধ্য নিউটন আবিষ্কার করলেন আলোর প্রতিসরণ সূত্র বা Law of Refraction of light।

তিনি দেখলেন, এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে ঢুকবার সময় আলো যে বাঁক নেয়, তার পরিমাণ নির্ভর করে মাধ্যমের ঘনত্বের ওপর।

ইতিপূর্বে তেলা কাঁচ মাধ্যম বা প্রিজম আর লেনস–এই দুই বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন কাঁচের সাহায্যে দৃষ্টি বিবর্ধক চশমা তৈরি সম্ভব হয়েছে, সম্ভব য়েছে দূরবীন তৈরি।

লিউয়েন হক তৈরি করেছিলেন জীবজগতের সূক্ষ্মতম অধিবাসীদের দেখবার উপযোগী অণুবীক্ষণযন্ত্র।

নিউটন প্রিজন ও লেনস নিয়ে নাড়াচাড়া করে দূরবীনের একটি মারাত্মক ক্রটি আবিষ্কার করে ফেললেন।

দূরবীনের লেনসে সৌরজগতের যে ছবি ভেসে উঠত, তাতে থাকত নানা বর্ণের রেখার বর্ণবৃত্ত। এর ফলে গ্রহনক্ষত্রের সঠিক অবস্থান নির্ণয়ে কাজ বড় রকমের বাধার সম্মুখীন হত। এই বর্ণঘটিত বিভ্রাটকে বলা হয় CHROMATIC ABERRATION বা বর্ণঘটিত স্থানচ্যুতি।

আলোক বিজ্ঞানীরা দূরবীনের এই ত্রুটি সম্পর্কে বিলক্ষণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। কিন্তু তারা মনে করতেন দূরবীনের এই ক্রটি প্রকৃতিগত অর্থাৎ ন্যাচারাল ফ্লো–এই ত্রুটিমুক্ত দূরবীন তৈরি অসম্ভব।

নিউটন এই বর্ণবিভ্রাট মুক্ত দূরবীন তৈরি করলেন। এর সাহায্যে গ্রহনক্ষত্রদের প্রকৃত দূরত্ব নির্ণয় করতে গিয়ে বর্ণঘটিত স্থান চ্যুতির বিঘ্ন থাকল অতি সামান্য মাত্রায়।

পরে ১৭৬০ খ্রি: তাঁর অনুসরণেই সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত দূরবীন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন আলোকবিজ্ঞানী জন ডোনাল্ড।

আলো ও বর্ণঘটিত নানা তত্ত্বও তথ্য যখন প্রকাশ করেন তখন নিউটনের বয়স ত্রিশের কোঠা ছুঁই ছুঁই।

তার এই গবেষণা প্রবন্ধ ইউরোপের বিজ্ঞানীমহলে প্রবল বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিল। লন্ডনের বিখ্যাত রয়াল সোসাইটি তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি জানালেন তাকে সংস্থার সদস্য পদে নির্বাচিত করে।

এই সম্মান প্রাপ্তির পর নিউটন কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ নিজের বর্ণঘটিত ত্রুটিমুক্ত দূরবীনটি রয়াল সোসাইটিতে উপহার পাঠিয়ে দেন।

১৬৬৭ খ্রি: নিউটনকে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে অঙ্কের অধ্যাপক পদে নিয়োগ করা হয়। দীর্ঘ ২০ বছর তিনি এই মহাবিদ্যালয়ের কাজে ছিলেন। এই সময়ে অঙ্ক আর পদার্থবিদ্যা নিয়ে একের পর এক গবেষণা করেছেন তিনি। রসায়ন নিয়েও কিছুকাল কাজ করেছেন।

ক্ষারীয় বা ক্ষারধর্মী ধাতুকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সোনায় পরিণত করা যায় কিনা তা নিয়েও পরীক্ষা করেছেন।

নিরন্তর গবেষণার মধ্যে থেকে বয়স তিরিশ হতে না হতেই সমস্ত চুল ধবধবে সাদা হয়ে গেল তার।

যে কোন বিষয়ে একনিষ্ঠ মনঃসংযোগের বিরল ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন তিনি। যে কোন বিষয় একবার মাথায় ঢুকলে তার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারতেন না। তাঁর সবচেয়ে মহৎ গুণ যেটি ছিল তা হল অপ্রয়োজনীয় প্রসঙ্গ এড়িয়ে মূল লক্ষে এগিয়ে যাবার ক্ষমতা। তাঁর প্রতিটি গবেষণার কাজ এগিয়েছে নির্দিষ্ট নিয়মের পথ ধরে। প্রথমে বিষয় নির্বাচন, পরে মূলনীতি নির্ধারণ। সবশেষে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলা।

১৬৮৪ খ্রি: এক তরুণ সৌরবিজ্ঞানী কেমব্রিজে এসে নিউটনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। এই বিজ্ঞানীর নাম এডমুন্ড হ্যানি। তাঁর নামেই পরে একটি বিশেষ ধূমকেতুর নাম হ্যানির ধূমকেতু রাখা হয়েছিল।

প্রকৃতির মহাশক্তি অভিকর্ষের ওপর গবেষণা করার আগ্রহ প্রকাশ করে হ্যানি নিউটনের সহযোগিতা প্রার্থনা করলেন।

নিউটন এতদিন তাঁর যে গবেষণার কথা চেপে রেখেছিলেন, তা প্রথম প্রকাশ করলেন হ্যানির কাছে।

জানালেন, বারো বছর আগেই তিনি এ সম্পর্কে প্রচুর গবেষণা করেছেন। বিভিন্ন তত্ত্ব আবিষ্কারও করেছেন।

হ্যালির প্রশ্নের উত্তরে তিনি এও জানালেন যে বিশেষ কারণেই তিনি তাঁর আবিষ্কৃত মূল্যবান তত্ত্ব দীর্ঘকাল গোপন করে রেখেছেন।

কারণটিও গোপন করলেন না নিউটন। তার আলোক বিজ্ঞানের ওপর গবেষণা প্রকাশিত হবার পর তাঁকে বহু মিথ্যা সমালোচনার শিকার হতে হয়েছিল। বহু বিশিষ্ট বিজ্ঞানীও এই দলে ছিলেন।

তাঁদের নীচতা দেখে তাঁর মন এমনই ভেঙ্গে পড়েছিল যে জীবনে আর কোন গবেষণার কথাই প্রকাশ করবেন না বলে সিদ্ধান্ত করেন।

তরুণ বিজ্ঞানী হ্যানির আগ্রহ ও তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত নিউটন তার গবেষণা প্রকাশ করবেন বলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হলেন।

টানা দুই বছর পরিশ্রম করে তিনি তাঁর যে গবেষণা প্রবন্ধটি তৈরি করেন তা বিশ্ববিজ্ঞানের এক অমূল্য সম্পদ। বইটির নাম রাখা হয় ফিলোসফিয়া নেচারালিস প্রিনসিপিয়া ম্যাথেমেটিকা যা ইংরাজি করলে দাঁড়ায় Mathematical Principle of Natural Philosophy

তরুণ হ্যানি এই সময় নানাভাবে নিউটনকে সাহায্য করেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁর আগ্রহেই বইটি তৈরি হয়েছিল, প্রকাশও করলেন নিজের পয়সায়।

নিউটনের এই বই-এর ভিত্তি উচ্চশ্রেণীর জ্যামিতি হলেও এর মধ্যে যেমন রয়েছে গভীর দর্শন তেমনি জটিল গণিত ও অসাধারণ সব বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত। বইটির সংক্ষিপ্ত নাম প্রিন্সিপিয়া। ইংরাজি প্রিনসিপল শব্দের ল্যাটিন উচ্চারণ হল প্রিন্সিপিয়া।

পরপর তিনটি বইয়ের সংকলন হল প্রিন্সিপিয়া। প্রথম বইটির আলোচ্য বিষয় গতিসূত্র। এতে রয়েছে পরপর তিনটি সূত্র।

প্রথম সূত্র হল : Every body continues in its state or rest or of uniform motion in a straight line unless it is compelled by external force to change that state of inertia

দ্বিতীয় সূত্র হল : Rate of Change of momentum is proportional to the force acting, and the Change takes place in the direction in which the force acts

তৃতীয় সূত্র : To every action there is an equal and oppoite reaction।

প্রিন্সিপিয়ার দ্বিতীয় বইতে নিউটন আলোচনা করেছেন প্রতিরোধী বস্তুর মাধ্যমের ভিতরে যে কোন বস্তুর গতি নিয়ে।

প্রতিরোধী বস্তু হিসেবে তিনি তরল ও বায়বীয় এই দুই পদার্থকেই গ্রহণ করেছেন।

নিউটনের মতে যে কোন গ্যাসই অসংখ্য স্থিতিস্থাপক পরমাণুর মিশ্রণ। গ্যাসের ওপর চাপই তার আয়তন নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রিন্সিপিয়ার তৃতীয় খণ্ডে রয়েছে সৌরজগৎ ও প্রকৃতির অভিকর্ষ বলের কথা। তিনি পরিষ্কারভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কিভাবে পৃথিবীর বুকে পতনশীল বস্তুর ওপর অভিকর্ষ বল কাজ করে এবং এই একই বলের প্রভাবে মহাকাশের গ্রহতারা তাদের নিজ নিজ কক্ষপথে থেকে নির্দিষ্ট নিয়মে কাজ করে।

এই অভিকর্ষ বলের টানেই যে সমুদ্রে জোয়ার ভাটা খেলা করে সেই কখাও তিনি বলেছেন।

নিউটনের বক্তব্যের অর্থ হল, সৃষ্টির প্রতিটি বস্তুর পিছনেই রয়েছে নির্দিষ্ট যুক্তি ও অবিসংবাদি কারণ।

প্রিন্সিপিয়া প্রকাশের পর এবারে নিউটন পেলেন অকুণ্ঠ প্রশংসা, সাধুবাদ আর অপ্রতিহত খ্যাতি।

খ্যাতির সঙ্গে এল প্রাপ্তি। ১৮৮৯ খ্রি: ইংল্যাণ্ডের পার্লামেন্ট নিউটনকে সদস্য পদে বরণ করল। কেমব্রিজের বিজ্ঞান বিভাগ পরিচালনার সময় দায়িত্বও তিনি পেলেন।

১৭০১ খ্রি: পেলেন দেশের সমস্ত টাকশালের অধ্যক্ষপদ। অবশ্য এই পদ পাবার পর তিনি পার্লামেন্ট থেকে অবসর নেন। ১৭০৩ খ্রি: তিনি রয়াল সোসাইটির সভাপতি পদে বৃত হলেন। আমৃত্যু ১৭২৭ খ্রি: তিনি এই পদ অলঙ্কৃত করেছেন।

১৭০৫ খ্রি: মহারানী অ্যান নিউটনকে নাইট উপাধিতে সম্মানিত করলেন। তাঁর নামের আগে যুক্ত হল স্যার। এই বিরল সম্মান বিজ্ঞানীদের মধ্যে তিনিই প্রথম লাভ করেন।

পদ বা পদক যাই জুটুক না কেন নিজ প্রতিভাগুণেই নিউটন জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের একজন বলে স্বীকৃত হয়েছেন। তাঁর আবিষ্কারের সূত্র ধরেই আধুনিক বিজ্ঞানধারণা সুদূরপ্রসারী ফল ফলিয়ে চলেছে।

১১. ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭ খ্রি:)

যিনি কঠোর জ্ঞান সাধনা ও অধ্যাবসায়ের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে ছিলেন সারাটা জীবন, এক রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেও ধন-সম্পদ, ভোগ বিলাস ও প্রাচুর্যের মোহ যাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি, যিনি ছিলেন মুসলমানদের গৌরব তিনি হলেন ইবনে সিনা। তাঁর আসল নাম আবু আলী আল্ হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা। তিনি সাধারণত ইবনে সিনা, বু–আলী সিনা এবং আবু আলী সিনা নামেই অধিক পরিচিত। ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তুর্কীস্তানের বিখ্যাত শহর বোখারার নিকটবর্তী আফসানা গ্রাম তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম সিতারা বিবি। পিতা আবদুল্লাহ ছিলেন খোরাসানের শাসনকর্তা। জন্মের কিছু কাল পরই তিনি ইবনে সিনাকে রোখারায় নিয়ে আসেন এবং তার লেখাপড়ার সুব্যবস্থা করেন। ছোট বেলা থেকেই তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল অসামান্য মেধা ও প্রতিভা। মাত্র ১০ বছর বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা মুখস্থ করে, ফেলেন। তাঁর ৩ জন গৃহশিক্ষক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ইসমাইল সুফী তাঁকে শিক্ষা দিতেন ধর্মতত্ত্ব, ফিকাহ শাস্ত্র ও তাফসীর; মাহমুদ মসসাহ শিক্ষা দিতেন গণিত শাস্ত্র এবং বিখ্যাত দার্শনিক আল্ না’তেলী শিক্ষা দিতেন দর্শন, ন্যায় শাস্ত্র, জ্যামিতি, টলেমির আন্ত মাজেস্ট, জওয়াহেরে মান্তেক প্রভৃতি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে সকল জ্ঞান তিনি লাভ করে ফেলেন। বিখ্যাত দার্শনিক আল না’তেলীর নিকট এমন কোন জ্ঞান আর অবশিষ্ট ছিল না, যা তিনি ইবনে সিনাকে শিক্ষা দিতে পারবেন। এরপর তিনি ইবনে সিনাকে নিজের স্বাধীন মত গবেষণা দেন।

এবার তিনি চিকিৎসা বিদ্যা সম্পর্কিত কিতাব সগ্রহ করে গবেষণা করতে শুরু করেন। ইবনে সিনা তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, এমন বহু দিবারাত্রি অতিবাহিত হয়েছে যার মধ্যে তিনি ক্ষণিকের জন্যেও ঘুমাননি। কেবলমাত্র জ্ঞান সাধনার মধ্যেই ছিল তার মনোনিবেশ। যদি কখনো কোন বিষয় তিনি বুঝতে না পারতেন কিংবা জটিল কোন বিষয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতেন তখনই তিনি মসজিদে গিয়ে নফল নামাজ আদায় করতেন এবং সেজদায় পড়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে বলতেন, “হে আল্লাহ তুমি আমার জ্ঞানের দরজাকে খুলে দাও। জ্ঞান লাভ ছাড়া পৃথিবীতে আমার ও কামনা নেই।” তারপর গৃহে এসে আবার গবেষণা শুরু করত। ক্লান্তিতে যখন ঘুমিয়ে পড়তেন তখন অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো স্বপ্নের ন্যায় তার মনের মধ্যে ভাসততা এবং তার জ্ঞানের দরজা যেন খুলে যেত। হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠেই সমস্যাগুলোর সমাধান পেয়ে যেতেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি চিকিৎসা বিদ্যায় ইন্দ্রজালের সৃষ্টি করে বাদশাহকে সুস্থ করে তোলেন। বাদশাহ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তার জন্যে রাজ দরবারের কুতুবখানা উন্মুক্ত করে দেন। মাত্র অল্প কয়েকদিনে তিনি অসীম ধৈর্য ও একাগ্রতার সাথে কুতুবখানার সব কিতাব মুখস্থ করে ফেলেন। জ্ঞান বিজ্ঞানের এমন কোন বিষয় বাকি ছিল না যা তিনি জানেন না। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, গণিতশাস্ত্র, জ্যামিতি, ন্যায়শাস্ত্র, খোদতত্ত্ব, চিকিৎসা শাস্ত্র, কাব্য, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে অসীম জ্ঞানের অধিকারী হন। ২১ বছর বয়সে ‘আল মজমুয়া’ নামক একটি বিশ্বকোষ রচনা করেন, যার মধ্যে গণিত শাস্ত্র ব্যতীত প্রায় সকল বিষয়াদি লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

১০০১ খ্রিস্টাব্দে পিতা আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। এ সময় তাঁর বয়স ছিল ২২ বছর। নেমে আসে তাঁর উপর রাজনৈতিক দুর্যোগ। তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন এবং পিতার ঘটলে ১০০৪ খ্রি: ইবনে সিনা খাওয়ারিজমে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ সময়ে খাওয়ারিজমের বাদশাহ ছিলেন মামুন বিন মাহমুদ। ১০০৪ ১০১০ খ্রি: পর্যন্ত তিনি খাওয়ারিজমে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করলেও তাঁর এ সুখ শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ইবনে সিনার সুখ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে গজনীর সুলতান মাহমুদ তাঁকে পেতে চাইলেন। কারণ মাহমুদ জ্ঞানী ব্যক্তিদের খুব ভালবাসতেন। তাঁদেরকে দেশ বিদেশ থেকে ডেকে এনে তাঁর শাহী দরবারের গৌরব বৃদ্ধি করতেন এবং তাদেরকে মণি–মুক্তা উপহার দিতেন। এতদুদ্দেশ্যে সুলতান মাহমুদ তাঁর প্রধান শিল্পী আবু নসরের মাধ্যমে ইবনে সিনার ৪০ খানা প্রতিকৃতি তৈরি করে সমগ্র পারস্য ও এশিয়া মাইনরের রাজন্যবর্গের নিকট ছবিসহ পত্র পাঠিয়ে দিলেন যাতে তাঁরা ইবনে সিনাকে খুঁজে বের করার জন্যে দেশে বিদেশে সুলতান মাহমুদ লোক পাঠিয়ে দিলেন। এছাড়া তিনি খাওয়ারিজমের বাদশাহ মামুন বিন মাহমুদকে পরোক্ষভাবে এ নির্দেশ দিয়ে একটি পত্র পাঠালেন যে, তিনি যেন তাঁর দরবারের জ্ঞানী ব্যক্তিদের সুলতান মাহমুদের দরবারে পাঠিয়ে দেন। আসলে অন্যান্য জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে ইবনে সিনাকে পাওয়াই ছিল তাঁর আসল উদ্দেশ্য।

ইবনে সিনা ছিলেন স্বাধীনচেতা ও আত্মমর্যাদা সচেতন ব্যক্তি। ধন সম্পদের প্রতি তার কোন লোভ লালসা ছিল না; কেবলমাত্র জ্ঞান চর্চার প্রতিই ছিল তাঁর আসক্তি। তিনি নিজের স্বাধীনতা ও ইজ্জতকে অন্যের নিকট বিকিয়ে দিতে রাজি ছিলেন না। অন্যায় ভাবে কারো কাছে মাথা নত করতে তিনি জানতেন না। এছাড়া বিনা যুক্তিতে কারো মতামতকে মেনে নিতেও রাজি ছিলেন না তিনি। এমনকি ধর্মের ব্যাপারেও তিনি যুক্তির সাহায্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। তাই তৎকালীন সময়ে অনেকে তাঁকে ধর্মীয় উগ্রপন্থী এবং পরবর্তীতে কয়েকজন বিখ্যাত পণ্ডিত তাঁকে কাফির বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন। যারা তাঁকে কাফির ফতোয়া দিয়েছিলেন তাঁরা তাঁকে ভুল বুঝেছিলেন। আসলে ইবনে সিনা ছিলেন একজন খাঁটি মুসলমান। যারা তাঁকে কাফির বলেছিলেন, তাদের উদ্দেশ্যে তিনি একটি কবিতা রচনা করেন। এতে তিনি লিখেছেন, “যারা আমাকে কাফির বলে আখ্যায়িত করে তাঁরা পৃথিবীতে বিখ্যাত হোক আমার কোন আপত্তি নেই ৷ তবে আমার মত যোগ্য ব্যক্তি তোমরা আর পাবে না। আমি এ কথাও বলতে চাই যে, আমি যদি কাফির হয়ে থাকি তাহলে পৃথিবীতে মুসলমান বলতে কেউ নেই। পৃথিবীতে যদি একজন মুসলমানও থাকে তাহলে আমিই হলাম সেই ব্যাক্তি।”

গজনীর সুলতান মাহমুদ ছিলেন প্রবল প্রতাপশালী নেতা। তাঁর প্রতাপে অন্যান্য রাজা বাদশাহগণ পর্যন্ত ভয়ে কম্পমান থাকতেন। তাই গজনীতে গেলে ইবনে সিনার স্বাধীনতা ও ইজ্জত অক্ষুণ্ন থাকবে কিনা সে সম্পর্কে সন্ধিহান হয়েই তিনি গজনীতে সুলতান মাহমুদের দরবারে যেতে রাজি হননি। কিন্তু খাওয়ারিজমে তিনি এখন নিরাপদ নন ভেবে ১০১৫ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মামুন বিন মাহমুদের সহায়তায় সেখান থেকে পলায়ন করে এক অনিশ্চিত পথে রওনা দেন। প্রথমে আবিওয়াদি, তারপর তুস, নিশাপুর ও পরে গুরগাও গিয়ে পৌঁছেন। এখানে এসে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কিতাব রচনায় নিজকে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে এখানে তাঁর সুখ শান্তি স্থায়ী হয়নি। তিনি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে ঘুরে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রাম এবং শহর থেকে শহরে। কিন্তু তিনি গজনীতে যেতে রাজি হলেন না। অবশেষে তিনি যান রাও প্রদেশে। বিভিন্ন কিতাব লিখতে শুরু করেন। কিন্তু এখানেও তার সুখ স্থায়ী হল না। তার জ্ঞান সাধনা ও কিতাব রচনায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। তারপর তিনি চলে যান প্রথমে কাজভীন ও পরে হামাদান শহরে। এখানে এসেই তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আশ শেফা ও আল কানুন’ লেখায় হাত দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ সময় হামাদানের বাদশাহ শামস-উদ-দৌলা মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে ৪০ দিন চিকিৎসা করে তাকে মুমূর্ষ অবস্থা থেকে সুস্থ করে তোলেন।

ক্রমান্বয়ে ইবনে সিনা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং বাদশাহ শামস-উদ-দৌলার মন্ত্রীত্বের আসন অলংকৃত করেন। এখানেও তিনি তার জ্ঞান বুদ্ধি ও কর্ম দক্ষতার কারণে রাজদরবারের উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিবর্গের ঈর্ষার সমালোচকগণ সেনাবাহিনীকে তাঁর গভীর ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হন। এক পর্যায়ে সমালোচকগণ সেনাবাহিনীকে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তোলে এবং ইবনে সিনার মৃত্যুদণ্ডের দাবি করে। বাদশাহ বুঝতে পেরেছিলেন যে, এটা একটি গভীর ষড়যন্ত্র। কিন্তু সেনাবাহিনীর দাবিকে অগ্রাহ্য করা কিংবা ইবনে সিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া কোনটিই শামস-উদ-দৌলার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইবনে সিনা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে আত্মগোপন করেন এবং দীর্ঘ ৪০/৫০ দিন অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করেন। পরবর্তীতে বাদশাহ পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়লে এবং সৈনিকগণ তাদের ভুল বুঝতে পেরে ইবনে সিনাকে খুঁজে বের করেন এবং মন্ত্রীত্বের পদ গ্রহণ করার অনুরোধ জানায়। শামস-উদ-দৌলার মৃত্যুর পর সময় ও ঘটনার প্রবাহে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে চলে যান ইস্পাহানে। এ সময়ে ইস্পাহানের শাসনকর্তা ছিলেন, আলা-উদ-দৌলা। তিনি ইবনে সিনাকে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং তাঁর জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা করে দেন। এখানে তিনি উদ্যত গতিতে জ্ঞান চর্চা শুরু করেন এবং বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আশ শেফা’ ও ‘আল্ কানুন’ এর অসমাপ্ত লেখা শেষ করেন।

এ মনীষী পদার্থ বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, জ্যামিতি, গণিত, চিকিৎসা বিজ্ঞান, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে প্রায় শতাধিক কিতাব রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে আল কানুন, আশ শেফা, আরযু ফিত তিব্ব, লিসানুল আরব, আল মজনু, আল মুবাদাউন মায়াদা, আল মুখতাসারুল আওসাত, আল্ আরসাদুল কলিয়া উল্লেখযোগ্য। আল কানুন কিতাবটি তকালীন যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক বিপ্লব এনে দিয়েছিল। কারণ এত বিশাল গ্রন্থ সে যুগে অন্য কেউ রচনা করতে পারেনি। আল কানুন কিতাবটি ল্যাটিন, ইংরেজি, হিব্রু প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হয় এবং তৎকালীন ইউরোপের চিকিৎসা বিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আল্ কানুন ৫টি বিশাল খণ্ডে বিভক্ত যার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪ লক্ষাধিক। কিতাবটিতে শতাধিক জটিল রোগের কারণ, লক্ষণ ও পথ্যাদির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়। প্রকৃত পক্ষে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের তিনিই হলেন জনক। আশ শেফা’ দর্শন শাস্ত্রের আর একটি অমূল্য গ্রন্থ, যা ২০ খণ্ডে বিভক্ত ছিল। এতে ইবনে সিনা রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রাণীতত্ত্ব ও উদ্ভিদ তত্ত্বসহ যাবতীয় বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তিনি মানুষের কল্যাণ ও জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতি সাধনে আজীবন পরিশ্রম করেছেন এবং ভ্রমণ করেছেন জ্ঞানের সন্ধানে। তিনিই সর্বপ্রথম মেনেনজাইটিস রোগটি সনাক্ত করেন। পানি ও ভূমির মাধ্যমে যে সকল রোগ ছড়ায় তা তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন। সময় ও গতির সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কের কথা তিনিই আবিষ্কার করেন। তিনি এ্যারিস্টটলের দর্শন ও ভালভাবে অধ্যয়ন করেন। কিন্তু এ্যারিস্টটলের কিছু কিছু মতবাদের সাথে তিনি একমত হলেও সকল মতবাদের সাথে তিনি একমত হতে পারেননি।

জীবন সায়াহ্নে ফিরে আসেন তিনি হামাদানে। অতিরিক্ত পরিশ্রমের দরুন তিনি আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হন। একদিন তার এক ভূত ঔষধের সাথে আফিম মিশিয়ে দেয়। আফিমের বিষক্রিয়ায় তার জীবনী শক্তি শেষ হয়ে আসে। ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দে মহাজ্ঞানী ও বিশ্ববিখ্যাত এ মনীষী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হামাদানে তাকে সমাহিত করা হয়।

“আল্লাহর ভয় মানুষকে সকল ভয় থেকে মুক্তি দেয়।”…ইবনে সিনা।

১২. ওমর খৈয়াম (১০৪৪-১১২৩ খ্রি:)

ওমর খৈয়াম ১০৪৪ খিস্টাব্দে খোরাসানের রাজধানী নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম গিয়াস উদ্দীন আবুল ফতেহ ওমর ইবনে ইব্রাহীম। কিন্তু তিনি ওমর খৈয়াম নামেই সমগ্র বিশ্বে পরিচিত। খৈয়াম হচ্ছে বংশগত উপাধি। খৈয়াম শব্দের অর্থ হচ্ছে তাবু নির্মাতা বা তাবু ব্যবসায়ী। সম্ভবত বংশের কেউ তাবু তৈরি করতেন কিংবা তাবুর ব্যবসা করতেন। আর সে থেকেই বংশের কিংবা পারিবারিক উপাধি হয়েছে খৈয়াম। আসলে তিনিই ছিলেন খৈয়াম অর্থাৎ তাবু নির্মাতা। তিনি জ্ঞানের যে তাবু নির্মাণ করে গেছেন, আজও বিশ্বের অগণিত জ্ঞান পিপাসু মানুষ প্রবেশ করে জ্ঞানের সে তাবুর অভ্যন্তরে এবং আহরণ করে জ্ঞান। ওমর খৈয়ামের জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত জানা যায় না। এমন কি এ মনীষীর জন্ম তারিখ নিয়েও রয়েছে মতভেদ। পারস্য ঐতিহাসিকগণের মতে গজনীর সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে আনুমানিক ১০১৮ থেকে ১০৪৮ সালের মধ্যে কোন এক সময়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

ওমর খৈয়াম ছিলেন একজন বিশ্ব বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী, অংক শাস্ত্রবিদ, অর্জন করার তেমন কোন আশা আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল না। তিনি কেবল মাত্র আত্মসন্তুষ্টির জন্যে বিজ্ঞান চর্চার অবসর সময়ে মনের খেয়ালে এক ধরনের চতুস্পদী কবিতা লিখতেন। তিনি নিজ মাতৃভূমি ইরানেও জীবিতাবস্থায় কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন না। অথচ মনের খেয়ালে তার লিখিত কবিতাগুলো আজ সমগ্র বিশ্বে হয়েছে সমাদ্রিত এবং দখল করেছে সাহিত্য ও কবিতা জগতের শ্রেষ্ঠ সিংহাসন। ওমর খৈয়াম আজ সমগ্র বিশ্বের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। কিন্তু ইউরোপীয়রা অত্যন্ত কৌশলে এ মহামনীষীকে বিশ্ব বিখ্যাত একজন বিজ্ঞানীর পরিবর্তে কেবলমাত্র একজন কবি হিসেবে পৃথিবীর মানুষের সামনে পরিচিত কারার চেষ্টা করেছেন। ওমর খৈয়ামের মৃত্যু প্রায় ৭৩৪ বছর পর ১৮৫৭ সালে এডোয়ার্ড ফিজারেল্ড খৈয়ামের ‘রুবাইয়াত’ নামক চতুষ্পদ কবিতাগুলোর ইংরেজি অনুবাদের দ্বারা সমগ্র ইউরোপে তাঁর রুয়াইয়াত ছড়িয়ে দেয় এবং তিনি কবি হিসেবে পরিচয় লাভ করেন।

ওমর খৈয়াম ছোট বেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও বুদ্ধিমান। তাঁর স্মরণ শক্তি এত প্রখর ছিল যে, যে কোন দর্শন গ্রন্থ এবং কঠিন কঠিন কিতাব সমূহ মাত্র ৬/৭ বার পাঠ করেই তা মুখস্থ করে ফেলতেন। তাঁর মেধা ও প্রতিভার সামনে সক্রেটিস, এ্যারিস্টটল এবং ইউক্লিড এর প্রতিভাও ম্রিয়মান হয়ে যায়। ওমর খৈয়ামের শিক্ষকদের মধ্যে একজন ছিলেন তৎকালীন বিখ্যাত পণ্ডিত ইমাম মোয়াফিক। মনীষী ওমর খৈয়ামের পারিবারিক আর্থিক অবস্থা খুব ভাল ছিল না। আমীর আবু তাহির তাকে জ্ঞান চর্চার জন্যে কিছু অর্থ সাহায্য করেন এবং রাজ্যের সুলতান জালাল উদ্দিন মালিক শাহের প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ফলে তাঁর আর্থিক দূরাবস্থা সামান্য লাঘব হয়। রাষ্ট্রীয় সাহায্য পেয়ে ওমর খৈয়াম ভোগ বিলাসকে স্পর্শও করেননি। বরং রাষ্ট্রীয় সাহায্য তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান সাধনা ও গবেষণার কাজে সহায়তা করেছিল। কোন বই হাতে পেলেই তা তিনি পড়ে শেষ করে ফেলতেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান, বীজ গণিত ও জ্যামিতি ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়। এছাড়া দর্শন শাস্ত্রে ছিল তাঁর অসাধারণ ব্যুৎপত্তি। মানুষ হিসেবে ছিলেন তিনি খাঁটি মুসলমান ও আল্লাহ প্রেমিক।

১০৭৪ খ্রিস্টাব্দে বৈজ্ঞানিক ওমর খৈয়াম সেলজুকের সুলতান জালাল উদ্দিন মালিক শাহের অনুরোধ রাজকীয় মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁর উপর অর্পিত হয় এক গুরু দায়িত্ব। রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যনির্বাহের সুবিধার্থে একটি সঠিক সৌর বর্ষপঞ্জি তৈরির জন্যে সুলতান জালাল উদ্দিন মালিক শাহ ওমর খৈয়ামকে অনুরোধ জানান। ওমর খৈয়াম মাত্র ৭ জন সহকর্মী বৈজ্ঞানিক নিয়ে অতি অল্প দিনে সাফল্যের সাথে এবং নিখুঁতভাবে একটি সৌর বর্ষপঞ্জি চালু করেন এবং সেলজুকের সুলতান জালাল উদ্দিন মালিক শাহের নাম অনুসারে এর নাম দেন আত্‌ তারিখ আল জালালী বা জালালী অব্দ। এ জালালী বর্ষপঞ্জিতে ৩৭৭০ বৎসরে মাত্র ১ দিনের ভ্রান্তি ছিল। অপর দিকে গ্রেগরীয়ান বর্ষপঞ্জিতে ভ্রান্তি ছিল ৩৩৩০ বৎসরে ১দিনের। জালালী অব্দ হিজরী ৪৭১ সালের ১০ রমজান থেকে শুরু হয়। এ মহান বিজ্ঞানী একটি নতুন গ্রহও আবিষ্কার করেছিলেন।

ওমর খৈয়ামের সর্বাদিক অবদান এলজাবরা অর্থাৎ বীজ গণিতে। তিনিই সর্বপ্রথম এলজাবরার সমীকরণগুলোর শ্রেণী বিন্যাসের চেষ্টা করেন। জ্যামিতি সমাধানে বীজগণিত এবং বীজগণিত সমাধানে জ্যামিতি পদ্ধতি তাঁরই বিস্ময়কর আবিষ্কার। ভগ্নাংশীয় সমীকরণের উল্লেখ ও সমাধান করে ওমর খৈয়ামই সর্ব প্রথম বীজগণিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। বীজগণিত সম্পৰ্কীয় ‘ফি আলজাবের’ নামক গ্রন্থ তিনিই রচনা করে যান। বীজ গণিতের ক্ষেত্রে ‘বাইনোমিয়াল থিউরাম’ আবিষ্কার করেন। এই ‘বাইনোমিয়াল থিউরাম’ এর আবিষ্কার কর্তা হিসেবে বৈজ্ঞানিক নিউটন আজ পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে আছেন। অথচ তারও শত শত বছর পূর্বে কবি হিসেবে পরিচিত বৈজ্ঞানিক ওমর খৈয়াম তা আবিষ্কার করে গেছেন।

গণিত শাস্ত্রেও তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। গণিত জগতে এলালিটিক জিওমেট্রির কল্পনা তিনিই সর্ব প্রথম করেন। পরে সপ্তদশ শতাব্দিতে জনৈক গণিতবিদ একে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয় মাত্র। এছাড়া পদার্থ বিজ্ঞানেও তাঁর অবদানের কোন কমতি নেই। ওমর খৈয়ামকে মেধা ও চিন্তা শক্তি এত গভীর ছিল যে, একদিন ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ওমর খৈয়ামকে প্রশ্ন করেছিলেন, “কোন গোলক যে অংশের সাহায্যে অক্ষের উপর ঘুরতে থাকে, গোলকের সমস্ত অংশ এক প্রকার হওয়া সত্ত্বেও ঐ অংশটি অন্যান্য অংশ থেকে কিভাবে আলাদা রূপে জানা সম্ভব? এ প্রশ্নের জবাবে ওমর খৈয়াম তখনই অংকের ব্যাখ্যা শুরু করেন। দুপুর থেকে করে বিকেল পর্যন্ত ও তার ব্যাখ্যা শেষ হয়নি। তার জবাবে ইমাম গাজ্জালী (রঃ) সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “সত্যের সন্ধান পেয়ে মিথ্যার যবনিকা অপসারিত হলো। ইতিপূর্বে এ বিষয়ে আমার যে ধারণা ছিল তা মিথ্যা।”

ওমর খৈয়াম ছিলেন একজন বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী। তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানেও বহু বহু রচনা করে যান। ওমর খৈয়াম যে এত বড় দার্শনিক, বিজ্ঞানী, অংক শাস্ত্রবিদ ও চিকিৎসাবিদ ছিলেন তা মুসলিম জাতির অনেকেই হয়তো আজও জানেন না। কেবলমাত্র একজন কবি হিসেবেই তাকে সবাই চিনেন। এ অসাধারণ ব্যক্তিটিকে তার জীবিতাবস্থায় নিজ মাতৃভূমির লোকেরাও চিনত না কিংবা চিনার চেষ্টা করত না। ওমর খৈয়াম কখনো নিজকে জনগণের সামনে জাহির করার চেষ্টা করেননি। তার মত বহু মুসলিম মনীষী নিজের ব্যক্তিতুকে লুকিয়ে রেখে সারাটা জীবন মানুষের কল্যাণে জ্ঞান বিজ্ঞান ও শিল্প সাহিত্যে অবদান রেখে গেছেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন। কিন্তু তার অধিকাংশ গ্রন্থই সংরক্ষণের অভাবে আজ হারিয়ে গেছে। তাঁর গ্রন্থাবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে–(১) রুবাইয়াত (মরমী কবিতা), (২) মিজান-উল-হিকাম (রসায়ন বিজ্ঞান), (৩) নিজাম–উল–মূলক (রাজনীতি), (৪) আল জাবরা ওয়াল মুকাবিলা (বীজগণিত), (৫) মুশফিলাত (গণিত শাস্ত্র), (৬) নাওয়াযিম আসকিনা (ঋতু পরিবর্তন বিষয়ক), (৭) আল কাউল ওয়াল তাকলিক (মানুষের নৈতিক দায়িত্ব), (৮) রিসালা মুকাবাহ, (৯) দার ইলমে কুল্লিয়াত, (১০) নওরোজ নামা প্রভৃতি।

বিশ্ব বিখ্যাত এ মনীষী ১১২৩ খ্রিস্টাব্দে ৭৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। জানা যায়, মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর শিষ্যদের শেষ বারের মত বিশেষ উপদেশ দানের উদ্দেশ্যে আহবান করেন। এরপর তিনি ওজু করে এশার নামাজ আদায় করেন। এদিকে তিনি শিষ্যদের উপদেশ দানের কথা ভুলে যান। নামাজান্তে সেজদায় গিয়ে তিনি কাঁদতে থাকেন এবং জোরে জোরে বলতে থাকেন, “হে আল্লাহ আমি কেবলমাত্র তোমাকে পাবার এবং তোমাকে সন্তুষ্ট করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। আমি চাই তোমাকে। হে আল্লাহ, আমি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। তোমার দয়া ও করুণার গুণে আমাকে ক্ষমা করে দাও।” এরপর তিনি আর মাথা তোলেননি। সেজদা অবস্থায়ই তিন চিরদিনের জন্যে এ নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে যান আল্লাহ পাকের সান্নিধ্যে।

 ১৩. ইমাম গাজ্জালী (রঃ) (১০৫৮–১১১১ খ্রি:)

আল্লাহ রাব্দুল আ’লামীন পথহারা মানুষদের সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্যে এবং পৃথিবীর বুক থেকে সকল অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অন্যায়, অসত্য, শোষণ, জুলুম, অবিচার, ব্যভিচার, শিরক, কুফর, কুসংস্কার এবং মানব রচিত মতবাদ ও মতাদর্শের মূলোৎপাটন করে আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থা তথা খিলাফত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে লক্ষাধিক নবী রাসূল। তাঁর পরে পৃথিবীতে আর কোন নবী বা রাসূলের আবির্ভাব ঘটবে না। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে আল্লাহ পাক নবুয়্যতের দরজাকে বন্ধ করে দিয়েছেন। তবে এ কথা অসত্য নয় যে, প্রত্যেক যুগেই পথহারা মানুষদের সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্যে ঐশী জ্ঞানে সমৃদ্ধ এক বা একাধিক মনীষীর আবির্ভাব ঘটবে এ ধরাতে। তারা নবী কিংবা রাসূল হিসেবে আবির্ভূত হবেন না; কিংবা নতুন কোন মত বা মতাদর্শও প্রচার করবেন না। বরং তারা বিশ্বনবী (সাঃ) এর নির্দেশিত পথে এবং তাঁরই আদর্শের দিকে আহবান করবেন মানব জাতিকে। তাদের চরিত্র ও স্বভাব হবে মার্জিত, আকর্ষণীয় ও অনুপম। তাঁরা দুনিয়াকে ভোগ বিলাসের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে মনে করবেন না। তাদের চরিত্র, স্বভাব ও সাধারণ জীবন যাত্রা দেখে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ ফিরে আসবে সত্য ন্যায়ের পথে। ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ছিলেন তাঁদেরই একজন।

একাদশ শতাব্দীতে মানুষ অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুফর, শিরক, বিদআত, কুসংস্কার ও নানাবিদ পাপ কাজে লিপ্ত হতে শুরু করেছিল, অপরদিকে শিক্ষিত যুব সমাজ এরিস্টটল, প্লেটো এবং পাশ্চাত্যের অন্যান্য অমুসলিম দার্শনিকদের ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে ইসলামের সত্য পথ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল, তখন পৃথিবীতে সত্যের আলোক বর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হন মুজাদ্দিদ ইমাম গাজ্জালী (রঃ)। তিনি ১০৫৮ খ্রিস্টাব্দে ইরানের খোরাসান প্রদেশের অন্তর্গত তুস নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল এ ইরানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন শেখ সাদী (রঃ) মহাকবি ফেরদৌসী (রঃ), আল্লামা হাফিজ (রঃ), আল্লামা রুমী (রঃ), এর মত বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম মনীষীগণ।

ইমাম গাজ্জালী (রঃ) এর প্রকৃত না আবু হামেদ মোহাম্মদ গাজ্জালী। কিন্তু তিনি ইমাম গাজ্জাল নামেই খ্যাত। গুজ্জাল শব্দের অর্থ হচ্ছে সূতা কাটা। এটা তার বংশগত উপাধি। কারো মতে তাঁর পিতা মোহাম্মদ কিংবা পূর্ব পুরুষগণ সম্ভবত সূতার ব্যবসা করতেন। তাই উপাধি হয়েছে গাজ্জালী।

তাঁর পিতা ছিলেন দরিদ্র এবং শৈশবেই তিনি তাঁর পিতাকে হারান। পিতার মৃত্যুতে তিনি নিদারুণ অসহায় অবস্থায় পড়েন কিন্তু সাহস হারাননি। জ্ঞান লাভের প্রতি ছিল তার খুব আগ্রহ। তৎকালীন যুগের বিখ্যাত আলেম হযরত আহমদ ইবনে মুহাম্মদ বারকানী এবং হযরত আবু নসর ইসমাইলের নিকট তিনি কোরআন, হাদিস, ফিকাহ ও বিবিধ বিষয়ে অস্বাভাবিক জ্ঞান লাভ করেন। কিন্তু এতে তিনি তৃপ্তি বোধ করলেন না। জ্ঞান অন্বেষণের জন্যে পাগলের ন্যায় ছুটে যান নিশাপুরের নিযামিয়া মাদ্রাসায়। তৎকালীন যুগে নিশাপুর ছিল ইসলামী জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যে সমৃদ্ধ ও উন্নত। এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সর্ব প্রথম ও পৃথিবীর বৃহৎ নিযামিয়া মাদ্রাসা। সেখানে তিনি উক্ত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আবদুল মালিক (রঃ) নিকট ইসলামী দর্শন, আইন ও বিবিধ বিষয়ে জান অর্জন করেন।

আবদুল মালিক (রঃ) এর মৃত্যুর পর তিনি চলে আসেন বাগদাদে। এখানে এসে তিনি একটি মাদ্রাসায় অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং বিভিন্ন জটিল বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। জ্ঞান বিজ্ঞান ও দর্শনে তাঁর সুখ্যাতি আস্তে আস্তে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে তিনি আল্লাহকে পাবার জন্যে এবং আল্লাহর সৃষ্টির রহস্যের সন্ধানে ধন– সম্পদ ও ঘর-বাড়ির মায়া মমতা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন অজানা এক পথে৷ প্রায় দশটি বছর দরবেশের বেশে ঘুরে বেড়ান দেশ থেকে দেশান্ত। আল্লাহর ইবাদত, ধ্যান মগ্ন, শিক্ষাদান ও জ্ঞান চর্চার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দেন দিন রাত। জেরুজালেম হয়ে চলে যান মদীনায়। বিশ্বনবীর রওজা মোবারক জিয়ারত শেষে চলে আসেন মক্কায়। হজ্জব্রত পালন করেন। এরপর চরে যান আলেকজান্দ্রিয়ায়। সেখানে কিছু দিন অবস্থান করে আবার ফিরে আসেন মাতৃভূমিতে।

ইমাম গাজ্জালী (রঃ) এর আধ্যাত্মিক জ্ঞান ছিল অত্যন্ত গভীর। আল্লাহর স্বরূপ ও সৃষ্টির রহস্য তিনি অত্যন্ত নিবিড় ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর মতে আত্মা ও সৃষ্টির রহস্য এবং আল্লাহর অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিক যুক্তি তর্কে মীমাংসা করার বিষয় নয়; বরং এরূপ চেষ্টা করাও অন্যায়। আল্লাহর অস্তিত্ব ও সৃষ্টির রহস্য অনুভূতির বিষয়। পরম সত্য ও অনন্তকে যুক্তি দিয়ে বুঝার কোন অবকাশ নেই। তাঁর মতে যুক্তি দিয়ে আপেক্ষিকতা বুঝা যায় মাত্র। তিনি সকল প্রশ্নে মীমাংসা করেছেন কোরআন, হাদিস ও তারই ভিত্তিতে নিজের বিবেক বুদ্ধির সাহায্যে। আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ধর্মের প্রতি তাঁর আস্থা ছিল পর্বতের ন্যায় অটল ও সুদৃঢ়। ধর্ম ও দর্শনে তাঁর ছিল প্রভূত জ্ঞান। ধর্ম ও যুক্তির নিজ নিজ বলয় তিনি নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, “আত্মা কখনো ধ্বংস হয় না কিন্তু দেহ ধ্বংস হয়। আত্মা মৃত্যুর পর জীবিত থাকে। হৃদপিণ্ডের সাথে আত্মার কোন সম্পর্ক নেই হৃদপিণ্ড একটি মাংসপিণ্ড মাত্র, মৃত্যুর পরও দেহে এর অস্তিত্ব থাকে। কিন্তু আত্মা মৃত দেহে অবশিষ্ট থাকে না। মৃত্যুর পর আত্মার পরিপূর্ণ উৎকর্ষ ও মুক্তি সম্ভবপর হয়ে থাকে।” তিনি ইসলামী জান, বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যে ইসলামের পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছেন। তিনি ছিলেন ধর্ম, আদর্শ ও সুফিবাদের মূর্তিমান প্রতীক। তিনি অন্ধ বিশ্বাসের উপর যুক্তিকে প্রাধান্য দিতেন। কিন্তু যা চিরন্তন সত্য ও বাস্তব সেখানে তিনি যুক্তিকে প্রাধান্য দিতেন না বরং সেক্ষেত্রে ভক্তি ও অনুভূতিকেই প্রাধান্য দিতেন।

অংকশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ। এ সম্পর্কে তাঁর বিশেষ বিষয় ছিল ম্যাজিক স্কোয়ার। সাবিত ইবনে কোরা ও ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ব্যতীত ম্যাজিক স্কোয়ার মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের মনোযোগ আকৃষ্ট করতে পারেনি। তিনি নক্ষত্রাদির গতি ও প্রকৃতি সম্বন্ধে ২টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। সম্ভবত তাঁর এ গ্রন্থ দু’টি আক প্রায় বিলুপ্তি। এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে তিনি প্রায় চার সহস্রাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর অধিকাংশ গ্রন্থই ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতাব্দিতে ইউরোপ অসাধারণ প্রভাব বিস্তার করে। তাঁর প্রণীত গ্রন্থাবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে–(১) ইহিল –উল–উলুমুদ দীন, (২) কিমিয়াতে সা’দাত–এ গ্রন্থটি ক্লড ফিল্ড The Alchemy of happiness নাম দিয়ে ইংরেজি ভাষার অনুবাদ করেন। এ গ্রন্থটি ‘সৌভাগ্যের পরশ মণি’ নামে বাংলা ভাষায়ও অনূদিত ও বহুল প্রচারিত হয়ে আছে, (৩) কিতাবুল মনফিলিন আদ দালাল–এ গ্রন্থটি The liberation Fromerror নাম দিয়ে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, (৪) কিতাবুত তাকাফাতুল কালাসিফা এ গ্রন্থটি ক্লড ফিল্ড The Internal Contradiction of philos ophy নাম দিয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ করছেন, (৫) মিশকাতুল আনোয়ার, (৬) ইয়াকুত্তাবলিগ, (৭) মনখুল প্রভৃতি গ্রন্থ সমগ্র ইউরোপে সমাদ্রিত হয় এবং আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ মহামনীষী ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ইসলামের এক নব জাগরণ ঘটিয়েছিলেন।

তিনি ১১১১ খ্রিস্টাব্দে সুস্থ অবস্থায় এ নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান; যাকে পাবার জন্যে, যার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে, যার স্বরূপ উপলব্ধি করার জন্যে সারাটা জীবন ঘরবাড়ি ছেড়ে ঘুরে ফিরেছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। মৃত্যুর দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে তিনি ফজরের নামাজ আদায় করেন। তারপর নিজ হাতে তৈরি করা কাফনের কাপড়খানা বের করে বলেন, “হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। তুমি তো রহমান এবং রাহিম। হে আল্লাহ, একমাত্র তোমাকে পাবার জন্যে এবং তোমার স্বরূপ বুঝার জন্যেই আমি সকল আরাম আয়েশ ত্যাগ করে ঘুরে ফিরেছি বছরের পর বছর এবং এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তরে। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও।” এরপর তিনি কাফনের কাপড় পরিধান করেন এবং পা’দুখানা সোজা করে শুয়ে পড়েন এবং শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১১১১ খ্রিস্টাব্দে। বিশ্ব বিখ্যাত এ মনীষী চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন মুসলিম জাহানে।

১৪. ইবনে রুশদ (১১২৬১১৯৯ খ্রি:)

ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ মুসলিম সভ্যতাকে বিশ্ব জনমনের স্মৃতিপট থেকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিশ্ব বিখ্যাত যে সকল মুসলিম মনীষীদের নামকে বিকৃত করে লিপিবদ্ধ করেছে, তাদের মধ্যে ইবনে রুশদ এর নাম অন্যতম। তারা অধিকাংশ মনীষীর নাম এমনভাবে বিকৃত করেছে, নাম দেখে বুঝার উপায় নেই সে উনি একজন খাঁটি মুসলমান এবং খোদা ভীরু ছিলেন। ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ ইবনে রুশদ এর নাম বিকৃত করে এভেরোস’ লিপিবদ্ধ করেছে। তার প্রকৃত নাম আবুল ওয়ালিদ মোহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে মোহাম্মদ ইবনে রুশদ।

১১২৬ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের কর্ডোভা নগরীতে একটি বিখ্যাত অভিজাত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করন। তাঁর পূর্ব পুরুষগণ স্পেনের রাজনীতিতে বিশেষভাবে জাড়িত ছিলেন। তাঁর পিতামহ ছিলেন কর্ডোভার প্রধান বিচারপতি। এছাড়া তিনি কর্ডোভা জামে মসজিদের ইমাম ছিলেন এবং মালেকী মাজহাবের একজন প্রখ্যাত পণ্ডিতও ছিলেন।

ইবনে রুশদ ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান আধ্যাত্মবাদী। কথায় ও কাজে ছিলেন আল্লাহ পার্কের এক অনুগত বান্দা। বাল্য ও কৈশোরে তিনি কর্ডোভা নগরীতে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি যে সকল শিক্ষকের নিকট জ্ঞান অধ্যয়ন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে দু’জনের নাম হল- ইবনে বাজা এবং আবু জাফর হারুন। জ্ঞান সাধনার প্রতি তার ছিল অসীম আগ্রহ। তিনি তাঁর মেধা ও প্রতিভার বলে খুব কম সময়ের মধ্যেই কোরআর, হাদিস, বিজ্ঞান, আইন, চিকিৎসা তার পাণ্ডিত্য ও কর্ম দক্ষতার সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে তাঁকে অপরদিকে তার চিকিৎসার খ্যাতি ও প্রতিপত্তিতে মুগ্ধ হয়ে খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফ ১১৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসক ইবনে তোফায়েলের মৃত্যুর পর তাঁকে রাজ চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ করেন এবং পরবর্তীতে ইয়াকুবের পুত্র খলিফা ইয়াকুব আর মনুসুরও ইবনে রুশদকে রাজ চিকিৎসক পদে বহাল রাখেন। এরূপ রাজকীয় পদমর্যাদা ও প্রভাব প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও এ মহান মনীষী ভোগ বিলাসের মধ্যে ডুবে যাননি। সরকারি বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পর তিনি জীবনের সমস্ত অবসর সময়ে মানুষের কল্যাণে জ্ঞান সাধনা, দর্শন, অংকশাস্ত্র, চিকিৎসা বিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করতেন। কথিত আছে, তিনি বিবাহ ও পিতার মৃত্যুর রাত্রি ব্যতীত আর কোন রাত্রিতেই অধ্যয়ন ত্যাগ করেননি।

ইবনে রুশদ কখনো অন্যায় ও অসত্যের সামনে সত্য ও ন্যায়কে প্রকাশ করতে ভয় করতেন না। তিনি তাঁর দর্শন ও ধর্মীয় বিষয়ে বলিষ্ঠ মতবাদ ব্যক্ত করতেন। এতে কখনো কখনো খলিফারা তাঁর নির্ভীক ও স্পষ্ট মতবাদে বিরক্ত ও ক্রোধান্বিত হয়ে উঠতেন। অপরদিকে খ্রিস্টান পাদ্রীরা প্রচার করেন, “তাঁর নাম পাপের প্রতি শব্দ।” অবশেষে খলিফা ইয়াকুব আল মনসুর তাঁকে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অপসারণ করেন। এতেও খলিফা সন্তুষ্ট হলেন না। ১১১৯ ইং সালে খলিফা তাঁকে কর্ডোভার নিকটবর্তী ইলিসাস নামক স্থানে নির্বাসন দেন এবং তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞান, অংকশাস্ত্র, পদার্থ বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক ইবনে রুশদ চরম অপমান ও আর্থিক দূরবস্থায় পতিত হন। ১১৯৮ খ্রিস্টাব্দে খলিফা তার ভুল বুঝতে পেরে তোক পাঠিয়ে ইবনে রুশদকে ফিরিয়ে আনেন এবং পূর্ব পদে পুর্নবহাল করেন। কিন্তু তিনি এ সুযোগ বেশি দিন ব্যবহার করতে পারেননি। ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে এ মুসলিম মনীষী ইহলোক ত্যাগ করেন।

এ মনীষী দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, আইন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ব্যাকরণ, চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করে যান। কিন্তু তাঁর প্রণীত অনেক গ্রন্থই সংরক্ষণের অভাবে আজ বিলুপ্ত প্রায়। তার প্রণীত প্রায় ৮৭টি বই এখনো পাওয়া যায়। তিনি গোলকের গতি সম্বন্ধে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যার নাম “কিতাবু ফি হরকাতুল ফালাক’। গ্রন্থটি জ্যাকব আনাতোলি কর্তৃক ১২৩১ সালে হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে তার লেখা বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২০টি। এগুলোর অধিকাংশই ইংরেজি, ল্যাটিন ও জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর তাঁর প্রণীত একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে, “কিতাব আল কুলিয়াত ফি–আততীব’। এ গ্রন্থটিতে তিনি অসংখ্য রোগের নাম, লক্ষণ ও চিকিৎসা প্রণালী বর্ণনা করেছেন। ধর্ম ও দর্শনের উপর তার রচিত একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে ‘তাহজুল আল তাহজুল’ যার ইংরেজি অনুবাদের নাম হচ্ছে, ‘The Incoherence of the Incoherence’ এছাড়া ইবনে রুশদ সঙ্গীত ও ত্রিকোণমিতি সম্বন্ধেও গ্রন্থ রচনা করেন।

 ১৫. আল্লামা শেখ সা’দী (রঃ) (১১৭৫–১২৯৫ খ্রি:)

গগণের উদারতা ও স্বর্গের শান্তির বাণী নিয়ে সময় সময় যে যে সবল মহাপুরুষ মর্ত্যের দ্বারে আতিথ্য গ্রহণ করেন এবং জগতের কিঞ্চিত যথার্থ কল্যাণ সাধন দ্বারা মানুষের স্মৃতিপটে অক্ষয় পদচিহ্ন রেখে যান, শেখ সা’দী (রঃ) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। সীমাহীন দারিদ্রতার মধ্যেও তিনি ধর্য্যের সাথে জ্ঞান অর্জন, পদব্রজে দেশ ভ্রমণ, কাব্য ও সাহিত্য রচনা এবং আধ্যাত্মিক চিন্তার মধ্য দিয়ে কাটিয়েছিলেন সারাটা জীবন। ডাক ও তার প্রথার যখন সৃষ্টি হয়নি, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত শত শত পত্র পত্রিকার অবাধ প্রচার যখন ছিল না; লঞ্চ, বাস, ট্রেন কিংবা প্লেনে চড়ে পৃথিবী ভ্রমণ করা যখন সম্ভব ছিল না; ধর্ম সাহিত্য ও ইতিহাসের অভিনব বার্তা যখন জনগণের নিকট পৌঁছবার কোন সুযোগ ছিল না, তখন শেখ সা’দী (রঃ) নৈশ নক্ষত্রের ন্যায় আপন অনাড়ম্বর কিরণ ধারা উৎসারিত করে জনগণের দুয়ারে দুয়ারে সে আলোক রশ্মি বিতরণ করতেন।

স্যার আউসলী এর মতে ১১৭৫ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের ফারেস প্রদেশের অন্তর্গত সিরাজ নগরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আয়ু ১২০ বছর। তবে তাঁর জন্ম ও মৃত্যু সাল নিয়ে মতভেদ আছে। কারো কারো মতে তাঁর জন্ম সাল ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দ এবং আয়ু ১০২ বছর। কিন্তু মুজাফফর উদ্দীন আতাবেক সা’দ বিন জঙ্গীর রাজত্বকালে যে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন তাতে কোন দ্বিমত নেই। বাল্যকালে তাঁর নাম ছিল শেখ মোসলেহ উদ্দীন। জানা যায়, ফারেসের শাসনকর্তা আতাবেক সা’দ বিন জঙ্গীর রাজত্বকালে তিনি যখন কবিতা লিখতেন তখন আপন নামের সাথে ‘সা’দী’ লিখতেন এবং এ নামেই তিনি সুখ্যাতি লাভ করেন। সা’দীর পিতা রাজ দরবারে চাকুরী করতেন এবং তিনি ছিলেন খুব ধার্মিক। ফলে শৈশব থেকেই সা’দীর পিতা রাজ দরবারে চাকুরী করতেন এবং তিনি ছিলেন খুব ধার্মিক। ফলে শৈশব থেকেই সা’দী ধর্মীয় অনুশাসনের ভিতর দিয়ে গড়ে উঠেন। কোন অসৎ সঙ্গ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। শৈশবেই তাঁর মধ্যে পরিলক্ষিত হয় অসাধারণ প্রতিভা। শিক্ষা লাভের প্রতি ছিল তাঁর অস্বাভাবিক আগ্রহ। কিন্তু শৈশবেই পিতা মৃত্যু বরণ করায় তিনি হয়ে পড়েন নিতান্ত ইয়াতীম ও অসহায়। পিতার আর্থিক অবস্থাও ভাল ছিল না। সরকারী চাকুরী করে পিতা যে সামান্য বেতন পেতেন তা দিয়েই খুব কষ্ট করে তাঁকে সংসার চালাতে হত। কিন্তু পিতার মৃত্যুতে সংসারে নেমে আসে চরম দারিদ্রতা এবং তাঁর শিক্ষা লাভের উপর আসে মারাত্মক আঘাত। কিন্তু এ অসহায়ত্ব ও দারিদ্রের মধ্যেও তিনি ধৈর্য্য হারাননি। শেখ সা’দী (রঃ) এর জীবনকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ৩০ বছর শিক্ষা লাভ, দ্বিতীয় ৩০ বছর দেশ ভ্রমণ, তৃতীয় ৩০ বছর গ্রন্থ রচনা এবং চতুর্থ ৩০ বছর আধ্যাত্মিক চিন্তা ও সাধনা।

পিতার মৃত্যুর পর তিনি সিরাজ নগরের গজদিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। কারো মতে ফারাসের শাসনকর্তা আতাবেক সা’দ বিন জঙ্গী দয়াপর্বশ হয়ে স্বয়ং ইয়াতীম শেখ সা’দীর আশ্রয় দান বিদ্যা শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। উক্ত মাদ্রাসায় নিশ্চিত মনে বেশী দিন শিক্ষা লাভ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। কারণ তখন রাজ্যের সর্বত্র রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি বিরাজ করছিল। তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের আশায় দারিদ্রের সাথে লড়াই করে চলে যান বাগদাদে। বাগদাদের নিযামিয়া মাদ্রাসা ছিল তঙ্কালীন বিশ্বের সবৃশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাগদাদে এসে তিনি অনাহারে, অর্ধাহারে এবং আশ্রয়ের অভাবে দিনের পর দিন পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। অতঃপর তিনি একজন সহৃদয় ব্যক্তির সহযোগিতায় স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে শিক্ষা লাভ শুরু করেন। তাঁর প্রতিভা, তীক্ষ্ণবুদ্ধি এবং শিক্ষা লাভে তার অসাধারণ পরিশ্রমের প্রেক্ষিত খুব অল্প সময়ের। মধ্যেই তাঁর প্রতি শিক্ষকগণের সুদৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। এরপর তিনি ভর্তি হন বাগদাদের নিযামিয়া মাদ্রাসায়। সেখানে তিনি বিখ্যাত আলেম আল্লামা আবুল ফাতাহ ইবনে জওজী (রঃ) এর নিকট তাফসীর, হাদিম ও ফিকাহ শাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। অল্প দিনের মধ্যেই তিনি মাদ্রাসার প্রধান ছাত্র হিসেবে পরিগণিত হন এবং মাসিক বৃত্তি লাভ করেন। মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি তাফসীর, হাদিস, ফিকাহ, সাহিত্য, দর্শন, খোদাত ও ইসলামের বিবিধ বিষয়ে অসামান্য পান্ডিত্য অর্জন করেন। আল্লামা শেখ সাদী (রঃ) শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভেই সন্তুষ্ট ছিলেন না; বরং আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের প্রতিও ছিল তাঁর অস্বাভাবিক আগ্রহ। শেখ সাদী (রঃ) এর জন্মের ১০ বছর পূর্বে অর্থাৎ ১১৬৫ খ্রি: (৫৬১ হিঃ) তোপসশ্রেষ্ঠ শেখ আবদুল কাদির জিলানী (রঃ) ইন্তেকাল করেন। তাঁর অলৌকিক তপঃ প্রভাবের কথা সমগ্র বিশ্বে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। শেখ সাদী (রঃ) প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের অবসর সময়ে ধন্য পুরুষদের আশ্রমে গিয়ে অতীন্দ্রিয় জগতের তথ্য সংগ্রহ করতেন। এতদুদ্দেশ্যে তিনি তকালীন তপস শেখ শাহাবুদ্দিন (রঃ) এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ধন্য পুরুষদের সঙ্গ লাভে অল্প দিনের মধ্যেই তার ধর্মগত প্রাণ তত্ত্বজ্ঞান ও পুণ্যের আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল।

৩০ বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্তির পর শুরু হয় তাঁর ভ্রমণ জীবন। জ্ঞান পিপাসা চরিতার্থ করার মানসে সংসার বৈরাগীর ন্যায় খালি হাতে তিনি পদব্রজে বিচরণ করেছেন জগতের বিভিন্ন দেশ এবং নানা স্থানে উপদেশ বিতরণের মাধ্যমে লোকদের ধর্ম ও সভ্যতার পথে উন্নীত করেছেন। স্যার আউসলী’র মতে প্রাচ্য জগতে সুবিখ্যাত ইবনে বতুতার পরে পরিব্রাজক হিসেবে যার নাম শীর্ষে রয়েছে, তিনি হলেন মাওলানা শেখ সা’দী (রঃ)। ডদব্রজ বা উষ্ট্রপৃষ্ঠ ব্যতীত যখন মরুভূমি পার হবার কোন উপায় ছিল না তখন শেখ সাদী (রঃ) শ্বাপদসঙ্কুল ও অসভ্য বর্বর অধুষিত জনপদের শত সহস্র বিপদ উপেক্ষা করে পব্রজে ভ্রমণ করেছিলেন দেশ থেকে দেশান্তরে। তিনি সমগ্র পারস্য, এশিয়া মাইনর, আরবভূমি, সিরিয়া, মিসর, জেরুজালেম, আর্মেনিয়া, আবিসিনিয়া, তুর্কিস্তান, ফিলিপাইন, ইরাক, কাশগড়, হাবস, ইয়ামন, শাম, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, হিন্দুস্তানের সোমনাথ ও দিল্লীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। পব্রজে ভ্রমণ করেছিলেন। এ সময় দেশ ভ্রমণ করতে গিয়ে তাঁকে পার হতে হয়েছিল পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর, ভারত মহাসাগর, আরব সাগর প্রভৃতি। এ সুদীর্ঘ সফরের ফলে তিনি বিশ্বের ১৮টি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। পদব্রজে তিনি হজ্জ সম্পাদন করেছিলেন ১৪ বার। তাঁর এ ভ্রমণ কাহিনী তিনি তার গুলিস্তা ও বোস্তা বিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। গুলিস্তায় তিনি লিখেছেন–

“দর আফসায়ে আলম বগাশতম বসে,
বসর বোরদাম আ’য়ামে বহর কাসে,
তামাত্তায় যে হরগোশা ইয়াফতাম,
যে হর খিরমানে খোশা ইয়াফতাম।”

অর্থাৎ–

“ভ্রমিয়াছি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রদেশ,
মিলিয়াছি সর্বদেশে সবাকার সনে,
প্রতি স্থানে জ্ঞানে রেণু করি আহরণ,
প্রতি মৌসুমে শস্য করেছি ছেদন।”

বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে শেখ সাদী (রঃ) অর্জন করেছিলেন বিবিধ জ্ঞান; তাঁর চোখের সামনে ঘটেছিল বহু বিচিত্র ঘটনা, তিনি অবলোকন করেছিলেন জাতির উত্থান, পতনের ইতিহাস। কর্ডোভার মুসলিম সাম্রাজ্য যার ঐশ্বর্যে একদিন এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা প্রভাবান্বিত হয়েছিল তা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শেখ সা’দী (রঃ) এর চোখের সামনে নিশ্চিহ্ন হয়ে ধরা পৃষ্ট হতে মুছে গিয়েছিল। এ শতকেই সেলজুক এবং খাওয়ারিজম শাহীর আত্মদ্বন্দু উভয় সাম্রাজ্যের মূল উৎপাটন করে ফেলেছিল। বনি আব্বাসদের রাজ বংশ যা প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ বছর বিপুল বিক্রমে রাজত্ব করেছিল, তাও এ শতকে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সা’দী (রঃ) দেখেছিলেন দুর্ভিক্ষের হাহাকার। মিসর ও পারস্যের দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ হানি দেখে তার হৃদয় বিদীর্ণ হয়েছিল। যে দুর্ধর্ষ চেঙ্গিস খাঁর নামে আজও সমগ্র এশিয়ার লোক শিহরিত হয়, তারই পোত্র নৃশংস হালাকু খান এক বিরাট তাতার বাহিনী নিয়ে ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের উপর আপতিত হয়েছিল। বর্বরদের নির্মম অক্রমণে ইসলামের শেষ খলিফা মোতাসেম বিল্লাহ নির্দয় ভাবে নিহত হলেন। এরপর শুরু হল নির্মম গণহত্যার অভিনব। নারী পুরুষের অকলঙ্ক শোণিতে রাজপথ, গৃহ ও টাইগ্রাসের পানি রঞ্জিত হল। বাগদাদ পরিণত হল এক মহা শ্মশানে। ইবনে খালদুন লিখেছেন, বিশ লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে প্রায় ষোল লক্ষ লোক এ আক্রমণে নিহত হয়েছিল। শেখ সাদী (রঃ) গুলিস্তার প্রথম অধ্যায়েই এ সকল জালেমদের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী পরিচালনা করেছেন। তাঁর প্রায় সমগ্র কাব্য গ্রন্থের ভিতরই জালেম বাদশাহর উপর তার শ্লেষ বাক্য ও অবজ্ঞার চিহ্ন বিচ্ছুরিত দেখতে পাওয়া যায়।

দেশ ভ্রমণে নিষ্ঠুর, জালেম ও বর্বরদের হাতে সা’দীকে কতবার যে কষ্ট লোগ করতে হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। দ্বাদশ শতাব্দীতে ফিলিস্তিনীতে খিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে ধর্মযুদ্ধ যখন চরম আকার ধারণ করে তখন খ্রিস্টানদের আক্রমণ থেকে। পাবার জন্যে শেখ সা’দী (রঃ) নিকটস্থ এক নির্জন জঙ্গলে আশ্রয় নেন। খ্রিস্টানগণ জঙ্গল থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায় এবং বুলগেরিয়া ও হাঙ্গেরী হতে আনীত ইহুদিদের সাথে তাঁকে পরিখা খননে নিযুক্ত করে। তখন তাঁর দুরাবস্থার সীমা ছিল না। একদিন আলিপ্পো শহরের এক সম্ভ্রান্ত বণিক (সাদীর এক সময়ের পরিচিত) সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। শেখ সা’দী (রঃ) তাকে দেখে সমুদয় ঘটনা বললেন। এতে বর্ণিত দয়াপরবশ হয়ে মনিবকে ১০ দিনার ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাঁকে মুক্ত করে সাথে করে আলিপ্পো শহরে নিয়ে যান। কিন্তু আলিপ্পো শহরেও তিনি সুখ পাননি। বণিকের এক বদমেজাজী ও বয়স্কো কন্যা ছিল। তার বদমেজাজের কারণে কেউ তাকে বিয়ে করতে রাজি হত না। বণিক ১০০ দিনার মোহরের বিনিময়ে কন্যাকে শেখ সা’দীর নিকট বিয়ে দেন এবং মোহরের অর্থ বণিক নিজেই পরিশোধ করেন। সা’দী বিপদে আপদে কখনো ধৈৰ্য্যহারা হতেন না। বিয়ের পর কবি শেখ সাদী (রঃ) আর সুখের মুখ দেখতে পেলেন না। বদমেজাজী রমণী একদিন সহসা বলে ফেলল যে, তুমি কি সেই হতভাগ্য নও, যাকে আমার পিতা অনুগ্রহ করে ১০ দিনার মূল্য দিয়ে স্বহস্তে মুক্ত করেছিলেন? উত্তরে শেখ সা’দী (রঃ) বললেন, “হ্যাঁ সুন্দরী! আমি সেই হতভাগ্য, যাকে তোমার পিতা ১০ দিনার দিয়ে মুক্ত করেছিলেন, কিন্তু পুনরায় ১০০ দিনার দিয়ে তোমার দাসত্বে নিযুক্ত করে দিয়েছেন। সম্ভবত আল্লাহ পাক তার প্রিয় বান্দাদেরকে এভাবে অভাব অনটন ও দুঃখ কষ্ট দিয়ে পরীক্ষা করে থাকেন।

