উডু-উইলসন, স্যার হেনরি আর্ভিং, মার্ক টোয়েন, বার্নার্ড শ, জহরলাল নেহরু সকলেই ছিলেন তার গুণমুগ্ধ অনুরাগী।
এই সময় হলিউডের একজন চলচ্চিত্র পরিচালক হেলেনের কাছে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রস্তাব করেন। ছবির নাম রাখা হয় Deliverrance। এই চলচ্চিত্রে হেলেনের প্রকৃত জীবনকে বাদ দিয়ে তাকে জোয়ান অব আর্কের সমগোত্রীয় করে তোলা হয়, যে যুদ্ধের বিরুদ্ধে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে।
১৯২২ সালে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল মারা গেলেন। তিনি ছিলেন “American Foundation for Blind”-এর সম্পাদক। তার মৃত্যুর পর ডাক্তার বেলের অন্তিম ইচ্ছা
অনুসারে এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেন হেলেন। এতদিন তিনি এককভাবে অন্ধদের কল্যাণে কাজ করেছিলেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বহু মানুষ নিজেদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। হেলেন অনুভব করলেন এই অন্ধ মানুষদের জন্য কিছু করা প্রয়োজন।
তিনি আমেরিকান ফাউন্ডেশন ফর ব্লাইন্ড”-এর সাথে সরাসরি যুক্ত থাকলেও পৃথিবীর বহু সংস্থার সাথেই ছিল তার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। শুধু আমেরিকা নয়, পৃথিবীর বহু দেশে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দিয়েছেন। মানুষ মুগ্ধ হয়ে তাকে অর্থ সাহায্য করেছে। সেই অর্থে তিনি দেশে দেশে গড়ে তুলেছিলেন অন্ধদের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এইভাবে প্রায় পঞ্চাশটি প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুলেছিলেন। একজন মানুষ শুধুমাত্র সদিচ্ছা নিয়ে কতদূর এগিয়ে যেতে পারে, কি বিশাল কর্মযজ্ঞের নায়ক হতে পারে হেলেন কেলার তার প্রকষ্ট উদাহরণ।– তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার অন্ধ মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষালাভ করে নিজেদের সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্ধকারের বুকে তাদের জীবনে জ্বলে উঠেছে। আলো।
১৯৩৬ সালে আকস্মিকভাবে কেলারের জীবনে নেমে এল বিরাট আঘাত। তার শিক্ষয়িত্রী, সঙ্গী, সহকারী, অ্যানি সুলিভান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এর অল্পদিন পরেই মারা গেলেন অ্যানি।
ইতিমধ্যে ইউরোপের বুকে শুরু হল বিশ্বযুদ্ধ। মানবতার পূজারী এই নারী দেশে দেশে ঘুরে আহত মানুষদের সেবা করেছেন। অন্ধ বিকলাঙ্গ পঙ্গু মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের উৎসাহ দিয়েছেন, অনুপ্রাণিত করেছেন। তাদের সাহায্যের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ হেলেনকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। আমেরিকায় গিয়ে দুজনের পরিচয় হয়। সেই সময় কবি তাকে শান্তিনিকেতনে আসবার আমন্ত্রণ জানান। হেলেন সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন ১৯৫৫ সালে তিনি ভারতে আসেন। দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে তাকে সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করা হয়। কলকাতাতেও এসেছিলেন তিনি। এখানে অন্ধ স্কুল পরিদর্শন করেন।
দেশ ভ্রমণ সমাজ কল্যাণকর কাজের মধ্যেও তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। তার লেখা কয়েকখানি উল্লেখযোগ্য বই, আমার জীবন কাহিনী, ১৯০৩ (‘The story of my life) আমার জগৎ ১৯০৮ (The world I live in), বিশ্বাস রাখ, ১৯০৪, (Let us have faith) শিক্ষিকা মিস অ্যানি স্যুলিভান, ১৯৫৫, (Teacher Annie Sullivan); খোলা দরজা, ১৯৫৭ (The open door)।
১৯৫০ সালে সতের বছর বয়সে পা দিলেন হেলেন কেলার। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। প্যারিসে সেই উপলক্ষে এক বিরাট সম্বর্ধনার আয়োজন করা হল। দেশ-বিদেশ থেকে সাংবাদিকের দল এসে ভিড় করল প্যারিসে। সকলেই ভেবেছিল তিনি বোধ হয় এই কর্মময় জীবন থেকে ছুটি নেবেন। কিন্তু হেলেন কেলার ছিলেন এক অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। সেবা আর কর্মের মাঝেই একাত্ম হয়েছিল তার জীবন। তাই ১লা জুলাই ১৯৬৮ সালে যখন তিনি মারা গেলেন তখনও তিনি ছিলেন কর্মরত।
পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও হেলেন কেলার আজও পৃথিবীর সমস্ত অন্ধ বিকলাঙ্গ পঙ্গু প্রতিবন্ধী মানুষের কাছে এক প্রেরণা আর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন জীবনের দৃষ্টান্ত প্রকৃতই বিরল।
৩৭. বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন (১৭০৬-১৭৯০)
আমেরিকার ইতিহাসে যদি বহুমুখী ব্যক্তিত্বের অধিকারী কোন পুরুষের নাম করতে হয় যিনি একাধারে ছিলেন মুদ্রাকর, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রের সংবিধানে রচয়িতা, বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক, যার সম্বন্ধে দেশবাসী শ্রদ্ধা অবনত চিত্তে বলেছিল আমাদের হিতৈষী মহাজ্ঞানী পিতা সেই মানুষটির নাম বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। শুধু আমেরিকার নন, সমগ্র মানব জাতির তিনি হিতৈষী বন্ধু। এই মহাজ্ঞানী কর্মযোগীর জন্য আমেরিকার বোস্টন শহরে।
১৭০৬ সালের জানুয়ারি মাসে। তার বাবা ধর্মীয় কারণে ইংল্যাণ্ড ত্যাগ করে আমেরিকায় গিয়ে বসবাস আরম্ভ করেন। বেঞ্জামিন জন্মের আগে তার মা চোদ্দটি সন্তানের জন্ম দেন। তাঁর বাবা অতিকষ্টে এই বিরাট সংসার প্রতিপালন করতেন। ছেলেবেলায় বেঞ্জামিন কোনদিনই আর্থিক সচ্ছলতার মুখ দেখেননি।
যখন তার আট বছর বয়স, বাবা তাকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কয়েক বছর স্কুলের খরচ মেটালেও শেষ পর্যন্ত আর পারলেন না। বেঞ্জামিনকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনে নিজের সাবান তৈরির কারখানায় ঢুকিয়ে দিলেন।
কিন্তু এই কাজে কিছুতেই মন বসল না বেঞ্জামিনের। ব্যবসার প্রতি কোনদিন তাঁর কোন আকর্ষণ ছিল না। তার আগ্রহ ছিল সমুদ্রে ভেসে বেড়াবার।
