এঙ্গেলস কোন জবাব দিতেন না। শুধু চেক পাঠিয়ে দিতেন। তিনি ভাবতেন তাঁর এই সাহায্য কোন মানুষকে নয়। মানুষের মুক্তি আন্দোলনের কাজে সাহায্য করবার জন্যই এই সাহায্য।
এই নিদারুণ দারিদ্র্যকে সঙ্গী করেই মার্কস ঝাঁপিয়ে পড়লেন ইউরোপের বুকে কমিউনিজম আন্দোলনের প্রচার করতে। দেশ-বিদেশের নেতারা এসে মাঝে মাঝেই তার সাথে সাক্ষাৎ করত। তবে এই সময় তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ক ছিল আন্তজার্তিক শ্রমিক সংঘ গড়ে তোলা। ১৮৭৩ সালে এই সমিতি ভেঙে না যাওয়া পর্যন্ত তিনিই এই সংস্থা পরিচালনা করতেন।
এরই মধ্যে তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখতেন–যদি কিছু অর্থ পাওয়া যেত, এর সাথে নিজের চিন্তা ভাবনা মতকে প্রকাশ করা যেত।
মার্কসের চিন্তা, দর্শনের ভিত্তি ছিল হেগলিয় দর্শন। হেগেল ছিলেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় দর্শনের অধ্যাপক। মার্কস সেখানে ছাত্র হিসাবে যোগ দেবার পাঁচ বছর
আগে হেগেল মারা গিয়েছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের ব্যর্থতার জন্য, কিছুটা নেপোলিয়নের জার্মান আক্রমণের জন্য জার্মানির মানুষ রুসো, ভলতেয়ারের পরিবর্তে হেগেলকেই আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করেছিল। ইতিহাসকে ক্রমবিবর্তনের অভ্রান্ত গতি হিসাবে উপলব্ধি করবার শিক্ষা মার্ক পেয়েছিলেন হেগেলের কাছ থেকে, কিন্তু হেগেল ছিলেন ভাববাদী দার্শনিক। মার্কস তার থেকে নিজেকে উত্তরণ করলেন বাস্তুবাদী দর্শনে। ক্রমশই তিনি উপলব্ধি করলেন সমগ্র সমাজ ব্যবস্থার চালিকা শক্তি হচ্ছে অর্থনীতি। যাদের হাতে যত উদবৃত্ত অর্থ সঞ্চিত হবে, তারাই হবে সবচেয়ে ক্ষমতাবান, সমাজের প্রভু।
তার এই ভাবনা চিন্তা মননশীলতা প্রকাশ করলেন তার অবিস্মরণীয় গ্রন্থ ড্যাস ক্যাপিটাল-এ (Das Capital) এতে তিনি ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার পুখানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছেন। ১৮৬৭ সালে তার এই ড্যাস ক্যাপিটল প্রচারিত হয়। পরবর্তী দুটি খণ্ড তাঁর মৃত্যুর পর এঙ্গলস সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। এই বইখানি বিশ্বের সমস্ত শোষিত বঞ্চিত সংগ্রামী মানুষের বাইবেল। রুশোর “সামাজিক চুক্তি” মতবাদ বইটি যেমন ফরাসি বিপ্লবের প্রেরণা দিয়েছিল, ড্যাস ক্যাপিটালও ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের প্রেরণা দিয়েছিল।
মার্কস তার জীবিতকালে Das Capital-এর প্রভাব দেখে যেতে না পারলেও অনুভব করেছিলেন একদিন তার এই বই সমগ্র পৃথিবীর অর্থনীতিকে নাড়া দেবে। তাই জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এই বই রচনাতেই বেশি সময় কাটাতেন। ক্রমশই তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছিল। ডাক্তাররা পরীক্ষা করে দেখলেন তার লিভার অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছে। কিছুদিনের মত। তাঁকে বিশ্রাম নিতে বললেন। কিন্তু বিশ্রাম শব্দটি মার্কসের অভিধানে লেখা ছিল