আল্লামা শেখ সা’দী (রঃ) বহু কাব্যগ্রন্থ রচনা করে যান। তাঁর এ সকল কাব্যে রয়েছে মানুষের নৈতিক ও চরিত্র গঠনের অমূল্য বাণী। শেখ সাদীর অলঙ্কারময় ভাষা ও প্রকাশের জাদু পাঠকদের মনকে বিস্ময় বিমুগ্ধ করে রাখত। আজও তার লেখা কাব্য গ্রন্থ কারিমা, গুলিস্তা ও বোস্তা বিশ্বের বিভিন্ন কওমী মাদ্রাসায় পাঠ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীরা পবিত্র কোরআন শিক্ষার পরই তাঁর রচিত কাব্য গ্রন্থ কারিমা, গুলিস্তা ও বোস্তা শিক্ষা লাভ করে থাকে। তাঁর সমস্ত রচনাই অতি সরল ও প্রাঞ্জল। আলেমগণ বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় সভায় শেখ সা’দীর কবিতা আবৃত্তি করে থাকেন। তাঁর কবিতা আবৃত্তি না করলে আলেমগণ যেন ওয়াজ মাহফিল জমাতে পারেন না। শিশুরা শেখ সাদীর কারিমা গ্রন্থের কবিতা সুললিত কণ্ঠে পাঠ করতে থাকে–

“কারিমা ব–বখশায়ে বর হালে মা
কে হাস্তম আসীরে কামান্দে হাওয়া।
দারেম গায়ের আর্য ফরিয়াদ রাস্
তু–য়ী আসীয়ারা খাতা বখশ ও বাস্।
নেগাদার মারা যে রাহে খাতা
খাতা দার গোযার ও সওয়াবম নমা।”

অনুবাদ : হে দয়াময় প্রভু! আমার প্রতি রহম কর। আমি কামনা ও বাসনার শিবিরে বন্দী। তুমি ব্যতীত আর কেউ নেই, যার নিকট আমি প্রার্থনা করব। তুমি ব্যতীত আর কেউ ক্ষমাকারী নেই। তুমি আমাকে পাপ থেকে রক্ষা কর। আমার কৃত পাপ ক্ষমা করে পুণ্যের পথ প্রদর্শন কর।

শেখ সাদীর গুলিস্তা ও বোস্তা বিশ্ব কাব্য ও সাহিত্যে এক অমূল্য সম্পদ। গুলিস্তা ও বোস্তা ব্যতীত জগতে এমন গ্রন্থ খুব কমই আছে যা বহু যুগ ধরে বিপুল ভাবে পঠিত হয়ে আসছে। ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে জেল্টায়াস নামক এক ব্যক্তি ল্যাটিন ভাষায় আমস্টারডাম নগরে ‘রোসারিয়াম পলিটিকাম’ নাম দিয়ে গুলিস্তার অনুবাদ প্রকাশ করেন। ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে উহা ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়। বর্তমানে ইউরোপ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখ সাদীর গুলিস্তাসহ বিভিন্ন কিতাব ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, আরবী, ডাচ, উর্দু, তুর্কি, বাংলা প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। শেখ সাদী (রঃ) এর উপরোক্ত গ্রন্থগুলো ব্যতীত নসিহত-অল-মলুক’, ‘রিসালায়ে আশুকিয়ানো’, ‘কিতাবে মিরাসী’, ‘মোজালেসে খামসা, তরজিয়াত’, রিসালায়ে সাহেবে দিউয়ান, কাসায়েদল আরবী, আৎ তবিয়াত’, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

শেষ বয়সে শেখ সাদী (রঃ) মাতৃভূমি নগরের এক নির্জন আশ্রমে জীবন যাপন করতেন। এ স্থানেই তিনি অধিকাংশ সময় গভীর ধ্যানমগ্ন থাকতেন। মাঝে মাঝে আগন্তক ব্যক্তিদের সাক্ষাৎ দেয়ার জন্যে আশ্রমের বাইরে যেতেন। দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন ধনী, গরীব, শিক্ষিত, মূর্খ, রাজা প্রজা এবং নিকট সমবেত হত। শেখ সাদী (রঃ) বাল্যকাল থেকেই দৈনিক ৪/৫ ঘণ্টা পৃবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতেন। তিনি কখনো গৃহে বেনামাজী চাকর নিয়োগ করতেন না। আস্তে আস্তে তাঁর বার্ধক্য ঘনিয়ে আসে। বার্ধক্যেও তিনি যৌবনের তেজ ধারণ করতেন। অবশেষে ১২৮২ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৬৯১ হিজরীতে ১২০ বছর বয়সে এ মনীষী ইহলোক ত্যাগ করেন। সিরাজ নগরের ‘দিলকুশা নামক স্থানের এক মাইল পূর্ববর্তী পাহাড়ের নিচে তাঁর সমাধি রয়েছে। সমাধি জিয়ারতকারীদের পাঠের জন্যে সা’দীর নিজ হাতে লেখা একটি কাব্যগ্রন্থ সমাধি গৃহে রক্ষিত আছে। পারস্যে এ সমাধি গৃহ ‘সাদীয়া’ নামে অভিহিত হয়ে থাকে।

১৬. মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রঃ) (১২০৭-১২৭৩ খ্রি:)

আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক কি? আল্লাহকে চেনা ও বুঝার উপায় কি? মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক কি? ইহজগতে থেকে মানবাকৃতি বজায় রেখে মানুষ কিভাবে অস্তিত্বহীন হতে পারে? নিয়তি ও কর্মের সমস্যার সমাধান কি? নফস কি এবং নফসের প্রভাব থেকে মানুষের মুক্তি লাভের উপায় কি? এ সকল বিস্ময়কর প্রশ্নের জবাব যিনি প্রথম মানুষের সামনে দিয়েছিলেন, তাঁর নাম মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রঃ)। ৬০৪ হিজরীর ৬ রবিউল আউয়াল মোতাবেক ১২০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ সেপ্টম্বর এ মহামনীষী বর্তমান আফগানিস্তানের বলখ নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল বাহাউদ্দিন ওয়ালিদ। পিতা ছিলেন তকালের স্বনামখ্যাত কবি ও দরবেশ। জানা যায় পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালিদের পাণ্ডিত্যের খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে পারস্যের রুম প্রদেশের অন্তর্গত কুনিয়ার তকালীন শাসনকর্তা আলাউদ্দিন কায়কোবাদ মনীষী বাহাউদ্দিন কুনিয়ায় আমন্ত্রণ করে পাঠান। আমন্ত্রণ পেয়ে বাহাউদ্দিন ওয়ালিদ সপরিবারে কুনিয়ার চলে যান এবং রাজনৈতিক কারণে তিনি সেখানে বাসস্থান নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এ রুম প্রদেশের নাম অনুসারে তিনি রুমী’ নামে খ্যাতি লাভ করেন।

৫ বছর বয়স থেকেই মাওলানা রুমী (রঃ) এর মধ্যে বিভিন্ন অলৌকিক বিষয়াদি পরিলক্ষিত হতে থাকে। বাল্যকালে তিনি অন্যান্য ছেলেমেয়েদের ন্যায় খেলাধূলা ও আমোদ প্রমোদ লিপ্ত থাকতে পছন্দ করতেন না। তিনি সর্বদা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আলোচনা পছন্দ করতেন। ৬ বছর বয়স থেকেই তিনি রোজা রাখতে শুরু করেন। ৭ বছর বয়সে তিনি সুমধুর কণ্ঠে পবিত্র কোরআন বিশুদ্ধভাবে তেলাওয়াত করতেন। কোরআন তেলাওয়াতের সময় তার দু’নয়নে অশ্রুধারা প্রবাহিত হত। সম্ভবত এ বয়সেই তিনি কোরআনের মর্মবাণী ও আধ্যাত্মিক বিষয়াদি অনুধাবন করতে পারতেন। কথিত আছে মাওলানা রুমী (রঃ) এর বয়স যখন ৬ বছর তখন পিতা বাহাউদ্দিন বালক রুমী (রঃ) কে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ইরানের নিশাপুরে যান এবং সেখানে বিখ্যাত দার্শনিক ও কবি শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তাবের সাক্ষাৎ লাভ করেন। শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তাৰ বালক জালাল উদ্দিনের মুখচ্ছবি দেখেই তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত বুঝতে পেরে তার জন্যে দোয়া করেন এবং তার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখার জন্যে পিতাকে উপদেশ দেন। নিশাপুর ত্যাগ করে পিতা বাহাউদ্দিন রুমী (রঃ) কে সঙ্গে নিয়ে পবিত্র হজ্জ সম্পাদন করেন এবং বাগদাদসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। পিতা নিজেই তার পুত্রকে আধ্যাত্মিক জ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিতে লাগলেন। শিক্ষা লাভের প্রতি তাঁর ছিল পরম আগ্রহ।

১২৩১ সালে পিতার মৃত্যুর পর মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রঃ) মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন এবং জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে মারাত্মক বাধা এসে দাঁড়ায়। মাতাকে হারিয়ে ছিলেন আরো কয়েক বছর পূর্বে। এ সময়ে কুনিয়া শহরে তিনি সাহচর্য লাভ করেন পিতার প্রধান শিষ্য তৎকালীন পণ্ডিত ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী সৈয়দ বোরহান উদ্দিনের। সৈয়দ বোরহান উদ্দিন পিত শোকাকুল মাওলানা রুমী (রঃ) কে শিক্ষা দান করেন। এরপর উচ্চতর শিক্ষা লাভের জন্যে তিনি চলে যান প্রথমে সিরিয়া ও পরে দামেস্কে। তিনি দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৭ বছর অধ্যয়ন করেন। এছাড়া জ্ঞানের সন্ধানে তিনি ৪০ বৎসর বয়স পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান দেশ থেকে দেশান্তরে। তিনি তার শিক্ষা জীবনে তৎকালীন যুগ শ্রেষ্ঠ মনীষীদের সাহচর্য লাভ করেন। তিনি যাদের থেকে জ্ঞান লাভ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে শামসুদ্দিন তাব্রীজ (রঃ), ইবনে আল আরাবি (রঃ), সালাউদ্দিন ও হুসামউদ্দিন এর নাম উল্লেখযোগ্য। জালাল রুমী (রঃ) এত জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে, তকালীন সময়ে তার সাথে অন্য কারো তুলনা ছিল না। কথিত আছে ১২৫৯ সালে চেঙ্গীস খানের পৌত্র হালাকু খান যখন বাগদাদ অধিকার করে তদীয় সেনাপতি কুতুববেগকে দামেস্কের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন তখন দামেস্কবাসীদেরকে সহযোগিতা করার জন্যে ধ্যানযোগে তিনি দামেস্কে উপস্থিত হয়েছিলেন।

পিতার মৃত্যুর পর রুমী (রঃ) পিতার গদীনেশীন হন। বিভিন্ন দেশ থেকে তাঁর নিকট আগত হাজার হাজার লোকদেরকে তিনি শিক্ষাদান করেন। তিনি বহু কিতাব লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁর গ্রন্থাবলীর মধ্যে মসনবী’ ও ‘দিওয়ান’ তাঁকে অমর করে রেখেছে। বাংলা ভাষা সহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তাঁর গ্রন্থ ‘মসনবী’ অনূদিত হয়েছে। আলেমগণ আজও বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় আলোচনা সভায় তাঁর রচিত কবিতা আবৃত্তি করে শ্রোতামণ্ডলীকে আকৃষ্ট করে থাকেন। পারস্যে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের পরই মসনবী’কে যথার্থ পথ প্রদর্শক বলে মনে করা হয়। দিওয়ানে রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার শ্লোক, যার প্রায় সমস্তই আধ্যাত্মিক গজল। তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য ও সংস্কৃতি অতুলনীয়।

রুমী (রঃ) ছিলেন মহাপণ্ডিত। অসামান্য পাণ্ডিত্য তাঁকে দরবেশ বা সুফীতে পরিণত করেছে। ইলমে মারেফত’ ও ‘এলমে লাদুনিতে তিনি অসাধারণ পাণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন। এটা হলো শ্রেষ্ঠ জ্ঞানের আলয়। সুফীর মতে দেহই মানবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনের মহা অন্তরায়। দেহের ভিতরে যে কামনা ও বাসনা মানুষকে সর্বদা সত্যপথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, যা মানুষকে ব্যক্তিত্ব বা অহংকার প্রদান করে ভোগলিন্দু করে, সে জৈব আকাংখার নাম সুফীদের ভাষায় নফর’। নফসের ধ্বংসই দেহের কর্তৃত্বের অবসান ও আত্মার স্বাধীনতার পূর্ণতা। তাই নফসের বিরুদ্ধে সুফীদের আজীবন সংগ্রাম। রুমী (রঃ) তার সারাটা জীবন নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন। রুমীর মতে বুদ্ধি, যুক্তি ও ভক্তি এক নয়। বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে আল্লাহকে চিনা, বুঝা ও পাওয়া যায় না। বরং এর জন্যে প্রয়োজন বিশ্বাস ও ভক্তি। ভক্তিই সোপান। আর ভক্তির উৎস হচ্ছে প্রেম ও আসক্তি। রুমির মতে আল্লাহ নির্গণ নন। জ্ঞান, দয়া, করুণা, প্রেম ও ক্রোধ ইত্যাদি অসংখ্য গুণাবলী রয়েছে তাঁর। কিন্তু মানুষ তার জ্ঞান, বুদ্ধি ও যুক্তির মাপকাঠি দিয়ে আল্লাহর গুণাবলী অনুধাবন করতে পারে না। কারণ বুদ্ধি ও যুক্তি নিজেই একটি সৃষ্ট বস্তু এবং মস্তিষ্ক ও স্নায়ুমন্ডলীর সক্রিয়তার উপর নির্ভরশীল। সুতরাং সৃষ্ট দিয়ে অসৃষ্টকে বুঝা সম্ভব নয়। আল্লাহকে বুঝতে ও চিনতে হলে ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রয়োজন। তাহলেই অন্তর দিয়ে আল্লাহকে অনুধাবন করতে পারবে। মানুষ যখন মারেফাতের ঊর্ধ্বতন স্তরে উন্নীত হয়ে আপনার ভিতর আল্লাহর প্রকাশ অনুভব করে তখন তার ব্যক্তিত্বের সীমা কোথায় ভাসিয়ে যায়। তিনি তখন অসীমের ভিতর আপনাকে হারিয়ে ফেলেন। কিংবা তিনি নিজের সীমার ভিতরই অসীমের সন্ধান লাভ করেন। তখন তিনি আনন্দে বিভোর হয়ে বিশ্ব ভ্রহ্মান্ডের রাজৈশ্বর্যকে একেবারেই তুচ্ছ বোধ করেন। মারেফাতের স্তর উন্নীত হলে আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে আর কোন ভেদাভেদ থাকে না। এ অবস্থার নাম হলো ‘হাল। এ কথাগুলো পৃথিবীর মানুষের সামনে পেশ করে গেছেন মাওলানা রুমী (রঃ)। ইহজগতে থেকে মানবাকৃতি বজায় রেখে মানুষ কিভাবে অস্তিত্বহীন হতে পারে তা মাওলানা রুমী (রঃ) দেখিয়েছেন।

মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী (রঃ) ‘ভাগ্য ও পুরস্কার’ সমস্যার সহজ সমাধান দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সকল কার্যের নিয়ন্তা আল্লাহ। কিন্তু এর সংগে তিনি এটাও স্বীকার করেছেন যে, আল্লাহ পাক মানুষকে কতকগুলো কার্যের পূর্ণ। স্বাধীনতা বা স্বেচ্ছাধিকার দিয়েছেন, যার সীমারেখার মধ্যে মানুষ নিজেই তার কর্মপন্থা নির্বাচনের অধিকারী। এ সকল কার্যাদির কর্মফলের জন্যে মানুষ নিজেই দায়ী। কারণ এগুলো করা না করা তারই স্বেচ্ছাধিকার ভুক্ত, যদিও কর্ম করার শক্তি আল্লাহই মানুষকে প্রদান করেছেন। রুমী (রঃ) ছিলেন তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী।

রুমী (রঃ) খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। তিনি দুনিয়ার ভোগ বিলাস ও ঐশ্বর্যকে তুচ্ছ মনে করতেন। তিনি যে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন সে তুলনায় দুনিয়া তুচ্ছ হওয়াটাই স্বাভাবিক। মৃতু কালে তার কোন সঞ্চিত ধন-সম্পদ ছিল না। ৬৬ বছর বয়সে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার অসুস্থতার সংবাদ প্রচারিত হবার সাথে সাথে চতুর্দিক হতে হাজার হাজার লোক গভীর উদ্বেগের সাথে ছুটে আসে। তৎকালীন বিখ্যাত চিকিৎসক শেখ সদরউদ্দিন, আকমাল উদ্দিন ও গজনফার তার চিকিৎসা করে ব্যর্থ হন। এ সময় রুমী (রঃ) চিকিৎসক শেখ সদরউদ্দিন সাহেবকে লক্ষ্য করে বললেন, “আশেক ও মাশুকের মধ্যে একটি মাত্র পর্দার ব্যবধান রয়েছে। আশেক চাচ্ছে তার মাশুকের নিকট চলে যেতে। পর্দাটা যেন দ্রুত উঠে যায়। শেখ সদরউদ্দিন বুঝতে পেরেছিলেন, রুমী (রঃ) এর আয়ু শেষ হয়ে আসছে; অর্থাৎ রুমী (রঃ) আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যাওয়ার জন্য তখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এরপর তিনি তাঁর শিষ্যদের সান্ত্বনা দিয়ে কিছু উপদেশ দিলেন, যার কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ

ইন্দ্রিয় লালসাকে কখনো প্রশ্রয় দিবে না। পাপকে সর্বদা পরিহার করবে। নামাজ ও রোজা কখনো কাযা করবে না। অন্তরে ও বাহিরে সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে চলবে। বিপদে ধৈর্যধারণ করবে। বিদ্রোহ ও প্রতিশোধমূলক মনোভাব পোষণ করবে না। নিদ্রা ও কথাবর্তায় সাধ্যানুযায়ী সংযমী হবে। কাউকে কোন প্রকার কষ্ট দিবে না। সব সময় সৎ লোকদের সংস্পর্শে থাকবে। মনে রাখবে, মানুষের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ, যার দ্বারা ও দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধিত হয়। তারপর তিনি বললেন, মানুষের দেহ নশ্বর কিন্তু তার আত্মা অবিনশ্বর। এ নশ্বর দেহ ধ্বংস প্রাপ্ত হয় বটে; কিন্তু তার ভিতর যে অবিনশ্বর আত্মা রয়েছে তা চিরকালই বেঁচে থাকে।

এরপর এ বিখ্যাত মনীষী ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন। এ সময়ে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর।

১৭. ইবনুন নাফিস (১২০৮-১২৮৮ খ্রি:)

জ্ঞান, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, শিল্প, সাহিত্য ও বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের যে শ্রেষ্ঠ অবদান রয়েছে তা আমরা অনেকেই জানি না। পাশ্চাত্য সভ্যতার ধারক ও বাহক এবং তাদের অনুসারীগণ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মুসলিম মনীষীদের নামকে মুসলমানদের স্মৃতিপট থেকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্যে ইসলামের ইতিহাস এবং মুসলিম বিজ্ঞানীদের নামকে বিকৃতভাবে লিপিবদ্ধ করেছে। ফলে সঠিক ইতিহাস না জানার কারণে অনেকে অকপটে এ কথা বলতেও দ্বিধা করেন না যে, সভ্যতার উন্নয়নে মুসলমানদের তেমন কোন অবদান নেই। বরং চিকিৎসা বিজ্ঞানেও মুসলমানগণ অমুসলিদের নিকট ঋণী। কিন্তু এ উক্তি সঠিক নয়; বরং মিথ্যারও নীচে। এমন এক যুগ ছিল যখন মুসলিম জাতির মধ্যে আল্লাহ পাকের করুণায় ধন্য মানুষের জন্ম হয়েছিল। তারা জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রায় সকল ধারা বা শাখা প্রশাখা আবিষ্কার করে গিয়েছেন। তাঁদের মৌলিক আবিষ্কারের উপরই বর্তমান জ্ঞান বিজ্ঞানের অধিষ্ঠান।

মানবদেহ রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা কে আবিষ্কার করেছিলেন? শ্বাসনালীর আভ্যন্তরীণ অবস্থা কি? মানবদেহে বায়ু ও রক্ত প্রবাহের মধ্যে ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার ব্যাপারটা কি? ফুসফুসের নির্মাণ কৌশল কে সভ্যতাকে সর্ব প্রথম অবগত করিয়েছিলেন? রক্ত চলাচল সম্বন্ধে তঙ্কালীন প্রচলিত গ্যালেনের মতবাদকে ভুল প্রমাণীত করে চিকিত্সা বিজ্ঞানে ১৩’শ শতাব্দীর বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন কে? এসব জিজ্ঞাসার জবাবে যে মুসলিম মনীষীর নাম উচ্চারিত হতে তিনি হলেন আলাউদ্দীন আবুল হাসান আলী ইবনে আবুল হাজম ইবনুন নাফিস আল কোরায়েশী আল মিসরী। তিনি ইবনুন নাফিস নামেই সর্বাধিক পরিচিত।

তিনি ৬০৭ হিজরী মোতাবেক ১২০৮ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মস্থান দামেস্ক, মিসর না সিরিয়া এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে তাঁর নামের শেষে ‘মিসরী’ সংযুক্ত থাকায় তিনি মিসরেই জন্মগ্রহণ করেছেন বলে অনেকে মনে করেন। ইবনুন নাফিস তাঁর প্রথম জীবন অতিবাহিত করেন দামেস্কে এবং মহাজজিব উদ্দীন আদ দাখওয়ারের নিকট তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে এত ঝুপত্তি লাভ করেন যে, তৎকালীন সময়ে তার সমকক্ষ আর কেউ ছিল না।

তথ্য অনুসন্ধান ও আবিষ্কারের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। খলিল আসোকিদি তাঁর ‘ওয়াদি বিল ওয়াকায়াত’ গন্থে লিখেছেন, “ইবনুন নাফিস ছিলেন অতি বিশিষ্ট দক্ষ ইমাম এবং অতি উচ্চ শিক্ষিত বিজ্ঞ হাকিম।” মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাঁর অবদান সর্বাধিক। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও আইন শাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্য লাভের পর তিনি কায়রো গমন করেন এবং সেখানে মাসরুবিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিকাহ (আইন) শাস্ত্রের অধ্যাপক নিযুক্ত হন।

ইবনুন নাফিস মানবদেহে রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতি, ফুসফুসের সঠিক গঠন পদ্ধতি, শ্বাসনালী, হৃৎপিন্ড, শরীর শিরা উপশিরায় বায়ু ও রক্তের প্রবাহ ইত্যাদি সম্পর্কে বিশ্বের জ্ঞান ভান্ডারকে অবহিত করেন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান জগতে তিনি যে কারণে অমর হয়ে আছেন তা হলো মানবদেহে রক্ত চলাচল সম্পর্কে গ্যালেনের মতবাদের ভুল ধরিয়ে ছিলেন তিনি এবং এ সম্বন্ধে নিজের মতবাদ সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। ইবনুন নাফিস তাঁর ইবনে সিনার কানুনের এনাটমি অংশের ভাষ্য শরহে তসরিহে ইবনে সিনা গ্রন্থে এ মতবাদ প্রকাশ করেন। তিনি ৫ জায়গায় হৃৎপিন্ড (Heart) এবং ফুসফুসের (Lungs) ভিতর দিয়ে রক্ত চলাচল সম্বন্ধে ইবনে সিনার মত উদ্ধৃত করেছেন এবং ইবনে সিনার এ মতবাদ যে গ্যালেনের মতবাদেরই পুনরাবৃত্তি তাও দেখিয়ে দিয়ে এ মতবাদের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে, শিরার রক্ত এর দৃশ্য বা অদৃশ্য ছিদ্র দিয়ে ডান দিক থেকে বাম দিকের হৃদপ্রকোষ্টে চলাচল করে না; বরং শিরার রক্ত সব সময়েই ধমনী শিরার ভিতর দিয়ে ফুসফুসে যেয়ে পৌঁছায়; সেখানে বাতাসের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে শিরার ধমনীর মধ্য দিয়ে বাম দিকের হৃৎপ্রকোষ্ঠে যায় এবং সেখানে এ জীবনতেজ গঠন করে।

তিনি ফুসফুস এবং হৃৎপিন্ডের এনাটমি নিয়ে আলোচনা করেন। ইবনে সিনা এ্যারিস্টটলের মতবাদের সাথে একমত হয়ে হৃৎপিন্ডে ৩টি হৃৎপ্রকোষ্ঠ রয়েছে বলে যে মত প্রকাশ করেছেন তিনি তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। এ্যারিস্টটল মনে করতেন যে, দেহের পরিমাপ অনুসারেই হৃপ্রকোষ্ট সংখ্যার কম বেশী হয়। তিনি এই মতকে ভুল বলে প্রমাণ করেন। তাঁর মতে হৃৎপিন্ডে মাত্র দুটো হৃৎপ্রকোষ্ট আছে। একটা থাকে রক্তে পরিপূর্ণ এবং এটা থাকে ডান দিকে আর অন্যটিতে থাকে জীবনতেজ, এটা রয়েঝে বাম দিকে। এ দুয়ের মধ্যে চলাচলের কোন পথই নেই। যদি তা থাকত তাহলে রক্ত জীবনতেজের জায়গায় বয়ে গিয়ে সেটাকে নষ্ট করে ফেলতে। হৃৎপিন্ডের এনাটমি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইবনুন নাফিস যুক্তি দেখান যে, ডান দিকের হৃপ্রকোষ্ঠে কোন কার্যকরী চলন নেই এবং হৃৎপিন্ডকে মাংসপেশীই বলা হউক বা অন্য কিছুই বলা হউক তাতে কিছু আসে যায় না। বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ মতবাদটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞান সম্মত বলে গৃহীত হলেও ইবনুন নাফিসকে বিজ্ঞান জগতে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।

ইবনুন নাফিস কেবল মাত্র একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানীই ছিলেন না; বরং তিনি সাহিত্য, আইন, ধর্ম ও লজিক শাস্ত্রেও অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বহু বৃহৎ গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি ২০ খন্ডে ইবনে সিনার বিখ্যাত গ্রন্থ কানুন ‘ এর ভাষ্য প্রণয়ন করেন। এতে তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন কঠিন সমস্যার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বিভিন্ন রোগের ঔষধ সম্পর্কে তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম হচ্ছে ‘কিতাবুশ শামিল ফিল সিনায়াত তিব্বিয়া’। গ্রন্থটি প্রায় ৩০০ খন্ডে সমাপ্ত হবার কথা ছিল কিন্তু তার অকাল মৃত্যুতে তা সম্ভব হয়নি। এ গ্রন্থটির হস্তলিপি দামেস্কে রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে তিনি হিপোক্রেটস, গ্যালেন, হুনায়েন ইবনে ইসহাক এবং ইবনে সিনার গ্রন্থের ভাষ্য প্রণয়ন করেন।

তিনি হাদীসশাস্ত্রের উপরও কয়েকখানা ভাষ্য লেখেন। এছাড়া তিনি আরো বহু গ্রন্থ রচনা করেন যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে–আল মুখতার মিনাল আগজিয়া (মানবদেহে খাদ্যের প্রভাব সম্পর্কে), রিসালাতু ফি মানাফিয়েল আদাল ইনসানিয়াত (মানবদেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কার্য সম্বন্ধে)’, আল কিতাবুল মুহাজ ফিল কুহল (চক্ষু রোগ সম্বন্ধে), শারহে মাসায়েলে ফিত তিব্ব’, ‘তারিকুল ফাসাহ, মুখতাসারুল মানতেক’ প্রভৃতি।

তিনি ৬৮৭ হিজরী মোতাবেক ১২৮৮ খ্রীঃ কায়রোতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে সুস্থ করে তোলার প্রায় সকল চিকিৎসাই ব্যর্থ হয়ে যায়। অবশেষে মৃত্যু শয্যায় তার মিসর ও কায়রোর চিকিৎসক বন্ধুরা তাঁর রোগের প্রতিষেধক হিসেবে তাকে মদ পান করতে অনুরোধ করেন। মদ পান করলেই তাঁর রোগ সেরে যাবে বলে তারা পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি এক ফোঁটা মদ পান করতেও রাজি হলেন না। তিনি বন্ধুদেরকে উত্তর দিলেন, “আমি আল্লাহ পাকের দরবারে চলে যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি চিরদিন এ নশ্বর পৃথিবীতে থাকতে আসিনি। আল্লাহ আমাকে যতটুকু ক্ষমতা দিয়েছেন আমি চেষ্টা করেছি মানুষের কল্যাণে কিছু করে যেতে। বিদায়ের এ লগ্নে শরীরে মদ নিয়ে আল্লাহ পাকের দরবারে উপস্থিত হতে আমি চাই না।”

অতঃপর ৬৮৭ হিজরীর ২১শে জিলকদ মোতাবেক ১২৮৮ খ্রীষ্টাব্দের ১৮ই ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার সকালে এ মহামনীষী ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তিনি তাঁর একমাত্র বাড়ীটি এবং তার সমস্ত বইপত্র মনসুরী হাসপাতালে দান করে যান।

১৮. ইবনে খালদুন (১৩২২–১৪০৬ খ্রীঃ)

মানব জাতির কল্যাণে আল্লাহ রাব্বর আলামীন যুগে যুগে এ ধরাতে পাঠিয়েছেন অসংখ্য নবী-রাসূল ও মনীষীদেরকে। যে ক’জন মুসলিম মনীষী মানুষের কল্যাণে বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা, শিল্প, সাহিত্য, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে তাদের অমূল্য অবদানের জন্যে আজও সমগ্র বিশ্বে অমর হয়ে আছেন, ব্যক্তি স্বার্থের জন্যে যারা কখনো অন্যায় ও অসত্যের কাছে মাথা নত করেননি, যারা জ্ঞান সাধনার উদ্দেশ্যে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন, ভোগ বিলাসকে উপেক্ষা করে যারা সারাটা জীবন কাটিয়েছেন মানুষের কল্যাণে, যারা জালেম শাসকদের স্বৈরশাসনকে সমর্থন না দিয়া কারাগারে কাটিয়েছেন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, তাদের মধ্যে ইবনে খালদুন অন্যতম।

১৩২২ খ্রিস্টাব্দের ২৭ মে আফ্রিকার তিউনিসিয়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ইবনে খালদুনের পুরো নাম আবু জায়েদ ওয়ালী উদ্দিন ইবনে খালদুন। তার পিতার নাম মুহাম্মদ ইবনে খালদুন। খালদুন’ হচ্ছে বংশের উপাধি। তাঁর পূর্ব পুরুষগণ ইয়েমেন থেকে এসে তিউনিসে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পিতামহ তিউনিসের সুলতানের মন্ত্রী ছিলেন। পিতা ছিলেন খুব জ্ঞান পিপাসু। বাল্যকাল থেকেই ইবনে খালদুন জ্ঞান সাধনায় মশগুল হন। তাঁর মেধা ও স্মরণশক্তি ছিল বিস্ময়কর। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি পবিত্র কুরআনের তাফসীর শিক্ষা শেষ করেন। দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ বিজ্ঞান, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান সাধনার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। যে কোন বিষয়ে কোন বই পেলেই তা তিনি পড়ে শেষ করে ফেলতেন। ফলে অল্প বয়সেই তিনি বিভন্ন বিষয়ে গভীর জ্ঞান লাভ করেন।

জ্ঞান সাধনায় মত্ত এ মনীষীর জীবনের এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নেমে আসে এক ভয়ানক দুর্যোগ। ১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দে তিউনিসে দেখা দেয় ‘প্লেগ’ নামক মহামারী। এ মহামারীতে তার পিতামাতা, শিক্ষক, আত্মীয়-স্বজন ও অনেক বন্ধুবান্ধব মারা যান। এ সময়ে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ১৭/ ১৮ বছর। পিতামাতাকে হারিয়ে তিনি শোকে-দুঃখে মুহ্যমান হয়ে পড়েন এবং সংসারে নেমে আসে অভাব অনটন। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন তিউনিসের সুলতান আবু মুহাম্মদ এর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে তিনি চাকুরিতে যোগদান করেন। যেহেতু সংসারে মা বোন কেউ ছিল না, তাই ২২ বছর বয়সে ১৩৫৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিবাহ করতে বাধ্য হন। জ্ঞান পিপাসু এ মনীষী বিবাহের পর আমোদ প্রমোদ ও ভোগ বিলাসে ডুবে যাননি বরং গভীর আগ্রহে জ্ঞান চর্চা শুরু করেন। আস্তে আস্তে সারা দেশে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে ক্রমান্বয়ে তিনি রাজনীতিতে জাড়িয়ে পড়েন। চলে আসেন আন্দালুসিয়ায়। সেখানে গ্রানাডার সুলতানের অনুরোধে তিনি কেস্টিল রাজ্যে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিছুদিন দায়িত্ব পালন করার পর ১৩৬৬ খ্রিস্টাব্দে আবার চলে আসেন স্বদেশভূমি তিউনিসে এবং এখানে তল্কালীন সুলতান আবু আবদুল্লাহর অনুরোধে ‘বগী’ নামক রাজ্যের মন্ত্রী হিসেবে চাকুরিতে যোগদান করেন।

পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় যে, প্রায় প্রত্যেক মনীষীই নিজ মাতৃভূমিতে মর্যাদা পাননি বরং নির্যাতিত, বিতাড়িত এবং ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। ইবনে খালদুন ও তাদের থেকে আলাদা নন। তিউনিসিয়ার ‘বগী’ রাজ্যে তিনি বেশি দিন অবস্থান করতে পারেননি। সেখানে তিনি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হন। সুলতান আবু আবদুল্লাহকে তাঁর ভাই আবুল আব্বাস হত্যা করে রাজ্য ছিনিয়ে নেন এবং ইবনে খালদুনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করেন। তিনি কোন উপায়ে বগী রাজ্য ত্যাগ করে চলে যান তেলেমচীন রাজ্যে যা মরক্কোর একটি ক্ষুদ্র রাজ্য ছিল। মরক্কোর সুলতান আবদুল আজীজ ইবনে আল হাসান এ ক্ষুদ্র রাজ্যটি দখল করে নিলে তিনি সুলতানের হাতে বন্দী হন। সুলতান ইবনে খালদুনের জ্ঞান প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে মুক্তি দানের আদেশ দেন। তখন প্রায় অধিকাংশ দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। আন্দলুসিয়ার সুলতান কর্তৃক মরক্কো দখল হলে ইবনে খালদুন পুনরায় গ্রেফতার হন এবং আনুমানিক ১৩৭৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুক্তি লাভ করেন।

মুক্তি পেয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ে তিনি চলে আসনে আন্দলুসিয়ায় এবং জ্ঞান সাধনা ও ইতিহাস রচনায় মনোনিবেশ করেন। কিন্তু এখানেও তিনি শান্তি ও নিরাপত্তা পেলেন না। জালেম, নিষ্ঠুর ও ক্ষমতা লিন্দু শাসকদের ষড়যন্ত্রের কারণে তাঁকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে দেশ থেকে দেশান্তরে, পোহাতে হয়েছে অনেক দুর্ভোগ। এ সময় আন্দালুসিয়ার সুলতান ছিলেন আল আহমার। তিনি ইবনে খালদুনকে খুব সম্মান দিয়েছিলেন। কিন্তু এ সময় মরক্কোর নতুন আমীর ইবনে খালদুনকে গ্রেফতার করার জন্যে লোক পাঠালে ইবনে খালদুন আন্দালুসিয়া ত্যাগ করে চলে যান উত্তর আফ্রিকায়। সে সময় উত্তর আফ্রিকায় ইবনে খালদুনের খুব প্রভাব ও সুখ্যাতি ছিল।

তিনি ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব; যিনি দুঃখ কষ্টকে বরণ করে নিয়েছেন। কিন্তু সত্য ও ন্যায়কে প্রকাশ করতে কাউকে ভয় করতেন না। তখন তেলেমচীনের আমীর আবু হামুর এর মন্ত্রী ছিলেন তার ভাই ইয়াহিয়া। তিনি এখানে সর্ব সাধারণ বিশেষ করে গরীব ও সমাজের নির্যাতীত ও নিপীড়িত মানুষের সাথে মেলামেশা করতে লাগলেন। ক্রমে ক্রমে ইবনে খালদুনের মানব সেবা, প্রতিভা ও আদর্শে মুগ্ধ হয়ে জনগণ তাঁর ভক্ত হতে লাগল এবং তার নিকট তাদের বিভিন্ন অভাব অভিযোগের কথা প্রকাশ করতে শুরু করল। আমীর আবু হামু ভাবলেন, জনগণ যেভাবে তার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে তাতে দেশে যে কোন সময় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে। তাই আমীর আবু হামু ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ইবনে খালদুনের বিরুদ্ধে প্রজা বিদ্রোহের অভিযোগ উত্থাপন করেন। এতে ইবনে খালদুন তেলেমচীন ত্যাগ করে বানু আরিফ প্রদেশে চলে যান এবং শান্তিতে বসবাস শুরু করেন। এখানেই তিনি আমীর মুহাম্মদ ইবনে আরিফের দেয়া নিরাপত্তা ও সহযোগিতায় বিশ্ববিখ্যাত কিতাব ‘আল্ মোকাদ্দিমা’ রচনা করেন। এ কিতাবের মাধ্যমে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজ বিজ্ঞানী, ঐতিহাসিক ও দার্শনিক হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করেন। আল মুকাদ্দিমায় তিনি যে মৌলিক চিন্তা ধারায় পরিচয় দিয়েছেন তা পৃথিবীতে আজও বিরল। তিনি সুস্পষ্ট ভাষাই বলেছেন যে, ঐতিহাসিক বিবরণ ও ঘটনাপঞ্জী লিপিবদ্ধ করাই ঐতিহাসিকের কাজ নয় বরং জাতির উত্থান পতনের কারণগুলোকেও বিশ্লেষণ করতে হবে। তিনি আল মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে জাতিসমূহের উত্থান পতনের কারণগুলো সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

১৩৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মাতৃভূমি তিউনিসে পুনরায় ফিরে আসেন কিন্তু মাতৃভূমির জনগণ তাকে সম্মান দেয়নি। অবশেষে ১৩৮২ খ্রিস্টাব্দে চলে যান মিসরে। সেখানে তিনি আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং পরবর্তীতে মিসরের সুলতান তাঁকে প্রধান বিচারপতির পদে নিযুক্ত করেন। মিসরের কায়রোতে তিনি প্রায় ২৪ বছর কাটিয়েছিলেন। এখানেই তিনি আত তারিক’ নামক আত্মচরিত্র গ্রন্থ রচনা করেন।

তিনি সমাজ বিজ্ঞান ও বিবর্তনবাদ সম্পর্কে অনেক নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কার করেন। বিবর্তনবাদের নতুন তথ্য ইবনে খালদুনই সর্বপ্রথম উদ্ভাবন করেছিলেন। ইতিহাস সম্পর্কে তার লেখা কিতাব আল ইবর’ বিশ্বের প্রথম এবং সর্ববৃহৎ ইতিহাস গ্রন্থ। ইবনে খালদুনের বিভিন্ন রচনাবলী ইউরোপে বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হবার পর সমগ্র বিশ্বে তাঁর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। উল্লেখ্য যে, এমন এক সময় ছিল যখন মুসলিম জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্যে পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তীতে ইউরোপের লোকের মুসলিম মনীষীদের জ্ঞান বিজ্ঞান ও শিল্প সাহিত্যকে চর্চা করে ক্রমান্বয়ে আজ উন্নতির শিখরে উঠেছে। কিন্তু মুসলিম জাতি তাদের পূর্ব পুরুষদের সুবিশাল জ্ঞান ভান্ডারকে উপেক্ষা করায় আজ বিশ্বের বুকে অশিক্ষা, দরিদ্র ও পরমুখাপেক্ষী জাতি হিসেবে পরিণত হয়েছে।

১৪০০ খ্রিস্টাব্দে দিগ্বিজয়ী বাদশা তৈমুর সিরিয়া আক্রমণ করেন এবং মিসর অভিযানের প্রস্তুতি নেন। ঠিক এ সময় ইবনে খালদুন মিসরের সুলতানের অনুরোধে একটি শান্তি চুক্তির প্রস্তাব নিয়ে বাদশা তৈমুরের দরবারে উপস্থিত। দীর্ঘ আলোচনার পর বাদশা তৈমুর ইবনে খালদুনের জ্ঞান, বুদ্ধি ও প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তার শান্তি প্রস্তাব মেনে নেন। তৈমুর তার মিসর অভিযান স্থগিত ঘোষণা করেন। এভাবে ইবনে খালদুন তাঁর জ্ঞান ও প্রতিভা দিয়ে একটি অনিবার্য সংঘাত থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করলেন। বাদশা তৈমুরের বিশেষ অনুরোধে ইবনে খালদুন দামেস্কে কিছুদিন অবস্থান করেন। এরপর ফিরে আসেন মিসরে। মিসরেই এ বিখ্যাত মনীষী ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। এ মনীষী মুসলিম জাতির জন্যে যে জ্ঞান রেখে গেছেন তা ইতিহাস চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।

১৯. কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬ খ্রীঃ)

পারিবারিক সীমাহীন দুঃখ দুর্দশার মধ্যেও যিনি আজীবন বাংলা কাব্য ও সাহিত্য চর্চায় ব্রতী ছিলেন, যিনি ছিলেন বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী, যিনি বাংলা কাব্য ও সাহিত্যে প্রচন্ড বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, যিনি দেশের স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যে জালেম শাসক গোষ্ঠীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে কারাগারে বন্দী জীবন কাটিয়েছিলেন, যার কাব্য ও সাহিত্যে ইসলামী ও ঐতিহ্য বলিষ্ঠ ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে, যার কবিতা, হামদ, নাত, গজল ও ইসলামী গান প্রায় প্রতিটি বাঙালী মুসলিমের হৃদয়কে করেছে জাগরিত, যিনি ছিলেন একাধারে শ্রমিক, সৈনিক, কবি, সাহিত্যিক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এবং একজন খাঁটি দেশ প্রেমিক তার নাম কাজী নজরুল ইসলাম। বাল্যকালে তাঁর ডাক নাম ছিল দুখু মিয়া।

বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ই জ্যৈষ্ঠ মোতাবেক ১৮৯৯ সালের ২৫শে মে বর্ধমান জেলার আসনসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কবি একাধিক ভাগ্যবান কবির ন্যায় সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম লাভ করেননি। চুরুলিয়ার কাজী বংশ এক কালে খুবই সম্ভ্রান্ত ছিল বটে; কিন্তু যে সময়ে কবি নজরুল ইসলাম শিশু হয়ে আবির্ভূত হন, সে সময় এ বংশটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নানা রকম বঞ্চনা ও শোষণের শিকার হয়ে আভিজাত্যের পশ্চাৎপট থেকে সম্পূর্ণ স্ফলিত হয়ে দৈন্যদশার একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পড়েছিল। অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, অপমান এবং মর্মান্তিক দারিদ্র্যে মধ্য দিয়ে কবির বাল্য, কৈশোর ও প্রাক যৌবন কেটেছে। পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন। কাজী’ হচ্ছে তাদের বংশের উপাধি। পিতা ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাজারের মুত্তাওয়াল্লি। ফলে ছোট বেলা থেকেই কাজী নজরুল ইসলাম ইসলামী চিন্তা ও ভাবধারার ভিতর দিয়ে বড় হন। বাল্যকালে তিনি বাড়ীর নিকটস্থ মাদ্রাসায় (মক্তব) শিক্ষা জীবন শুরু করেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি সুমধুর কণ্ঠে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করতে পারতেন। বাল্যকালেই পবিত্র কুরআনের অর্থ ও তার মর্মবাণী শিক্ষা লাভ করতে শুরু করেন। এছাড়া তিনি বাংলা ও আরবী ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি মক্তবে ফারসী ভাষাও শিখতে থাকেন। হঠাৎ করে তাঁর পিতা মারা যান তিনি। নিতান্তই ইয়াতীম হয়ে পড়েন। সংসারে নেমে আসে অভাব অনটন ও দুঃখ-দুর্দশা। লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি লেটো গানের দলে যোগ দেন এবং খুব কম সময়ের মধ্যেই তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেন। লেটো গানের দলে কোন অশ্লিল গান পরিবেশন হতো না বরং বিভিন্ন পালা গান, জারি গান, মুর্শিদী গান ইত্যাদি পরিবেশিত হত। অসামান্য প্রতিভার বলে তিনি লেটো দলের প্রধান নির্বাচিত হন।

‘লেটো’ গানের দলে থেকেই তিনি বিভিন্ন বইপত্র পড়ে সাহিত্য চর্চা চালিয়ে যান। এ সময়ে তিনি কয়েকটি কবিতা, ছড়া গান, পালা গান রচনা করে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দেন। এর পর তিনি শিক্ষা লাভের জন্যে গ্রামের কয়েকজন ব্যক্তির সহযোগিতায় রাণীগঞ্জের শিয়ালসোল রাজ স্কুলে ভর্তি হন। শৈশব কাল থেকে তিনি ছিলেন একটু চঞ্চল প্রকৃতির। স্কুলের বাঁধা ধরা নিয়ম কানুন তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তাই হঠাৎ করে একদিন স্কুল থেকে উধাও হন তিনি। কিন্তু কোথায় যাবেন, কি খাবেন, কি করে চলবেন ইত্যাদি চিন্তা করে এবং আর্থিক অভাব অনটনের কারণে তিনি আসানসোলের এক রুটির দোকানে মাত্র ৫ টাকা মাসিক বেতনে চাকুরী গ্রহণ করেন। রুটি তৈরির ফাঁকে ফাঁকে তিনি বিভিন্ন কবিতা, গান, গজল, পুঁথি ইত্যাদি রচনা করেন এবং বিভিন্ন বইপত্র পড়ে তার জ্ঞান ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে লাগলেন। তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে জনৈক পুলিশ ইন্সপেক্টর তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন এবং ময়মনসিংহ জেলার দরিরামপুর হাই স্কুলে ভর্তি করে দেন। এরপর তিনি পুনরায় রাণীগঞ্জের শিয়ালসোল রাজ স্কুলে ভর্তি হন। ১৯১৭ সালে বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি দশম শ্রেণীর ছাত্র। যুদ্ধের কারণে তার আর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া হল না। তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ৪৯ নম্বর বাঙালী পল্টন রেজিমেন্টের হাবিলদার পদে প্রমোশন লাভ করেন। সৈনিক জীবনে তাকে চলে যেতে হয় পাকিস্তানের করাচিতে। কিন্তু তাঁর কবিতা ও সাহিত্য চর্চা থেমে যায়নি। করাচি সেনা নিবাসে সহকর্মী একজন পাঞ্জাবী মৌলিবী সাহেবের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁর নিকট তিনি ফারসী ভাষা শিক্ষা লাভ করেন এবং মহা কবি হাফিজ, শেখ সাদী (রঃ) প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত কবিদের রচনাবলী চর্চা করেন। এরপর থেকেই তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, হামদ নাত, গজল, সাহিত্য ইত্যাদির ব্যাপক রচনার তাগিদ অনুভব করেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের তেমন কোন সুযোগ না পেলেও অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে তিনি তাঁর কাব্য ও সাহিত্য চর্চা চালিয়েছিলেন। যুদ্ধ থেমে গেলে ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে পল্টন রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেয়ার পর তিনি ফিরে আসেন নিজ মাতৃভূমি চুরুলিয়া গ্রামে। এরপর শুরু হয় তাঁর একনিষ্ঠ কাব্য চর্চা। তাঁর লেখা একাধারে ‘দৈনিক বসুমতী’, ‘মুসলিম ভারত’, ‘মাসিক প্রবাসী’, ‘বিজলী’, ‘ধূমকেতু’ প্রভৃতি বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপা হতে থাকে।

নজরুলের কবিতা তদানীন্তন রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত ও বঞ্চিত মানুষদের জাগরণের তিনি ছিলেন মহান প্রবক্তা। ১৯২১ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত অমর কবিতা ‘বিদ্রোহী’ যা বাংলা সাহিত্যে তাঁকে বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে অমর করে রেখেছে।

বল বীর–
বল চির উন্নত মম শির
শির নেহারি নতশির ওই
শিখর হিমাদ্রির।

দেশ প্রেমিক কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠীর শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে তাঁর কলমকে অস্ত্র ও বুলেট হিসেবে ব্যবহার শুরু করলেন। ইতিমধ্যে সমগ্র দেশে শুরু হয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী তুমুল আন্দোলন। কাজী নজরুল ইসলাম সাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকায় লিখতে লাগলেন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। অন্যায়, অবিচার, অসাম্য ও অসত্যের বিরুদ্ধে তিনি লিখনীর মাধ্যমে শুরু করলেন প্রচন্ড বিদ্রোহ। তিনি মুসলিম জাতিকে তাদের অতীতের ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে শুনিয়েছেন জাগরণের বাণী। তিনি স্বদেশবাসীকে আহবান জানিয়েছেন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে দেয়ার জন্যে। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিশের প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী এ দেশের বিশেষ করে মুসলমান কৃষকদের ক্রমান্বয়ে নিঃস্ব করে ফেলেছিল। মুসলমান কৃষকরা তাদের জায়গা জমি ও বাড়ী-ঘর সব কিছু হারিয়ে প্রায় পথে বসেছিল। কবি কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক চক্রের বিরুদ্ধে এ দেশের কৃষক সমাজকে বিদ্রোহ করার আহবান জানান। তিনি সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থের কৃষাণের গান’ নামক কবিতায় লিখেছেন,

চল্ চল্ চল্‌!
ঊর্ধ্ব গগণে বাজে মাদল,
নিম্নে উতলা ধরণীতল,
অরুণ পাতে তরুণ দল
চল্‌–রে চল্‌–রে চল্‌।
চল্ চল্ চল্ ॥

বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার এ কবিতাটিকে রণসঙ্গীতের মর্যাদা দান করেছেন। পরাধীনতার শৃঙখলামুক্ত জাতির জীবনে অন্যায়, অবিচার ও অত্যাচার নির্মূল করার ব্যাপারে তার আবেদন চির অম্লান।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম বহু হামদ, নাত, গজল, আধুনিক গান, ইসলামী গান, গল্প, কবিতা, সাহিত্য ও উপন্যাস রচনা করে যান। এ সকল বিষয়ে তাঁর রচনার সংখ্যা কয়েক সহস্র। তাঁর রচনাবলীর মধ্যে অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশী, দোলন চাঁপা চক্রান্ত, প্রলয় শিখা, ভাঙ্গার গান, নতুন চাঁদ, ফনীমনসা, রিক্তের বেদন, মৃত্যুক্ষুধা, সাম্যবাদী, সর্বহারা, সিন্দু হিন্দোল, রাজবন্দীর জবানবন্দী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ‘বাংলাদেশে নজরুল ইনস্টিটিউট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তাঁর লেখার উপর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি ফারসী ভাষার মহাকবি হাফিজের কতকগুলো কবিতার বাংলা অনুবাদ করেছেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের অধিকাংশ কবিতা ও সাহিত্য রুশ ভাষাতে অনুদিত হয়েছে। ইংরেজী ভাষায়ও তার লেখার অনুবাদ হয়েছে এবং হচ্ছে। ১৯৪৫ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কবি জগত্তারিণী পুরস্কার প্রাপ্ত হন। ১৯৬০ সালে তিনি ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৭০ সালে বিশ্ব ভারতী কবিকে ‘ডিলিট উপাধি দিয়ে সম্মানিত করে। ১৯৭৩ সালে কবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ‘ডিলিট’ উপাধি লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে কবিকে ‘একুশে পদক’ প্রদান করা হয়।

আধুনিক বাংলা কাব্য ও সাহিত্যে মুসলিম সাধনার সবচেয়ে বড় প্রেরণা হলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর আবির্ভাবে মুলসিম স্বাতন্ত্র কাব্য সাধনার দিগন্তে নবোদিত সূর্যের মহিমা বিচ্ছুরিত হয়েছে। ইসলামী বিভিন্ন বিষয়গুলোকে তিনিই প্রথমবার সত্যিকার সাহিত্যে রূপ দিয়েছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়াও প্রবীণদের মধ্যে মীর মোশাররফ হোসেন, মহাকবি কায়কোবাদ, কবি গোলাম মোস্তফা, ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং নবীণদের মধ্যে কবি ফররুখ আহমেদ, সৈয়দ আলী আহসান তালিম হোসেন, কাদির নেওয়াজ প্রমুখ কবিগণ মুসলিম স্বাতন্ত্রবোধের বাণী উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু সে বাণী নজরুল ইসলামের ন্যায় বজ্রকণ্ঠ ছিল না, ছিল অর্ধোচ্চারিত। নজরুল কাব্যে ইসলামী ও মুসলিম ঐতিহ্য বলিষ্ঠ ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। নজরুল ছিলেন মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি এবং স্বাধীনতা চেতনার প্রতীক। বাংলা ভাষায় আরবী, ফারসী শব্দের সার্থক ব্যবহার, ইসলামী আদর্শ এবং মুসলিম ঐতিহ্যের রূপায়নে নজরুল ইসলামের অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি ‘খেয়াপারের তরণী’ কবিতায় লিখেছেন

‘আবু বকর, উসমান, উমর আলী হায়দার,
দাঁড়ী যে এ তরণীর, নাই ওরে নাই ডর।
কান্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি–মাল্লা,
দাঁড়ী মুখে সারী গান–লা শরীক আল্লাহ।’

কারবালার মর্মান্তিক বিয়োগান্ত ঘটনা কবি কাজী নজরুল ইসলাম কি সুন্দর ভাবে তাঁর কাব্যে ফুটিয়ে তুলেছেন–

‘নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া।
আম্মা! লাল তেরি খুনকিয়া খনিয়া
কাঁদে কোন্ ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে
সে কাঁদনে আসু আনে সীমারের ছোরাতে।’

ইসলামী আদর্শ ও মুসলিম জাতির স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন–

‘ধর্মের পথে শহীদ যাহারা, আমরা সেই সে জাতি।
সাম্য মৈত্রী এনেছি আমরা বিশ্বের করেছি জ্ঞাতি।
আমরা সেই সে জাতি।।’

কাজী নজরুল ইসলামের আল্লাহর প্রতি ছিল অগাধ ভক্তি ও বিশ্বাস। মানুষের প্রতি আল্লাহ পাকের অশেষ নেয়ামতের শুকরিয়া জ্ঞাপন করে তিনি লিখেছেন–

এই সুন্দর ফুল সুন্দর মিঠা নদীর পানি
খোদা তোমার মেহের বাণী।।
এই শস্য-শ্যামল ফসল ভরা মাটির ডালি খানি
খোদা তোমার মেহের বাণী।।
তুমি কতই দিলে মানিক রতন, ভাই বেরাদর পুত্র স্বজন
ক্ষুধা পেলে অন্ন জোগাও মানি না মানি
খোদা তোমার মেহের বাণী।।

তিনি ইসলামের মৌলিক ইবাদত ও বিধানকেও বাংলা কাব্যে যথাযথভাবে প্রয়োগ করেছেন। তিনি লিখেছেন–

‘মসজিদে ঐ শোন রে আযান, চল্ নামাযে চল,
দুঃখে পাবি সান্ত্বনা তুই বক্ষে পাবি বল।
ওরে চল্ নামাযে চল্।
…………………..
…………………..
“তুই হাজার কাজের অছিলাতে নামায করিস কাজা,
খাজনা তারি দিলি না, যে দিন দুনিয়ার রাজা।
তারে পাঁচ বার তুই করবি মনে, তাতেও এত ছল
ওর চল, নামাযে চল্।”

এমনিভাবে কবি নজরুল ইসলাম তার কাব্যে মুসলিম স্বাতন্ত্রবোধ সৃষ্টি করেছেন। তাঁর প্রতিটি ইসলামী গান, গজল, হামদ ও নাত প্রায় প্রত্যেক বাঙালী মুসলমানের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ওয়াজ মাহফিল ও মিলাদ মাহফিলে তাঁর লেখা হামদ, নাত ও গজল পঠিত হচ্ছে।

১৯৪২ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক দূরূহ ব্যধিতে আক্রান্ত হন এবং বাকশক্তি চিরদিন জন্যে হারিয়ে ফেলেন। তাঁকে সুস্থ করে তোলার জন্যে দেশের সকল প্রকার চিকিৎসা ব্যর্থ হবার পর ১৯৫৩ সালে সুচিকিৎসার জন্যে সরকারী ব্যবস্থাধীনে লন্ডনে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানেও কবিকে রোগমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তারপর ১৯৭২ সালে তাকে বিদেশ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় নিয়ে আসা হয় এবং ঢাকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর বাংলা ১৩৮৩ সালের ১২ই ভাদ্র মোতাবেক ১৯৭৬ইং সালের ২৯শে আগস্ট এ বিখ্যাত মনীষী পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তার একটি ইসলামী সংগীতে অছিয়ত করে যান, তাকে মজিদের পার্শ্বে কবর দেয়ার জন্যে;যেন তিনি কবরে শুয়েও মুয়াজ্জিনের সুমধুর আযানের ধ্বনি শুনতে পান। তিনি লিখেছেন–

মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।
যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিদের আযান শুনতে পাই।।
………………………
………………………
আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাযীরা যাবে,
পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি ও বান্দা শুনতে পাবে।
গোর-আযাব থেকে এ গুণাহগার পাইবে রেহাই।।

তাঁর সে অছিয়ত অনুযায়ীই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন উত্তর পার্শ্বে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবিকে সমাহিত করা হয়। মসজিদের পার্শ্বে কবি আজ চির নিদ্রায় শায়িত। প্রতিদিন প্রায় অসংখ্য মানুষ নামাজান্তে কবির মাজার জিয়ারত করছে। আজ কবি পৃথিবীতে নেই; কিন্তু বাংলা কাব্যে কবি ইসলামী ভাবধারা ও মুসলিম স্বতন্ত্রবোধ সৃষ্টিতে যে অবদান রেখে গেছেন, প্রতিটি শিক্ষিত বাঙালী মুসলমানের হৃদয়ে কবি অমর হয়ে থাকবেন।

২. হযরত ঈসা (খ্রীষ্ট পূর্ব ৬-৩০)

বিবি মরিয়ম নাছেরাহ নামক একটি শহরের অধিবাসিনী ছিলেন। নাছেরাহ শহরটি মুকাদ্দাসের অদূরেই অবস্থিত ছিল।

বিবি মরিয়ম পিতা মাতার মানত পূর্ণ করার জন্য বাইতুল মুকাদ্দাসের খেদমতে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি বাল্যকাল থেকেই অতিশয় সুশীলা এবং ধর্মানুরাগিনী ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল ইমরান এবং নবী জাকারিয়া (আঃ)-এর শ্যালিকা বিবি হান্না তার জননী ছিলেন।

একদিন বিবি মরিয়ম নামাজ পড়িতেছিলেন, হঠাৎ ফেরেশতা জিব্রাঈল অবতীর্ণ হলেন। তিনি বললেন, তোমার প্রতি সালাম, তুমি আল্লাহর অনুগ্রহ প্রাপ্তা। আল্লাহ তোমার সাথে রয়েছেন।

বিবি মরিয়ম এই অপ্রত্যাশিত পূর্ব সম্বোধনে ভীত চকিত হলেন। ভাবতে লাগলেন–কে আসল, কিসের সালাম। হযরত জিব্রাঈল বললেন, আমি আল্লাহর ফেরেশতা জিব্রাঈল। তুমি ভীত হইও না; তুমি পবিত্র সন্তান লাভ করবে, এই সুসংবাদ তোমাকে দিতে এসেছি।

বালিকা ভীত হলেন এবং বললেন, তা কেমন করে হবে? আমি যে কুমারী। আমি স্বামীর সঙ্গ লাভ করি নি।

ফেরেশতা বললেন, “আল্লাহর কুদরতেই এটি হবে। তাঁর কাছে এটি কঠিন কাজ নয়।”

এই বলে ফেরেশতা অন্তর্নিহিত হলেন। ছয়মাস পূর্বে হযরত জাকারিয়া (আঃ)-এর স্ত্রী গর্ভবতী হয়েছেন। এখন আবার কুমারী মরিয়ম আল্লাহর কুদরতে গর্ভবতী হলেন।

বিবি মরিয়ম যদিও আল্লাহর কুদরতে সন্তান সম্ভবা হলেন, কিন্তু দেশের লোকেরা তা মেনে নিবে কেন? কুমারী নারীর এভাবে গর্ভবতী হওয়ার ফলে সবাই তাকে বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে বের করে দিলেন, এমনকি তাকে স্বগ্রামও ছেড়ে যেতে হলো। সঙ্গী সহায়হীন অবস্থায় গর্ভবতী মরিয়ম একটি নির্জন প্রান্তরে সন্তান প্রসব করলেন।

বিপদাপন্ন মরিয়ম কোন আশ্রয় খুঁজে না পেয়ে একটি শহরের দ্বারপ্রান্তে আস্তাবলের একটি পতিত প্রাঙ্গণের একটি খেজুর গাছের নিচে আশ্রয় নিলেন। হায়, যিনি পৃথিবীর মহাসম্মানিত নবী, তিনি সেই নগণ্য স্থানে ভূমিষ্ঠ হলেন। যে মহানবীর ধর্মানুসরণকারিরা আজ পৃথিবীময় বিস্তৃত, শক্তি এবং সম্মানে যারা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে রয়েছে; তাদের নবী ভূমিষ্ঠ হলেন একটি আস্তাবলের অব্যবহার্য আঙ্গিনায়। দরিদ্রতম পিতা-মাতার সন্তানও এই সময় একটু শয্যালাভ করে থাকে, একটু শান্তির উপকরন পায়, কিন্তু মরিয়মের সন্তান শোয়াবার জন্য আস্তাবলের ঘরটুকু ছাড়া আর কিছুই ভাগ্যে হলো না।

আটদিন বয়সে সন্তানের ত্বক ছেদনা করা হলো। তাঁর নামকরণ হলো ঈসা। ইনি মছিহ নামে প্রসিদ্ধ হয়েছেন।

হযরত মুসা (আঃ)-এর শরীয়ত অনুসারে বাদশাহ কিংবা পয়গাম্বর তাঁর পদে বহাল হবার অনুষ্ঠানে, তৈল লেপন করার নিয়ম ছিল। এছাড়া তাওরাত কিতাবে হযরত ঈসা (আঃ)-এর নাম মছিহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করলে একজোড়া ঘুঘু জাতীয় পাখি উৎসর্গ করার নিয়ম হযরত মুসা (আঃ)-এর শরীয়তের বিধান ছিল।

মরিয়ম সূচী-স্নাতা হওয়ার পর সন্তান সাথে নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে গেলেন এবং সেখানে গিয়ে পাখির মানত পালন করলেন।

এই সময় একদল অগ্নিপূজক হযরত ঈসা (আঃ)-কে খুঁজে ফিরছিল। তারা জ্যোতিষী ছিল। নক্ষত্র দেখে তারা হযরত ঈসা এর জন্ম হয়েছে’ এটি জানতে পেরেছিল। নিরুইস বাদশাহ এটি শুনে ভয় পেলেন এবং সেই অনুসন্ধানকারী দলের কাছে গোপনে বললেন যে, তারা যেন সেই বালকেরা সন্ধান করে কোথায় আছে তা বের করে। অগ্নিপূজকরা খুঁজতে খুঁজতে বিবি মরিয়মের কাছে পৌঁছল ও সেই ক্ষুদ্র শিশুকে সেজদা করল এবং সেখানে মানত ইত্যাদি সম্পন্ন করল। রাতে তারা স্বপ্নে দেখল, তাদেরকে হিরুইসের কাছে ফিরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা হিরুইস তার জীবনের শত্রু। মরিয়ম এরূপ স্বপ্ন দেখলেন যে, সম্রাট এই সন্তানের শত্রু, সে তাকে হত্যা করতে চায়। সে যেন শিশুকে নিয়ে মিশরে চলে যায়। জ্যোতিষীরা সম্রাটের কাছে আর ফিরে গেল না। এতে বাদশাহ ভয়ানক রাগ হলো। সে হুকুম করল যে, বায়তুল্লাহর এবং এর আশেপাশের সকল বস্তির সন্তানদেরকে যেন হত্যা করে ফেলা হয়।

ইতিপূর্বে মরিয়ম তার সন্তান নিয়ে মিশরে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। হিরুইস যতদিন জীবিত ছিল, ততদিন সন্তান নিয়ে তিনি মিশরেই অবস্থান করলেন।

হিরুইসের মৃত্যুর সংবাদ শুনার পর তিনি নিজ দেশ নাছেরায় চলে আসলেন।

সন্তান দিন দিন বাড়তে লাগল। বয়স বাড়বার সাথে সাথে ঈসার মধ্যে প্রখর জ্ঞান এবং তীক্ষ্ণ মেধা শক্তির পরিচয় ফুটে উঠল। আল্লাহর বিশেষ একটি অনুগ্রহ যে, তাঁর উপর রয়েছে, দিন দিন তা প্রকাশ পেতে শুরু করল। ঈসার মাতা সহ প্রতি বছর ঈদের উৎসবের ইরুসালেমে যোগদান করতেন। ঈসার ১২ বছর বয়সে ইরুসালেমে বড় বড় জ্ঞানী এবং পণ্ডিতবর্গের সাথে ধর্ম বিষয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর বাকপটুতা এবং তত্ত্বজ্ঞান শুনে পণ্ডিতেরা অবাক হকয়ে যেতেন। ক্রমান্বয়ে হযরত ঈসা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পূর্ণতা লাভ করতে লাগলেন। ত্রিশ বছর বয়সে তিনি আল্লাহর কাছ থেকে ‘ওহী’ লাভ করেন এবং নবীরূপে ধর্মপ্রচার করতে শুরু করলেন।

হযরত ইয়াহিয়া বিবি মরিয়মের খালাত ভাই হতেন। তিনি ইয়ারদন নদীর তীরে লোকদেরকে ধর্মোপদেশ দান করতেন। হযরত ঈসা (আঃ) সেখানে গিয়ে ওয়াজ করতে শুরু করেন। ওহী আসা শুরু করার পর থেকে ইঞ্জিল কিতাব অবতীর্ণ হতে থাকে। তিনি তাঁর নবুয়তের প্রমাণস্বরূপ বহু অলৌকিকক কার্যাবলী দেখাতে শুরু করেন। মাটি দিয়ে পাখি তৈরি করে উড়িয়ে দেয়া, অন্ধকে দৃষ্টিদান, বোবাকে বাক্শক্তি দান, কুষ্ঠকে আরোগ্য করা, পানির উপরে হাটা ইত্যাদি তার মো’জেজা ছিল।

তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির বলে, বহু রোগী আরোগ্য লাভ করে। বহু লোডক ধর্মজ্ঞান লাভ করে। সর্বপ্রথমে যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এরা উপর ঈমান এনেছিলেন, সাথে থেকে সাহায্য করেছিলেন তাদেরকে ‘হাওয়ারী’ বলা হতো। তাঁরা সর্বদা হযরত ঈসা (আঃ)র সাথে থাকতেন। হযরত ঈসা (আঃ) যখন নবী হন, সেকালে ইহুদী ধর্মগুরুরা অতিশয় শিথিল হয়ে পড়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রকৃত ধর্মানুভূতির পরিবর্তে ভণ্ডামী প্রকাশ পেয়েছিল। তাদের মধ্যে কেবল ধর্মের বাহ্যিক আবরণ বাকী ছিল। হযরত ঈসা (আঃ) এর ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি তাঁর ওয়াজ বক্তৃতায় ইহুদী ধর্মগুরুদের কঠোর সমালোচনা করতেন। এতে সেই সকল বাহ্যাবরণ বিশিষ্ট ইহুদী ধর্মপ্রচারকরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঘোর শত্রুতে পরিণত হন। কিন্তু হযরত ঈসা (আঃ)-এর বাণী ছিল আল্লাহ্ই বাণী। তা এমনই হৃদয়গ্রাহী হতো যে, যে তা শুনতো তার হৃদয়ই তাতে আকৃষ্ট হতো। বিদ্বেষপরায়ণ ইহুদী পুরোহিতরো কোন কথায়ই হযরত ঈসা (আঃ)-কে ধরতে পারতেন না। তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে নানা ছুতা নাতায় দোষীসাব্যস্ত করবার চেষ্টায় লিপ্ত হলেন।

হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ্র অত্যধিক প্রেমে অভীভূত হয়ে আল্লাহকে পিতা বলেছিলেন। এরূপ আরও দুই একটি দৃষ্টান্তমূলক বাক্য নিয়ে হিংসাপরায়ণ ইহুদী আলেমগণ নানা কথা সৃষ্টি করলেন। এভাবে তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে ধর্মদ্রোহী কাফের বলে ফতোয়া দিলেন। তাদের শরীয়তে মৃত্যুই সেই সকল অপরাধের একমাত্র সাজা। দেশে তখন রুমীয়দের রাজত্ব ছিল। তখনকার দিনে রাজা ছাড়া আর কারও মৃতুদণ্ড দিবার অধিকার ছিল না। সুতরাং তারা সম্রাটের কানে হযরত ঈসার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করতে শুরু করলেন।

হযরত ঈসা (আঃ) তার বক্তৃতার অধিকাংশ সময় আসমানী বাদশাহের কথা উল্লেখ করতেন। এতে শত্রুদের একটি সুযোগ জুটে গেল। তারা আসমানী বাদশাহীর ব্যাখ্যা একটু ঘুরিয়ে ফুরিয়ে হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রতি রাজদ্রোহীর অভিযোগ সৃষ্টি করল। গোপনভাবে তাকে ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে লাগল।

অদৃষ্টের এমনি বিড়ম্বনা, যে হাওয়ারী দল ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গী এবং বিশ্বস্তরূপে বিরাজ করতেন, তারাই এখন গুপ্তচর হলেন। সেই হাওয়ারীদের মধ্যে একজনের নাম ছিল ইয়াহুদ। শত্রুদের কাছ থেকে তিন টাকার ঘুষ গ্রহণ করে হযরত ঈসা (আঃ)-কে রুমীয় সৈন্যদের হাতে ধরিয়ে দিল।

হাওয়ারীদের মধ্যে পিতার ছিল একজন ঘনিষ্ঠ এবং প্রধান সঙ্গী, রাজদ্রোহের অপরাধ থেকে বাঁচবার জন্য তিনিও সম্রাটের দরবারে নিজ পরিচয় গোপন এবং হযরত ঈসার সাথে কোনও সম্পর্ক নেই বলে প্রকাশ করলেন। হযরত ঈসা (আঃ) ধৃত হলেন এবং রাজবিচারে তিনি মৃত্যুদণ্ড লাভ করলেন। সে সময়ের মৃত্যুদণ্ডে এখনকার মত গলায় ফাঁসি দিবার ব্যবস্থা ছিল না। ছলিবের সাহায্যে তখন মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো।

