অ্যানির ছেলেবেলা থেকেই দৃষ্টিশক্তি কম ছিল, তাই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল ম্যাসচুসেট প্রতিবন্ধী আশ্রমে। এই সময় অ্যানি পার্কিনস ইনস্টিটিউটের কথা শুনতে পান।
পার্কিনস ইনস্টিটিউটে ছয় বছর ছিলেন অ্যানি। কয়েকজন বিখ্যাত ডাক্তার এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। তাদের চিকিৎসায় এবং দুবার অপারেশনের পর চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরে পেলেন অ্যানি। অন্ধত্বের নিদারুণ যন্ত্রণার কথা ভেবে অ্যানি স্থির করলেন তিনি অন্ধদের শিক্ষা দেওয়ার কাজেই নিজের জীবনকে উৎসর্গ করবেন। সেদিন ছিল ৩রা মার্চ ১৮৮৭।
প্রতিটি বস্তুর সাথে প্রথমে পরিচয় করাতেন অ্যানি। হেলেন তার স্পর্শ অনুভূতি দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করতেন তার উপর লিখতেন সেই বস্তুর নাম। কখনো আবার হেলেনকে দিয়ে বার বার লেখাতেন সেই নাম।
অল্পদিনেই প্রকাশ পেল হেলেনের অসামান্য প্রতিভা। অ্যানি যা কিছু শেখাতেন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তা শিখে নিতেন হেলেন। লুই ব্রেলা আবিষ্কৃত ব্রেল পদ্ধতিতে (এই পদ্ধতিতে অন্ধরা পড়াশুনা করে। হেলেন কয়েক বছরের মধ্যে শিখলেন ইংরাজি, লাটিন, গ্রীক, ফরাসী এবং জার্মান ভাষা। আঙুলের স্পর্শের মাধ্যমে তিনি খুব সহজেই নিজের মনোভাব প্রকাশ পারতেন।
যখন তার দশ বছর বয়স, একদিন অ্যানি জানতে পারলেন নরওয়ের একটি শিশু বিশেষ পদ্ধতিতে কথা বলতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘ এগারো মাস ধরে চলল গুরু-শিষ্যর নিবিড় অনুশীলন। একদিন হেলেনের কণ্ঠে অস্ফুষ্ট স্বরে প্রথম উচ্চারিত হল আমি আর বোবা নই। পরিণত বয়সে বিশেষ চিকিৎসায় তার বাকশক্তি অনেকখানি সহজবোধ্য হয়ে এসেছিল।
কুড়ি বছর বয়েসে হেলেন সাহিত্য দর্শন ধর্ম ইতিহাসে এতখানি জ্ঞান অর্জন করলেন, তাকে র্যাডক্লিফ কলেজে ভর্তি করে দেওয়া হল।
চার বছর পর হেলেন B.A.পাশ করলেন। তাই নয়, সমস্ত কলেজের মধ্যে তিনিই সর্বোচ্চ নম্বর পেলেন।
কলেজে পড়বার সময়েই শুরু হল তার সাহিত্যচর্চা। তিনি লিখলেন আত্মজীবনীমূলক ছোট একটি রচনা Optimism { কলেজ থেকে স্নাতক হবার পর তিনি রচনা করলেন তার আত্মজীবনী The story of my life। এতে আছে তার জীবনের তেইশ বছরের কাহিনী। হেলেন লিখেছেন কেমন করে অ্যানি তার মধ্যে শিক্ষার সাথে সাথে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছিলেন, কিভাবে অ্যানি তার শ্রদ্ধা ভালবাসা অর্জন করেছিলেন তার অপূর্ব বর্ণনা।
ইতিমধ্যে হেলেনের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। ছাপা হবার সাথে সাথেই তার জীবন কাহিনী নিঃশেষ হয়ে গেল। শুধু আমেরিকায় নয়, ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ল তার খ্যাতি।
কলেজ জীবন শেষ করে হেলেন শুরু করলেন তার কর্মজীবন। নিজের জীবনের সমস্ত সুখ থেকে বঞ্চিত হলেও জীবন তার কাছে ছিল গতিময় প্রাণবন্ত।
এইসময় অ্যানি মিঃ ম্যাকি নামে র্যাডিকাল পার্টির এক কর্মকর্তাকে বিবাহ করেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কিছু লোক অ্যানির বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করতে থাকে…তার লেখার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় তিনি একটি রাজনৈতিক মতবাদের সমর্থক।
এই ঘটনায় হেলেন ও অ্যানি দুজনেই বিচলিত হয়ে পড়লেন। যদিও এই ধরনের কুৎসা সমালোচনার বিরুদ্ধে জবাব দেওয়ার ক্ষমতা ছিল হেলেনের তবুও তিনি স্থির করলেন আর সাংবাদিকের জীবন নয়, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়ে যে অর্থ উপার্জন করবেন তাই দিয়ে জীবন ধারণ করবেন।
অ্যানির সংসার জীবনেও নেমে এল বিভেদ আর অশান্তির আগুন। বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেল দুজনের। হেলেন আর অ্যানি আবার অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বাধা পড়ে গেলেন।
এরপর থেকে দুজনে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে ছোট ছোট মঞ্চে বক্তৃতার আয়োজন করতেন। হেলেলেন সম্বন্ধে মানুষের মনের মধ্যে এমন এক অবিমিশ্রিত কৌতূহল আর শ্রদ্ধা জেগে উঠেছিল, দলে দলে লোক এসে তার সভায় ভিড় করত। এইভাবে বক্তৃতা করে যে অর্থ উপার্জন হত তাতে অতি কষ্টে দিন গুজরান হত দুজনের।
কিন্তু দুর্ভাগ্য নেমে এল অন্য দিক থেকে। অ্যানির দৃষ্টিশক্তি কোনদিনই ভাল ছিল না। ক্রমশই তা খারাপের দিকে যেতে আরম্ভ করল। অল্পদিনেই প্রায় অন্ধ হয়ে গেলেন অ্যানি।
দুটি অবলা নারী ও নিজের ব্যয়ভার বহন করা ক্রমশই কষ্টকর হয়ে উঠছিল হেলেনের কাছে। বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করে বক্তৃতার আয়োজন করে যে সামান্য অর্থ আয় হত, সমস্ত ব্যয়ভার মেটাবার পর হাতে সামান্য অর্থই উদ্ধৃত থাকত।
হেলেন বহু বিশ্ববিখ্যাত মানুষের সাথে মিলিত হয়েছেন, তাদের সাথে কথাবার্তা বলেছেন। যারাই তার সংস্পর্শে এসেছে তারাই মুগ্ধ হয়েছে।
হেলেনের একজন অনুরাগী ছিলেন বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোকাল ফিজিওলজির অধ্যাপক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল (ডাক্তার বেলই প্রথম হেলেনের বাবাকে পার্কিনস ইনস্টিটিউটের সন্ধান দেন)। ডাক্তার বেলই টেলিফোনের আবিষ্কারক। হেলেনকে নিজের কন্যার মত স্নেহ করতেন, তাকে নানাভাবে সাহায্য করতেন।
ডাক্তার বেলের নেশা ছিল দেশভ্রমণের। হেলেন এবং অ্যানিকে সঙ্গী করে বেরিয়ে পড়লেন ইউরোপে।
যখন যে দেশে গিয়েছেন হেলেন কেলার সেই দেশের মানুষের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। রাষ্ট্রনায়ক থেকে আরম্ভ করে সাধারণ মানুষ যারাই তার সংস্পর্শে এসেছেন, সকলেই মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখেছেন এই অসামান্য প্রতিভাময়ী নারীকে।
