প্রায় দু বছরের প্রচেষ্টায় তিনি বিভিন্ন শ্রমিক সংঘের সাথে এক যোগসূত্র গড়ে, তুলতে সক্ষম হলেন। প্রত্যেকেই একমত হলেন এই সমস্ত সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী সংঘগুলোর একটি সমন্বয়কারী কেন্দ্রীয় কমিটি থাকা দরকার। গড়ে উঠল আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট লীগ। এই লীগের প্রথম অধিবেশন বসল লন্ডনে ১৮৪৭ সালে। যোগ দিলেন বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, লন্ডনের প্রতিনিধিরা। এখানে রচনা করা হল লীগের নিয়ম বিধি। স্থির করা হল ভবিষ্যৎ কর্মসূচি, এখানেই মার্কস ও এঙ্গলস যৌথভাবে রচিত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো সাধারণ সভায় পেশ করলেন।
এই ম্যানিফেস্টো আধুনিক সমাজতন্ত্রবাদের প্রথম ধ্বনি (Birth cry)। এতে সমাজতন্ত্রের মূল নীতি বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হল তাদের সংগ্রামের কথা, কোন পথে তারা অগ্রসর হবে সেই পথের দিশা। বিপ্লবের আহ্বান ধ্বনিত হয়ে উঠল এই ইশতেহারে। “কমিউনিস্ট বিপ্লবের আতঙ্কে শাসক শ্রেণীর কাপুড়, শৃঙ্খল ছাড়া প্রলেতারিয়েতের হারাবার কিছু নেই। জয় করবার জন্যে আছে সারা জগৎ।”
মার্কস এই ইশতেহারে “সমাজতন্ত্র” কথাটির পরিবর্তে “কমিউনিজম” নামটি ব্যবহার করলেন। কারণ তার পূর্বেকার দার্শনিকরা “সমাজতন্ত্র” কথাটি ব্যবহার করতেন কিন্তু তাঁর মতবাদ প্রাচীন সমাজতান্ত্রিক ধারণা থেকে স্বতন্ত্র ছিল বলে তিনি কমিউনিজম কথাটি ব্যবহার করলেন।
এই ইশতেহার মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হল ১৮৪৮ সালে। সমস্ত ইউরোপের বুকে যেন বিপ্লব শুরু হয়ে গেল। এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শাসক শ্রেণীর বুক।
মার্কস ছিলেন ব্রাসেলসে। বেলজিয়ামের শাসক শ্রেণীর মনে হল তার মত একজন মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার অর্থ অনিবার্যভাবে নিজের ধ্বংসের পথকে প্রশস্ত করার হুকুম দেওয়া হল অবিলম্বে বেলজিয়াম ত্যাগ কর। ইতিমধ্যেই ফ্রান্স, জার্মানি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন।
১৮৪৯ সালে ইংলন্ডে এসে বাসা বাঁধলেন মার্কস, সঙ্গে স্ত্রী জেনি আর তিনটি শিশু সন্তান।
সেই সময় ইংলন্ড ছিল ইউরোপের সবচেয়ে উদার মনোভাবাপন্ন দেশ। এবং বিভিন্ন দেশের নির্বাসিতদের আশ্রয়স্থল। যখন মার্কস এখানে এসে পৌঁছলেন, তাঁর হাতে একটি কপর্দকও নেই। সর্বহারা মানুষের সপক্ষে লড়াই করতে করতে উনি নিজেই হয়ে গিয়েছিলেন সর্বহারা।
পাঁচজনের সংসার। আরো একজন জেনির গর্ভে, পৃথিবীতে আসার অপেক্ষায়। দু কামরার একটা ছোট্ট বাড়ি। পরের দিন খাওয়া জুটবে কি জুটবে না কেউই জানে। জামা-কাপড় জুতোর অবস্থা এমন বাইরে যাওয়াই দুষ্কর। বহুদিন গিয়েছে শুধুমাত্র একটি জামার অভাবে ঘরের বাইরে যেতে পারেননি মার্কস। অভুক্ত শিশুরা বসে আছে শূন্য হাঁড়ির সামনে। দোকানী ধারে কোন মাল দেয়নি।
এমন ভয়ঙ্কর দারিদ্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নিজের কর্তব্য দায়িত্ব থেকে মুহূর্তের জন্যও তিনি বিচলিত হননি। একটি মাত্র পরিবার তো নয়, তার জন্যে অপেক্ষা করছে পৃথিবীর কোটি কোটি পরিবার। তাদের শিশুদের মুখেও যে এক ফোঁটা অন্ন নেই।