ছলিবের আকৃতি হলো এই একটি লম্বা কাঠের উপরের অংশে আর একখানি কাঠ আড়াআড়িভাবে জুড়ে দেয়া হতো। তাতে অপরাধীকে এমনিভাবে ঝুলিয়ে দেয়া হতো যে, অপরাধীর পৃষ্ঠদেশ কাষ্ঠদ্বয়ের সংযুক্তি স্থলের উপর রক্ষিত হতো। আড়া কাঠের উভয়দিকে দুই হাত বিস্তারিত করে দিয়ে তাতে পেরেক মেরে দেয়া হতো। কারও হাঁটুতেও পেরেক ফুড়ে কাঠসলগ্ন করে দেয়া হতো। এই অবস্থায় ঝুলে থেকে ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও যন্ত্রণায় ছটফট করে মরে যেত। হযরত ঈসা (আঃ) ছলিবে বিদ্ধ করে রাখা হলো। পরদিন ইহুদীদের উৎসবের দিনে কোনও অপরাধীর ছলিবে ঝুলন্ত থাকা তাদের ধর্মমতে বিধেয় ছিল না। হযরত ঈসা (আঃ)-কে দুপুরের দিকে ক্রুমে বিদ্ধ করা হয়েছিল। পায়ে কাটা বিদ্ধ করা হচ্ছিল না। তবুও তিনি সেই যাতনায়ই মুষড়িয়ে পড়লেন এবং চেতনা হারালে; তিনি শরীরের দিক দিয়েও কৃশকায় ছিলেন। ঈদের দিনের কারণে যখন সন্ধ্যার দিকে তাকে ক্রুশ থেকে খসান হলো, তখন তাকে মৃত বলেই ধারণা করা হলো। তাকে গোরস্থানে পাঠিয়ে দেয়া হলো এবং দাফন করা হলো। কোন সহৃদয় ব্যক্তি তাকে কবর থেকে উঠিয়ে এনেছিলেন। পরে তিনি চেতনা লাভ করলেন। অতঃপর তিনি নিরুদ্দেশ হন। তিনি কোথায় কিভাবে আত্মগোপন করেন তার সঠিক তত্ত্ব জানা যায় নি। কোরআন শরীপে তাঁর সম্পর্ক বর্ণিত রয়েছে যে, তাকে হত্যা করা হয় নি। তিনি ক্রুশে প্রাণ দান করেন নি। বরং মৃত্যুর মতোই ধারণা করা হয়েছিল, পরে আল্লাহ তাকে পৃথিবী থেকে তুলে নিলেন। এর ৫০০ শত বছর পরে হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) এই পৃথিবীতে সংবাদ দিয়েছেন।

২০. মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক পাশা (১৮৮১-১৯৩৮)

মুস্তাফা কামাল ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে স্যালেনিকার এক চাষী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। যে পরিবারে তাদের জন্ম, তাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন ম্যাসিডনের অধিবাসী। তার বাবার নাম ছিল আলি রেজা, মা জুবেইদা। ছেলেবেলা থেকেই মুস্তফা ছিলেন সকলের চেয়ে আলাদা।

যখন তার সাত বছর বয়স তখন বাবা মারা গেলেন। চাচা এসে তাকে নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। চাচার ভেড়ার পাল চরাতে হত। জুবেইদা চাচাকে বলে তাকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন।

সহপাঠীদের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে ঝগড়া-ঝাটি মারামারি লেগেই থাকত। কোন বিষয়ে অন্যায় দেখলে মেনে নিতে পারতেন না। জন্ম থেকে তার মধ্যে ছিল বিদ্রোহী সত্তা। একদিন কোন এক শিক্ষকের অন্যায় দেখে স্থির থাকতে পারলেন না। তার সাথে মারামারি করে স্কুল ছাড়লেন।

বাড়ি ফিরে এসে স্থির করলেন, স্কুলে আর ফিরে যাবেন না। তিনি সৈনিক হবেন। বাড়ির লোকের অজান্তে সৈনিক স্কুলে ভর্তির জন্য দরখাস্ত করলেন। তারপর ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্যালেনিকার সৈনিক স্কুলে ভর্তি হলেন।

এখানেই তার সুপ্ত প্রতিভার প্রথম স্ফুরণ ঘটল। কুচকাওয়াজ ড্রিল যুদ্ধবিদ্যায় তিনি ছিলেন সকলের সেরা। অন্য সব বিষয়ের মধ্যে অঙ্ক ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়। অঙ্কে তার অসাধারণ জ্ঞান লক্ষ্য করে তার এক অধ্যাপক তাকে কামাল অর্থাৎ সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন উপাধি দিয়েছিলেন। সেই থেকে সকলে তাকে কামাল বলেই ডাকত।

তিনি কৃতিত্বের সাথে সতেরো বছর বয়সে সৈনিক স্কুল থেকে পাশ করলেন।

এরপর ভর্তি হলেন মনাস্টির সামরিক উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখানে এসে এক নতুন একদিন যে অটোমান সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য, আজ তার কি করুণ পরিণতি। দেশের সুলতান অন্য দেশের কাছে অবজ্ঞার পাত্র। কামাল অন্তরে অনুভব করেন এই অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।

একদিকে মনের মধ্যে জেগে উঠছিল নতুন স্বপ্ন অন্যদিকে চলছিল সামরিক শিক্ষা। কুড়ি বছর বয়েসে কনস্তান্তিনোপল সৈনিক কলেজে ভর্তি হলেন। এখানে থাকবার সময়েই তিনি বতন অর্থাৎ পিতৃভূমি (Vatan=Fatherland) নামে গোপন সমিতি গড়ে তুললেন। সেই সমিতির সকলেই ছিল সৈনিক কলেজের ছাত্র।

চার বছর পর কলেজ থেকে পাশ করে অশ্বারোহী বাহিনীর ক্যাপ্টেন হিসাবে নিযুক্ত হলেন। তখন বতনের সভ্যরা মাঝে মাঝেই মিলিত হয়ে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা স্থির করত। এই দলের মধ্যে একজন সুলতানের পুলিশের তরফে ঘুষ নিয়ে গুপ্তচরের কাজ করতে আরম্ভ করল। একদিন যখন সব সদস্যরা গোপন আলোচনায় যোগ দিয়েছে, সে সকলের অগোচরে পুলিশের কাছে সংবাদ পৌঁছে দিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সকলকে বন্দী করে পাঠিয়ে দেওয়া হল কারাগারে। বিচারে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল। কিন্তু সুলতানের মনে হল এই তরুণ অফিসারদের মৃত্যুদণ্ড দিলে সামরিক বাহিনীর উপর তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। নিজেদের সহকর্মীর মৃত্যুতে হয়ত তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারে। তাই শেষ মুহূর্তে তার মার্জনা ঘোষণা করলেন।

সকলকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হল। কামালকে পাঠিয়ে দেওয়া হল সুদূর দামাস্কাসে অশ্বরোহী বাহিনীর সেনানী করে। পার্বত্য বন্ধুর অঞ্চল।

স্যালেনিকাতে গড়ে উঠেছিল বতনের একটি শাখা। কামাল পাশার কাছে সংবাদ এল স্যালেনিকায় বতনের সভ্যরা বৃহত্তর আনোদালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি স্থির করলেন সেখানে গিয়ে সকলের সাথে মিলিত হবেন। ছদ্মবেশে বেরিয়ে পড়লেন। মিশর এবং গ্রীসের পথ ধরে সবেমাত্র এসে পৌঁছেছেন, এমন সময় এক গুপ্তচরের নজর পড়ল তার উপর।

কর্তৃপক্ষের কাছে সংবাদ যেতেই নির্দেশ এল কামাল পাশাকে বন্দী কর। এক বিশ্বস্ত বন্ধুর মারফৎ এই গোপন সংবাদ পেতেই এক ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে আবার পালিয়ে গেলেন গ্রীসে, সেখান থেকে এলেন জাফায়। কামাল পৌঁছবার আগেই তাকে বন্দী করবার নির্দেশ সেখানে এসে পৌঁছেছিল।

জাফায় সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন আহমেদ বেগ। বতনের প্রতি বের ছিল গভীর সমর্থন। তিনি তৎক্ষণাৎ কামালকে নিজের কাছে নিয়ে এসে সৈনিকের পোশাক পরিয়ে জাহাজে করে গোপনে পাঠিয়ে দিলেন গাঁজায়। সেখানে তুর্কী সেনাদলের সাথে স্থানীয় বিদ্রোহী আদিবাসীদের লড়াই চলছিল। কামালও সেই লড়াইয়ে যোগ দিলেন। আহমেদ বে সুলতানের কাছে সংবাদ পাঠালেন কামাল পাশা সিরিয়া ত্যাগ করে কোথাও যায়নি। সে গাঁজায় যুদ্ধ করছে।

বিপদ থেকে রক্ষা পেলেন কামাল পাশা। কিন্তু বুঝতে পারলেন স্যালেনিয়া ছাড়া অন্য কোথাও বিপ্লবকে সংগঠিত করা সম্ভব হবে নাই। তিনি সুলতানের কাছে আবেদন জানালেন, যেন তাকে তার জন্মভূমি স্যালনিকাতে বদলি করা হয়। শেষ পর্যন্ত তার অনুরোধে সাড়া দিয়ে তাকে স্যালনিকয় বদলি করা হল।

এখানে ইতিপূর্বেই একটি রাজনৈতিক সমিতি গড়ে উঠেছিল। অটোমান ফ্রিডম সোসাইটি (Ottoman Freedom Society)। কামাল এই দলের একজন সক্রিয় সদস্য হলেন। কিন্তু এই দলের অন্যদের সাথে দলের লক্ষ্য কর্মপন্থা নিয়ে মতভেদ দেখা দিল। কামাল চাইতেন স্বৈরতন্ত্র ধ্বংস হোক, কোন আপোষ মীমাংসা নয়, প্রয়োজন নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার।

দলের অন্য নেতারা ছিলেন সংস্কারবাদী। তারা চাইতেন প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যেই সংস্কার সাধন। এদের প্রধান ছিলেন এনভার বে ও মেজর নিয়ামি। তাদের রাজনৈতিক কার্যকলাপের সংবাদ সুলতান আবদুল হামিদের কাছে পৌঁছতে বিলম্ব হল না।

সুলতানের প্রধান সেনাপতি বিরাট সৈন্যদল নিয়ে স্যলনিকা অবরোধ করল। বিদ্রোহীদের সপক্ষেও এগিয়ে আসে আরো সৈন্য। সুলতান বুঝতে পারলেন গৃহযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এই যুদ্ধ এড়াবার জন্য সুলতান বিদ্রোহীদের সংস্কারের দাবি মেনে নিয়ে তাদের ক্ষমা করলেন। চারদিকে বে আর নিয়ামির জয়ধ্বনি উঠল। দুজনে হয়ে উঠলেন জনগণের নতুন নেতা।

কামাল তার গভীর দূরদৃষ্টি দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন এই সংস্কারের অঙ্গীকার সুলতানের সিংহাসন রক্ষার একটা কৌশল মাত্র।

কামাল পাশার অনুমান অভ্রান্ত হল। ১৯০৯ সালে সুলতানের কিছু অনুগামী ইসলাম ধর্ম বিপন্ন বলে দেশময় আন্দোলন শুরু করল। দেশে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করা হল। সব কিছুর জন্য দায়ী করা হল সংস্কারবাদীদের। একদিন যারা হয়ে উঠেছিল সমাজের সবচেয়ে শ্রদ্ধার–তারাই হয়ে উঠল সবচেয়ে ঘৃণায়। জেনারেল নিয়ামি পথের মাঝে খুন হলেন, এনভার বেকে একটি সামরিক দলের সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া হল জার্মানিতে। কামালকে পাঠানো হল ত্রিপলিতে।

দেশের এই বিবাদ-বিসংবাদের সুযোগ নিয়ে ইউরোপের অন্য দেশগুলো তুরস্কের অধিকৃত বিভিন্ন অঞ্চল অস্ট্রিয়া, বসনিয়া অধিকার করল। গ্রীস ক্রীট দ্বীপ দখল করে নিল। বুলগেরিয়া তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করল।

গুপ্তচরদের ক্রমাগত প্ররোচনায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল সাধারণ সৈন্যরা। সেখানকার সংস্কারবাদী সমস্ত নেতাকে হত্যা করে সুলতানের আনুগত্য স্বীকার করে নিল।

এই সংবাদ পাওয়া মাত্রই এনভার বে ও কামাল পাশা তাদের অনুগত সৈন্যদের নিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সুলতানের অনুগত বাহিনীর উপর। মাত্র একদিনের যুদ্ধেই সুলতানের বাহিনী পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করল। সুলতানের ভাইপোকে নামমাত্র সিংহাসনে বসানো হল।

এই সময় কামাল উন্নত সামরিক জ্ঞান লাভ করবার জন্য ফ্রান্সে গেলেন। এই প্রথম তুরস্কের বাইরে নতুন কোন দেশ প্রত্যক্ষ করলেন তিনি। ফ্রান্সের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিমণ্ডল দেখে মুগ্ধ হলেন।

ফ্রান্সে সামরিক শিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে এলেন। কিছুদিনের মধ্যেই এই শিক্ষার সুফল পেলেন। ১৯১১ সালে ইতালির সৈন্যবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল তুরস্কের উপর। তুরস্কের উপর এনভারের অধীনে কামাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে রওনা হল। একদিকে যখন এনভার বিলাসবহুল তাবুতে নিজের বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছে, অন্যদিকে সাধারণ তাবুতে বসে কামাল যুদ্ধের পরিকল্পনায় সমস্ত রাত্রি বিনিদ্র। কাটিয়ে দিচ্ছেন। পরদিন যুদ্ধ শুরু হতেই অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করলেন কামাল।

এই যুদ্ধে তুরস্ক পরাজিত হল। দেশের বিরাট অংশ দিতে হল মিত্রপক্ষের হাতে। এনভার বে দেশের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে নিজেই সব ক্ষমতা দখল করলেন। সাময়িক যুদ্ধ বিরতি হল। কিন্তু কয়েক মাস পরেই মিত্রপক্ষের নিজেদের মধ্যেই বিবাদ দেখা দিল। এই সুযোগে বেশ কিছু অঞ্চল পুনরুদ্ধার করলেন এনভার বে। তার জয়গানে সমস্ত দেশের মানুষ মুখরিত হয়ে উঠল। অন্যদিকে যার শৌর্যে বীরত্বে এই জয় সম্ভব। হল সেই কামাল রয়ে গেলেন সকলের অজ্ঞাতে।

এই যুদ্ধে জয়লাভ করে এনভার নতুন তুর্কী সাম্রাজ্য গড়ে তোলবার স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করলেন।

শুরু হল সৈন্যসংগ্রহের কাজ। একজন জার্মান জেনারেলকে এই সৈন্যদের গড়ে তোলবার ভার দেওয়া হল। এই কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠলেন কামাল।

এনভারের কিরুদ্ধে এ সমালোচনা করবার জন্য তাকে সোফিয়ার দূতাবাসে সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হল।

ইউরোপের বুকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। এনভার মাথায় এক নতুন ভাবনা জেগে উঠল। ঠিক করলেন, রাশিয়া আক্রমণ করে তাদের ককেশাসের সীমান্তের ওপারে বিতাড়ন করবেন। এনভার শুধু রুশ সৈন্যদের কথা চিন্তা করেছিলেন, সে দেশের প্রচণ্ড শীতের কথা চিন্তা করেননি। বরফাবৃত পাহাড়ি পথে যেতে যেতে প্রায় ৮০,০০০ হাজার সৈন্য পথেই মারা পড়ল।

অন্যদিকে মিত্রপক্ষের পক্ষে ইংল্যাণ্ড কনস্তান্তিনোপল অধিকার করবার জন্য সৈন্যবাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসে। কামাল অতুলনীয় সাহস আর বীরত্বের সাথে ইংরেজ বাহিনীর গতিরোধ করে তাদের বিতাড়ন করলেন। তার এই অভাবনীয় সাফল্যের জন্য এনভার তাকে পাঠালেন ককেশাস অঞ্চলে। সেখানে রুশ বাহিনীর কাছে তুর্কীর সেনাদল পরাজয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল। সৈন্যদল নিয়ে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চললেন। কামাল। এইবার ভাগ্য তাকে সাহায্য করল। রাশিয়ায় লেনিনের নেতৃত্বে জারের উৎখাত হল। তার সেনাপতিরা রণে ভঙ্গ দিল।

এদিকে মিত্রপক্ষের ক্রমাগত চাপের মুখে বিপর্যস্ত তুরস্ক। বিপদ আসন্ন অনুভব করে। এনভার দেশ ত্যাগ করে পালিয়ে গেলেন।

দেশের এই বিপদের মুহূর্তে কামাল এগিয়ে এলেন। তিনি এ্যাঙ্গোরাতে একটি জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত করলেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই গ্রীস তুরস্ক আক্রমণ করল। দেশের অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল জয় করে নিল।

এই সময় কামাল ছিলেন এ্যাঙ্গোলার কাছেই এক গ্রামে। জীবনের এক চরমতম সঙ্কটে পড়লেন কামাল। তার হাতে নিয়মিত সৈন্যের সংখ্যা ছিল নগণ্য। বেশির ভাগই ছিল উপজাতিদের থেকে সংগ্রহ করা লোকজন। সৈন্যদের দেবার মত প্রয়োজনীয় অস্ত্র নেই, পরিবহন ব্যবস্থা অপ্রতুল। খাবারের অভাব।

কামাল বুঝতে পারলেন এই সীমিত শক্তি নিয়ে শক্তিশালীকে এক বিরাট প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব নয়। তাই তিনি কৌশল অবলম্বন করলেন। গ্রীক সৈন্যদের অগ্রসর হবার সুযোগ দিলেন না। নিজে সাখারিয়া নদীর তীরে সুবিধাজনক জায়গায় সৈন্য সাজালেন। ১৯২১ সালের ২৪শে আগস্ট দুই পক্ষে শুরু হল তুমুল যুদ্ধ। কামাল পাশার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ যুদ্ধ। চৌদ্দ দিন লড়াইয়ের পর গ্রীক বাহিনী পিছু হটতে আরম্ভ করল।

তুরস্কের সাহায্যে এগিয়ে এল রাশিয়া। ফরাসীদের সঙ্গে এক গোপন চুক্তিতে সিরিয়ার সীমান্ত থেকে ৮০,০০০ সৈন্য নিয়ে এলেন কামাল।

গ্রীক বাহিনী পরাজিত হলে পালিয়ে গেল। সীমান্তে অবস্থান করছিল ব্রিটিশ শক্তি। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন কামাল। দুই পক্ষ মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। কিন্তু যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার আগেই একজন বৃটিশ সেনাপতির মধ্যস্থতায় কামালের সঙ্গে নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি হল।

ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা, ইতালি, রুমানিয়া, জাপান, গ্রীস, তুরস্কের প্রতিনিধিরা ল্যাসেন নামে এক জায়গায় নতুন চুক্তি করলেন। তাতে তুরস্কের সার্বভৌমিকতা, স্বাধীনতা স্বীকার করে নেওয়া হল। এইভাবে একমাত্র কামালের একনিষ্ঠ দেশাত্মবোধ ও অক্লান্ত শ্রমে তুরস্ক সাম্রাজ্য রক্ষা পেল।

ইতিমধ্যে ১৯২২ সালের ১লা নভেম্বর তুর্কী জাতীয় পার্লামেন্ট সুলতান ষষ্ঠ মহম্মদকে পদচ্যুত করল। এবং সর্বসম্মতভাবে কামাল পাশাকে রাষ্ট্রের প্রধান হিসাবে ঘোষণা করা হল।

তুরস্ক হল প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র (২৯শে অক্টোম্বর ১৯২৩)। কামাল পাশা নব প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত হলেন। দেশের সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হল তার হাতে। তার People’s Party দেশের সর্বত্র নির্বাচনে জয়লাভ করল।

এইবার তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারে হাত দিলেন। এতদিন তুরস্ক ছিল ইসলামিক রাষ্ট্র। ধর্মীয় বিধান অনুসারেই সমাজ পরিচালিত হল। তিনি ঘোষণা করলেন তুরস্ককে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করতে হবে। মুহূর্তে সমস্ত দেশ জুড়ে যেন ঝড় বয়ে গেল। শুধু মৌলবাদী ধর্মীয় নেতারা নয়, বিরোধীপক্ষও প্রতিবাদে ফেটে পড়ল। সৈন্যবাহিনীর মধ্যেও বিদ্রোহের আশঙ্কা ঘণীভূত হয়ে উঠল।

কামাল পাশা প্রথমে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই বিবাদের সমাধান করবার চেষ্টা করলেন কিন্তু যখন সফল হলেন না, কঠোর হাতে সমস্ত প্রতিবাদী কণ্ঠকে নীরব করে দিলেন। পার্লামেন্টে যখন এই বিল অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হল তখন অধিকাংশ সদস্যই তাতে সম্মতি দিতে অস্বীকার করল। তিনি বললেন, যদি প্রয়োজন হয় পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে দ্বিধা করব না।

তার অনমনীয় দৃঢ়তার কাছে শেষ পর্যন্ত সব বাধাই দূর হল। তুরস্ক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষিত হল।

তুর্কী নারীদের সামাজিক মর্যাদা প্রদান তার সংস্কারের প্রধান উল্লেখযোগ্য বিষয়। ১৯২৫ সালে তিনি বহুবিবাহ প্রথা আইন করে বন্ধ করলেন। রেজেস্ট্রি বিয়ে চালু হল। মেয়েদের ক্ষেত্রে বিয়ের বয়স ঠিক হল ১৭, পুরুষদের ক্ষেত্রে ১৮। মেয়েদের ইচ্ছামত পোশাক পরবার অনুমতি দেওয়া হল। বোরখা পরার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হল।

মেয়েদের জন্যে তৈরি হল স্কুল-কলেজ। তাদের ভোট দেবার অধিকার দেওয়া হল। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মেয়েদের সব বাধা দূর হল।

ইউরোপে বিভিন্ন দেশ দেখে তার মনে হয়েছিল শিক্ষার উন্নতি ছাড়া দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য স্কুল খোলা হল। সাত থেকে ষোল বৎসরের ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হল। ১৯২২ সালে নিরক্ষরতার হাত ছিল শতকরা ৮২ জন। মাত্র দশ বছরের মধ্যে সেই হারকে কমিয়ে ৪২ জনে নামিয়ে আনা হল।

তিনি ধর্মশিক্ষাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা প্রসারের উপর গুরুত্ব দিলেন। আরবি লিপির পরিবর্তে রোমান লিপির ব্যবহার শুরু হল। পৃথিবীর অন্য দেশের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য বর্ষপঞ্জী সংস্কার করা হল। দশমিক মুদ্রা চালু হল।

শুধুমাত্র দেশের শিক্ষার উন্নতি নয়। ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব দেওয়া হল। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য সমগ্র দেশ জুড়ে রেলপথ তৈরির কাজে হাত দেওয়া হল। তৈরি হল নতুন নতুন পথঘাট।

শুধুমাত্র দেশের অভ্যন্তরিণ সংস্কার নয়, বৈদেশিক ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি স্থাপন করা হল। ১৯৩২ সালে তুরস্ক লীগ অব নেশনস-এর সদস্য হল। সামরিক দিক থেকে যাকে কোন বিপদ না আসে তার জন্যে প্রতিবেশী প্রতিটি দেশের সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তি করা হল।

ইতিমধ্যে কামাল পাশা পর পর চারবার সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। ১৯২৩ সালে প্রথম তিনি নির্বাচিত হন, তারপর ১৯২৭, ১৯৩১, ১৯৩৫।

তুরস্কের সর্বাত্মক উন্নতির জন্য অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে তার স্বাস্থ্য ক্রমশই ভেঙে পড়ছিল। ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসে তিনি মারা গেলেন।

যদিও কামাল পাশার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় তিনি একনায়কতান্ত্রিক শাসন চালু করেছিলেন, সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দেশ পরিচালনা করেছেন, তবুও তিনি তুরস্কের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ। যে পরিস্থিতিতে তিনি দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন তখন কঠোরতা ছাড়া উন্নতির কোন পথই খোলা ছিল না।

২১. গৌতম বুদ্ধ (খ্রি: পূ: ৫৬৩ খ্রি: পূ: ৪৮৩)

প্রাচীন ভারতে বর্তমান নেপালের অন্তর্গত হিমালয়ের পাদদেশে ছিল কোশল রাজ্য। রাজ্যে রাজধানী কপিলাবস্তু। কোশলের অধিপতি ছিলেন শাক্যবংশের রাজা শুদ্ধোধন। শুদ্ধোধনের সুখের সংসারে একটি মাত্র অভাব ছিল। তাঁর কোন পুত্রসন্তান ছিল না। বিবাহের দীর্ঘদিন পর গর্ভবতী হলেন জ্যেষ্ঠা রানী মায়াদেবী। সে কালের প্রচলিত রীতি অনুসারে সন্তান জন্মাবার সময় পিতৃগৃহে যাত্রা করলেন মায়াদেবী। পথে লুম্বিনী উদ্যান। সেখানে এসে পৌঁছতেই প্রসব বেদনা উঠল রানীর। যাত্রা স্থগিত রেখে বাগানেই আশ্রয় নিলেন সকলে। সেই উদ্যানেই জন্ম হল বুদ্ধের। যিনি সমস্ত মানবের কল্যাণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি রাজার পুত্র হয়েও কোন রাজপ্রসাদে জন্মগ্রহণ করলেন না, মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে নীল আকাশের নীচে আবিভূর্ত হলেন।

পুত্র জন্মাবার কয়েক দিন পরেই মারা গেলেন মায়াদেবী। শিশুপুত্রের সব ভার নিজের হাতে তুলে নিলেন খালা মহাপ্রজাপতি। শিশুপুত্রের নাম রাখা হল সিদ্ধার্থ।

রাজা শুদ্ধোধন জ্যোতিষীদের আদেশ দিলেন শিশুর ভাগ্য গণনা করতে। তাঁরা সিদ্ধার্থের ভাগ্য গণনা করে বললেন, এই শিশু একদিন পৃথিবীর রাজা হবেন। যে দিন এ জরাজীর্ণ বৃদ্ধ মানুষ, রোগগ্রস্ত মানুষ, মৃতদেহ এবং সন্ন্যাসীর দর্শন পাবে সেই দিনই সংসারের সকল মায়া পরিত্যাগ করে গৃহত্যাগ করবে।

চিন্তিত হয়ে পড়লেন শুদ্ধোধন। মন্ত্রীরা পরামর্শ দিলেন এই শিশুকে সুখ, বৈভব আর বিলাসিতার স্রোতে ভাসিয়ে দিন, তাহলে এ আর কোনদিন গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী হবে না।

স্বতন্ত্র প্রাসাদেই স্থান হল রাজপুত্র সিদ্ধার্থের। যেখানে কোন জরা ব্যাধি মৃত্যুর প্রবেশ করার অধিকার নেই। ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলেন সিদ্ধার্থ। যৌবনে পা দিতেই রাজা শুদ্ধোধন তাঁর বিবাহের আয়োজন করলেন। সম্ভ্রান্ত বংশীয় সুন্দরী কিশোর যশোধরার সাথে বিবাহ হল সিদ্ধার্থের।

বিবাহের পর কিছু দিন আনন্দ উৎসবে মেতে রইলেন সিদ্ধার্থ। যথাসময়ে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হল। তার নাম রাখা হল রাহুল।

সন্তানের জন্মের পর থেকেই পরিবর্তন শুরু হল সিদ্ধার্থের। একদিন পথে বের হয়েছেন এমন সময় তার চোখে পড়ল এক বৃদ্ধ। অস্থিচর্মসার, মাথার সব চুলগুলো পেকে সাদা হয়ে গিয়েছে। মুখে একটিও দাঁত নেই। গায়ের চামড়া ঝুলে পড়েছে। লাঠিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছিল।

বৃদ্ধকে দেখামাত্রই রথ থামালেন সিদ্ধার্থ। তার সমস্ত মন বিচলিত হয়ে পড়ল– মানুষের একি ভয়ঙ্কর রূপ?

ভারাক্রান্ত মনে প্রাসাদে ফিরে গেলেন সিদ্ধার্থ। কয়েক দিন পর হঠাৎ সিদ্ধার্থের চোখে পড়ল। একটি গাছের তলার শুয়ে আছে একজন মানুষ। অসুস্থ রোগগস্ত, যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে।

বিমর্ষ হয়ে পড়লেন সিদ্ধার্থ। তাহলে তো যৌবনেও সুখ নেই। যেকোন মুহূর্তে ব্যাধি এসে সব সুখ কেড়ে নেবে।

কিছু দিন পর সিদ্ধার্থের চোখে পড়ল রাজপথ দিয়ে চলেছে এক শবযাত্রা। জীবনে এই প্রথম মৃতদেহ দেখলেন-প্রিয়জনদের কান্নায় চারদিক মুখর হয়ে উঠেছে। বিস্মিত হলেন সিদ্ধার্থ- কিসের এই কান্না? সারথী চন্ন বলল, প্রত্যেক মানুষের জীবনের পরিণতি এই মৃত্যু। মৃত্যুই জীবনের শেষ তাই প্রিয়জনকে চিরদিনের জন্য হারাবার বেদনায় সকলে কাঁদছে।

আনমনা হয়ে গেলেন সিদ্ধার্থ। এক জিজ্ঞাসা জেগে উঠল তার মনের মধ্যে। মৃত্যুই যদি জীবনের অন্তিম পরিণতি হয় তবে এই জীবনের সার্থকতা কোথায়?

রাজপ্রাসাদের সুখ ঐশ্বর্য বিলাস সব তুচ্ছ হয়ে গেল সিদ্ধার্থের কাছে। প্রতি মুহূর্তে মনে হল এই জরা ব্যধি মৃত্যুর হাত থেকে কে তাকে মুক্তির সন্ধান দেবে?

অকস্মাৎ দেখা হল এক সন্ন্যাসীর সাথে। সিদ্ধার্থ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন আপনি এই সন্ন্যাস গ্রহণ করেছেন?

সন্ন্যাসী বললেন, আমি জেনেছি সংসারের সব কিছুই অনিত্য। জরা, ব্যাধি, মৃত্যু যেকোন মুহূর্তে জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই আমি যা কিছু অবিনশ্বর চিরন্তন তারই সন্ধানে বার হয়েছি। আমার কাছে সুখ-দুঃখ জীবন-মৃত্যু সব এক হয়ে গিয়েছে।

সিদ্ধার্থ সকলের কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলেন। দিবারাত্র চিন্তার মধ্যে হারিয়ে গেলেন।

সকলের অগোচরে গভীর রাতে নিজের কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে এলেন সিদ্ধার্থ। পেছনে পড়ে রইল স্ত্রী যশোধরা, পুত্র রাহুল, পিতা শুদ্ধোধন, মহাপ্রজাপতি।

অশ্বশালায় ঘুমিয়ে ছিল সারথী চন্ন। তাঁকে ডেকে তুললেন সিদ্ধার্থ। সিদ্ধার্থকে রথে নিয়ে চললেন চন্ন। নগরের সীমানা পার হয়ে, জনপদ গ্রাম পার হয়ে, রাজ্যের সীমানায় এসে দাঁড়ালেন। এবার সারথী চন্নকে বিদায় দিতে হবে। নিজের সমস্ত অলংকার রাজবেশ খুলে উপহার দিলেন চন্নকে। তারপর বললেন, তুমি পিতাকে বলো আমি যদি কোনদিন জরা ব্যধি মৃত্যুকে জয় করতে পারি তবে আবার তার কাছে ফিরে আসব। আমি মানুষকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করে আলোর পথ দেখাতে চাই।

চলতে চলতে অবশেষে সিদ্ধার্থ এসে পৌঁছলেন রাজগৃহ। তখন রাজগৃহ ছিল কোথাও কোন জনমানব নেই, চারদিক নির্জন, শুধু পাখির কুজন আর বয়ে চলা বাতাসের শব্দ। ভাল লেগে গেল সিদ্ধার্থের। তিনি স্থির করলেন এখানেই বিশ্রাম গ্রহণ করবেন। ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়ল পাহাড়ের ছোট ছোট গুহায় ধ্যানমগ্ন হয়ে আছেন সব সাধুরা। একটি গুহার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন সিদ্ধার্থ। সেই গুহায় ধ্যানমগ্ন ছিলেন আলাড়া নামে এক সাধু। সিদ্ধার্থ গুহার অদূরে বসলেন।

আলাড়ার ধ্যান ভঙ্গ হতেই সিদ্ধার্থ তাঁর কাছে গিয়ে নিজের পরিচয়, গৃহত্যাগের কারণ বর্ণনা করে বললেন, আমি মুক্তির পথের সন্ধান করছি। আপনি আমাকে বলে দিন কোন পথ ধরে অগ্রসর হলে আমার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব।

সেখানেই রয়ে গেলেন সিদ্ধার্থ। একটি গুহায় তিনি বাসস্থান করে নিলেন। সমস্ত দিন ধ্যান বেদপাঠ শাস্ত্রচর্চার মধ্যে অতিবাহিত হত।

দিন কেটে যায়। গুরু আলাড়ার কাছে শিক্ষা পেয়ে অনেক কিছু জ্ঞানলাভ করেছেন সিদ্ধার্থ কিন্তু তার অন্তরে যেন অতৃপ্তি রয়ে যায়।

নতুন শুরুর সন্ধানে বার হলেন সিদ্ধার্থ। এবার এলেন উদ্দাক নামে এক সাধুর সান্নিধ্যে। দীক্ষা নিলেন তাঁর কাছে। সেই একই জীবনচর্চা শাস্ত্রপাঠ জপ-যজ্ঞ–এতে বাইরের আড়ম্বর আছে কিন্তু অন্তরের স্পর্শ নেই।

সিদ্ধার্থ উপলব্ধি করতে পারলেন যে, জ্ঞান, পরম সত্যের অন্বেষণ তিনি করছেন, কোন সাধুই তার সন্ধান জানেন না।

হতাশায় ভেঙে পড়লেন। তিনি অনুভব করলেন তাঁর পথের সন্ধান অপর কেউ তাঁকে দিতে পারবে না। অন্ধকারের মধ্যে তাকেই খুঁজে বার করতে হবে আলোর দিশা।

ঘুরতে ঘুরতে এসে উপস্থিত হলেন উরুবেলা নামে এক নগর প্রান্তে। যেখানে পাঁচজন সাধু বহুদিন তপস্যা করছিলেন। সিদ্ধার্থের আসার উদ্দেশ্য শুনে তারা বলল তুমি তপস্যা কর।

সিদ্ধার্থ জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন করে আমি তপস্যা করব? দিন-রাত্রি একই আসনে বসে ধ্যান করে চলেন।

এত আত্মনিগ্রহ করেও যে প্রজ্ঞা জ্ঞানের সন্ধান করছিলেন তার কোন দিশা পেলেন। সিদ্ধার্থ। মনে হল যাকে তিনি উপলব্ধি করতে চাইছেন, সে পরম সত্য যেন ধরা দিতে গিয়েও দূরে সরে যাচ্ছে।

সিদ্ধার্থ স্থির করলেন আর আত্মনিগ্রহের পথে তিনি অগ্রসর হবেন না। কাছেই এক গ্রামে ছিল একটি মেয়ে, নাম সুজাতা। ধর্মপ্রাণ ভক্তিমতী। প্রতি বছর সে মনের কামনা পূরণের আশায় বৃক্ষ দেবতার কাছে পূজা দিত।

প্রতি বছর যে বৃক্ষের তলায় সুজাতা পূজা দিত, সিদ্ধার্থ স্নান সেরে অর্ধমৃত অবস্থায় সেই বৃক্ষের তলায় এসে বসেছিলেন।

সুজাতা দাসী পুন্নাকে নিয়ে বৃক্ষতলায় এসে সিদ্ধার্থকে দেখে বিস্মিত হলেন। সুজাতা সিদ্ধার্থের সামনে নতজানু হয়ে তাঁকে পায়েস প্রদান করলেন।

সিদ্ধার্থের মনে হল এও যেন ঈশ্বরেরই অভিপ্রেত। তিনি পায়েস গ্রহণ করে খাওয়া মাত্র সমস্ত শরীরে এক শক্তি অনুভব করলেন। প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠল তাঁর দেহ-মন।

সিদ্ধার্থ এবার সেই গাছের নিচেই ধ্যানে বসলেন। দিন কেটে গেল সন্ধ্যা হল। ধীরে ধীরে পার্থিব জগৎ মুছে গেল তার সামনে থেকে। এক অনির্বচনীয় অনুভূতি প্রজ্ঞা জ্ঞান ধীরে ধীরে জেগে ওঠে তার মধ্যে। তিনি অনুভব করলেন জন্ম-মৃত্যুর এক চিরন্তন আবর্তন। সমস্ত বিশ্ব জুড়ে রয়েছে এক অসীম অনন্ত শূন্যতা। তার মাঝে তিনি একা জেগে রয়েছেন।

তারই মধ্যে সহসা জেগে ওঠে লোভ, কামনা, বাসনা, প্রলোভন। যা যুগ যুগ ধরে মানুষকে চালিত করেছে। তারা কি এত সহজে নিজেদের অধিকার ত্যাগ করতে চায়। ধীরে ধীরে পার্থিব চেতনার জগৎ থেকে তিনি উত্তোরণ করলেন পরম প্রজ্ঞার জগতে। দেহধারণ অর্থাৎ জন্ম থেকে মুক্তির মধ্যেই মানুষ সকল পার্থিক জগতের দুঃখ কষ্ট থেকে উদ্ধার পেতে পারে। এই পরম মুক্তিরই নাম নির্বাণ। এই পরম জ্ঞান উপলব্ধির মধ্যে দিয়ে যুবরাজ সিদ্ধার্থ হয়ে উঠলেন মহাজ্ঞানী বুদ্ধ।

সেই সময় সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল দুজন বণিক। তাদের দৃষ্টি পড়ল বুদ্ধের দিকে। দেখা মাত্রই মুগ্ধ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল তারা। তারা বুদ্ধের পায়ের কাছে বসে বলল, প্রভু, আপনি আমাদের সব পাপ তাপ দুঃখ দূর করে আপনার শিষ্য করে নিন।

বুদ্ধ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তাঁর অন্তস্থিত উপলব্ধিকে কি মানুষ গ্রহণ করতে পারবে। দীর্ঘক্ষণ চিন্তা করার পর মনে হল তাঁর এই সাধনা তো মানুষের মঙ্গলের জন্য, তাদের মুক্তির জন্য। তিনি তো শুধু নিজের নির্বাণের জন্য এই তপস্যা করেনি।

বুদ্ধ স্থির করলেন সর্ব প্রথম তিনি তার উপদেশ প্রদান করবেন সেই পাঁচ সন্ন্যাসীর কাছে যারা তাঁর গুরু। তাঁকে উপহাস করে অন্যত্র চলে গিয়েছেন।

তিনি দুই বণিককে আশীর্বাদ করে তাদের বিদায় দিয়ে সেই নিরঞ্জনা নদীতীরস্থ গাছটিকে প্রণাম করে এগিয়ে চলছেন। যে বৃক্ষের তলায় তিনি বোধি লাভ করেছিলেন। সেই বৃক্ষের নাম হল বোধিবৃক্ষ। যুগ যুগ ধরে মানুষ যার বেদীমূল শ্রদ্ধা নিবেদন করে চলেছে।

বুদ্ধ চলতে চলতে এসে পৌঁছলেন সেই পাঁচ সাধুর কাছে। তারা সকলেই কঠোর সাধনায় নিমগ্ন হয়েছে। বুদ্ধকে দেখামাত্রই তাঁরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ল।

বুদ্ধ তাদের সামনে গিয়ে বললেন, তোমরা এই আত্মনিগ্রহের পথ ত্যাগ কর। এই কৃচ্ছসাধনাও যেমন প্রজ্ঞা লাভের পথের প্রতিবন্ধক তেমনি ভোগসুখ বিলাসের মধ্যেও সত্যকে জানা যায় না।

ধীরে ধীরে পাঁচজন সাধুর মন থেকে সব সংশয় দূর হয়ে গেল। তারা উপলব্ধি করল তথাগত বুদ্ধই তাদের জীবনে আলোর দিশারী হয়ে এসেছেন।

বুদ্ধ তাদের একে একে ধর্মের উপদেশ দিতে লাগলেন। তাঁর উপদেশ শোনবার পর পাঁচজন সাধু বলল, আপনি আমাদের দীক্ষা দিন, আজ থেকে আমরা আপনার শিষ্য হব।

বুদ্ধ তাদের দীক্ষা দিয়ে শিষ্য হিসেবে বরণ করে নিলেন। দেখতে দেখতে অল্প দিনের মধ্যেই বুদ্ধের নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

প্রাচীন ভারতে বৈদিক ধর্মে মূর্তিপূজা না থাকলেও ছিল যাগযজ্ঞ আচার-অনুষ্ঠানের বাড়াবাড়ি। ব্রাহ্মণরা ছিল সমাজের সবকিছুর চালক। বুদ্ধের ধর্মের মধ্যে ছিল মানুষের প্রতি ভালবাসা করুণা প্রেম। তাই মানুষ সহজেই তার ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন।

এতদিন পুরোহিত ব্রাহ্মণরা মানুষকে বলত একমাত্র তারাই পারে মানুষকে মুক্তি দিতে। বুদ্ধ বললেন, অন্য কেউ তোমাদের মুক্তি দিতে পারবে না। তোমাদের জীবনচর্চার মধ্যেই আছে তোমাদের জীবনের সুখ-দুঃখ। মানুষ নিজেই যেমন তার দুঃখকে সৃষ্টি করে তেমনি নিজের চেষ্টার মধ্যে দিয়েই সব দুঃখ থেকে নিজেকে উত্তীর্ণ করতে পারে। তুমি সৎ জীবন যাপন কর, পবিত্র আচরণ কর। অন্তরকে শুদ্ধ কর, উদার কর। সেখানে যেন কোন কলুষতা না স্পর্শ করতে পারে।

দলে দলে মানুষ আসতে আরম্ভ করল তার কাছে। তিনি তাদের কাছে বললেন, অষ্টমার্গের কথা।

প্রথম হচ্ছে সত্য বোধ–অর্থাৎ মন থেকে সকল ভ্রান্তি দূর করতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে নিত্য ও অনিত্য বস্তুর মধ্যে প্রভেদ।

দ্বিতীয় হচ্ছে সংকল্প-সংসারের পার্থিব বন্ধন থেকে মুক্ত হবার আকাঙ্ক্ষা। যা কিছু পরম জ্ঞান তাকে উপলব্ধি করার জন্য থাকবে গভীর আত্ম সংযমের পথ ধরে এগিয়ে চলা।

তৃতীয়–সম্যক বা সত্য বাক্য। কোন মানুষের সাথেই যেন মিথ্যা না বলা হয়। কাউকে গালিগালাজ বা খারাপ কথা বলা উচিত নয়। অন্য মানুষের সাথে যখন কথা বলবে, তা যেন হয় সত্য পবিত্র আর করুণায় পূর্ণ।

চতুর্থ–সৎ আচরণ। সকল মানুষেরই উচিত ভোগবিলাস ত্যাগ করে সৎ জীবন যাপন করা। সমস্ত কাজের মধ্যেই যেন থাকে সংযম আর শৃঙ্খলা। এছাড়া অন্য মানুষের প্রতি আচরণে থাকবে দয়া ভালবাসা।

পঞ্চম–হল সত্য জীবন বা সম্যক জীবিকা অর্থাৎ সত্তাবে অর্থ উপার্জন করতে হবে এবং জীবন ধারণের প্রয়োজনে এমন পথ অবলম্বন করতে হবে যাতে রক্ষা পাবে পবিত্রতা ও সততা।

ষষ্ঠ–সৎ চেষ্টা মন থেকে সকল রকম অশুভ ও অসৎ চিন্তা দূর করতে হবে যদি কেউ আগের পাঁচটি পথ অনুসরণ করে তবে তার কর্ম ও চিন্তা স্বাভাবিকভাবেই সংযত হয়ে চলবে।

সপ্তম–সম্যক ব্যায়াম অর্থাৎ সৎ চিন্তা। মানুষ এই সময় কেবল সৎ ও পবিত্র চিন্তা ভাবনার দ্বারা মনকে পূর্ণ করে রাখবে।

অষ্টম–এই স্তরে এসে মানুষ পরম শান্তি লাভ করবে। তার মন এক গভীর প্রশান্তির স্তরে উত্তীর্ণ হবে।

বুদ্ধ যে অষ্টমার্গের উপদেশ দিয়েছিলেন তা মূলত তাঁর সন্ন্যাসী আশ্রম বা সঙ্গ শিষ্যদের জন্য। কিন্তু তিনি তাঁর প্রখর বাস্তব চেতনা দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, সাধারণ গৃহী মানুষ কখনোই এই অষ্টমার্গের পথকে সম্পূর্ণ অনুসরণ করতে পারবে না। তিনি সমগ্র মানব সমাজের জন্য দশটি নীতি প্রচলন করলেন–

১. তুমি কোন জীব হত্যা করবে না।

২. অপরের জিনিস চুরি করবে না।

৩. কোন ব্যভিচার বা অনাচার করবে না।

৪. মিথ্যা কথা বলবে না, কাউকে প্রতারণা করবে না।

৫. কোন মাদক দ্রব্য গ্রহণ করবে না।

৬. আহারে সংযমী হবে। দুপুরের পর আহার করবে না।

৭. নৃত্যগীত দেখবে না।

৮. সাজসজ্জা অলঙ্কার পরবে না।

৯. বিলাসবহুল শয্যায় শোবে না।

১০. কোন সোনা বা রূপা গ্রহণ করবে না।

এই দশটি উপদেশের মধ্যে প্রথম পাঁচটি ছিল সাধারণ মানুষের জন্য। আর সন্ন্যাসীর ক্ষেত্রে দশটি উপদেশই পালনীয়।

বুদ্ধের এই উপদেশ জনগণের মধ্যে প্রচার করার জন্য তার ষাট জন বিশিষ্ট শিষ্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এবার বুদ্ধ তার কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে রওনা হলেন গয়ার পথে।

বুদ্ধের শিষ্যের সংখ্যা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন বিরাট সংখ্যক এই গৃহত্যাগী সন্ন্যাসীর জন্য প্রয়োজন সঙ্ঘের। যেখানে তারা জীবনচর্চার সাথে ধর্মচর্চা করবেন। সৎ পবিত্র জীবনের আদর্শ গ্রহণ করবেন।

শুরু হল সজ্ঞা প্রতিষ্ঠার কাজ। সেই সময় একদিন যখন বুদ্ধ শিষ্যদের উপদেশ দিচ্ছিলেন, কপিলাবস্তু থেকে এক দূত এসে মহারাজ শুদ্ধোধনের একটি পত্র দিল বুদ্ধকে।

বুদ্ধ তার কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে রওনা হলেন কপিলাবস্তুর পথে। মহারাজ শুদ্ধোধনের মনে ক্ষীণ আশা জেগে ওঠে, হয়ত পুত্র তার রাজ্যের ভার গ্রহণ করবে। বুদ্ধ নগরে প্রবেশ করতেই বৃদ্ধ পিতা ছুটে গেলেন তাঁর কাছে। কিন্তু এ তিনি কাকে দেখলেন! গপরনে পীতবস্ত্র, একদিকে কাঁধ অনাবৃত। মস্তক মুণ্ডন। হাতে ভিক্ষাপাত্র। তিনি ভিক্ষাপাত্র হাতে নগরের মানুষের কাছে ভিক্ষা চাইছেন।

যে কিনা সমগ্র রাজ্যের যুবরাজ সে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করছে। লজ্জায় ক্ষোভে মাথা নত করলেন শুদ্ধোধন। বুদ্ধ এগিয়ে এলেন পিতার কাছে। এসে তাকে প্রণাম করে বললেন, আপনি হয়ত পুত্রস্নেহে আমাকে দেখে ব্যথিত হয়েছেন। মন থেকে এই মায়া আপনি দূর করুন। এই জগৎ অনিত্য।

রাজা শুদ্ধোধন উপলব্ধি করলেন তাঁর সম্মুখে যে দাঁড়িয়ে আছে সে তার পুত্র নয়, মহাজ্ঞানী মানবশ্রেষ্ঠ তথাগত বুদ্ধ। পুত্রকে নিয়ে রাজপ্রাসাদে গেলেন। প্রাসাদের অন্তঃপুরে বসেছিলেন যশোধারা। তিনি ভাবলেন যতক্ষণ না বুদ্ধ তার কাছে আসে, তিনি কোথাও যাবেন না।

বুদ্ধের হৃদয় যশোধারার সাথে সাক্ষাতের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। তিনি দুজন শিষ্যকে নিয়ে অন্তঃপুরে প্রবেশ করলেন। বুদ্ধকে দেখামাত্রই উঠে এলেন যশোধারা। তার পরনে কোন রাজবেশ নেই। কোন অলঙ্কার নেই। গৃহে থেকেও সন্ন্যাসিনী। বুদ্ধের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়লেন যশোধারা।

বুদ্ধ তাঁকে শান্ত করে বললেন, হে আমার পুত্রের জননী, আমি জানি তুমিও জন্ম জন্মান্তর ধরে সৎ পবিত্র জীবন যাপন করছ, তাই আমি তোমাকে মুক্তির পথ দেখাতে এসেছি। আমি তোমাকে যে উপদেশ দেব তুমি সেই পথ অনুসরণ কর, তবেই জীবনের সব মায়া বন্ধনের ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে। আর সেখানে অপেক্ষা করলেন না বুদ্ধ।

পরদিন বুদ্ধ নগরে বেরিয়েছেন ভিক্ষাপাত্র হাতে। এমন সময় প্রাসাদের অলিন্দে দাঁড়িয়ে যশোধারা তাঁর পুত্র রাহুলকে বললেন, ঐ যে দিব্যকান্তি পুরুষ পথ দিয়ে চলেছেন উনি তোমার পিতা। যাও ওর কাছ থেকে গিয়ে তোমার উত্তরাধিকার চেয়ে নাও।

পুত্র রাহুল গিয়ে দাঁড়াল বুদ্ধের সামনে। তাঁকে প্রণাম করে বলল, আমি তোমার পুত্র। তুমি আমাকে আমার উত্তরাধিকার দাও।

এবার এলেন তাঁর ভাই আনন্দ। আনন্দ প্রজাপতির পুত্র। তিনি বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। সকলকে নিয়ে বুদ্ধ কপিলাবস্তু ত্যাগ করে এলেন শ্রাবস্তী নগরে। এখানে তার থাকবার জন্য অনাথ পিণ্ডক নামে এক ধনী বণিক জেতবনে এক মঠ নির্মাণ করে দিলেন।

একদিন কপিলাবস্তু থেকে মহাপ্রজাপতির দূত এল বুদ্ধের কাছে। তারা সংসার জীবন ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করে সজ্ঞে আশ্রয় নিতে চান। তাঁর সাথে যশোধারা ও আরো অনেকেই সন্ন্যাস গ্রহণ করতে চায়।

কিন্তু বুদ্ধ নারীদের সন্ন্যাস গ্রহণকে মেনে নিতে পারলেন না। তিনি মাতা মহাপ্রজাপতির অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন।

আনন্দ ছিলেন বুদ্ধের প্রধান শিষ্য। আনন্দের অনুরোধে বুদ্ধ বললেন, বেশ তাহলে তাদের সঙ্ েপ্রবেশ করার অনুমতি দিলাম। তবে সঙ্রে নিয়ম ছাড়াও আরো আটটি নিয়ম তাঁদের মেনে চলতে হবে।

মাতা মহাপ্রজাপতি বুদ্ধের সমস্ত নিয়ম মেনে চলার অঙ্গীকার করলেন। বুদ্ধ অনুমতি দিলেও নারীদের এই সংঘে প্রবেশ করার বিষয়টিকে কোন দিনই অন্তর থেকে সমর্থন করতে পারেননি।

বুদ্ধ আনন্দকে বললেন, যদি নারীরা সঙ্ঘে প্রবেশ না করত তবে বৌদ্ধ ধর্ম হাজার হাজার বছর ধরে ভারতের বুকে রয়ে যেত। কিন্তু নারীরা প্রবেশ করার জন্য কিছু দিনের মধ্যেই আমার প্রবর্তিত সব নিয়ম-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। বুদ্ধের এই আশঙ্কা সত্য বলেই পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছিল।

তাঁর এই সমস্ত উপদেশের সাথে সাথে বিভিন্ন গল্প বলতেন বুদ্ধ। এই গল্পগুলোর মধ্যে থাকত নীতিশিক্ষা। সাধারণ অশিক্ষিত মানুষ সহজেই এই শিক্ষা গ্রহণ করত। এই সমস্ত গল্পগুলো পরবর্তীকালে সংকলন করে তৈরি হল জাতক। বৌদ্ধদের বিশ্বাস প্রাচীনকালে ভগবান বুদ্ধ অসংখ্যবার জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। কখনো মুনষ, কখনো পশু পাখি। প্রত্যেক জন্মেই তিনি কিছু পুণ্য কাজ করেছিলেন। এই ধারাবাহিক পুণ্য সঞ্চয়ের মধ্যে দিয়েই তিনি অবশেষে বুদ্ধত্ব লাভ করেছেন।

বুদ্ধের প্রতিটি উপদেশ ছিল সরল। তার উপদেশের উৎস ছিল তাঁর হৃদয়–তিনি কোন সংস্কারে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর শিক্ষার মূল কথাই ছিল নারী পুরুষ সকলেরই আধ্যাতিক জ্ঞান অর্জনের সমান অধিকার আছে। সে যুগে পুরোহিত ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় মানুষের মধ্যে যে ভেদরেখা সৃষ্টি করেছিল তিনি সকল মানুষের জন্য। শুধু উপদেশ দিয়েই কখনো তিনি নিজেকে নিবৃত্ত রাখতেন না। জগতের মঙ্গলের জন্য তিনি নিজের প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলতেন পশুবলি হচ্ছে অন্যতম কুসংস্কার বাহ্মণদের বাক্য অনুসারে যদি পশুবলি কল্যাণকর হয় তবে তো মানুষ বলি আরো বেশি কল্যাণকর।

বুদ্ধ বলেছেন, আচার-অনুষ্ঠান, যাগ-যজ্ঞ অর্থহীন, জগতে একটি মাত্র আদর্শ আছে, অন্তরে সব মোহকে বিসর্জন দাও। তবেই তোমার অন্তরের অজ্ঞানতার মেঘ মুছে গিয়ে সূর্যালোক প্রকাশিক হবে। তুমি নিজেকে নিঃস্বার্থ কর।

বৌদ্ধ ধর্ম সমগ্র ভারতবর্ষে বিপুলভাবে প্রসার লাভ করেছিল। এর পেছনে দুটি কারণ ছিল। বৌদ্ধ ধর্মের সহজ সরলতা, দ্বিতীয়তঃ মানুষের প্রতি ভালবাসা। বুদ্ধ তাঁর সমস্ত জীবন ধরে মানুষকে ভালবাসার শিক্ষা দিয়েছেন। এই ভালবাসা শুধু মানুষের জন্য নয়, সমস্ত প্রাণীর জন্য। তিনিই প্রথম সমস্ত পশু-প্রাণী-কীট-পতঙ্গকে অবধি করুণা প্রদর্শন করতে উপদেশ দিয়েছেন।

এই দয়া ক্ষমা করুণাই বুদ্ধের শ্রেষ্ঠ দান। তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না। তার শিক্ষা ছিল ঈশ্বর বলে কিছু নেই। ঈশ্বর সম্বন্ধে সে যুগে প্রচলিত সব ধারণাকেই তিনি অস্বীকার করেছিলেন। বৃদ্ধ এক জায়গায় বেশি দিন থাকতেন না। ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম প্রচার করতেন, নীতিশিক্ষা দিতেন।

জীবনের দিন যতই শেষ হয়ে আসছিল ততই মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়তেন। বিশেষত বর্ষার প্রকোপেই বেশি অসুস্থ হয়ে পড়তেন।

জীবনের অন্তিম পর্বে (বুদ্ধ তখন আশি বছরে পা দিয়েছেন। বুদ্ধ তাঁর কয়েকজন শিষ্য নিয়ে এলেন হিরণ্যবতী নদীর তীরে কুশীনগরে। ঘুরতে ঘুরতে এসে দাঁড়ালেন এক শালবনের নিচে। আনন্দ গাছের নিচে বিছানা পেতে দিলেন। সামান্য কয়েকজন শিষ্য সেখানে দাঁড়িয়েছিল। তারা সকলেই উপলব্ধি করতে পারছিলেন ভগবান তথাগত এবার তাঁদের ত্যাগ করে যাবেন।

এবার আনন্দকে কাছে ডাকলেন বুদ্ধ। বললেন, আমি যখন থাকব না, আমার উপদেশ মত চলবে আমার উপদেশই তোমার পথ নির্দেশ করবে।

বুদ্ধদেব তাঁর কোন উপদেশ লিপিবন্ধ করে যাননি। তাঁর মৃত্যুর পর বৌদ্ধ স্থবির শ্ৰমণরা মিলিতভাবে তার সমস্ত উপদেশ সংকলিত করেন। এই সংকলিত উপদেশই ত্রিপিটক নামে পরিচিত। ত্রিপিটক বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ।

বুদ্ধ শেষ বারের মত শিষ্যদের কাছে ডেকে তাঁদের উপদেশ দিলেন তারপর গভীর ধ্যানে মগ্ন হলেন। সে ধ্যান আর ভাঙল না।

বৌদ্ধদের মতে বুদ্ধ দেহত্যাগ করেছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৪ সালে। কিন্তু আধুনিক কালের ঐতিহাসিকদের মতে বুদ্ধের মহাপ্রয়াণ ঘটেছিল খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৬ বা ৪৮৩।

২২. শ্রীরামকৃষ্ণ (১৮৩৩-১৮৮৬)

ছেলে বড় হল। পাঁচ বছরে পড়ল গদাধর। কামারপুকুর গ্রামের লাহাবাবুদের বাড়ির নাটমন্দিরে পাঠশালা। বাবা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় ছেলে গদাধরকে সেই পাঠশালায় ভর্তি করিয়ে দিলেন। কিন্তু পড়াশোনায় খুব বেশি মন নেই গদাধরের। শুধু বাংলাটা পড়তে ভাল লাগে। অংক কষতে গেলেই মাথা গুলিয়ে যায়। বামুনের ছেলে। ছোটবেলাতেই মুখে মুখে শিখেছে। দেবদেবীর প্রণাম মন্ত্র। সেগুলো কিন্তু সে বেশ গড়গড়িয়ে বলে যেতে পারে। তার কিছুদিন পরেই রামায়ণ পড়তে পারে সুর করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গলার সুর এবং বলার ভঙ্গিও তার সুন্দর হয়েছে। তাই মধুযোগীর বাড়িতে তার রামায়ণ পড়া শুনতে ভিড় জমে যায়।

একদিন বিকেলবেলা সে রামায়ণ পাঠ করছে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও শুনছে মনোযোগ। দিয়ে। কাছেই আমগাছের ওপর বসে ছিল একটা হনুমান। সে লাফ দিয়ে ঠিক গদধরের কাছে এসে পড়ল। তারপর পা জড়িয়ে ধরল গদাধরের। হইচই করে উঠল সবাই। কেউ বা ভয় পেয়ে উঠে চলে গেল। কিন্তু গদাধর একটুও নড়ল না। সে হনুমানের মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিল। বুঝি শ্রীরামচন্দ্রের আশীর্বাদ পেয়েই খুশী হয়ে রামভক্ত হনুমান আবার লাভ দিয়ে গাছে উঠে গেল।

অদ্ভুত ছেলে গদাধর! সব সময়েই ভাবাবেশে মত্ত হয়ে থাকে। পথে পথে ঘুরে গান করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায়। লোকজন ছুটে এসে মাথায় ও মুখে জল ছিটিয়ে তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনে।

কামারপুকুর থেকে দু’মাইল দূরে আনুড় গ্রাম। সেখানে বিরাট এক গাছের তলায় আছে বিশালাক্ষীর থান। গাঁয়ের মেয়েরা দল বেঁধে চলেছে সেই বিশালাক্ষী দেবীর পূজা দিতে। হঠাৎ কোত্থেকে ছুটে এসে গদাধর সেখানে সেই দলে ঢুকে পড়ল। গাঁয়ের মেয়েরা ভাবল, যাক ভালই হয়েছে। গদাইয়েরও গান গেয়ে খুব আনন্দ। বাবার কাছ থেকে শেখা দেবতার ভজন কি সুন্দর গায়।

কিন্তু বিশালাক্ষী থানের কাছাকাছি যেতেই তার গান থেমে গেল। দু’চোখ বেয়ে পড়তে লাগল জলের ধারা। প্রসন্ন বলে মেয়েটি এগিয়ে এসে তাকে ধরতেই তার কোলে অবসন্ন হয়ে ঢলে পড়ল। গদাইয়ের জ্ঞান হতেই সে বলল, ওরে গদাইকে কিছু খেতে দে।

কিন্তু কি খেতে দেবে গদাইকে? কারুর সঙ্গে ভোগের সামগ্রী ছাড়া যে আর কিছু নেই। প্রসন্ন বলল, ভোগের জিনিসই আলাদা করে ওকে দে। ওকে খাওয়ালেই তোদের পুণ্যি হবে।

অনেকে পূজার জন্য আনা নৈবেদ্য থেকে কলা, দুধ ও বাতাসা গদাইয়ের মুখে তুলে দেয়।

বড় খামখেয়ালী ছেলে গদাধর। পড়াশুনা মোটেই করছে না। শুধু আড্ডা দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দল বেঁধে ছেলেদের সঙ্গে যাত্রা করে। কখনো সাজে কৃষ্ণ, কখনো শিব।

দেখতে দেখতে বড় হতে লাগল গদাধর। দাদা রামকুমার বলেন, গাঁয়ে ওর লেখাপড়া কিছু হবে না। আমি ওকে কলকাতায় নিয়ে যাব। লেখাপড়া শেখাব।

রামকুমার কলকাতায় ঝামাপুকুরে থাকেন। সেখানে একটা টোল খুলেছেন। সেখানেই ছোটভাইকে নিয়ে যেতে চান। কিন্তু সে গা ছেড়ে যেতে চায় না।

১৮৩৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এই কামারপুকর গ্রামে জনা হয়েছে গদাধরের। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখেছে এখানকার পথ-ঘাট, পুকুর, মা-বাবা ও গাঁয়ের লোকজনদের। এসব ছেড়ে যেতে কি ভাল লাগে।

পৈতে হয়েছে। দাই-মা ধনী কামারনীর আদর পেয়েছে। মা চন্দ্রমণির দিকে যেমন টান, ধনী কামারনীর দিকেও টান তার কম নয়। বাবাকেও ভালবাসে খুব। কিন্তু সাত বছর বয়সেই বাবাকে হারাতে হল হঠাৎ। ছিলিমপুরে থাকেন বাবার ভাগনে রামাদ। তার বাড়িতে দুর্গাপূজায় পুরোহিত হয়ে পূজা করতে গিয়েছিলেন ক্ষুদিরাম। সেখানেই ভাসানের দিন রাত্রিবেলায় মারা গেলেন। সেই খবর পেয়ে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল গদাধর।

এবার গ্রাম ছাড়তেই হবে গদাধরকে। বাবার শ্রাদ্ধ শান্তি হয়ে যাবার পরই রামকুমার তাকে কলকাতা যাবার জন্য তৈরী হতে বললেন। সে কথা শুনে গদাধরের মন খারাপ হয়ে গেল। ভাগনে হৃদয় তারই সমবয়সী। ক্ষুদিরামের শ্রাদ্ধের সময় এসেছে। তার সঙ্গে গাঁয়ের পথে পথে ঘুরে বেড়ায় গদাধর।

একদিন বেড়াতে বেড়াতে একটু দূরেই চলে গেল। গা ছাড়িয়ে মাঠ, জমি। বেশ লোকের ভিড়। কয়েকজন লোক জমি ভাগাভাগি করছে। মাপছে দড়ি ফেলে। তাতেও হল না। লেগে গেল তাদের মধ্যে ঝগড়া, তারপর হাতাহাতি। খুড়ো আর ভাইপোর মধ্যে বিবাদ। দুজনেই পণ্ডিত। অথচ কি মারামারি করল তারা। গদাধর ভাবল, ছিঃ, লেখাপড়া শিখেও মানুষ এমন হয়! এমন বিষয়-সম্পত্তিকে ধিক্।

গদাধরের মনটা খারাপ হয়ে গেল ভীষণ।

রামকুমার গদাধরকে নিয়ে কলকাতায় এলেন। মধ্য কলকাতায় ঝামাপুকুরে অনেক রকম পুঁথি আছে টোলে। সেগুলো নেড়েচেড়ে দেখে গদাধর। রামকুমার বললেন, এসব পড়ে এখন লাভ নেই। ইস্কুলে তোকে ভর্তি করিয়ে দেব। সেখানেই পড়বি।

গদাধর ঠোঁট উলটিয়ে বলল, আমি পড়বই না স্কুলে।

রামকুমার জিজ্ঞেস করলেন, কেন?

গদাধর জবাব দিল, চালকলা বাঁধা বিদ্যা শিখতে চাই না।

–তবে কি চাস?

–আমি চাই এমন বিদ্যা শিখতে যাতে সত্যিকারের কোন লাভ হয়। মানুষের জীবন ধন্য হয়।

রামকুমার ভাবলেন, ছোট ভাইটার মাথা নিশ্চয় খারাপ হয়ে গিয়েছে। লেখাপড়া যখন করবে না তখন দেবসেবাই করুক। তাই বললেন, ব্রাহ্মণের সন্তান, পূজার মন্ত্র তন্ত্র ভাল করে শিখে নে। ব্যাকরণ, শাস্ত্র এসব পড়াশুনা কর।

গদাধর তাতে কোন আপত্তি করে না। পূজার মন্ত্রের বই নাড়াচাড়া করে। রামকুমার টোলে পড়ানো ছাড়া যজমানদের বাড়িতে পূজাও করেন। গদাধরও সঙ্গে যায়। যতক্ষণ দাদা পূজা করেন সব কিছু দেখে গদাধর পূজা মন্ত্র ও আয়ত্ত করে। ঘরে ফিরে এসে পূজার মন্ত্র ও নিয়মকানুন লেখা বই ও দেখে নেয়। কয়েকদিনের মধ্যে তার অনেক কিছু শেখা হয়ে যায়।

ঝামাপুকুরের পিতাম্বর মিত্তির বাড়ির বিগ্রহের পুরোহিত ছিলেন রামকুমার। একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ায় যেতে পারলেন না। তিনি গদাধরকে বললেন, তুই একটু পুজোটা করে দিয়ে আসবি?।

গদাধর বেশ খুশিমনেই গেল। পূজা করল। তার পূজা দেখে বাড়ির গিন্নিরা ও মেয়েরা কী খুশী। কি সুন্দর মন্ত্রপাঠ করে গদাধর। পূজা করতে করতে সে কখনো যেন তন্ময় হয়ে যায়। মেয়েরা বেশি করে চাল কলা ও নৈবেদ্যর ডালি তাকে দিয়ে দেয়। গদাধর আপত্তি জানিয়ে বলে, এত দিচ্ছ কেন?

মেয়েরা ভক্তিতে গদগদ হয়ে প্রমাণ করে তাদের নবীন পূজারীকে। এরপর থেকে মিত্রবাড়ির নিয়মিত পূজারী হয়ে গেল গদাধর।

গদাধরের কিন্তু ওসবের দিকে কোন লাভ নেই। মাঝে মাঝে যজমানের বাড়ি থেকে পাওয়া সব কিছু পথের এক ভিখারীকে দিয়ে দেয়। এজন্য দাদার ভৎর্সনাও শুনতে হয় গদাধরকে। গদাধর বলে আমাদের তো অনেক আছে, ওদের যে কিছুই নেই। মনে মনে রামকুমার ভাবেন, গরীবের ঘরে জন্ম হলেও রাজার মন নিয়ে গদাধর জন্মেছে।

বড় হয়ে উঠছেন গদাধর। দেখতে তাঁকে ভক্তিমান ব্রাহ্মণ বলেই মনে হয়। কিন্তু কেমন যেন উদাস উদাস ভাব।

রামকুমার খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। গদাধরের ভবিষ্যৎ কি হবে?

এমন সময় এক সুযোগ এসে গেল তাদের সামনে।

কলকাতার জানবাজারের রানী রাসমণি মন্দির স্থাপন করলেন দক্ষিণেশ্বরে। সে অতি বিচিত্র কাহিনী। কাশীতে অন্নকূট উৎসব করার জন্য বিরাট বিরাট নৌকায় বহু খাদ্যসামগ্রী ও লোকজন নিয়ে জনপথে চলেছিলেন রানী রাসমণি। রাত্রে স্বপ্ন দেখলেন। জগজ্জননী মূর্তিমতী হয়ে তাঁকে বললেন, ওরে তোর কাশী যাওয়ার দরকার নেই। গঙ্গার তীরে এখানেই মন্দির তৈরী করে আমাকে প্রতিষ্ঠা কর। আমাকে অন্নভোগ দে।

রাসমণির আর কাশী যাওয়া হল না। গঙ্গার তীরে দক্ষিণেশ্বরে মন্দির নির্মাণ করলেন। খরচ হল নয় লাখ টাকা। নবরত্ন বিশিষ্ট কালী মন্দির, উত্তর ভাগে রাধাগোবিন্দ মন্দির, পশ্চিমে গঙ্গার তীর জুড়ে দ্বাদশ শিবের মন্দির। মূর্তিও তৈরী হল। মূর্তি ছিল বাক্সের মধ্যে। দেখা গেল মূর্তি ঘামছে। রাত্রে স্বপ্ন দেখলেন রাণীমা। ভবতারিণী কালী বলছেন, আমাকে আর কতদিন এভাবে কষ্ট দিবি? এবার আমায় মুক্তি দে।’

১২৬১ সালে বারোই জ্যৈষ্ঠ স্নানযাত্রার দিনে মন্দিরে মূর্তি প্রতিষ্ঠা হল। কিন্তু মায়ের অন্নভোগ দেওয়ার কি হবে? মার যে অন্নভোগ দেবার অধিকার তোমার নেই। কারণ তুমি যে জেলের মেয়ে।

দেবীকে ভোগ দেবো, তাতেও জাতবিচার? রানীর হৃদয় ব্যথায় ভরে উঠল। রানীর জামাতা মথুরামমোহন সব কিছু দেখাশুনা করতেন। তিনি নানা দেশের পণ্ডিতদের কাছে। বিধান নিতে ছুটলেন। কিন্তু সব পণ্ডিতেরই এক কথা। অচ্ছুৎ রামকুমারের কাছে। রামকুমার বিধান দিলেন মন্দিরের যাবতীয় সম্পত্তি যদি রানী কোন ব্রাহ্মণকে দান করেন তবেই অন্নভোগ দেওয়া চলতে পারে।

রানী অকূলে যেন কূল পেলেন। তিনি ঠিক করলেন গুরুর নামে মন্দির দান করবেন। কিন্তু গুরুর বংশের কেউ পুরোহিত হয় এ তার কাম্য নয়। কারণ তাঁরা সকলেই অশাস্ত্রজ্ঞ এবং আচারসর্বস্ব। অন্য সৎ ব্রাহ্মণও পাওয়া গেল না। অন্য কেউ মন্দিরের পূজা করতে রাজী হলেন না।

মন্দির প্রতিষ্ঠা-উৎসবের দিন রামকুমার এলেন গদাধরকে সঙ্গে নিয়ে। বিরাট আয়োজন কালীবাড়িতে। যাত্রাগান, কালীকীর্তন, ভাগবত পাঠ। মহা ধূমধাম কাণ্ড। সকাল থেকে চলছে খাওয়া-দাওয়া আহূত কে অনাহূত, কার কি জাত তার খোঁজ-খবরও করে না কেউ।

গদাধর কিন্তু কিছুই খেলেন না। বাজার থেকে মুড়ি কিনে খেয়ে সারাদিন কাটিয়ে দিলেন। রাত্রিবেলা রামকুমার গদাধরকে জিজ্ঞেস করলেন, এখনকার ভোগের প্রসাদ তুই নিলিনে কেন? ব্রাহ্মণের হাতে রাধা মাকে নিবেদন করা ভোগ আমি নিলাম, তুই নিলি না কেন?

