কিন্তু শুধু তাই নয়। বর্তমান পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির এবং এই পদ্ধতি যে বুর্জোয়া সমাজ সৃষ্টি করেছে তার গতির বিশেষ নিয়মটিও মার্কস আবিষ্কার করেন। যে সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে এতদিন পর্যন্ত সব বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ ও সমাজতন্ত্রী সমালোচক উভয়েরই অনুসন্ধান অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছিল, তার উপর সহসা আলোকপাত হল উদ্বৃত্ত মূল্য আবিষ্কারের ফলে।
একজনের জীবদ্দশার পক্ষে এরকম দুটি আবিষ্কারই যথেষ্ট। এমনকি এরকম একটা আবিষ্কার করতে পারার সৌভাগ্য যাঁর হয়েছে তিনিও ধন্য। কিন্তু মার্কসের চর্চার প্রতিটি ক্ষেত্রে–এমনকি গণিত শাস্ত্রেও তিনি স্বাধীন আবিষ্কার করে গেছেন।
এই হল বিজ্ঞানী মানুষটির রূপ। তবে মার্কস সকলের আগে ছিলেন বিপ্লববাদী। তাঁর জীবনের আসল ব্রত ছিল পুঁজিবাদী সমাজ এবং এই সমাজ যে সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে তার উচ্ছেদে কোন না কোন অংশ নেওয়া, আধুনিক প্রলেতারিয়েতের মুক্তি সাধনের কাজে অংশ নেওয়া, একে তিনিই প্রথম তাঁর নিজের অবআত, প্রয়োজন সম্বন্ধে তার মুক্তির শর্তাবলী সম্বন্ধে সচেতন করে তুলেছিলেন। তাঁর ধাতটাই ছিল সংগ্রামের এবং যে আবেগ, যে অধ্যবসায় ও যতখানি সাফল্যের সঙ্গে তিনি সংগ্রাম করতেন তার তুলনা মেলা ভার।
তাই তাঁর কালের লোকেদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রোশ ও কুৎসার পাত্র হয়েছেন মার্কস। স্বেচ্ছাতন্ত্রী এবং প্রজাতন্ত্রী দু ধরনের সরকারই নিজ নিজ এলাকা থেকে তাকে নির্বাসিত করেছে। রক্ষণশীল বা উগ্র গণতান্ত্রিক সব বুর্জোয়ারাই পাল্লা দিয়ে তার দুর্নাম রটনা করেছে, এসব তিনি মাকড়শার ঝুলের মতই ঝেটিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন, উপেক্ষা করেছেন এবং যখন একান্ত প্রয়োজনবশে বাধ্য হয়েছেন, একমাত্র তখনই এর জবাব দিয়েছেন।…আমি সাহস করে বলতে পারি যে মার্কসের বহু বিরোধী থাকতে পারে কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রু তার মেলা ভার।
যুগে যুগে অক্ষয় হয়ে থাকবে তার নাম, অক্ষয় হয়ে থাকবে তার কাজ।
৩৯. হ্যানিম্যান (১৭৫৫-১৮৪৩)
১৭৫৫ সালের ১০ এপ্রিল কারো কারো মতে (১১ এপ্রিল) মধ্যরাতে জার্মান দেশের অর্ন্তগত মারগ্রেওয়েট প্রদেশের অন্তর্গত মিসেন শহরে এক দরিদ্র চিত্রকরের গৃহে জন্ম হল এক শিশুর। দরিদ্র পিতামাতার মনে হয়েছিল আর দশটি পরিবারে যেমন সন্তান আসে, তাদের পরিবারেও তেমনি সন্তান এসেছে। তাকে নিয়ে বড় কিছু ভাববার মানসিকতা ছিল না তাদের। তাই অবহেলা আর দারিদ্র্যের মধ্যেই বড় হয়ে উঠল সেই শিশু। তখনো কেউ কল্পনা করতে পারেনি এই শিশুই একদিন হয়ে উঠবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে এক নতুন ধারার জন্মদাতা, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থার জনক ক্রিশ্চিয়ান ফ্রেডরিখ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান।
হ্যানিম্যানের বাবা গগফ্রিড মিসেন শহরের একটা চীনামাটির কারখানায় বাসনের উপর নানান নক্সা করতেন, ছবি আঁকতেন। এই কাজে যা পেতেন তাতে অতি কষ্টে সংসার চলত। হ্যানিম্যান ছিলেন চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। পিতামাতার প্রথম পুত্র সন্তান। গডফ্রিডের আশা ছিল হ্যানিম্যান বড় হয়ে উঠলে তারই সাথে ছবি আঁকার কাজ করবে, তাতে হয়তো সংসারে আর্থিক সমস্যা কিছুটা দূর হবে।
কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই হ্যানিম্যানের ছিল শিক্ষার প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ। বাড়িতেই বাবা-মায়ের কাছে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শুরু হল। বারো বছর বয়েসে হ্যানিম্যান ভর্তি হলেন স্থানীয় টাউন স্কুলে। অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর অসাধারণ মেধার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হলেন তার শিক্ষকরা। বিশেষত গ্রীক ভাষায় তিনি এতখানি দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে তিনিই প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রদের গ্রীক ভাষা পড়াতেন।
টাউন স্কুলে শিক্ষা শেষ করে হ্যানিম্যান ভর্তি হলেন প্রিন্সেস স্কুলে (Prince’s School)। এদিকে সংসারে ক্রমশই অভাব আর দারিদ্র্য প্রকট হয়ে উঠেছিল। গডফ্রিডের পক্ষে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। নিরুপায় হ্যানিম্যানকে স্কুলে থেকে ছাড়িয়ে লিপজিক শহরে এক মুদির দোকানে মাল কেনাবেচার কাজে লাগিয়ে দিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ এ কথা জানতে পেরে হ্যানিম্যানের স্কুলের মাইনে ও অন্যসব খরচ মকুব করে দিল যাতে আবার হ্যানিম্যান পড়াশুনা আরম্ভ করতে পারেন। যথাসময়ে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় অসাধারণ কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হলেন হ্যানিম্যান। তিনি একাধিক ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।
ক্রমশই তাঁর মধ্যে উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে উঠছিল। পিতার অমতেই লিপজিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্যে বেরিয়ে পড়লেন। হাতে সম্বল মাত্র ২০ খেল (আমাদের দেশের ১৪ টাকার মত)। তিনি ভর্তি হলেন লিপজিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিজের খরচ মেটাবার জন্য এক ধনী গ্রীক যুবককে জার্মান এবং ফরাসি ভাষা শেখাতেন। এছাড়া বিভিন্ন প্রকাশকের তরফে অনুবাদের কাজ করতেন।
হ্যানিম্যানের ইচ্ছা ছিল চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করবেন। তখন কোন ডাক্তারের অধীনে থেকে কাজ শিখতে হত। লিপজিক কোন ভাল কোয়ারিনের কাছে কাজ করার সুযোগ পেলেন। তখন তাঁর বয়স বাইশ বছর। ইতিমধ্যেই তিনি গ্রীক, লাটিন, ইংরাজি, ইতালিয়ান, হিব্রু, আরবি, স্প্যানিশ এবং জার্মান ভাষায় যথেষ্ট পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন। এবার ভাষাতত্ত্ব ছেড়ে শুরু হল চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন।