তবুও মাঝে মাঝে নিজেকে স্থির রাখতে পারেন না। পথে বেরিয়ে পড়েন। আনমনা উদাসীর মত লন্ডনের পথে পথে ঘুরে বেড়ান। লোকেরা অবাক চোখে চেয়ে দেখে মানুষটিকে। মাথায় ঘন কাল চুল, সারা মুখে দাড়ি, প্রশস্ত কপাল, পরনের কোট জীর্ণ, অর্ধেক বোম ছিঁড়ে গিয়েছে। তার হাঁটর, ভঙ্গিটা বড় অদ্ভুত কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে তাঁর দুই চোখে ফুটে উঠেছে এক আশ্চর্য প্রত্যয় আর বিশ্বাস। তার কণ্ঠস্বর মিষ্ট নয় কিন্তু যখন কিছু বলেন, শ্রোতারা মুগ্ধ বিস্ময়ে তাঁর প্রতিটি কথা অনুভর করে। সেই মুহূর্তে তিনি নম্র বিনয়ী শান্ত।
কিন্তু যখনই কেউ তাঁর চিন্তার বুকে আঘাত হানে মুহূর্তে তিনি যেন এক অন্য মানুষ, ক্ষুরধার তরবারির মত তার মুখে যুক্তি ঝলসে ওঠে। তখন সামান্যতম করুণা নেই, দয়া নেই, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে চলে যান। সমস্ত দিন পড়াশুনা করেন, তখন ভুলে যান সংসারের দারিদ্র্য, সন্তানের অসুখের কথা।
১৮৫২ সালের ইস্টারের দিন মার্কসের মেয়ে ফ্রানসিসকা মারা গেল। জেনি লিখেছেন “আমাদের ছোট মেয়েটা ব্রঙ্কাইটিসে ভুগছিল, তিন দিন ধরে সে মৃত্যুর সাথে লড়াই করেছিল, কি ভয়ঙ্কর সে কষ্ট! যখন সব কষ্টের অবসান হল, তার ছোট্ট দেহটাকে পেছনের ঘরে শান্তিতে শুইয়ে রেখে দিলাম। আমাদের প্রিয় সন্তানের মৃত্যু যখন হল তখন আমাদের ঘর শূন্য। একজন ফরাসি উদ্বাস্তু দয়া করে আমাকে দু পাউন্ড দিলেন, তাই দিয়ে একটা কফিন কিনলাম, তার মধ্যে আমার সোনামানিক নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। যখন সে পৃথিবীতে এসেছিল তখন তার জন্যে কোন দোলনা দিতে পারিনি। মৃত্যুকালেও তার জন্যে একটা শবাধারও দিতে পারিনি।”
মার্কসের ছটি সন্তানের মধ্যে তিনটি সন্তানই অনাহারে বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছিল। কি নির্মম যন্ত্রণাময় জীবন। পৃথিবীর কোন সাহিত্যিক দার্শনিক লেখকের জীবন বোধ হয় এতখানি দুঃখময় হয়নি।
দারিদ্র, ক্ষুধা আর অসুস্থতা ছিল মার্কসের গৃহে চিরস্থায়ী সঙ্গী। অথচ তিনি বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক। যার কলমের শক্তিতে অর্ধেক পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গেল। কত সম্রাট, জার, রাজা, অত্যাচারী শাসক ধ্বংস হয়ে গেল। সৃষ্টি হল নতুন পৃথিবীর ইতিহাস। অথচ সেই মানুষটির কলমের শক্তিতে নিজের সংসারের দু-মুঠো অন্ন জোগাড় করতে পারেননি। আসলে তিনি যে এক নতুন বিশ্বকে সৃষ্টি করার কাজে হাত দিয়েছেন তা উপলব্ধি করবার মত মানুষ খুব কমই ছিল। আর তার কাজের জন্য অর্থ সাহায্য করবার মানুষ শুধু একজনই ছিল, তিনি ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস। সমস্ত জীবন ধরে তিনি অকৃপণ হাতে মার্কসকে সাহায্য করেছেন। বহু.সময়েই দেখা গিয়েছে এঙ্গেলসের অর্থ আসাবার পরেই তা নিয়ে বাজারে ছুটে গিয়েছেন মার্কস। ছেলেমেয়েদের জন্য খাবার কিনে নিয়ে এসেছেন। এঙ্গেলসের এই সাহায্য বন্ধুত্বের ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লিখে রাখবার যোগ্য। মাঝে মাঝে মার্কস অস্থির হয়ে উঠতেন, বন্ধুকে লিখতেন, “তোমার কাছে আবার সাহায্য চাওয়ার আগে যেন আমার হাতের বুড়ো আঙুলটা কেটে ফেলি।”