গদাধর জবাব দিলেন, এমনি নেইনি।

রামকুমার অবাক হলেন। অথচ এই গদাধরই ছোটবেলায় ধনী কামারনীর কাছ থেকে ভিক্ষা নিয়েছেন। শিয়র গ্রামের রাখালদের সঙ্গে বসে খেয়েছিল। খেয়েছিল ছুতোর বাড়ির বউয়ের হাতে খিচুড়ি রান্না। চিনিবাস শাখারীর হাতে মিষ্টি। আনুড়ে বিশালাক্ষী মায়ের থানে নানা জাতের মেয়েদের দেওয়া পূজার প্রসাদ খেয়েছিল। তখন তো জাতবিচার করেনি। আশ্চর্য!

কারণ জিজ্ঞেস করলে গদাধর জবাব দিলেন, ওরা দিয়েছিল অতি যত্নের বিদুরের খুদ। কিন্তু এ যে হেলায় ফেলায় দেওয়া দুর্যোধনের রাজভোগ।

জবাব শুনে অবাক হয়ে গেলেন রামকুমার। বাঃ, রামায়ণ মহাভারত পড়ে আর টোলের নানা বই ঘাটাঘাটি করে অনেক কিছু তো এ বয়সে গদাধর শিখে ফেলেছে।

রামকুমার বললেন, তা হলে কি করতে বলিস আমাকে? ঝামাপুকুরে ফিরে যাব? রাণীমা যে আমাকে এখানে পুরোহিত করতে চান। সে কাজ তা হলে নেব না?

গদাধর বললেন, কথা যখন দিয়েছ তখন ছাড়বে কেন? আর তোমার টোলও তো প্রায় উঠেই গেছে। তুমি এখানেই থাক।

–তুইকি করবি?

–আমিও থাকবো তোমার কাছে। এখানে খাবো না।

-–এখানকার কিছু না খেতে চাস আমি পয়সা দেবো, বাজার থেকে চাল ডাল কিনে রান্না করে খাস।

গদাধর তাতেই রাজী হলেন।

দিন কাটতে লাগল ভালভাবেই। একদিন ভাগনে হৃদয় সেখানে এসে হাজির হল। গদাধরের প্রায় সমবয়সী। হৃষ্টপুষ্ট চেহারা। বলল, বর্ধমানে গিয়েছিলেন চাকরির খোঁজে। হল না। শুনলাম, তোমরা দু’মামাই আছো দক্ষিণেশ্বরে! তাই চলে এলাম।

রামকুমার বললেন, বেশ, থাক্ এখানে। একটা কিছু হবেই। তুই থাকলে গদাধরেরও সুবিধা হবে।

মথুরবাবু মাঝে মাঝে এসে মন্দিরের কাজ দেখাশুনা করেন। গদাধর কিন্তু ঢুকিয়ে দেবেন মথুরবাবু। পরের দাসত্ব করতে তার ভাল লাগে না।

গদাধর মাটি দিয়ে শিব গড়ে পূজো করেন। নিজেই পূজা করে বাতাসা ভোগ দিয়ে হৃদয়কে প্রসাদ দেন। গদাইয়ের হাতে গড়া শিবমূর্তি একদিন মথুরবাবু দেখতে পেলেন। কি অপূর্ব মূর্তি। গদাধর তখন কাছে ছিলেন না। জিজ্ঞেস করলেন হৃদয়কে, এ মূর্তি কে গড়েছে?

হৃদয় বলল, গদাই মামা।

–আমাকে দিতে পার এ মূর্তি?

–হ্যাঁ। নিয়ে যান। ছোটমামা এরকম মূর্তি অনেক গড়তে পারে।

মথুরামোহন সেই মূর্তি নিয়ে গেলেন জানবাজারের বাড়িতে। রাসমণিকে দেখিয়ে বললেন, দেখুন মা, পুরুত ঠাকুরের ছোটভাই গড়েছে।

রাসমণি বললেন, বাঃ বেশ তো। ওঁকে আমাদের মন্দিরের বিগ্রহের সাজনদার করলে বেশ হয়।

মথুরামোহন বললেন, আচ্ছা, আমি বলে দেখি পুরুত ঠাকুরকে।

পরদিন মথুরামোহন দক্ষিণেশ্বরে এসে রামকুমারকে ব্যাপারটা জানালেন। রামকুমার বললেন, গদাই যা খামখেয়ালী ছেলে। আমার কথা কি শুনবে? আপনি বললে যদি রাজী হয়।

মথুরামোহন তখন ডেকে পাঠালেন গদাধরকে। গদাধর ভয়ে ভয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন মথুরাবাবুর সামনে। মথুরাবাবু বললেন, তুমি ঘুরে ঘুরে বেড়াও কেন? তোমার মনের মতো একটা কাজ দিলে করবে?

–কি কাজ?

–মা ভবতারিণীকে তুমি নিজের মতো করে সাজাবে।

ভয়ে কুঁকড়ে উঠলেন গদাধর। বললেন, একা সাহস হয় না সেজবাবু। ঘরে সব দামী দামী জিনিস। সঙ্গে হৃদয় থাকে তো পারি।

–বেশ তো। সে তোমার সাগরেদ থাকবে। কাজ করবে দু’জনে মিলে। মনের মতো কাজ পেয়ে খুশীই হলেন গদাধর।

জন্মাষ্টমীর পরদিন নন্দোৎসব। রাধা-গোবিন্দের মন্দিরে বিশেষ পূজা ও ভোগ অনুষ্ঠান। সেই বিগ্রহের পূজারী ক্ষেত্ৰনাথ। দুপুরে পূজোর পর পাশের ঘরে শয়ন দিতে নিয়ে যাচ্ছেন রাধা-গোবিন্দকে। হঠাৎ পা পিছনে ক্ষত্ৰনাথ পড়ে গেলেন। হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল গোবিন্দের একটি পা।

মন্দিরে হইচই পড়ে গেল। হায়, একি অঘটন।

রানী রাসমণিকে খবর পাঠানো হল। তিনি মথুরামোহনকে বললেন, পণ্ডিতদের কাছ থেকে বিধি নাও, কি ভাবে ঐ বিগ্রহের পূজা করা হবে?

মথুরামোহন অনেক পণ্ডিতের সঙ্গেই পরামর্শ করলেন। তারা বললেন, ঐ বিগ্রহকে গঙ্গায় বিসর্জন দিতে হবে। তার জায়গায় বসাতে হবে নূতন মূর্তি।

কিন্তু রাণীর মন তাতে সায় দিল না। সে গোবিন্দকে এতদিন গৃহদেবতা রূপে পূজা করা হয়েছে, তাকে বিসর্জন দিতে হবে?

গদাধরের কানে সে কথা যেতেই তিনি বললেন, সে কি কথা। কোন জামাইয়ের যদি ঠ্যাং ভেঙ্গে যায়, তাতে কি ফেলে দিতে হবে, না চিকিৎসা করাতে হবে। গোবিন্দ গৃহদেবতা, নিতান্ত আপন। সেই আপনজনকে ফেলে দেব কেন? আমিই ঠাকুরের পা জোড়া লাগিয়ে দিচ্ছি।

একথা শুনে রাসমণির মনের চিন্তা দূর হয়ে গেল। তিনি বললেন, ছোট ভট্টাচার্য যা বলেছেন তাই ঠিক।

গদাধর মাটি দিয়ে সুন্দরভাবে জুড়ে দিলেন গোবিন্দের পা। বোঝাই গেল না যে পা ভেঙ্গে গিয়েছিল। সেই মূর্তিই সিংহাসনে বসানো হল।

ক্ষেত্ৰনাথ পুরোহিতের কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেলেন। গদাধরকে নিযুক্ত করা হল রাধাগোবিন্দ মন্দিরের পুরোহিত। গদাধর কোন আপত্তি করলেন না। মতিগতি দিন দনি একটু ভাল হচ্ছে তার। নিজেই একদিন বললেন, আমাকে দীক্ষা দাও।

কেনারাম ভট্টাচার্য নামে এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণকে এনে গদাধরকে দীক্ষা দেওয়া হল। তারপর থেকে পূজার দিকে খুব মন দিলেন গদাধর। রামকুমার ভাবলেন, গদাইয়ের হাতে ভবতারিণীর পূজার ভার দিয়ে কিছুদিনের জন্য দেশ থেকে ঘুরে আসি। তাই গদাধরকে শক্তি পূজার ভার দিয়ে কিছুদিনের জন্য দেশ থেকে ঘুরে আসি। তাই গদাধরকে শক্তি পূজার পদ্ধতি শেখাতে লাগলেন।

গদাধর এখন আগের চেয়ে অনেক সংযত ও ধীরস্থির। কিছুদিন পর ভবতারিণীর পূজার ভার গদাইয়ের আর রাধাগোবিন্দের পূজার ভার হৃদয়ের হাতে দিয়ে রামকুমার দেশের দিকে রওনা হয়ে গেলেন। কিন্তু বিধির কি আশ্চর্য লীলা! রামকুমার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছতে পারলেন না। পথেই অসুস্থ হয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। সেখানেই মারা গেলেন।

সে খবর শুনে কি কান্নাই না কেঁদেছিলেন গদাধর।

তারপর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে।

দেশ থেকে ঘুরে এসে ভবতারিণীর পূজায় মন দিয়েছেন গদাধর। কিন্তু পূজার ধরন ধারণ যেন পালটে গেছে অনেক। হৃদয় অবাক হয়ে গেল তার ছোটমামার হাবভাব দেখে। একদিন দেখল গদাধর মায়ের মূর্তির হাত টিপে দেখলেন তারপর ছুটে চলে গেলেন বাইরে। ভূত প্রেত সাপ নেউলের ভয় নেই। পঞ্চবটী বনের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। পরনের কাপড় খুলে গেল, গলার পৈতে লুটোপুটি খেতে লাগল মাটিতে।

আর একদিন দেখল হৃদয়, গদাধর মা কালীর মূর্তির সামনে বসে কাঁদছেন। বলছেন, মা গো রামপ্রসাদকে তুই দেখা দিয়েছিস, আমাকে দেখা দিবি না কেন?

হৃদয় একদিন জিজ্ঞেস করল, মামা, এসব টং করো কেন?

গদাধর জবাব দিলেন, ওসব ঢং নয় রে। মাকে পেতে হলে পাশমুক্ত হতে হবে। অষ্ট পাশ। ক্ষুধা, লজ্জা, কুল, শীল, ভয়, মান, জাত, দম্ভ এসব ছাড়তে হয়।

পঞ্চবটিতে সারারাত পঞ্চমুণ্ডিত আসনে বসে ধ্যান করেন গদাধর। রাত্রি শেষে বেরিয়ে আসেন। পা টলছে মাতালেন মত। মন্দির খুলতে না খুলতেই ঢুকে পড়লেন ভেতরে। বিগ্রহের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, দেখা দিবি না? বেশ, চাই না দেখতে। রাক্ষসী তুই তাই তো রক্ত মেখে মুণ্ডুমালা গলায় রাকিস। আরো খাবি রক্ত?

মন্দিরের দেওয়ালে ঝুলছে বলির খাড়া। সেই খাড়াটি নিয়ে নিজের গলা কাটবার জন্য তুলে ধরলেন। মন্দিরের আঙিনায় তখন ভিড় জমে গেছে। কিন্তু কেউ হঠাৎ প্রতিমার পায়ের কাছে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ে গেলেন গদাধর। ধরাধরি করে অচেতন গদাধরকে নিয়ে যাওয়া হল তার ঘরে। পরের দিনও নয়। সময় সময় একটু জ্ঞান হয় আর কি যেন বিড় বিড় করে বলেন। আবার জ্ঞান হারিয়ে যায়।

মথুরাবাবু আর রাসমণি দেখতে এলেন। রাণী শিয়রে বসলেন হাতে পাখা নিয়ে। মুখে চিন্তার রেখা। আহা, কি হবে বাছাধনের। ঘুমের ঘোরেই গদাধর বলেন, মা এলি! মাগো!

উথলে ওঠে রাসমণির মাতৃস্নেহ। অচেতন গদাধরের মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিয়ে বলেন, এই যে বাবা আমি। গদাধর মুখ তুলে তাকান। দেখেন শিয়রে রানী রাসমণি! প্রকৃতিময়ী মাতৃমূর্তি!

একদিন পূজায় বসেছেন গদাধর। প্রতিমার পায়ে পুপুঞ্জলি দিতে গিয়ে ফুলবেলপাতা নিজের মাথায় দিয়ে বসলেন। হেসে উঠলেন হিহি করে। মূর্তির দিকে তাকিয়ে দেখলেন গদাধর। মূর্তি কোথায়? সশরীরে জগজ্জননী বসে আছেন। সামনে সাজানো ভোগ খাচ্ছেন বসে বসে।

একদিন দেরি হয়ে গেল পূজা করতে। ভোগের থালা থেকে এক মুঠো অন্ন তুলে ধরলেন গদাধর প্রতিমার সামনে। বললেন, নে নে, খা। খিদে পেয়েছে বুঝিখুব?

মন্দিরের একটু দূরেই যে পঞ্চবটী, সেখানে আমলকী গাছের তলায় আসন পাতলের গদাধর। নিরিবিলি, বসে মায়ের ধ্যান করবেন।

কিন্তু গরু ছাগলে বড় উৎপাত করে। গাছগাছালি খেয়ে ফেলে। তাই গদাধর বাগানের মালী হরিকে বললেন, জায়গাটা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে দে না একটু।

হরি বলল, অনেক বাঁশ দড়ি পেরেক লাগবে যে। পাব কোথায়? গদাধর বললেন, তা হলে থাক।

কিন্তু সেদিনই কিছুক্ষণ পরে বান এলো গঙ্গায়। মন্দিরের ঘাটে কোত্থেকে বানের জলে বাঁশ কাঠ দড়ি ভেসে এলো।

বেড়া দেওয়ার সমস্যা মিটে গেল। কিন্তু নালিশ এলো রানী ও মথুরামোহনের কাছে। ছোট পুরুতঠাকুর অনেক রকম পাগলামী করছে। পঞ্চবটীতেও জায়গা দখল করার মতলব আঁটছে।

রানীমা ও মধুরামোহন দু’জনেই এলেন তদন্ত করতে। গোমস্তারা বলল ছোট ভট্টাচার্যকে না তাড়ালে মন্দিরের সুনাম নষ্ট হয়ে যাবে। রানী সবার কথা শুনলেন, শুনলেন জলে ভেসে আসা কাঠ, বাঁশ দড়ির কথা। বললেন, বেশ আসি সব দেখছি।

সেদিন দক্ষিণেশ্বরেই রইলেন রানী। দুপুরের পূজার পর মন্দিরে এলেন। গদাধরকে বললেন, একটু মায়ের নাম শোনাও বাবা।

গদাধর গান ধরলেন। চোখ বুজে শুনতে লাগলেন রানী। হঠাৎ এক সময় রানীর গালে এক চর বসিয়ে দিলেন। ধমক দিয়ে বললেন, এখানেও বিত্ত বিষয় নিয়ে ভাবনা।

চারদিক থেকে হইহই করে উঠল রানীর দাসীরা, খাসাঞ্চী, গোমস্তারা। তুমি একি করলে পুরুত ঠাকুর? গদাধর বললেন, আমি কি করব? মা যা করান আমি তাই করি।

মথুরামোহন ছুটে এসে বললেন, না, আর সহ্য করা যায় না। রানীমা বললেন, আমারই দোষ, আমি মন্দিরে বসে হাইকোর্টের মামলার কথা ভাবছিলুম। ওর হাত দিয়ে মা শাসন করেছেন আমাকে।

সবাই অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল।

পরদিন চলে গেলেন রাণীমা ও মথুরামোহন। বলে গেলেন, যতদিন ছোট ভট্টাচার্য স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না আসেন ততদিন অন্য পুরোহিত পূজা করবেন। তার ওপর যেন কোন চাপ না দেওয়া হয়।

ছ’বছর পরে কামারপুকুরে ফিরে এলেন গদাধর। মা চন্দ্রমণির বয়স ষাটের ওপর। মাকে শিশুর মতো জড়িয়ে ধরল। কে বলবে গদাধর এখন চব্বিশ বছরের যুবক। তিনি যেন এখনো সেই চঞ্চল বালক।

সিয়রে হৃদয়ের বাড়িতে গেলেন গদাধর। সেদিন সেখানে গানের আসর বসেছিল। একটি স্ত্রীলোকের কোলে ছিল একটি ফুটফুটে মেয়ে। টুলটুল করে তাকিয়ে চারদিক দেখছিল। স্ত্রীলোকটি রহস্য করে জিজ্ঞেস করল মেয়েটিকে, বিয়ে করবি? মেয়েটি ঘাড় নাড়ল? কাকে বিয়ে করবি এত লোকের মধ্যে? মেয়েটি গদাধরকে দেখিয়ে বলল, ঐ যে!

মেয়েটি জয়রামবাটির রামচন্দ্র মুখুজ্যের মেয়ে সারদামণি। একদিন শুভলগে গদাধরের সঙ্গে ওরই বিয়ে হল। প্রায় দু’বছর কামারপুকুরে থাকার পর দক্ষিণেশ্বরে ফিরলেন। মা কালীর পূজার ভার আবার তারই ওপর পড়ল।

রানী রাসমণির অসুখ। হঠাৎ একদিন পড়ে গিয়ে কোমরে ব্যথা পেলেন। শয্যাশায়ী হলে একেবারে।

মনে শান্তি নেই রাসমণির। দক্ষিণেশ্বরের পূজোর খরচ চালানোর জন্য দু’লাখ চব্বিশ হাজার টাকায় জমিদারি কিনেছেন। কিন্তু সেই সম্পত্তি এখনো দেবোত্তর করেননি। তাঁর চার মেয়ের মধ্যে দু’মেয়ে শুধু বেঁচে আছে। সেই দুই মেয়ে সই করে দিলেই সব গোল চুকে যায়। কিন্তু বড় মেয়ে পদ্মমণি কিছুতেই সই দিল না। রাণী ভাবনায় পড়লেন। হঠাৎ যেন দেখলেন, গদাধর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন, নাই বা সই করল, মেয়ে কি মায়ের সঙ্গে মামলায় জিততে পারবে?

অভয় পেলেন রাসমনি। আঠারোশো একষট্টি সালের আঠারোই ফেব্রুয়ারি সেই সম্পত্তির দানপত্র রেজিষ্ট্রি হয়ে গেল।

পরের দিন রাসমণি বললেন, আমাকে কালীঘাটে নিয়ে চল। সেখানেই মায়ের কাছে শেষ নিঃশ্বাস ফেলব।

বিছানা সাজিয়ে মৃত্যুপথযাত্রী রানীর দেহ আনা হল আদিগঙ্গার তীরে। অমাবস্যার অন্ধকার রাতে রানীর পুণ্যাত্মা দেহ ছেড়ে চলে গেল। দক্ষিণেশ্বরে ঘরের বারান্দায় অস্থির ভাবে পায়চারি করেছিলেন গদাধর। হঠাৎ বলে উঠলেন, চলে গেল রে, চলে গেল রাসমণি। মায়ের অষ্টনায়িকার এক নায়িকা।

একদিন সকালবেলা বাগানে ফুল তুলছেন গদাধর। এমন সময় বকুলতলার ঘাটে একটি নৌকা এসে ভিড়ল। এক সুন্দরী স্ত্রীলোক নামলেন নৌকা থেকে। পরনে গেরুয়া শাড়ি, হাতে ত্রিশূল। বয়স হয়েছে ভৈরবীর। কিন্তু কী রূপের ছটা। গদাধরকে বললেন, এই যে বাবা, তুমি এখানে। জানি তুমি গঙ্গাতীরে আছ। তাই তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।

শুনে গদাধর অবাক। তুমি আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছ মা?

মা মহামায়াই পাঠিয়ে দিলেন।

পঞ্চবটীতে ভৈরবীর থাকবার ব্যবস্থা হল। তিনি সেখানে থাকেন। তার ঝোলায় আছে তন্ত্রশাস্ত্র, গীতা, ভাগবত। গদাধরকে পড়ে শোনান। নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞান ভৈরবীর। কিন্তু নানা লোকের মনে নানা রকম সন্দেহ। সুন্দরীর ভৈরবী কি রম্ভা মেনকার মত গদাধরের মনের পরিবর্তন ঘটাতে এসেছেন?

কিন্তু কিছুদিন পরেই দেখা গেল, ভৈরবী এসেছেন গদাধরের প্রকৃত রূপ উদঘাটনের জন্য। তিনি বললেন, গদাধর মানব দেহধারী শ্রীরামচন্দ্র। তান্ত্রিক মতে শক্তি-দীক্ষা তিনি দিলেন গদাধরকে।

একদিন মড়ার মাথার খুলিতে মাছ বেঁধে ভোগ সাজালেন। কালীকে নিবেদন করে গদাধরকে বললেন, প্রসাদ নাও। গদাধর নির্বিবাদে প্রসাদ গ্রহণ করলেন।

ভৈরবী বললেন, এবার বৈষ্ণবমতে সাধনা কর বাবা। চারটি বেদ, আঠারোটি পুরাণ, চৌষট্টি তন্ত্রে যে রাস মেলে না, তাই মেলে না, তাই মেলে বৈষ্ণব মতে সাধনায়।

গদাধর রাজী হলেন। কী অপূর্ব যোগাযোগ! সেই সময়ে এলেন বেদান্তপন্থী অদ্বৈতবাদী সন্ন্যাসী পরমহংদেবের দল। তাঁদের সঙ্গে করেন শাস্ত্র আলোচনা। অতি সহজভাবে গভীর তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করলেন। সাধুরা খুশী হলে আশীর্বাদ করে গদাধরকে বললেন, তুমি ধর্মের সারমর্ম বুঝেছ। তুমি পরমহংস।

কিছুদিন পর এলেন সন্ন্যাসী তোতাপুরী। পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় তার মঠ। চল্লিশ বছর সাধনা করেছেন। বেরিয়েছেন তীর্থ দর্শনে। তাঁকে দেখে গদাধর ভক্তিভরে প্রণাম করলেন। যেন কতকালের পরিচিত। গদাধর বললেন, আমাকে দীক্ষা দিন।

তোতাপুরী বললেন, দিতে রাজী আছি, কিন্তু তোমাকে গৈরিক বস্ত্র পরতে হবে। গদাধর বললেন, গৈরিক পরতে পারব না। ছোটবেলাতেই মায়ের কাছে কথা দিয়েছি। সন্ন্যাসী না সেজেও আমি সন্ন্যাস নেব।

তোতাপুরী ভাবলেন, মনে যার রং ধরেছে, তার দেবহারণের রং বিচার করে লাভ নেই। তাই তিনি গদাধরকে দীক্ষা দিলেন। বললেন, আজ তোমার নতুন জন্মলাভ হল। তোমার নাম এখন হবে রামকৃষ্ণ আর পদবী হবে পরমহংস। পরমহংস কাকে বলে জান তো? দুধে জলে এক সঙ্গে থাকলেও যিনি হাসের মত জলটি ছেড়ে দুধটি নিতে পারেন, তিনিই পরমহংস।

তোতাপুরী বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। কদিন পরেই এলেন গোবিন্দ রায়। জাতে ক্ষত্রিয়। কিন্তু মুসলমান হয়েছেন। আরবী ফারসীতে পণ্ডিত। রামকৃষ্ণ তাকে বললেন, আমি মুসলমান ধর্মমতে সাধন ভজন করব। কত মানুষ কত পথে সাধনা করে বাঞ্ছিত ধামে গিয়ে পৌঁছায়। আমি এই পথটাকে বাদ দেব কেন?

গোবিন্দ রায় দীক্ষা দিলেন রামকৃষ্ণকে। কাছা খুলে ফেললেন। কাপড় পরলেন লুঙ্গির মত করে। পাঁচ বেলা নামাজ পড়তে লাগলেন। একদিন মুসলমানদের রান্নার মত রান্না করিয়ে খেলেন।

একদিন ভাবাবিষ্ট অবস্থায় রামকৃষ্ণ দেখলেন গৌরবর্ণ সুপুরুষ যীশুখ্রীস্ট এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছেন। যীশুর ভজনা করতে করতে তিনি সমাধিস্থ হয়ে গেলেন।

মা চন্দ্রমণিও ছেলে গদাধরকে দেখবার জন্য দক্ষিণেশ্বরে এলন। তিনি নহবতের ঘরে থাকেন। ছেলের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়। কিছুদিন পর স্ত্রী সারদামণিরও এসে হাজির হলেন। রামকৃষ্ণ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি গো, তুমি কি আমাকে সংসার পথে টেনে নিতে এসেছ?

সারদা জবাব দিলেন, না। তোমার ইষ্টপথে সাহায্য করার জন্যই আমি এসেছি।

ঠাকুর রামকৃষ্ণের শিক্ষায় শ্রীমতী সারদা সুনিপুণা হতে লাগলেন। প্রকাশ পেতে লাগলেন জগতের মঙ্গলসাধিকা শক্তিরূপে।

চন্দ্রমণির বয়স অনেক হয়েছিল। শেষ বয়সে ছেলেকে দেখবার আকাঙ্খা হয়েছিল ভিষণ 1 সে আশা তাঁর পুরণ হল। একদিন দক্ষিণেশ্বরেই রোগশয্যায় পুত্রকে শিয়রে রেখে মা চোখ বুজলেন।

রামকৃষ্ণ স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। দক্ষিণেশ্বরও হয়ে উঠেছে তীর্থভূমি। সেখানে মাঝে মাঝেই এসে উপস্থিত হন কত সাধুপুরুষ, কত গুণী জ্ঞানী। বিখ্যাত মানুষ। তিনিও মাঝে মাঝে বিখ্যাত মানুষদের বাড়ি যান। একদিন গেলেন মহষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি। খ্রীষ্টধর্মের বন্যায় যখন দেশটা ডুবে যাবার উপক্রম হয়েছিল। তখন ব্রাহ্মণধর্মের জীবন তরণী ভাসিয়ে বহু মানুষকে উদ্ধার করেছেন। দেবেন্দ্রনাথকে রামকৃষ্ণ বললেন, তুমি তো পাকা খেলোয়াড় হে। একসঙ্গে দু’খানা তলোয়ার ঘোরাও, একটি কর্মের আর একটি জ্ঞানের।

ব্রাহ্মণধর্মের অন্যতম প্রবর্তক কেশবচন্দ্র সেনের বাড়িও গেলেন একদিন। সেখানে গিয়ে গান করতে করতে রামকৃষ্ণ সমাধিস্থ হয়ে পড়লেন। আর একদিন গেলেন বিদ্যাসাগরের বাড়িতে। বললেন, এতদিন খাল বিল দেখেছি, এবার সাগর দেখলুম। বিদ্যাসাগর হেসে বললেন, তবে নোনা জল খানিকটা নিয়ে যান। রামকৃষ্ণ বললেন, না গো! নোনা জল কেন? তুমি যে বিদ্যার সাগর, ক্ষীরসমুদ্র।

নরেন্দ্রনাথ নিজেই এসেছিলেন রামকৃষ্ণের কাছে। বিখ্যাত দত্ত বাড়ির ছেলে, শিক্ষিত তরুণ। রামকৃষ্ণের প্রভাবে তিনি হয়ে গেলেন স্বামী বিবেকানন্দ।

ঠাকুর রামকৃষ্ণ শুধু সাধকই নন, তিনি যে প্রেমাবতার। প্রেম বিলাতে বিলাতে তিনি মানুষের মনের কলুষকে দূর করতে লাগলেন, মানুষের মনের পাপ হরণ করতে গিয়ে নিজেই হলেন নীলকণ্ঠ।

গলায় তাঁর ক্ষতরোগ হল। ক্যান্সার। চিকিৎসার জন্য তাকে চিকিৎসকের নির্দেশে শিষ্যদের এবং সাধারণ মানুষের তাঁর কাছে যেতে মানা। কিন্তু প্রেমের ঠাকুর রামকৃষ্ণ সেই নিষেধ উপেক্ষা করে কল্পতরু উৎসবের অনুষ্ঠান করলেন। সর্বধর্মের সকল শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মিশে হৃদয়ের প্রেম নিঃশেষে বিতরণ করতে লাগলেন।

ইংরেজি ১৮৮৬ সাল, বাংলা ১২৯৩ সালের ১লা ভাদ্র মহাসমাধিতে নিমগ হলেন যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ।

২৩. শ্রীচৈতন্য (১৪৮৬-১৫৩৩)

মধ্যযুগে মুসলমানরাই ছিলেন এ দেশের শাসক। ইসলাম ছিল রাজধর্ম। ইসলাম ধর্ম ছিল উন্মুক্ত। ধর্মের মধ্যে উঁচু-নিচু ভেদাভেদ, জাতিভেদ ছিল না। মসজিদে ছিল সকলের প্রবেশাধিকার। মক্তব-মাদ্রাসায় যে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত।

অপরদিকে হিন্দুসমাজ ছিল একেবারে বিপরীত। ধর্মের এক অচলায়তন। জাতিবেদ আর সংকীর্ণ গোঁড়ামিতে সমস্ত সমাজ শতবিভক্ত। শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব, সৌর, ব্রাহ্মণ সকলেই অন্যের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত। পরস্পরের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ আর ঘৃণা। মন্দির, পূজামণ্ডপের দ্বার শুধু মাত্র উচ্চবর্ণের মানুষদের জন্যেই উন্মুক্ত। সমাজের নিম্নশ্রেণীর মানুষের কোন স্থান নেই সেখানে।

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনে কোন সুখ ছিল না, শান্তি ছিল না। হিন্দুদের উপর চলত সুলতানী সৈন্যদের অত্যাচার। লুঠতরাজ ছিল সাধারণ ঘটনা। সুন্দরী মেয়েদের উপর ছিল না তার। সমাজ তাকে রক্ষা করত না শাস্তি দিতে দ্বিধা করত না।

জীবনের সর্বস্তরে ছিল হাজার ছাত্মার্গের বেড়াজাল। ব্রাহ্মণদের জন্যেই শুধু ছিল শিখার সুযোগ। তাদের প্রবল প্রতাপে অতিষ্ঠ হয়ে সমাজের নিম্ন শ্রেণীর মানুষ দলে দলে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। হিন্দু সমাজের এই সর্বনাশা অবক্ষয়ের যুগে শ্রীচৈতন্যর আবির্ভাব।

১৪৮৬ খৃস্টাব্দের ১৯ শে ফেব্রুয়ারি। বাংলা ফাল্গুন মাসের দোলপূর্ণিমা। সেদিন ছিল চন্দ্রগ্রহণ। নবদ্বীপের মায়াপুর পল্লীতে নিমাইয়ের জন্ম হল। পিতা জগন্নাথ মিশ্র, মাতা শচীনদেবী। সেই সময় দাদা বিশ্বরূপের বয়স ছিল দশ। ছেলেবেলা থেকেই বিশ্বরূপ ছিলেন শান্ত, সংসারের প্রতি উদাসীন। মাত্র ষোল বছর বয়েসে সংসারের সব বন্ধন ছিন্ন করে সন্ন্যাস নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। আর তাঁর কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি।

জ্যেষ্ঠপুত্রের এই বিচ্ছেদ ব্যথা কিছুতেই ভুলতে পারেন না জগন্নাথ মিশ্র। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি মারা গেলেন। বালক পুত্রকে নিয়ে সংসারের সব ভার নিজের কাঁধে তুলে নিলেন শচী দেবী।

বালক নিমাই ভর্তি হলেন গঙ্গাদাস পণ্ডিতের চতুম্পাঠীতে। যেমন মেধাবী তেমনি চঞ্চল। কৈশোর উত্তীর্ণ হতেই হয়ে উঠলেন। নানা শাস্ত্রে সুপণ্ডিত। কিন্তু যেমন তার্কিক তেমনি অহংকারী। কূট প্রশ্ন তুলে মানুষকে বিব্রত করতে আনন্দ পেতেন।

সংসারে অভাব অনটন, তাই নিজেই টোল স্থাপন করলেন নিমাই পণ্ডিত। তার খ্যাতি আর পাণ্ডিত্যের আকর্ষণে অল্প দিনেই টোল ভরে উঠল। পুত্রকে উপার্জনক্ষম দেখে শচীমাতা লক্ষ্মী নামে সুলক্ষণা এক কন্যার সাথে তার বিবাহ দিলেন।

এই সময় কেশব নামে কাশ্মীরের এক পণ্ডিত বিভিন্ন স্থানের পণ্ডিতদের তর্কযুদ্ধে পরাজিত করে নবদ্বীপে এলেন। তার পাণ্ডিত্যের কথা শুনে স্থানীয় কোন পণ্ডিতই তার সাথে বিচারে অবতীর্ণ হতে সাহসী হলেন না। অবশেষে কেবশ নিমাই পণ্ডিতের দর্শন পেয়ে তাঁকেই বিচারে আহ্বান করলেন। কেশব মুখে মুখে গঙ্গার স্তব রচনা করলেন। সকলে মুগ্ধ। কিন্তু নিমাই প্রতিটি শ্লোকের অশুদ্ধি আর অপপ্রয়োগ নির্ণয় করে কেশবকে পরাজিত করলেন। নিমাইয়ের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

কিছুদিনের জন্য পূর্ববঙ্গ ভ্রমণে গেলেন নিমাই। সেখানে যথেষ্ট খ্যাতি সম্মান অর্থ পেলেন। নবদ্বীপে ফিরে এসে এক বেদানাদায়ক সংবাদ পেলেন। স্ত্রী লক্ষ্মী সাপের কামড়ে মারা গিয়েছে। শোকের আবেগটা স্তিমিত হয়ে আসতেই শচীদেবী পুনরায় নিমাইয়ের বিবাহের ব্যবস্থা করলেন। কন্যার নাম বিষ্ণুপ্রিয়া। সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পিতা জগন্নাথ মিশ্র বহুদিন মারা গিয়েছেন। তাঁর পিণ্ডদান করতে গয়ায় গেলেন নিমাই। সেখানে বিষ্ণুপাদপদ্ম দেখে তার মধ্যে জেগে উঠল এক পরিবর্তন। চঞ্চল উদ্ধত অহংকারী নিমাই চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন। তার মধ্যে জন্ম নিল কৃষ্ণ অনুরাগী এক প্রেমিক সাধক। দিন রাত শুধু কৃষ্ণের বিরহে ব্যাকুল। যা কিছু দেখেন তাকেই কৃষ্ণ বলে আলিঙ্গন করেন। তার এই আকুলতা দেখে সকলে বিস্মিত। এতো পরম সাধকের লক্ষণ।

টোলে অধ্যাপনায় আর কোন আগ্রহ নেই। সামনে খোলা পুথি পড়ে থাকে। ছাত্ররা কলরব করতে থাকে। নিমাই তাদের নিয়ে নামকীর্তন আরম্ভ করেন। এক এক সময় ভাবে বিভোর হয়ে যান। বাহ্য জ্ঞান থাকে না। তার এই অপ্রকৃতিস্থ ভাব দেখে শচীদেবী, বিষ্ণুপ্রিয়া ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।

সেই সময় বৈষ্ণবদের সমাজে তেমন কোন প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল না। সংখ্যাতেও তারা ছিল নগণ্য। নিমাইকে পেয়ে বৈষ্ণব সমাজের বুকে যেন প্রাণের জোয়ার বয়ে যায়।

অদ্বৈত আচার্য ছিলেন বৈষ্ণব সমাজের প্রধান। জ্ঞান ভক্তিতে তার কোন তুলনা ছিল না। নিমাইকে দেখা মাত্রই তার মনে হল মানব যেন তার আরাধ্য দেবতার আবির্ভাব ঘটেছে। এতদিন তিনি যেন এই মানুষটিরই প্রতীক্ষা করছিলেন। বৃদ্ধ দ্বৈত পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে নিমাইকে বরণ করে নিলেন। সমস্ত বৈষ্ণব সমাজ তাকে নেতা হিসেবে স্বীকার করে নিল।

একদিন নগর কীর্তন করতে করতে নিমাই এসে পড়লেন নন্দন আচার্যের গৃহে। সেখানে ছিলেন সুদর্শন এক অবধূত। বয়সে, তরুণ, মুখে স্নিগ্ধ ভাব, নাম নিত্যানন্দ। নিত্যানন্দের জন্ম রাঢ় অঞ্চলের একচাকা গ্রামে। বাবার নাম হাড়াই ওঝা। মায়ের নাম পদ্মাবতী। এঁরা ছিলেন রাঢ়ীয় শ্রেণীর ব্রাহ্মণনি বৃন্দাবন থেকে বিভিন্ন অঞ্চল পরিভ্রমণ করতে করতে এলেন নবদ্বীপে। নিমাইয়ের দর্শন পেতেই আকৃষ্ট হলেন তাঁর প্রতি। তিনি হয়ে উঠলেন নিমাইয়ের প্রধান পার্ষদ।

শ্রীবাসের গৃহপ্রাঙ্গণে চলে নিত্যদিন নামগান আর কীর্তন। সেখানেই শুধুমাত্র গৃহপ্রাঙ্গণে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, তাকে ছড়িয়ে দিতে হবে সর্ব মানুষের দ্বারে দ্বারে। তিনি নামগান করার ভার দিলেন তার দুই প্রধান ভক্ত নিত্যানন্দ আর যবন হরিদাসকে। একজন হিন্দু অন্যজন মুসলমান। সেই যুগে এ এক দুঃসাহসিক কাজ। সমস্ত ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে একজন মুসলমানকে দিয়ে বৈষ্ণবধর্মের প্রচার-মধ্যযুগে এ ছিল কল্পনীয়।

নগরের পথে পথে ঘুরে ঘুরে তারা কীর্তন করতনে। অনেকে ভাবরসে আপ্লুত হয়ে তাদের সঙ্গী হত। অনেকে বিদ্রূপ করত, উপহাস করত। বিশেষত ব্রাহ্মণ সমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে থাকে। নীচ ধর্মের মানুষেরা যদি এভাবে অপর সকলের সাথে সমমর্যাদা পায় তবে যে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি রসাতলে যাবে। জগাই আর মধ্যেই নামে দুই পাপাচারী ব্রাহ্মণ, যারা সকল পাপকর্মে সিদ্ধ, তারেদ প্ররোচিত করে। একদিন নগরের পথে নামগান করছেন নিমাই আর নিত্যানন্দ। মদ্যপ অবস্থায় দুই ভাই নামকীর্তন বন্ধ করার জন্য চিৎকার করে ওঠে। আত্মহারা নিমাইয়ের কোন কথাই কানে যায় না। রাগেতে মাধাই কলসীর ভাঙা টুকরো তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারে। নিত্যানন্দের মাথায় এসে আঘাত লাগে। অঝোরে রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ে। সেই দৃশ্য দেখে ক্রদ্ধ হয়ে ওঠেন নিমাই। তার সেই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে বহু কষ্টে শান্ত করান নিত্যানন্দ। দুই ভাই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অনুতাপে লজ্জায় শিষ্যত্ব গ্রহন করেন নিমাইয়ের। জয় হয় প্রেমধর্মের।

এই ঘটনা নবদ্বীপের মানুষের মনে বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। চারদিকে বেড়ে চলে সমবেত কীর্তন আর নামগান। তখন বাংলার সুলতান ছিলেন হোসেন শাহ। বৈষ্ণবদের এই ক্রমবর্ধমান শক্তিকে ভাল চোখে দেখলেন না। তাছাড়া কিছু গোড়া মুসলমানও এর বিরুদ্ধে নালিশ জানাল। চাঁদ কাজী প্রকাশ্য পথে সমবেত কীর্তন বন্ধ করার হুকুম দিলেন।

ভক্তমণ্ডলী ভীত হয়ে পড়ল। কিন্তু শ্রীগৌরাঙ্গ আদেশ দিলেন সন্ধ্যাবেলায় নগরের পথে কীর্তন হবে। শুদু বৈষ্ণবরা নয়, সাধারণ মানুষও দলে দলে যোগ দিল সেইনগর কীর্তনে। প্রকৃত পক্ষে সেদিন নিমাই যে জনজাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন, ইতিহাসে তা বিরল। তাঁর এই শক্তির উৎস ছিল জনগণের সাথে প্রত্যক্ষ সংযোগ। তিনি ধর্ম বর্ণ বৈষম্য মুছে ফেলে সকল মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে উঠেছিলেন। তাই মানুষ তার ডাকে অমন করে সাড়া দিয়েছিল।

নিমাইয়ের ডাকে বার হতেই সস্নেহে নিমাই তার সাথে কথা বললেন। নিমাইয়ের মধুর সম্বোধন, তার আন্তরিকতা, অকৃত্রিম ভালবাসায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন কাজী। হরিনাম সংকীর্তনের উপর থেকে সব বাধানিষেধ তুলে নিলেন। প্রকৃতপক্ষে নিমাই তার প্রেমের শক্তিতে মুসলমান শাসকের কাছ থেকে অবাধ ধর্মাচরণের স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন।

গয়াধাম থেকে প্রত্যাবর্তন করার পর এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নিমাইয়ের জনপ্রিয়তা শুধু বৃদ্ধি পায়নি, তার অনুগামী বৈষ্ণবদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করতে পারছিলেন শুধু নবদ্বীপ নয়, তাঁর কর্মক্ষেত্রকে ছড়িয়ে দিতে হবে আরো বৃহৎ জগতের মাঝখানে।

তার এই ইচ্ছার কথা প্রকাশ করলেন নিত্যানন্দ ও আরো কয়েকজন অন্তরঙ্গ পার্ষদের কাছে। জননী শচীদেবীর কাছেও প্রকাশ করলেন নিজের মনের ইচ্ছা। কিন্তু কোন্ মা তাঁর পুত্রকে সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দেয়?

১৫১০ খ্রীস্টাব্দে ২৬ মাঘ গভীর রাত্রে গৃহত্যাগ করলেন নিমাই। সকলে গভীর ঘুমে অচেতন। নিমাই গঙ্গা পার হয়ে অপর পারে কাটোয়ায় গেলেন। সেখানে ছিলেন কেশব ভারতী। তার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে সন্ন্যাস নিলেন। তার নতুন নাম হল শ্রীচৈতন্য।

শ্রীচৈতন্যের লক্ষ্য নীলাচল। তার অনুগামী ভক্তরা দলে দলে এসে হাজির হয় কাটোয়ায়। প্রভুর বিরহ তারা কেমন করে সহ্য করবে! সকলের অনুরোধে শান্তিপুরে শ্রীঅদ্বৈতের গৃহে কয়েকদিনের জন্য রয়ে গেলেন। শচীদেবী এসে পুত্রের সাথে দেখা করলেন। সকলের কাছে বিদায় নিয়ে শ্রীচৈতন্য এবার যাত্রা করলেন উড়িষ্যায় পথে। নীলাচলে প্রভু জগন্নাথের দর্শন পাবার জন্যে তার সমস্ত মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল।

উড়িষ্যা যাত্রা পথে তার সঙ্গী অল্প কয়েকজন ভক্তশিষ্য আর অনুগামী। জগন্নাথের মন্দিরে প্রবেশ করতেই ভাবে বিহল চৈতন্যদেব জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। প্রহরীরা বাধা দিতে ছুটে এল। সেই সময়ে সেখানে এসেছিলেন উকলরাজ প্রতাপরুদ্রের গুরু মহাপণ্ডিত বাসুদেব সার্বভৌম। তিনি শ্রীচৈতন্যের অপরূপ দেহলাবণ্য প্রেমবিহল ভাব দেখে তাকে নিজের গৃহে নিয়ে গেলেন।

বাসুদেব সার্বভৌম শুধু যে উৎকলের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈদান্তিক। তার এই আত্মসমর্পণ শুধু যে উড়িষ্যায় আলোড়ন তুলল তাই নয়, সমস্ত দেশের পণ্ডিতরা বিস্মিত হল। মাত্র ২৪ বছরের এক তরুণ কোথা থেকে পেল এমন ঐশীশক্তি যার বলে বাসুদেব সার্বভৌমের মত মানুষ নিজের সব সত্তা বিসর্জন দিয়ে শ্রীচৈতন্যের পাদপদ্মে নিজেকে সমর্পণ করেছেন। অল্প দিনের মধ্যেই নীলাচলের মানুষ প্রভুর প্রেমের জোয়ারে ভেসে গেল।

কিছুদিন পর শ্রীচৈতন্য স্থির করলেন দক্ষিণ ভারতে যাবেন। সেখানকার সব তীর্থ : দর্শন করবেন। কোন সঙ্গী নেই সাথী নেই, একাই রওনা হলেন।

বিদ্যানগরের শাসক ছিলেন রামানন্দ রায়। উত্তল রাজ্যের প্রতিনিধি পরম ধার্মিক বৈষ্ণব। শ্রীচৈতন্যকে দেখামাত্রই ভাবে আবিষ্ট হয়ে গেলেন রামানন্দ রায়। মনে হল শ্রীচৈতন্যই তার ধ্যানের দেবতা। রামানন্দ রায়ের অনুরোধে সেখানে কয়েক দিনের জন্য রয়ে গেলেন শ্রীচৈতন্য।

দশ দিন পর আবার শ্রীচৈতন্য যাত্রী করলেন দক্ষিণের পথে। একের পর এক তীর্থ দর্শন করতে থাকেন। গেলেন শ্রীরঙ্গক্ষেত্রে, রামেশ্বর, ত্রিবাঙ্কর, আরো বহু স্থান। যেখানেই যান সেখানেই কৃষ্ণনামের জোয়ার বয়ে যায়। শ্রীচৈতন্যের এই দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ ঐতিহাসিক দিক থেকেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে প্রেমধর্মের প্রচার করেছিলেন তা দীর্ঘদিন স্থায়ী ছিল।

প্রায় দু বছর দাক্ষিণাত্য ভ্রমণ করে আবার নীলাচলে ফিরে এলেন শ্রীচৈতন্য। তার বিরহে ভক্ত শিষ্যরা সকলেই ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। শ্রীচৈতন্যকে ফিরে পেয়ে সমস্ত নীলাচল যেন উৎসব নগরী হয়ে উঠে।

যে সব ভক্ত শিষ্যরা যারা নবদ্বীপ ছেড়ে প্রভুর সাথে নীলাচলে এসেছিল, দীর্ঘ দিন পরবাসে থেকে সকলেরই মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। শ্রীচৈতন্য ও উপলব্ধি করেছিলেন। তাছাড়া তার অবর্তমানে বাংলায় বৈষ্ণব ধর্মের প্রচারের জন্য উপযুক্ত মানুষের প্রয়োজন। সে কাজের ভার তুলে দিলেন নিত্যানন্দের উপর। শুধু তাই নয়, তিনি বললেন সংসারী হয়ে তুমি গৃহী মানুষের মধ্যে বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার কর।

নিত্যানন্দ ছিলেন ব্রাহ্মচারী ও অবধূত। শ্রীচৈতন্যের চেয়ে প্রায় আট বছরের বড়। তবুও শ্রীচৈতন্য গভীর অন্তদৃষ্টি দিয়ে অনুভব করেছিলেন সংসারের প্রতি নিত্যানন্দের আকর্ষণ রয়েছে। তাই তাকে সংসার জীবন গ্রহণ করতে অনুরোধ করেছিলেন। বাংলায় ফিরে এসে নিত্যানন্দ জাহ্নরী দেবী নামে এক মহিলাকে বিবাহ করেন। জাহ্নরী দেবী ছিলেন শাস্ত্রজ্ঞ ধার্মিক। তিনি খেতুড়ি মহোৎসবের সময়ে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন এবং বহু ভক্ত তার কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।

গৌড় ত্যাগ করবার পর চার বছর অতিক্রান্ত হয় প্রতি বছর নবদ্বীপ শান্তিপুর থেকে ভক্তরা আসত তাকে দর্শন করবার জন্য।

১৫১৪ সালে বিজয়া দশমীর দিন নীলাচল ত্যাগ করে যাত্রা করলেন নবদ্বীপের পথে। প্রথমে এলেন কটকে। স্থানীয় মুসলমান শাসকরাও তার প্রেমগানে এতখানি মুগ্ধ হয়েছিলেন যে নদী পার করে গৌড়ে পৌঁছবার সকল ব্যবস্থা করে দিলেন।

শ্রীচৈতন্য এলেন কুমারহট্ট গ্রামে শ্রীবাসের গৃহে। তারপর শান্তিপুর হয়ে এলেন নবদ্বীপে। তার শৈশব কৈশোর যৌবনের কিছু অংশের লীলাভূমি এই নবদ্বীপে। নবদ্বীপ্রবাসীরাও শ্রীচৈতন্যের নামগানে বিভোর।

শচীমাতা এলেন পুত্র দর্শনে। কিন্তু বিষ্ণুপ্রিয়া কুলবধূ, তাছাড়া সন্ন্যাস গ্রহণের পর তো সন্ন্যাসীর স্ত্রীমুখ দর্শন নিষিদ্ধ। তবুও তার সমস্ত অন্তর স্বামী দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সব দ্বিধা-সংকোট দূর করে বিষ্ণুপ্রিয়া এলেন। শ্রীচৈতন্যের কাছে এসে প্রণাম করতেই প্রভু বললেন, তুমি কৃষ্ণুপ্রিয়া হও।

কিন্তু বিষ্ণুপ্রিয়ার জগৎ যে চৈতন্যময়। চৈতন্য ছাড়া যে তার আরাধ্য কেউ নেই। শ্রীচৈতন্য নিজের পাদুকা দিয়ে বললেন, এই পাদুকা গ্রহণ কর। এর মধ্যেই তুমি আমাকে খুঁজে পাবে।

কয়েক দিন নবদ্বীপে থেকে নগরবাসীর সাথে কীর্তন কৃষ্ণনামে মাতোয়ারা হয়ে উঠলেন শ্রীচৈতন্য। বৰ্ণহিন্দুর অত্যাচার যখন হাজার হাজার মানুষ মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করছিল, শ্রীচৈতন্যই তাদের মধ্যে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সেদিন যদি শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব না হত, বাংলার হিন্দু সমাজ সংস্কৃতি ধর্ম ভাষা সাহিত্য যা কিছু গৌরব সব কিছু চিরদিনের মত বিনষ্ট হয়ে যেত।

কয়েক দিন নবদ্বীপে থাকার পর তিনি যাত্রা করলেন, কৃষ্ণের লীলাভূমি বৃন্দাবনের পথে।

বৃন্দাবন থেকে শ্রীচৈতন্য যাত্রা করলেন প্রয়াগের পথে। সাথে দুজন ভক্ত। হঠাৎ পথপ্রান্তে এক রাখালের বাঁশির সুর শুনে জ্ঞান হারালেন শ্রীচৈতন্য। স্থির নিস্পন্দ দেহ। মনে হয় যেন প্রাণের সাড়া নেই। একদল পাঠান সেনা সেই পথ দিয়ে কোথাও চলেছিল। পাঠান সেনাপতি ছিলেন ধার্মিক লোক। অচেতন শ্রীচৈতন্যকে দেখে মনে হল নিশ্চয়ই তার দুই সঙ্গী তাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছে। সেনাপতি দুই ভক্তকে বন্দী করবার হুকুম দিলেন। তারা যতই বলে প্রভু বেঁচে আছেন, কেউ তাদের কথায় কান দেয় না। তাদের হাত-পা বাধা হতেই জ্ঞান ফিরে পেলেন শ্রীচৈতন্য। তার কথায় দুই ভক্তকে মুক্ত করে দেওয়া হল। শুধু তাই নয়, পাঠান সেনাপতি চৈতন্যের প্রেমভাব তার দিব্যকান্তি দেখে এতখানি আবিষ্ট হলেন, তিনি শ্রীচৈতন্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। তার নতুন নাম হল রামদাস।

বাংলার নবার হুসেন শাহর দুই প্রধান কর্মচারী ছিলেন সাকর মল্লিক আর দবীর খাস-দুজনেই ছিলেন পণ্ডিত, বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী। শ্রীচৈতন্যের আকর্ষণে প্রথমে সাকর মল্লিক সব কিছু ত্যাগ করে এসে পৌঁছলেন প্রয়াগে। কৃষ্ণনামে তিনিও বিভোর। শ্রীচৈতন্য তাকে দীক্ষা দিয়ে নতুন নাম দিলেন শ্রীরূপ। রূপ বৈষ্ণব ধর্মের একজন প্রধান স্তম্ভ হয়ে ওঠেন। শ্রীচৈতন্য তার উপর ভার দেন বৃন্দাবনে ধর্মপ্রচার করতে।

উত্তর ভারত ভ্রমণ পর্ব শেষ করে শ্রীচৈতন্য ফিরে আসেন নীলাচলে। তাঁকে ফিরে পেয়ে ভক্ত শিষ্যদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়।

শ্রীচৈতন্য নিজে কোন ধর্মতত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করেননি। নিজে কোন ধর্মগ্রন্থও রচনা করেননি। সচরাচর উপদেশও দিতেন না তবুও হাজার হাজার মানুষ এক অদৃশ্য আকর্ষণে বার বার তাঁর কাছে ছুটে এসেছে। কারণ তার মত এমন করে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে কেউ প্রেমের মন্ত্র প্রচার করেনি। তিনি সে যুগের অধিকাংশ সাধু-সন্তের মত মানবতা-বিমুখী সন্ন্যাসী ছিলেন না। তার মধ্যে ছিল মানবীয় চেতনা, তাই তিনিই প্রথম দক্ষিণ ভারতের ঘৃণা দেবদাসী প্রথা বিলোপ করার জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন। নারীদের প্রতি তার ছিল অপরিমেয় শ্রদ্ধা। তিনি পারস্পরিক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ক্ষত-বিক্ষত ভারতবর্ষের বুকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন শান্তি আর ঐক্য। প্রধানত তারই চেষ্টায় হোসেন শাহ ও রাজা প্রতাপরুদ্র পারস্পরিক যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত হয়েছিলেন।

তিনি মানুষকে মর্যাদা দিয়েছেন মানুষ হিসেবে। তার মধ্যেই বাংলার মানুষ খুঁজে পেয়েছিল একসাহসী ব্যক্তিত্বপূর্ণ পুরুষকে যিনি অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, সৃষ্টি করেছিলেন গণ প্রতিরোধ। কিন্তু তিনি যে ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের সূচনা করেছিলেন, যোগ্য উত্তরাধিকারীর অভাবে সেই মহৎ সম্ভাবনা পূর্ণ হয়নি।

১৫২২ খৃস্টাব্দে, শ্রীচৈতন্যের তখন ৩৬ বছর বয়স প্রকৃতপক্ষে এই সময় থেকেই তার মধ্যে শুরু হয় দিব্যোন্মাদ অবস্থা। বাহ্য জগতের সাথে সম্পর্ক ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসে। অধিকাংশ সময়ই কৃষ্ণনামে বিভোর হয়ে থাকতেন।

১৫৩৩ খৃস্টাব্দের ২৯ শে জুন,আশাঢ় মাস। শ্রীচৈতন্য তখন অধিকাংশ সময়ই ভাবে বিহ্বল হয়ে থাকতেন। এক এক সময় বাহ্য জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মত পথে বার হয়ে পড়তেন। শিষ্যরা প্রতিনিয়ত তাকে পাহারা দিত।

প্রতিদিন প্রভু একবার করে জগন্নাথের মন্দিরে যেতেন। সেদিনও মন্দিরে গিয়েছেন। তিনি সাধারণত নাটমন্দিরের গরুর স্তম্ভের নীচে গিয়ে দাঁড়াতেন, সেখান থেকে দর্শন করতেন প্রভু জগন্নাথকে। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে তিনি মন্দিরের মূল গর্ভগৃহে প্রবেশ করলেন। সাথে সাথে মন্দিরের দরজা বন্ধ হইল। সেই সময় মন্দিরের মধ্যে কি ঘটেছিল তা জানা যায় না। কিন্তু যখন মন্দিরের দরজা খোলা হল তখন ভেতরে প্রভু নেই। চারদিকে প্রচার করা হয় তিনি জগন্নাতের সাথে লীন হয়ে গেছে। ভক্তজনের কাছে একথা বিশ্বাসযোগ্য হলেও প্রকৃত সত্য কি তাই?

বহু ঐতিহাসিকের অনুমান নীলাচলে শ্রীচৈতন্যের প্রভাব জনপ্রিয়তা দেখে জগন্নাথ মন্দিরের পূজারীরা চিন্তিত হয়ে উঠেছিলেন। বহু মানুষ জগন্নাথদেবকে না দেখে শুধুমাত্র শ্রীচৈতন্যকে দর্শন করতেন। এতে ক্ষুব্ধ পূজারীরা তাকে মন্দিরের মধ্যে হত্যা করে কোন গোপন পথে দেহ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যায়।

তাই বোধ হয় সাহিত্যিক কালকূট লেখেন–কোথায় গেলেন শ্রীচৈতন্য? কাদের হাতে তোমার রক্ত লেগে রইল? আমরা কি সেই সব রক্তক্ত হাতে পূজার ডালি সাজিয়ে দিই?

২৪. স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২)

ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিবেকানন্দ এক যুগপুরুষ! ভারত আত্মার মূর্ত রূপ। তারই মধ্যে একই সাথে মিশেছে ঈশ্বর প্রেম, মানব প্রেম আর স্বদেশ প্রেম। তাঁর জীবন ছিল মুক্তির সাধনা–সে মুক্তি জাতির সর্বাঙ্গীন মুক্তির। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সর্বক্ষেত্রেই মানুষ যেন নিজেকে সকল বন্ধনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে। সন্ন্যাসী হয়েও ঈশ্বর নয়, মানুষই ছিল তাঁর আরাধ্য দেবতা। তাই মানুষের কল্যাণ, তাদের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গলই ছিল তাঁর সাধনা। তিনি বলতেন, “যে সন্ন্যাসীর মনে অপরের কল্যাণ করার ইচ্ছা নেই সে সন্ন্যাসীই নয়। বহুজনহিতায় বহুজনসুখায় সন্ন্যাসীর জন্ম। পরের জন্য প্রাণ দিতে, জীবের গগনভেদী ক্রন্দন নিবারণ করতে, সকলের ঐহিক ও পরমার্থিক মঙ্গল করতে এবং জ্ঞানালোক দিয়ে সকলের মধ্যে ব্রহ্মসিংহকে জাগরিত করতে সন্ন্যাসীর জন্ম হয়েছে।”

স্বামী বিবেকানন্দের জীবন সর্ব মানবের কাছেই এক আদর্শ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনিই প্রথম উচ্চারণ করলেন, ঈশ্বর নয় মানুষ। মানুষের মধ্যেই ঘটবে ঈশ্বরের পূর্ণ বিকাশ। তিনি যুগ যুগান্তরের প্রথা ধর্ম সংস্কার ভেঙে ফেলে বলে উঠলেন আমরা অমৃতের সন্তান।

শুধু ভারতবর্ষে নয়, বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরলেন সেই অমৃতময় বাণী। পরাধীন ভারতবর্ষের প্রতিনিধি হিসেবে দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন, I have a message to the west. তাঁর সেই Message-প্রাসঙ্গিকতা আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে বর্তমান বিশ্ব।

বিবেকানন্দের আবির্ভাবকাল এমন একটা সময়ে যখন বাংলার বুকে শিক্ষা সাহিত্য ধর্ম সংস্কৃতি সর্বক্ষেত্রেই শুরু হয়েছে নবজাগরণের যুগ। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ধনী শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বিবেকানন্দের পিতা বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন উত্তর কলকাতার নামকরা আইনজীবী। তাঁর মধ্যে গোঁড়া হিন্দুয়ানী ছির না। বহু মুসলমান পরিবারের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। উদার বন্ধুবৎসল দয়ালু প্রকৃতির লোক ছিলেন তিনি।

বিশ্বনাথ দত্তের কন্যাসন্দান থাকলেও কোন পুত্র ছিল না। স্ত্রী ভুবনেশ্বরী দেবী শিবের কাছে নিত্য প্রার্থনা করতেন। অবশেষে ১৮৬৩ সালের ১২ই জানুয়ারী জন্ম হল তাঁর প্রথম পুত্রের। ডাক নাম বিলো, ভাল নাম শ্রীনরেন্দ্রনাথ দত্ত। যদিও তিনি বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিত স্বামী বিবেকানন্দ নামে।

ছেলেবেলায় নরেন্দ্রনাথ ছিলেন যেমন চঞ্চল তেমনি সাহসী। সকল বিষয়ে ছিল তাঁর অদম্য কৌতূহল। বাড়িতে গুরুমহাশয়ের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হলেন মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনে। তিনি সর্ব বিষয়ে ছিলেন ক্লাসের সেরা ছাত্র। কৈশোরেই তার মধ্যে দয়া-মায়া, মমতা, পরোপকার, সাহসিকতা, ন্যায়বিচার প্রভৃতি নানা গুণের প্রকাশ ঘটেছিল।

নরেন্দ্রনাথ ছিলেন সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী। ছেলেবেলা থেকেই নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন, কুস্তি বক্সিং দুটিতেই ছিল তাঁর সমান দখল নিয়মিত ক্রিকেট খেলতেন। কর্মক্ষেত্রে সবল নিরোগ দেহের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই তিনি চির রুগ্ন বাঙালীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, গীতা পাঠ করার চেয়ে ফুটবল খেলা বেশি উপকারী।

১৮৭৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নরেন্দ্রনাথ জেনারেল এসেম্বলী ইনস্টিটিউশনে এফ, এ পড়ার জন্য ভর্তি হলেন, এখানকার অধ্যক্ষ ছিলেন উইলিম হেস্টি। তিনি ছিলেন কবি দার্শনিক উদার হৃদয়ের মানুষ। তাঁর সান্নিধ্যে এসে দেশ বিদেশের দর্শনশাস্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। নরেন্দ্রনাথের সহপাঠী ছিলেন ডঃ ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। পরবর্তীকালে যিনি এই দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দর্শনশাস্ত্রে এতখানি বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন, অধ্যক্ষ উইলিয়ম হেস্টি তাঁর সম্বন্ধে বলেছিলেন, “দর্শনশাস্ত্রে নরেন্দ্রনাথের অসাধারণ দখল, আমার মনে হয় জার্মানী ও ইংলণ্ডের কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই তার মত মেধাবী ছাত্র নেই।”

পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শনের অনুশীলনে নরেন্দ্রনাথের চিন্তার জগতে এক ঝড় সৃষ্টি করল। একদিকে প্রচলিত বিশ্বাস ধ্যান ধারণা সংস্কার, অন্যদিকে নবচেতনা–এই দুয়ের দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত নরেন্দ্রনাথ প্রকৃত সত্যকে জানার আশায় ব্রাহ্মসমাজে যোগ দিলেন।

ব্রাহ্মধর্মের মতবাদ, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, নারীদের প্রতি মর্যাদা তাকে আকৃষ্ট করলেও ব্রাহ্মদের অতিরিক্ত ভাবাবেগ, কেশবচন্দ্রকে প্রেরিত পুরুষ হিসেবে পূজা করা তাঁর ভাল লাগেনি। কিন্তু এই সময় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপদেশে তিনি নিয়মিত ধ্যান করতে আরম্ভ করলেন। আচার-ব্যবহারে, আহারে,

পোশাক-পরিচ্ছদে তিনি প্রায় ব্রহ্মচারীদের মতই জীবন যাপন করতেন।

যতই দিন যায় সত্যকে জানার জন্যে ব্যাকুলতা ততই বাড়তে থাকে। পরিচিত অপরিচিত জ্ঞানী মূর্খ সাধুসন্ত যাদেরই সাথে সাক্ষাৎ হয়, তিনি জিজ্ঞাসা করেন ঈশ্বর আছেন, কি নেই? যদি ঈশ্বর থাকেন তবে তার স্বরূপ কি?-কারোর কাছেই এই প্রশ্নের উত্তর পান না। ক্রমশই মনের জিজ্ঞাসা বেড়ে চলে। বার বার মনে এমন কি কেউ নেই যিনি এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে পারেন!

১৮৮০ সালে ঠাকুর রামকৃষ্ণ সিমলাপল্লীতে সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে এসেছিলেন। সেখানেই প্রথম রামকৃষ্ণের সাথে পরিচয় হল নরেন্দ্রনাথের। নরেন্দ্রনাথের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে ঠাকুর তাঁকে দক্ষিণেশ্বরে যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানান।

প্রথম পরিচয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্রনাথের মনে কোন রেখাপাত করতে পারেননি। পরীক্ষার ব্যস্ততার জন্য অল্পদিনেই নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণের কথা ভুলে যান। এফ এ পরীক্ষার পর বিশ্বনাথ দত্ত পুত্রের বিবাহের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। কিন্তু বিবাহ করে সংসার জীবনে আবদ্ধ হবার কোন ইচ্ছাই ছিল না নরেন্দ্রনাথের। তিনি সরাসরি বিবাহের বিরুদ্ধে নিজের অভিমত প্রকাশ করলেন।

রামকৃষ্ণদেবের গৃহী ভক্তগণের মধ্যে ছিলেন ডাক্তার রামচন্দ্র দত্ত। তিনি নরেন্দ্রনাথের দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন। একদিন নরেন্দ্রনাথ তাঁর সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে নিজের মনের সব কথা বলতেই রামচন্দ্র বললেন, যদি প্রকৃত সত্যকে জানতে চাও তবে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছে যাও, তিনি তোমাকে প্রকৃত পথের সন্ধান দিতে পারবেন।

রামচন্দ্রের উপদেশে নরেন্দ্রনাথ একদিন কয়েকজন বন্ধুর সাথে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছে গেলেন। তাঁকে দেখামাত্রই আনন্দে বিভোর হয়ে উঠলেন রামকৃষ্ণ। সম্ভবত তিনি নরেন্দ্রনাথের মধ্যেকার সুপ্ত প্রতিভার, তার আধ্যাত্মিক শক্তিকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই প্রথম পরিচয়ে রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, “তুই এতদিন কেমন করে আমায় ভুলে ছিলি। আমি যে কতদিন ধরে তোর পথপানে চেয়ে আছি। বিষয়ী লোকের সঙ্গে কথা কয়ে আমার মুখ পুড়ে গেছে। আজ থেকে তোর মত যথার্থ ত্যাগীর সঙ্গে কথা করে শান্তি পাব।”

নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণের সরলতায় মুগ্ধ হলেও তাঁকে আদর্শ পুরুষ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেননি। তাছাড়া তাঁর যুক্তিবাদী মন বিনা পরীক্ষায় কোন কিছু মেনে নিতে চায়নি। ঠাকুরের প্রতি আকর্ষণে বারবার দক্ষিণেশ্বরে ছুটে গেলেও তাকে দীর্ঘদিন গুরু বলে গ্রহণ করেননি। আসলে তিনি কোন ভাবাবেগের দ্বারা পরিচালিত হননি। যখন তিনি পরিপূর্ণভাবে রামকৃষ্ণের মধ্যেকার আধ্যাত্ম চেতনাকে উপলব্ধি করেছেন তখনই তিনি তাঁর কাছে আত্মনিবেদন করেছেন।

নরেন্দ্রনাথ যখন রামকৃষ্ণের কাছে যাতায়াত করতেন তখনো তিনি নিয়মিত ব্রাহ্মসমাজে যেতেন। কেশবচন্দ্র, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখের কাছে ধর্ম উপদেশ শুনতেন। কিন্তু তার অন্তরের পিপাসাকে তৃপ্ত করত না। তাছাড়া নরেন্দ্রনাথের অনন্ত যে তেজদীপ্ত পৌরষ ছিল, ব্রাহ্ম ধর্মের আত্মনিন্দা, নিজেকে কীটাণুতুল্য হেয় জ্ঞান করার প্রবৃত্তির সাথে তা মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এমনকি একদিন ঠাকুর রামকৃষ্ণ তাঁকে যখন স্পর্শ করলেন, তিনি মুহূর্তে নিজের চেতনা হারালেন। মনে হল তার সমস্ত সত্তা এক অনন্তের মধ্যে বিলিন হয়ে গেল। তিনি যেন হারিয়ে যাচ্ছেন এক অসীম মহাশূন্যে। আতঙ্কে আর বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলেন, “তুমি আমার এ কি করলে, আমার যে যে বাবা-মা আছেন।”

রামকৃষ্ণ পুনরায় তাঁকে স্পর্শ করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনলেন। এই ঘটনাটিকে বিবেকানন্দের মনে হয়েছিল এক ধরনের সম্মোহন। ঠাকুরের প্রতি নরেন্দ্রনাথের ভালবাসা শ্রদ্ধা থাকলেও এই ঘটনার পর থেকে সব সময় সতর্ক থাকতেন যাতে ঠাকুর তাঁকে সম্মোহিত না করতে পারেন।

রামকৃষ্ণের কাছে তিনি যখন যাতায়াত করতেন সেই সময় বি-এ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। ধনীর সন্তান হয়েও কঠোর সংযমী জীবন যাপন করতেন। প্রতিদিন ধ্যান জপ করতেন, ধর্মগ্রন্থ পড়তেন। যথাসময়ে পরীক্ষা শেষ হল। সাংসারিক ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন করতেন। হঠাৎ তিনি মারা গেলেন। সংসারে আয়ের মত ব্যয়ও ছিল বিরাট কোন সঞ্চয় করে যেতে পারেননি। ফলে সংসারে নেমে এল বিরাট বিপর্যয়। সদ্যবিধবা জননী, ছোট ছোট ভাইবোনের দুঃখভরা মুখের দিকে তাকিয়ে বেদনায় নরেন্দ্রনাথের অন্তর ভরে উঠত। একদিন যারা বিশ্বনাথ দত্তের অনুগ্রহে পুষ্ট হয়েছিল আজ তারাই সকলে মুখ ফিরিয়ে নিল। মানুষের কৃতঘ্নতার এই কদর্য রূপ দেখে সংসারের অভাব দূর করার জন্য চাকরির সন্ধান শুরু হল। সারাদিন পথে পথে ঘুরে রাত্রিবেলায় বাড়ি ফিরতেন। তার অন্তরের বেদনা সেদিন একমাত্র উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন রামকৃষ্ণ। তাঁর আশীর্বাদ আর নরেন্দ্রনাথের আন্তিরিক প্রচেষ্টায় সংসারের অভাব সাময়িক দূর হল। সাথে কিছু কিছু অনুবাদের কাজ করে অর্থ উপার্জন করতেন। কিছুদিন পর তিনি বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটন স্কুলে চাকরি পেলেন।

কিন্তু যার অন্তরে আধ্যাত্মিকতার দীপ প্রজ্বলিত হয়ে উঠেছে, সংসার, চাকরি, অর্থ তাঁর বাঁধবে কেমন করে? ক্রমশই নিজের মধ্যে অনুভব করছিলেন ঠাকুরের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ।

১৮৮৫ সালে ঠাকুর রামকৃষ্ণ গলার ক্যানসারে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হল কাশীপুর উদ্যানবাটীতে। রাখাল, বাবুরাম, শরৎ, শশী, লাটু আরো সব ভক্তরা দিবরাত্র তার আরাধ্য কর্মকে সম্পূর্ণ করবার জন্যই নরেন্দ্রনাথের আবির্ভাব। নরেন্দ্রনাথও অনুভব করছিলেন তীব্র ব্যাকুলতা, চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি কাশীপুর উদ্যানবাটীতে এসে অন্য ভক্তদের সাথে ঠাকুরের শ্রীচরণে আশ্রয় নিলেন। অন্য ভক্তরা প্রথম দিকে মাঝে মাঝে গৃহে যেতেন, ধীরে ধীরে তাও বন্ধ হয়ে গেল। উদ্যানবাটী হয়ে উঠল রামকৃষ্ণ ভক্ত-শিষ্যদের আশ্রম। গুরুসেবার সাথে ভক্তরা সাধন ভজন ধ্যান, শাস্ত্রপাঠ আলোচনা করতেন।

প্রকৃতপক্ষে উত্তরকালে যে রামকৃষ্ণ সজ্ঞা গড়ে উঠেছিল এখানেই তাঁর সূচনা হয়।

ঠাকুর রামকৃষ্ণ ছিলেন গৃহী। কিন্তু তিনি জানতেন গৃহীদের পক্ষে তার উপদেশ বাণীকে জগতের মানুষের কাছে প্রচার করা সম্ভব নয়। যারা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী, সংসারের সকল বন্ধনকে ছিন্ন করতে পেরেছে একমাত্র তারাই পারবে সব দুস্তর বাধাকে অতিক্রম করে আরাধ্য কর্মকে সম্পাদন করতে। তিনি তাঁর শিষ্যদের মধ্যে আঠারো জনকে সন্ন্যাস প্রদান করলেন। নিজের হাতে তাদের গৈরিক বস্ত্র তুলে দিয়ে বললেন, “তোরা সম্পূর্ণ নিরভিমান হয়ে ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিয়ে রাজপথে ভিক্ষা করতে পারবি কি?”

