জার্মানির রাইন নদীর তীরে ছোট্ট শহর ট্রিয়ার (Trier)। এই শহরে বাস করতেন হার্সকেল ও হেনরিয়েটা মার্কস নামে এক ইহুদি দম্পতি, হার্সকেল ছিলেন আইন ব্যবসায়ী। শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত মার্জিত রুচির লোক বলে শহরে তাঁর সুনাম ছিল। প্রতিবেশী সকলেই তাকে সম্মান করত। প্রতিবেশী জার্মানদের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক ছিল।
১৮১৮ সালের ৫ মে হেনরিয়েটা তার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিলেন। প্রথম সন্তান ছিল মেয়ে। জন্মের পর শিশুর নাম রাখা হল কার্ল।
যখন কার্লের বয়স ৬ বছর, হার্সকেল তার পরিবারের সব সদস্যই খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষা নিলেন। ইহুদির উপর নির্যাতনের আশঙ্কায় ভীত হয়ে পড়েছিলেন হাসকেল। সন্তানদের রক্ষার জন্য নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মান্তরিত হলেন।
হার্সকেলের সব চেষ্টাই বৃথা গেল। যে সন্তানদের রক্ষার জন্য তিনি নিজের ধর্ম ছাড়লেন, তাঁর সেই সন্তানদের মধ্যে চারজন টিবিতে মারা গেল। শুধু বেঁচে রইলেন কার্ল, হয়ত মানুষের প্রয়োজনের জন্যেই ঈশ্বর তাঁকে বাঁচিয়ে রাখলেন। ছেলেবেলা থেকেই কার্ল মার্কস ছিলেন প্রতিবেশী অন্য সব শিশুদের চেয়ে আলাদা। ধীর শান্ত কিন্তু চরিত্রের মধ্যে ছিল এক অনমনীয় দৃঢ়তা। যা অন্যায় মনে করতেন, কখনোই তার সাথে আপোস করতেন না।
বারো বছর বয়েসে কার্ল স্থানীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। তিনি ছিলেন ক্লাসের সেরা ছাত্র। সাহিত্য গণিত ইতিহাস তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করত। স্কুলের ছাত্র অবস্থাতেই তিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখে বিচলিত হয়ে পড়তেন। সহপাঠীরা যখন বড় কিছু হবার স্বপ্ন দেখত, তাঁর মনে হত এই সব দুঃখী মানুষের সেবায় নিজের জীবনকে উৎসর্গ করবেন।
সতেরো বছর বয়সে কৃতিত্বের সাথে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। ভর্তি হলেন জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইচ্ছা ছিল দর্শন নিয়ে পড়াশুনা করবেন। শুধুমাত্র বাবার ইচ্ছা পূর্ণ করতেই ভর্তি হলেন আইন পড়তে। কিন্তু আইনের বই-এর চেয়ে বেশি ভাল লাগত কবিতা, সাহিত্য, দর্শন। আর যাকে ভাল লাগত তার নাম জেনি। পুরো নাম জোহান্না বার্থাজুলি জেনি ওস্টেফালেন। জেনির বাবা ছিলেন ট্রিয়ারের এক সম্ভ্রান্ত ব্যারন, রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা। ব্যারনের সাথে কার্লের বাবার ছিল দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব। সেই সূত্রেই পরিচয় হয়েছিল জেনি আর কার্লের। শৈশবে খেলার সাথী, যৌবনে নিজের অজান্তেই দুজনে প্রেমের বাঁধনে বাঁধা পড়ে গেল। যতদিন দুজনে ট্রিয়ারে ছিলেন, নিয়মিত দেখা হত কিন্তু বনে যেতেই কার্ল অনুভব করলেন জেনির বিরহ। পড়াশুনায় মন বসাতে পারেন না, সব সময় মনে পড়ে বেড়ান।
ছেলের এই অস্থিরতার কথা শুনে বিচলিত হয়ে পড়লেন হার্সকেল। ডেকে পাঠালেন মার্কসকে, ট্রিয়ারে এসে পৌঁছতেই ফিরে পেলেন জেনিকে। আবার আগের মত স্বাভাবিক হয়ে উঠলেন কার্ল। কিন্তু এখানে তো বেশিদিন থাকা সম্ভব হবে না। তাই গোপনে জেনি কার্লের বাগদত্তা হয়ে গেলেন। কিন্তু এ খবর গোপন রাখা গেল না। চিন্তায় পড়ে গেলেন হার্সকেল, সামনে গোটা ভবিষ্যৎ পড়ে রয়েছে। ঠিক করলেন এবার বন নয়, কার্লকে পাঠাবেন বার্লিনে। সেখানে রয়েছেন অনেক জ্ঞানী-গুণী অধ্যাপক। সেখানকার পরিবেশে গেলে হয়ত কার্লের পরিবর্তন হতে পারে।
বাদ সাধলেন কার্ল। বার্লিনে গেলে শুধু আইন পড়ব না। দর্শন আর ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনা করব। অগত্যা তাতেই মত দিলেন হার্সকেল।
বার্লিনের নতুন পরিবেশ ভাল লাগল কার্লের। পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে নিয়মিত চিঠি লেখেন জেনিকে। সেই চিঠিতেই থাকে ছোট ছোট কবিতা, দাস ক্যাপিটালের স্রষ্টা প্রেমের কবিতা লিখছেন।
বার্লিন থেকে মার্কস এলেন জেনাতে। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে ডক্টরেট লাভ করলেন। তাঁর থিসিস-এর বিষয় ছিল “The difference between the narural Philosophy of demiocitus and Epicurus.” 43 976 075 fost stos এত তথ্যপূর্ণ সুসংহত প্রাঞ্জল ভাষায় প্রকাশ করেছেন, পরীক্ষকরা বিস্মিত হয়ে গেলেন।
কিন্তু এই প্রবন্ধে তার স্বাধীন বস্তুবাদী মতামত কারোরই মনমত হল না। তাছাড়া। জার্মানিতে তখন স্বাধীন মত প্রকাশের কোন অধিকার ছিল না। তাঁর ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি নেবেন। কিন্তু উগ্র স্বাধীন মতামতের জন্য তাঁর আবেদন অগ্রাহ্য হল।
ইতিমধ্যে বাবা মারা গিয়েছেন। ট্রিয়ারে রয়েছে মা আর প্রিয়তমা জেনি। চাকরির আশা ত্যাগ করে তাদের কাছেই ফিরে চললেন মার্কস। অবশেষে দীর্ঘ প্রেমের পরিণতি ঘটল। মার্কস আর জেনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। জেনি ছিলেন ধনী পরিবারের অসাধারণ সুন্দরী তরুণী, তবু মার্কসের মত এক দরিদ্র যুবককে বিবাহ করেছিলেন। পরিণামে পেয়েছিলেন চরম দারিদ্র্য আর দুঃখ, স্থায়ী ঘর বাঁধতে পারেননি তাঁরা। যাযাবরের মত এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে, তবুও জেনি ছিলেন। প্রকৃত জীবনসঙ্গিনী। আমৃত্যু স্বামীর সব দুঃখ যন্ত্রণাকে ভাগ করে নিয়েছিলেন।
বিয়ের পর ফিরে এলেন বলে। এই সময় হেগল ছিলেন জার্মানির শ্রেষ্ঠ দার্শনিক। তাঁর দার্শনিক মতবাদ, চিন্তা যুবসমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। মার্কসও হেগলের দার্শনিক চিন্তার দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন তাছাড়া সেই সময় জার্মানির যুবসমাজ যে গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন দেখছিল, মার্কস তা সর্বান্তকরণে সমর্থন করতেন।
