বনে এসে কয়েকজন তরুণ যুবকের সাথে পরিচয় হল। তারা সকলেই ছিল হেগেলের মতবাদে বিশ্বাসী। এদের সাথেই তিনি স্থানীয় বৈপ্লবিক কাজকর্মে যুক্ত হয়ে পড়লেন। নিজের ব্যক্তিত্ব, প্রখর বাস্তব জ্ঞান, অসাধারণ প্রতিভায় স্থানীয় ব্যডিকাল মনোভাবাপন্ন যুবকদের নেতা হিসাবে নির্বাচিত হলেন। সেই সময়ে তাঁর সম্বন্ধে একটি চিঠিতে ঐতিহাসিক মোসেস (Moses) তার এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছেন, “কার্ল মার্কসের সাথে পরিচয় হলে তুমি মুগ্ধ হবে, এ যুগের শুধু শ্রেষ্ঠ নন, সম্ভবত একমাত্র প্রকৃত দার্শনিক। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সেই প্রগাঢ় প্রজ্ঞার সাথে মিশেছে তীক্ষ্ণ পরিহাস বোধ। যদি রুশো, ভলতেয়ার, হাইনে, হেগলকে একত্রিত কর তবে একটি মাত্র নামই পেতে পার, ডক্টর কার্ল মার্কস।
মার্কস অনুভব করলেন তাঁদের চিন্তাভাবনা, মতামত প্রকাশ করবার জন্য একটি পত্রিকার প্রয়োজন। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রকাশিত হল রেনিস গেজেট। মার্কস হলেন তার সম্পাদক। তকালীন শ্রমিকদের দুরবস্থা সম্বন্ধে সকলকে সচেতন করবার জন্য তিনি এই পত্রিকায় একের পর এক প্রবন্ধ লিখতে আরম্ভ করলেন।
কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশিত হতেই সরকারি কর্মচারীরা সচেতন হয়ে উঠল, এত স্পষ্টতই বিদ্রোহের ইঙ্গিত। সরকারি আদেশবলে নিষিদ্ধ করা হল রেনিস না প্রাশিয়ান সরকার। যে মানুষটির কলমে এমন অগ্নিঝরা লেখা বার হয়, সে আবার নতুন কি বিপদ সৃষ্টি করবে কে জানে! তাই মাকর্সকেও দেশ থেকে নির্বাসিত করা হল।
মাত্র কয়েক মাসের সাংবাদিকতার জীবনে মার্কস এক নতুন রীতির প্রবর্তন করলেন; চিরাচরিত নরম সুর নয়, প্রাণহীন নীরস রচনা নয়, বলিষ্ঠ দৃপ্ত নিউঁকি সত্যকে অসংকোচে প্রকাশ করেছেন। ভাষায় নিয়ে এসেছেন যুক্তি, তথ্যের সাথে সাহিত্যের মাধুর্য। সাংবাদিকতার ইতিহাসে এ এক উজ্জ্বল সংযোজন।
জার্মান ত্যাগ করে মার্কস এলেন ফ্রান্সের সাথে স্ত্রী জেনি। শুরু হল নির্বাসিত জীবন। এখানকার পরিবেশ অপেক্ষাকৃত স্বাধীন, মুক্ত। পরিচয় হল সমমনোভাবাপন্ন কয়েকজন তরুণের সাথে। এদের মধ্যে ছিলেন প্রাওধন, হেনরিক হাইনে, পিয়েরি লিরক্স।
তিনি স্থির করলেন এখান থেকেই একটি পত্রিকা প্রকাশ করবেন। তাঁর কলম হয়ে উঠেছিল ক্ষুরধার তরবারী। নিজের লেখা প্রকাশ করবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেন। প্যারিস থেকে প্রকাশিত হত একটি জার্মান পত্রিকা Vorwart। এতে পর পর কয়েকটি জ্বলাময়ী প্রবন্ধ লিখলেন মার্কস। তার ভবিষ্যৎ জীবনের চিন্তাভাবনার প্রথম প্রকাশ ঘটল এখানে। তিনি লিখলেন, “ধর্ম পৃথিবীর মানুষের দুঃখ ভোলাবার জন্য স্বর্গের সুখের প্রতিশ্রুতি দেয়। এ আর কিছুই নয়, আফিমের মত মানুষকে ভুলিয়ে রাখবার একটা কৌশল।” দার্শনিকদের সম্বন্ধে বললেন, তারা শুধু নানাভাবে জগতের ব্যাখ্যা করা ছাড়া কিছুই করেনি। আমরা শুধু ব্যাখ্যা করতে চাই না চাই জগৎকে পালটাতে।