গুরুর আদেশে নরেন্দ্রনাথ ও অন্য সব শিষ্যরা পথে বেরিয়ে পড়লেন। সংসার জীবনের শেষ বন্ধনটুকুও ছিন্ন হয়ে গেল। সন্ন্যাস গ্রহণের পর বিবেকানন্দের সমস্ত অন্তর মানুষের দুঃখ-বেদনা দূর করার আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল হয়ে উঠল। ১৮৮৬ সালের এপ্রির মাসে স্বামী বিবেকানন্দকে সাথে নিয়ে গয়া অভিমুখে যাত্রা করলেন। সেখান থেকে গেলেন বুদ্ধগয়ায়। এখানে এসেই তার মধ্যে জেগে উঠল বুদ্ধের মহামুক্তির তীব্র আকাক্ষা। বুদ্ধের মত মুষকে সকল যন্ত্রণা দুঃখ থেকে মুক্তির পথ দেখার জন্যেই তাঁর আবির্ভাব। এখানে বোধিসত্ত্বের মন্দিরে ধ্যানস্থ হয়ে গেলেন স্বামীজী। তিন দিন পর তাঁর ধ্যান ভঙ্গ হল। তারপর আবার ফিরে এরেন কাশীপুর উদ্যানবাটীতে।

তখন ঠাকুর গুরুতর অসুস্থ। একদিন তিনি বিবেকানন্দকে জিজ্ঞাসা করলেন, “নরেন, তুই কি চাস?” নরেন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন, “শুকদেবের মত সর্বদা নির্বিকল্প সমাধিযোগে সচ্চিদানন্দ সাগরে ডুবিয়া থাকিতে চাই।”

ঠাকুর নরেন্দ্রনাথের এই কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, “ঐ কথা বলতে তোর লজ্জা করে? কোথায় তুই বটগাছের মত বেড়ে উঠে শত শত লোককে শান্তির ছায়া দিবি তা না তুই নিজের মুক্তির জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিস, এত ক্ষুদ্র আদর্শ তোর!”

নিজের ভ্রান্তি অনুভব করে লজ্জিত হলেন নরেন্দ্রনাথ। প্রকৃতপক্ষে এই শিক্ষাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তখনই তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন “বহুজনহিতায় বহুজন সুখায় কর্ম করিব।”।

১৮৮৬ সালের ১৫ই আগস্ট রামকৃষ্ণ দেহত্যাগ করলেন। নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণের সঙ্গ পেয়েছিলেন পাঁচ বছর। শেষ কয়েক মাস ছাড়া কোনদিনই তাদের মধ্যে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু তারই মধ্যে রামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক সম্পদ, তাঁর উদয় ধর্মমত, সর্বজীবের প্রতি দয়া, সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শকে আত্মস্থ করেছিলেন, তার মধ্যে ভারতবর্ষের সব মহাপুরুষদের সদগুণের পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে। যিনি একাধারে শঙ্করের অদ্ভুত মস্তিষ্ক এবং চৈতন্যের অদ্ভুত বিশাল অনন্ত হৃদয়ের অধিকারী, যাঁহার হৃদয় ভারতান্তর্গত বা ভারতবহির্ত দরিদ্র দুর্বল পতিত সকলের জন্য কাঁদিবে…যিনি সকল বিরোধী সম্প্রদায়ের সমন্বয় সাধন করিবেন…এই রূপ ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন এবং আমি অনেক বর্ষ ধরিয়া তাহার চরণতলে বসিয়া শিক্ষালাভের সৌভাগ্যলাভ করিয়াছি।” রামকৃষ্ণদেব গৈরিক বস্ত্র দিলেও তাঁর শিষ্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন তাঁর মৃত্যুর পর। ঠাকুরের পবিত্র ভস্মকে সাক্ষী রেখে নরেন্দ্রনাথ ও তাঁর সঙ্গীরা শাস্ত্রানুমোদিতভাবে সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন।

ঠাকুরের মৃত্যুর পর কাশীপুর উদ্যানবাটী ছেড়ে দিতে হল। বিবেকানন্দ দেখলেন এই অবস্থায় যদি তরুণ সন্ন্যাসীরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তবে শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শকে প্রচারের পথে নানান ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে। তাছাড়া এই সব সন্ন্যাসীরা দিকহারা পথিকের মত অকূল পাথারে ভেসে যাবে।

রামকৃষ্ণের জনৈক ভক্ত বরানগরে একটি বাড়ি ঠিক করে দিল। সেখানে উঠলেন সকলে। সেখানকার অবস্থা বর্ণনা করে একজন লিখেছেন, “নিচের তলা ব্যবহার করা যায় না। উপরের তলায় তিনটে ঘর…একবেলা ভাত কোনদিন জুটত কোনদিন জুটত না। থালাবাসন তো কিছুই নেই। বাড়ির সংলগ্ন বাগানে লাউগাছ কলাগাছ ঢের ছিল! দুটো লাউপাতা কি একখানি কলাপাতা কাটবার উপায় ছিল না। শেষে মানকচুর পাতায় ভাত ঢেলে খেতে হত। তেলাকুচোর পাত সিদ্ধ আর ভাত। কিছু খেলেই গলা কুটকুট করতো। এত যে কষ্ট, ঐক্ষেপ ছিল না।”

এত দুঃখ-কষ্টের মধ্যে সকলকে আনন্দ উৎসাহে প্রাণশক্তিতে ভরিয়ে রেখেছিলেন বিবেকানন্দ। গুরুর অবর্তমানে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন সংঘের প্রধান। সেই দিনকার মঠের সন্ন্যাসেীদের মধ্যে যে সাধনা ত্যাগ কষ্ট সহিষ্ণুতার প্রবল শক্তি জেগে উঠেছিল তারই প্রভাবে একদিন তারা সকলেই হয়ে উঠেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শ শিষ্য।

কিছুদিন বরানগর মঠে থাকার পর শুরু হল তাঁর পরিব্রাজক জীবন। তিনি তার সতীর্থদের ডাক দিয়ে বললেন এবারে আমাদের প্রচারে নামতে হবে। ভারতবর্ষকে দেখতে হবে। বুঝতে হবে এই লক্ষ কোটি নর-নারীর দৈনন্দিন জীবনের স্তরে স্তরে কত বেদনা কত কুসংস্কারের জঞ্জাল পুঞ্জীকৃত হয়ে আছে। এদের কল্যাণব্রতের সাধনা শুধু স্বার্থত্যাগের কথা নয়, সর্বত্যাগের কথা।

১৮৮৮ সাল। শুরু হল বিবেকানন্দের ভারত পরিক্রম। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ভারতবর্ষের এক প্রান্তে থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়ালেন। দেখলেন ভারতবর্ষের প্রকৃত রূপ। ধর্মের নামে ভণ্ডামি আর অধর্ম। দেশ জুড়ে শুধু দারিদ্র অশিক্ষা আর অন্ধ সংস্কার। বৃহত্তম মানব সমাজই পশুর স্তরে বাস করছে। এই সব দৃশ্য তাঁকে যে বিচলিত করত তাই নয়, কেমন করে এর থেকে উদ্ধার পাওয়া যায় সেই বিষয়ও গভীরভাবে চিন্তা করতেন।

এই পরিব্রাজক জীবনের মধ্যে দিয়ে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে গড়ে তুলেছিলেন বিবেকানন্দ। তিনি যে শুধু সনাতন হিন্দু ধর্মের বাণীকে প্রচার করতেন, লোককে উদ্বুদ্ধ হবার শিক্ষা দিতেন তাই নয়, নিজেও বহু কিছু শিক্ষা লাভ করতেন। একবার তিনি খেতড়ির রাজদরবারে অতিথি ছিলেন। সন্ধ্যেবেলায় রাজা সঙ্গীতের আয়োজন করেছেন। এক বাঈজী গান আরম্ভ করতেই তিনি উঠে পড়তেন। বললেন সন্ন্যাসীর পক্ষে এই রকম আসরে উপস্থিত থাকা অনুচিত। বাঈজী দুঃখিতভাবে গান আরম্ভ করল, “প্রভু তুমি আমার নাম দোষ নিও না। তোমার নাম সমদর্শী, আমাকে উদ্ধার কর।” স্বামীজী গান শুনে বুঝতে পারলেন ঈশ্বর সর্ব মানবইর মধ্যেই বিরাজমান। সাথে সাথে নিজের ভ্রান্তি বুঝতে পারলেন। অনুশোচনায় নিজেকে ধিক্কার দিলেন। সন্ন্যাসী হয়েও নারী-পুরুষের ভেদ রয়েছে। তিনি পুনরায় নিজের আসনে এসে বসলেন। সঙ্গীত অনুষ্ঠানের শেষে বাঈজীর কাছে যে শিক্ষা পেয়েছেন। তার জন্যে তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিলেন।

সমাজের হীনতম ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা সমবেদনা পরবর্তী জীবনে আরো প্রবল হয়ে উঠেছিল। তারই প্রমাণ পাই স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে লেখা একটি চিঠিতে। “বেশ্যারা যদি দক্ষিণেশ্বরের মহাতীর্থে যাইতে না পায় তো কোথায় যাইবে? পাপীদের জন্য প্রভুর যত প্রকাশ পুণ্যবানদের জন্য তত নহে।…ভেদাভেদ সংসারের মধ্যে থাকুক…তীর্থে যদি ঐরূপ ভেদ হয় তাহলে তীর্থ আর নরকে ভেদ কি? যাহারা ঠাকুর ঘরে গিয়েও ঐ বেশ্যা, ঐ নীচ জাতি, ঐ গরীব, ঐ ছোটলোক ভাবে তাহাদের সংখ্যা যতই কম হয় ততই মঙ্গল। যাহারা ভক্তের জাতি বা যোনি বা ব্যবসায় দেখে তাহারা আমাদের ঠাকুরকে কি বুঝিবে? প্রভুর কাছে প্রার্থনা যে শত শত বেশ্যা আসুক তার পায়ে মাথা নোয়াতে এবং একজনও ভদ্রলোক না আসে নাই আসুক।”

স্বামীজী যখন যেখানে গিয়েছেন, যাঁরাই তাঁর সান্নিধ্যে এসেছেন, তাঁর ব্যক্তিত্ব পাণ্ডিত্য সদা প্রসন্নময় মুখমন্ডলের দিকে চেয়ে সকলেই মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি যখন দক্ষিণ ভারতে ছিলেন সেই সময় অধ্যাপক পণ্ডিত শঙ্কর পাণ্ডরঙ্গজী তাঁকে বলেন, স্বামীজী এদেশে ধর্মপ্রচার করে আপনি বিশেষ সুবিধা করতে পারবেন বলে মনে হয় না। আপনার উদার ভাবসমূহ আমাদের দেশের লোক সহজে বুঝবে না। আপনি এদের মধ্যে শক্তি ক্ষয় না করে পাশ্চাত্যদেশে যান, সেখানকার লোক মহত্ত্বের ও প্রতিভার সম্মান করতে জানে। আপনি নিশ্চয়ই পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সভ্যতার উপর সনাতন ধর্মের অপূর্ব জ্ঞানালোক নিক্ষেপ করে এক অভিনব যুগান্তর আনতে পারবেন।

সম্ভবত এই উপদেশই তাঁর মনে প্রথম বিদেশযাত্রার ইচ্ছাকে জাগিয়ে তুলেছিল। ১৮৮৮ সালে এক তরুণ মন নিয়ে বরানগর মঠ থেকে ভারত পরিভ্রমণে বার হয়েছিলেন বিবেকানন্দ। ১৮৯২ সালের শেষ প্রান্তে সমস্ত ভারতবর্ষে ভ্রমণ করে এসে পৌঁছালেন দক্ষিণে কন্যাকুমারিকায়। তখন তিনি জ্ঞান আর ব্যাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোতে এক পরিণত প্রজ্ঞাবান। ভারতের শ্বেত পাথরের উপর বসে তার স্বীকার না করে তবে তিনি কেমন করে যাবেন!

শেষ পর্যন্ত শিষ্যদের একান্ত অনুরোধে তিনি বললেন, তোমরা সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে অর্থ ভিক্ষা কর। রাজা নবাবের অর্থে নয়, সাধারণ মানুষের দানের অর্থেই ধর্মসভায় যোগ দিতে চাই। একদিন স্বামীজী স্বপ্নে দেখিলেন স্বয়ং রামকৃষ্ণ যেন তাকে সমুদ্র পার হয়ে বিদেশযাত্রার ইঙ্গিত দিলেন।

মায়ের পত্র পেয়ে সব বাধা দূর হয়ে গেল। স্থানীয় উৎসাহী শিষ্যরা যখন তার যাত্রার আয়োজন শুরু করেছে এমন সময় খেতরির মহারাজার দূত এসে তাঁকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গেল খেতরিতে। স্বামীজীর আশীর্বাদ মহারাজের পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। তার অন্নপ্রাশন।

মহারাজই তার আমেরিকা যাত্রার আয়োজন করলেন। বোম্বাইতে এসে মহারাজার মুন্সী জগমোহন স্বামীজীর জন্য বহুমূল্য রেশমের আলখাল্লা ও পাগড়ী তৈরি করালেন। তার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দিলেন। একটি জাহাজে প্রথম শ্রেণীর কেবিন রিজার্ভ করা হল।

১৮৯৩ সালের ৩১ মে স্বামীজী শিকাগো অভিমুখে যাত্রা করলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই জাহাজের অধিকাংশ যাত্রীর সাথে তার পরিচয় গড়ে উঠল। জাহাজ সিংহল মালয় সিঙ্গাপুর হয়ে হংকং-এ কয়েকদিনের জন্য অবস্থান করল। এই সুযোগে স্বামীজী দঃ চীনের রাজধানী ক্যান্টন ঘুরে এলেন। তাঁর গভীর দৃষ্টি দিয়ে প্রত্যক্ষ করলেন চীনের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা। ভারতবর্ষ ও চীন এই দুই প্রাচীন সভ্যতার তুলনা করে বললেন, “চীন ও ভারতবাসী যে সভ্যতা সোপানে এক পা অগ্রসর হতে পারছে না দারিদ্রই তার প্রধান কারণ।”

যখন আমেরিকায় এসে পৌঁছলেন তখন তিনি সন্ন্যাসী মাত্র। তাঁর কাছে ছিল না কোন নিমন্ত্রণ পত্র, ছিল না প্রয়োজনীয় অর্থ। ভারতবর্ষ থেকে ইতিমধ্যেই কয়েকজনকে মনোনীত করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন ব্রাহ্মধর্মের প্রতাপচন্দ্র মজুমদার, জ্ঞানশরণ চক্রবর্তী এছাড়া বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম, বৈষবধর্ম, পার্শী ধর্মের প্রতিনিধি কিন্তু হিন্দু ধর্মের কেউ ছিল না।

অপরিচিত অজানা দেশ। প্রতি পদে বাধা আর বিদ্রূপ। সবকিছু উপেক্ষা করে রইলেন স্বামীজী। তখনো ধর্ম সম্মেলনের বেশ কিছুদিন বাকি ছিল। কিভাবে ধর্ম সম্মেলনে যোগ দেবেন তারই চিন্তায় বিভোর হয়ে ছিলেন স্বামীজী। এই সময় তার সাথে পরিচয় হল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক মিঃ জে এইচ রাইটের সাথে। তিনি স্বামীজীর ব্যক্তিত্বে, তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হলেন। স্বামীজীর ব্যক্তিত্বে, তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হলেন। স্বামীজীর আমেরিকায় আসবার উদ্দেশ্য, তাঁর অসুবিধার কথা শুনে ধর্মমহাসভার সাথে যুক্ত মিঃ বনিকে একটি চিঠি লিখে দিলেন। তাতে মিঃ রাইট লিখেছিলেন এই অজ্ঞাতনামা হিন্দু সন্ন্যাসী আমাদের সব পণ্ডিতদের চেয়েও বেশি পণ্ডিত।

রাইট চিঠির সাথে শিকাগো যাওয়ার টিকিট কিনে দিলেন স্বামীজী যখন শিকাগো শহরে এসে পৌঁছলেন তখন দিন শেষ হয়ে এসেছিল। ধর্মমহাসভার অফিসের ঠিকানা। জানেন না। স্বামীজী দু-একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁরা স্বামীজীর অদ্ভুত পোশাক দেখে উপহাস করল। রাত্রি কাটাবার জন্য কোথাও কোন আশ্রয় পেলেন না। শেষে নিরুপায় হয়ে রেলের মালগুদামের সামনে পড়ে থাকা একটি বড় প্যাকিং বাক্সের মধ্যে জড়সড় হয়ে বসে রইলেন। বাইরে প্রবল শীত। সমস্ত রাত্রি সেইভাবে কেটে গেল। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায়, অনাহারে স্বামীজীর তখন অর্ধমৃত অবস্থা। সকাল হতেই প্রচণ্ড ক্ষুধায় দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে আরম্ভ করলেন। কিন্তু কারো কাছ থেকে একমুষ্টি ভিক্ষা পেলেন না। ক্লান্ত অবসন্ন দেহে একটি বাড়ির সামনে এসে পড়লেন।

সেই বাড়িতে থাকতেন মিসেস জর্জ ডব্লিউ হেইল নামে একজন বয়স্কা মহিলা। স্বামীজীকে দেখামাত্রই তাঁর অন্তরে এমন এক ভাবের সঞ্চার হল, তিনি স্বামীজীকে নিজের ঘরে নিয়ে এসে যথেষ্ট আদর যত্ন করলেন। ধর্মসভায় যোগদানের ব্যাপারে এই ভদ্রমহিলা স্বামীজীকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন।

যথাসময়ে স্বামীজী হিন্দুধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে ধর্মসভার অন্তর্ভুক্ত হলেন। এই ব্যাপারে প্রতাপচন্দ্র মজুমদার নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতার কথা স্বামীজী নিজেই লিখে গিয়েছেন।

সকলেই বক্তৃতা প্রস্তুত করিয়া আনিয়াছিলেন। আমি নির্বোধ, আমি কিছুই প্রস্তুত করি নাই। দেবী সরস্বতীতে প্রণাম করিয়া অগ্রসর হইলাম। ব্যারোজ মহোদয় আমার পরিচয় দিলেন। আমার গৈরিক বসনে শ্রোতাবর্গের চিত্ত কিছু আকৃষ্ট হয়েছিল।

আমি আমেরিকাবাসীদেরকে ধন্যবাদ দিয়ে আরো দু-এক কথা বলে একটি ক্ষুদ্র বক্তৃতা করলাম। যখন আমি আমেরিকাবাসী ভগ্নী ও ভ্রাতৃগণ বলিয়া সভাকে সম্বোধন করিলাম তখন দুই মিনিট ধরিয়া এমন করতালি ধ্বনি হইতে লাগিল যে কান যেন কালা করিয়া দেয়। তারপর আমি বলতে আরম্ভ করিলাম। যখন আমার বলা শেষ হইল আমি তখন হৃদয়ের আবেগেই একেবারে যেন অবশ হইয়া পড়িলাম। পর দিন সব খবরের কাগজ বলিতে লাগিল আমার বক্তৃতাই সেইদিন সকলের প্রাণে লাগিয়াছে। সুতরাং তখন সমগ্র আমেরিকা আমাকে জানিতে পারিল।”

এ্যানি বেসান্ত লিখেছেন, “মহিমাময় মূর্তি, গৈরিক বসন, ভারতীয় সূর্যের মত ভাস্বর, উন্নত শির, মর্মভেদী দৃষ্টিপূর্ণ চক্ষু, চঞ্চল ওষ্ঠাধর, মনোহর অঙ্গভঙ্গী…স্বামী বিবেকানন্দ আমার দৃষ্টিপথে এইরূপে প্রতিভাত হয়েছিলেন। প্রথম দৃষ্টিতে তিনি যোদ্ধা সন্ন্যাসী ছিলেন।”

স্বামী বিবেকানন্দ সেদিন পরাধীন ভারতবর্ষের প্রতিনিধি হিসেবে দুপ্তকণ্ঠে প্রাচ্যের সুমহান আদর্শকে তুলে ধরেছিলেন বিশ্বের সামনে। তাঁর মধ্যে এক দৈবশক্তি জেগে উঠেছিল। সেদিন তার মধ্যে পাশ্চাত্যের মানুষ দেখেছিল ভারতের মহিমান্বিত রূপ।

শিকাগো ধর্মসভা শেষ হবার পর স্বামীজী দু মাস হিন্দু ধর্ম প্রসঙ্গে বক্তৃতা দিয়ে নিজেকে নিবৃত্ত রাখেননি। পাশ্চাত্য সভ্যতার যা কিছু শ্রেষ্ঠ গুণ তাকে উপলব্ধি করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন তাদের বিজ্ঞানে অগ্রগতি। তাই তিনি লিখেছিলেন প্রাচ্যকে নিতে হবে প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক জ্ঞান। এই দু-এর সম্মেলনেই গড়ে উঠবে প্রকৃত সভ্যতা।

প্রায় দু বছর তিনি আমেরিকাতে ছিলেন। সেখানকার বড় বড় শহরে ঘুরে ঘুরে তিনি বক্তৃতা দিতেন। তাঁর এই বক্তৃতায় আমেরিকার শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল। বহু মানুষ তার ভক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু ভারতীয় ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ তাঁর খ্যাতি প্রভাবে ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে। তারা স্বামীজীকে নানাভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। আমেরিকায় থাকার সময় মিস হেনরিয়েটা মুলার নামে এক ইংরেজ মহিলার আমন্ত্রণে ১৮৯৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ইংলন্ডে এসে পৌঁছলেন। কয়েক মাস পরেই আবার আমেরিকায় যেতে হয়। চার মাস পর পুনরায় তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। প্রায় সাত মাস ইংলণ্ডে ছিলেন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি অভূতপূর্ব খ্যাতি অর্জন করেন। এখানেই পরিচয় হয় মার্গারেটের সাথে। যিনি পরবর্তীকালে হন স্বামীজীর প্রিয় শিষ্যা ভগ্নী নিবেদিতা।

ইংলণ্ডে স্বামীজীর প্রভাব সম্পর্কে বিপিনচন্দ্র পাল একটি চিঠিতে লিখেছেন, ইংলণ্ডের অনেক জায়গায় আমি এমন বহু লোকের সান্নিধ্যে এসেছি যারা স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তি পোষণ করেন। সত্য বটে আমি তাঁর সম্প্রদায়ভুক্ত নই তথাপি আমাকে স্বীকার করতেই হবে বিবেকানন্দের প্রভাবগুণেই ইংলণ্ডে এখানকার অধিকাংশ লোক আজকাল বিশ্বাস করে যে প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রগুলোর মধ্যে বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক তত্ত্ব নিহিত আছে।

১৮৯৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর তিনি ভারতের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। দীর্ঘ চার বছরের বিদেশ ভ্রমণ শেষ হল। “এবার কেন্দ্র ভারতবর্ষ”। ১৮৯৭ সালের ১৫ই জানুয়ারি তিনি কলম্বেয় এসে পৌঁছান।

স্বামীজী শুধুমাত্র প্রাচ্যের বাণীকে ইউরোপ আমেরিকায় তুলে ধরে দেশের সম্মান বৃদ্ধি করেননি তার এই ঐতিহাসিক সাফল্যে ভারতবর্ষের মানুষ ফিরে পেয়েছিল তাদের আত্মবিশ্বাস আর আত্মমর্যাদা। যুগ যুগ ধরে পরাধীনতা, অশিক্ষা আর দারিদ্রের মধ্যে ভারতবর্ষের মানুষ হারিয়ে ফেলেছিল নিজেকে। সেই দিন তারই অনুপ্রেরণায় ভারতবর্ষের মানুষ নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করল।

২০শে জানুয়ারি কলকাতায় এসে পৌঁছলেন স্বামীজী। সেই দিন সমস্ত কলকাতা উত্তাল হয়ে উঠেছিল। কলকাতা তথা ভারতবর্ষের মানুষ সেই দিন তাদের অন্তরের সব শ্রদ্ধা ভালবাসা উজাড় করেছিল স্বামীজীর পদপ্রান্তে।

দেশে ফিরে এসেও বিশ্রাম নেবার কোন অবকাশ পেলেন না স্বামীজী। তিনি নিজেও জানতেন দেশের মানুষকে জাগিয়ে তোলবার জন্য যে গুরুদায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেছেন, সেখানে বিশ্রাম নেবার মত কোন অবকাশ নেই। তিনি দেশের যুবসমাজকে আহ্বান করে বলেছিলেন, “আমি তোমাদের নিকট এই গরীব অজ্ঞ অত্যাচারপীড়িতদের জন্য সহানুভূতি, এই প্রাণপণ চেষ্টা দায়স্বরূপ অর্পণ করিতেছি। তোমরা সারা জীবন এই ত্রিশ কোটি ভারতবাসীর উদ্ধারের ব্রত গ্রহণ কর–আমি সূচনা করিয়াছি, তোমরা সম্পূর্ণ কর।”

জাতীয় কল্যাণের এই আদর্শকে সামনে রেখে তিনি দেশের তরুণ সম্পদায়ের সামনে কর্মযোগের বাণীকে প্রচার করতে চেয়েছেন। এবং এই কাজের জন্য প্রয়োজন একটি কেন্দ্রীয় মঠের। যেখান থেকে শুধু তিনি নন, তাঁর শিষ্যরাও সন্ন্যাসযোগ ও কর্মযোগের সুমহান বাণীকে তুলে ধরতে পারবে দেশ-বিদেশে মানুষের কাছে।

১৮৯৭ সালে ১লা মে বলরাম বসুর বাড়িতে স্বামীজীর আহ্বানে শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত ও সন্ন্যাসীরা সকলে মিলিত হলেন। স্বামীজী বললেন, “নানান দেশ ঘুরে আমার ধারণা হয়েছে সঙ্ঘ ব্যতীত কোন বড় কাজ হতে পারে না।”

প্রতিষ্ঠিত হল রামকৃষ্ণ মিশন। বলা হল “মানবের হিতার্থে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ যে সকল তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন ও যে কার্যে তাহার জীবন প্রতিপাদিত হইয়াছে, তাহার প্রচারে এবং মনুষ্যের দৈহিক, মানসিক ও পারমার্থিক উন্নতিকল্পে যাহাতে সেই সকল তত্ত্ব প্রযুক্ত হইতে পারে তদ্বিষয়ে সাহায্য করা এই মিশনের উদ্দেশ্য।”

গঙ্গার তীরে বেলুড়ে জমি কেনা হল। এখানেই ১৮৯৮ সালের ৯ই ডিসেম্বর শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ স্থাপিত হল। বিবেকানন্দ সমস্ত আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে উঠে রামকৃষ্ণ মিশনকে সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। স্বামীজীর ভক্ত মিসেস ওলি বুল ও মিস হেনরিয়েটা মূলারের প্রদত্ত অর্থেই বেলুড় মঠের জমি কেনা হয় ও ভবন নির্মাণ করা হয়।

এই সময় স্বামীজীকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হত। ক্রমশই তাঁর শরীর ভেঙে পড়ছিল। মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। চিকিৎসকের নির্দেশে দার্জিলিং গেলেন।

১৮৯৮ সালে কলকাতায় প্লেগ দেখা দিল। স্বামীজী ছুটে এলেন কলকাতায়। শিষ্যদের নিয়ে শুরু করলেন অসুস্থ মানুষদের সেবা। রামকৃষ্ণের শিবজ্ঞানে জীব সেবার আদর্শ মূর্ত হয়ে উঠল স্বামীজীর মধ্যে। ১৮৯৯ সালের ২০শে জুন স্বামীজী দ্বিতীয়বারের জন্য ইউরোপ আমেরিকা ভ্রমণে বার হলেন। এই বার তার সাথে ছিলেন স্বামী তুরিয়ানন্দ ও তাঁর মানসকন্যা নিবেদিতা। সর্বত্রই তিনি পৃজিত হয়েছেন ভারতবর্ষের এক মহান মানব হিসাবে। তিনি পাশ্চাত্যের মানুষের কাছে উপনিষদের বাণীকেই নতুন করে প্রচার করেছিলেন। তিনি বললেন, মানুষের অন্তরে যে দেবত্ব আছে তাকে জাগিয়ে তোলাই মনুষ্যত্বের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। ইংল্যাণ্ড আমেরিকা ছাড়াও প্যারিস ভিয়েনা এথেন্স মিশর ভ্রমণ শেষ করে ৯ই ডিসেম্বর ১৯০০ সালে বেলুড় মঠে ফিরে এলেন।

১৯০১ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি বেলুড় মঠের ট্রাস্ট ভীড় রেজিস্ট্রী হয়। ১০ই ফেব্রুয়ারি মঠের ট্রাস্টীদের সর্বসম্মতিক্রমে স্বামী ব্রহ্মানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ এবং স্বামী সারদানন্দ সাধারণ সম্পাদক হন।

স্বামীজী মঠের সমস্ত কাজকর্ম থেকে প্রকৃতপক্ষে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে যান। কেউ কোন পরামর্শ চাইলে তিনি তাদের বুদ্ধিমত কাজ করার পরামর্শ দিতেন।

অত্যধিক পরিশ্রমে স্বামীজীর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। বেশির ভাগ সময় ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকতেন। ১৯০২ সালের জানুয়ারি মাসে জাপানী পণ্ডিত ডাঃ ওকাবুর সাথে বুদ্ধগয়ায় গেলেন। সেখানে থেকে কাশী। কিছুদিন পর আবার বেলুড়ে ফিরে এলেন। শরীর একেবারেই ভেঙে পড়েছিল।

১৯০২ সালের ৩রা জুলাই স্বামীজী তার ভক্ত-শিষ্যদের খাওয়ার পর নিজে হাত ধুইয়ে দিলেন। একজন জিজ্ঞাসা করল আমরা কি আপনার সেবা গ্রহণ করতে পারি? স্বামীজী বললেন, যীশুও তাঁর শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন।

পরদিন ১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই স্বামীজী সকাল থেকেই উৎফুল্ল ছিলেন। সকলের সঙ্গে একসাথে খেয়ে সন্ধ্যায় পর নিজের ঘরে ধ্যানে বসলেন। রাত ৯টা ৫০ মিনিটে সেই ধ্যানের মধ্যেই মহাসমাধিতে ডুবে গেলেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৯ বছর ৬ মাস।

২৫. যোহান উলফগ্যঙ ভন গ্যেটে

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে জার্মানিতে প্রকাশিত হল একখানি উপন্যাস, নাম “The sorrows of Werther” (তরুণ ভেক্টরের শোক)। উপন্যাস প্রকাশিত হবার সাথে সাথে সমস্ত জার্মানিতে আলোড়ন পড়ে গেল। ক্রমশই তার ঢেউ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আছড়ে পড়ল সমস্ত ইউরোপে, এমনকি সুদূর চীনেও।

কাহিনীর নায়ক ভের্টর এক ছন্নছাড়া যুবক। তার কবি মন স্বপ্নের জগতে বাস করে। মাঝে মাঝেই আঘাত পায়, বেদনায় ভেঙে পড়ে। আবার সব ভুলে নতুন করে স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সে স্বপ্নও ভেঙে যায়। নতুন জীবনের আশায় শহরের কাছে এক গ্রামে এল। গ্রামের মুক্ত প্রকৃতি গছা ফুল পাখি মানুষ মুগ্ধ করে ভেক্টরকে, প্রিয়তম বন্ধু হেলমকে চিঠি লেখে ভেক্টর। এই চিঠির মালা সাজিয়েই সৃষ্টি হয়েছে উপন্যাস। জীবনে আঘাত ব্যর্থতা হতাশায় শেষ পর্যন্ত সব আশা হারিয়ে আত্মহত্যা করে ভের্টর।

ভেক্টরের আশা নিরাশা তার কল্পনা রোমান্স সমস্ত মানুষের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করল। যুবক-যুবতীদের কাছে ভের্টর হয়ে উঠল আদর্শ। উপন্যাসের পাতা ছাড়িয়ে ভেক্টর হয়ে উঠল এক জীবন্ত মানব। তার অনুকরণে ছেলেরা পরতে আরম্ভ করল নীল কোট, হলদে ওয়েস্ট কোট। মেয়েরা নায়িকার মত সাদা পোশাক আর পিঙ্ক বো-তে নিজেদের সাজাতে থাকে। সকলেই যেন ভেক্টরের জীবনের সাথে জীবন মেলাতে দলে দলে যুবক-যুবতীরা আত্মহত্যা করতে আরম্ভ করল।

শুধু একটি মানুষ নির্বিকার। ভেক্টরের জীবনের সেই বিষাদ, বিষণ্ণতা, অন্ধকার তার জীবনকে স্পর্শ করতে পারেনি কারণ তিনি যে চির আলোর পথিক, ভেক্টরের স্রষ্টা, জার্মান সাহিত্যের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ পুরুষ যোহান উলফগ্যঙ ভন গ্যেটে।

গ্যেটের জন্ম জার্মানির ফ্রাঙ্কফুট শহরে। তারিখটি ছিল ১৭৪৯ সালের ২৮ শে আগস্ট। গ্যেটের প্রপিতামহ ছিলেন কামার, পিতামহ দর্জি। পিতামহ চেয়েছিলেন সম্ভ্রান্ত নাগরিক হিসাবে ছেলেকে গড়ে তুলতে। গ্যেটের পিতা যোহান ক্যাসপার পড়াশুনা শেষ করে উচ্চপদস্থ কর্মচারী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। যোহান ছিলেন যেমন শৃঙ্খলাপরায়ণ তেমনি সুপণ্ডিত। অন্যদিকে গ্যেটের মা ছিলেন সহজ সরল উদার হৃদয়ের মানুষ। গ্যেটের জীবনে পিতা এবং মাতা দুজনেরই ছিল ব্যাপক প্রভাব। গ্যেটে লিখেছেন, আমার জীবন সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল পিতার কাছ থেকে, মায়ের কাছে পেয়েছিলাম সৃষ্টির প্রেরণা।

ছেলেবেলা থেকেই গ্যেটে ছিলেন এক ভিন্ন চরিত্রের মানুষ। পিতা যোহান ক্যাসপার চেয়েছিলেন ছেলে তার মতই একজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী হবে। চার বছর বয়েসে গ্যেটেকে স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হল। কিন্তু স্কুলের ছোট্ট গণ্ডির মধ্যে অল্পদিনেই গ্যেটের প্রাণ হাঁপিয়ে উঠল। মাস্টারদের শাসন, অন্য ছেলেদের দুষ্টামি, কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার বেড়াজালে কিছুতেই নিজেকে মানিতে নিতে পারলেন না। অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বাধ্য হয়ে পিতা তাঁকে বাড়িতে এনে গৃহশিক্ষক রেখে পড়াবার ব্যবস্থা করলেন। একদিকে চলতে লাগল ল্যাটিন, গ্রীক, ইটালিয়ান, ইংরাজি ভাষা শিক্ষা, অন্যদিকে ছবি আঁকা, গান শেখা। এরই মধ্যে শৈশব কালেরই গ্যেটের মনে গড়ে উঠেছিল এক ভিন্ন জগৎ। যা প্রচলিত জীবন পথ থেকে স্বতন্ত্র, মাত্র ছ বছর বয়েসে ঈশ্বরের অস্তিত্বে সন্দেহ প্রকাশ করেন।

পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন গ্যেটে। দুচোখ ভরে দেখতেন প্রকৃতির অপরূপ শোভা। মানুষজন বাড়িঘর জীবনের নানা রূপ। যা কিছু একবার দেখতেন জীবনের স্মৃতিপটে তা অক্ষয় হয়ে থাকত। কৈশোরের এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তার নানান রচনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে।

কৈশোরেই শুরু হয়েছিল তাঁর সাহিত্য জীবনের হাতেখড়ি। তিনি নিজের সম্বন্ধে লিখেছেন, “যখন আমার দশ বছর বয়েস তখন আমি কবিতা লিখতে শুরু করি যদিও জানতাম না সেই লেখা ভাল কিম্বা মন্দ। কিন্তু উপলব্ধি করতে পারতাম অসাধারণ কিছু সৃষ্টি করবার ক্ষমতা আমার মধ্যে রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে জন্ম থেকেই তিনি কবি। কবিতা ছিল তার সত্তায় আর সেই সত্তার সাথে মিশে ছিল তাঁর প্রেম। যে প্রেমের শুরু মাত্র পনেরো বছর বয়েসে। শেষ প্রেম চুয়াত্তর বছর বয়েসে।

একদিন গ্যেটে তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে সরাইখানায় গিয়েছেন, সেখানে দেখলেন সরাইখানার মালিকের কিশোরী কন্য মাগুরিতকে। তাঁর চেয়ে কয়েক বছরের বড়। কিন্তু প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হলেন গ্যেটে। অল্প দিনেই দুজনে পরস্পরের প্রতি গভীর প্রেমে আকৃষ্ট হলেন। গ্যেটে লিখেছেন তার প্রতি আমার দুর্নিবার আকর্ষণ আমার মনের মধ্যে সৃষ্টি করল এক নতুন সৌন্দর্যের জগৎ আর আমাকে উত্তোরিত করল পবিত্রতম মহত্ত্বে।

গ্যেটের কৈশোর জীবনের প্রথম প্রেম দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাগুরিত ফ্রাঙ্কফুট ছেড়ে পিতার সঙ্গে গ্রামে চলে গেলেন।

বিচ্ছেদ বেদনায় সাময়িক ভেঙে পড়লেও ধীরে ধীরে আবার নিজেকে আনন্দ জগতে ভাসিয়ে দিলেন গ্যেটে। সমস্ত দিন বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আমোদ আহ্লাদেই কেটে যায়। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন পিতা। স্থির করলেন আইন পড়বার জন্য গ্যেটেকে লিপজিগে পাঠাবেন।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুধুমাত্র পিতাকে সন্তুষ্ট করবার জন্য গ্যেটে লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। আইনের প্রতি সামান্যতম আকর্ষণ ছিল না তার। ক্লাস কামাই করে অধিকাংশ সময় তিনি ঘুরে বেড়াতেন পথে প্রান্তরে, বাজারে মানুষের ভিড়ে। “আমি মনে করি এই পৃথিবী আর ঈশ্বর সম্বন্ধে আমার জ্ঞান কলেজের শিক্ষকদের চেয়ে বেশি। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চার-দেওয়ালের ক্লাসঘরের মধ্যে থেকে আমি যা জানতে পারব, বাইরের উন্মুক্ত পৃথিবীর মানুষদের কাছ থেকে তার থেকে অনেক বেশি জানতে পারবে।”

তাঁর এই জীবনবোধের অনুপ্রেরণায় মাত্র সতেরো বছর বয়সে রচনা করলেন নাটক Lover’s Quarrels এবং The fellow Sinners। শেষ নাটকটির বিষয়বস্তু হচ্ছে বিবাহিত জীবনের ব্যভিচার। এক বৃদ্ধ যিনি যৌবনের পাপের জন্য নিয়ত অনুশোচনায় যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, এক নৈতিক প্রশ্ন তাঁর জীবনে বড় হয়ে উঠেছে। তরুণ গ্যেটের মনে হয়েছে। আমরা সকলেই অপরাধী। অপরাধবোধের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার শ্রেষ্ঠ পথ অন্যকে ক্ষমা করা, অতীতকে বিস্মৃত হওয়া।

গ্যেটে কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনে পা দিয়েছেন। তাঁর স্বপ্নলু চোখ সুদর্শন চেহারা, প্রাণের উচ্ছলতা সকলকে আকৃষ্ট করে। এক অজানা আকর্ষণে যে তার সংস্পর্শে আসে, সেই মুগ্ধ হয়ে যায়।

উচ্ছ্বাসের রঙিন ফেনায় লিপজিগের দিনগুলো কাটতে থাকে। এই সময় গ্যেটের পরিচয় হল বাড়িওলার মেয়ে এনেৎ-এর সাথে কয়েকদিনের মধ্যেই তার প্রেমে পড়ে গেলেন গ্যেটে। কিন্তু অল্প দিনেই প্রেমের জোয়ারে ভাটা পড়ল গ্যেটের। এনেৎ-এর আচরণে তাঁর প্রতি সন্দিহান হয়ে পড়লেন। নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায় ভেঙে পড়লেন গ্যেটে। উপরন্তু বেহিসেবী উদ্দাম জীবনযাত্রার কারণে তার স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়েছিল। গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বন্ধুরা তাঁর জীবনের আশা ত্যাগ করল। কিন্তু অদম্য প্রাণশক্তিতে ভরপুর গ্যেটে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। আর লিপজিগ ভাল লাগছিল না। ফিরে এলেন ফ্রাঙ্কফুটে। যোহান ক্যাসপার চেয়েছিলেন ছেলে আইনজ্ঞ হয়ে ফিরে আসবে। গ্যেটে পিতার কাছে ফিরে এলেন তবে আইনজ্ঞ হয়ে নয়, কবি হয়ে।

ছেলের পরিবর্তন পিতা-মাতার চোখ এড়াল না। তবুও তারা আশা হারালেন না। এই সময় গ্যেটে মায়ের এক বন্ধু তাকে এ্যালকেমির (মধ্যযুগের রসায়ন শাস্ত্র) ভর্তি করে। দিলেন। শুরু হয় গ্যেটের এ্যালকেমি শিক্ষা। এই এ্যালকেমি বিদ্যাকেই তিনি রূপ দিয়েছেন তাঁর ফাউস্টে।

গ্যেটের পিতা চেয়েছিলেন পুত্র এ্যালকেমিস্ট হিসাবে নয়, আইনজ্ঞ হিসাবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করুক। পিতার ইচ্ছা অনুসারে ১৭৭০ সালে গ্যেটে ফ্রাঙ্কফুট ত্যাগ করে এলেন স্ট্যাটসবুর্গে। আইনের অসমাপ্ত পাঠ শেষ করবার জন্য ভর্তি হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। গ্যেটে যেখানে থাকতেন তারই সংলগ্ন ঘরে ছিল কয়েকজন ডাক্তারির ছাত্র। অল্প দিনেই তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন গ্যেটে। শুরু হল তাঁর শরীরতত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা। এখানেই পরিচয় হল বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকদের রচনাবলীর সাথে। ভর্তি হলেন সঙ্গীত শিক্ষার স্কুলে। দেখতে দেখতে অল্পদিনের মধ্যে গ্যেটে হয়ে উঠলেন স্ট্যাটসবুর্গের শিক্ষিত সমাজের মধ্যমণি।

গ্যেটের জীবনে ঘটল এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। গেটের পাশের কক্ষে থাকতেন ওয়েল্যান্ড নামে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক ছাত্র। একদিন গ্যেটেকে নিয়ে গেলেন স্ট্যাটসবুর্গের অদূরে এক গ্রাম্য যাজকের বাড়িতে। সেখানে দেখা হল যাজকের ১৮ বছরের তরুণী কন্যা ফ্রেডরিখ ব্রিয়নের সাথে। তার হাঁটু পর্যন্ত স্কার্টে ঢাকা রয়েছে। মুখে এক গ্রাম্য সরলতা। চোখে উজ্জ্বল স্বচ্ছ দৃষ্টি। প্রথম দর্শনেই ভালবাসার গভীর বাঁধনে বাঁধা পড়ে গেলেন দুজন। গ্রাম্য প্রকৃতির মাঝে ব্রিয়নের সহজ সরলতা, অনুপম সৌন্দর্য গ্যেটের জীবনের এক নতুন দিগন্তের দ্বারকে উন্মোচিত করল। এই প্রথম গ্যেটে অনুভব করলেন প্রকৃত প্রেমের স্বরূপ। বিবাহের কথা উঠল। কিন্তু গ্যেটে বুঝতে পারলেন সামাজিক কারণে তাদের মধ্যে বিবাহ হওয়া সম্ভব নয়। তখন আইন পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। ভাগ্যক্রমে গ্যেটে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। বাড়ি থেকে পিতার ডাক এল।

গ্যেটে বুঝতে পারছিলেন ফ্রেডরিখের সাথে তাঁর মিলন সম্ভব নয়। বিষণ্ণ হৃদয়ে গ্যেটে ফিরে গেলেন ফ্রাঙ্কফুটে। গ্যেটের জীবনে বহু নারীর আগমন ঘটেছিল, তাদের মধ্যে একমাত্র ফ্রেডরিখ সারা জীবন অবিবাহিত থেকে যান। নিজের সম্বন্ধে ফ্রেডরিখ বলেছিলেন, যে মন আমি গ্যেটেকে উৎসর্গ করেছি তা আর কাউকে দিতে পারব না।

ফ্রাঙ্কফুটে ফিরে আসতেই গ্যেটের পিতা তাঁকে পাঠালেন সুপ্রীম কোর্টে। মনের ইচ্ছা পুত্র আইনের জগতে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করুক। সুপ্রীম কোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করলেন গ্যেটে। কিন্তু আদালতের কাজকর্মের অবস্থা অল্পদিনেই আইন ব্যবসায়ের উপর সব শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেললেন গ্যেটে। স্থির করলেন আর আইন নয়, সাহিত্যই হবে তার জীবনের একমাত্র পেশা।

গ্যেটের প্রিয় লেখক ছিলেন শেকস্পীয়র। তাঁর অনুকরণে তিনি লিখলেন একটি পঞ্চম অঙ্কের নাটক। সাহিত্য হিসাবে এর সামান্যই মূল্য আছে।

সুপ্রীম কোর্টে কাজ করবার সময় গ্যেটে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই পরিবারের কুড়ি বছরের তরুণী কন্যা লটিকে দেখেই তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। গ্যেটে। কিন্তু অল্পদিনেই গ্যেটে জানতে পারলেন লটি অন্য পুরুষের বাগদত্তা। শুধু তাঁর সাথে প্রেমের অভিনয় করেছে। আকস্মিক এই আঘাতে মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন গ্যেটে। মনে হল আত্মহত্যা করবেন। কিন্তু ধীরে ধীরে মানসিক শক্তি সঞ্চয় করে আবার উঠে দাঁড়ালেন গ্যেটে।

লটির প্রতি ব্যর্থ প্রেমের স্মৃতি, তার প্রেমিকের প্রতি ঈর্ষা গ্যেটের মনোজগৎকে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল, চার সপ্তাহের মধ্যে রচনা করলেন তাঁর অবিস্মরণীয় উপন্যাস The sorows of Werther. তরুণ ভেক্টরের শোক। সমস্ত জার্মানি তথা ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সেই উপন্যাসের প্রতিক্রিয়া। চব্বিশ বছরের অখ্যাত যুবক গ্যেটে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন।

সেদিনকার কিছু সমালোচক এঁকে সেন্টিমেন্টাল রোমান্স বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও, তরুণ সমাজের কাছে এই বই চিরদিনের।

এই বইয়ের নায়ক এক তরুণ, নাম ভের্টর। স্বপ্নের জগতে বাস করে ভের্টর। তার মন পাখা মেলে উড়ে বেড়ায়। কিন্তু জীবনের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে সব স্বপ্ন তার ভেঙে গেল। একদিন পথে বেরিয়ে পড়ল। ঘুরতে ঘুরতে ভের্টর এসে পড়ল একটা ছোট গ্রাম ভালহাইমে। বসন্তকাল, সমস্ত প্রকৃতি নতুন সাজে সেজে উঠেছে। মুগ্ধ হয়ে গেল ভেক্টর। সেখানেই রয়ে গেল। মনে হল এখানেই জীবনের সব দুঃখকে ভুলতে পারবে।

ধীরে ধীরে তার মন শান্ত প্রকৃতিস্থ হয়ে আসছিল। এমন সময় দেখা হল শারললাটের সাথে। সে অ্যালবার্টের বাগদত্তা। তবুও তাকে দেখে মুগ্ধ হল ভের্টর। ভালবাসার বাঁধনে বাঁধা পড়ল সে। পরিচিত হল অ্যালবার্টের সাথে। অ্যালবার্টের শান্ত ভদ্র আচরণে বিভ্রান্ত ভের্টর। কেমন করে শারলোটকে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে আনবে, আবার শারলোটকে না পেলেও যে তার জীবন অন্ধকার।

মানসিক যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ে ভের্টর। শেষে ঠিক করল সে চলে যাবে অন্য কোথাও। বন্ধু তার জন্যে একটা চাকরি ঠিক করল। কিন্তু চাকরি নিয়েও সুখী হতে পারল না। একদিন সব ছেড়ে আবার ফিরে এল ভালহাইমে। শারলোট তখন অ্যালবার্টের স্ত্রী। সমস্ত অন্তর ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে ভেক্টরের। হতাশার বেদনায় আত্মহত্যা করল ভেক্টর। লাইম গাছের নিচে তার দেহ সমাধি দেওয়া হল।

সমস্ত উপন্যাসটি পত্রগুচ্ছের সংকলন। অনেকে বিদগ্ধ সমালোচকের অভিমত উনিশ শতকে ইংরেজি সাহিত্যে যে রোমান্টিক মুভমেন্টের বিকাশ ঘটেছিল তার মূল অনুপ্রেরণা তরুণ ভেক্টরের শোক।

তরুণ ভেক্টরের শোক যখন প্রকাশিত হল, গ্যেটে তখন আইন ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত ছিলেন। এই উপন্যাসের খ্যাতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্থির করলেন সাহিত্যকেই জীবনের একমাত্র অবলম্বন হিসাবে গ্রহণ করবেন। সম্ভবত এই সময় থেকেই গ্যেটের মনের মধ্যে ফাউষ্টের ভাবনা জন্ম নেয়।

১৭৭৪ সালে তিনি লিখলেন তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় নাটক Clavigo। এই নাটকের বিষয়বস্তু তিনি পেয়েছিলেন কোরআন থেকে।

গ্যেটের খ্যাতি জনপ্রিয়তা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বিভিন্ন স্থান থেকে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছিল। যদিও অভিজাত সম্প্রদায়কে তিনি তার বহু রচনায় বিদ্রূপ করেছেন তবুও তাদের প্রতি ছিল এক সহজাত আনুগত্যবোধ আর শ্রদ্ধা। তার এক বন্ধু রাজদরবারে চাকরি নেওয়ার পর তিনি লিখেছিলেন, “ক্ষমতাবান প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, তাদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার মধ্যে আমি কোন দোষ দেখি না। যদি শ্রেষ্ঠ মানুষদের সাথে সম্পর্ককে যথার্থভাবে কাজে লাগান যায় তবে তা সব সময়েই কল্যাণকর।”

যখন যুবরাজ কার্ল লুডউইগ তাঁকে ওয়েমারে আমন্ত্রণ করলেন, গ্যেটে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে যুবরাজের আতিথ্য গ্রহণ করলেন। তখন তার বয়স ছাব্বিশ। অবশিষ্ট জীবন তিনি এখানেই অতিবাহিত করেন।

প্রাসাদের কাছেই একটি উদ্যান বাড়িতে তার থাকার ব্যবস্থা হল। এখানে পরিচয় হল দুই কিশোর রাজকুমারের সঙ্গে। এই পরিচয় ভবিষ্যৎ জীবনে এক বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।

কার্ল ছিলেন শিক্ষা জ্ঞান শিল্প সংস্কৃতির গভীর পৃষ্ঠপোষক। গ্যেটের জ্ঞান সৃজনীশক্তি ব্যক্তিত্ব দেখে মুগ্ধ হলেন কার্ল। তাকে অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে নির্বাচিত করলেন। গ্যেটে উপলব্ধি করেছিলেন তার দায়িত্বের কথা। তাই সমস্ত কাজকে দুভাগে ভাগ করে নিয়েছিলেন। একদিকে রাজনীতি অন্যদিকে সাহিত্য সৃষ্টি। কনফুসিয়াসের মত তিনিও তরুণ যুবরাজকে নানান বিষয়ে শিক্ষা দিতেন, পরামর্শ দিতেন। এর জন্যে নিজেকে স্বাধীনতা বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত হতেন না। সাহিত্যে যিনি ছিলেন চির বিদ্রোহী, ব্যক্তিজীবনে তিনি তার সম্পূর্ণ বিপরীত, রাজশক্তির প্রতি চরম অনুগত।

একদিন তিনি ও সুরকার বিঠোফেন রাজপথ দিয়ে হাঁটছিলেন। সেই সময় যুবরাজ সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সকলে রাজপথ ছেড়ে সরে দাঁড়াল। বিঠোফেন কোন ভ্রূক্ষেপ না করে যুবরাজের সামনে দিয়েই পথ অতিক্রম করে গেলেন। কিন্তু গ্যেটে মাথার টুপি খুলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

এই আনুগত্যের পেছনে আরো একটি কারণ ছিল। তিনি যেমন সাহিত্য সংস্কৃতিকে ভালবাসতেন তেমনি চাইতেন সুখ বিলাসিতা। যুবরাজের সভাসদ হলেও প্রকৃতপক্ষে তার উপর কোন দায়িত্ব ছিল না। তার অধিকাংশ সময় কাটত জ্ঞানের চর্চায়।

এখানেই পরিচয় হল এক অভিজাত পরিবারের সুন্দরী তরুণীর সাথে। Lili Schonemann. অল্পদিনের মধ্যেই গভীর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠল দুজনের মধ্যে। বিবাহের প্রস্তাব দিলেন গ্যেটে। কিন্তু Lili-এর পরিবারের লোকজন গ্যেটের প্রতিষ্ঠার জন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে চাইলেন। ক্ষুব্ধ গ্যেটে নিজেই এই সম্পর্ক ছিন্ন। করলেন। কিন্তু এই প্রেম কালজয়ী হয়ে আছে ফাউস্টের বহু দৃশ্যে।

একদিকে যখন ফাউস্ট রচনার কাজ চলেছে, তারই পাশাপাশি আমেরিকান বিপ্লবের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে রচনা করলেন তাঁর নাটক, এগৰ্মত। এই নাটকের বিষয়বস্তু হল স্পেনের অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডবাসীদের বিদ্রোহ। এই নাটকের নায়ক কাউন্ট। এগৰ্মত ছিলেন দেশপ্রেমিক কিন্তু বাস্তব জ্ঞানহীন। নিজের সামর্থ্য শত্রুর শক্তিতে বিচার না করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সংগ্রামে। এই হটকারিতার জন্যেই শেষ হল তার জীবন।

১৭৭৯ সাল নাগাদ অসুস্থ হয়ে পড়লেন ডিউক কার্ল। স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য ডিউক এবং গ্যেটে গেলেন সুইজারল্যান্ডে। এখানকার শান্ত পরিবেশ, মনোরম প্রাকৃতিক নিসর্গ দৃশ্য। গ্যেটের মনে এক গভীর প্রশান্তি নিয়ে আসে। ওয়েমারে প্রত্যাবর্তন করে গ্যেটে গভীর অধ্যয়ন শুরু করলেন। মূলত বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ছাড়াও তিনি পড়তেন ইতিহাস, দর্শন, চিত্রকলা। গ্যেটের উদ্দেশ্য ছিল ওয়েমারের কৃষি, খনিজ উত্তোলন, সামরিক উন্নয়নের জন্য এই জ্ঞানকে কাজে লাগানো। তাছাড়া নিজেরই অন্তহীন জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পাওয়া ফাউস্টের মত গ্যেটেও ছিলেন চির জ্ঞান-অন্বেষী।

একদিকে চলছিল তাঁর জ্ঞান সাধনা অন্য দিকে সাহিত্য সাধনা। এগতের পর রচনা করলেন ভিন্নধর্মী উপন্যাস উইলেম মেস্তার। এই উন্যাসে গ্যেটের নিজের জীবনই অনেকাংশে প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। গ্যেটে যাদের ভালবেসেছিলেন তাদের কাউকেই জীবন সঙ্গী হিসাবে পাননি। ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রনা তাঁকে আহত করলেও চলার পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি। উপন্যাসের নায়ক মেস্তারের জীবনেও বারে বারে প্রেম এসেছিল কিন্তু প্রতিবারই সে ব্যর্থ হয়েছে। তবুও তার চলার ছন্দ বিনষ্ট হয়নি। কিন্তু ঘটনর আধিক্যে উপন্যাসের ছন্দ অনেকাংশে বিঘ্নিত হয়েছে।

তবে গ্যেটের সার্থক উপন্যাস কাইন্ডার্ড বাই চয়েস’ বা ‘সিলেকটিভ এ্যাফিনিটি’। একই পরিবেশের মধ্যে গড়ে উঠেছে কয়েকটি নরনারী-এডওয়ার্ড ও ওতিলে, শার্লোতে ও ক্যাপ্টেন। একদিকে নায়ক-নায়িকাদের ইচ্ছাশক্তি অন্যদিকে নিয়তি, এই দুই-এর দ্বন্দ্ব, তার বিস্তারই এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু।

উপন্যাস লিখলেও গ্যেটে অনুভব করেছিলেন উপন্যাসে নয়, নাটকেই তাঁর প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটা সম্ভব। একক প্রচেষ্টায় গড়ে তুললেন নাটকের দল লিটলট থিয়েটার। এই দলের প্রয়োজনে কয়েকটি অসাধারণ নাটক রচনা করেছিলেন। প্রথম পর্বের নাটকে দেখা যায় তারুণ্য আর যৌবনের উদ্দামতা। তার Stella নাটকে দেখা যায় নায়ক তার স্ত্রীর সাথে বাস করে, অন্যদিকে তার প্রেমিকাকেও ভালবাসে। তিনজনের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক পারস্পরিক সম্পর্ক। এ পরোক্ষভাবে দুই পত্নী গ্রহণের মতবাদ। এর বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে ওঠে। নিরুপায় হয়ে গ্যেটে নাটকের শেষ অঙ্কের পরিবর্তন ঘটালেন। নায়ক স্থির করতে পারে না কাকে বেছে নেবে স্ত্রী না প্রেমিকাকে? মানসিক দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে।

কিন্তু ক্রমশই গ্যেটের মধ্যেকার এই বিদ্রোহ মনোভাব প্রশমিত হয়ে আসে। যৌবনের উদ্দামতায় যিনি বিদ্রোহী হয়ে সব কিছুকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, এখন হয়ে ওঠেন প্রজ্ঞাবান দার্শনিক, যিনি সব কিছুর মধ্যে অন্বেষণ করেন সৌন্দর্যের প্রজ্ঞার, তিনি জানতেন অভিজাতদের বাইরের সৌন্দর্যের মধ্যে প্রকৃত সৌন্দর্যকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। একদল কয়লা খনির শ্রমিক, রুটি তৈরির কারিগরকে দেখে বলেছিলেন তথাকথিত এই নিচু সমাজের মানুষেরাই ঈশ্বরের চোখে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে সুন্দর।

মানুষের প্রতি এই অন্তহীন ভালবাসাই ছিল তাঁর সৃষ্টির মূল উৎস। একবার ডিউক কার্ল ফরাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ডিউক যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করবার জন্যে ডেকে পাঠালেন গ্যেটেকে। গ্যেটে এলেন কিন্তু মানুষের এই বীভৎসতা তাঁর ভাল লাগল না। তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে এক নির্জন অঞ্চলে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন ফুল, প্রকৃতি। দেশকে তিনি ভালবাসতেন। যখন তাঁকে বলা হয়েছিল যুদ্ধের জন্য গান লিখতে, তিনি বলেছিলেন, যে বিষয়ে আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই, সেই বিষয়ে আমি একটি শব্দও উচ্চারণ করি না। আমি যা ভালবাসি শুধু তারই গান গাইতে পারি।

১৭৮৮ সাল, তখন গ্যেটের বয়স ৩৯। তারুণ্যের প্রান্তে পৌঁছে পরিচয় হল ক্রিস্টেন ভারপাইনের সাথে। ক্রিস্টেন তার ভাইয়ের জন্য একটি সুপারিশপত্র নিয়ে এসেছিলেন গ্যেটের কাছে। ক্রিস্টেনের স্নিগ্ধ সৌন্দর্য শান্ত স্বভাব, সম্বপূর্ণ ব্যবহার দেখে মুগ্ধ হলেন গ্যেটে। ক্রিস্টেনকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন। দীর্ঘ আঠারো বছর তারা একত্রে রয়ে গেলেন। ১৮০৬ সালে শুধুমাত্র সন্তানের পরিচয়ের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য দুজনে বিবাহ করেন।

গ্যেটের জীবনের আরেকটি ঘটনা, কবি শীলারের সাথে পরিচয়। এই পরিচয় অল্পদিনের মধ্যেই গভীর বন্ধুত্বে পরিণত হল। যদিও দুজনে ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের মানুষ। গ্যেটের বয়স তখন ৪৫, শীলারের ৩৫। গ্যেটে প্রাণবন্ত সজীব, শীলার অসুস্থ। ধর্মের প্রতি গ্যেটের প্রাণবন্ত সজীব, শীলার অসুস্থ। ধর্মের প্রতি গ্যেটের কোন আগ্রহ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন অন্তরের প্রকৃতির সৌন্দর্যে। অন্যদিকে শীলার ছিলেন ধর্মভীরু, তিনি বিশ্বাস করতেন ন্যায়বিচারে। গ্যেটে পেয়েছেন ভাগ্যের অকৃপণ সহায়তা, নারীর প্রেম কিন্তু শীলার পেয়েছেন শুধু দারিদ্র্য আর বঞ্চনা। এত বৈষম্য সত্ত্বেও দুজনের বন্ধুত্ব ছিল অকৃত্রিম। এই বন্ধুত্ব দুজনের সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। শীলার Horen নামে একটি পত্রিকা সম্পাদন করতেন। গ্যেটে এই পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। এই সময় তাদের লেখার একাধিক বিরূপ সমালোচনা হতে থাকে। দুজনে সরস বুদ্ধিদীপ্ত কবিতায় তার জবাব দিতে থাকেন। ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে। যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ Musen Almanach।

১৮০৫ সালে যখন শীলারের মৃত্যু হয়, গ্যেটে শিশুর মত কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। এক বন্ধুকে লিখেছিলেন আমার অর্ধেক অস্তিত্ত্ব চলে গেল।

মাত্র ৪৫ বছর বয়েসে বন্ধু দেহরক্ষা করলেও ঈশ্বরের আশীর্বাদে দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন গ্যেটে। ১৭৪৯-১৮৩২ প্রায় তিরাশি বছর-এই সুদীর্ঘ জীবনে অনেক কিছু হারাতে হয়েছে তাঁকে-প্রিয় বন্ধু, আদরের বোন, প্রিয়তমা স্ত্রী, একমাত্র সন্তান। এত বেদনার মধ্যেও তাঁর জীবনের অপ্রতিহত গতি কখনো রুদ্ধ হয়নি। তিনি তাঁর সমস্ত যন্ত্রণা বেদনাকে ব্যর্থতাকে রূপান্তর ঘটিয়েছেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে। এমন বিস্ময়কর বহুমুখী প্রতিভা মানব ইতিহাসে দুর্লভ। কি ছিলেন না তিনি? কবি, নাট্যকার, চিত্রকর, সঙ্গীতজ্ঞ, বিজ্ঞানী, দার্শনিক।

তিনি প্রায় ৬০টি বই লিখেছেন-এর মধ্যে আছে গাথা, গীতিকবিতার ব্যঙ্গনাটক, কাব্য, নাটক, প্রবন্ধ, উপন্যাস, মজাদার কাহিনী, ভূত-দৈত্যদানার গল্প। তার এই বহুব্যাপ্ত প্রতিভার নির্যাস দিয়ে সমস্ত জীবন ধরে সৃষ্টি করেছেন ফাউস্ট, যার প্রথম খণ্ড লিখতে লেগেছিল ত্রিশ বছর, দ্বিতীয় খণ্ড শেষ করতে লেগেছিল পঁচিশ বছর।

ফাউস্টের কাহিনী প্রচলিত কাহিনী থেকেই নেওয়া। স্বর্গে ঈশ্বর ও দেবদূতেরা। মিলিত হয়েছেন। সকলে যখন ঈশ্বরের বন্দনা গান গাইছে, শয়তানদের প্রভু মেফিস্টোফিলিস বলল, ঈশ্বরের সৃষ্ট মানবের চরম ব্যর্থতার কথা।

ভগবান বললেন, তার অনুগত সেবক ফাউস্টের কথা।

শয়তান বলল, আমি তার বুদ্ধি বিনাশ করে আমার দলে নিয়ে আসব।

ভগবান বললেন, মানুষ হয়ত ভুল করতে পারে কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখবে তার অন্তরে এক সৎ আত্মা জেগে উঠছে।

ঈশ্বরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতার অহংকার নিযে মেফিস্টোফিলিস পৃথিবীতে ফিরে আসে। ফাউস্টকে সে জয় করবেই।

ফাউস্ট মহাজ্ঞানী। মানুষের সমস্ত জ্ঞানকে সে আত্মস্থ করেছে, তবুও তার মনে হয়েছে এই বিশ্বের রহস্য তার কাছে অজ্ঞাত। তাই সব জ্ঞান বর্জন করে আশ্রয় নিয়েছে জাদুবিদ্যার।

ফাউস্টের শিষ্য ভাগনার। সেও গুরুর মত জ্ঞানের সন্ধানী।

ফাউস্ট নিজের পাঠাগারে রাশি রাশি পুঁথির মধ্যে বসে অস্থির হয়ে ওঠে। মনে হয় এই প্রাণশূন্য শুষ্ক পুঁথি তার দুঃখ, মানসিক যন্ত্রণাকেই যেন বাড়িয়ে দিয়েছে। জীবনের কোন অর্থই খুঁজে পায় না ফাউস্ট। বিষের শিশি তুলে নিয়ে স্থির করে এই যন্ত্রণাময় জীবনকে শেষ করবে।

এমন সময় কানে আসে ইস্টারের সঙ্গীত। প্রভু যীশুর পুনরভ্যুত্থান, তাঁর প্রেমের বন্দনা। মুহূর্তে ফাউস্টের সমস্ত অন্তর এক অজানা আনন্দে পূর্ণ হয়ে ওঠে। তার দু চোখ বেয়ে নামে অশ্রুধারা।

পরদিন ইস্টার। ফাউস্ট তাঁর শিষ্য ভাগনারকে নিয়ে নগর প্রাকারে আসে। নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ আনন্দ করছে। ফাউস্টও তাদের সাথে যোগ দেয়। এই প্রথম সে উপলব্ধি করে সকলের আনন্দের সাথে নিজের আনন্দকে মিশিয়ে দেবার আনন্দ।

সন্ধ্যেবেলায় গৃহ পথে ফেরার সময় চোখে পড়ে একটা কুকুর তাদের অনুসরণ করছে। কুকুরটা সামনে এসে বিরাট আকার ধারণ করল, তারপর পরিণত হল এক ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে। সেই ধোয়া থেকে বেরিয়ে এল শয়তান মেফিস্টো ফিলিস। ফাউস্টের সামনে এসে বলল, প্রভুর কি হুকুম?

ফাউস্ট জানতে চায় তার পরিচয়। শয়তান ফাউস্টকে বলে সে ফাউস্টের দাসত্ব করবে। ফাউস্টের সকল আকাঙ্ক্ষাকে তৃপ্ত করবে।

কিন্তু তার বিনিময়ে ফাউস্টকে কি দিতে হবে?

