আধুনিক কালে আমরা যে টিউব লাইট দেখি তা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক শক্তি সংক্রান্ত এইসব আবিষ্কার এই সব আবিষ্কারের গবেষণাপত্র তিনি প্রথম পেশ করেন লন্ডনের রয়াল সোসাইটিতে। তার পর থেকেই তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
ইংল্যান্ডে থাকাকালীন সময়ে সমুদ্রস্রোতে, তার গতি, প্রকৃতি সম্বন্ধে কয়েকটি গবেষণাপত্র রয়াল সোসাইটিতে জমা দেন। এছাড়া তিনিই প্রথম বাইফোকাল লেন্সের ব্যবহার শুরু করেন।
তার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং এই সম্পর্কিত বিভিন্ন রচনা অল্পদিনেই ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের বিজ্ঞানী মহলে সাড়া জাগাল। এই সমস্ত দেশের বিজ্ঞানীরা তাকে বিপুলভাবে সম্মান জানাল। ইংল্যান্ডের রয়াল সোসাইটি তাঁকে তাদের সদস্য হিসাবে নির্বাচিত করল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডক্টর উপাধিতে ভূষিত করল।
ইতিমধ্যে তিনি হয়ে উঠেছিলেন পেনসিলভেনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি। জনগণের তরফ থেকে তাকে সংসদ নির্বাচিত করা হল (১৭৫০)। এই সময় থেকে তিনি ক্রমশই রাজনৈতিক কাজকর্মে জড়িয়ে পড়লেন। তিনি চেয়েছিলেন আমেরিকার সমৃদ্ধি, শ্রীবৃদ্ধি।
তার এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বিচক্ষণতার জন্য তিনি আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যের তরফ থেকে প্রতিনিধি হিসাবে একাধিকবার ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড গিয়েছেন। যেখানেই তিনি গিয়েছেন সেখানেই পেয়েছেন অভূতপূর্ব সম্মান আর সম্বর্ধনা।
এদিকে সমস্ত দেশ জুড়ে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আমেরিকার অধিবাসীদের মনে ক্ষোভ জমে উঠতে থাকে। আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দিল। ১৭৭৫ সালের ১৯শে এপ্রিল আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ আরম্ভ হল।
পরের মাসেই ফিলাডেলফিয়া শহরে আমেরিকান কংগ্রেসের অধিবেশন বসল। এখানেই জর্জ ওয়াশিংটনকে আমেরিকান বাহিনীর প্রধান হিসাবে নির্বাচিত করা হল। দেশের এই স্বাধীনতা যুদ্ধে অসাধারণ সাংগঠনিক প্রতিভা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বেঞ্জামিন। তাঁকে আমেরিকার প্রতিনিধি হিসাবে পাঠানো হল ফ্রান্সে। তিনি অল্পদিনেই ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার জন্য অস্ত্র ও সৈন্য সংগ্রহ করলেন।
১৭৮৩ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর তিনি দেশের উন্নয়নের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাঁকে পেনসিলভেনিয়ার শাসন পরিষদের সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত করা হল।
নতুন আমেরিকা গড়ে উঠবার পর নতুন শাসনতন্ত্র রচনার প্রয়োজন দেখা দিল। ডাক পড়ল বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের। তিনি আরো কয়েকজনের সহযোগিতায় রচনা করলেন আমেরিকা সংবিধান। এই সংবিধানের মধ্যে দিয়ে তিনি আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করলেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল একাশি। এই বয়সেও তিনি ছিলেন তরুণদের মতই উদ্যমী কর্মঠ।
সকল মানুষের প্রতি ছিল তাঁর আন্তরিক ভালবাসা। জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এসে নিগ্রো দাসদের দুরবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। তাই দাসপ্রথা বিলোপের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি যে কাজের সূত্রপাত করেন, উত্তরকালে লিঙ্কন তা সমাপ্ত করেন।
১৭৯০ সালে সামান্য রোগভোগের পর তার মৃত্যু হয়।
বিজ্ঞান, দর্শন রাজনীতি, অর্থনীতি-সর্বক্ষেত্রেই অসংখ্য রচনার মধ্যে দিয়ে নিজের অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। সমস্ত জীবন সেই লক্ষ্যপথেই অগ্রসর হয়েছেন– তাই তার সম্বন্ধে এমাসন বলেছেন, তিনি ছিলেন মানবজাতির সবচেয়ে হিতৈষী বন্ধু।
৩৮. কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩)
লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বিশাল পাঠকক্ষের এক কোণে প্রতিদিন এসে পড়াশুনা করেন এক ভদ্রলোক। সুন্দর স্বাস্থ্য, চওড়া কপাল, সমস্ত মুখে কালো দাড়ি। দুই চোখে গভীর দীপ্তি। যতক্ষণ চেয়ারে বসে থাকেন, টেবিলে রাখা পিকৃত বইয়ের মধ্যে আত্মমগ্ন হয়ে থাকেন। দিন শেষ হয়ে আসে। একে একে সকলে পাঠকক্ষ থেকে বিদায় নেয়, সকলের শেষে বেরিয়ে আসেন মানুষটি। ধীর পদক্ষেপে রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেন। একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে আসেন। ২৮ নম্বর ঘরের দরজায় এসে কড়া নাড়তেই দরজা খুলে দেন এক ভদ্রমহিলা। সাথে সাথে আনন্দে চিৎকার করে ওঠে উঁটি ছেলেমেয়ে। এক মুহর্তে গম্ভীর আত্মমগ্ন মানুষটি সম্পূর্ণ পালটে যান। হাসিখুশি আমোদ অহ্লাদে মেতে ওঠেন স্ত্রী আর শিশুদের সঙ্গে।
এক এক দিন ঘরে এসে লক্ষ্য করেন শিশুদের বিষাদক্লিষ্ট মুখ। মানুষটির বুঝতে অসুবিধা হয় না ঘরে খাবার মত একটুকরো রুটিও নেই। আবার বেড়িয়ে পড়েন মানুষটি। চেনা পরিচিতদের কাছ থেকে সামান্য কিছু ধার করে খাবার কিনে নিয়ে আসেন, যেদিন কারোর কাছে ধার পান না সেদিন কোন জিনিস বন্ধক দেন। ঘরে ফিরে আসতেই সব কিছু ভুলে যান, তখন আবার সেই হাসিখুশিভরা প্রাণোচ্ছল মানুষ। গুরুগম্ভীর পাণ্ডিত্যের চিহ্নমাত্র নেই।
এই অদ্ভুত মানুষটির নাম কার্ল মার্কস। যিনি রাজনীতি রাষ্ট্রনীতি সমাজনীতি অর্থনীতির সর্বক্ষেত্রেই যুগান্তর এনেছেন। আধুনিক পৃথিবীকে উত্তরণ করেছেন এক যুগ থেকে আরেক যুগে।
যিনি পৃথিবীর সমস্ত শোষিত বঞ্চিত দরিদ্র নিপীড়িত মানুষকে মুক্তির আলো দিয়েছেন। ভাগ্যের কি বিচিত্র পরিহাস, সেই মানুষটিকে কাটাতে হয়েছে চরম দারিদ্র্য আর অনাহারের মধ্যে।