কিন্তু মার্কসের চাওয়ার সাথে সমাজের ওপর তলার মানুষদের চাওয়ার বিবাদ শুরু হল। কারণ তারা পৃথিবীর পরিবর্তন চায় না। বর্তমান অবস্থার মধ্যেই যে তাদের সুখ ভোগ-বিলাস ব্যসন। পরিবর্তনের অর্থই সে সব কিছু থেকে বঞ্চিত হওয়া। তাই অন্য যে বিষয়েই বিবাদ থাক না, নিজেদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে সব দেশের অভিজাত ক্ষমতাবান মানুষেরাই এক।
মার্কসের তীব্র সমালোচনার মুখে বিব্রত প্ৰাশিয়ান সরকার ফরাসি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করল মার্কসকে দেশ থেকে বহিষ্কার করবার জন্য। প্রাশিয়ার অনুরোধে সাড়া দিয়ে ফরাসি সরকার মাকর্সকে অবিলম্বে দেশ ত্যাগ করবার নির্দেশ দিল।
ফ্রান্সের পনেরো মাসের অবস্থানকালে পরিচয় হয়েছিল ফ্রেডারিক এঙ্গেলস-এর সাথে। এই পরিচয় মার্কসের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কারণ পরবর্তী জীবনে এঙ্গেলস হয়ে উঠেছিলেন তাঁর প্রিয়তম বন্ধু, সহকর্মী সহযোগী। তিনি যে শুধু মার্কসকে রাজনৈতিক কাজে সাহায্য করেছিলেন তাই নয়, দুঃখের দিনে এঙ্গেলস উদার হাতে। বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর সাহায্যে।
এঙ্গেলস ছিলেন মার্কসের চেয়ে দু বছরের ছোট। তার বাবা ছিলেন জার্মানীর এক শিল্পীপতি। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রগতিশীল। বাবার ব্যবসার কাজে ইংলন্ডে গিয়েছিলেন, সেই সময় বিখ্যাত চার্টিস্ট আন্দোলনের সাথে পরিচয় হয়। মার্কসের সাথে প্রথম পরিচয় হয় যখন তিনি রেনিস গেজেট পত্রিকা সম্পাদনা করছিলেন। বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে প্যারিসে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের পর থেকে।
মার্কস প্যারিস ত্যাগ করে এলেন ব্রাসেলসে। এর অল্প কিছুদিন পর এঙ্গেলস এসে মিলিত হলেন তাঁর সাথে। এই মিলন এক নতুন যুগের সূচনা করল।
কয়েক মাস পর মার্কসকে নিয়ে এঙ্গেলস এলেন ইংলন্ডে। এখানে মার্কসের পরিচয় হল জার্মান শ্রমিক সংঘের নেতাদের সাথে, এছাড়াও লন্ডন ও ম্যাঞ্চেস্টারের (Manchester) বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সাথে। এই পরিচয়ের মাধ্যমে এক নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করলেন তিনি। এতদিন শুধুমাত্র যা কিছু অন্যায় ভ্রান্ত বলে মনে করতেন, তার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র লেখনির মাধ্যমে প্রতিবাদ করতেন। সমাজতান্ত্রিক সঙ্ঘগুলোর সাথে তার কোন যোগ ছিল না। সর্বদাই একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। ইংলন্ডের শ্রমিক শ্রেণীর সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের সূত্রে অনুভব করলেন শুধুমাত্র লেখনির মাধ্যমে উদ্দেশ্য ছিল সমাজতান্ত্রিক মতবাদ-এর চর্চা, তার প্রচার। এই সূত্রেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে সমস্ত শ্রমিক সংঘ ছিল, তাদের সাথে যোগাযোগ শুরু করলেন মার্কস। এঙ্গেলস গেলেন প্যারিসে সেখানকার শ্রমিক সংঘগুলোকে সংগঠিত করবার জন্য।