শয়তান জবাব দিল জীবনে সে হবে ফাউস্টের ভৃত্য মৃত্যুর পর ফাউস্ট হবে তার ভূত।

জীবনের পর অনন্ত অন্ধকার। সেই অন্ধকারের কথা ভাবে না ফাউস্ট। তার চাই জীবনের সুখ।

রক্তের অক্ষরে চুক্তি লেখা হয় তাদের।

দুজনে বেরিয়ে পড়ল পথে। প্রথমে এল এক সরাইখানায়। সেখানকার আনন্দ উল্লাস ভাল লাগে না ফাউস্টের। তখন শয়তান তাকে নিয়ে এল ডাকিনীদের কাছে। তারা দিল জাদু পানীয়। সেই পানীয় খেতেই বয়োবৃদ্ধ ফাউস্ট হল সজীব উজ্জ্বল এক তরুণ।

দুজন পথে বেরিয়ে পড়ল। সেই পথে চলেছিল একটি মেয়ে, নাম মার্গারেট, নিষ্পাপ কুমারী। তাকে ভাল লাগে ফাউস্টের। এমন পবিত্র হৃদয়কে স্পর্শ করবার ক্ষমতা নেই শয়তানের। কিন্তু মার্গারেটের প্রেমে মুগ্ধ ফাউস্ট তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে চায়। কিন্তু তার সেই অনুরোধ ফিরিয়ে দেয় মার্গারেট। তার বাড়িতে গিয়ে এক বাক্স অলঙ্কার রেখে আসে। এমন বহুমূল্য গহনা দেখে কি করবে ভেবে না পেয়ে মার্গারেট পাদ্রীর কাছে দিয়ে আসে। তাই দেখে পরের দিন আরেক বাক্স গহনা রেখে এল শয়তান। আজ আর গহনা পাদ্রীর কাছে ফেরত দেয়া না। সে পাড়ার এক কাছে লুকিয়ে রেখে আসে। ইচ্ছে সেখান থেকেই মাঝে মাঝে এক-আধটা গহনা পরবে, মা কিছুই জানতে পারবে না।

শয়তান মেফিস্টোফিলিস আর ফাউস্ট আসে কাছে। শয়তান তরুণের বেশে প্রলুব্ধ করে অন্যদিকে নিয়ে যায়। আর ফাউস্ট মার্গারেটের কাছে আসে। মুগ্ধ হয় মার্গারেট। ফাউস্টের অন্তরে জাগে ভালবাসা। কোন কলুষতার স্পর্শ লাগে না সেখানে। কিন্তু শয়তান চায় কামনার আগুন জ্বালিয়ে দিতে। মার্গারেট শয়তানকে দেখে ভয় পায়। কিছুতেই ভেবে পায় না ফাউস্টের মত এমন একজন ভদ্র মানুষের কি করে সে অনুচর হল।

ফাউস্টের কামনার আগুন একদিন জ্বলে উঠল। শয়তান মার্গারেটের মাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিল। সেই ওষুধে মারা গেল মার্গারেটের মা। সন্তানসম্ভবা হল মার্গারেট।, মার্গারেটের ভাই ছিল সৈনিক। সে বোনের এই অধঃপতন সহ্য করতে পারল না। একদিন আক্রমণ করল ফাউস্ট আর শয়তানকে। শয়তানের প্ররোচনায় ফাউস্ট আঘাত করে হত্যা করল মার্গারেটের ভাইকে।

অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ফাউস্ট জানতে পারল মার্গারেট তার শিশুসন্তানকে বিসর্জন দিয়েছিল, তাই তাকে বন্দী করা হয়েছে। তাছাড়া মা-ভাইয়ের মৃত্যুর জন্যেও তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বিচারে তার প্রাণদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। দুঃখে অনুশোচনায় ভেঙে পড়ল ফাউস্ট। তার সমস্ত ক্ষোভ ফেটে পড়ল শয়তানের উপর। স্থির করল যেমন করেই হোক সে উদ্ধার করবেই মার্গারেটকে। শয়তান তাকে কারাগারে নিয়ে গেল। মার্গারেট তখন উন্মাদ। অসহায়ের মত কারাগার থেকে বেরিয়ে এর ফাউস্ট। মৃত্যু হল মার্গারেটের।

এখানেই শেষ ফাউস্টের প্রথম খণ্ড।

দ্বিতীয় খণ্ডে ফাউস্টকে দেখা গেল এক সমাটের দরবারে জাদুকররূপে। সমাট ভোগবিরাসে মত্ত। রাজ্যে কোন শৃঙ্খলা নেই। শয়তান মেফিস্টোফিলিস উৎসবের আয়োজন করেছে। একের পর এক দৃশ্য সৃষ্টি করে চলেছে ফাউস্ট। তার পেছনে কাজ করছে শয়তান। সম্রাট চাইলেন জাদুবিদ্যার দ্বারা ট্রয়ের রানী হেলেন আর তার অপহরণকারী প্যারিসকে নিয়ে আসতে হবে। শয়তানের সাহায্যে কুয়াশার মধ্যে আবির্ভূত হল হেলেন আর প্যারিস। সকলে বিস্ময়ে মুগ্ধ হতবাক। কি অপরূপ এই নারী হেলেন। প্যারিস যখন তার প্রণয়ী হেলেনকে অপহরণ করে নিয়ে চলেছে, নিজেকে সংযত রাখতে পারল না ফাউস্ট। সে চাবি ছুঁড়ে আঘাত করে। সাথে সাথে অদৃশ্য হয়ে যায় সেই ছায়ামূর্তি। আর জ্ঞান হারিয়ে ফেলল ফাউস্ট।

চারদিকে ধিক্কারধ্বনি উঠল। শয়তান ফাউস্টকে নিয়ে এল তার পুরনো পাঠাগারে। সেখানে সব কিছুই আগের মত আছে। ভাগনার সেখানে গবেষণা করে চলেছে কৃত্রিম। মানুষ সৃষ্টির। তৈরি হয়েছে এক ক্ষুদ্র মানুষ।

ফাউস্টের জ্ঞান ফিরে আসতেই সে বলল, হেলেনকে ছাড়া জীবনে সে কোন কিছুই চায় না। শয়তান নিয়ে এল হেলেনকে। ফাউস্ট তখন আর্কেডিয়া রাজ্যের রাজা। মিলন হল দুজনের। একটি সন্তান জন্মাল কিন্তু তাকে মৃত্যুবরণ করতে হল। পুত্রের মৃত্যুর বেদনায় মারা গেল হেলেন। স্ত্রী-পুত্রের মৃত্যুতে ফাউস্টের মনোলোকে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দিল। সকল তুচ্ছতা সংকীর্ণতার ঊর্ধের উঠে যায় তার মন। সে এক মহত্তর পরিপূর্ণতার ধ্যানে আত্মমগ্ন হতে চায়। সমুদ্রের তীরে এক নির্জন অনুর্বর প্রান্তরে গড়ে তুলতে চায় শস্যক্ষেত্র, নতুন জনবসতি।

ফাউস্টের চিন্তা-ভাবনায় অস্থির হয়ে ওঠে শয়তান। এ ফাউস্টযেন তার ইচ্ছাশক্তির দাস নয়। শয়তানের সাহায্যে গড়ে ওঠে নতুন জনপদ। সেখানে তৈরি হয়েছে প্রাসাদ, বাগান, বাড়ি, ঘর। তৈরি হয়েছে জলাশয়, খাল।

ফাউস্ট এখন বৃদ্ধ, ধীর শান্ত। নিজের মধ্যেই আত্মমগ্ন হয়ে থাকে। সেই প্রাসাদের কাছেই থাকত এক বুড়ো-বুড়ি। তাদের কুটিরে বসে উপাসনা করত। তাদের উপসনার ঘণ্টাধ্বনি বেজে উঠত। মাঝে মাঝে এত তন্ময়তার গভীরে ডুব দিত ফাউস্ট, যে সেই মৃদু ঘণ্টাধ্বনিও তার তন্ময়তা ভঙ্গ করত। ফাউস্ট আদেশ দিল ঐ বুড়ো-বুড়িকে সরিয়ে দিতে।

সাথে সাথে শয়তান গিয়ে আগুন জ্বানিয়ে দিল কুটিরে। এই দৃশ্য দেখে রাগে ফেটে পড়ল ফাউস্ট। সে তো দুই বুড়ো-বুড়িকে হত্যা করতে চায়নি চেয়েছিল অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে।

বয়েসের ভারে ক্রমশই স্থবরি আসে ফাউস্ট। চোখের দৃষ্টি কমে আসে। কিন্তু তবুও কাজ করে চলে ফাউস্ট। তার অপর কোন কামনা নেই, স্বর্গের কোন ভাবনা নেই তার, যা কিছু কাজ এই পৃথিবীতে শেষ করে যেতে হবে।

শ্রমিকেরা কাজ করে। তাদের বিচিত্র শব্দ ভেসে আসে। ফাউস্টের মনে হয় কর্মের মধ্যে যেন সঙ্গীতের সুর। এক অপার্থিব আনন্দে তার সমস্ত অন্তর ভরে ওঠে।

গড়ে উঠেছে নতুন জনপদ, কৃষিক্ষেত্র, জীবনের প্রবাহ। ফাউস্টের মন আনন্দে ভরে ওঠে। মনে তার সব কাজ শেষ হয়েছে। পরম শান্তিতে মৃত্যুবরণ করে।

শয়তান আসে ফাউস্টের আত্মাকে দখল করতে। কিন্তু তার আগে এসে দাঁড়াল দেবদূতের দল। শয়তান চেয়েছিল সুখ আর ভোগের বিলাসে ফাউস্টকে ভাসিয়ে দিতে। কিন্তু সেই সুখ আর ভোগবিলাসকে অতিক্রম করে ফাউস্ট খুঁজে পেয়েছিল এক মহত্তর জীবন। তাই শয়তানের কোন অধিকার নেই তার উপর। দেবদূতের দল তার আত্মাকে নিয়ে গেল ঈশ্বরের কাছে।

সংক্ষেপে এই ফাউস্টের কাহিনী। মহাকবি গ্যেটে তাঁর জীবনব্যাপী সাধনা দিয়ে গড়ে তুলেছেন এই ফাউস্টের। ফাউস্ট যেন তাঁরই আত্মার প্রতিরূপ। সে সমস্ত জীবন কর্মের সাধনায়, জ্ঞানের সাধনায় নিজেকে ব্যাপ্ত রেখেছিল। ফাউস্টের মধ্যে ফুটে উঠেছে। মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি। মানব জীবনের সব আশা-নিরাশা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, পাপ-পুণ্য নিয়ে আত্মিক-আধ্যাত্মিক সংকটের বিচিত্র রূপ এখানে ফুটে উঠেছে। এই কাব্য পৃথিবীর সাহিত্য জগতের এক অনন্য সম্পদ।

ফাউস্টের রচনাপর্বেই গ্যেটে রচনা করেন তার আত্মজীবনীমূলক রচনা “কাব্য এবং সত্য”। যদিও এতে তিনি সঠিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করেননি তবুও তাঁর জীবন সম্বন্ধে। অনেক কিছু জানা যায়।

জীবনের শেষ পর্বে এসে প্রাচ্যের কবি হাফিজের কাব্যের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন এবং তারই প্রভাবে রচনা করেন বেশ কিছু কবিতা।

বৃদ্ধ হয়েও যৌবনের মত তারুণ্যের দীপ্তিতে ভরপুর হয়ে থাকতেন গ্যেটে। শোনা যায় ভাইমারের যুদ্ধের পর যখন নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনী জার্মানি দখল করে, নেপোলিয়ন আদেশ দিয়েছিলেন গ্যেটের প্রতি সামান্যতম অমর্যাদা যেন না করা হয়। তিনি গ্যেটেকে আমন্ত্রণ করেছিলেন তাঁর প্রাসাদে।

গ্যেটে যখন এলেন, নেপোলিয়ন বিস্ময়ভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠেছিলেন, একটা মানুষ আপনি!

বৃদ্ধ গ্যেটের ব্যক্তিত্ব, তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়েছিলেন নেপোলিয়ন। তার সাথে নানান বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। বহু বিষয়ে গ্যেটে নেপোলিয়নের মতের সাথে একমত হতে পারেননি। গ্যেটে স্পষ্টভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করেছিলেন। গ্যেটে যখন চলে : যান, নেপোয়িন গভীর শ্রদ্ধায় আবার বলেছিলেন একটা মানুষ বটে।

গ্যেটে সম্বন্ধে নেপোলিয়নের এই মন্তব্য যথার্থই সত্য। একজন পরিপূর্ণ মানুষ।

জীবনের অন্তিম লগ্নে এসেও এই মানুষটি বিস্মৃত হননি তিনি মানুষ, ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ জীব-যে প্রতিমুহূর্তে নিজেকে উত্তরণ করে চলেছে অন্ধকার থেকে আলোকে।

১৮৩২ সালের ২২শে মার্চ। কয়েকদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন গ্যেটে। অনুরাগীরা তাঁকে এনে বসিয়ে দিল তাঁর পাঠকক্ষের চেয়ারে। সকলেই অনুভব করছিল কবির জীবনদীপ নির্বাপিত হয়ে আসছে। এক বিষণ্ণ বেদনায় আচ্ছন্ন হয়েছিল তাদের মন। দিন শেষ হয়ে এসেছিল। বাইরে অন্ধকারের ছায়া নেমে এসেছিল।

গ্যেটে চোখ মেলে তাকালেন। অস্ফুটে বলে উঠলেন, “আরো আলো।”

তারপরই স্তব্ধ হয়ে গেল চির আলোর পথিক গ্যেটের মহাজীবন।

২৬. আলেকজান্ডার ফ্লেমিং

আলেকজান্ডার ফ্লেমিং-এর জন্ম হয় ১৮৮১ সালের ৬ই আগস্ট স্কটল্যাণ্ডের অন্তর্গত লকফিল্ড বলে এক পাহাড়ি গ্রামে। বাবা ছিলেন চাষী। আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। দারিদ্র্যের মধ্যেই ছেলেবেলা কাটে ফ্লেমিংয়ের। যখন তার সাত বছর বয়স, তখন বাবাকে হারান। অভাবের জন্য প্রাইমারী স্কুলের গণ্ডিটুকুও শেষ করতে পারেননি। যখন ফ্লেমিংয়ের বয়স চৌদ্দ, তাঁর ভাইরা সকলে এসে বাসা বাঁধল লণ্ডন শহরে। তাদের দেখাশুনার ভার ছিল এক বোনের উপর। কিছুদিন কাজের সন্ধানে ঘোরাঘুরি করবার পর ষোল বছর বয়স এক জাহাজ কোম্পানিতে চাকরি পেলেন ফ্লেমিং। অফিসে ফাইফরমাশ খাটার কাজ।

কিছুদিন চাকরি করেই কেটে গেল। ফ্লেমিংয়ের এক চাচা ছিলেন নিঃসন্তান। হঠাৎ তিনি মারা গেলেন। তাঁর সব সম্পত্তি পেয়ে গেলেন ফ্লেমিংয়ের ভাইরা। আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের বড় ভাই টমের পরামর্শ মত ফ্লেমিং জাহাজ কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়ে মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হলেন।

অন্য সকলের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও অসাধারণ মেধায় অল্পদিনেই সকলকে পেছনে ফেলে মেডিক্যাল স্কুলের শেষ পরীক্ষায় প্রথম হলেন ফ্লেমিং। তিনি সেন্ট মেরিজ হাসপাতালে ডাক্তার হিসাবে যোগ দিলেন।

১৯০৮ সালে ডাক্তারির শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন কারণ সেনাবাহিনীতে খেলাধুলোর সুযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি।

কয়েক বছর সামরিক বাহিনীতে কাজ করবার পর ইউরোপ জুড়ে শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। সে সময় ফ্লেমিং ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীর ডাক্তার হিসাবে কাজ করছিলেন। তিনি ব্যাকটেরিয়া নিয়ে যে গবেষণা করেছিলেন, এখানেই প্রথম তার পরীক্ষা করবার সুযোগ পেলেন।

হাসপাতালে প্রতিদিন অসংখ্য সৈনিক এসে ভর্তি হচ্ছিল। তাদের অনেকেরই ক্ষত ব্যাকটেরিয়ার দূষিত হয়ে উঠেছিল। ফ্লেমিং লক্ষ্য করলেন। যে সব অ্যান্টিসেপটিক ঔষধ চাল আছে তা কোনভাবেই কার্যকরী হচ্ছে না ক্ষত বেড়েই চলেছে। যদি খুব বেশি পরিমাণে অ্যান্টিসেপটিক ঔষধ ব্যবহার করা হয়, সে ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া কিছু পরিমাণে ধ্বংস হলেও দেহকোষগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফ্লেমিং উপলব্ধি করলেন দেহের স্বাভাবিক শক্তি একমাত্র এসব ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রতিরোধ করতে পারে কিন্তু তার ক্ষমতাও সীমাবদ্ধ।

১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হল। দু মাস পর ইংল্যাণ্ডে ফিরে এলেন ফ্লেমিং। আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জীবাণুগুলোকে ধ্বংস করবার মত কোন কিছুই খুঁজে পেলেন না।

ইংল্যাণ্ডে ফিরে এসে তিনি সেন্ট মেরিজ মেডিক্যাল স্কুলে ব্যাকটেরিওলজির প্রফেসার হিসাবে যোগ দিলেন। এখানে পুরোপুরিভাবে ব্যাকটেরিওলজি নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সঠিকভাবে উপলব্ধি করলেন, মানবদেহে কিছু নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে যা এই বহিরাগত জীবাণুদের প্রতিরোধ করতে পারে। কিন্তু তার প্রত্যক্ষ কোন প্রমাণ পেলেন না।

১৯২১ সাল একদিন ল্যাবরেটরিতে বসে কাজ করছিলেন ফ্লেমিং। কয়েকদিন ধরেই তাঁর শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না। সর্দি-কাশিতে ভুগছিলেন। তিনি তখন প্লেটে জীবাণু কালচার নিয়ে কাজ করছিলেন হঠাৎ প্রচণ্ড হাঁচি এল। নিজেকে সামলাতে পারলেন না ফ্লেমিং। প্লেটটা সরাবার আগেই নাক থেকে খানিকটা সর্দি এসে পড়ল প্লেটের উপর। পুরো জিনিসটা নষ্ট হয়ে গেল দেখে প্লেটটা একপাশে সরিয়ে রেখে নতুন একটা প্লেট নিয়ে কাজ শুরু করলেন। কাজ শেষ হয়ে গেলে বাড়ি ফিরে গেলেন ফ্লেমিং। পরদিন ল্যাবরেটরিতে ঢুকেই টেবিলের একপাশে সরিয়ে রাখা প্লেটটার দিকে নজর পড়ল। ভাবলেন প্লেটটা ধুয়ে কাজ শুরু করবেন। কিন্তু প্লেটটা তুলে ধরতেই চমকে উঠলেন। গতকাল প্লেট ভর্তি ছিল জীবাণু সেগুলো আর নেই। ভাল করে পরীক্ষা করতেই দেখলেন সব জীবাণুগুলো মারা গিয়েছে। চমকে উঠলেন ফ্লেমিং। কিসের শক্তিতে নষ্ট হল এতগুলো জীবাণু। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল গতকাল খানিকটা সর্দি পড়েছিল প্লেটের উপর। তবে কি সর্দির মধ্যে এমন কোন উপাদান আছে যা এই জীবাণুগুলোকে ধ্বংস করতে পারে! পর পর কয়েকটা জীবাণু কালচার করা প্লেট টেনে নিয়ে তার উপর নাক ঝাড়লেন। দেখা গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই জীবাণুগুলো নষ্ট হতে আরম্ভ করেছে। এই আবিষ্কারের উত্তেজনায় নানাভাবে পরীক্ষা শুরু করলেন ফ্লেমিং। দেখা গেল চোখের পানি, থুতুতেও জীবাণু ধ্বংস করবার ক্ষমতা আছে। দেহনিৰ্গত এই প্রতিষেধক উপাদানটির নাম দিলেন লাইসোজাইম। লাইস অর্থ ধ্বংস করা, বিনষ্ট করা। জীবাণুকে ধ্বংস করে তাই এর মান লাইসোজাইম।

এই সোজাইম সাধারণ জীবাণুগলোকে ধ্বংস করলেও অধিকতর শক্তিশালী জীবাণুগুলোর ক্ষেত্রে ব্যর্থ হল।

তারপর আট বছর কেটে গেল।

একদিন কিছুটা আকস্মিকভাবেই ঝড়ো বাতাসে খোলা জানলা দিয়ে ল্যাবরেটরির বাগান থেকে কিছু ঘাস পাতা উড়ে এসে পড়ল জীবাণু ভর্তি প্লেটের উপর। খানিক পরে কাজ করবার জন্য প্লেটগুলো টেনে নিতেই দেখলেন জীবাণুর কালচারের মধ্যে স্পষ্ট পরিবর্তন। মনে হল নিশ্চয়ই এই আগাছাগুলোর মধ্যে এমন কিছু আছে যার জন্যে এই পরিবর্তন ঘটেছে। এর আগে তিনি আগাছা নিয়ে পরীক্ষা করেছেন, এবার কি কারণে পরিবর্তন ঘটল। ভাল করে পরীক্ষা করতেই লক্ষ্য করলেন আগাছাগুলোর উপর ছত্রাক। জন্ম নিয়েছে। সেই ছত্রাকগুলো চেঁচে নিয়ে জীবাণুর উপর দিতেই জীবাণুগুলো ধ্বংস হয়ে গেল।

তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর এতদিনের সাধনা অবশেষে সিদ্ধিলাভ করল। এই ছত্রাকগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম ছিল পেনিসিলিয়াম নোটেটাম। তাই এর নাম দিলেন। পেনিসিলিন।

রসায়ন সম্বন্ধে জ্ঞান না থাকার কারণে পেনিসিলিন আবিষ্কার করলেও কিভাবে তাকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে ঔষধ হিসাবে প্রস্তুত করা যায় তার স্পষ্ট কোন ধারণা ফ্লেমিং করে উঠতে পারেননি।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই পেনিসিলিনের উপযোগিতা তীব্রভাবে সকলে অনুভব করল! অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হওয়ায় ফ্লোরির নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী কিভাবে পেনিসিলিনকে ঔষধে রূপান্তরিত করা যায় তা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলেন। ফ্লোরির সাথে ছিলেন রসায়নবিদ ডঃ চেইন। কয়েক মাসের প্রচেষ্টার পর তারা সামান্য পরিমাণ পেনিসিলিন তৈরি করতে সক্ষম হলেন। প্রথমে তারা কিছু জীবজন্তুর উপর পরীক্ষা করে আশাতীত ভাল ফল পেলেন। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন মানুষের উপর পরীক্ষা। আকস্মিকভাবে সুযোগ এসে গেল।

একজন পুলিশ কর্মচারী মুখে সামান্য আঘাত পেয়েছিল, তাতে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল তা দূষিত হয়ে রক্তের মধ্যে জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছিল। ডাক্তাররা তার জীবনের সব আশা ত্যাগ করেছিল। ১৯৪১ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি প্রফেসর ফ্লোরি স্থির করলেন এই মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটির উপরেই পরীক্ষা করবেন পেনিসিলিন। তাকে তিন ঘণ্টা অন্তর অন্তর চারবার পেনিসিলিন দেওয়া হল। ২৪ ঘণ্টা পর দেখা গেল যার আরোগ্যলাভের কোন আশাই ছিল না। সে প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছে। এই ঘটনায় সকলেই উপলব্ধি করতে পারল চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কি যুগান্তকারী প্রভাব বিস্তার করতে চলেছে পেনিসিলিন।

ডাঃ চেইন বিশেষ পদ্ধতিতে পেনিসিলিনকে পাউডারে পরিণত করলেন। এবং ডাঃ ফ্লোরি তা বিভিন্ন রোগীর উপর প্রয়োগ করতেন। কিন্তু যুদ্ধে হাজার হাজার আহত মানুষের চিকিৎসায় ল্যাবরোটারিতে প্রস্তুত পেনিসিলিন প্রয়োজনের তুলনায় ছিল নিতান্তই কম।

আমেরিকার Norhern Regional Research ল্যাবরেটরি এই ব্যাপারে সাহায্য করতে এগিয়ে এল।

মানব কল্যাণে নিজের এই আবিষ্কারের ব্যাপক প্রয়োগ দেখে আনন্দে অভিভূত হয়ে উঠেছিলেন ফ্লেমিং। মানুষের কলকোলাহলের চেয়ে প্রকৃতির নিঃসঙ্গতাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করত। মাঝে মাঝে প্রিয়তমা পত্নী সারিনকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। সারিন শুধু যে তার স্ত্রী ছিলেন তাই নয়, ছিলেন তার যোগ্য সঙ্গিনী।

১৯৪৪ সালে ইংল্যাণ্ডের রাজদরবারের তরফ থেকে তাঁকে নাইট উপাধি দেওয়া হল। ১৯৪৫ সাল তিনি আমেরিকায় গেলেন।

১৯৪৫ সালের শেষ দিকে তিনি ফরাসী গভর্নমেন্টের আমন্ত্রণে ফ্রান্সে গেলেন। সর্বত্র তিনি বিপুল সম্বর্ধনা পেলেন। প্যারিসে থাকাকালীন সময়েই তিনি জানতে পারলেন এ বৎসরে মানব কল্যাণে পেনিসিলিন আবিষ্কারের এবং তার সার্থক প্রয়োগের জন্য নোবেল প্রাইজ কমিটি চিকিৎসাবিদ্যালয় ফ্লেমিং, ফ্লোরি ও ডঃ চেইনকে একই সাথে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করেছেন। এই পুরস্কার পাওয়ার পর ফ্লেমিং কৌতুক করে বলেছিলেন, এই পুরস্কারটি ঈশ্বরের পাওয়া উচিত কারণ তিনিই সব কিছু আকস্মিক যোগাযোগ ঘটিয়েছেন।

ফ্রান্স থেকে ফিরে এসে তিনি আবার সেন্ট মেরি হাসপাতালে ব্যাকটেরিওলজির গবেষণায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন। চার বছর পর তার স্ত্রী সারিন মারা যান। এই মৃত্যুতে মানসিক দিক থেকে বিপর্যন্ত হয়ে পড়েন ফ্লেমিং।

তাঁর জীবনের এই বেদনার্ত মুহূর্তে পাশে এসে দাঁড়ালেন গ্রীক তরুণী আমালিয়া তরুকা। আমালিয়া ফ্লেমিংয়ের সাথে ব্যাকটেরিওলজি নিয়ে গবেষণা করতেন। ১৯৫৩ সালে দুজনে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হলেন। কিন্তু এই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হল না। দুই বছর পর ১৯৫৫ সালে ৭৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ফ্লেমিং।

২৭. ওয়াল্ট হুইটম্যান (১৮১৯-১৮৯২)

আজন্ম দারিদ্র পীড়িত কবি হুইটম্যানের জন্ম ১৮১৯ সালের ৩১ মে লং আইল্যণ্ডের ওয়েস্ট হিলে। বাবা ছিলেন ছুতোর। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। লিভস অব গ্রাসের কবি ওয়াল্ট হুটম্যান ছিলেন আমেরিকার নব যুগের নতুন চিন্তার প্রবক্তা। ঊনবিংশ শতকের আমেরিকান সংস্কৃতির প্রাণপুরুষ। শুধু আমেরিকার নন, আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি।

বাবা ওয়ালটার হুইটম্যান ছিলেন ইংরেজ। সামান্য লেখাপড়া জানতেন। অবসর পেলেই চার্চে গিয়ে ধর্ম-উপদেশ শুনতেন।

যখন ওয়াল্টের চার বছর বয়স, তখন তাঁর বাবা এলেন ব্রুকলীনে। ছেলেমেয়েদের পাঠিয়ে দেওয়া হল ওয়েস্ট হিলে মামার বাড়িতে। কয়েক মাস পর স্কুলে ভর্তি হলেন হুইটম্যান, শহরের চার-দেওয়াল ঘেরা স্কুল।

স্কুলের বাঁধা পড়া ভাল না লাগলেও বই ভাল লাগত। যখন যে বই পেতেন তাই পড়ে ফেলতেন। অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি ছিল তার, যা কিছু একবার পড়তেন তা আর কখনো বিস্মৃত হত না।

পাঁচ বছর পর স্কুলের পাঠ শেষ হল। ছাত্র জীবনেরও পরিসমাপ্তি ঘটল। তখন তাঁর বয়স এগারো। সংসারের আর্থিক অবস্থা ক্রমশই খারাপ হয়ে আসছিল। একটা অফিসে বয়ের কাজ নিতে হল। দুটি বছর সেখানেই কেটে গেল।

তেরো বছর বয়েসে দি লং আইল্যাণ্ড (The long Island) নামে একটি পত্রিকার ছাপাখানায় চাকরি পেলেন। গভীর মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করতেন ছাপাখানার প্রতিটি কাজ, পড়তেন পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যা।

কয়েক বছরের মধ্যেই পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ পেলেন। পত্রিকার আর্থিক অবস্থা তখন খারাপ হয়ে আসছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন একাধারে পত্রিকার প্রকাশক, সম্পাদক, মুদ্রাকর, মেশিনম্যান। তবুও পত্রিকাটিকে চালাতে পারলেন না।… এক বছর পর সব কিছু বিক্রি করে দিলেন। আবার শুরু হল ছন্নছাড়া জীবন।

যখন যেখানে কাজ পেতেন সেখানেই চাকরি করতেন। বেশির ভাগই ছিল পত্র পত্রিকার কাজ। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিয়মিত লিখে চলতেন গদ্য পদ্য, এর মধ্যে কিছু ছাপাও হয়েছিল।

সাতাশ বছর বয়সে ব্রুকলিনের সবচেয়ে নামী পত্রিকা দৈনিক ঈগল-এ সম্পাদকের চাকরি পেলেন।

হুইটম্যান বিশ্বাস করতেন সমস্ত মানুষই একই সত্তার বিভিন্ন প্রকাশ। সাদা, কালো, পীত সকল মানুষই পরস্পরের ভাই,–তাঁর এই মনের ভাবনাই প্রকাশ পেয়েছিলেন ঈগল পত্রিকায়। অনেকেই তাঁর সাথে একমত হতে পারল না। বাধ্য হয়ে চাকরি ছাড়তে হল। শোনা যায় কোন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। লোকটি দাসপ্রথার সমর্থনে মন্তব্য করেছিল। হুইটম্যান এক লাথিতে তাকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলেন। অনিবার্যভাবেই চাকরি হারাতে হল তাঁকে।

নতুন চাকরি পেলেন নিউ অরলিয়েন্সে। জীবনের এই পর্যায়ের অনেক ছবিই অনাবৃত রয়ে গিয়েছে।

নিউ অরলিয়েন্সের রোমাঞ্চকর অধ্যায় একদিকে যেমন এনেছিল আনন্দ, অন্যদিকে বেদনা। তাঁর এই আলোছায়াময় জীবনের কথা অপূর্ব ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন দু-একটি কবিতায়:

Out of the rolling ocean crowd,
Came a drop gently to me,
Whispering I love you, before long I die,
I have travelled a long way merely to look on you, to touch you.
For I could not die till I once looked on you,
Again we wander–we love-we seperate again
Again she holds me by the hand
I must not go
I see her close beside me, with silent lips sad and tremulous.
Return in peace to the occan, my love.
I too am part of the occan, my love.

ত্রিশ বছরে পা দিলেন হুইটম্যান। ক্রমশই তাঁর অন্তরলোকে অনুভব করছিলেন এক পরিবর্তন। নিজেকে প্রকাশ করবার এক তীব্র কামনা খাঁচায় বন্ধ পাখির মত পাখা ঝাঁপটাচ্ছিল। অনুভব করতেন মহৎ এক সৃষ্টির প্রেরণা। নিউ অরলিয়েন্স থেকে ফিরে এলেন ব্রুকলিনে মা-বাবার কাছে। সংসারে অভাব, বাবার সাথে ছুতোর মিস্ত্রির কাজ শুরু করলেন।

দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলল তার সাধনা। শিল্পীর হাতে যেমন একটু একটু করে জন্ম নেয় তার মানস প্রতিমা, হুইটম্যান তেমনি রচনা করে চলেন একের পর এক কবিতা।

১৮৫৫ সাল, হুইটম্যান শেষ করলেন তাঁর প্রথম কবিতা সংকলন; নাম দিলেন লিভস অব গ্রাস (Leaves of grass)। হাতে সামান্য কিছু অর্থ সঞ্চয় করেছিলেন। সেই

অর্থে এক বন্ধুর ছাপাখানায় ছাপা হল Leaves of grass। এই প্রথম বইতে নিজের নাম লিখলেন ওয়ান্ট হুইটম্যান। প্রথমে ছাপা হল ১০০০ কপি। কবিতা পড়ে কোন প্রকাশকই বই প্রকাশ করবার দায়িত্ব দিল না।

হুইটম্যান তাঁর কবিতার বই আমেরিকার প্রায় সব খ্যাতনামা লোকেদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। কেউ মতামত দেওয়া তো দূরের কথা, বই প্রাপ্তির সংবাদটুকু অবধি জানালেন না।

শুধু মাত্র এমার্সন মুগ্ধ হলেন। তাঁর মনে হল আমেরিকার সাহিত্য জগতে এক নতুন ধ্রুবতারার আবির্ভাব হল।

কয়েক মাস পর যখন দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করলেন, বইয়ের সাথে এই চিঠি ছেপে দিলেন। এমার্সনের এই প্রশংসা বহু জনের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। কিন্তু বইয়ের বিক্রি তেমন বাড়ল না।

এত অপবাদ বিরুদ্ধ সমালোচনা সত্ত্বেও Leaves of grass কালজয়ী গ্রন্থ। এতে ফুটে উঠেছে তার মানব প্রেম।

তাঁর এই মনোভাবের মধ্যে ফুটে উঠেছে আমেরিকান গণতন্ত্রের প্রতিচ্ছায়া। যদিও এই গণতন্ত্র কোন রাজনৈতিক বা সামাজিকতা গণতন্ত্র নয়। এক ধর্মীয় বিশ্বাস-মানুষ এক বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে চলেছে যার পরিণতিতে এক পূর্ণতা-এই পূর্ণতা কি কবি নিজেও তা জানেন না-তিনি বিশ্বাস করতেন এই পূর্ণতা ব্যর্থ হবার নয়।

“It cannot fail the young man who died and was buried,
Nor the young woman who died and was put by his side,
Nor the little child that pecped in at the door and then drew back and was never seen again. Nor the old man who has lived without purpose and feels it with bitterness worse than gall.”

অন্য একটি কবিতায় জীবনের জয়গান গেয়েছেন–

“Do you weep at the brecity of your life and the intersity of your suf fering?
Weep not child, weep not my darling,
Some thing there is more immortal even then the stars.”

১৮৫৭ সালে Lears of Grass প্রথম প্রকাশিত হয়। তারপর থেকে কবি তাঁর সমস্ত জীবন ধরে এক সংস্কার করেছেন, পরিমার্জনা করেছেন। নতুন কবিতা সংযোজন করেছেন। তার খ্যাতি (সেই সাথে অখ্যাতিও) ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে কিন্তু আর্থিক সাফল্য কোন দিনই পাননি।

১৮৫৭ সালে তিনি “ব্রুকলিন ডেইলি টাইমস” পত্রিকার সম্পাদক হলেন।

কয়েক বছর পত্রিকার চাকরি করলেন, ইতিমধ্যে আমেরিকার ভাগ্যাকাশে নেমে এল এক বিপর্যয়। দাসপ্রথা বিরোধের প্রশ্নে উত্তর আর দক্ষিণের মধ্যে প্রথমে দেখা দিল বিরোধ তারপর শুরু হল গৃহযুদ্ধ।

তাই যুদ্ধ শুরু হবার পর তিনি যুদ্ধে যোগ না দিলেও আহত মানুষদের সেবার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করলেন।

কিন্তু লিভস অব গ্লাসের লেখকের বোধহয় সেবা করবারও অধিকার ছিল না। একদিন হাসপাতালের সেক্রেটারি তার টেবিলের উপর দেখতে পেলেন এক খণ্ড ‘লিভস অব গ্রাস’। জানতে পারলেন লেখকের পরিচয়। এমন একটা অশ্লীল বইয়ের লেখক তার হাসপাতালে কাজ করবে-এ কিছুতেই মেনে নিতে পারল না সেক্রেটারি। পরদিন হুইটম্যান জানতে পারলেন তাঁকে কাজ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

প্রাচ্যের এক মনীষী একবার বলেছিলেন, ঈশ্বর শহরের মানুষের মধ্যে দিয়ে হেঁটে, যান। কিন্তু মানুষ এত অন্ধ যে তাকে দেখতে পায় না।

যথার্থই হুইটম্যানের মহত্ত্বতাকে উপলব্ধি করবার মত তখন কেউ ছিল না। শিক্ষিত ধনী ব্যক্তিরা তাকে উপেক্ষা করেছিল, কারণ তিনি তাদের ভণ্ডামি নোংরামিকে তীব্র ভাষায় কষাঘাত করেছিলেন আর সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ক্ষমতা ছিল না তার কবিতার মর্মকে উপলব্ধি করবার।

১৮৬৫ সালে যখন লিঙ্কনকে হত্যা করা হল, বেদনায় ভেঙে পড়েছিলেন কবি। লিঙ্কন তাঁর কাছে ছিলেন স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক। এই মর্মান্তিক বেদনায় তিনি চারটি মর্মস্পর্শী কবিতা রচনা করেন। এমন শোকাবহ কবিতা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। এর মধ্যে একটি কবিতা “O Captain my Captain.” যাত্রার শেষ লগ্ন সমাহত, তীরভূমি অদূরে, কিন্তু কাণ্ডারীর দেহ প্রাণহীন। হোয়েন লাইল্যাকস লাস্ট কবিতাটির ফুটে উঠেছে মৃত্যুর বর্ণনা।

All over bouquets of roses
O death! I cover you over with roses and early lilies:

১৮৭৩ সালে কবি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এই সময়ে তিনি থাকতেন ওয়াশিংটনে তার ছোট ভাই জর্জের বাড়িতে।

১৮৯২ সালে বাহাত্তর বছর বয়সে মানুষের প্রিয় কবি হারিয়ে গেলেন তার প্রিয় সূর্যের দেশে।

 ২৮. ফিওদর মিখাইলভিচ দস্তয়ভস্কি (১৮২১-১৮৮১)

২৮. ফিওদর মিখাইলভিচ দস্তয়ভস্কি (১৮২১-১৮৮১)

তাঁর সম্বন্ধে বলা হয় তিনি লেখকের লেখক ফিওদর দস্তয়ভস্কি (জন্ম অক্টোবর ৩০, ১৮২১। মৃত্যু ২৮ জানুয়ারি, ১৮৮১)। সাত ভাইবোনের মধ্যে দস্তয়ভস্কি ছিলেন পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান। পিতা মিখায়েল আন্দ্রিয়েভিচ ছিলেন মস্কোর এক হাসপাতালের ডাক্তার। কয়েক বছর পর দস্তয়ভস্কির পিতা টুলা জেলায় Darovoye তে একটা সম্পত্তি কিনলেন। প্রতিবছর গ্রীষ্মের ছুটিতে মা ভাই বোনেদের সাথে নিয়ে সেখানে বেড়াতে যেতে দস্তয়ভস্কিকে পাঠিয়ে দেওয়া হল Chemak’s বোর্ডিং স্কুলে। তিন বছর সেখানে (১৮৩৪-৩৭) পড়াশুনা করার পর বাড়িতে ফিরে এলেন দস্তয়ভস্কি। এক বছরের মধ্যে মার মৃত্যু হল।

স্ত্রী মৃত্যু মাইকেলের জীবনে এক পরিবর্তন নিয়ে এল। শহরের পরিমণ্ডলে থাকতে আর ভাল লাগল না, হাসপাতালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পাকাপাকিভাবে গ্রামে গিয়ে বসবাস করতে আরম্ভ করলেন। দস্তয়দস্কি আর তার ভাইকে ভর্তি করে দিলেন মিলিটারি ইনজিনিয়ারিং একাডেমিতে।

গ্রামে গিয়ে অল্পদিনেই সম্পত্তি বাড়িয়ে ফেললেন মাইকেল। মাইকেলে অত্যাচার অন্যায় আচরণে প্রজাদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠতে থাকে। কয়েকজন তাঁর কোচওয়ানের সাথে শলাপরামর্শ করে নির্জনে নিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করল। পিতার মৃত্যু দস্তয়ভস্কির জীবনে নিয়ে এল বিরাট আঘাত।

পিতা নিহত হবার পর এক অপরাধবোধ তাঁর মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। পিতার মৃত্যুর পর নিজেকেই অপরাধী বলে মনে হল তাঁর। এর থেকে জন্ম নিল এক অসুস্থ মনোবিকার। তাই পরবর্তীকালে কোন মৃত্যু শোক আঘাত উত্তেজনার প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এলেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন, ঘন ঘন দেখা দিত মৃগীরোগ। সমস্ত জীবনে আর তিনি এই রোগ থেকে মুক্তি পাননি।

ইনজিনিয়ারিং একাডেমি থেকে পাশ করে সামরিক বিভাগে ডিজাইনারের চাকরি নিলেন। নিঃসঙ্গতা ক্লান্তি ভোলবার জন্য জুয়ার টেবিলে গিয়ে বসেন দস্তয়ভস্কি। অধিকাংশ দিনই নিজুের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে আসেন। মাইনের টাকা কয়েকদিনের মধ্যেই ফুরিয়ে যায়।

অর্থ সংগ্রহের তাগিদে ঠিক করলেন ফরাসী জার্মান সাহিত্য অনুবাদ করলেন। তিনি এবং তার ভাই মিখায়েল একসঙ্গে ফরাসী সাহিত্যিক বালজাকের উপন্যাস অনুবাদ করতে আরম্ভ করলেন। ১৮৪৪ সালে একটি রাশিয়ান পত্রিকায় তা প্রকাশিত হতে আরম্ভ হল। কিছু অর্থও পেলেন।

ক্রমশই চাকরির জীবন অসহ্য হয়ে উঠল। সাহিত্য জগৎ তাঁকে দুর্নিবারভাবে আকর্ষণ করছিল। তিনি চাকরি ছাড়লেন। নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করলেন সাহিত্য সাধনায়।

৩০শে সেপ্টেম্বর ১৮৪৪ তার ভাইকে একটা চিঠিতে দস্তয়ভস্কি লিখলেন “একটা উপন্যাস শেষ করলাম। এটা সম্পূর্ণ আমার নিজের লেখা। এখন পাণ্ডুলিপি থেকে নকল করছি। একটা পত্রিকায় পাঠাব। জানি না তারা অনুমোদন করবে কি না। তা আমি এই রচনায় সন্তুষ্ট হয়েছি।”

প্রথম উপন্যাস পুতুর ফোক বা অভাজন প্রকাশিত হওয়ার পর কয়েকটি ছোট গল্প রচনা করলেন দস্তয়ভস্কি। তারপর লিখলেন তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস “দি ডবল”। প্রথম উপন্যাসে তিনি লেখক হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিলেন, দ্বিতীয় উপন্যাসে পেলেন খ্যাতি। তার লেখার মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছিল মানুষের বেদনাময় জীবনের ছবি। মানুষ সহজেই। তাঁর রচনার প্রতি আকৃষ্ট হল। সমাজের শিল্পী সাহিত্যিক সমালোচক মহলের দ্বার তার কাছে উন্মুক্ত হল।

এই সময় দস্তয়ভস্কির জীবনে নেমে এল বিপর্যয়। রাশিয়ার সম্রাট জার ছিলেন এক অত্যাচারী শাসক। তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠেছিল ছোট ছোট সংগঠন। এক বন্ধুর মারফত দস্তয়ভস্কি পরিচিত হলেন এর একটি সংগঠনের সাথে এদের আসর বসত প্রটাসভস্কি নামে এক তরুণ সরকারী অফিসারের বাড়িতে।

কিন্তু অত্যাচারী জার প্রথম নিকোলাসের গুপ্তচরদের নজর এড়াল না। তাদের মনে হল এরা রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। রিপোের্ট গেল সরকারী দপ্তরে। যথারীতি একদিন প্রটাসভস্কির আসর থেকে বাড়িতে ফিরে এসে খাওদা-দাওয়া করে রাত্রিতে ঘুমিয়ে পড়লেন দস্তয়ভস্কি। হঠাৎ শেষ রাতে পুলিশের পদশব্দে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। চেয়ে দেখলেন তাঁর ঘরে জারের পুলিশ বাহিনী। কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই তাঁকে গ্রেফতার করা হল (এপ্রিল ১৩,১৮৪৯)।

অন্য অনেকের সাথে তাকে বন্দী করে রাখা হল আলোবাতাসহীন ছোট্ট একটি কুঠুরিতে। দিনে মাত্র তিন-চারবার ঘরের বাইরে আসার সুযোগ মিলত। এক দুঃসহ মানসিকতার মধ্যেই তিনি রচনা করলেন একটি ছোট গল্প “ছোট্ট নায়ক” A little Hero)।

নানান প্রশ্ন অনুসন্ধান-তারপর শুরু হল বিচার। বিচারে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য দণ্ডাদেশ পত্র পাঠিয়ে দেওয়া হল সম্রাট নিকোলাসের কাছে। সম্রাট তাদের মৃত্যুদণ্ড রোধ করে সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিলেন। দস্তয়ভস্কির চার বছরের জন্য সাইবেরিয়ায় নির্বাসন আর তারপর চার বছর সৈনিকের জীবন যাপন করবার আদেশ দেওয়া হল।

খ্রিস্টমাস ডেতে পায়ে চার সের ওজনের লোহার শেকল পরিয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল সাইবেরিয়ার বন্দীনিবাসে (জানুয়ারি ১৮৫০)। চারদিকে নরকের পরিবেশ। খুনী বদমাইশ শয়তানের মাঝখানে দস্তয়ভস্কি একা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত। ছোট অন্ধকার কুঠুরিতে শীতকালে অসহ্য ঠাণ্ডা। ছাদের ফুটোদিয়ে বরফ ঝরে পড়ে মেঝেতে পুরু হয়ে যায়। কনকনে তুষারজড়ে হাত-পা ফেটে রক্ত ঝরে। গ্রীষ্মের দিনে আগুনের দাবদাহ।

তারই মাঝে হাড়ভাঙা খাটুনি। ক্লান্তিতে, পরিশ্রমে শরীর নুয়ে পড়েছে। সে তার জীবনের এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার কথা পরবর্তীকালে জ্বলন্ত অক্ষরে লিখে গিয়েছেন তাঁর The house of the Dead (মৃত্যুপুরী) উপন্যাসে।

দীর্ঘ চার বছর (১৮৫০-১৮৫৪) সাইবেরিয়ার বন্দীনিবাসে কাটিয়ে অবশেষে লোহার বেদির বন্ধন থেকে মুক্তি পেলেন।

ওমস্কের বন্দীনিবাস থেকে দস্তয়ভস্কিকে পাঠানো হল সেমিপালতিনস্ক শহরে। কিন্তু সামরিক জীবনের নিয়ম-শৃঙ্খলা কুচকাওয়াজ তার রুগ্ন শীর্ণ অসুস্থ অনভ্যস্ত শরীরে মাঝে মাঝে অসহনীয় হয়ে উঠত। তবুও নিজের যোগ্যতার কিছুদিনের মধ্যেই সামরিক বিভাগে উঁচু পদ পেলেন।

এই সময় শহরের প্রধান সেনানায়ক জানতে পারলেন তাঁর সৈন্যদলের মধ্যে একজন শিক্ষিত লেখক আছেন। তিনি দস্তয়ভস্কিকে ডেকে পাঠালেন। তারপর থেকে প্রতিদিন দস্তয়ভস্কি তার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে খবরের কাগজ পড়ে শোনাতেন।

এখানেই একদিন পরিচয় হল এক মদ্যপ সরকারী কর্মচারী আলেকজাণ্ডার ইসায়েভ এবং তার সুন্দরী তরুণী স্ত্রী মারিয়া ডিমিট্রিয়েভনার সাথে। তারপর থেকে শুরু হল তাঁর সেখানে যাতায়াত।

এর কিছুদিনের মধ্যে ইসায়েভ বদলি হয়ে গেলেন চারশো মাইল দূরের এক শহরে। মারিয়ার অদর্শনে আবার মানসিক দিক থেকে বিপর্যয় হলে গেলেন দস্তয়ভস্কি।

কয়েক মাস পর তার স্বামী মারা গেলেন। বছর খানেক পর একদিন দস্তয়ভস্কি গেলেন মারিয়ার কাছে। সেখানে গিয়ে যা দেখলেন তাতে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। মারিয়া এক তরুণ স্কুল শিক্ষকের প্রেমে পড়েছে। অনেক অনুনয়-বিনয় করে তার মত পরিবর্তন করতে সক্ষম হলেন।

১৮৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুজনের বিয়ে হল। সারা দিনের পরিশ্রম উত্তেজনায় বাসরঘরেই মূৰ্ছিত হয়ে পড়লেন দস্তয়ভস্কি। সুখের পাত্র পূর্ণ হবার আগেই অপূর্ণ রয়ে গেল সব আকাঙ্ক্ষা।

আরো দুবছর থাকার পর শেষ হল তাঁর বন্দী জীবন। সামরিক বিভাগের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে স্ত্রী পুত্রকে নিয়ে এসে বাসা বাঁধলেন মস্কোর কাছাকাছি টিভর শহরে।

এবার সাইবেরিয়ার নির্বাসিত জীবনের অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে লিখলেন The house of the Dead (মৃতের পরী)।

কিন্তু কে প্রকাশ করবে এই অখ্যাত তরুণের লেখা! দস্তয়ভস্কির বড় ভাই মাইকেলের সঙ্গে মিলিতভাবে প্রকাশ করলেন একটি পত্রিকা “সময়” (Time)। এতেই প্রকাশিত হল The house of the Dead।

প্রকাশের সাথে সাথে দস্তয়ভস্কির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। সাইবেরিয়ার বন্দী জীবনের ছবি ইতিপূর্বে আর কোন লেখকের রজনাতেই এমন মূর্ত হয়ে ওঠেনি। খ্যাতির সাথে অর্থও আসতে আরম্ভ করল। কিন্তু মারিয়ার বিলাস-ব্যসনের সাথে তাল রাখতে ব্যর্থ হলেন দস্তয়ভস্কি।

যন্ত্রণা হতাশা ভোলবার জন্য ক্রমশই তিনি সৃষ্টির গভীরে ডুব দিলেন। এই সময় দস্তয়ভস্কির জীবনে এল পলিনা। এক প্রাণ-উচ্ছল সুন্দরী তরুণী।

দুজনে গেলেন ফ্রান্সে। কিন্তু পলিনাকে কাছে পেলেন না দস্তয়ভস্কি। এক পুরুষে মন ভরে না তার। বিচ্ছেদ ঘটে গেল দুজনের। ততদিনে হাতের অর্থও ফুরিয়ে এসেছে। জুয়ার নেশায় মাতালের দস্তয়ভস্কি। এক একদিন সব হারিয়ে গায়ের কোট খুলে দিয়ে আসতেন। কোনদিন বা জিততেন কিন্তু তার পরদিন আবার সব হারাতেন। এই জুয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করেই তিনি পরবর্তীকালে লিখেছিলেন “জুয়াড়ি”।

ইতিমধ্যে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল মারিয়া। তার সেবা-যত্নের কোন ত্রুটি করলেন। কিন্তু তাঁর সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৮৬৪ সালের এপ্রিল মাসে মারা গেল মারিয়া।

স্ত্রীর মৃত্যুর মাত্র তিন মাস বাদে মারা গেলেন বড় ভাই মাইকেল। মাইকেলের মৃত্যু তাঁর কাছে অনেক বেশি আঘাত নিয়ে এল। তাঁর জীবনের অনেকখানি জুড়ে ছিল ভাইয়ের অস্তিত্ব।

এই দুঃখের মধ্যেই রচনা করলেন তাঁর “অপরাধ এবং শাস্তি” Crime and Punishment)। এক অনন্য সাধারণ উপন্যাস। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে যে কটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস আছে, এটি তার মধ্যে একটি। কাহিনীর নায়ক রাসকলনিভ। দরিদ্র, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, আদর্শবাদে বিশ্বাসী। কিন্তু দারিদ্র্যের চাপে তার আদর্শবাদের বন্ধনটুকু শিথিল হয়ে পড়তে থাকে। বাড়ি থেকে খবর আসে সংসারের অভাব দূর করবার জন্যে ছোটবোন দুনিয়া ধনী লুজানকে বিয়ে করতে চলেছে। এক প্রচণ্ড মানসিক অস্থিরতার মধ্যে সে কিছু অর্থ ধার করতে গেল শহরের এক বুড়ির কাছে। বুড়ির বন্ধকী ব্যবসা। একাই থাকে বুড়ি। তার ঘরে জমিয়ে রাখা সোনা-দানা দেখে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না রাসকলনিভ। বুড়িকে হত্যা করল। এই সময় বুড়ির বোন এসে পড়ায় নিজেকে বাঁচাবার জন্য তাকেও হত্য করল রাসকলনিকভ। সামান্য যা পেল তাই নিয়েই পালিয়ে এল কিন্তু এবার তার মধ্যে শুরু হল মানসিক যন্ত্রণা। মনে হতে লাগল পুলিশ বুঝি সব সময় তার পেছনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ক্রমশই এক অপরাধ বোধ তার মনের মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। এই সময় রাসকলনিকভের সঙ্গে দেখা হল সোনিয়ার। সে পতিতা। নিজের বিপন্ন পরিবারকে ক্ষুধার হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে সে এই পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু রাসকলনিকভ উপলব্ধি করতে পারল পাপের মধ্যে থেকেও সোনিয়ার অন্তর জুড়ে রয়েছে শুধু পবিত্রতা। তাই নিজেকে সোনিয়ার কাছে উৎসর্গ করে না। শুরু হল পাপ-পুণ্যের দ্বন্দ্ব। শেষ পর্যন্ত নিজের অপরাধ স্বীকার করে সোনিয়ার কাছে। পুলিশও বুড়ির হত্যা রহস্য উদ্ধারের জন্য চারদিকে অনুসন্ধান করতে থাকে। তারা অনুমান করে রাসকলনিকভ খুনী। কিন্তু প্রমাণের অভাবে তাকে ধরতে পারছিল না। রাসকলনিকভের মনে হল সে যে অপরাধ করেছে তার জন্যে তাকে ধরতে পারছিল না। রাসাকলনিকভের মনে হল সে যে অপরাধ করছে তার জন্যে তাকে শাস্তি পেতেই হবে। সোনিয়ার প্রেমের আলোয় সে তখন এক অন্য মানুষ। তাই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করল। সোনিয়াও তার সাথে যাত্রা করল। সে বাসা বাধল জেলের কাছে এক গ্রামে। ভালবাসা, ত্যাগ আর পবিত্রতার মধ্যে দুজনে প্রতীক্ষা করে নতুন জীবনের।

ক্রাইম এ্যাণ্ড পানিশমেন্ট উপন্যাস রচনার পেছনে যখন তার সমস্ত মন একাগ্রতাটুকু অর্পণ করেছিলেন তখন প্রকাশকের সঙ্গে চুক্তিমত তাকে নতুন উপন্যাস জমা দেবার দিন এগিয়ে আসছিল। কিন্তু একটি লাইনও তখনো তিনি লিখে উঠতে পারেননি। হাতে মাত্র দু মাস সময়। কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। এমন সময় তার এক বন্ধু পরামর্শ দিল স্টেনোগ্রাফার রাখতে। বন্ধু তার চেনা-জানা একটি মেয়েকে পাঠিয়ে দিলেন তার কাছে।

১৮৬৬ সালের ৪ অক্টোবর কুড়ি বছরের সাদামাটা চেহারার অ্যানা এসে দাঁড়াল দস্তয়ভস্কির দরজায়।

চব্বিশ দিনের মাথায় শেষ করলেন “এক জুয়াড়ির গল্প”-এ জুয়াড়ি আর কেউ নয়, দস্তয়ভস্কি নিজেই।

চব্বিশ দিন দস্তয়ভস্কির সংসারে যাতায়াত করতে করতে অ্যানা পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করেছিলেন তার মানসিক, সাংসারিক অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলতা।

দস্তয়ভস্কির মনে হল মারিয়া, পলিনা তাঁকে যা দিতে পারেনি, সেই সংসারের সুখ হয়তো দিতে পারবে অ্যানা। তাই সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। দস্তয়ভস্কির বয়স তখন ৪৫, অ্যানার ২০। সকলের বিরোধিতা সত্ত্বেও তাঁদের বিয়ে হল।

দেনার টাকা শোধ করবার জন্য লিখতে আরম্ভ করলেন “দি ইডিয়ট”।

ইডিয়ট উপন্যাস শেষ করে কয়েক মাস আর কিছু লেখেননি দস্তয়ভস্কি। ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। এক দেশ থেকে আরেক দেশ। দারিদ্র্য তাঁর নিত্যসঙ্গী। এরই মধ্যে লিখলেন “দি এটারনাল হ্যাঁসবেন্ড” (The etemal husband), পরে দীর্ঘ উপন্যাস “দি পজেজড” (The possesed)।

দেখতে দেখতে চার বছর কেটে গেল। যাযাবরের মত ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন দস্তয়ভস্কি।

দেশে ফেরার জন্য মন টানছে কিন্তু কেমন করে ফিরবেন। হাত শূন্য। স্ত্রী, শিশুকন্যার জন্যে রাখা শেষ সম্বলটুকু নিয়ে গিয়ে জুয়ার টেবিলে বসলেন। কিন্তু সেটুকুও হারাতে হল।

এই বিপদের দিনে এগিয়ে এলেন তার এক বন্ধু। তার কাছে থেকে অর্থ সাহায্য পেয়ে দীর্ঘ চার বছরের প্রবাস জীবনের পর জুলাই ৪, ১৮৭১ স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে পিটসবার্গে ফিরলেন দস্তয়ভস্কি।

আর্থিক সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্তি না পেলেও তাঁর সমস্ত মন জুড়ে তখন চলছিল সেই মহতী সৃষ্টির প্রেরণা। দীর্ঘ চার বছর লেখার পর ১৮৮০ সালে প্রকাশিত হল “দি ব্রাদার্স কারামাজোভ”। এক মহাকাব্যিক উপন্যাস। ব্যাপ্তিতে, গভীরতায়, চরিত্র সৃষ্টিতে ক্রাইম এ্যাণ্ড পানিশমেন্টের পাশাপাশি এই উপন্যাসও তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।

সমস্ত দেশ জুড়ে তিনি পেলেন এক অভূতপূর্ব শ্রদ্ধা আর ভালবাসা। তাকে বলা হল জাতির প্রবক্তা। ক্রমশই তার শরীর ভেঙে পড়ছিল। শেষে অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

সন্ধ্যেবেলায় চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হয়ে পড়লেন দস্তয়ভস্কি। ৩১ বছর আগে যে পথ দিয়ে শৃঙ্খলিত অবস্থায় লোকের ধিক্কার কুড়োতে কুড়োতে গিয়েছিলেন সাইবেরিয়ার বন্দীনিবাসে, আজ সেই পথ দিয়ে হাজার হাজার মানুষের বেদনা আর ভালবাসার মধ্যে দিয়ে চললেন অমৃতলোকে।

২৯. আলেকজান্ডার দি গ্রেট (৩৫৬ খ্রিস্ট পূর্ব-৩২৩ খ্রিস্ট পূর্ব)

খ্রিস্ট পূর্ব চারশো বছর আগেকার কথা। গ্রীসদেশ তখন অসংখ্য ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল। এমন একটি রাষ্ট্রের অধিপতি ছিলেন ফিলিপ। ফিলিপ ছিলেন বীর, সাহসী, রণকুশলী। সিংহাসন অধিকার করবার অল্প দিনের মধ্যেই গড়ে তুললেন সুদক্ষ এক সৈন্যবাহিনী। ফিলিপের পুত্রই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে বীর আলেকজান্ডার।

খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৬ সালে আলেকজান্ডারের জন্ম। আলেকজান্ডারের মা ছিলেন কিছুটা অস্বাভাবিক প্রকৃতির। সম্রাট ফিলিপকে কোন দিনই প্রসন্নভাবে গ্রহণ করতে পারেননি।

ছেলেবেলা থেকেই আলেকজান্ডারের দেহ ছিল সুগঠিত। বাদামী চুল, হালকা রং। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় ছিল-আলেকজান্ডারের শরীর থেকে সব সময় একটা অপূর্ব সুগন্ধ বার হত। সমকালীন অনেকেই এই সুগন্ধের কথা উল্লেখ করেছেন।

যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকলেও পুত্রের শিক্ষার দিকে ফিলিপের ছিল তীক্ষ্ণ নজর। আলেকজান্ডারের প্রথম শিক্ষক ছিলেন লিওনিদোস নামে অলিম্পিয়াসের এক আত্মীয়। আলেকজান্ডার ছিলেন যেমন অশান্ত তেমনি জেদী আর একরোখা। শিশু আলেকজান্ডারকে পড়াশুনায় মনোযোগী করতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হত লিওনিদোসকে। কিন্তু তার আন্তরিক প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন আলেকজান্ডার। লিওনিদোসের কাছে শিখতেন অঙ্ক, ইতিহাসের বিভিন্ন কাহিনী, অশ্বরোহণ, তীরন্দাজী।

কিশোর বয়েস থেকেই তার মধ্যে ফুটে উঠেছিল বীরোচিত সাহস। এই সাহসের সাথে সংমিশ্রণ ঘটেছিল তীক্ষ্ণ বুদ্ধির। একদিন একজন ব্যবসায়ী একটি ঘোড়া বিক্রি করেছিল ফিলিপের কাছে। এমন সুন্দর ঘোড়া সচরাচর দেখা যায় না। ফিলিপের লোকজন ঘোড়াটিকে মাঠে নিয়ে যেতেই হিংস্র হয়ে উঠল। যতবারই লোকেরা তার পিঠের উপরে উঠতে চেষ্টা করে, ততবারই তাদের আঘাত করে দূরে ছিটকে ফেলে দেয়। শেষ আর কেউই ঘোড়ার পিঠে উঠতে সাহস পেল না। কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন ফিলিপ আর আলেকজান্ডার। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন নিজের ছায়া দেখে ভয় পাচ্ছে। ঘোড়াটি। তাই ঘোড়ার পাশে গিয়ে আস্তে আস্তে তার মুখটা সূর্যের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। তারপর ঘোড়াটিকে আদর করতে করতে একলাফে পিঠের উপর উঠে পড়লেন। উপস্থিত সকলেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। যদি ঐ ঘোড়া আলেকজান্ডারকে আহত করে। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে এলেন আলেকজান্ডার। ঘোড়া থেকে নেমে ফিলিপের সামনে আসতেই পুত্রকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন ফিলিপ। বললেন, তোমাকে এইভাবে নতুন রাজ্য জয় করতে হবে। তোমার তুলনায় ম্যাসিডন খুবই ছোট।

ফিলিপ অনুভব করতে পারলেন তাঁর ছেলে অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। এখন শুধু প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষার এবং সে ভার আলেকজান্ডারের জন্মের সময়েই সমর্পণ করেছেন মহাজ্ঞানী অ্যারিস্টটলের উপর। অ্যারিস্টটল ফিলিপের আমন্ত্রণে ম্যাসিডনে এলেন।

দীর্ঘ তিন বছর ধরে অ্যারিস্টটলের কাছে শিক্ষালাভ করেছিলেন আলেকজান্ডার। পরবর্তীকালে অনেক ঐতিহাসিকের অভিমত, নিজেকে বিশ্ববিজয়ী হিসাবে গড়ে তোলার শিক্ষা আলেকজান্ডার পেয়েছিলেন অ্যারিস্টটলের কাছে।

আমৃত্যু গুরুকে গভীর সম্মান করতেন আলেকডান্ডার। তাঁর গবেষণার সমস্ত দায়িত্বভার নিজেই গ্রহণ করেছিলেন। নিজের গুরুর প্রতি সম্মান জানাতে গিয়ে আলেকজান্ডার বললেন, এই জীবন পেয়েছি পিতার কাছে। কিন্তু সেই জীবনকে কি করে আরো সুন্দর করে তোলা যায়, সেই শিক্ষা পেয়েছি গুরুর কাছে।

আলেকজান্ডারের বয়স যখন মোল, ফিলিপ বাইজানটাইন অভিযানে বার হলেন। পুত্রের উপর রাজ্যের সমস্ত ভার অর্পণ করলেন। ফিলিপের অনুপস্থিতিতে কিছু অধিনস্থ অঞ্চলের নেতারা বিদ্রোহ ঘোষণা করল। কিশোর আলেকজান্ডার নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে রইলেন না। বীরদর্পে সৈন্যবাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শুধু বিদ্রোহীদের পরাজিত করলেন। না, তাদের বন্দী করে নিয়ে এলেন ম্যাসিডনে।

এই যুদ্ধজয়ে অনুপ্রাণিত আলেকজান্ডার সৈন্যবাহিনী নিয়ে এগিয়ে চললেন। প্রথম যে দেশ জয় করলেন, নিজের নামে সেই দেশের নাম রাখলেন আলেকজান্ডা পোলিস।

পিতা-পুত্রের মধ্যেকার সম্পর্ক ক্রমশই খারাপ হতে থাকে। এর পেছনে মায়ের প্ররোচনাও ছিল যথেষ্ট। আলেকজান্ডারের যখন কুড়ি বছর বয়স, ফিলিপ আততায়ীর হাতে নিহত হলেন। এর পেছনে রানী অলিম্পিয়াসেরও হাত ছিল। ফিলিপ নিহত হতেই সিংহাসন অধিকার করলেন আলেকজান্ডার। প্রথমেই হত্যা করা হল নতুন রানীর কন্যাকে, নতুন রানীকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করলেন রানী অলিম্পিয়াস। যাতে ভবিষ্যতে কেউ তার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে।

এই সময় ম্যাসিডনের চতুর্দিকে শক্ররাষ্ট্র। ফিলিপের হত্যার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন অধিনস্থ রাষ্ট্র স্বাধীনতা ঘোষণা করল। ম্যাসিডনের নেতৃস্থানীয় সকলেই আলেকজান্ডারকে পরামর্শ দিল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্র সম্পর্ক স্থাপন করতে।

কিন্তু এই পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করলেন আলেকজান্ডার। সুসংহত সামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন শত্রুদের উপর। প্রথমে আক্রমণ করলেন থেবেস। তাদের সমস্ত বাধা চূর্ণ বিচূর্ণ করে শহর দখল করলেন, যাতে তার শক্তি সম্বন্ধে সমস্ত গ্রীসের মানুষ সচেতন হয়ে ওঠে। তাই শুধু নগর ধ্বংস করে নিবৃত্ত হলেন না, ছয় হাজার লোককে হত্যা করা হল এবং ত্রিশ হাজার লোককে দাস হিসাবে বিক্রি করা হল।

এবার থেবেস থেকে আলেকজান্ডার এগিয়ে চললেন দক্ষিণের দিকে। প্রথমে কিছু রাষ্ট্র বাধা দিলেও একে একে সমস্ত দেশই তার অধীনতা স্বীকার করে তাঁকে নেতা হিসাবে মেনে নিল।

অবশেষে তিনি এলেন কর্নিথে। এখানে সমস্ত গ্রীক রাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে তাঁকে প্রধান হিসাবে নির্বাচিত করল এবং এশিয়া অভিযানের সমস্ত দায়িত্বভার অর্পণ করা হল।

যখন আলেকজান্ডার কর্নিথে ছিলেন, দেশের সমস্ত জ্ঞানীগুণী মানুষেরা নিয়মিত তাকে অভিনন্দন জানাতে আসত। কিন্তু আলেকজান্ডার মহাজ্ঞানী ডায়োজেনিসের সাথে সাক্ষাতের জন্য উৎসুক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি আলেকজান্ডারের কাছে গেলেন না। শেষে আলেকজান্ডার নিজেই গেলেন তাঁর কাছে।

বাড়ির সামনে একটি খোলা জায়গায় শুয়ে রোদ পোহাচ্ছিলেন বৃদ্ধ দার্শনিক। আলেকজান্ডার তার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আপনি কি আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করেন?

