দুর্ভাগ্যক্রমে এই সময় তার সামান্য গচ্ছিত অর্থ একদিন চুরি হয়ে গেল। নিদারুণ অর্থসংকটে পড়লেন হ্যানিম্যান। এই বিপদের দিনে তাকে সাহায্য করলেন স্থানীয় গভর্নর। তাঁর লাইব্রেরী দেখাশুনার ভার দিলেন হ্যানিম্যানকে। এই সুযোগটিকে পুরোপুরি সদব্যবহার করেছিলেন তিনি। এক বছর নয় মাসে লাইব্রেরীর প্রায় সমস্ত বই পড়ে শেষ করে ফেলেছিলেন।
হাতে কিছু অর্থ সঞ্চয় হতেই তিনি ভর্তি হলেন আরল্যানজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখান থেকেই তিনি চব্বিশ বছর বয়েসে “ডক্টর অব মেডিসিন” উপাধি পেলেন।
ডাক্তারি পাস করে এক বছর তিনি প্র্যাকটিস করার পর জার্মানির এক হাসপাতালে চাকরি পেলেন।
এই সময় চিকিৎসাশাস্ত্র সম্বন্ধীয় প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশিত হল। এই প্রবন্ধে নতুন কিছু বক্তব্য না থাকলেও রচনার মৌলিকত্ব অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
অন্য সব বিষয়ের মধ্যে রসায়নের প্রতি হ্যানিম্যানের ছিল সবচেয়ে বেশি আগ্রহ। সেই সূত্রেই হেসলার নামে এক ঔষধের কারবারীর সাথে পরিচয় হল। নিয়মিত তার বাড়িতে যাতায়াত করতে হত। হেসলারের সাথে থাকতেন তার পালিতা কন্যা হেনরিয়েটা। হেনরিয়েটা ছিলেন সুন্দরী বুদ্ধিমতী। অল্পদিনেই দুই তরুণ-তরুণী পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। ১৭৮২ সালের ১৭ নভেম্বর দুজনের বিয়ে হয়ে গেল। হ্যানিম্যানের বয়স তখন ২৭ এবং হেনরিয়েটার ১৮। বিয়ের পরের বছরেই তাঁদের প্রথম সন্তান জন্ম নিল।
এই সময় হ্যানিম্যান রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন রচনা প্রকাশ করতে আরম্ভ করলেন। তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ, “কিভাবে ক্ষত এবং ঘা সারানো যায় সে বিষয়ে নির্দেশনামা।”
এই বই পড়লেই বোঝা যায় তরুণ চিকিৎসক হ্যানিম্যান নিজের অধিগত বিষয়ে কতখানি দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। এই সময় থেকেই আরো গভীরভাবে পড়াশুনা এবং বিভিন্ন প্রবন্ধ রচনা ও অনুবাদের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
সে যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা অন্য বিষয় সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন না। কিন্তু হ্যানিম্যানের আগ্রহ ছিল বিভিন্ন বিষয়ে। বিশেষভাবে তিনি রসায়নের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ফরাসি ভাষা থেকে জার্মান ভাষায় একাধিক গ্রন্থ অনুবাদ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুই খণ্ডে Art of Manufacturing chemical products. এছাড়া দুই খণ্ডে Art of distilling liquors. রসায়নের ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা সেই যুগে যথেষ্ট সাড়া জগিয়েছিল।
তাঁর লেখা On Arsenic poisoning ফরেনসিক গবেষণার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
এই সময় তিনি ডাক্তার ওয়াগলার-এর সাথে টাউন হাসপাতালে ডাক্তারি করতেন। হঠাৎ ডাক্তার ওয়াগলার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সমস্ত হাসপাতালের দায়িত্ব এসে পড়ল হ্যানিম্যানের উপর।
পরের কয়েক বছর তিনি অজস্র বই অনুবাদ করেন এবং Mercurius Solubilis আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত হয়ে গেলেন। চিকিৎসক হিসাবে তখন তার নাম যশ চারদিকে এতখানি ছড়িয়ে পড়েছিল যে তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারতেন। মনের মধ্যে তখন নতুন কিছু উদ্ভাবনের স্বপ্ন ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল। তিনি অনুভব করতে পারছিলেন সমস্ত দিন হাসপাতালে কাটিয়ে মনের ইচ্ছা পূর্ণ করা সম্ভব হবে না। তাই হাসপাতালের চাকরি ছেড়ে দিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য পুরোপুরি অনুবাদের কাজে হাত দিলেন।
১৭৯১ সালে তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডাক্তার কালেনের একটি বই এ্যালোপ্যাথিক মেটিরিয়া মেডিকার ইংরাজি থেকে জার্মান ভাষায় অনুবাদের কাজ হাতে নেন। এই বইয়ের একটি অধ্যায়ের Cinchona Bark পাদটীকায় লেখা ছিল ম্যালেরিয়া জ্বরের ঔষধ কুইনাইন যদি কোন সুস্থ ব্যক্তির শরীরে প্রয়োগ করা যায় তবে অল্পদিনের মধ্যেই তার শরীরে ম্যালেরিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পাবে।
কালেনের এই অভিমত হ্যানিম্যানের চিন্তাজগতে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করল। তিনি এর সত্যাসত্য পরীক্ষার জন্য নিজেই প্রতিদিন ৪ ড্রাম করে দুবার সিঙ্কোনার রস খেতে আরম্ভ করলেন। এর তিন-চারদিন পর সত্যি সত্যিই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলেন। এরপর পরিবারের প্রত্যেকের উপর এই পরীক্ষা করলেন এবং প্রতিবারই একই ফলাফল পেলেন। এর থেকে তার মনে প্রশ্ন জেগে উঠল, কুইনাইনের মধ্যে কি রোগের লক্ষণ এবং ঔষধের লক্ষণের সাদৃশ্য সৃষ্টিকারী কোন ক্ষমতা আছে? অথবা অন্য সমস্ত ঔষধের মধ্যেই কি এই ক্ষমতা আছে? অর্থাৎ যে ওষুধ খেলে মানুষের কোন রোগ নিরাময় হয়, সুস্থ দেহে সেই ওষুধ খেলে সেই রোগ সৃষ্টি হয়।
এতদিন চিকিৎসকদের ধারণা ছিল বিরুদ্ধভাবাপন্নতাই বিরুদ্ধভাবাপন্নকে আরোগ্য করে। অর্থাৎ মানুষের দেহে অসুস্থ অবস্থায় যে সব লক্ষণ প্রকাশ পায় তার বিপরীত ক্রিয়াশক্তি সম্পন্ন ঔষধেই রোগ আরোগ্য হয়। এই প্রচলিত মতের বিরুদ্ধে শুরু হল তার গবেষণা।
এই সময় তিনি যাযাবরের মত এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। স্থায়ী কোন আস্তানা গড়ে তুলতে পারেননি। গোথার ডিউক মানসিক রোগের চিকিৎসালয় খোলার জন্য তার বাগানবাড়িটি হ্যানিম্যানকে ছেড়ে দিলেন। ১৭৯৩ সালে হ্যানিম্যান এখানে হাসপাতাল গড়ে তুললেন এবং একাধিক মানসিক রোগগ্রস্ত রুগীকে সুস্থ করে তোলেন। সেকালে মানসিক রুগীদের উপর কঠোর নির্যাতন করা হত। শারীরিক নির্যাতনকে চিকিৎসার প্রধান অঙ্গ বলে মনে করা হত। হ্যানিম্যান কঠোর ভাষায় এর নিন্দা করেন।