না। তাছাড়া Das Capital-এর কাজ তিনি শেষ করতে পারেননি। অসুস্থ অবস্থাতেই তিনি লিখে চললেন। এই সময় তার জীবনে নেমে এল চরম আঘাত। ১৮৮১ সালের ২ ডিসেম্বর বুকে ক্যানসারে মারা গেলেন মার্কসের সুখ-দুঃখের চিরসাথী জেনি। যদিও কিছুদিন ধরেই অসুস্থ হয়ে ছিল জেনি, বিছানা ছেড়ে ওঠবার ক্ষমতা ছিল না তার। তবুও এই মৃত্যু মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত করে দিল মার্কসকে।
বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন মার্কস। এ বাড়ির সর্বত্র যে জেনির স্মৃতি ছড়ানো, কিছুতেই তাকে ভুলতে পারছেন না। পুরো একটি বছর তিনি এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়ালেন। শরীরের অবস্থা ক্রমশই খারাপ হয়ে আসছিল।
১৮৮৩ সালের জানুয়ারিতে বড় মেয়ে মারা গেল। মেয়েকে খুব ভালবাসতেন মার্কস। ফিরে এলেন বাড়িতে। সমস্ত জগৎ যেন তাঁর কাছে অন্ধকার হয়ে এসেছিল। বুকে নতুন অসুখ দেখা দিল। ডাক্তাররা সাধ্যমত চিকিৎসা করেন কিন্তু অসুখ বেড়েই চলল। অবশেষে ১৪ মার্চ ১৮৮৩ সালে চিরঘুমের দেশে হারিয়ে গেলেন মার্কস। তখন তার বয়েস ৬৬ হতে কয়েক সপ্তাহ বাকি।
তিনদিন পর তার স্ত্রীর সমাধির পাশে তাঁকে সমাধি দেওয়া হল। তখন মাত্র দশ বারোজন লোক সেখানে উপস্থিত। তাদের মধ্যে ছিলেন মার্কসের প্রিয় বন্ধু সহযোগী ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস।
মার্কসের সমাধির পাশে এঙ্গেলস যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তার মধ্যেই রয়েছে তাঁর জীবন ও কর্মের যথার্থ মূল্যায়ন।
১৪ মার্চ বেলা পৌনে তিনটেয় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক চিন্তা থেকে বিরত হয়েছেন। মাত্র মিনিট দুয়েকের জন্য তাকে একা রেখে যাওয়া হয়েছিল। আমরা ফিরে এসে দেখলাম যে তিনি তাঁর আরামকেদারায় শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন কিন্তু ঘুমিয়েছেন চিরকালের জন্য। এই মানুষটির মৃত্যুতে ইউরোপ ও আমেরিকার জঙ্গী প্রলেতারিয়েত এবং ইতিহাস বিজ্ঞান উভয়েরই অপূরণীয় ক্ষতি হল। এই মহান প্রাণের তিরোভাবে যে শূন্যতার সৃষ্টি হল তা অচিরেই অনুভূত হবে।
ডারউইন যেমন জৈব প্রকৃতির বিকাশের নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন, তেমনি মার্কস আবিষ্কার করেছেন মানুষের ইতিহাসের বিকাশের নিয়ম। মতাদর্শের অতি নিচে এতদিন লুকিয়ে রাখা এই সত্য যে, রাজনীতি, বিজ্ঞান, কলা, ধর্ম, ইত্যাদি চর্চা করতে পারার আগে মানুষের প্রথম চাই খাদ্য, পানীয়, আশ্রয়, পরিচ্ছদ। সুতরাং প্রাণ ধারণের আশু বাস্তব উপকরণের উৎপাদন এবং সেই হেতু কোন নির্দিষ্ট জাতির বা নির্দিষ্ট যুগের অর্থনৈতিক বিকাশের মাত্রাই হল সেই ভিত্তি যার ওপর গড়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট জাতিটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনের ধ্যান-ধারণা, শিল্পকলা এমনকি তাদের ধর্মীয় ভাবধারা পর্যন্ত এবং সেই দিক থেকেই এগুলোর ব্যাখ্যা করতে হবে, এতদিন যা করা হয়েছে সেভাবে উল্টো দিক থেকে নয়।