ডায়োজেনিস শান্ত স্বরে বললেন, “আপনি আমার আর সূর্যের মাঝে আড়াল করে দাঁড়াবেন না, এবং বেশি আর কিছু প্রার্থনা করি না।”

সামান্যতম ক্রুদ্ধ হলেন না আলেকজান্ডার। বৃদ্ধ দার্শনিকের নিলোর্ভ স্পষ্ট উত্তর শুনে শ্রদ্ধায় বলে উঠলেন, আমি যদি আলেকজান্ডার না হতাম তাহলে ডায়োজেনিস হতে চাইতাম।

আলেকজান্ডার জানতেন উপযুক্ত প্রস্তুতি ছাড়া কোন যুদ্ধজয় অসম্ভব। শুরু হল তাঁর যুদ্ধের প্রস্তুতি। অল্পদিনের মধ্যেই গড়ে তুললেন সুদক্ষ বিশাল এক সৈন্যবাহিনী। তার মধ্যে ছিল ত্রিশ হাজার পদাতিক, চার হাজার অশ্বারোহী। তাঁর প্রথম লক্ষ্য ছিল পারস্য অভিযান। পারস্য দখলের পর তার লক্ষ্য এশিয়া। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৪ সালে বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন।

প্রথমে আলেকজান্ডার এলেন হেলসম্পটে। এখানে বয়ে চলেছে Granicus নদী। নদীর ওপারে পারস্য সম্রাটের বিশাল সৈন্যবাহিনী।

দুই পক্ষে শুরু হল মরণপণ লড়াই। ক্রমশই দারিয়ুসের বাহিনী বিধ্বস্ত হতে থাকে। তাদের পক্ষে প্রায় ২৫০০০ হাজার সৈনিক মারা পড়ল। প্রাণ বাঁচাতে দারিয়ুস তার পরিবারের সকলকে ফেলে রেখে পালিয়ে গেলেন।

এই বার আলেকজান্ডার এশিয়ামাইনর অভিমুখে অভিযান শুরু করলেন-ক্রমাগত যুদ্ধ জয়ে এক অপরাজের মনোভাব গড়ে উঠল তার মধ্যে। পৃথিবীর কোন কিছুতেই তাঁর ভয় নেই। ধ্বংসের জন্যেই যেন তার আবির্ভাব।

যা অসম্ভব অন্যরা যা দেখে পিছিয়ে যায় তিনি তাকে সম্ভব করে তুলতেন। যেখানে দুরন্ত নদী তার পথে বাধার সৃষ্টি করত, সকলে বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ত, সুকৌশলে সেই নদী পার হয়ে যেতেন আলেকজান্ডার। যখন বিশাল পাহাড় তার পথে অবরোধ করে দাঁড়াত তিনি অসীম সাহসে সেই পাহাড় অতিক্রম করে শত্রু সৈন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন।

দ্রুততাই একবার তাঁকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। সেই সময় দারিয়ুস ছিলেন সমগ্র পশ্চিম এশিয়া, মিশর ও পারস্যের অধিপতি। একটি যুদ্ধে পরাজিত হলেও

অন্য জায়গায় গিয়ে তিনি অন্য সৈন্যদল নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন।

আলেকজান্ডারও তখন যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। মরুভূমির মত রুক্ষ প্রান্তরের বুকে ঘোড়া ছুটিয়ে এলেন Cydnus নদীর কূলে। এই নদীর পানি ছিল ভীষণ ঠাণ্ডা। সমস্ত দিনের রৌদ্রতাপে আলেকজান্ডারের শরীর এত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, মুহূর্ত মাত্র বিলম্ব না করে তিনি নদীর পানিতে গোসল করলেন এবং পরদিনই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

কয়েক দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠলেন।

এইবার শুরু হল আলেকজান্ডারের বৃহত্তম অভিযান। সেই সময় দাবিয়ুস ছিলেন পৃথিবীর বৃহত্তম সাম্রাজ্যের অধিপতি। তার সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় দশ লক্ষ। অপরদিকে আলেকজান্ডারে সৈন্য সংখ্যা দু লক্ষের বেশি হল না।

আরবেলায় রণক্ষেত্রে দুই পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হল। দারিয়ুসের সৈন্যদের মধ্যে ছিল সংহতির অভাব। তাছাড়া দারিয়ুস নিজেও রণকুশলী ছিলেন না। সম্পূর্ণ পরাজিত হলেন দারিয়ুস। এইবারও প্রাণভয়ে স্ত্রী কন্যাদের রেখে পালিয়ে গেলেন।

আলেকজান্ডার পারস্যের রাজধানী পার্সেপোলিশ দখল করলেন। সেই সময় পার্সেপোলিশ ছিল পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ নগর। যুগ যুগ ধরে পারস্য সম্রাটেরা বিভিন্ন দেশ থেকে সম্পদ আহরণ করে এখানে সঞ্চিত করে রেখেছিল। সব সম্পদ অধিকার করলেন আলেকজান্ডার। রাজপ্রাসাদের সকলকে বন্দী করা হল। দারিয়ুসের মা, স্ত্রী, দুই কন্যাকে বন্দী করে আনা হল আলেকজান্ডারের সামনে। তারা সকলেই মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আলেকজান্ডার তাদের সসম্মানে মুক্তি দিয়ে প্রাসাদে ফিরিয়ে দিলেন।

পারস্য অভিযানের পর তিনি সিরিয়া অভিযান শুরু করলেন। সমুদ্র-বেষ্টিত শহর দখল করবার সময় অসাধারণ সামরিক কৌশলের পরিচয় দেন। সৈন্য পারাপার করবার জন্য সমুদ্রের উপর তিনি দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করলেন। সিরিয়ার সৈন্যবাহিনী ছিল খুবই শক্তিশালী। এক প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী মরণপণ সংগ্রামের পর জয়ী হলেন আলেকজান্ডার। সিরিয়া দখল করবার পর দখল করলেন প্যালেস্টাইন, তারপর মিশর। মিশরে নিজের নামে স্থাপন করলেন নতুন নগর আলেকজান্দ্রিয়া।

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৮ সালের মধ্যে সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্য তাঁর অধিকারে এল।

৩২৭ খ্রিস্টপূর্বে আলেকজান্ডার সৈন্যবাহিনী নিয়ে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে ভারতবর্ষে প্রবেশ করলেন। সেই সময় ভারতবর্ষে ছিল অসংখ্য ছোট বড় রাষ্ট্র। কারোর সাথেই কারোর সদ্ভাব ছিল না। প্রত্যেকেই পরস্পরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হত।

তক্ষশীলার রাজা অম্ভি প্রতিবেশী রাজা পুরু শক্তি খর্ব করবার জন্য আলেকজান্ডারের বন্ধুত্ব চেয়ে তাঁর কাছে দূত পাঠালেন।

দীর্ঘ এক মাস চলবার পর নিহত হলেন রাজা অষ্টক। গ্রীক সৈন্যরা পুষ্কলাবতী নগর দখল করে নিল।

প্রতিবেশী সমস্ত রাজাই আলেকজান্ডারে বশ্যতা স্বীকার করে নিল। শুধু একজন আলেকজান্ডারের বশ্যতা স্বীকার করতে অস্বীকার করলেন, তিনি রাজা পুরু।

আলেকজান্ডার সরাসরি শত্রুসৈন্যের মুখোমুখি হতে চাইলেন না। তিনি গোপনে অন্য পথ দিয়ে নদী পা হয়ে পুরুকে আক্রমণ করলেন। পুরু ও তার সৈন্যবাহিনী অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করলেও আলেকজান্ডারের রণনিপুণ বাহিনীর কাছে পরাজয় বরণ করতে হল। আহত পুরু বন্দী হলেন। তাঁকে নিয়ে আসা হল আলেকজান্ডারের কাছে। তিনি শৃঙ্খলিত পুরুকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি আমার কাছে কি রকম ব্যবহার আশা করেন? পুরু জবাব দিলেন, একজন রাজা অন্য রাজার সঙ্গে যে ব্যবহার আশা করেন, আমিও সেই ব্যবহার আশা করি।

পুরুর বীরত্ব, তাঁর নির্ভীক উত্তর শুনে এতখানি মুগ্ধ হলেন আলেকজান্ডার, তাঁকে মুক্তিদিয়ে শুধু তাঁর রাজ্যই ফিরিয়ে দিলেন না, বন্ধুত্ব স্থাপন করে আরো কিছু অঞ্চল উপহার দিলেন।

আলেকজান্ডারের ইচ্ছা ছিল আরো পূর্বে মগধ আক্রমণ করবেন। কিন্তু তাঁর সৈন্যবাহিনী আর অগ্রসর হতে চাইল না। দীর্ঘ কয়েক বছর তারা মাতৃভূমি ত্যাগ করে এসেছিল। আত্মীয় বন্ধু পরিজনের বিরহ তাদের মনকে উদাসী করে তুলেছিল। এছাড়া দীর্ঘ পথশ্রমে যুদ্ধের পর যুদ্ধে সকলেই ক্লান্ত। অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বদেশের পথে প্রত্যাবর্তন করলেন আলেকজান্ডার। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আলেকজান্ডার এসে পৌঁছলেন ব্যাবিলনে।

ব্যাবিলনে এসে কয়েক মাস বিশ্রাম নিয়ে স্থির করলেন আরবের কিছু অঞ্চল জয় করে উত্তর আফ্রিকা জয় করবেন। কিন্তু ২রা জুন খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩, গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন আলেকডান্ডার। এগারো দিন পর মারা গেলেন আলেকজান্ডার। তখন দিন শেষ হয়ে সন্ধ্যা নেমেছিল।

আলেকজান্ডার মাত্র ৩৩ বছর বেঁচেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এবং সেই বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যের অধিশ্বর হতে। তার মনের অতিমানবীয় এই ইচ্ছাকে পূর্ণ করবার জন্য তিনি তাঁর স্বল্পকালীন জীবনের অর্ধেককেই প্রায় অতিবাহিত করেছেন যুদ্ধেক্ষেত্রে। তার বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য ঐতিহাসিকরা তাঁকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতির আসনে বসিয়েছেন। তাঁকে ‘আলেকজান্ডার দি গ্রেট’ এই নামে অভিহিত করা হয়েছে।

নিরপেক্ষ বিচারে কি আলেকজান্ডারকে শ্রেষ্ঠ মহৎ নৃপতি হিসাবে ব্যাখ্যা দেওয়া যায়? এই প্রসঙ্গে একজন প্রখ্যাত জীবনীকার লিখেছেন, অনেকে তাঁকে মানব জীবনের যা কিছু শ্রেষ্ঠ গুণ-মহত্ত্বতা, বীরত্বের এক প্রতিভু বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি নগর স্থাপন করেছেন, অসভ্য জাতিকে সভ্য করেছেন, পথঘাট নির্মাণ করেছেন, দেশে দেশে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আলেকজান্ডার সভ্যতা সংস্কৃতি সম্বন্ধে উৎসাহী ছিলেন না। নিজের খ্যাতি গৌরব প্রভুত্ব ছাড়া কোন বিষয়েই তাঁর কোন আগ্রহ ছিল না। এক পৈশাচিক উন্মাদনায় তিনি শুধু চেয়েছিলেন পথিবীকে পদানত করতে। তিনি যা কিছু করেছিলেন, সব কিছুই শুধুমাত্র নিজের গৌরবের জন্য, মানব কল্যাণের জন্য নয়। তিনি যে ক’টি নগর স্থাপন করেছিলেন, তার চেয়ে বেশি নগর গ্রাম জনপদকে ধ্বংস করেছিলেন। হাজার হাজার মানুষকে শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছা চরিতার্থতার জন্য হত্যা করেছিলেন।

সুপ্রাচীন মহান গ্রীক সভ্যতার একটি মাত্র বাণীকে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন দেশে দেশে। সে বাণী ধ্বংসের আর মৃত্যুর। শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রচারের ব্যাপারে তার সামান্যতম আগ্রহ ছিল না।

তার তৈরি করা পথে পরবর্তীকালে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল বলে অনেকে তাঁর দূরদর্শিতার প্রশংসা করেন। কিন্তু এই পথ তিনি তৈরি করেছিলেন সৃভ্যতাকে ধ্বংসের কাজ তরান্বিত করতে।

প্রকৃতপক্ষে তাঁর নাম চিরদিন ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে সভ্যতার অগ্রদূত হিসাবে নয়-ধ্বংস, ঝঞ্ঝা, হত্যা, মৃত্যুর পথপ্রদর্শক হিসাবে।

৩. হযরত মুসা (খ্রীষ্ট পূর্ব ত্রয়োদশ শতাব্দী)

প্রাচীন মিশরের রাজধানী ছিল পেন্টাটিউক। নীল নদের তীরে এই নগরে বাস করতেন মিশরের “ফেরাউন” রামেসিস। নগরের শেষ প্রান্তে ইহুদিদের বসতি। মিশরের “ফেরাউন” ছিলেন ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন। একবার কয়েকজন জ্যোতিষী গণনা করে তাকে বলেছিলেন, ইহুদি পরিবারের মধ্যে এমন এক সন্তান জন্মগ্রহণ করবে যে ভবিষ্যতে মিশরের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। জ্যোতিষীদের কথা শুনে ভীত হয়ে পড়লেন ফ্যারাও। তাই “ফেরাউন” আদেশ দিলেন কোন ইহুদি পরিবারে সন্তান জন্মগ্রহণ করলেই যেন হত্যা করা হয়।

“ফেরাউন” এর গুপ্তচররা চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াত। যখনই কোন পরিবারে সন্তান জন্মবার সংবাদ পেত তখনই গিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করত।

ইহুদি মহল্লায় বাস করতেন আসরাম আর জোশিবেদ নামে এক সদ্যবিবাহিত দম্পতি। যথাসময়ে জোশিবেদের একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করল। সন্তান জন্মাবার পরই স্বামী-স্ত্রীর মনে হল যেমন করেই হোক এই সন্তানকে রক্ষা করতেই হবে। কে বলতে পারে এই সন্তানই হয়ত ইহুদি জাতিকে সমস্ত নির্যাতন থেকে রক্ষা করবে একদিন।

সকলের চোখের আড়ালে সম্পূর্ণ গোপনে শিশুসন্তানকে বড় করে তুলতে লাগলেন আসরাম আর জোশিবেদ। কিন্তু বেশিদিন এই সংবাদ গোপন রাখা গেল না। স্বামী-স্ত্রী বুঝতে পারলেন যে কোন মুহূর্তে “ফেরাউন”-এর সৈনিকরা এসে তাদের সন্তানকে তুলে নিয়ে যাবে। ঈশ্বর আর ভাগ্যের হাতে শিশুকে সঁপে দিয়ে দুজন বেরিয়ে পড়লেন। নীল নদের তীরে এক নির্জন ঘাটে এসে শিশুকে শুইয়ে দিয়ে তারা বাড়ি ফিরে গেলেন।

সেই নদীর ঘাটে প্রতিদিন গোসল করতে আসত “ফেরাউনের কন্যা। ফুটফুটে সুন্দর একটা বাচ্চাকে একা পড়ে থাকতে দেখে তার মায়া হল। তাকে তুলে নিয়ে এল রাজপ্রাসাদে। তারপর সেই শিশু সন্তানকে নিজের সন্তানের মত স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে মানুষ করে তুলতে লাগল। রাজকন্যা শিশুর নাম রাখল মুসা।

এ বিষয়ে আরেকটি কাহিনী প্রচলিত। মুসার মা জোশিবেদ জানতেন প্রতিদিন “ফেরাউন”-এর কন্যা সখীদের নিয়ে নদীতে স্নান করতে আসেন। একদিন ঘাটের কাছে পথের ধারে শিশু মুসাকে একটা ঝুড়িতে করে শুইয়ে রেখে দিলেন। নিজের গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর রাজকুমারী সেই পথ দিয়ে স্নান করতে যাবার সময় দেখতে পেল মুসাকে। পথের পাশে ফুটফুটে একটা শিশুকে পড়ে থাকতে দেখে তার মায়া হল। তাড়াতাড়ি মুসাকে কোলে তুলে নিল। জোশিবেদকেই মুসাকে ধাত্রী হিসাবে নিয়োগ করে রাজকুমারী। নিজের পরিচয় গোপন করে রাজপ্রাসাদে মুসাকে দেখাশুনা করতে থাকে জোশিবেদ। মা ছাড়া মুসা কোন নারীর স্তন্যপান করেনি।

ধীরে ধীরে কৈশোর থেকে যৌবনে পা দিলেন মুসা। ফ্যারাওয়ের অত্যাচার বেড়েই চলছিল। ইহুদির উপর এই অত্যাচার ভাল লাগত না মুসার। পুত্রের মনোভাব জানতে পেরে একদিন জোশিবেদ তার কাছে নিজের প্রকৃত পরিচয় দিলেন। তারপর থেকে মুসার অন্তরে শুরু হল নিদারুণ যন্ত্রণা।

একদিন রাজপথ দিয়ে যাচ্ছিলেন মুসা। এমন সময় তার চোখে পড়ল এক হতভাগ্য ইহুদিকে নির্মমভাবে প্রহার করছে তার মিশরীয় মনিব। এই দৃশ্য দেখে আর স্থির থাকতে পারলেন না মুসা। তিনি সেই ইহুদিকে উদ্ধার করবার জন্য নিজের হাতে তরবারী দিয়ে আঘাত করলেন মিশরীর মনিবকে। সেই আঘাতে মারা গেল মিশরীয় লোকটি। ইহুদি লোকটি চারদিকে এ কথা প্রকাশ করে দিল। গুপ্তচররা “ফেরাউনকে গিয়ে সংবাদ দিতেই ক্রোধে ফেটে পড়লেন “ফেরাউন”। তিনি বুঝতে পারলেন রাজকন্যা মুসাকে মানুষ করলেও তার শরীরে বইছে ইহুদি রক্ত, তাই নিজের ধর্মের মানুষের উপর অত্যাচার হতে দেখে মিশরীয়কে হত্যা করেছে। একে যদি মুক্ত রাখা যায় তবে বিপদ অবশ্যম্ভাবী। তখনই সৈনিকদের ডেকে হুকুম দিলেন, যেখানে থেকে পার মুসাকে বন্দী করে নিয়ে এস।

“ফেরাউন”-এর আদেশে কথা শুনে আর বিলম্ব করলেন না মুসা। তৎক্ষণাৎ নগর ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়লেন।

দীর্ঘ পথশ্রমে মুসা ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর চোখে পড়ল দূরে একটি কুয়ো। কুয়োর সামনে সাতটি মেয়ে তাদের ভেড়াকে পানি খাওয়াচ্ছিল। হঠাৎ একদল মেষপালক সেখানে এসে মেয়েদের কাছে থেকে জোর করে ভেড়াগুলোকে কেড়ে নিল। সাথে সাথে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে দিল সাত বোন। তাদের চিৎকার শুনে ছুটে এলেন মুসা। তারপর মেষপালকদের কাছ থেকে সবকটা ভেড়া উদ্ধার করে মেয়েদের ফিরিয়ে দিলেন। মেয়েরা তাঁকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ি ফিরে গেল।

সাত বোনের বাবার নাম ছিল রুয়েন। সাত বোন এসে মুসাকে ডেকে নিয়ে গেল। তাদের বাড়িতে। তাঁর পরনের মূল্যবান পোশাক, সম্ভ্রমপূর্ণ ব্যবহার দেখে সকলেই মুগ্ধ হয়ে গেল। রুয়েন তার পরিচয় জিজ্ঞেস করতেই কোন কথা গোপন করলেন না মুসা। অকপটে নিজের পরিচয় দিলেন। রুয়েন মুসার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে তাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিল। অল্প কিছুদিন পর এক মেয়ের সাথে তাঁর বিয়ে দিলে রুয়েন।

সেই যাযাবর গোষ্ঠীর সাথে থাকতে থাকতে অল্প দিনেই মেষ চরানোর কাজ শিখে নিলে মুসা। এক নতুন পরিবেশের সাথে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে মানিয়ে নিলেন। দেখতে দেখতে বেশ কয়েক বছর কেটে গেল।

ওদিকে মিশরে ইহুদিদের অবস্থা ক্রমশই দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল।

মিডিয়াতে পশুপালকের জীবন যাপন করলেও স্বজাতির কথা ভুলতে পারেননি মুসা। মাঝে মাঝেই তার সমস্ত অন্তর ব্যথিত হয়ে উঠত।

একদিন মেষের পাল নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে নির্জন পাহাড়ের প্রান্তে এসে পৌঁছলেন মুসা। সামনেই বেশ কিছু গাছপালা। হঠাৎ মুসা দেখলেন সেই গাছপালা পাহাড়ের মধ্যে থেকে এক আলোকছটা বেরিয়ে এল। এত তীব্র সেই আলো, মনে হল দু চোখ যেন ঝলসে যাচ্ছে। তবুও স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন সেই আলোর দিকে। তার মনে হল ঐ আলো যেন তাঁকে আচ্ছান্ন করে ফেলছে। এক সময় শুনতে পেলেন সেই আলোর মধ্যে থেকে এক অলৌকিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল: মুসা মুসা।

চমকে উঠলেন মুসা। কেউ তাঁরই নাম ধরে ডাকছে। তৎক্ষণাৎ সাড়া দিলেন, কে আপনি আমায় ডাকছেন? সেই অলৌকিক কণ্ঠস্বর বলে উঠল, আমি তোমার ও তোমার পূর্বপুরুষদের একমাত্র ঈশ্বর।

ঈশ্বর তাঁর সাথে কথা বলছেন, এ যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না মুসা। ভীত হয়ে মাটিতে নতজানু হয়ে বসে পড়লেন। আমার কাছে আপনার কি প্রয়োজন প্রভু?

দৈবকণ্ঠস্বর বলল, তুমি আমার প্রতিনিধি হিসাবে মিশরে যাও। সেখানে ইহুদিরা অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করছে। তুমি ইহুদিদের মুক্ত করে নতুন দেশে নিয়ে যাবে।

মুসা বললেন, আমি কেমন করে তাদের মুক্তি দেব?

দৈববাণী বলল, আমি অদৃশ্যভাবে তোমাকে সাহায্য করব। তুমি ফ্যারাও-এর কাছে গিয়ে বলবে, আমিই তোমাকে প্রেরণ করেছি। সকলেই যেন তোমার আদেশ মেনে চলে।

মুসা বললেন, কিন্তু যখন তারা জিজ্ঞেস করবে ঈশ্বরের নাম, তখন কি জবাব দেব? প্রথমে ঈশ্বর তাঁর নাম প্রকাশ না করলেও পরে বললেন তিনিই এই বিশ্বজগতের স্রষ্টা আল্লাহ।

মুসা অনুভব করলেন তাঁর নিজের শক্তিতে নয়, ঈশ্বর প্রদত্ত শক্তিতেই তাঁকে সমস্ত কাজ সমাধান করতে হবে। এতদিন ঈশ্বর সম্বন্ধে তাঁর কোন স্পষ্ট ধারণা ছিল না। এই প্রথম অনুভব করলেন ঈশ্বর-নির্দিষ্ট কাজের জন্যই তিনি পৃথিবীতে এসেছেন। আর আল্লাহ তাঁর একমাত্র ঈশ্বর।

এর কয়েক দিন পর দ্বিতীয়বার ঈশ্বরের আদেশ পেলেন মুসা। তিনি পুনরায় আবির্ভূত হলেন মুসার সামনে। তারপর বললেন, তোমার উপর আমি প্রসন্ন হয়েছি। একমাত্র তুমিই পারবে ইহুদি জাতিকে এই সংকট থেকে উদ্ধার করতে। আর বিলম্ব করো না, যত শীঘ্র সম্ভব রওনা হও মিশরে। অল্প কয়েক দিন পর স্ত্রী-সন্তানদের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে মিশরের পথে যাত্রা করলেন যাত্রা করলেন মুসা।

যথাসময়ে মিশরে গিয়ে পৌঁছলেন মুসা। গিয়ে দেখলেন সত্যি সত্যিই ইহুদিরা অবর্ণনীয় দুরবস্থায় মধ্যে বাস করছে।

মুসা প্রথমেই সাক্ষাৎ করলেন ইহুদিদের প্রধান নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে। তাদের সকলকে বললেন ঈশ্বরের আদেশের কথা। মুসার আচার-আচরণ, তাঁর ব্যক্তিত্ব, আন্তরিক ব্যবহার, গভীর আত্মপ্রত্যয় দেখে সকলেই তাঁকে বিশ্বাস করল।

মুসা বললেন, আমরা “ফেরাউন”-এর কাছে গিয়ে দেশত্যাগ করবার অনুমতি প্রার্থনা করব। মুসা তার ভাই এ্যাবন ও কয়েকজন ইহুদি নেতাকে সাথে নিয়ে গিয়ে হাজির হলেন “ফেরাউন”-এর দরবারে। মুসা জানতেন সরাসরি দেশত্যাগের অনুমতি চাইলে কখনোই ফ্যারাও সেই অনুমতি দেবেন না। তাই তিনি বললেন, সম্রাট, আমাদের। স্রষ্টা আদেশ দিয়েছেন সমস্ত ইহুদিকে মিডিয়ার মরুপ্রান্তরে এক পাহাড়ে গিয়ে প্রার্থনা করতে। আপনি যদি কয়েক দিনের জন্য সেখানে যাবার অনুমতি দেন।

“ফেরাউন মুসার অনুরোধে সাড়া দিলেন। ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠলেন, তোমাদের আল্লাহর আদেশ আমি মানি না। তোমরা মিশর ত্যাগ করে কোথাও যেতে পারবে না।

মুসা বললেন, আমরা যদি মরুভূমিতে গিয়ে প্রার্থনা না করি তবে তিনি আমাদের উপর ক্রুদ্ধ হবেন। হয়ত আমাদের সকলকেই ধ্বংস করে ফেলবেন।

ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে এলেন মুসা। কি করবেন কিছুই ভাবতে পারছিলেন না। শেষে নিরুপায় হয়ে আল্লাহর কাছে আকুল হয়ে প্রার্থনা করলেন। তার প্রার্থনায় সাড়া দিলেন আল্লাহ। তিনি মুসাকে বললেন, তোমার ভাই এ্যারনকে বল, সে যেন নদী, জলাশয়, পুকুর ঝর্ণায় গিয়ে তার জাদুদণ্ড স্পর্শ করে, তাহলেই দেখবে সমস্ত পানি রক্ত হয়ে গিয়েছে।

আল্লাহ নির্দেশের এ্যারন মিশরের সমস্ত পানীয় জলকে রক্তে রূপান্তরিত করে ফেলল। ফ্যারাও আদেশ দিলেন মাটি খুড়ে পানি বার কর।

সৈনিকরা অসংখ্যা কূপ খুঁড়ে ফেলল। সকলে সেই জল পান করতে আরম্ভ করল। এ্যারনের জাদু বিফল হতেই মুসা পুনরায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন।

এইবার মিশর জুড়ে ব্যাঙের মহামারী দেখা গেল। তার পচা গন্ধে লোকের প্রাণান্তরক অবস্থা কেউ আর ঘরে থাকতে পারে না। সকলে গিয়ে “ফেরাউনের কাছে নালিশ জানাল। নিরুপায় হয়ে “ফেরাউন” ডেকে পাঠালেন মুসাকে। বললেন, তুমি ব্যাঙের মড়ক বন্ধ কর। আমি তোমাদের মরুভূমিতে গিয়ে প্রার্থনা করবার অনুমতি দেব।

মুসার ইচ্ছায় ব্যাঙের মড়ক বন্ধ হলেও ফ্যারাও নানান অজুহাতে ইহুদিদের যাওয়ার অনুমতি দিলেন না।

নিরুপায় হয়ে মুসা আবার আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন। ফ্যারাওয়ের আচরণে এই বার ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন আল্লাহ। সমস্ত মিশর জুড়ে শুরু হল ঝড়-ঝঞ্ঝা বৃষ্টি মহামারী। তবুও “ফেরাউন” অনুমতি দিতে চান ন।

এই বার আল্লাহ নির্মম অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। হঠাৎ সমস্ত মিশরীয়দের প্রথম পুত্র সন্তান মারা পড়ল। দেশজুড়ে শুরু হল হাহাকার। সমস্ত মিশরীয়রা দলবদ্ধভাবে গিয়ে “ফেরাউন”-এর কাছে দাবি জানাল, ইহুদিদের দেশ ছাড়ার অনুমতি দিন, না হলে আরো কি গুরুতর সর্বনাশ হবে কে জানে।

ভয় পেয়ে গেলেন ফ্যারাও। “ফেরাউন মুসাকে ডেকে বললেন, প্রার্থনা করবার জন্য তোমাদের মরুভূমিতে যাবার অনুমতি দিচ্ছি। যদি মনে কর, তোমাদের যা কিছু আছে, গৃহপালিত গবাদি পশু, জীবজন্তু, জিনিসপত্র, সব সাথে নিয়ে যেতে পার।

দেশত্যাগের অনুমতি পেয়ে ইহুদিরা সকলেই উল্লসিত হয়ে উঠল। তারা সকলেই মুসাকে তাদের নেতা বলে স্বীকার করে নিল। মিশর ছাড়াও মাকুম নগরেও বহু ইহুদি বাস করত। সকলে দলবদ্ধভাবে মুসাকে অনুসরণ করল।

মুসা জানতেন আল্লাহর শাস্তির ভয়ে ফ্যারাও দেশত্যাগের অনুমতি দিলেও তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করবেন যাতে তাদের যাত্রাপথে বিঘ্ন সৃষ্টি করা যায়। তাই যথাসম্ভব সতর্ক ভাবে পথ চলতে লাগলেন।

কয়েকদিন চলবার পর তারা সকলে এসে পড়ল লোহিত সাগরের তীরে।

এদিকে ইহুদিরা মিশর ত্যাগ করতেই “ফেরাউন”-এর মনের পরিবর্তন ঘটল। যেমন করেই হোক তাদের ফিরিয়ে নিয়ে এসে আবার ক্রীসদাসে পরিণত করতে হবে। তৎক্ষণাৎ ইহুদিদের বন্দী করবার জন্য বিশাল এক সৈন্যবাহিনীকে পাঠালেন “ফেরাউন”।

এদিকে দূর থেকে মিশরীয় সৈন্যদের দেখতে পেয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ল সমস্ত ইহুদীরা। সামান্যতম বিচলিত হলেন না মুসা।

প্রার্থনায় বসলেন মুসা। প্রার্থনা শেষ হতেই দৈববাণী হল, মুসা, তোমার হাতের দণ্ড তুলে সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে যাবে। সমুদ্রের পানি তোমাদের স্পর্শ করবে না।

মুসা তাঁর হাতের দণ্ড তুলে সমুদ্রের সামনে এসে দাঁড়াতেই সমুদ্র দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেল। তার মধ্যে দিয়ে প্রসারিত হয়েছে প্রশান্ত পথ। সকলের আগে মুসা, তার পেছনে সমস্ত ইহুদি-নারী-পুরুষের দল সেই পথ ধরে এগিয়ে চলল। তারা কিছুদূর যেতেই মিশরীয় সৈন্যরা এসে পড়ল সমুদ্রের তীরে। ইহুদিদের সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে যেতে দেখে তারাও তাদের অনুসরণ করে সেই পথে ধরে এগিয়ে চলল। সমস্ত মিশরীয় বাহিনী সমুদ্রের মধ্যে নেমে আসতেই আল্লাহর নির্দেশ শুনতে পেলেন মুসা, তোমার হাতের দণ্ড পেছন ফিরে নামিয়ে দাও।

মুসা তার হাতে দণ্ড নিচু করতেই সমুদ্রের জলরাশি এসে আছড়ে পড়ল মিশরীয় সৈন্যদের উপর। মুহূর্তে বিশাল সৈন্যবাহিনী সমুদ্রের অতল গহরে হারিয়ে গেল। ইহুদিরা নিরাপদে তীরে গিয়ে উঠল।

মুসা সকলকে নিয়ে এগিয়ে চললেন। সামনে বিশাল মরুভূমি। সামান্য পথ অতিক্রম করতেই তাদের সঞ্চিত পানি, খাবার ফুরিয়ে গেল। মরুভূমির বুকে কোথাও পানির চিহ্নমাত্র নেই। ক্রমশই সকলে তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ছিল। অনেকে আর অগ্রসর হতে চাইছিল না।

মুসা বিচলিত হয়ে পড়লেন, এতগুলো মানুষকে কোথা থেকে তৃষ্ণার পানি দেবেন। কিছুদূর যেতেই এক জায়গায় পানি পাওয়া গেল। এত দুর্গন্ধ সেই পানি, কার সাধ্য তা মুখে দেয়। প্রার্থনায় বসলেন মুসা। প্রার্থনা শেষ করে আল্লাহর নির্দেশে কিছু গাছের পাতা ফেলে দিলেন সেই পানির মধ্যে। সাথে সাথে সেই পানি সুস্বাদু পানীয় হয়ে উঠল। সকলে তৃষ্ণা মিটিয়ে সব পাত্র ভরে নিল। যারা মুসাকে দোষারোপ করছিল, তারা অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা-ভিক্ষা চাইল। সকলে মুসাকে তাদের ধর্মগুরু ও নেতা হিসাবে স্বীকার করে নিল। সকলে তাঁর নির্দেশ মত এগিয়ে চলল। কিছুদিনের মধ্যেই সমস্ত খাবার ফুরিয়ে গেল। আশেপাশে কোথাও কোন খাবারবের সন্ধান পাওয়া গেল না। খিদের জ্বালায় সকলেই ক্লান্ত হয়ে পড়ল। আবার তারা দোষারোপ করতে আরম্ভ করল মুসাকে। তোমার জন্যেই আমাদের এত কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে।

মুসা সকলকে শান্ত করে বললেন, তোমরা ভুলে গিয়েছ আমাদের ঈশ্বর আল্লাহর কথা। তিনি “ফেরাউনকে” তোমাদের দেশত্যাগের অনুমতি দিতে বাধ্য করেছেন। তিনি সমুদ্রকে দ্বিধাবিভক্ত করেছেন, সৈন্যদের হাত থেকে তোমাদের রক্ষা করেছেন। তোমাদের পানীর ব্যবস্থা করেছেন। তবুও তোমরা তাঁর শক্তিতে সন্দেহ প্রকাশ করছ।

মুসার কথা শেষ হতেই কোথা থেকে সেখানে উড়ে আসে অসংখ্য পাখির ঝাঁক। ইহুদিরা ইচ্ছামত পাখি মেরে মাংস খায়। আর কারো মনে কোন সংশয় থাকে না। মুসাই তাদের অবিসংবাদিত নেতা। সকলে শপথ করে জীবনে-মরণে তারা মুসার সমস্ত আদেশ মেনে চলবে।

মুসা সমস্ত ইহাদিদের নিয়ে এলেন এফিডিম নামে এক নির্জন প্রান্তে। চারদিকে ধু ধু বালি, মাঝে মাঝে ছোট পাহাড়, কোথাও পানীর কোন উৎস নেই।

মুসা আবার এগিয়ে চললেন। কিছুদূর গিয়ে একটা বড় পাহাড়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। আল্লাহর নির্দেশে একটা পাথর সরাতেই বেরিয়ে এল স্বচ্ছ পানির এক ঝর্ণাধারা। সেই পানিতে সকলের তৃষ্ণা মিটল।

মুসা যেখানে এসেছিলেন তার অদূরেই প্যালেস্তাইনে তখন বাস করত আমালেক নামে এক উপজাতি সম্প্রদায়। নতুন একদল মানুষকে তাদের অঞ্চলে প্রবেশ করতে দেখে তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হল।

অপরদিকে ইহুদিরা দীর্ঘ পথশ্রমে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, অবসন্ন, সকলে মুসাকে বলল, এই যুদ্ধে আমাদের নিশ্চিত পরাজয় হবে। তুমি অন্য কোথাও আশ্রয়ের সন্ধানে চল।

মুসা সকলকে সাহস দিয়ে তাঁর দলের সমস্ত পুরুষদের একত্রিত করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। যুদ্ধ পরিচালনার ভার দেওয়া হল জোশুয়া নামে এক সাহসী যুবককে। শুরু হলে গেল তুমুল যুদ্ধ। মুসা নিজে যুদ্ধে যোগ দিলেন। আল্লাহ্র নির্দেশে পাহাড়ের উপর উঠে তার হাতের দণ্ড আকাশের দিকে তুলে ধরলেন। যুদ্ধের প্রথমে আমালেকরা ইহুদিদের বিপর্যন্ত করছিল। কিন্তু মুসা তাঁর দণ্ড ঊর্ধ্বাকাশে তুলে ধরতেই যুদ্ধের গতি পরিবর্তন হল। ইহুদিরা বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমালেকদের উপর। ইহুদিদের সেই প্রচণ্ড বিক্রম সহ্য করতে পারল না আমালেকরা। বিপর্যন্ত বিধ্বস্ত হয়ে তারা পালিয়ে গেল।

ইহুদিরা নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলল প্যালেস্তানেই দিকে। পথে সিনাই পর্বত। এখানে পানি ও গাছপালার কোন অভাব নেই দেখে মুসা সেখানেই সকলকে তাবু খাটাবার নির্দেশ দিলেন।

সেই সময় মুসার শ্বশুর জেথ্রো তার স্ত্রী, দুই পুত্র, সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে সেই পথ ধরে যাচ্ছিল। কাছে আসতেই বুঝতে পারলেন এরা দেশত্যাগী ইহুদি জাতি। তার জামাই-এর নেতৃত্বে এখানে বসতি স্থাপন করেছে।

জেথ্রো ছিলেন উপজাতি সম্প্রদায়ে পুরোহিত। নানান দেবদেবীর পূজা করতেন তিনি। মুসাকে বললেন, তোমাদের আল্লাহর কথা শুনে উপলব্ধি করতে পেরেছি, তিনি সকল দেবতার ঊর্ধ্বে, তিনিই সমস্ত শক্তির উৎস। এতদিন আমি ভুল পথে চালিত হয়েছি। যে সব দেবতাকে পূজা-অর্চনা করেছি তারা কেউই আল্লাহর সমকক্ষ নন। আমি তার ইবাদত করতে চাই।

মুসা ইহুদিদের মধ্যে থেকে সৎ ন্যায়বান জ্ঞানী মানুষদের বিচারক হিসাবে নিযুক্ত করলেন।

এই সময় মুসা একদিন গভীর রাতে আল্লাহর দৈববাণী শুনতে পেলেন মুসা; আমি আমার এক দূতকে তোমাদের কাছে পাঠাব। তোমরা সকলে তাকে অনুসরণ করবে। যে পথে তোমরা যাবে সেই পথে নানান বাধা আসবে। শক্ররা তোমাদের যাত্রাপথে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে। কিন্তু আমার আশীর্বাদে তোমাদের কোন ক্ষতি হবে না। তুমি বীরদর্পে এগিয়ে যাবে। পথে অন্য কোন দেবতার মূর্তি বিগ্রহ মন্দির দেখলেই তা ধ্বংস করবে। আর সর্বত্র আমার উপদেশ প্রচার করবে। যারা মূর্তি পূজা করবে তারা আমার শত্রু, তুমি তাদের ধ্বংস করবে।

পরদিন মুসা ইহুদিদের সকলকে ডেকে বললেন তোমরা সকলে আগামী দুদিন শুদ্ধ পবিত্রভাবে থাকবে। তৃতীয় দিন দেবদূতের আবির্ভাব হবে। তখন আমরা তাঁকে অনুসরণ করব।

দুদিন কেটে গেল। তৃতীয় দিন ভোর থেকেই ঘন মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল। তারই সাথে ঘন ঘন বিদ্যুতের চমক, বজ্রের নিঘোর্ষ। হঠাৎ ঘন মেঘপুঞ্জের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল এক তীব্র আলোকছটা। তার আলোয় সব অন্ধকার কেটে গেল। দেখা গেল এক টুকরো ভাসমান মেঘ আকাশ থেকে নেমে এল সিনাই পর্বতের মাথায়। এক মেঘ থেকে সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলি বার হয়ে পাহাড়ের সমস্ত চূড়াকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

এমন সময় সইে মেঘপুঞ্জ থেকে অলৌকিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, মুসা, তুমি পাহাড়ের চূড়ায় উঠে এস।

পাহাড়ের চূড়ায় উঠতেই মুসা শুনতে পেলেন আল্লাহর কণ্ঠস্বর, হে আমার প্রিয় ভক্ত, আমি তোমার মাধ্যমে সমস্ত ইহুদিদের দশটি নিয়ম জানাতে চাই। শুধু মাত্র আমাকে মানলেই চলবে না। এই দশটি নিয়ম তোমাদের সকলকে মেনে চলতে হবে।

আল্লাহ তখন মুসার কানে কানে দশটি নির্দেশ দিলেন। এদের বলে টেন কম্যান্ডমেন্টস্।

মুসাকে আরো কিছু নির্দেশ দিয়ে আল্লাহর অদৃশ্য কণ্ঠস্বর বাতাসে মিলিয়ে গেল। ঝরে গেল সেই আলোকরশ্মি মেঘপুঞ্জ। সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এল।

নিয়ম দশটি নিম্নরূপঃ

এক–আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ঈশ্বর নেই। তোমরা আল্লাহ ছাড়া অপর কোন দেবতার ইবাদত করবে না।

দুই–আল্লাহকে শুধু মাত্র উপাস্য হিসাবে মান্য করলেই হবে না। তাঁর প্রতিটি নির্দেশ আদেশ মেনে চলতে হবে।

তিন–সপ্তাহের ছয় দিন কাজ করবে। সপ্তম দিন কোন কাজ করবে না। এই দিন স্যাবাথ বা পবিত্র বিশ্রামের দিন।

চার–পিতামাতাকে ভক্তি করবে, শ্রদ্ধা করবে, তাঁদের প্রতি পালনীয় কর্তব্য অবশ্যই পালন করবে।

পাঁচ–কোন মানুষকে হত্যা করো না।

ছয়–কোন নারী বা পুরুষ কখনোই ব্যভিচার করবে না।

সাত–অপরের দ্রব্য অপহরণ করবে না।

আট–মিথ্যা সাক্ষ্য দেবে না।

নয়–অন্য জিনিসের প্রতি কোন লোভ করবে না, বা যাতে অন্যের অধিকার আছে। তা গ্রহণ করবে না।

দশ––উপাসনাস্থল বেদী নির্মাণ করে পশুবলি দিতে হবে।

পাথর স্থাপন করা হল পাহাড়ের গায়ে। যাতে ইহুদিদের ভবিষ্যৎ বংশধররা জানতে পারে ঈশ্বরের আদেশের কথা।

এইবার মুসা ঈশ্বরের ধ্যান করবার জন্য পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গেলেন। দীর্ঘ চল্লিশ দিন ধরে গভীর সাধনায় মগ্ন হয়ে রইলেন মুসা।

এদিকে মুসা অনুপস্থিতিতে সকলেই চিন্তিত হয়ে পড়ল। সকলে এসে ধরল মুসার ভাই হারুনকে সে ভুলে গেল টেন কম্যান্ডমেন্টস-এর নির্দেশ। সে একটি সোনার বাছুর তৈরি করে বলল, এই বাছুরটিকেই আল্লাহর প্রতীক বলে পূজা কর। তারপর একে বলি দিয়ে পূজা শেষ করব।

সকলে বাছুর পূজার আনন্দে মেতে উঠল। ইহুদিদের এই মূর্তিপূজা দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন আল্লাহ। তিনি মুসাকে বললেন, ওদের এই গর্হিত কাজের জন্য আমি সকলকে ধ্বংস করব। সৃষ্টি করব নতুন এক জাতি।

মুসা বুঝতে পারলেন আল্লাহ ইহুদিদের অন্যায় আচরণে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছেন। তিনি নতজানু হয়ে বসে বললেন, হে প্রভু, তুমি তোমার সন্তানদের এই অপরাধ মার্জনা কর।

মুসার কথায় শান্ত হলেন আল্লাহ। তিনি তাঁর উপদেশ-নির্দেশ লেখা আরো দুটি পাথর দিলেন। মুসা সেই পাথর দুটি নিয়ে পাহাড় থেকে নিচে নামতেই দেখতে পেলেন সোনার বাছুরে মূর্তিকে ঘিরে ইহুদিরা আনন্দ উৎসবে মেনে উঠেছে। ইহুদিদের এই অসংযমী ধর্মবিরুদ্ধ আচরণে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন মুসা।

তাই তিনি ক্রুদ্ধ স্বরে গর্জন করে উঠলেন, তোমরা এই নাচ ও পূজা উৎসব বন্ধ কর।

ইহুদিরা কোনদিন মুসার এই ক্রুদ্ধ মূর্তি দেখেনি। তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। মুসা বললেন, তোমরা যারা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করে আমার সঙ্গী হতে চাও তারা আমার ডানদিকে এসে দাঁড়াও। যারা আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করতে না চাও তারা সকলে বাঁ দিকে যাও।

ইহুদিরা সকলেই মুসার ডান দিকে এসে দাঁড়াল। মুসা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, তোমরা যে অন্যায় করেছ তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।

মুসা বললেন, প্রত্যেক পরিবারের একজন তরবারি নিয়ে এগিয়ে এস।

সকলে তরবারি নিয়ে আসতেই মুসা বললেন, এই তরবারী দিয়ে তোমাদের যে কোন একজন ভাই, বন্ধু কিম্বা প্রিয়জনকে হত্যা কর। এ আমার নির্দেশ নয়, আল্লাহর আদেশ।

সকলেই নতমস্তকে সেই আদেশ মেনে নিল। মুসা আর ইহুদিদের সাথে একত্রে বাস করতেন না। তিনি আলাদা তাবুতে থাকতেন। দিনরাত আল্লাহর ধ্যানেই মগ্ন হয়ে থাকতেন। মাঝে শুধু আল্লাহর নির্দেশগুলো প্রচার করতেন। দশটি অনুশাসন ছাড়াও এগুলো ছিল স্বতন্ত্র নির্দেশ।

এক-–বিদেশীদের স্বজাতির মানুষদের মতই ভালবাসবে।

দুই-–কেনাবেচার সময় ব্যবসায়ীরা যেন ওজনের কারচুপি না করে সঠিক দাম নেয়।

তিন–অন্যের স্ত্রীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক করা চলবে না।

চার–মূর্তিপূজা, জাদুবিদ্যা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।

আল্লাহর নির্দেশে সকলে প্যালেস্তাইনের যাত্রার জন্যে প্রস্তুত হল। তিন দিন চলবার পর তারা এসে পড়ল ক্যানান নগরের প্রান্তে। এখানেই শিবির স্থাপন করা হল।

মুসা ইহুদিদের মধ্যে থেকে বারো জন অভিজ্ঞ মানুষকে পাঠালেন প্যালেস্তাইনে। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তর পরিদর্শন করে এসে জানাল প্যালেস্তাইনের দক্ষিণ দিকটাই সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চল।

মুসা বললেন, আমরা প্যালেস্তাইনের দক্ষিণেই বসতি স্থাপন করব, তোমরা সকলে এগিয়ে চল ৷

প্যালেস্তাইনের সীমান্ত প্রদেশে তখন বাস করত আমালেকিত ও কানানিত নামে দুটি উপজাতি। এই দুই উপজাতি বহুদিন ধরেই প্যালেস্তাইনে বাস করছিল। দুই উপজাতির মানুষেরা এক সঙ্গে ইহুদিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আচমক এই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না ইহুদিরা। তারা আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে গেল হর্মা নামে এক নির্জন প্রান্তরে।

মুসা বুঝতে পারলেন প্যালেস্তাইনে প্রবেশ করতে গেলে অন্য পথ দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। তারা এসে পড়লেন ক্যানানিত রাজ্যের প্রান্তে। অপরিচিত ইহুদিদের দেখেই ক্যানানিতে রাজা তাদের আক্রমণ করলেন। এইবার আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল ইহুদিরা। মুসার বুদ্ধি-কৌশলে তারা পরাজিত হল।

অবশেষে তারা এসে পড়লেন জর্ডান নদীর তীরে। নদীর ওপারে মোয়ারের রাজ্য। সেই রাজ্য পার হলেই প্যালেস্তাইন। জর্ডানের তীরে এক উঁচু পাহাড়ের উপর উঠলেই দেখা যায় প্যালেস্তাইনের সবুজ প্রান্তর।

এদিকে মুসাও উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছিলেন প্যালেস্তাইনের মাটিতে পা দেবার জন্য। এমন সময় আল্লাহর দৈববাণী শুনতে পেলেন। হে আমার প্রিয় ভক্ত, তোমার পৃথিবী ছাড়বার সময় হয়েছে, তুমি প্রস্তুত হও।

পরদিনই সমস্ত ইহুদিদের ডেকে আল্লাহ আদেশের কথা বললেন। সকলের সামনে সমস্ত দায়িত্বভার ত্যাগ করে জোশুয়ার উপর অর্পণ করলেন।

সকলকে উপদেশ দিয়ে তিনি প্রার্থনায় বসলেন। বুঝতে পারলেন তাঁর সময় শেষ হয়েছে। দীর্ঘ ১২০ বছর ধরে পৃথিবীর কত কিছুই তো প্রত্যক্ষ করলেন। গত চল্লিশ বছর মেষপালক যেমন তার মেষের চালকে চালিয়ে নিয়ে বেড়ায়, তিনি তেমনি সমগ্র ইহুদি জাতিকে মিশর থেকে নিয়ে এসেছেন প্যালেস্তাইনের প্রান্তরে। জীবনে কোনদিন সুখভোগ করেননি। বিলাসিতা করেননি। ধর্মের পথে সৎ সরল জীবন যাপন করেছেন। প্রতিমুহূর্তে নিপীড়িত ইহুদি জাতির প্রতি নিজের অন্তরের অকুণ্ঠ ভালবাসা প্রকাশ করেছেন। তাদের নানান বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। এতদিনের তাঁর সব কাজ শেষ হল।

 ৩০. লেনিন (১৮৭০-১৯২৪)

পুরো নাম ভাদিমির ইলিচ উলিয়ানফ। যদিও তিনি বিশ্বের সমস্ত মানুষের কাছে পরিচিত ভিন্ন নামে। রুশ বিপ্লবের প্রাণ পুরুষ ভি, গাই লেনিন। জারের পুলিশকে ফাঁকি দেবার জন্য তিনি ছদ্মনাম নেন লেনিন। লেনিনের জন্য রাশিয়ার এক শিক্ষিত পরিবারে ১৮৭০ সালের ২২শে এপ্রিল (রাশিয়ার পুরনো ক্যালেন্ডার অনুসারে ১০ই এপ্রিল)। লেনিনের পিতা-মাতা থাকতেন ভল্গা নদীর তীরে সিমবিস্ক শহরে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে লেনিন ছিলেন তৃতীয়। লেনিনের বাবা ইলিয়া অস্ত্রাকান ছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।

ছটি সন্তানের উপরেই ছিল বাবা-মায়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব। তবে লেনিনের জীবনে যার প্রভাব পড়েছিল বাবা-মায়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব। তবে লেনিনের জীবনে যার প্রভাব পড়েছিল সবচেয়ে বেশি তিনি লেনিনের বড় ভাই আলেকজান্ডার। আলেকজান্ডার ছিলেন সেন্ট পিটার্সবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি “নারোদনায় ভোলিয়ার” নামে এক বিপ্লবী সংগঠনের সভ্য হিসাবে গোপনে রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

“নারোদনায়া ভোলিয়া” বিপ্লবী দলের সদস্যরা স্থির করলেন যার তৃতীয় আলেকজান্ডারকেও হত্যা করা হবে। লেনিনের ভাই আলেকডান্ডারও এই পরিকল্পনার সাথে যুক্ত হলেন। এই সময় (১৮৮৬ সাল) লেনিনের বাবা হঠাৎ মারা গেলেন। যখন পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে তখন জারের গুপ্তচর বিভাগের লোকজন সব কিছু জানতে পেরে গেল। অন্য সকলের সাথে আলেকজান্ডারও ধরা পড়লেন। বিচারে অন্য চারজনের সাথে তার ফাঁসি হল।

বড় ভাইয়ের মৃত্যু লেনিনের জীবনে একটি বড় আঘাত হয়ে এসেছিল। এই সময়ে লেনিনের বয়স মাত্র সতেরো। তিনি স্থির করলেন তিনি বিপ্লবী আন্দোলনে যুক্ত হবেন।

ছেলেবেলা থেকেই পড়াশুনায় ছিল তার গভীর আগ্রহ আর মেধা। প্রতিটি পরীক্ষায় ভাল ফল করে ভর্তি হলেন কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। সেই সময় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল একটি বিপ্লবী কেন্দ্র।

১৮৮৭ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর ছাত্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ছাত্রদের এক বিরাট সভা হল। সেই সভার নেতৃত্বের ভার ছিল লেনিনের উপর। এই কাজের জন্য তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হল। শুধু তাই নয়, পাছে তিনি নতুন কোন আন্দোলন শুরু করেন সেই জন্য ৭ই ডিসেম্বর তাকে কাজানের গভর্নরের নির্দেশে কোফুশনিকো নামে এক গ্রামে নির্বাসন দেওয়া হল।

এক বছরের নির্বাসন শেষ হল। লেনিন ফিরে এলেন কাজান শহরে। তার ইচ্ছা ছিল আবার পড়াশুনা শুরু করবেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির অনুমতি দেওয়া হল না।

কাজানে ছিল একটি বিপ্লবী পাঠক্রম। তার সকল সদস্যরাই মার্কসবাদের চর্চা করত, পড়াশুনা করত, লেনিন এই পাঠচক্রের সদস্য হলেন। এখানেই তিনি প্রথম মার্কসীয় দর্শনের সাথে গভীরভাবে পরিচিত হলেন।

এদিকে তার পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশই খারাপ হয়ে আসছিল। বাধ্য হয়ে উলিয়ানফ পরিবারের সদস্যরা এলেন সামারার মফঃস্বল অঞ্চলে। সামারায় এসে লেনিন স্থির করলেন তিনি আইনের পরীক্ষা দেবেন। পড়াশুনা বছরের পাঠক্রম মাত্র দেড় বছরে শেষ করে তিনি সেন্ট পিটার্সবুর্গে পরীক্ষা দিতে গেলেন। এ পরীক্ষার ফল বার হওয়ার পর দেখা গের লেনিন প্রথম স্থান অধিকার করেছেন।

১৮৯২ সাল নাগাদ তিনি সামারা কোর্টে আইনজীবী হিসাবে যোগ দিলেন।

কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলেন সামারা কাজান তার কাজের উপযুক্ত জায়গা নয়। আইনের ব্যবসাতেও মনোযোগী হতে পারছিলেন না। সামারা ছেড়ে এলেন সেন্ট পিটার্সবুর্গে।

লেনিন লিখলেন তার প্রথম প্রবন্ধ “জনসাধারণের বন্ধুরা কিরকম এবং কিভাবে তারা সোসাল ডেমক্রেটদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এই প্রবন্ধ তিনি প্রথম বললেন, কৃষক শ্রমিক মৈত্রীর কথা। একমাত্র এই মৈত্রী পারে স্বৈরতন্ত্র, জমিদার ও বুর্জোয়াদের ক্ষমতার উচ্ছেদ, শ্রমিকদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা এবং নতুন কমিউনিস্ট সমাজ গঠন করতে।

এই সব লেখালেখি প্রচারের সাথে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করবার প্রয়োজন অনুভব করছিলেন। ১৮৯৬ সালে তিনি সেন্ট পিটার্সবুর্গের মার্কসবাদী চক্রগুলোকে নিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির জন্য সংগ্রামের সঙ্” নামে একটিমাত্র রাজনৈতিক সংগঠনে ঐক্যবদ্ধ করেন। পরবর্তীকালে যে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছিল, এই সঙ্ তারই ক্ৰণাবস্থা।

এই কাজের মধ্যেই লেনিনের সাথে পরিচয় হল নাদেজুদা ক্রপস্কাইয়ার সাথে। নাদেজুদা ছিলেন একটি নৈশ বিদ্যালয় শিক্ষিকা। এখানে প্রচার করতে আসতেন লেনিন। সেই সূত্রে দুজনের মধ্যে আলাপ হল। দুজনে দুজনের মতাদর্শ, আদর্শের সাথে পরিচিত হলেন। অল্পদিনের মধ্যেই দুজনের মধ্যে গড়ে উঠল মধুর সম্পর্ক। নাদেজুদাও লেনিনের সাথে সংঘ পরিচালনার কাজে যুক্ত হলেন।

তার কাজকর্ম ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এই সময় থোর্নটোন কারখানায় শ্রমিকরা ধর্মঘট করল। এই ধর্মঘটের নেতৃত্বের ভার ছিল “সংগ্রাম সরে “ উপর। এই ধর্মঘটের সাফল্যের প্রতিক্রিয়া অন্য অঞ্চলের শ্রমিকদের উপর গিয়ে পড়ল।

জারের পুলিশবাহিনী তৎপর হয়ে উঠল। লেনিনের সাথে সংগঠনের প্রায় সমস্ত নেতাকে গ্রেফতার করা হল। নিষিদ্ধ করা হল শ্রমিক শ্রেণীর সজ্ঞা।

লেনিনকে সেন্ট পিটার্সবুর্গের জেলখানার এক নির্জন কক্ষে বন্দী করে রেখে দেওয়া হল। জেলে বসে তিনি অনেকগুলো প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন।

চোদ্দ মাস বন্দী থাকবার পর তিন বছরের জন্য লেনিনকে নির্বাসন দেওয়া হল সাইবেরিয়ায়।

এক বছর পর নির্বাসিত হয়ে এলেন লেনিনের প্রিয়তমা ক্রপস্কাইয়া। প্রথমে তাকে অন্য জায়গায় নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল কিন্তু লেনিনের বাগদত্তা বলে তাকে শুশেনস্কোয়েতে থাকবার অনুমতি দেওয়া হল। দু মাস পর তাদের বিয়ে হল। ১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন তার প্রকৃত বন্ধু, সঙ্গী এবং বিশ্বস্ত সহকারী।

আন্তরিক প্রচেষ্টায় বেশ কিছু বই আনিয়ে নিলেন লেনিন। তার মধ্যে ছিল মার্কস এঙ্গেলসের রচনাবলী। এখানেই তিনি তাদের রচনা জার্মান থেকে রুশ ভাষায় অনুবাদ শুরু করলেন। এছাড়া একের পর এক গ্রন্থ রচনা করতে আরম্ভ করলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল “রাশিয়ায় সোসাল ডেমোক্রোটদের কর্তব্য। এছাড়া “রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ”-এই দুটি বইয়ের মধ্যে লেনিনের চিন্তা-মনীষা, ভবিষ্যৎ জীবনের পরিকল্পনার স্পষ্ট ছবি ফুটে উঠেছে। দ্বিতীয় বইটি রচনার সময় তিনি প্রথম ছদ্মনাম ব্যবহার করলেন লেনিন।

চিন্তা-ভাবনা পরিশ্রমের ফলে নির্বাসন শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কিন্তু ক্রুপস্কাইয়ার সেবাযত্নে সুস্থ হয়ে উঠলেন। অবশেষে নির্বাসন দণ্ডের মেয়াদ শেষ হলে ১৯০০ সালের ২৯ জানুয়ারি রওনা হলেন।

লেনিন ফিরে এলেন। তাকে সেন্ট পিটার্সবুর্গে থাকবার অনুমতি দেওয়া হল না। এমনকি কোন শিল্পনগরীতে বসবাস নিষিদ্ধ করা হল। বাধ্য হয়ে সেন্ট পিটার্সবুর্গের কাছেই পসকফ বলে এক শহরে বাসা করলেন। এতে রাজধানীর নাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হবে।

ঘুরে ঘুরে অল্পদিনের মধ্যেই নিজের কর্মক্ষেত্রকে প্রসারিত করে ফেললেন। তার এই গোপন কাজকর্মের কথা জারের পুলিশবাহিনী কাছে গোপন ছিল না। একটি রিপোর্ট তার বিরুদ্ধে লেখা হল, “বিপ্লবীদের দলে উলিয়ানফের উপরে কেউ নেই। মহামান্য জারকে রক্ষা করতে গেলে তাকে সরিয়ে ফেলতে হবে।” লেনিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হল।

সম্পূর্ণ ছদ্মবেশে কখনো পায়ে হেঁটে কখনো ঘোড়ার গাড়িতে চেপে সীমান্ত পার হয়ে এলেন জার্মানি।

জার্মানিতে এসে প্রথমেই স্থির করলেন একটি পত্রিকা প্রকাশ করবেন। ১৯০০ সালের ডিসেম্বর মাসে জার্মানির লিপজিগ শহর থেকে প্রকাশিত হল নতুন পত্রিকা ইসক্রা। যার অর্থ স্ফুলিঙ্গ। সেইদিন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি এই স্ফুলিঙ্গই একদিন দাবানলে মত জ্বলে উঠবে।

সম্পূর্ণ গোপনে এই পত্রিকা পাঠিয়ে দেওয়া হল রাশিয়ায়। সেখান থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হল দিকে দিকে। অল্পদিনের মধ্যেই ইসক্রা হয়ে উঠল বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান মুখপত্র। আর জার্মানিতে থাকা সম্ভব হল না। গোয়েন্দা পুলিশের লোকজন এই সব বিপ্লবী কাজকর্ম বন্ধ করবার জন্য সচেষ্ট হয়ে উঠল। বিপদ আসন্ন বুঝতে পেরে লেনিন ও তার সঙ্গীরা জার্মানি ছেড়ে পালিয়ে এলেন ইংল্যান্ডে।

কিছুদিন পর সংবাদ পেলেন তার মা আর বোন ফ্রান্সের একটি ছোট শহরে এসে রয়েছেন। মায়ের সাথে সাক্ষাতের জন্য প্যারিসে গেলেন।

প্যারিস ত্যাগ করে আবার লন্ডনে ফিরে এলেন। কিন্তু এখান থেকে পত্রিকা প্রকাশ করার কাজ অসুবিধাজনক বিবেচনা করেই সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় চলে এলেন। তার সঙ্গে ছিলেন ক্রুপস্কাইয়া। একটি ছোট বাড়ি ভাড়া করলেন দুজনে। অল্পদিনের মধ্যে এই বাড়িটি হয়ে উঠল বিপ্লবীদের প্রধান কর্মক্ষেত্র। ১৯০৩ সালে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস শহরে পার্টির অধিবেশন বসল। পুলিশের ভয়ে একটি ময়দান গুদামে সকলে জমায়েত হল। এখানেই জন্ম নিল বলশেভিক পার্টি।

পার্টি কগ্রসগুলোর প্রস্তুতি ও অধিবেশনে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছেন। ১৯০৫ সালের তৃতীয়, ১৯০৬ সালের চতুর্থ, ১৯০৭ সালের পঞ্চম কংগ্রেসে তিনিই প্রধান রিপোর্টগুলো পেশ করেন। কংগ্রেসে বলশেভিক (সংখ্যাগরিষ্ঠ) আর মেনশেভিকদের মধ্যে যে লড়াই চলে তার কথা তিনি শ্রমিক সাধারণের সামনে তুলে ধরেন।

একটু একটু করে যখন গড়ে উঠছে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী দল, ঠিক সেই সময় ১৯০৫ সালে রাশিয়ার বুকে ঘটল এক রক্তাক্ত অধ্যায়। সেন্ট পিটার্সবুর্গে ছিল জারের শীতের প্রাসাদ। বন্ধ কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক তাদের ছেলে মেয়ে বৌ নিয়ে সেখান এসে ধর্না দিল। জারের প্রহরীরা নির্মমভাবে তাদের উপর গুলি চালাল। দিনটা ছিল ১৯০৫ সালের ৯ই জানুয়ারি। এক হাজারেরও বেশি মানুষ মারা পড়ল। রক্তের নদী বয়ে গেল সমস্ত প্রান্তর জুড়ে। এই পৈশাচিক ঘটনায় বিক্ষোভ আর ক্রোধে ফেটে পড়ল সমস্ত দেশ। গণ আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল দেশের প্রান্তে প্রান্তে।

বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা সরাসরি পুলিশের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। দেশ জুড়ে ধর্মঘট শুরু হয়। এই পরিস্থিতিতে আর দেশের বাইরে থাকা সম্ভব নয়, বিবেচনা করেই দীর্ঘ দিন পর রাশিয়ায় ফিরে এলেন লেনিন।

৫ই ডিসেম্বর মস্কো শহরে সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করা হল। দুদিন পর এই ধর্মঘট প্রত্যক্ষ বিদ্রোহের রূপ নিল। রাস্তায় রাস্তায় গড়ে উঠল ব্যারিকেড। রেললাইন তুলে ফেলা হল। শ্রমিকরা যে যা অস্ত্র পেল তাই নিয়ে লড়াই শুরু করল। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না, জারের সৈনিকরা নির্মমভাবে এই বিদ্রোহ দমন করল। শত শত মানুষকে হত্যা করা হল। হাজার হাজার মানুষকে বন্দী করে নির্বাসন দেওয়া হল। চরম অত্যাচারের মধ্যে জার চাইলেন বিপ্লবের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে। কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে জ্বলে ওঠা আগুনকে কি নেবানো যায়।

১৯০৭ সাল নাগাদ ফিনল্যান্ডের এক গ্রামের গিয়ে আশ্রয় নিলেন লেনিন। এখানে থাকতেন চাষীর ছদ্মবেশে। নেতারা নিয়মিত তার সাথে যোগাযোগ করতেন। এই সংবাদ জারের গুপ্তচরদের কানে গিয়ে পৌঁছাল, জারের তরফ থেকে ফিনল্যান্ডের সরকারের কাছে অনুরোধ করা হল লেনিনকে বন্দী করে তাদের হাতে তুলে দেবার জন্য। গোপনে এই সংবাদ পেয়ে দেশ ছাড়লেন লেনিন।

ফিনল্যান্ড পার হয়ে এলেন স্টকহোমে। সেখানে তারই প্রতীক্ষায় ছিলেন ক্রুপস্কাইয়া। দুজনে এলেন জেনিভায়। দেশের বাইরে গেলেও দেশের সঙ্গে যোগাযোগ এক মুহূর্তের জন্য বিচ্ছিন্ন হল না। একদিকে যেমন দেশের সমস্ত সংবাদ তিনি সংগ্রহ করতেন, অন্যদিকে তার বিশ্বাসী অনুগামীদের মাধ্যমে বলশেভিক পার্টিকর্মীদের কাছে নির্দেশ উপদেশ দিতেন।

বলশেভিক পার্টির মুখপাত্র প্রলেতারি প্রত্রিকা হত জেনিভা থেকে। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে এই পত্রিকার অফিস সরিয়ে নিয়ে আসা হল প্যারিসে। এখানে আরো অনেক পলাতক রুশ বিপ্লবী আশ্রয় নিয়েছিল। সেই সময় প্যারিস ছিল বিপ্লবীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। রাশিয়া থেকে বিপ্লবী সংগঠনের নেতারা এসে তার সাথে দেখা করত।

এদিকে রাশিয়ায় আন্দোলন ক্রমশই জোরদার হয়ে উঠতে থাকে। বলশেভিক পার্টির তরফে যে সমস্ত পত্রিকা বার হত তার চাহিদা ক্রমশই বেড়ে চলছিল। পার্টির সদস্যদের কাছ থেকে আবেদন আসতে থাকে, সাপ্তাহিক পত্রিকা নয়, চাই দৈনিক পত্রিকা।

লেনিন নিজেও একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করবার কথা ভাবছিলেন। ১৯১২ সালে প্রকাশিত হল শ্রমিক শ্রেণীর দৈনিক পত্রিকা প্রাভদা। এর অর্থ সত্য। লেনিন ও স্তালিন যুগ্মভাবে এর সম্পাদক হলেন। এই পত্রিকা রুশ বিপ্লবের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। এই পত্রিকায় লেনিন অসংখ্য রচনা প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন ছদ্মনামে।

এরই মধ্যে দেখা দিল বিশ্বযুদ্ধ। হিংস্র উন্মাদনায় মেতে উঠল বিভিন্ন দেশ। লেনিন উপলব্ধি করেছিলেন এই যুদ্ধের সুদূর প্রসারী ফলাফল। জারের লোহার শেকল আলগা হতে আরম্ভ করেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে।

১৯১৭ সালের ১৬ই এপ্রিল দীর্ঘ দশ বছর পর দেশে ফিরলেন। তিনি এসে উঠলেন তার বোন আনার বাড়িতে।

লেনিনকে ধরবার জন্য পুলিশ হানা দিল আনার বাড়িতে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আগের দিন সেই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছেন লেনিন। পুলিশ সমস্ত বাড়ি তছনছ করে ফেলল।

বিপদের গুরুত্ব বুঝে লেনিন পিটার্সবুর্গ ছেড়ে এক চাষীর ছদ্মবেশে পালিয়ে এলেন সীমান্তের কাছে রাজলিতে বলে এক ছোট শহরে।

কিন্তু এখানেও বিশ্রাম নেবার সময় নেই। কুঁড়েঘরে বসেই রচনা করলেন তার কয়েকটি বিখ্যাত রচনা। এখানে থেকেই তিনি লিখলেন দুটি চিঠি “বলশেভিকদের ক্ষমতা দখল করতে হবে-” এবং “মাসৰ্কবাদ ও সশস্ত্র অভ্যুত্থান”।

এর পরেই তিনি চলে এলেন পিটার্সবুর্গের এক গোপন আস্তানায়। এখান থেকেই তিনি ১৯১৭ সালের লা অক্টোবর ঘোষণা করলেন “সশস্ত্র বিপ্লব ছাড়া ক্ষমতা দখল করা সম্ভব নয়। অবিলম্বে শুরু হোক এই বিপ্লব।

ছোট ছোট সভায় লেনিনের এই নির্দেশ প্রচার করা হল। নেতৃস্থানীয় সকলেই একে একে উপস্থিত হতে আরম্ভ করল। ২৪শে অক্টোবর লেনিন এলেন সেন্ট পিটার্সবুর্গ শহরের স্মেলনি ভবনে–এই ভবন হল বিপ্লবের সদর দপ্তর। চারদিকে দেওয়া হল প্রয়োজনীয় নির্দেশ। একে অন্যের সাথে যাতে ঠিকমত যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে তার ব্যবস্থা করা হল। রেড গার্ডের সৈনিকরা প্রস্তুত হল। সামরিক বাহিনীর বহু ইউনিট এসে যোগ দিল তাদের সাথে।

চূড়ান্ত সময়ে ঘোষণা করা হল শত্রুপক্ষের উপর আঘাত হানল। মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ল বিপ্লবী শ্রমিক আর রেড গার্ডেন সৈন্যরা। ২৫শে অক্টোবর (নতুন পঞ্জিকা অনুসারে ৭ই নভেম্বর) রাত শেষ হবার আগেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব জায়গা দখল করে নিল বিপ্লবী বাহিনী। সরকারী বাহিনী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু স্রোতের মুখে খড়কুটোর মত ভেসে গেল তারা। জারের অস্থায়ী সরকারের সদস্যরা গিয়ে আশ্রয় নিল তার শীতের প্রাসাদে।

প্রাসাদের অদূরেই সমুদ্রে দাঁড়িয়েছিল যুদ্ধ জাহাজ আরোরা। আরোরা থেকে কামান গর্জে করল নিজেদের অধিকার।

তারপর ঘোষণা করা হল কৃষিজমি সংক্রান্ত ঐতিহাসিক সনদ। এতদিন দেশের সমস্ত জমির মালিক ছিল জামিদার আর ভূস্বামীরা। তাই দেশের সমস্ত জমি কেড়ে নিয়ে কৃষকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

কিন্তু বাধা এল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জমিদার, ভূস্বামী, রাজতন্ত্রের সমর্থকদের কাছ থেকে। এছাড়াও দেশের মধ্যে ছিল অসংখ্য প্রতিবিপ্লবী দল। দীর্ঘ চার বছর ধরে তাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম চালাতে হয়েছে লেনিনকে। অবশেষে গড়ে উঠেছে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা।

অতিরিক্ত পরিশ্রমে স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে লেনিনের ডান হাত-পা অসাড় হয়ে আসে। চিকিৎসায় ধীরে ধীরে সুস্থ হতেই আবার কাজ শুরু করলেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অবশেষে ২১শে জানুয়ারি ১৯২৪ সালে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন সর্বহারার নেতা লেনিন।

তাই পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে যেখানেই শোষিত বঞ্চিত মানুষের সংগ্রাম, সেখানেই উচ্চারিত হয় একটি নাম-মহামতি লেনিন।

৩১. মাও সে তুং (১৮৯৩-১৯৭৬)

১৮৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর চীনের হুনান প্রদেশের এক গ্রামে মাও জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে অবস্থাপন্ন। চাষবাসই ছিল তার প্রধান পেশা। শৈশবে গ্রামের স্কুলেই পড়াশুনা করতেন। পড়াশুনার প্রতি তার ছিল গভীর আগ্রহ। পাঠ্যসূচির বাইরে যখন যে বই পেতেন তাই পড়তেন। তাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করত চীনের ইতিহাস, বীর গাথা। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে মাও ছিলেন সবচেয়ে বড়।

পরে তার দুই ভাই কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়ে নিহত হয়। গ্রামের স্কুলের পাঠ শেষ করে কিছুদিন গ্রামেই পড়াশুনা করলেন। প্রায় জোর করেই বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে হুনানের প্রাদেশিক শহরে এলেন। ভর্তি হলেন এখানকার হাই স্কুলে। এই সময় নিয়মিত স্থানীয় লাইব্রেরীতে গিয়ে পড়াশুনা করতেন। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি লাইব্রেরীর অর্ধেকের বেশি বই পড়ে শেষ করে ফেলেছিলেন।

১৯১৮ সালে ২৫ বছর বয়সে তিনি এলেন পিকিং শহরে। এই প্রথম তিনি প্রদেশ ছেড়ে বার হলেন। জীবনের এই পর্যায়ে দুবেলা দুমুঠো খাবার সংগ্রহের জন্য তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হত।

এক বছর পর মাও ফিরে এলেন তার গ্রামে। স্থানীয় একটা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতার কাজ পেলেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি সমতাদর্শী কয়েকজন তরুণকে সাথে নিয়ে একটি পত্রিকা প্রকাশ করলেন।

১৯২১ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠল। এর ৫০ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মধ্যে মাও-ও ছিলেন।

ইতিপূর্বে মাও বেশ কিছু রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময় চীনে সান ইয়াৎ সেনের নেতৃত্বের কুয়োমিংতাং দল অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। চীনা কমিউনিস্ট দল (CCP) এবং কুয়োমিংতাং (K.M.T) এর মধ্যে সংযুক্ত ঐক্য গড়ে উঠল।

রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির তরফে এই ঐক্যকে সমর্থন জানানো হল। চিয়াং কাইশেক গেলেন মস্কোতে। সেখানে তাকে সান ইয়াৎ সেনের উত্তরাধিকারী হিসাবে মনোনীত করা হল।

ইতিমধ্যে মাও বিবাহ করেছেন তার এক শিক্ষকের কন্যাকে-ইয়াং কাই হুই। হুই পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অবস্থাতেই কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। সেই সূত্রেই দুজনে নিকট সান্নিধ্যে আসেন। ১৯৩০ সালে আন্দোলনের কাজে জড়িত থাকার সময়েই নিহত হন হুই।

CCP এবং KMT দুই রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হলেও অল্পদিনের মধ্যেই তাদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত প্রভেদ প্রকট হয়ে উঠল। মাও-এর উপর ভার ছিল এই দুটি দলের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা।

চীন ছিল মূলত কৃষিভিত্তিক দেশ। দেশের শতকরা আশি জন মানুষই ছিল কৃষিনির্ভর। তৈরি হল জাতীয় কৃষক আন্দোলন সংগঠন। এই সংগঠনের পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হল মাও-এর উপর।

অল্পদিনের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি এবং মাও-এর সামনে এক সংকট দেখা দিল।

মাও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছিলেন গতানুগতিক পথে নয়, কৃষকদের মধ্যে থেকেই বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। ১৯২৭ সালে তিনি হুনানের কৃষক আন্দোলনের উপর এক বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করে পার্টি নেতৃত্বের কাছে আবেদন জানালেন, অবিলম্বে দেশ জুড়ে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা হোক। দলের অধিকাংশেরই এ ব্যাপারে সম্মতি ছিল না। তারা কৌতুক করে বলত ‘গেঁয়োদের আন্দোলন। মাওয়ের প্রস্তাব সমর্থিত হল না। তা সত্ত্বেও দলের মধ্যে বেশ কিছু সদস্য এর সমর্থনে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে এল।

কৃষক আন্দোলনের প্রতি এই প্রকাশ্য সমর্থনে কুয়োমিংতাং এর সাথে বিরোধ প্রকট হয়ে উঠল। সাথে সাথে কুয়োমিংতাং এর সভাপতি চিয়াং কাইশেক-এর কমিউনিস্ট বিরোধী মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল। দেশ জুড়ে শুরু হল কমিউনিস্টদের প্রতি সক্রিয় বিরোধিতা। নিষিদ্ধ করা হল কৃষক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে। দলের অধিকাংশ নেতাকে বন্দী করা হল। সাধারণ কর্মচারীদের উপর শুরু হল অত্যাচার।

মাও সে তুং আত্মগোপন করে পালিয়ে এলেন হুনানে। নতুন করে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে হাত দিলেন। সেই সময় ফসল কাটার কাট শুরু হয়েছে। মাও ক্ষেতমজুরদের নিয়ে শুরু করলেন ‘শরঙ্কালীন শস্য আন্দোলন’। কিন্তু আন্দোলনের বিস্তার ঘটার আগেই চিয়াং কাইশেকের অনুগামীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল আন্দোলনকারীর উপর। নির্মম হাতে ভেঙে দেওয়া হল আন্দোলন। ধরা পড়লেন মাও। তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হল। কয়েকজন বন্ধুর সহায়তায় বন্দীদশা থেকে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচালেন মাও।

কিন্তু তার এই আন্দোলনকে সমর্থন জানাল না কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি। মাওকে দলের পলিটব্যুরো এবং দলের সাধারণ সমিতি থেকে পদচ্যুত করা হল।

মাও দলের মধ্যে এতখানি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিদান্তে সামান্যতম বিচলিত হলেন না। তিনি তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে উৎখাত করা সম্ভব হবে না। উত্তর ও মধ্য চীনে গড়ে তোলা হল ছোট ছোট বিপ্লবী সংগঠন। হুনানের সীমান্ত প্রদেশে মাও সংগঠিত করলেন প্রায় এক হাজার কৃষককে। রাত কাটাতে হয় পাহাড়ে-জঙ্গলে। সেখানেই চলে মহড়া।

বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এক দল সৈন্য পাঠানো হল। মাও জানতেন মুখোমুখি যুদ্ধে জয়লাভ অসম্ভব। শুরু হল পাহাড়-জঙ্গল থেকে অতর্কিতে আক্রমণ। কয়েকদিনের মধ্যেই পরাজিত হল সমস্ত সেনাবাহিনী। তাদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হল।

প্রবল শীত আর অনাহারে কৃষক বাহিনীর অনেকেই মারা পড়েছে কিন্তু অদম্যমনোবল, সাহস আর উদ্যমে অবশিষ্টদের নিয়ে গড়ে তুললেন তার লাল ফৌজ। এই লাল ফৌজের সহায়তায় ছোট ছোট অঞ্চল দখল করে সেখানে স্বাধীন সরকার গড়ে তুললেন।

১৯২৮ সাল নাগাদ তার সাহায্যে কৃষক নেতা চু তে বিরাট বাহিনী নিয়ে এগিয়ে এলেন। চু মাও-এর নীতিতে বিশ্বাস করতেন।

এই সময় কমিউনিস্ট পার্টির অধিকাংশ সদস্যই আত্মগোপন করেছিল। প্রকৃতপক্ষে তাদের কার্যদারা এতখানি সীমিত হয়ে পড়েছিল, মাও হয়ে উঠলেন কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম পুরোধা।

মস্কোতে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির আন্তজার্তিক সম্মেলনে স্টালিন মাও-এর বিপ্লবী প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানালেন। তাকে আবার দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর সদস্য হিসাবে নির্বাচিত করা হল।

চিয়াং কাইশেক তার বাহিনীকে আদেশ দিলেন কমিউনিস্টদের সমূলে বিনাশ করতে। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে চারবার বিশাল বাহিনী পাঠনো হল বিদ্রোহীদের দমন করবার জন্য। এই বাহিনী ছিল সম্পূর্ণ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত তবুও তারা জয়লাভ করতে পারেনি। এ পাহাড় অরণ্য অধ্যুষিত অঞ্চল ছিল সৈন্যদের অগম্য কিন্তু তার চেয়েও বড় কারণ মাও-এর লাল ফৌজের অদম্য মনোবল এবং শৃঙ্খলাবোধ। লাল ফৌজের সাফল্যের পেছনে আরো একটি বড় কারণ ছিল স্থানীয় মানুষের সহায়তা।

চিয়াং অনুভব করতে পারছিলেন এর সুদূর প্রসারিত প্রতিক্রিয়া। তাই জার্মান সামরিক উপদেষ্টাদের পরামর্শ মত পঞ্চমবার প্রায় এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল অভিযানের প্রস্তুতি নিলেন।

সামরিক বাহিনী বীরদর্পে এগিয়ে চলল। এই সুসজ্জিত বাহিনীর প্রতিরোধ করা সম্ভবপর ছিল না মাও-এর লাল ফৌজের। তারা ক্রমশই পিছু হটতে আরম্ভ করল। একের পর এক মুক্ত অঞ্চল অধিকৃত হতে থাকে চিয়াং কাইশেকের বাহিনীর।

লাল ফৌজ পিছু হটতে হটতে এসে কিয়াংসাই পার্বত্য প্রদেশে। এই স্থান প্রশিক্ষণের উপযুক্ত বিবেচনা করে মাও উত্তর-পশ্চিমে বিখ্যাত চীনের প্রাচীরের কাছে এসে আশ্রয় নিলেন।

১৯৩৪ সালের অক্টোবরে লাল ফৌজের শুরু হল ঐতিহাসিক অভিযান। এই অভিযান সহজসাধ্য ছিল না। পথের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টেও লাল ফৌজের মনোবল এতটুকু ভেঙে পড়েনি। প্রত্যেকেই ছিল মা-এর বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ। অবশেষে অক্টোবর ১৯৩৫ সালে তারা এসে পৌঁছল উত্তরের সেনসি প্রদেশে। এখানেই শিবির স্থাপন করলেন মাও। ইতিমধ্যে আরো বহু তরুণ কৃষক শ্রমিক এসে যোগ দিয়েছে লাল ফৌজে। সেখানে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হল। বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে আবার গড়ে উঠল মুক্ত স্বাধীন শাসনব্যবস্থা।

এই সময় একজন আমেরিকান সাংবাদিক এডগার স্নো বহু কষ্টে চীনা কমিউনিস্ট ঘটিতে গিয়ে পৌঁছান। তার এই অভিজ্ঞতার কথা পরবর্তীকালে বিবরণ দিয়েছেন তার বিখ্যাত “চীনের আকাশে লাল তারা” (Red star over China) বইতে। মাও সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন “যেমন মজার তেমনি গম্ভীর দর্বোদ্য প্রকতির মানুষ। তার মধ্যে জ্ঞান আর কৌতুকের এক আশ্চর্য সমন্বয় ঘটেছে। নিজের অভ্যেস পোশাক-পরিচ্ছদ সম্বন্ধে যতখানি উদাসীন, নিজের দায়িত্ব কর্তব্য সম্বন্ধে ততখানিই সজাগ। কি অফুরন্ত প্রাণশক্তি, রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভাধর।

মাও একদিকে যখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে জনজাগরণ গড়ে তুলছিলেন, অন্যদিকে তখন চিয়াং কাইশেকের বাহিনী দেশের শত শত কমিউনিস্ট ও তরুণ ছাত্রকে হত্যা করতে আরম্ভ করল। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ও কৃষকের উপর চলতে থাকে নির্যাতন।

এই সময় উত্তরাঞ্চলে শুরু হল জাপানী আক্রমণ। জাপান সরকার বুঝতে পেরেছিল চীনের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার সমস্ত শক্তি নিয়োগ করেছে কমিউনিস্ট বিরোধী অভিযানে।

মাও অনুভব করতে পেরেছিলেন জাপানী আক্রমণের বিপদ। তাই কুয়োমিংতাং এর সাথে ইতিপূর্বে তিনি ঐক্যবদ্ধভাবে জাপানীদের প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলেন।

এই সময় সেনসি প্রদেশের কাছে আকস্মিকভাবে বন্দী হলেন চিয়াং কাইশেক ও তার সেনাদল। লাল ফৌজের তরফে জোরালো দাবি উঠল চিয়াং কাইশেককে হত্যা করা হোক। মাও তার গভীর দূরদৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন চিয়াং কাইশেককে হত্যা করে জাপানী আগ্রাসন রোধ করা সম্ভব নয়। তিনি তাকে মুক্তি দিলেন যাতে সম্মিলিতভাবে জাপানীদের আক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

ইতিমধ্যে পৃথিবী জুড়ে শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা। পরাজিত হল জাপানের সৈন্যবাহিনী। কিন্তু বিপ্লবের আগুন নিভল না। লাল ফৌজ তখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রান্তে প্রান্তে। চিয়াং কাইশেক উপলব্ধি করতে পারছিলেন মাও-এর নেতৃত্বে যে বিপ্লব শুরু হয়েছে তাকে ধ্বংস করবার মত তার ক্ষমতা নেই। তাই আমেরিকার সাহায্য প্রার্থী হলেন। কিন্তু আমেরিকান মদতপুষ্ট হয়েও নিজেকে রক্ষা করতে পারলেন না চিয়াং কাইশেক। লাল ফৌজের সৈন্যবাহিনী চারদিক থেকে পিকিং শহর ঘিরে ফেলল। আমেরিকান সেনাবাহিনীর সাহায্যে চিয়াং পালিয়ে গেলেন ফরমোসা দ্বীপে। ১লা অক্টোম্বর ১৯৪৯ সালে লাল ফৌজ পিকিং দখল করে নিল। নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হল। তার চেয়ারম্যান হিসাবে নির্বাচিত হলেন পঞ্চান্ন বছরের মাও সে তুং। সমাপ্ত হল তার দীর্ঘ সংগ্রাম।

কয়েক বছরের মধ্যেই দেখা গেল মানুষের মন থেকে বিপ্লবের উন্মাদনা ক্রমশই ফিকে হয়ে আসছে হ্রাস পাচ্ছে মাও-এর জনপ্রিয়তা।

দেশে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হল। নেতৃত্বের এক অংশ তার সাথে একমত না হলেও সরাসরি বিরুদ্ধাচারণ করতে সাহস পেল না। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের স্বেচ্ছাকৃত উদ্যমের উপর। মাও বিশ্বাস করতেন আর্থিক কারণে নয়, আদর্শগত উৎসাহেই মানুষ কাজ করবে। কিন্তু অচিরেই প্রমাণিত হল তার বাস্তবতাশূন্য তাত্ত্বিক মতাদর্শের ব্যর্থতা।

দেশ জুড়ে শুরু হল কমিউনিস্ট নেতৃত্বের প্রতি তীব্র সমালোচনা। বিতর্কের ঝড় বয়ে গেল চারদিকে। এর মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল ছাত্ররা।

মাও এর বিরুদ্ধে নতুন আন্দোলনের ডাক দিলেন। তার উদ্দেশ্যে ছিল সরকারী আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা করা-দ্বিতীয়ত জনগণের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা। সেই সাথে দেশবাসীকে মার্কসীয় আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে সাংস্কৃতিক অবক্ষয়কে রোধ করা।

এই আন্দোলনকেই বলা হয়েছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়। লাল ফৌজের মধ্যে যে সব ছাত্র ছিল তারাই এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। এছাড়াও ছিল শিক্ষক অধ্যাপক বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল মাওয়ের চতুর্থ পত্নী (প্রাক্তন অভিনেত্রী) চিয়াং চিং।

সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলেছিল ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত। এর পরবর্তীকালে • চীনের রাষ্ট্রনৈতিক ও সমাজ জীবনে বিরাট পরিবর্তন দেখা গেল। প্রকৃতপক্ষে এতদিন পর্যন্ত চীন নিজেকে বিশ্বের সমস্ত দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। এই বার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলল। ইউরোপে পাঠানো হল বাণিজ্য প্রতিনিধি দল। বিদেশীদের দেশে আসবার অনুমতি দেওয়া হল। যে রাষ্ট্রসঙ্ঘের অস্তিত্বকে চীন অস্বীকার করেছিল দীর্ঘদিন, ১৯৭১ সালে তার সদস্য পদ গ্রহণ করল।

অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বিশেষত কৃষিক্ষেত্রে চীন অভূতপূর্ব উন্নতি লাভ করে। সর্বক্ষেত্রেই ছিল মাও-এর অবদান। কয়েক শো বছরের শোষিত বঞ্চিত দরিদ্র অবক্ষয়ের অন্ধকারে ডুবে যাওয়া একটি জাতিকে তিনি দেখিয়েছিলেন আধুনিকতার আলো।

মাওয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় তিনি স্টালিনের মতই সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন। কমিউনিস্ট বিরোধীদের নির্মমভাবে ধ্বংস করেছিলেন। বিপ্লব উত্তরকালে দেশে যখন শান্তি শৃঙ্খলা সুস্থিরতার প্রয়োজন, মাও অনাবশ্যকভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। কোরিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণ, তিব্বত দখল, ফরমোসা সংক্রান্ত বিবাদ, ভারত আক্রমণ, রাশিয়ার সাথে বিবাদ। মাও ভেবেছিলেন বিপ্লবের সময় যেবাবে গণজাগরণ ঘটাতে সমর্থ হয়েছিলেন, উত্তরকালেও তা বর্তমান থাকবে। মাও বিশ্বাস করতেন এক অন্তহীন বৈপ্লবিক সংগ্রাম। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি প্রত্যেক বিপ্লবী উত্তরকালে হয়ে ওঠে সংশোধনবাদী নয়তো ক্ষমতালিন্দু।

তাই তার অজান্তেই দেশে গড়ে উঠেছিল তার বিরুদ্ধ শক্তি। যারা মাও-এর বার্ধক্যের সুযোগ নিয়ে প্রকৃত রাষ্ট্রক্ষমতা চালিত করত। তার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ সালে মাও মারা গেলেন। গ্যাং অব ফোর’ নামে চারজনের একটি দলকে বন্দী করা হল। এদের মধ্যে ছিলেন মাও-এর বিধবা পত্নী। প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল।

ব্যক্তি জীবনের দোষত্রুটি বাদ দিলে মাও ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি আজন্ম। বিপ্লবী। তিনি বিশ্বাস করতেন একমাত্র বিপ্লবের মধ্যে দিয়েই মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র পূর্ণতা লাভ করতে পারে। আর এর বিশ্বাসের শক্তিতেই তিনি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন পৃথিবীর বৃহত্তম জনসংখ্যাবহুল রাষ্ট্রের।

৩২. কনফুসিয়াস (খ্রি: পূর্ব ৫৫১ খ্রি: পূর্ব ৪৭৯)

আড়াই হাজার বছর আগেকার কথা। চীনদেশের লু রাজ্যে বাস করতেন ল শিয়াং নামে এক অবসরপ্রাপ্ত সেনাপতি। মনে শান্তি ছিল না লু শিয়াং-এর। কারণ তিনি নয়টি কন্যার পিতা হলেও একটিও পুত্র সন্তান নেই তার। একদিন গ্রামের পথ দিয়ে যেতে যেতে তাঁর ভীষণ তেষ্টা পেয়েছিল। পথের পাশেই ছিল এক গরীব চাষীর কুটির। সেখানে গিয়ে পানি চাইতেই একটি কিশোর মেয়ে এসে পানি দিল। মেয়েটির নাম চেং সাই। তাকে দেখে লু শিয়াং-এর মনে হল মেয়েটি সর্ব সুলক্ষণা। এর গর্ভে নিশ্চয়ই তার পুত্র সন্তান জন্মাবে। চাষীকে তার মনের কথা জানায়।

লু শিয়াং-এর ইচ্ছায় চাষী এবং তার কন্যা সম্মতি দিল। সেই রাত্রিতেই মিলিত হলেন তাঁরা। কিন্তু তাঁদের এই মিলনের কথা সকলের কাছে গোপন রেখে দিলেন লু শিয়াং।

অবশেষে চেং সাই একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য লু শিয়াং-এর। পুত্র সন্তান জন্মের সংবাদ অন্য স্ত্রীদের কানে যেতেই তারা লু শিয়াংকে পাগল বলে ঘরে আটকে রাখল। কয়েক মাস পরেই তার মত্য হল।

ওদিকে চেং সাই-এর কাছেই বড় হয়ে উঠতে লাগল নবজাত শিশুসন্তান। এই শিশুসন্তানই ভবিষ্যতে কনফুসিয়াস নামে সমস্ত জগতে পরিচিত হন।

লু শিয়াং তাঁর প্রতিশ্রুতি মত কোন অর্থই দিয়ে যেতে পারেননি চেং সাইকে। কিন্তু তার জন্যে নিজের দায়িত্বকে অস্বীকার করলেন না চেং সাই।

চরম অভাব অনটনের মধ্যেও চেং সাই স্বামীর প্রতি ছিলেন খুবই শ্রদ্ধাশীল। মনে মনে স্বামীর বংশমর্যাদা তার খ্যাতি বীরত্বের জন্য গর্ববোধ করতেন।

স্কুলে যাবার বয়েস হতেই চেং কনফুসিয়াসকে স্থানীয় একটি স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। অল্প কিছু দিনের মধ্যে শিক্ষক ছাত্র সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন কনফুসিয়াস। একদিকে যেমন তাঁর ছিল জ্ঞান অর্জনের প্রবল ইচ্ছা, অন্যদিকে অসাধারণ মেধা। শুধুমাত্র স্কুলের পাঠ্যপুস্তক পড়ে তার মন ভরত না। ধর্মের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আকর্ষণ।

মায়ের স্নেহে অভাব অনটনের মধ্যেই দিন কাটছিল কনফুসিয়াসের। কনফুসিয়াসের তখন ১৫ বছর বয়স। হঠাৎ তার মা মারা গেলেন। কনফুসিয়াসের জীবনে মাই ছিলেন সব। তার এই অকাল মৃত্যুতে কনফুসিয়াস বিরাট আঘাত পেলেন।

কিন্তু সেই কিশোর বয়েসেই নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন, এত বড় বিয়োগ বেদনাতেও ভেঙে পড়লেন না। আন্তরিক প্রচেষ্টায় নিজেকে সংযত রাখলেন।

তখনকার প্রচলিত নিয়ম ছিল স্ত্রীকে স্বামীর পাশেই কবর দেওয়া হবে। পিতার সমাধির পাশে মায়ের দেহ সমাহিত করলেন কনফুসিয়াস। নিজের গৃহে ফিরে এসে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হতেই পরিচিত জনেরা সকলে তাকে পরামর্শ দিল পিতার সম্পত্তির অধিকার দাবি করতে।

কিন্তু কনফুসিয়াসের আত্মমর্যাদাবোধ এতখানি প্রবল ছিল, তিনি বললেন, যে সম্পত্তি পিতা আমাকে দিয়ে যেতে পারেননি তাতে আমার কোন লোভ নেই।

পরবর্তীকালে কনফুসিয়াস বলতেন, আত্মমর্যাদা না থাকলে কোন মানুষই অন্যের কাছে মর্যাদা পেতে পারে না। যে মানুষের মধ্যে এই আত্মসম্মানবোধ আছে একমাত্র সেই হতে পারে প্রকৃত জ্ঞানী।

মায়ের মৃত্যুতে সাময়িক অসুবিধার মধ্যে পড়লেও নিজের বিদ্যাশিক্ষা অধ্যয়ন বন্ধ করলেন না কনফুসিয়াস। অল্প দিনের মধ্যেই তাঁর জ্ঞান, পাণ্ডিত্যের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

কনফুসিয়াস থাকতেন লু প্রদেশে। এই প্রদেশের অন্যতম প্রধান শাসক ছিলেন চি চি-র কানেও গিয়ে পৌঁছেছিল কনফুসিয়াসের পাণ্ডিত্যের খ্যাতি। প্রথম পরিচয়েই মুগ্ধ হলেন চি। কনফুসিয়াসের দারিদ্র্যের কথা শুনে তাঁকে হিসাব রাখবার কাজ দেওয়া হল অল্পদিনেই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিলেন কনফুসিয়াস। চি খুশি হয়ে তাকে আরো উঁচু পদ দিলেন। কিন্তু পদের কোন মোহ ছিল না কনফুসিয়াসের। তার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল জ্ঞান অর্জন। যে কোন পুঁথি পেলেই গভীর মনোযোগ সহকারে তা পড়তেন। উপলব্ধি করতে চেষ্টা করতেন তার অন্তর্নিহিত সত্য। তাই যখনই সময় পেতেন পুঁথি সংগ্রহ করতেন। কিম্বা যেখানেই কোন পুঁথিসন্ধান পেতেন সেখানেই ছুটে যেতেন।

কনফুসিয়াসের চরিত্রের উদারতা মহত্ত্বতার কারণে সকলেই তাকে ভালবাসত। তখন কনফুসিয়াস সবেমাত্র যৌবনের পা দিয়েছেন। সকলের পরামর্শে বিবাহ করলেন। স্ত্রীর নাম পরিচয় সব কিছুই ছিল অজ্ঞাত। তার স্ত্রীর গর্ভে এক পুত্র, দুটি কন্যা (কারো মতে একটি কন্যা) জন্ম গ্রহণ করে। স্ত্রীর সঙ্গে কনফুসিয়াসের কি রকম সম্পর্ক ছিল তা জানা যায় না। সম্ভবত স্ত্রীর সাথে কনফুসিয়াসের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিল। অনেকের মতে স্ত্রীর মৃত্যু হয়।

তাঁর কাজে খুশি হয়ে চি তাকে তার সমস্ত গবাদি পশুর দেখাশুনা করা, তাদের তত্ত্বাবধান করা, পালন করার সমস্ত দায়িত্বভার অর্পণ করলেন। আপাতদৃষ্টিতে সহজসাধ্য মনে হলেও কাজটি ছিল অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ।

কনফুসিয়াস তখন ত্রিশ বছরে পা দিয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করছিলেন প্রকৃত জ্ঞান শুধু পুঁথির মধ্যে পাওয়া যাবে না। চারপাশের জগতে ছড়িয়ে রয়েছে জ্ঞানের উপকরণ। তিনি বেরিয়ে পড়তেন শহর থেকে শহরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।

এই ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন চীনদেশের প্রকৃত অবস্থা। দেখলেন সমস্ত দেশ জুড়ে শুধু অভাব অনটন। রাজা, রাজপুরুষদের নৈতিক অধঃপতন। প্রতিনিয়তই এক দেশের সাথে অন্য দেশের যুদ্ধবিগ্রহ চলেছে। কোথাও শান্তি-শৃঙ্খলা নেই। নেই ন্যায়নীতি, ধর্মবোধ।

গভীর চিন্তার মধ্যে দিয়ে তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন সমাজ জীবন, ব্যক্তি জীবন, রাষ্ট্রনৈতিক জীবন-সর্বক্ষেত্রেই প্রয়োজন শৃঙখলার। এই শৃঙ্খলা রয়েছে প্রকৃতির মধ্যে, ঈশ্বরের সমস্ত বিধানের মধ্যে। তাই দিন রাত্রি, সপ্তাহ, মাস, বৎসর বিভিন্ন ঋতু একই নির্দিষ্ট নিয়মে আবর্তিত হচ্ছে।

কনফুসিয়াস বিশ্বাস করতেন আইন বা দণ্ডের দ্বারা এই শৃঙ্খলাকে সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। আইন যতই কঠোর হবে ততই তাকে অমান্য করবার ইচ্ছা মানুষের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠবে। একমাত্র মানুষের অন্তরের বিবেকবোধ নীতিবোধই তাকে সঠিক শৃঙ্খলার পথে চালিত করতে পারে। আর এই বিবেকবোধ নীতিবোধই তাকে সঠিক শৃঙ্খলার পথে চালিত করতে পারে। আর এই বিবেকবোধ তখনই মানুষের মধ্যে জাগ্রত হবে যখন ধর্মীয় চেতনা জেগে উঠবে।

কনফুসিয়াসের মধ্যেকার এই উপলব্ধি, গভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা দেশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। দূর দূরান্ত থেকে ছাত্ররা আসতে আরম্ভ করল তার কাছে। তাদের শিক্ষাদনের জন্য তিনি একটি এ্যাকাডেমি স্থাপন করলেন।

কিন্তু কনফুসিয়াস শুধু জ্ঞানী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন একজন আদর্শ শাসক হতে।

তাই জ্ঞানী হিসাবে যেমন ছাত্রদের শিক্ষা দিতেন, অন্যদিকে সংস্কারক হিসাবে সমাজের ক্রটি-বিচ্যুতিগুলোকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করতেন। নানান বিষয়ে সুপরামর্শ দিতেন।

তাঁর আকৃতি ছিল কুৎসিত। অস্বাভাবিক দীর্ঘদেহ, মাথাটি ছিল বিশাল আকৃতির, চওড়া মুখ। ছোট দুটি যথেষ্ট বড়। নাকটি ছিল স্বাভাবিক দ্বিগুণ। যখন তিনি হাঁটতেন, হাত দুটো পাখির ডানার মত দুপাশে ছড়িয়ে থাকত। পিঠটা ছিল কালো কচ্ছপের মত।

এই দৈহিক অপূর্ণতা সত্ত্বেও ভ্রমর যেমন মধুর আকর্ষণে ফুলের কাছে আসে, মানুষও তেমনি তার জ্ঞানের প্রদীপ্ত শিখায় নিজেকে আলোকিত করবার জন্য শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে থাকে।

শিক্ষক হিসাবে আচার্য হিসাবে তার খ্যাতি ক্রমশই দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। এতদিন শুধু সাধারণ ঘরের ছেলেরাই তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করত। ক্রমশই অভিজাত ঘরের ছেলেরাও তার কাছে জ্ঞান লাভের জন্য শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে আরম্ভ করল। কনফুসিয়াস কোন দরিদ্র ছাত্রের কাছ থেকে অর্থ না নিলেও ধনীদের কাছ থেকে অর্থ নিতেন। ক্রমশই কনফুসিয়াস আর্থিক দিক থেকে সচ্ছল হয়ে উঠলেন।

এই সময় আরো একটি ঘটনার অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে কনফুসিয়াসের প্রভাব আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পেল।

কিন্তু আকস্মিকভাবে দেশে দেখা দিল সামরিক বিপর্যয়। প্রতিবেশী দেশের আক্রমণ দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন কনফুসিয়াস। অন্য এক দেশে গিয়ে আশ্রয় নিলেন। সেই রাজ্যের শাসনকর্তার নাম ছিল চিং।

কনফুসিয়াসের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই করে দিলেন। মাঝে মাঝেই তিনি কনফুসিয়াসের কাছে এসে নানান বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। একদিন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, একজন শাসনকর্তার প্রকৃত সাফল্য কিভাবে নিরূপণ করা যায়?

কনফুসিয়াস বললেন, একজন শাসক তখনই সফল যখন তিনি প্রকৃতই শাসক। ভৃত্য সকল সময়েই ভৃত্য, পিতা প্রকৃতই পিতা, পুত্র সত্যিকারের পুত্র।

ডিউক চিং উপলব্ধি করলেন কনফুসিয়াসের কথার প্রকৃত তাৎপর্য। যিনি প্রকৃতই শাসক তার মধ্যে একাধিক গুণের সন্নিবেশ ঘটবে। একটি গুণের অভাব ঘটলেও তিনি প্রকৃত শাসক বলে পরিগণিত হবেন না।

দীর্ঘ সাত বছর ডিউক চিং-এর রাজ্যে সুখেই দিন কাটিয়ে দিলেন কনফুসিয়াস।

সেই সময় ইয়াং হু নামে চি রাজবংশের এক ভৃত্য ছিল। নিজের বুদ্ধি চতুরতায় রাজাকে নির্বাসিত করে রাজ্যের ক্ষমতা দখল করে নিল। কনফুসিয়াসকে নিজের রাজ্যে

আমন্ত্রণ করে এনে তাঁকে উচ্চপদ দিতে চাইল।

তিনি জানতেন ইয়াং হু শুধু মাত্র প্রবুর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, সে পররাজ্যলোভী হীন চরিত্রের মানুষ। এমন মানুষকে সাহায্য করবার সামান্যতম ইচ্ছা ছিল না কনফুসিয়াসের।

একদিন ইয়াং হু নিজে গিয়ে কনফুসিয়াসের সাথে সাক্ষাৎ করল। ইয়াং হুর আন্তরিক ইচ্ছা লক্ষ্য করে কনফুসিয়াস সাময়িকভাবে বিচলিত হয়ে পড়লেন। প্রথমে স্থির করলেন মন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। কিন্তু অল্প কয়েক দিনেই অনুভব করলেন, নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য পালনের দায়িত্ব অস্বীকার করা নৈতিক অপরাধ হলেও ইয়াং হুর মত শাসকের কাছে স্বাধীনভাবে রাজ্যের উন্নতি সাধন করা সম্ভব নয়।’

দৈবক্রমে সেই সময় পার্শ্ববতী লু রাজ্য থেকে কনফুসিয়াসের কাছে প্রধানমন্ত্রী হবার আমন্ত্রণ এল। এই রাজ্যের প্রধান ছিলেন ডিউক তিং। তিনি রাজ্যের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের প্রধান পরামর্শদাতা হিসাবে কনফুসিয়াসকে নিযুক্ত করলেন। ডিউক তিং নিজেও কোন দরকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবার সময় কনফুসিয়াসের পরামর্শ গ্রহণ করতেন।

অল্প দিনের মধ্যেই লু রাজ্যের অভূতপূর্ব উন্নতি দেখা দিল। সকল বিশৃঙ্খলা দূর হল। দেশের রাজস্ব বৃদ্ধি পেল। সাধারণ নাগরিকদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ বহুগুণ বৃদ্ধি পেল।

লু রাজ্যের এই সর্বাঙ্গীন উন্নতি দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ল প্রতিবেশী রাজ্যের রাজারা। তারা গোপনে ষড়যন্ত্র করতে আরম্ভ করল কিভাবে রাজা তিং ও প্রধানমন্ত্রী কনফুসিয়াকে হত্যা করা যায়।

কনফুসিয়াসের এতখানি দূরদৃষ্টি ছিল, তিনি জানতেন শুধু আভ্যন্তরিণ শান্তি বজায় রাখলে চলবে না,বিদেশী শত্রুর প্রতিও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে। গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন, শত্রুপক্ষের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল।

রাজ্যে মধ্যে কিছু কিছু সামন্ত ছিল যারা ডিউক তিং-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেনি। একে একে তাদের সকলকে পরাজিত করে তিং-এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিদের সামন্ত পদে বসালেন।

কনফুসিয়াস জানতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে মানুষের মধ্যে ক্ষমতার লোভ প্রবল হয়ে ওঠে। যাতে তারা বিদ্রোহ করে ডিউকের বিরুদ্ধে কোন বিপদের সৃষ্টি না করতে পারে, সেই কারণে সমস্ত সমস্ত রাজাদের অস্ত্র ও সৈন্যসংখ্যা সীমিত রাখবার হুকুম দিলেন।

কনফুসিয়াস বিশ্বাস করতেন মানুষের মধ্যে যদি নৈতিক চরিত্রের উন্নতি বিধান না করা যায়, শুধুমাত্র আইনের শাসনে মানুষকে সংযত রাখা সম্ভব হয় না-তাছাড়া সুদীর্ঘ কালও শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব নয়। তাই কনফুসিয়াস নিজেই তাদের মধ্যে ধর্মবোধ নীতিবোধ জাগ্রত করবার জন্য নানান উপদেশ দিতেন। অল্প দিনেই এর সুফল দেখা দিল।

সমগ্র চীনদেশে সেই সময় লু ছিল একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে চুরি, ডাকাতি, খুন হত না। সকলেই নির্ভয়ে নিরাপদে নিজের দ্ৰব্য রাখতে পারত। গভীর রাতেও পর্যটকরা নির্ভয়ে পথ চলতে পারত।

একদিন রাজা ডিউক শিকারে যাচ্ছিলেন। পথে একদল সুন্দরী মেয়েকে তার রথের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল। তাদের রূপে মুগ্ধ ডিউক ভুলে গেলেন শিকার। তাদের নিয়ে আনন্দে মত্ত হয়ে রইলেন কয়েক দিন। রাজকার্যে মন নেই! বন্ধ হয়ে গের পূজা আচার অনুষ্ঠান।

কনফুসিয়াস মনে মনে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। রাজার এই নৈতিক স্খলন গুরুত্বর অপরাধ বলে মনে হল তাঁর।

তৎক্ষণাৎ প্রধানমন্ত্রীর পদে ইস্তফা দিয়ে লু রাজ্য ত্যাগ করে পথে বেরিয়ে পড়লেন। তখন তার বয়স চুয়ান্ন। সঙ্গে কয়েকজন মাত্র অনুগত শিষ্য।

কনফুসিয়াস উপলব্ধি করতে পারেন তার আদর্শকে গ্রহণ করবার মত মানুষ কোথাও নেই। তবুও তিনি শিক্ষা দিতে থাকেন। তাঁর ছাত্র সংখ্যা বেড়েই চলে। তিনি যেখানে যখন যেতেন সেখানেই তার সঙ্গে ছাত্রেরা যেত।

কনফুসিয়াস যখন যে রাজ্যে যেতেন সেইখানে খোঁজ করতেন, কোথায় গ্রন্থাগার আছে। সেখানে কোন প্রাচীন পুঁথির সন্ধান পেলেই গভীর মনোযোগ সহকারে তা পড়তেন। সমস্ত জীবন তিনি নিজেকে মনে করতেন একজন শিক্ষার্থী। তাই যখন যেখানেই কোন জ্ঞানের সন্ধান পেতেন আগ্রহভরে তাকে গ্রহণ করতেন।

কনফুসিয়াসের জ্ঞানের কোন সীমা ছিল না। অতলান্ত সমুদ্রের মতই ছিল তার প্রজ্ঞা তাই দেশের যে প্রান্তেই যেতেন না কেন, সাধারণ প্রজা থেকে আরম্ভ করে ডিউজ রাজারও অবনত মস্তকে শ্রদ্ধায় তাঁর কাছে মাথা নত করত।

যখন কেউ কনফুসিয়াসকে প্রশ্ন করত মহত্ত্বতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন কি? তিনি উত্তর দিতেন দয়া ও ত্যাগ। অন্যের প্রতি যখন মানুষের দয়া ও ভালবাসা জাগ্রত হবে তখন সে হবে প্রকৃত অর্থেই মহৎ মানুষ। তার উপরেই ঈশ্বরের আশীর্বাদ নিয়ত বর্ষীত হয়। অর্থলিন্দু মানুষ কখনো মহৎ হতে পারে না। সে নিয়তই ঈশ্বরের কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

একদিন কনফুসিয়াসের এক শিষ্য তাঁকে প্রশ্ন করলেন, আমাদের সমাজ জীবনে মাঝে মাঝে মহৎ মানুষের আবির্ভাব হয়-এই মহৎ মানুষের সাথে অন্য সাধারণ মানুষের তফাৎ কি?

কনফুসিয়াস উত্তর দিলেন, একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ তার পারিপার্শ্বিক সমস্ত কিছুকেই গভীরভাবে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ কোন কিছুই গভীরভাবে চিন্তা করে না। শ্রেষ্ঠ মানুষেরা মনে করেন ঈশ্বরের ইচ্ছায় সব কিছু চালিত হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ ভাগ্যের হাতেই নিজেকে সঁপে দেয়। শ্রেষ্ঠ মানুষ সর্বদাই নিজের ক্রটি বিচ্যুতিকে বড় করে দেখে। এই ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে জীবনকে আরো ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়াই থাকে তার লক্ষ্য। কিন্তু সাধারণ মানুষ সর্বদাই অন্যের ত্রুটি-বিচ্যুতিকে বড় করে দেখে-নিজেকে মনে করে সর্বদোষ মুক্ত।

সেই সময় কনফুসিয়াস ছিলেন চেন রাজ্যে। তখন চীনের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে চলছে বিশৃঙ্খলতা। চেন রাজ্যেও শুরু হয়েছে অরাজকতা। শত্রু সৈন্য সীমান্ত অঞ্চলে জড় হয়েছে।

কনফুসিয়াস তাঁর শিষ্যদের বললেন, এই দেশ ত্যাগ করে অন্য কোন দেশে যেতে হবে।

কনফুসিয়াস বুঝল, আমরা মানব সমাজে বাস করি। মানুষের সমস্যা দেখে যদি পালিয়ে যাই তবে কখনোই যথার্থ মানুষ হয়ে উঠতে পারব না। পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য আমাদের সচেষ্ট হতে হবে।

আবার চেন রাজ্যে ফিরে এলেন কনফুসিয়াস। তিনি তিন বছর সেখানে রয়ে গেলেন। তারপর কনফুসিয়াস গেলেন সাই নামে এক রাজ্যে। এই সময় চু নামে এক রাজ্যের বাইরে শিবির করেছিলেন। তারা কনফুসিয়াসকে সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রণ জানাল।

চু রাজার ইচ্ছে ছিল কনফুসিয়াসকে তার রাজ্যে একটি জমিদারী দান করবেন যাতে কনফুসিয়াস তাঁর রাজ্যেই স্থায়ীভাবে বাস করতে পারেন। কিন্তু চু রাজার প্রধানমন্ত্রী কনফুসিয়াসকে পছন্দ করত না। তার ভয় ছিল কনফুসিয়াসের মত জ্ঞানী পণ্ডিত মানুষ যদি চু রাজ্যে থাকে তবে রাজা তার পরামর্শ মতই সকল কাজ করবে। তাই প্রধানমন্ত্রী রাজাকে জমি দান করতে নিষেধ করল।

কনফুসিয়াস আবার পথে বেরিয়ে পড়লেন। মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ল রাজ্যের কথা। এই লু রাজ্যেই নিজের নীতি আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন তিনি। এক এক বার মনে হত তিনি ফিরে যাবেন লু রাজ্যে। পরমুহূর্তেই মনে হত যদি তারা তাকে গ্রহণ না করে। মনে মনে ব্যথিত হতেন কনফুসিয়াস।

অবশেষে কনফুসিয়াসের মনের আকাক্সক্ষা পূর্ণ হল। একদিন কনফুসিয়াস তাঁর শিষ্যদের নিয়ে এক শিবিরে বিশ্রাম করছিলেন। এমন সময় তিনখানি রথ এসে দাঁড়াল সেখানে। রথ থেকে নামল লু রাজ্যের তিন উচ্চপদস্থ কর্মচারী। তারা কনফুসিয়াসকে অভিবাদন করে বলল, তারা মহামান্য ডিউকের আদেশে কনফুসিয়াসকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছেন।

কনফুসিয়াস শিষ্যদের নিয়ে ফিরে এলেন লু রাজ্যে। রাজ্যের ডিউক ব্যারন উচ্চপদস্থ কর্মচারী সকলেই তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল। কারণ তারা উপলব্ধি করতে পেরেছিল কনফুসিয়াসের মত মানুষ খুব বেশি জন্মগ্রহণ করেন না। তাঁকে পরামর্শদাতা হিসাবে পাওয়া সকল রাজ্যের ভাগ্যের ঘটে না।

কিছুদিনের মধ্যেই লু রাজ্যে ফিরে এল তার পূর্বের সমৃদ্ধি। তিনি রাজ্যের শাসনভার পরিচালনার জন্য যে সব উপদেশ দিতেন তা আধুনিককালেও সমান গুরুত্পূর্ণ। তিনি বলতেন সরকার শুধু গরীবদেরই দেখাশুনা করবে না, বৃদ্ধ ও অশক্তদেরও সাহায্য করবে। তিনি কাজের শ্রমবিভাগ করে দিলেন। যে যার যোগ্যতা সামর্থ্য অনুসারে কাজ করবে। তিনি বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য বেঁধে দিলেন। দেশের উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাবার জন্য ব্যবসায়ী ও ধনী ব্যক্তিদের উপর নির্দিষ্ট হারে কর ধার্য করা হল। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করা হল। পুরনো রাস্তা ব্রিজ যাতে নিয়মিত মেরামত করা হয় সেই দিকে নজর রাখবার জন্য কর্মচারী নিয়োগ করা হল। তিনি বলতেন দেশের সর্বত্রই যেন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের ধনী-দরিদ্র কোন মানুষই যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়।

কনফুসিয়াস একাত্তর বছরে পা দিয়েছেন। মাঝে মাঝেই তার শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। বুঝতে পারছিলেন তার জীবন শেষ হয়ে আসছে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৭৯, সঠিক দিনটি জানা যায় নি। কনফুসিয়াস তার শিষ্যদের কাছে ডাকলেন, বললেন, তোমারই আমার শেষ কাজ করবে। কোন আড়ম্বর করো না। বিলাস আড়ম্বরের মধ্যে দিয়ে গেলে ঈশ্বরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে পারব না।

কনফুসিয়াসের মৃত্যুর পর শিষ্যরা তাঁর সমাধিস্থলকে ঘিরে মন্দির গড়ে তুলল। সেখানেই কুঁড়েঘর করে বাস করতে থাকে। তিন বছর ধরে এইভাবে তারা শোক পালন করে।

কনফুসিয়াস নতুন কোন ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেননি। কোন মতবাদ বা দর্শনের জন্ম দেননি। বা কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করেননি। তিনি ছিলেন বাস্তববাদী। যা কিছু ছিল তাকেই নতুনভাবে প্রয়োজন অনুসারে পরিবর্তন করেছেন। যখন কেউ তাকে স্বর্গ, ঈশ্বর সম্বন্ধে প্রশ্ন করত, তিনি নিজের বুকের উপর হাত রেখে বলতেন, এখানেই আছে স্বর্গ ঈশ্বর।

তিন বলতেন, দয়া, সততা, পবিত্রতা, ভালবাসা, জ্ঞান, মহত্ত্বতা মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ। এই সব গুণের মধ্যে দিয়েই মানুষ নিজেকে দেবত্বে উন্নীত করতে পারে, অন্যের শ্রদ্ধা-ভালবাসা অর্জন করতে পারে।

কনফুসিয়াসের মধ্যে এই সমস্ত গুণের সমাবেশ ঘটেছিল বলেই আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে তার শ্রদ্ধার আসন পাতা রয়েছে।

 ৩৩. বারট্রান্ড রাসেল (১৮৭২-১৯৭০)

এ প্রজ্ঞাবান মানুষটির জন্ম হয় ইংল্যন্ডের মন্মথশায়ারের ট্রেলাক গ্রামে। জন্মতারিখ (১৮৭২ সালে ১৮ই মে)। ইংল্যন্ডের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম। দাদু লর্ড জন রাসেল ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী। বাবা ভাইকাউন্ট ছিলেন পার্লামেন্টের সদস্য। পরিবার পরিকল্পনা সপক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি তার সদস্যপদ হারান। তার মাও ছিলেন উদারনৈতিক চরিত্রের মহিলা। শৈশবেই বাবা-মাকে হারান রাসেল।

এই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “আমার ছেলেবেলা ছিল চরম বিয়োগান্তক। জন্মের এক বছর পরেই বাবা অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। চাচা হঠাৎ উন্মাদ হয়ে গেলেন। মা আর বোন একই সাথে ডিপথেরিয়ার মারা গেলেন। ১৮ মাস পর বাবা মারা গেলেন। ভাই ফ্রাঙ্ক কাঁদছিল, আমি চুপ করে সব দেখছিলাম।”

মা-বাবার অবর্তমানে শিশু রাসেলের সব ভার নিজের হাতে তুলে নেন দাদী রাসেল।

বাড়িতেই পড়াশুনা শুরু হল। একজন জার্মান গভর্নেস ও ইংরেজ শিক্ষকের তত্ত্ববধানে তিনি সাহিত্য, বিজ্ঞান, অঙ্কের পাঠ নিতে আরম্ভ করলেন। ভাইয়ের কাছে শিখতেন জ্যমিতি। কিন্তু তার প্রিয় বিষয় ছিল বীজগণিত।

১৮৯০ সালে আঠারো বছর বয়সে কেমব্রিজের ট্রিনটি কলেজে ভর্তি হলেন। তার বিশেষ আগ্রহ ছিল গণিতে। এখান থেকে গণিতে প্রথম হলেন ট্রাইপোস। পরে সপ্তম বাংলার।

গণিত ছাড়াও তার আকর্ষণ ছিল দর্শনে। দর্শনে সম্মানের সাথে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে কলেজের ফেলো নির্বাচিত হলেন।

কেমব্রিজে ছাত্র অবস্থাতেই পরিচয় হয় অ্যালিস পিয়ার্সন স্মিথ নামে এক আমেরিকান তরুণীর সাথে। অল্পদিনেই দুজনে গভীর প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হলেন ১৮৯৪ সালে দুজনের বিয়ে হল। রাসেল তখন মাত্র ২২ বছরের যুবক।

বিয়ের অল্প কিছুদিন পর রাসেল জার্মানিতে গিয়ে সেই সময়কার বিখ্যাত অঙ্কশাস্ত্রবিদ অধ্যাপক ভায়ারট্রাসের সাথে একসাথে গণিত সংক্রান্ত কিছু কাজকর্ম করলেন। এখানে তিনি গণিতে অধ্যাপনাও করেছেন।

১৯০০ সালে রাসেলের জীবনে ঘটল এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্যারিসে বসেছিল দর্শনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন।

ইংল্যান্ডে ফিরে এসে তিনি এবং অধ্যাপক হোয়াইটহেড একই সাথে গবেষণা শুরু করলেন। ১৯০২ সাল থেকে ১৯১০ দীর্ঘ আট বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর প্রকাশ করলেন গণিতশাস্ত্র সম্বন্ধনীয় যুগান্তকারী রচনা প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা (Principia Mathematica)।

প্রিন্সিপিয়া উত্তরকালে গণিতজ্ঞদের কাছে এক অমূল্য গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। অঙ্কশাস্ত্রের উপর এমন প্রামাণ্য গ্রন্থ খুব কমই রচিত হয়েছে। দুই মহান পণ্ডিতের অক্লান্ত সাধনার ফলশ্রুতি এই গ্রন্থ।

১৯০৮ সালে তিনি লন্ডনের রয়াল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হলেন। তার প্রিন্সিপিয়া রচনা শেষ করে তিনি রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়লেন। তিনি পার্লামেন্টের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবার ব্যাপারে মনস্থির করলেন।

১৯১০ সালে লিবারেল পার্টির প্রতিনিধি হিসাবে দাঁড়ালেন। কিন্তু স্থানীয় ভোটদাতারা সরাসরি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলল, রাসেল ঈশ্বর মানেন না, চার্চে যান না। এমন লোককে ভোটে নির্বাচিত করার কোন অর্থই হয় না। ভোটে পরাজিত হলেন রাসেল।

উত্তরকালে আরো দুবার তিনি পার্লামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, দুবারই পরাজিত হন।

১৯১৪ সালে শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। রাসেল ছিলেন যুদ্ধবিরোধী। তিনি ইংল্যান্ডের মানুষদের সঙ্গী মনোবৃত্তির তীক্ষ্ণ সমালোচনা করলেন।

তার এই যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের জন্য সমস্ত দেশবাসীর কাছে অপ্রিয়ভাজন হয়ে উঠলেন। রাসেলকে অভিযুক্ত করা হল এবং তার বিরুদ্ধে জরিমানা ধার্য করা হল। তিনি জরিমানা দিতে অস্বীকার করলেন। এর জন্যে তার গ্রন্থাগারের অধিকাংশ বই বিক্রি করে জরিমানার অর্থ আদায় করা হল।

১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন শেষ পর্যায়ে, তিনি ট্রিবিউনাল পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করবর অপরাধে কারারুদ্ধ হলেন। ইংল্যান্ডের মিত্রপক্ষ আমেরিকার বিরুদ্ধে এই লেখার জন্য ছ মাসের জন্য তাকে কারারুদ্ধ করা হল। কারাদণ্ড ভোগ করার অপরাধে তাকে ট্রিনটি কলেজের অধ্যাপকের পদ থেকে বিতাড়িত করা হয়।

কারাগারে বসেও এই জ্ঞানতাপস বৃথা সময় নষ্ট করেননি। এই সময় রচনা করলেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ Introduction to Mathematical Philosophy। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দীর্ঘ কয়েক বছর তিনি কোন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাননি। এই সময় লেখা ও বক্তৃতা দিয়ে উপার্জন করতেন।

ইতিমধ্যে রাশিয়ায় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। দেশে গড়ে উঠেছে সমাজতন্ত্র। রাসেল। সমাজবাদের প্রতি আকৃষ্ট হলেন।

১৯২০ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হল আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলন। রাসেল ইংল্যান্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি হিসাবে রাশিয়ায় গেলেন। এখানে সাক্ষাৎ হল লেনিনের সাথে। রাশিয়ার নতুন সমাজব্যবস্থা দেখে হতাশ হয়েছিলেন রাসেল।

তার এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখেন “The practice and theory of Bolshevism”। রাশিয়ার ভ্রমনের পর তিনি চীনে যান। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

চীনে এসে পিকিং ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বক্তৃতা দিলেন। ছাত্রদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সম্মান পেলেন।

চীন ভ্রমণের পর তিনি “চীনের সমস্যা” বলে একটি বই লেখেন। তাতে চীনের মানুষ, তাদের সংস্কৃতির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।

চীনে থাকার সময় ঠাণ্ডা লেগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শরীরের অবস্থা এত খারাপ হয়েছিল, সকলে তার জীবনের আশা প্রায় ত্যাগ করেছিল।

কিন্তু রাসেল অদম্য প্রাণশক্তির জোরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। এই সময় তাকে যিনি অক্লান্ত সেবা-যত্ন করে সুস্থ করে তোলেন তার নাম ডোরা ব্লাক। ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে রাসেল ডোরাকে বিবাহ করেন।

তিনি জীবনে চারবার বিবাহ করেছিলেন, এছাড়া বহু নারীর প্রেমে পড়েছিলেন।

তার প্রথমা স্ত্রী অ্যালিস ছিলেন স্বামীর প্রতি খুবই অনুরক্ত। কিন্তু একদিন পাহাড়ি পথে সাইকেল চালাতে চালাতে হঠাৎ তার মনের মধ্যে অ্যালিসের সম্বন্ধে অদ্ভুত এক শূন্যতা সৃষ্টি হল। তার প্রতি সব আকর্ষণ হারিয়ে ফেললেন। বাড়ি ফিরেই অ্যালিসের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা আনলেন।

ইতিমধ্যে মোরেল নামে এক বিবাহিত মহিলার প্রেমে পড়ে গেলেন রাসেল। অল্পদিনের মধ্যেই এই প্রেম ছিন্ন হয়ে গেল। এবার রাসেলের সঙ্গিনী হলেন মিস ডোরা ব্ল্যাক। বিবাহ না করলেও দুজনে স্বামী-স্ত্রীর মত থাকতেন। চীন থেকে ফেরার পর রাসেল ডোরাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করেন।

রাসেলের আর্থিক অবস্থা খুব ভাল ছিল না। নিজে পৈত্রিক সম্পত্তি বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানে দান করে দিয়েছিলেন। এই সময় শুধুমাত্র লেখাই ছিল তার জীবিকা অর্জনের পথ। রাসেল শিক্ষা সম্বন্ধে বরাবরই গভীরভাবে চিন্তা করতেন। শিক্ষা সম্বন্ধীয় এই সব চিন্তা-ভাবনাকে তিনি প্রকাশ করেছেন তার দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ “On education” ও “Education and the social order”-এ।

১৯২৯ সালে তিনি রচনা করলেন তার চেয়ে বিতর্কিত এবং উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ “ম্যারেজ অ্যান্ড মরালস” (Marriage and Morals)।

ডাক এল আমেরিকা থেকে। সপরিবারে গেলেন আমেরিকাতে। প্রথমে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেন তারপর লস এঞ্জেলসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসাবে যোগ দিলেন। এক বছর পর (১৯৪১) ডাক এল নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনের অধ্যাপনা করবার জন্য। কিন্তু তার ম্যারেজ অ্যান্ড মরালস বই-এর ইতিমধ্যে চারদিকে তর বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল। কলেজের এক ছাত্রীর মা অভিযোগ জানাল রাসেলের মত মানুষ শিক্ষক হলে তার মেয়ের সর্বনাশ হবে।

এছাড়া একজন বিশপ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাল তিনি ধর্ম ও নৈতিকতার বিরোধী। বিচারক ম্যাকগীহান এই অভিমতের সমর্থন করে আদেশ দিলেন রাসেলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না। এর জন্যে তিনটি কারণ দেখালেন। প্রথমত, রাসেল আমেরিকার নন, দ্বিতীয়ত, অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হবার জন্য তিনি কোন পরীক্ষা দেননি, তৃতীয়ত, তিনি যা লিখেছেন তা সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক।

এই প্রসঙ্গে আইনস্টাইন মন্তব্য করেছিলেন এই সুন্দর পৃথিবীতে যাজকরাই বার বার মানুষকে উত্তেজিত করে আর প্রতিভাবানরা হয় নির্বাসিত।

এই সময় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইউলিয়াম জেমস স্মারক বক্তৃতা দেবার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানান হল। তাকে বারনেস ফাউনডেশনের তরফ থেকে দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত করা হল। তিনি এখানে পর পর বেশ কয়েকটি বক্তৃতা দিলেন। হঠাৎ তাকে পদচ্যুত করা হল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি যে সব বক্তৃতা দিয়েছেন তা মোটেই উন্নত মানের নয়। সবচেয়ে বিস্ময়ের, এই সময় তিনি যে সব বক্তৃতা দিয়েছিলেন তা সংকলন করে প্রকাশিত হল “পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস।” এই যাবকাল পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস প্রসঙ্গে যত বই লেখা হয়েছে এটি তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।

এই সময় চাকরি হারিয়ে খুবই অসুবিধার মধ্যে পড়েছিলেন তিনি। তাঁর সাথে ছিল তৃতীয় স্ত্রী প্যাট্রিসিয়া স্পেন্স এবং শিশুপুত্র কনরার্ড।

এইবার ডাক এল ইংল্যান্ড থেকে। তার পুরানো কলেজ প্রিনটি পুনরায় অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত করলেন। দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর কেমব্রিজ তার অপরাধের প্রায়শ্চিত্য করল। এই আমন্ত্রণ পেয়ে লন্ডনে ফিরে এলেন রাসেল।

ইংল্যান্ডে ফিরে এসে প্যাট্রিসিয়ার সাথে সম্পর্কের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হল। কিছুদিনের মধ্যে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেল।

বিবাহ বিচ্ছেদ, আর্থিক সংকট, যুদ্ধ তার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা কোন কিছুই কিন্তু তার সৃজনীশক্তিকে সামান্যতম ব্যাহত করতে পারেনি। ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত হল তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আর একটি রচনা “Human Knowledge-its scope and limits”। ক্রমশই তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছিল দেশে দেশে। তিনি যখনই যে দেশে যেতেন, অভূতপূর্ব সম্মান বর্ষিত হত তার উপর। প্রকৃতপক্ষে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্ববাসীর কাছে বিংশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক।

অবশেষে এল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। ৯৫০ সালে তার ম্যারেজ অ্যান্ড মরাল বইটির জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হল।

আশি বছরে পা দিলেন রাসেল। এডিথ ফিঞ্চ নামে আমেরিকান মহিলাকে তিনি বিবাহ করলেন। এডিথ তার চতুর্থ ও শেষ স্ত্রী। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এডিথের কাছ থেকেই তিনি সুখ ও শান্তি পেয়েছিলেন। এতদিন রাসেল ছিলেন জ্ঞানের পূজারী ব্যক্তিগত জীবনের সুখ ভোগ, ছোট-বড় সামাজিক সমস্যা, এই ছিল তার জগৎ। ব্যক্তি জীবনের বহু কিছুর মধ্যেই লক্ষ্য করা গিয়েছে স্বার্থপরতা হীনমন্যতা, সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।

নিজের ছাত্রকে, বন্ধুকে প্রতারিত করতে যার সামান্যতম বাধেনি, মনুষ্যত্বের চেয়ে অর্থ যার কাছে বড় হয়ে উঠেছিল, তিনিই আবার নিজের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সমস্ত অর্থই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দান করে যান।

প্রকৃতপক্ষে রাসেলের মধ্যে ছিল দ্বৈত্য সত্তা-ব্যক্তিসত্তা এবং সামাজিকসত্তা। জীবনের প্রথম ৮০ বছর ব্যক্তিসত্তাই ছিল প্রবল কিন্তু উত্তরকালে সমগ্র মানব সমাজ, পৃথিবী হয়ে উঠল তার কর্মভূমি।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে এগিয়ে এলেন মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ। যারা পৃথিবীর বুকে প্রচার করতে চেয়েছিলেন শান্তি বাণী। এদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন রাসেল আর আইনস্টাইন-তারা প্রকাশ করলেন এক ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব।

জাপানের হিরোসিমায় আণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন সমস্ত মানব সভ্যতার অস্তিত্ব আজ বিপন্ন হতে চলেছে।

পৃথিবীর সমস্ত বিজ্ঞানী পদার্থবিদদের কাছে আবেদন করে বললেন, একমাত্র আপনারাই পারেন সমস্ত পৃথিবীকে রক্ষা করতে। আসুন সকলে মিলে পৃথিবী থেকে পারামাণিক যুদ্ধের সব সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিই।

পৃথিবী থেকে সব পারমাণবিক অস্ত্র নিশ্চিহ্ন করার জন্য স্থাপিত হল “ক্যাম্পেন ফর নিউক্লিয়ার ডিসআর্মামেন্ট” (Campaign for Nuclear Disarmament)। রাসেল হলেন এর প্রেসিডেন্ট। তিনি ইংল্যান্ডের নেতবন্দের কাছে আবেদন রাখলেন তারা যেন পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করে অহেতুক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় না নামে। তিনি ব্রিটেন, আমেরিকা এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানকে চিঠি লিখলেন কিন্তু তার সেই ডাকে কেউ সাড়া দিল না।

এবার প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নেমে পড়লেন রাসেল। ১৯৬১ সালে ট্রাফালগার স্কোয়ারে ত্রিশ হাজার মানুষের মিছিলে ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিলেন। তাকে আইন ভাঙার অপরাধে সাত দিনের জন্য কারারুদ্ধ করা হল। বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়, রাসেল তখন প্রায় নব্বই বছরের বৃদ্ধ। তার আন্তরিক প্রচেষ্টায় বিশ্বশান্তির জন্য প্রতিষ্ঠিত হল “বারট্রান্ড রাসেল পিস ফাউন্ডেশন”। যে রাসেল একদিন শিষ্যকে ন্যায্য প্রাপ্য দেননি, তিনি তার জীবনের সমস্ত উপার্জিত অর্থ তুলে দিলেন এই পিস ফাউন্ডেশনে।

শান্তি আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক হলেও কিন্তু তার লেখনী স্তব্ধ হয়নি। তবে এইবার আর দর্শন গণিত নয়, লিখলেন, “ওয়ার ক্রাইমস ইন ভিয়েনাম” এবং এতে তিনি সমস্ত পৃথিবীর সামনে আমেরিকান সৈন্যদের ভিয়োমে অত্যাচারের কাহিনী তুলে ধরলেন।

এ সময় প্রকাশকদের তাগিদে রচনা করলেন তার তিন খণ্ডে আত্মজীবনী। এই আত্মজীবনী তিন খণ্ডে বিভক্ত (১৮৭২-১৯১৪), (১৯১৪-১৯৪৪), (১৯৪৪-১৯৬৭) রচনার প্রথমেই তিনি বলেছেন তিনটি শক্তি তার জীবনকে চালিত করেছে। প্রথম প্রেমের আকাক্ষা, জ্ঞানের তৃষ্ণা, মানুষের জীবনের দুঃখ-বেদনার অনুভূতি।

রাসেলের সমস্ত জীবন ছিল কর্মময়। কমবেশি প্রায় ৭৫টি বই লিখেছিলেন। এই বইগুলোর মধ্যে ফুটে উঠেছে তার অগাধ পাণ্ডিত্য, প্রখর যুক্তবোধ, অসাধারণ মনীষা এবং অপূর্ব রচনাশৈলী।

৩৪. পাবলো পিকাসো (১৮৮১-১৯৭৩)

২৫ অক্টোবর ১৮৮১ স্পেনের ভূমধ্যসাগরীয় দক্ষিণ উপকূলে কাতালান প্রদেশের মালাগা শহরে পিকাসোর জন্ম। বাবা ডন জোস রুইজ ব্লাসকো ছিলেন আর্ট স্কুলের শিক্ষক এবং শহরের একটি মিউজিয়ামের কিউরেটর। বিয়ের এক বছর পরেই পিকাসোর জন্ম হয়। ডন জোস ছেলেন নাম রাখলেন পাবলো নেপোমুসেনো ক্রিসপিনায়ানো দ্য লা সান্তিমাসসিমা ত্রিনিদাদ রুইজ পিকাসো।

এই বিশাল নাম ধরে ডাকা কারোর পক্ষেই সম্ভব ছিল না। তাই সংক্ষেপে ডাকা হত পাবলো রুইজ। রুইজ ছিল তার পিতার পদবি, পিকাসো মাতৃকুলের পদবি। বড় হয়ে পিতৃকুলের পদবি বর্জন করে শিল্পী নিজের নাম রাখলেন পাবলো পিকাসো। এই নামেই আজ তিনি জগৎবিখ্যাত।

ছবি আঁকার হাতেখড়ি তার বাবার কাছে। শিশু বেলা থেকেই পিকাসোর মধ্যে ছিল ছবির প্রতি গভীর অনুরাগ। শোনা যায় যখন তিনি তিন বছরের শিশু, একটা পেনসিল কিম্বা কাঠকয়লা পেলে কাগজ কিম্বা মেঝের উপরেই ছবি আঁকতে আরম্ভ করে দিতেন।

ছাত্র অবস্থাতেই তার মধ্যে শিল্প চেতনায় বিকাশ ঘটতে থাকে। পিকাসোর যখন চৌদ্দ বছর বয়স, কাবা মালাগা ছেড়ে এলেন বার্সিলোনাতে। স্থানীয় আর্ট স্কুলে অধ্যাপক হিসাবে যোগ দিলেন ডন জোস। বাবার স্কুলেই ভর্তি হলেন পিকাসো। অল্পদিনের মধ্যেই তার প্রতিভার বিকাশ লক্ষ্য করা গেল।

বার্সিলোনায় ছাত্র অবস্থায় তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন শিল্প জগতে নতুন ধারার প্রবক্তা ভ্যান গক, তুলুস লোত্রেক, পল গ্যগা, সেজান প্রভৃতির একসপ্রেশনিজম বা প্রকাশবাদকে। লক্ষ্য করতেন তাদের চিত্রকলার বৈশিষ্ট্য বৈচিত্র্য।

তিন বছর বার্সিলোনার আর্ট স্কুল ছাত্র হিসাবে থাকার পর ১৮৯৭ সালে তিনি মাদ্রিদের রয়াল এ্যাকাডেমিতে ভর্তি হলেন। এই সময় কিছু তরুণ শিল্পী ছবির প্রদর্শনীতে আয়োজন করেছিল। এতে বহু প্রতিষ্ঠিত শিল্পীও যোগ দিলেন। সকলকে বিস্মিত করে এখানে শ্রেষ্ঠ শিল্পীর পুরস্কার পেলেন পিকাসো। তার জীবনের এটাই প্রথম সাফল্য।

আর মাদ্রিদের পরিবেশ ভাল লাগল না। ফিরে এলেন বার্সিলোনায় বাবা-মায়ের কাছে। এই সময়টি ছিল তার প্রস্তুতির যুগ। বাড়িতেই একটি স্টুডিও তৈরি করলেন। তার দিনের বেশির ভাগটাই কাটাতেন পথে, ঘাটে, বস্তিতে, জাহাজঘাটায়, পতিতাপল্লীতে, জেলেপাড়ায়, সমুদ্রের কূলে। তিনি যা দেখতেন তাই আঁকতেন। পথের ধারে বসে থাকা ভিখারি, গীর্জার সন্ন্যাসিনী, কারখানার শ্রমিক, পথের কুকুর, বৃদ্ধা, যৌবন হারানো পতিতা-তার ছবিতে কেউ বাদ যেত না।

১৯০০ সালে তিনি স্থির করলেন লন্ডন যাবেন। স্পেনের পরিমণ্ডল শিল্পের অনুকূল ছিল না। পথে কয়েকদিনের জন্যে নামলেন প্যারিসে। উদ্দেশ্য ছিল শিল্পের তীর্থক্ষেত্র প্যারিসের শিল্পকলার সাথে পরিচিত হওয়া।

মুগ্ধ হয়ে গেলেন পিকাসো। তার মনে হল স্পেন নয়, ইংল্যান্ড নয়, প্যারিসই হবে তার শিল্প সাধনার কেন্দ্রভূমি। প্রধানত আর্থিক কারণেই প্যারিসে স্থানীয়ভাবে ঘর বাধতে পারলেন

না। এর পরবর্তী চার বছর তিনি কখনো প্যারিস কখনো বার্সিলোনায় কাটিয়েছেন।

১৯০০ সালে তার প্রথম ছবি প্যারিস প্রদর্শিত হল “The moulin de la Galettle”. একটি কফি হাউসের দৃশ্য। এতে পিকাসোর প্রতিভা বিকশিত না হলেও ছবির বলিষ্ঠতা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এই প্রদর্শনীতে কোন ছবি বিক্রি হল না।

পিকাসোর শিল্পী জীবনের প্রথম পর্যায়ে যেতে পারে ১৯০১ থেকে ১৯০৪। এই সময়টিকে নাম দেওয়া হয়েছে ব্লু পিরিয়ড (Blue Period)। সমস্ত ছবি জুড়ে থাকত নীল রং। তার কাছে নীল রং ছিল জীবনের বিষণ্ণতা আর বেদনার প্রতীক।

এরই মধ্যে কিছুদিনের জন্য মাদ্রিদে এসে কয়েক জন তরুণ বন্ধুর সহযোগিতায় প্রকাশ করলেন একটি পত্রিকা ছবির “Young Ar”। পিকাসো হলেন এই পত্রিকার সম্পাদক। মাদ্রিদে তার একটি ছবির প্রদর্শনীও হল। এই সব ছবিগুলোই ছিল প্যাস্টেলে আঁকা। কিছুদিন পর ফিরে এলেন প্যারিসে।

ছবিতে নীল রঙের ব্যবহারের পরিবর্তে এবার দেখা গেল গোলাপী রং। যাকে বলা হয়েছে Pink Period। ১৯০৩ সাল থেকেই তার ছবির মধ্যে এল গাঢ় কালো সীমারেখা।

সৌভাগ্যক্রমে খুব অল্পদিনের মধ্যেই তার ছবি শিল্পরসিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তাই দেখা যায় সে সময়ে শিল্পীরা নিদারুণ যন্ত্রনা আর আর্থিক কষ্টের মধ্যে সংগ্রাম করে চলেছেন, তখনই তিনি ছবির ক্রেতা পেতে আরম্ভ করেছেন। তার বেশ কিছু ছবি বিক্রি হতেই তিনি স্থায়ীভাবে এসে প্যারিসে বাসা বাধলেন (১৯০৪)। কিন্তু ফরাসী সরকারের তরফে বহুবার তাকে নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি ফরাসী নাগরিক হননি। স্পেনের সন্তান হিসাবে নিজের পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন।

তার প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্বের চূড়ান্ত পরিণতি দেখা গেল ১৯০৭ সালে আঁকা লে ডিময়সেলস দ্য এভিগনন ছবিতে (Leo Demoiselles d Avignon)। তার কিউবিজম ধারার প্রথম সূত্রপাত হয় এই ছবিতে।

পিকাসোর এভিগনন ছবিটি ১৯০৭ সালে আঁকা হলেও তা জনসাধারণের সামনে প্রথম প্রদর্শিত হয় ১৯৩৭ সালে। কারণ এই ছবির আঙ্গিককে সাধারণ মানুষ কতখানি গ্রহণ করতে পারবে সে বিষয়ে পিকাসো ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত।

কিন্তু পিকাসো নিজের পথ থেকে সামান্যতম সরে আসেননি। ১৯০৭ থেকে ১৯১১ তিনি ধারাবাহিকভাবে তার ছবির মধ্যে একটু একটু করে পরিবর্তন নিয়ে আসতে থাকেন। ছবির ভাষা হয়ে উঠতে থাকে জটিল থেকে আরো জটিল। ছবির মধ্যে জীবনের স্বাভাবিক প্রকাশ একদম মুছে গেল, জন্ম নিল আধুনিক চিত্রশিল্পকলার। এই সময় কিছু বিখ্যাত ছবি ফলের ডিশ (১৯০৯)। গীটার হাতে মহিলা (Ma Jolic)।

পিকাসো এবং ব্রাক-এর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে প্রচারিত হতে আরম্ভ করল কিউবিক চিত্রকলা। একে বলা হত কিউবিস্ট কলেজ (Cubist College} এই সময় পিকাসো সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি হল (Still life with chair Caning (1911-1912)। ১৯১২ সালে তার কিছু কিউবিস্ট ছবির লন্ডনে এক প্রদর্শনী হয়। তখন ছবিগুলোর মূল্য ছিল ২ থেকে ২০ পাউন্ড। বর্তমানে সেই সব ছবিগুলোর মূল্য এক লক্ষ পাউন্ডের চেয়ে বেশি।

পিকাসোর জীবনের প্রথম নারী ফেরানডে অলিভিয়ের। ১৯০৪ সালে পিকাসো যখন আত্মপ্রতিষ